গল্প:প্রেম সমাচার(০২)

লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা

পর্ব:০২

— ‘এইযে শুনছেন? কানে তুলো এঁটে রেখেছেন কেন? কথা বলতে তো সমস্যা নেই। আজ রাতের জন্য আমরা প্রতিবেশি। সেই দায়িত্ববোধ থেকেও একটু কথা তো বলতে পারেন এংরি ইয়াং ম্যান….’

ল্যাপটপ ওপেন করে খুটখাট করে কিছু একটা টাইপিং করলেও কাজে মন নেই নীরবের। সে নিজের দাদাভাইকে চেনে আর চেনে বলেই ভয় হয়।সে শুনলোও ওপাশের রমনীর মিষ্টি কন্ঠের ডাক। অথচ উত্তর নেবার প্রয়োজন বোধ করলো না। কানে এয়ারবাডস দিয়ে রাখা তাই না শোনার ভান করে বসে থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া ট্রেনিং-এ ওকে একনাগাড়ে চুপ করে বসে থাকাটাও শেখানো হয়েছে। বি ষাক্ত সাপ ছেড়ে দিয়ে ধৈর্য্যের পরিক্ষা নিয়েছেন সিনিয়ররা। সে-সকল হাড় হিম করা ট্রেনিং-এর ব্যপারে সিভিলিয়ান কল্পনা পর্যন্ত করবে না। ট্রেনিং-এর সাপটাকেও আজ ভালো লাগলো নীরবের। অন্তত জান বেরিয়ে গেলেও কান সহি-সালামতে থাকতো!

নীতি এবারে তুড়ি বাজালো নীরবের সামনে। হাতে একটা বই ছিলো সেটা দিয়ে সিটের উপর কয়েকবার বাড়ি দিয়ে বললো,

— ‘শুনছেন? এটা কোথায়? ঢাকার কাছাকাছি এসে গিয়েছি? ময়লার স্তুপের সুঘ্রাণ পেয়েছেন? পেলেই বুঝবেন উই আর ইন ঢাকা। ইট পাথরের একটা বিশ্রী শহর। ধুলো-ময়লা,জ্যাম, দূষণ আর সবথেকে বাজে হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের ঘুষ খেয়ে থলথলে ভুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। শীত কোরছে না আপনার? আপনি কি পড়াশোনা করেন? অনার্স শেষ? রেজাল্ট কি ছিলো? আজকাল নাকি সবার সিজিপিএ চার হয়। আমি বলি আসলেই তারা কই? আমি তো তাদের চোখে দেখিনা। এখন আপনি বলেন ভাই? ইউনিভার্সিটি একটা চিল করার জায়গা। সেখানে ও সিজিপিএ নিয়ে প্যারা খাওয়া লাগে। এই ল্যাব, এসাইনমেন্ট, ভাইভা, ঘোড়ার ডিম, হাতির ডিম, টিকটিকির ডিম দিয়ে পুরো সেমিস্টার ঠেসেঠুসে রাখে। এত পড়লে চিল কোরবো কখন? আপনিও কি আমার মতো বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন? জোর দিয়ে বিয়ে দেয়া একটা সিনেম্যাটিক ব্যপার। আই এঞ্জয় সিনেমা। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে তো আর সিনেমা করা যাবেনা, বলুন? আপনার প্রব্লেম কি? দাঁতে পোকা? কথা বলতে পারেন না? তাহলে সব সময় এমন এংরি ইয়াং ম্যান সেজে থাকছেন কেন? আরেহ ভাই ওসব টাফ লুক টিভি সিরিয়ালে ভালো লাগে। বাস্তব জীবনে মনে হয় বহু বছর টয়লেট ক্লিয়ার না হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যর রোগী। সিনেমায় আবার টাফ লুক দেয়া নায়কের সেই ডিমান্ড। আপনি পোড়ামন দেখেছেন? কেয়ামত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত দেখেছেন? গান গুলো শুনেছেন একেকটা হিলিং পাওয়ার নিয়ে বানানো। সিয়াম আহমেদ এত জোশ ভাই… পোড়ামন ২ এর ওই গানটা গাইবো? ওকে গাইছি..

তুই চুল করে দে এলোমেলো,
ভেঙে দে না চুড়ি..
তোর প্রেমে এখন আমি
সুতোকাটা ঘুড়ি..

পরের লিরিক্স আপনার জানা আছে? উপরের লাইন গুলো আবার গাইলে আপনি কোরাস করবেন আমার সঙ্গে? আপনার ভাগের লাইনগুলো গাইছি। আপনি মেমোরাইজ করে নেবেন।

আমি তোর সঙ্গে বাঁচব,
আমি তোর সঙ্গে মরবো।
তোর প্রেমে এখন আমি
সুতো কাটা ঘুড়ি।

লাস্টের দুটো লাইন কিন্তু সেইম। নিন শুরু করুন। আরেহ থেমে আছেন কেন? সফরে গান ছাড়া জমেই না। শুনেছেন? আবার গাইবো? আপনি মেমোরাইজ করতে পারেননি? এত ডাল ব্রেইন কিভাবে হয় মানুষের? আমি যেকোনো গানের লিরিক্স শুনলে একশ বছর পরও মনে রাখি…. এটা পারলে অন্যটা বলবেন তো নাকি?

ওহে শ্যাম তোমারে আমি নয়নে নয়নে রাখিবো..
অন্য কেউরে আমি চাইতে দিবো।
ওহে শ্যাম…’

ক্রমাগত চলবে থাকা বকবকানিতে একটা লম্বা শ্বাস ফেললো নীরব উপরের দিকে তাঁকিয়ে। কেন এমন হচ্ছে ওর সঙ্গে? উপরওয়ালা কি চাইছেন? হাড়ভাঙা কড়া ট্রেনিং-এর পর শুধুমাত্র শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলার অপরাধে নীররের ছয় বছরের কষ্ট জলে যাক? তা-ও কিনা এক আধা পাগলের জন্য। উঠে অন্য কোথাও চলে যাবে নাকি? এমন চপর চপর ওর কান দুটো আর নিতে পারছেনা৷ দুপাশে মাথা নাড়ায়! কিভাবে পরিত্রান পাবে? এই মেয়ের পিছু ছাড়ানো টা জরুরি। এই মেয়েকে সারারাত সহ্য করার চেয়ে ক্রস ফায়ার ডচ করা ভীষণ ইজি। নাহ! ‘সোর্ড ওফ অনার’ ধারী লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান মোটেও হার মানবে না।তার লক্ষ্য হতে বিচ্যুতি সৃষ্টির মাধ্যম ‘কাঁচাকলাট্র‍্যাপ’কে এক্ষুনি গোড়া থেকে উপড়ে ফেলবে নীরব।

ল্যাপটপ নামিয়ে ট্রলিব্যাগে রেখে তালা দিয়ে কেবিনের বাইরে বের হতে উদ্যত হয় নীরব। এমন সময় ট্রেন এসে থামলো কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে। এটা সম্ভবত কোনো জংশন অথবা অন্য ট্রেন বাইপাস হবার কারণে লাইন ছেড়ে দাঁড়িয়েছে ওদের ট্রেন। বাইরেটা হেঁটে দেখার জন্য এগোতে থাকে নীরব। কিন্তু সেটা আদৌও হবার ছিলো? কখনোই না। ওপাশ থেকে তড়িঘড়ি করে সিট থেকে নামলো নীতি। নীরবের পিছে এসে দাঁড়িয়ে বললো,

— ‘বাইরে যাচ্ছেন? আমিও যাবো। বাড়ি থেকে পালিয়েছি তো। নয়তো খাবার-দাবার কিনে আনতাম। আমার আম্মুর হাতের রান্না জম্পেশ। একবার খেলে মনে হবে খেয়েই যাই। বিয়ের ভয়ে অমৃত ফেলে ছুটে পালিয়েছি। ক্ষিদে পেয়েছে। স্টেশন থেকে কিছু কিনে নেব না-হয়। আপনার প্রব্লেম নেই তো? দেখুন? আমরা আজকের জন্য প্রতিবেশী। আর প্রতিবেশীর হক সবার আগে। ভুলে যাবেন না কিন্তু। আচ্ছা শুনুন আপনার নাম কি? প্রতিবেশীর নাম না জেনে এই এই বলে আর কতবার ডাকবো?’

— ‘নীরব।’

— ‘নীরব সাহেব… হুম নাইস নেইম। আপনার সঙ্গে মিলেছে। একেবারে রাজজোটক। নীরবই তো থাকছেন পুরোটা সময়। আমার নাম নীতি। আমি ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত আছি। মানে জার্নালিস্ট। এক সপ্তাহ আগে জার্নালিজম ফাইনাল দিয়ে বাড়ি এলাম। ওমা আর সবাই ধরে আমাকে ভুড়িওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগলো। ওমন ন করলে আমি এখন রুমের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকতাম। ‘

নীতির চুপচাপ শুয়ে থাকা কথাটা কানে বাজলো নীরবের। না চাওতেও মুখ ফসকে বললো,

— ‘তবে এটা হতো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।’ বলেই বুঝল বোলতার চাকে ঢিল ছুড়েছে। পালটা আক্রমণ এলো বলে।

— ‘আমার রুমে থাকাটা আশ্চর্যজনক হবে কেন? কি বলতে চাইছেন? আমার রুমে আমি থাকবনা? তো কি করব? থলথলে ভুড়িওয়ালার পেটে সাতার কাঁটব? দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশ ফিটের বিশাল কামরা আমার। ম্যাচিং উডেন ফার্নিচার। ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝে। টার্কিস লাইটিং দিয়ে সাজানো আমার ঘরে আমি থাকবো এটা নিয়ে আপনি মশকরা করেন? আমায় চেনেন? কতটুকু চেনেন হ্যাঁ? সুন্দরী মেয়ে দেখলেই মশকরা করতে মন চায়?’

চোখ সরু করে ঠোঁটে ঠোঁট টিপে নীতির দিকে একপলক তাঁকিয়ে কেবিনের দরজার কাছে ঝোলানো জংলি ছাপা জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয় হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো নীরব। যেন নিজের পরিচয় বোঝাতে চাইছে। সে-ও একজন সরকারি চাকরিজীবী। আর্মিতে আছে। সুতরাং কথাবার্তা যেন একটু বুঝেশুনে বলে এমনটাই ইঙ্গিত করলো নীরব।

জ্যাকেট দেখে খানিক থমকালো নীতি। কপাল কুঁচকে কিছু বোঝার চেষ্টা করতেই ঠোঁটের কোনে ফুটলো রহস্যময় হাসি!

স্টেশনে এসে একটা সিগারেট ধরালো নীরব। লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো উড়িয়ে দিয়ে চেয়ে থাকলো ট্রেনের দরজার কাছে। কেননা দরজার ফাঁকা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বারবার নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বাঁচাল মেয়েটা। তীক্ষ্ণ নজরে নীরবও পর্যবেক্ষণ করতে থাকে মেয়েটিকে। কোথাও না কোথাও একটা ক্লু নিঃসন্দেহে পাবে মেয়েটিকে জব্দ করার। ডিপার্টমেন্টের হ্যানিট্র‍্যাপ না হয়ে ইনফরমেশন হাতানোর জন্য শত্রুপক্ষের কোনো চাল কি না সেটা বোঝার ও চেষ্টা করতে থাকে নীরব। একটা সিগারেট শেষ করে আরেকটা ধরাতেই নীতি এসে দাঁড়ালো ওর পাশে। সম্পূর্ণভাবে নীরবকে অদেখা করে দোকানিকে বললো,

—’ মামা? সিঙ্গারা কবেকার? ফ্রেশ হবে তো? সয়াবিন দিয়ে ভেজেছেন নাকি মোটরসাইকেলের পোড়া মোবিল দিয়ে? আপনাদের এসব ফাস্টফুড খাওয়া আর বিষ খাওয়া একই কথা। টাকা দিয়ে বিষ কিনে খাই আমরা। সিঙ্গারা ফ্রেশ হলে পাঁচটা দেন। বাড়ি থেকে পালিয়েছি, বুঝলেন? আজই যে পালাব সেটাও বুঝিনি। নয়তো পেট ভরে খেতাম। আপনার দুই মাসের বাসি সিঙ্গারা খেতে আসতাম না।’

স্টেশনে হরেক রকম যাত্রীই আসে।তন্মধ্যে এমন আজব পাব্লিক দেখে সবকটা দাঁত কেলিয়ে হাসলো দোকানি।বললেন,

— ‘সিঙ্গারা আপনার মামি বানায় মামা। একদম ফ্রেশ মাল। খেয়ে দেখেন। আমার বউয়ের হাতেও জাদু আছে।’

— ‘তাই নাকি? তবে দশটা দিন। আমরা বুঝলেন মামা প্রতিবেশীর খবর রাখি। সোসালিজম মেইনটেইন করে চলি। কোষ্ঠকাঠিন্যর রোগী সেজে থাকিনা। আরেহ ভাই আপনি সকালে ইউসুফ গুলের ভুসি খাবেন, পাকা পেপে খাবেন, বেশি বেশি শাক-সবজি, ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার-দাবার খাবেন তাহলে তো আর এমন টাফ লুক নিয়ে চলা লাগেনা। কিন্তু মানুষ বোঝেনা। ভাবে সবুজ জ্যাকেট আর একটু গম্ভীরমুখে থাকলেই সবাই তাকে সরকারি চাকরিওয়ালা বাহিনীর সদস্য ভেবে উঠতে-বসতে সালাম ঠুকবে। স্যার সম্বোধন করে কুর্নিশ করে। পারলে পকেটে দুই-চারশ টাকা ভস করে গুঁজে দেবে। আমাদের দেশের আর্মিদের কোনো কাজ আছে বলেন? বসে খেয়ে থলথলে ভুড়ি বানায়। উনাদের থলথলে ভুড়ি একশ গজ দূর থেকে দেখলেই চেনা যায়। জ্যাকেট দিয়ে ভয় দেখানো লাগবেনা।’

দোকানে দাঁড়ানো নীরবের দিকে আড়চোখে তাঁকালো বয়স্ক দোকানি। তার মন বলছে এই লোক আর্মির অফিসার। লোকটার গড়ন,উচ্চতা, চুলের কাট সবই আর্মিদের মতো। পরণেও আর্মির জ্যাকেট। কিন্তু ট্রেনের যাত্রী এসব কি বলে? নাকি কোনো প্রতারণাকারী চক্র? এসব বলে ঝামেলা বাঁধিয়ে দোকান লুট করবে নাকি! ইতস্ততভাবে দশটা সিঙ্গারা প্যাকেট করে দিলেন দোকানি।

— ‘মামা একশ টাকা।’

সিঙ্গারার দাম শুনে ভ্রু কুঁচকে গেলো নীতির। কোমরে হাত দিয়ে বললো,

— ‘একশ টাকা মানে?’

— ‘দশ পিস সিঙ্গারা। দশটাকা পিস হিসেবে একশ টাকা হয়।’

ততক্ষণে অর্ধেক শেষ হওয়া সিগারেট পা দিয়ে পিষে ফেলে দোকানিকে ত্রিশ টাকা মিটিয়ে চটজলদি কেটে পড়লো নীরব। তীরে এসে তরী ডোবানোর জন্য শ্রবণেন্দ্রিয় নষ্ট করতে পারবেনা সে ৷ যাবার আগে অবশ্য দোকানীর দিকে চেয়ে বাঁকা হাসলো। আজ এই লোক কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিল সেই আফসোস জীবনভর করবেন।

নীরবের কেটে পড়াকে সরু দৃষ্টিতে চেয়েও ভেংচি কাটলো নীতি। এবারে ধারালো গলায় বললো,

— ‘দশ টাকা পিস সিঙ্গারা? এটা ময়দা নাকি সোনা দিয়ে বানাইছেন? রাত-বিরেতে অবলা-অসহায় ট্রেন যাত্রীর কাছ থেকে ডাকাতি করতে দোকান খুলে বসেছেন? আপনার বউয়ের হাতের জাদু আছে বলে দশ টাকা পিস নেবেন? একটু আগে না মামা সম্বোধন করলেন? সেই ভাগ্নির কাছ থেকে ডাকাতি করতে পারবেন মামা? যেখানে আমাকে ফ্রি দেয়া উচিত ছিলো।’

কাঁচুমাচু করে দোকানি বললেন,

— ‘আপনি দশ টাকা কম দিয়েন।’

—’ দশ টাকা কম দিবো মানে? আমাকে আপনার পাষাণ মনে হয়? খেটে খাওয়া মানুষের দশটাকা আমি খেয়ে বড়লোক হয়ে যাবো। আমার নাম নীতি। নীতি বিরুদ্ধে আমি কোনো কাজ করিনা। একশটাকা দিয়েই নেবো আমি। স্বাদ ভালো না হলে কিন্তু বদদোয়া দেবো মামা। মামির হাতের জাদু হাওয়ায় মিশে যাবে। মামিকে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসবেন বুঝলেন। আপনাদের ভালোবাসা দেখে আমি শিহরিত।’

সিঙ্গারার বিল মিটিয়ে সেখানেই খাওয়া শুরু করলো নীতি। একের পর এক গলাধঃকরণ করে চলেছে সিঙ্গারা।

—’ মামা সস দেন। সস ছাড়া সিঙ্গারা জমেনা। মামির হাতে আসলেই জাদু আছে মামা। সস দিয়ে জাদুর শক্তি একটু বাড়িয়ে দিন এবার।’

— ‘সস নেই মামা।’

বিড়বিড়িয়ে আরও কিছু বলে একটু দূরের দোকানে গেলো নীতি। দোকানিকে বকাবকি করা থামালো না একটুও। বলল,

— ‘মামা সস দিন তো। ভালো দেখে দেবেন। পঁচা টমেটোর সস দেবেন না কিন্তু। ওই পাশের মামার কাছ থেকে সিঙ্গারা নিলাম।এখন শুনি সস নেই। আপনি বলেন সস ছাড়া হবে?’

শীতের রাতে বেজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দোকানি কিছুই বললেন না। দুটো মিমি সসের প্যাকেট দিয়ে বিরস মুখে বললেন,

—’২০ টাকা।’

— ‘২০ টাকা মানে?’

— ‘সস নিলেন। সেটার দাম।’

— ‘কিন্তু বাজারে তো এটার দাম ১০ টাকা’

দোকানি সসের প্যাকেট পুনরায় নির্ধারিত জায়গায় রেখে বললেন,

— ‘তাহলে যান গা আপা। বাজার থেকেই লন।’

— ‘ভোক্তা অধিকারে একবার ফোন করলে এসব ‘বাজার থেকে লন’ বেরিয়ে যাবে বুঝেছেন? অসহায় মুসাফির থেকে ডাকাতি করেন আপনারা? আমি কালই ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করবো।’

নীতির উচ্চবাচ্চ্যে নরম হলো দোকানি। কাল থেকে আর দোকানই খুলবেনা। কই থেকে আসে এসব পাগল-ছাগল! বললেন,

— ‘সামান্য দশ টাকা আপা।’

— ‘সামান্য দশ টাকা? গাছের একটা পাতা ছিঁড়ে দশ টাকায় চালাতে পারবেন? আমি তাহলে সসের দাম না দিয়ে দুটো পাতা দিয়ে যাই? নেবেন? বলুন? নেবেন?’

মুখটাকে কালো করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে দোকানি। বললেন,

— ‘আপনি দশ টাকায় দেন আপা।’

— ‘এইতো ট্রেন এবার লাইনে এসেছে। আমার সঙ্গে কেউ ঠকবাজি করে পার পাইনা।’

মনের আনন্দে সস মাখিয়ে সিঙ্গারা খেতে থাকা নীতি শুনলও না চলন্ত ট্রেনের হুইসেল। ধীরে ধীরে আরম্ভ করতে শুরু করে ‘পার্বতীপূর এক্সপ্রেস’। বেখবর নীতি তখনও ব্যস্ত সিঙ্গারায় কলিজা খোঁজায়।

নীরব ট্রেনের দরজা থেকে বাইরে তাঁকালো একবার। যা ভেবেছিল তাই-ই। মেয়েটি ট্রেন মিস করে যাচ্ছে। সে শুনলো চেঁচিয়ে বাচাল মেয়েটি বলছে,

— ‘ওই কোষ্ঠকাঠিন্যর রোগী.. চেইন টানুন। আমি ট্রেন মিস করতে চাই না। সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যাবে। বাংলার একজন সুন্দরী রমনীকে ভুড়িওয়ালার গলায় ঝুলিয়ে দিতে সাহায্য করবেন না। প্লিজ নীরব.. নীরব।’

ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো বাচাল মেয়েটির শব্দরা।মেয়েটির আর্তচিৎকারে বাঁকা হাসলো নীরব। কড়া ট্রেনিং-এর সুফল হিসেবে মানুষের নজর পড়তে পারে সে। এই মেয়েটিকে সাহায্য করতে গেলে এক্ষুনি ওকে টেনে ধরবে। সম্ভবত ট্রেনে তার আরোও কিছু সহকারী আছে যারা ওর ল্যাপটপ হাতিয়ে নেবে। সবকিছুই কেমন যেন ওর প্ল্যান মতাবেক হচ্ছে। নিজের চৌকস মস্তিকের প্রতি সর্বদা আস্তা রাখে নীরব। ট্রেনিং-এর শেষ ধাপ উতরে গেলে ডিপার্টমেন্টকে জানাবে হ্যানিট্র‍্যাপে সত্যিকার অর্থে হানির ব্যবস্থা করার জন্য। এসব আধা পাগল দিয়ে ওকে ঘায়েল করা অসম্ভব।

কেবিনে এসে ল্যাপটপ খুলে বসলো পুনরায় নীরব। ঠোঁটের কোনে ফুটে আছে বাঁকা হাসি। ট্রেন চলতে শুরু করেছে পূর্ন গতিতে। সামনের সিটে মেয়েটির এখনো ব্যাকপ্যাক পড়ে আছে অবহেলায়। সেদিকে একপল চেয়ে ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেলো নীরব। মূক হয়ে রইলো কয়েক পল।

অতঃপর বাংলাদেশ আর্মির চৌকস লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটলো ট্রেনের বিপরীতেমুখে…

চলবে…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments