অনুগল্প:নাটকঘর

নাবিলা বাসর ঘরে একটা পুতুল তোয়ালের ভিতর ভালো করে মুড়িয়ে কোলের উপর নিয়ে চুপচাপ বসে বর আসার অপেক্ষা করছে। ঘুমে ঢুলছে, কিন্তুু বর আসার নাম নেই। ইচ্ছে করছে ঘর থেকে বেরিয়ে বর এর কলার ধরে টেনে আনতে। প্রথম দিনেই বউকে অপেক্ষা করানো হচ্ছে।
এরই মধ্যে দরজা খোলার শব্দ পেয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করে আরেকটু ঘোমটা টেনে বসল।

জাহিন দরজার ছিটকিনি আটকে বিছানায় বসা নতুন বউ এর দিকে চোখ পরলে ভ্রু কোঁচকালো। মেয়েটার কোলে কে? মনে হচ্ছে বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে আছে। কিন্তুু তার তো কুমারী মেয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে। তাহলে বাচ্চা কোথা থেকে আসল! একটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করলে দেখল তোয়ালের মধ্যে বাচ্চার মতো করে পুতুলকে নিয়ে বসে আছে। এটা দেখে জাহিনের কোঁচকানো ভ্রু আরও কুঁচকে গেলো।
এ মেয়ে পাগল না-কি! কিন্তুু তার মা তাকে পাগল মেয়ের সাথে কেন বিয়ে দিবে! দিলে তো আগেই বলে দিত!

নাবিলা বিরক্ত হয়ে বসে আছে। আজব কখন থেকে অপেক্ষা করিয়ে এখন ঘরের মধ্যে এসে কী ধ্যান করছে আল্লাহই জানে! জাহিনের কোনো আওয়াজ না পেয়ে নিজের ঘোমটা সরিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

“আপনার সমস্যা কী হ্যাঁ? আমার ঘোমটা তুলছেন না কেন? কী ধ্যান করছেন?”

জাহিন নাবিলার কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকালো। নতুন বউরা তো লজ্জা পায়! আর এ ঘোমটা তুলছিনা বলে অধৈর্য হয়ে গেছে!

নাবিলা জাহিনকে তার দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
“আসুন ঘোমটা তুলুন। এই বলে আবার নিজের ঘোমটা ফেলে মাথা নিচু করল।”

জাহিন অবাক এর উপর অবাক হলো। নিজেই ঘোমটা উঠালো, আবার নিজেই ফেলে বলছে তাকে উঠিয়ে দিতে!

নাবিলা ঘোমটার আড়াল থেকে বলল,
”আপনি কী আসবেন? না-কি আমি আপনাকে ঘোমটা পরিয়ে সেটা আবার সরিয়ে দিব!”

জাহিন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে এগিয়ে এলো নাবিলার দিকে! অতঃপর নাবিলার ঘোমটা ধীরে ধীরে উঠালো। নাবিলা জাহিনের দিকে তাকিয়ে লজ্জামাখা হাসি দিয়ে মাথা নিচু করে নিল।

জাহিন হা করে চেয়ে আছে তার এই বহুরূপী বউ এর দিকে। একটু আগেই নিজের ঘোমটা নিজে সরিয়ে রেগে তাকে ঘোমটা সরিয়ে দিতে বলে নিজে নিজেই ঘোমটা দিল। এখন আবার লজ্জাও পাচ্ছে! কী সাংঘাতিক!

নাবিলা জাহিন এর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
”চোখ বড় বড় করে কী দেখছেন? আমি জানি আমি একটু বেশিই সুন্দর। আমার পাশে আপনাকে তেমন মানাচ্ছে না। কিন্তুু ব্যাপার না ভালোবাসাবাসি হয়ে গেলে এসব ম্যাটার করবে না।”

জাহিন কথা বলতে ভুলে গেছে!
নাবিলা আবার হুট করে রেগে গিয়ে বলল,

”আপনার সমস্যাটা কী? দেখছেন না আমি একটা বাবু নিয়ে বসে আছি। জানি এটা পুতুল। আসলে আসল বাচ্চা দিতে কেউ রাজি হলো না। ব্যাপার না। পুতুল দিয়েই চালিয়ে নিব। আপনি এখন আমাকে ইচ্ছে মতো বকুন, মারতেও পারেন তবে আস্তে।”

জাহিন অনেকক্ষণ পর মুখ ফুটে মৃদুস্বরে বলল,
“কেন বকব? কেন মারব?”

নাবিলা কপালে দুটো থাপ্পড় দিয়ে বলল,
“আরে আপনি তো দেখছি কিছুই জানেনা না! গল্পে পড়েননি? বসর ঘরে বউ তার আগের বাচ্চাকে নিয়ে বসে থাকে আর স্বামী এসে বউ এর কোলে বাচ্চা দেখে বলে আমি এ বিয়ে মানিনা।
আপনিও শুরু করুন নিন।”

জাহিন হা করে চেয়ে রইল। মানে তাকে এখন এক্টিং করতে হবে!

নাবিলা বিরক্ত হয়ে বলল,
”আরে নিন শুরু করুন। কত প্ল্যান করলাম সব দেখছি আপনার জন্য ভেস্তে যাবে।”

“কার সাথে প্ল্যান করলে?”

”কেন আপনার সাথে?”

”কখন?”

“কখন মানে? আপনাকে তো আমি সব মেসেজ করে বলে দিয়েছিলাম। আপনি সিনও করেছেন। যদিও কিছু রিপ্লে করেননি। কিন্তুু নিরবতা তো সম্মতির লক্ষ্মণ। নিন এবার শুরু করুন।”

জাহিন ফোন বের করে দেখল আসলেই প্যারাগ্রাফ লিখে পাঠিয়েছিল এই মেয়ে তাকে। ভুল করে সিন হয়ে গেছিল। কিন্তুু সে পড়ে দেখেনি।

নাবিলা অধৈর্য হয়ে বলল,
”কি হলো? আমার হাত থেকে পুতুল টা নিন!”

জাহিন বোকা চোখে তাকালো, অতঃপর নাবিলার থেকে পুতুল নিতে গেলে নাবিলা পুতুলকে শক্ত করে ধরে বলল,

”প্লিজ আমার বাচ্চাটাকে কিছু করবেন না, ওর তো কোনো দোষ নেই বলুন?”

জাহিন হা করে চেয়ে রইল নাবিলার দিকে। অতঃপর বলল,
”আপনিই তো পুতুলকে নিতে বললেন। এখন আবার দিচ্ছেন না কেন?”

নাবিলা রেগে বলল,
”গল্পেও তো দিত না। কেউ কী কারো বাচ্চাকে জম এর হাতে দেয়! মানে নতুন স্বামী যেহেতু বাচ্চাকে দেখতে পারেনা তাই আর কী!
নিন জোর করে আমার থেকে নেওয়ার চেষ্টা করুন।”

জাহিন মাথা নাড়িয়ে একটু শক্তি খাটিয়ে নাবিলার থেকে পুতুলটা নিয়ে নিল। জাহনিের সত্যি সত্যি এই পুতুল এর উপর রাগ লাগছে। যদি মেসেজটা আগে দেখতে পেত, তাহলে এই পুতুলকে জ্বালিয়ে দিত। রেগে পুতুলটাকে ছুঁড়ে ফেলতে গেলে নাবিলা মৃদু চিৎকার করে জাহিনের পায়ের কাছে বসে কান্নার ভান করে বলতে লাগল,

”নাআআআ, এ আপনি কী করছেন? ও তো বাচ্চা। বাচ্চারা নিষ্পাপ হয়। ওকে আমার কাছে দিয়ে দিন প্লিজ। আমি আপনার বাড়ির সবকাজ করে দিব, তবুও ওকে কিছু করবেন না।”

জাহিন অবাক হয়ে একবার নাবিলার দিকে তাকালো আরেকবার পুতুলের দিকে, ভাবল এটা সত্যি পুতুল তো! না-কি আসল বাচ্চা! এই মেয়ে যেভাবে কাঁদছে মনে হচ্ছে সে কোনো বাচ্চাকে হত্যা করতে যাচ্ছে।

নাবিলা জাহিনের কোনো সাড়া না পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
”আপনার সমস্যা কী? আপনি ঠিকভাবে তো কিছুই পারছেন না!”

“কীভাবে করব তাহলে?”

“আমাকে বের করে দিন আপনার ঘর থেকে। আমার সাথে একঘরে কিছুতেই থাকবেন না বলুন।”

জাহিন মন খারাপ করে বলল,
”আমি তো আপনার সাথে থাকব বলেই বিয়ে করলাম।”

“উফ! এটা তো গল্প। নিন নিন আমার হাত ধরে বের করে দিন।”

জাহিন অসহায় ফেস বানিয়ে নাবিলার হাত ধরে দরজার দিকে যেতে নিলে নাবিলা বসে পরল। আর বলতে লাগলো,

”এমন করবেন না প্লিজ। আমি তো বললাম আমি আপনার বাড়ির সবকাজ করে দিব। কাজের লোক হয়ে থাকবো তবুও আমায় একটু ঠাই দিন!”

জাহিন কনফিউজড হয়ে গেল, সে কী এতোই অত্যাচার করছে!
এই মেয়ের নিখুঁত এক্টিং দেখে জাহিন মাঝে মাঝে ভহলে যাচ্ছে এটা তার বউ এর গল্প।

নাবিলা বসা থেকে উঠে বলল,
”নিন এবার টানতে টানতে বের করুন।”

জাহিন নাবিলা কথা মেনে নাবিলার হাত ধরে টানতে লাগলো। নাবিলাও তার শক্তি দিয়ে না যাওয়ার জন্য এগোচ্ছে না।
হঠাৎ করেই নাবিলার শাড়িতে পা বেজে জাহিন পরে গেল, তার উপর নাবিলাও জাহিনের উপর পরল।
জাহিন ভালোই ব্যাথা পেয়েছে, অতঃপর বলল,

”প্লিজ উঠুন। আমার কোমড় ভেঙে গেছে মনে হয়।”

নাবিলা বলল,
“আরে না না। ওঠা যাবে না। আমরা তে পরে গেছি। এখন সবকিছু ভুলে দু’জন দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবো কিছুক্ষণ।”

জাহিন কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
”কতক্ষণ?”

”বেশিক্ষণ না। আপনার চোখের পাতা বারবার পরে যাচ্ছে। হচ্ছে না।”
অতঃপর দুইহাতের দুই আঙুল দিয়ে জাহিনের দু’চোখ টেনে ধরে বলল,
”নিন এবার চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকুন আমার চোখের দিকে।”

জাহিন কথা বলতে ভুলে গেল। এটা তার বউ? হায় আল্লাহ! এমন বউ তার ঘাড়েই জুটতে হলো!
ভাবলো বলবে ঘুম পেয়েছে। তাহলে এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে।
অতঃপর জাহিন বলল,
“বলছিলাম আমার খুব ঘুম পেয়েছে।”

নাবিলা মন খারাপ করে বলল,
”ওহ!”
অতঃপর জাহিনের উপর থেকে উঠে পরল।

জাহিন কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,
”আপনি এক্টিং অনেক ভালো পারেন, এক্টর হলেই তো পারতেন!”

নাবিলা রাগ দেখিয়ে বলল,
”এক্টিং করলে পর্দা কীভাবে করতাম? এটা তো ইসলামে ঠিক না জানেনা না!”

এতোক্ষণ পর নাবিলার মুখে একটা কথা শুনে ভালো লাগলো। যাক তার বউ এর একটা ভালো দিক তো আছে। কিন্তুু গল্প পড়ে যে মাথা গেছে এ মেয়ের!

নাবিলা জাহিনের হাত থেকে পুতুলটা নিয়ে টেবিলে রেখে বলল,
”চলুন, আজ তো আপনার ঘুম পেয়েছে। আবার কালকে আগে আগে স্টার্ট করবনি।”

”কীহ!”

নাবিলা পাত্তা না দিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,
”বাসরঘর টার সাজানো অনেক সুন্দর হয়েছে।”

জাহিন কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
”এটা বাসরঘর নয়, নাটকঘর।”

……. সমাপ্ত……

অনুগল্প:নাটকঘর

writer Drm Shohag

5 1 vote
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x