‘আলহামদুলিল্লাহ কবুল’ বলার মাত্র কয়েক মুহুর্ত পর নিজের সদ্য বিয়ে করা স্বামীকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম আমি। বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকলাম সেই মানুষটির দিকে। কত বছর যেন পেরোলো? দুই নাকি তিন বছর? এতদিনে তার বাচ্চারা হয়তো বেশ বড় হয়ে গিয়েছে তাইনা? আর তার সেই সুন্দরী বউ? সে কোথায়? সুন্দরী বউ ফেলে আমার সঙ্গে বিয়ে বসতে হলো কেন তাকে? আর সদ্য এতিম হওয়া একজন মেয়ের প্রতি এতবড় প্রতরণা করতে বাড়ির গুরুজনদের একবারও বিবেকে বাঁধল না? তবে সবচেয়ে বেশি দুষলাম বোধহয় নিজেকে। পাত্রের ছবি না দেখে বিয়েতে ‘হ্যাঁ’ বলার জন্য নিজেকে দশতালা বিল্ডিং থেকে তুলে ফেলে দিতে মন চায়ল আমার। আমি না-হয় ঘোরে আছন্ন ছিলাম। কিন্তু আমার আপনজনেরা? তারা কিভাবে পারল আমার সঙ্গে এত বড় অন্যায় করতে? একজন বিবাহিত, দুইবাচ্চার বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে দিল? কবুল বলার আগ পর্যন্ত চোখ জোড়া শুকনো খটখটে থাকলেও এবারে ভিজে উঠল আমার। ভিজে চিবুকে গড়িয়ে পড়ল জল। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। শুনলাম ওঘরে আম্মা নাকি জ্ঞান হারিয়েছেন। উঠে দেখারও প্রয়োজন মনে করলাম না। বাবার দোহায় দিয়ে আমাকে বিবাহিত, দুই বাচ্চার বাবার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন ওনি! ছেলের খোঁজ-খবর না নিয়ে বিয়ের আয়োজন করে এখন অজ্ঞান হবার নাটক করে লাভ কি? গাঁট হয়ে মামুর বাড়ির ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে রইলাম। সকলে আম্মাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমার দিকে ফিরেও দেখল না। এমতাবস্থায় নিজের খুব কাছে পেলাম পরিচিত সুঘ্রাণ। আজও সেই সুঘ্রাণে আমার প্রেমে পড়ার অনুভুতি হয়। যেমনটা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। বিয়ে উপলক্ষে এমনিতেও তেমন সাজগোজ করিনি আমি। নেহাৎ মায়ের কান্নাকাটিতে রাজি হয়েছিলাম। বাবার শেষ ইচ্ছে ছিল নাকি এই ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে দেয়া। ছেলেটা নাকি হীরের টুকরো। আমাকে মাথায় তুলে রাখবে। আমার বাবা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা ছিলেন। তিনি নিশ্চয় যাকে-তাকে আমার জন্য পছন্দ করে যাননি ভেবেই বিয়েতে অমত করিনি। সকালে রাজী হয়েছিলাম আর বিকেলেই দেখি বরযাত্রী হাজির! এ আবার কেমন বর? ঘোড়ায় উঠে বসেছিল নাকি? যে পাত্রী রাজী হওয়া মাত্র ঘোড়া ছোটানো শুরু করবে? ওদিকে আম্মা শুরু করলেন ঘ্যানঘ্যান। আজ হলেও বিয়ে.. এক সপ্তাহ পর হলেও বিয়ে। বিয়ে তো বিয়েই। অত আয়োজনের কি আছে? ছেলের ছুটি নেই। আজই কোয়ার্টারে ফিরে যেতে হবে। এমন আরও কত কিছু বলে যে কেঁদে ভাসালেন! শেষমেষ রাজী হয়ে লাল শাড়ি জড়িয়ে বসলাম। তবে তাতে ক্ষান্ত দিল না আমার বোনেরা। ভূতের মত মুখে একগাদা মেকাপ ঘষল। বরবাত্রী এলো আছরের নামাজের পর। ছেলে সহ মোট ছয় জন। আমাকেও নিয়ে আসা হলো তৎক্ষনাৎ। আমি আসা মাত্র কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। শুভ কাজে দেরি করতে নেই। ওই এক কথা জপতে জপতে শুরু হলো এক প্রতারকের সঙ্গে আমার জীবন জড়িয়ে দেয়া! মাথায় ঘোমটা জড়িয়ে বসা লাল বেনারসির আঁচলে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি ফের। ঠিক তখনই শুনলাম সেই ভরাট পুরুষালি কন্ঠস্বর আমায় ডাকছে। ধ্বক করে উঠল বুকের ভেতর। সে কেন এসেছে? আমার সঙ্গে প্রতরণা করে কি লাভ পেল? আঁচল থেকে মুখ উঠিয়ে আড়চোখে দেখলাম কয়েক হাত দুরত্ব রেখে একটা দুই কি তিন বছরের বাচ্চা লাফিয়ে তার গলা ধরে ঝুলে বসে পড়ল! ব্যস এতেই যেন কান্নারা বাঁধ ভাঙল আমার। বাচ্চাটা মানুষটার গলা ধরে ঝুলতে ঝুলতে বলল,
— ‘ আমরা বাসায় কখন যাব পাপা?’
এইতো সেই আগের ঘরের বাচ্চা ওনার। বাচ্চা ছেলেটাকে আদর করে দিয়ে সেই মানুষটা প্রত্যুত্তরে বলল,— ‘ তোমার নতুন মাম্মার কান্নাকাটি শেষ হলেই যাব। ‘
বলেই সেই মানুষটা বাচ্চাটার হাতে একটা টিস্যু ধরিয়ে দিয়ে বলল, — ‘ মাম্মাকে টিস্যুটা দাও। কাজল ল্যাপ্টে তাকে মঞ্জুলিকার ছোটবোন লাগছে। বাচ্চারা আছে আশেপাশে। ভয় পাবে।’
আমি ঠিক শুনলাম। কতটা নির্লজ্জ হলে বাচ্চা নিয়ে বিয়েতে আসতে পারে? শয়তান! আস্ত শয়তান। এই শয়তানটার প্রেমে পড়েছিলাম আমি? তাকে নিয়ে ঘর সাজিয়েছিলাম ভাবতেই ঘৃণার উদ্রেক হলো। অথচ আজও তার কন্ঠস্বর আমার মনে অনুভূতির জন্ম দেয়। পেটের মধ্যে প্রজাপতিরা ডানা মেলে। মুক্ত হাওয়ায় ভাসতে ইচ্ছে হয়। তার প্রশস্ত বক্ষপটে মাথা রেখে ঘুমুতে ইচ্ছে হয়। তাকে নিয়ে স্বপ্নের দুনিয়ায় ভাসতে ইচ্ছে হয়! কেন ফিঁকে হয়না একজন প্রতারকের জন্য আমার অনুভুতিরা? অন্তরালের অনুভুতির দামামা অগ্রাহ্য করে হঠাৎই খেয়াল হলো আমার, এই লোকটা আমায় মঞ্জুলিকা বলল কেন? তখনই মনে পড়ল কাজল, আইলাইনার আমি ইচ্ছে করে দিইনি। ওইতো ছোটবোনের জোরাজুরিতে দিয়েছিলাম। ওগুলো বোধহয় ওয়াটারপ্রুফ ছিল না। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছতেই দেখলাম পুরো কব্জিতে কালি লেগে গেল! বাচ্চাটার হাত থেকে বাড়িয়ে রাখা টিস্যুটা না নিয়ে আঁচলে চোখ মুছলাম। সেই দেখে শয়তানটা বাচ্চাটাকে বলল,
— ‘ ভেতরের ঘরে যাও চ্যাম্প। ‘
চ্যাম্প! ছেলেকে আবার ঢং করে চ্যাম্প বলা হচ্ছে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে? এর মধ্যে বড়মামী এসে একটা মিষ্টি ধরলেন ওই প্রতারকটার সামনে। আর শয়তানটা হেসে তিমি মাছের মত বিশাল হা করে গোটা মিষ্টি মুখে পুরে নিলেন। ওনার কান্ড দেখে বড় মামী হেসে ফেললেন। বললেন, — ‘ অর্ধেকটা পিহুর জন্য রাখতে জামাই বাবা।’
— ‘ অবশ্যই মামানি। ‘ বলেই সেই লোক বড়মামীর হাতে ধরা পিরিচ থেকে কাঁটাচামচে গেঁথে আরেকটা মিষ্টির অর্ধেক খেয়ে রেখে দিলেন। যার অর্থ এইযে বাকি অর্ধেক দিলাম। বড়মামী হাসলেন। আমি তখনও মাথা নিচু করে বসে আছি। আমি জানি মামী এখন ওই শয়তানটার এঁটো মিষ্টি আমায় গেলাবেন৷ তবে এত সহজ না। ওর মত প্রতারক, শয়তানের এঁটো খাবার আমি জীবনেও খাব না। খাব না মানে খাবনা। যার যা ইচ্ছে ভেবে নিক। হু কেয়ারস? ঠিক পরের মুহুর্তে সেই আঁধা খাওয়া মিষ্টিটা বড়মামী আমার সামনে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, — ‘ নে পিহু। তোর বিয়ের মিষ্টি। ‘
তীব্র বিতৃষ্ণায় ঝট করে মুখ সরিয়ে নিলাম আমি। নিয়ে বললাম, — ‘ আমি মিষ্টি খাইনা মামি। ‘ বড়মামী সহজ-সরল নারী। বরাবরই তিনি অত প্যাচগোচ বোঝেননা। এখনও বুঝলেন না। ভাবলেন আমার হয়তো মন ভালো নেই। বাবাকে হারিয়েছি কয়েক মাস পেরিয়েছে মাত্র! তার উপর হুট করে বিয়েটা হয়ে গেল সেজন্য আমার মন খারাপ। তবে ওই কাঁটাচামচ দিয়ে মিষ্টির একটুকরো ভেঙে আমার মুখে পুরে দিয়ে বললেন, — ‘ সুখী হ পিহু। ‘ বলেই যেভাবে এসেছিলেন ওইভাবেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। কাজী সাহেব সহ আরও কয়েকজন মুরুব্বি অবশ্য সে ঘরেই আছেন। আমাদের দিকে তাদের খেয়াল নেই। কাগজপত্র ঠিকঠাক করছেন সম্ভবত।
মাথাটা নিচু করে রাখলেও চোখের পানিতে চিবুক, থুতনি ভিজে টইটম্বুর আমার। চারিদিকে বিয়ের বাড়ির আমোদ-প্রমোদ ছড়িয়ে আছে। এ-ও আসছে-যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে সেই বাচ্চা ছেলেটার বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ে এসেও আমার পাশে বসা সদ্য বিবাহিত স্বামীকে ‘পাপা’ সম্বোধন করে গলা ধরে ঝুলে গিয়েছে। আর আমি নির্বাক, নিশ্চল বসা তখনও। এই মানুষটার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এমনই এক বিয়ে বাড়িতে। বছর তিনেক আগে রুনু আপার বিয়েতে আমরা সবাই গ্রামে গেলাম। রুনু আপারা গ্রামের বাসিন্দা নন।স্থানীয় জেলাশহরে থাকেন বাবা-মা সমেত। তবে গ্রামে আসা-যাওয়া করেন নিয়মিত। রুনু আপা ছিলেন ভীষণ সুন্দরী। কলেজ শেষ হতেই রুনু আপার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। ব্যাটে-বলে মিলে পাত্রও মিলে গেল। পাত্র ঢাকায় চাকরি করে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের কেনাকাটাও শুরু হলো। হঠাৎই বেঁকে বসলেন রুনু আপা। একরাতে ঘুম ভেঙে চাচী রুনু আপাকে পেলেন গ্রামের কলপাড়ে। খোলা চুলে, হাঁটুমুড়ে বসে আছেন রুনু আপা। লাগাতার শব্দ বলে চলেছেন তিনি নাকি ইহজীবনে বিয়ে করবেন না। তারপরের গল্পটা জটিল। ঝাড়-ফুঁক, মানত করা, ডাক্তার দেখানো, কেঁদেকেটে বোঝানো, কিরা-কসম, মারধোর কিছুতেই তাকে টলানো গেল না। সেই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পাত্রপক্ষ অবশ্য মাথা নাড়লেন অন্যকিছু ইঙ্গিতে।উঠতি বয়সের মেয়েরা এধরণের পণ এমনি-এমনি করেননা। নিশ্চিত কোনো ঘাপলা আছে। ফলাফল সেই ইঞ্জিনিয়ার সটকে পড়লেন মান-ইজ্জত নিয়ে।রুনু আপার মাথায় সমস্যা আছে, জ্বীনের আছর আছে এমন কিছু রটে গেল গোটা গ্রামে। বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসা হলো। এরমধ্যে জহির ভাইয়ের বাবা এসে নাকি রুনু আপার দাদার হাত চেপে ধরলেন। উনার ছেলেও নাকি ইহজীবনে বিয়ে না করার পণ করেছেন। এখন এই পণ ভাঙার জন্য রুনু আপার সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিতে চান। পণে-পণে কাটাকাটি ছাড়া নাকি কোনো উপায় নেই। গ্রামের ধারে যেই একশ বছরের পুরনো বটগাছ আছে সেখানে একজন নতুন কবিরাজ এসেছেন। তিনি বলেছেন রুনু আর তার ছেলের উপর আছর করা জ্বীনেরা নাকি দুইজন প্রেমিক-প্রেমিকা। নিজেদের মধ্যে রাগারাগি করে দুজন মানুষের উপর ভর করে রাগ মিটাচ্ছে। গ্রামে জ্বীনের আছর খুব খারাপ জিনিস! এখন এর থেকে পরিত্রানের একটামাত্র পথ রুনু আর জহিরের বিবাহ! আর সেই কবিরাজ মাত্র পাঁচ টাকার বিনিময়ে ছেলেকে বদজ্বীনের আছর থেকে বাঁচানোর উপায় বাতলে দিয়েছেন। তবে বিয়ে হলে আস্ত খাসির রোস্ট নাকি বট তলায় রেখে যেতে বলেছেন।
জহির ভাইয়ের বাবা গ্রামের সরল মানুষ হলেও রুনু আপার দাদাভাই ছিলেন ভীষণ বিচক্ষণ। তিনি ঠিকই বুঝলেন আর বুঝলেন বলেই জ্বীন তাড়ানোর বন্দোবস্ত করলেন। ধুমধাম করে রুনু আপা আর জহির ভাইয়ের বিয়ের সানাই বাজিয়ে দিলেন। দাদার জন্য তার বিয়ের আয়োজন গ্রামে করা হল। অবশ্য পাত্রও দূরের কেউ নন। পাশাপাশি বাড়ি। তাছাড়া সেদিন বিয়ে শুধু রুনু আপা আর জহির ভাইয়ের হবেনা। উনাদের উপর আছর করে থাকা জ্বীনদের বিয়ে হবে সেই আসরে। পরে অবশ্য কবিরাজের কেচ্ছা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। ছোট থেকেই নাকি জহির ভাইয়ের রুনু আপাকে পছন্দ ছিল। এগুলো অবশ্য পরে রুনু আপাই বলেছিলেন। জহির ভাইয়ের এক বন্ধুকে কবিরাজ সাজিয়ে গাছতালায় বসিয়ে দিয়েছিলেন। বাকিটা তো ইতিহাস হয়ে গেল। বিয়েতে আমরা ঢাকা থেকে গেলাম। গিয়ে রঙখেলা শেষে সবাই ধান ক্ষেতে গেলাম। সবাই আল ধরে হেঁটে ভূতের মত বাড়ি ফিরছিলাম। বাকি ভাই-বোনেরা কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। আর আমি হিল জুতো পরার কারণে কাঁদায় হাঁটতে পারছিলাম না। একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলাম। ফলাফল যা হবার তাই-ই হলো। লেটকে পড়লাম কাঁদায়। ঠিক তখনই কোথা থেকে উড়ে এলো একজন লম্বাচওড়া পুরুষ। বুদ্ধিদীপ্ত একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ, চওড়া কপাল, পুরু ঠোঁট আর খাঁড়া নাকের অন্যন্ত সুপুরুষ একজন মানুষ। তিনি এসেই আমাকে কাঁদা থেকে তুললেন। মুখ থুবড়ে পড়ার কারণে আমার মুখ কাঁদায় মাখামাখি। তিনি এসেই আমাকে ধমকালেন,
— ‘ সব ননীর পুতুলরা আসে গ্রামে! ডিসগাস্টিং!’
ছোটবেলা থেকে বড়ই আদরে বড় হওয়া আমি আচমকা বাইরের কোনো পুরুষের ধমক মেনে নিতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম। আমার কান্নাকাটি দেখে চমকে উঠলেন। বললেন,
— ‘ কাঁদছো কেন? বাড়ি চেনো না? ‘
আমি মাথা নাড়ালাম। বাড়ির রাস্তা আমার মনে নেই। আর আশেপাশে আমার ভাইবোনেরা কেউ নেই! তিনি চ-সূচক একটা শব্দ করে বললেন,
— ‘ ডিসগাস্টিং। ‘
সেই মুহুর্তে আমার মনে হলো ধাক্কা নিয়ে এঁকেও ধান ক্ষেতের কাঁদায় ফেলে দিয়ে ডিসগাস্টিং বানিয়ে ফেলি। কাঁদায় মাখামাখি হয়ে ওনি আমাকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে গেলেন। আমি তখন এতটাই কষ্টে ছিলাম জানার আগ্রহ পর্যন্ত পেলাম না তিনি জানলেন কিভাবে আমি কোন বাড়ির অতিথি?
বাড়ি ফিরে ঘষে মেজে গোসল শেষ করে কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। সন্ধ্যায় হলুদ হবে রুনু আপার।সেই জন্য ওবাড়ি থেকে কিছু মুরুব্বিরা এসেছেন শাড়ি-গহনা দেয়ার জন্য। তখন পরিচয় হলো শায়লা আন্টির সঙ্গে। ওনার কোলে ফুটফুটে ছেলে বাবু আর তার পাশে বসা একজন সুন্দরী রমনীর কোলে ঠিক একই বয়সী মেয়ে বাবু। আমি সকালে ধান ক্ষেতের কষ্ট ভুলে সেই বাবুদের নিয়ে ব্যস্ত হলাম। কথায়-কথায় জানলাম সেই বাবুরা আন্টির নাতি-নাতনি। আর সেই সুন্দরী রমনী আন্টির ছেলে বউ৷ ওনারা ঢাকা থাকেন। আন্টির ছেলে বউ খুব মিশুক। ছিমছাম গড়নের মেয়েটির সমগ্র আনন জুড়ে ভীষণ মায়া। এমনকি ওনার নামও মায়া! মাতৃত্বের জন্য বোধহয় একটু মুটিয়ে গিয়েছেন। তবে ওনার রুপে কোনো কমতি নেই। আমি তাকে মায়া আপু ডেকে বাচ্চাদের আদর করলাম, চা-নাস্তা এনে দিলাম। মায়া আপুর কাছে যতক্ষণ বসে ছিলাম তিনি নিজের স্বামীর গুনগান গেয়ে গেলেন। যাবার আগে বললেন বাবুর বাবা আজ সন্ধ্যায় আসবে। ছুটি পায়নি। আমি যেন হলুদে যাই তাহলে দেখা করিয়ে দেবেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামীর সঙ্গে। স্বামীর কথা বলার সময় মায়া আপুর চোখের উজ্জ্বলতা, ফুটে থাকা কোমলতা ব্যক্ত করল স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসার টান।
মায়া আপুর স্বামী বিষয়ক কথাবার্তা শুনতে শুনতে আমার কেন জানি সকালে ধানক্ষেতের ছেলেটার কথা বারবার মনে পড়তে লাগল! আমি বুঝে পেলাম না আমার মনের কি হয়ে গেছে? আমাকে অপমান করা লোকের কথা কেন মনে করিয়ে দেবে?
সন্ধ্যায় আমরা পৌছালাম হলুদের প্রোগ্রামে। বের হবার আগে আমার চাচী আমার হাতে ফুলের ডালা ধরিয়ে দিলেন। হলুদ শাড়ি সামলে, ফুলের ডালা নিয়ে আমি যখন ওবাড়ি পৌছালাম তখনই আমার উপর কেউ বোধহয় একগাদা পার্টিস্প্রে করল! হায় আমার সাজগোজ! সব শেষ! আমার কি হবে? বলেই হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসলাম। তখন বয়স আর কত হবে আমার? সদ্য ইন্টারমিডিয়েটে ভরতি হয়েছি কলেজে। কান্নার মাঝে দেখলাম জহির ভাইয়ের পাশে সকালের ধান ক্ষেতে আমাকে অপমান করা ছেলেটা! ব্যস এতেই আমার কান্নার তোড় বাড়ল। ফুলের ডালা ছুঁড়ে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। কতক্ষন কেঁদে কেটে, সবার কাছে আহ্লাদ নিয়েও যখন আমার রাগ ভাঙল না তখন শুনি জহির ভাইয়ের কন্ঠস্বর। তিনি নিজের হলুদ ফেলে চলে এসেছেন। আমি ঝট করে উঠে বসলাম। নিজের কাজে অনুতপ্ত হয়ে হাত-মুখ ভালোমত ধুঁয়ে সমস্ত মেকাপ উঠিয়ে ওবাড়ি গেলাম। জহির ভাই বেশ খুশি হলেন। তিনি আমাকে নিজের পাশে বসার জায়গাও দিলেন। ঠিক তখনই শুনলাম ওই লোকটা জহির ভাইকে উদেশ্য করে বলল,
— ‘ ননীর পুতুল নিয়ে বসে আসিস কেন? ফুলের টোকা লাগলেও তো গঙ্গা-যমুনা ঢালা শুরু করবে। উফফ ডিসগাস্টিং। ‘
মুহুতে তেঁতে উঠলাম আমি। বললাম,
— ‘ আর একবার আমাকে ডিসগাস্টিং বললে এখানে মে রে শুইয়ে রেখে যাব।’
— ‘ বাবা! প্যানপ্যানানি মহারানী আবার মারপিট করতেও পারে নাকি? কই দেখি শুইয়ে দাও দেখি ননীর পুতুল। ‘
ব্যস এতেই লেগে গেল তুমুল ঝগড়া। বরপক্ষ-কনেপক্ষর তরুণ তরুণীরা মিলে শুরু হলো ঝগড়াঝাটি। যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
ছেলেমেয়েদের ঝগড়াঝাটি থামল গুরুজনদের মধ্যস্ততায়। খাওয়া-দাওয়ার পর আমি গেলাম ভেতরের দিকে। মায়া আপুর খোঁজে। তিনি বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে নিয়ে গিয়েছেন। জহির ভাইদের বাড়িটা উঠোনকে কেন্দ্র করে চারদিকে তিনটা করে ছাদের ঘর। বড় উঠোন পেরিয়ে আমি পশ্চিমের ঘরে যাবার সময় কেউ একজন টেনে ধরল আমার কনুই। এদিকটা অন্ধকার। বাইরে ধুমধাড়াক্কা বিট দিয়ে গান বাজাচ্ছে। আমার চেঁচানো কেউ শুনতে পাবেনা ভেবেই অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হবার যোগাড় হলো আমার। তোতলানো কন্ঠে বললাম, — ‘ কে? দেখুন আমায় ছাড়ুন। ‘
ঠিক তখনই আলো জ্বলে উঠল। আলোর উৎস একটা লাইটার। আর যেই মানুষটা আমাকে ধরে রেখেছে তার গা থেকে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যাওয়া পারফিউমের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। সেই মানুষটা আর কেউ নয়। সকালে ধানক্ষেতে কাঁদা থেকে উদ্ধার করা ছেলেটা। আমি চমকে তাকালাম। হাত ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করলাম। তিনি ছেড়েও দিলেন তৎক্ষনাৎ। দিয়ে বললেন,
— ‘ গবেট মেয়ে কোথাকার। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে ছাড়ত? ননীর পুতুলের বুদ্ধিসুদ্ধি বলতে কিছু নেই? ‘ ধীরে ধীরে ভয়ের ছাপ পড়ল আমার চেহারায়। আর ওনি বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলেন। তড়িঘড়ি করে পালিয়ে এলাম ওখান থেকে। বাড়িতেও ফিরে এলাম। মায়া আপু কিংবা তার স্বামীর সঙ্গে সেদিন আর দেখা হলোনা আমার।
রাতে বিছানায় শুয়ে ঠান্ডা মাথায় গোটা ঘটনাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভাবতেই শিউরে উঠলাম। আসলেই আমি গবেট। সেই ছেলেটা ঠিকই বলেছে। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভুতি হলো তার জন্য। মনে মনে ঠিক করলাম একটা ধন্যবাদ আগামীকাল তার প্রাপ্য। পরদিন বিয়ে বাড়িতে তাকে দেখলাম। অফহোয়াইট রঙা ব্লেজার, ট্রিম করা হেয়ারস্টাইলে তাকে ভীষণ সুপুরুষ লাগছে৷ কিশোরী মন কুপোকাত হলো। গেট ধরার সময় তার দিকে ইচ্ছে করে বেশি ফুল ছিটিয়ে দিলাম। তিনি বোধহয় বুঝতে পারলেন। বুঝে মুচকি হাসলেন।আর এতেই একটা হার্টবিট মিস করলাম আমি। কারো হাসি এত সুন্দর হতে পারে? মায়া আপুও এসেছেন বরযাত্রী হিসেবে। আজ এসেই বললেন উনার স্বামী গতরাতে এসেছেন। বলার সময় সেই একই উজ্জ্বলতা, একই দ্যুতি খেলে গেল ওনার দুচোখে। মায়া আপু আজ শাড়ি পরেছেন। কালারটা ঠিক অফহোয়াইট নয়।এটাকে বেইজ কালার বলে। মায়াকে মানিয়েছে শাড়িটাই অনেক। আপুর সঙ্গে কথা বলার মাঝে একটা বাচ্চা ছেলে এসে চিরকুট দিয়ে গেল আমার হাতে। মায়া আপু হেসে ফেললেন। আর আমি লজ্জায় লাল হলাম। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন বিয়ে বাড়িতে এসব হয়ই। আমি বাবুর বাবাকে দেখে আসি। কোথায় যে গেল!
মায়া আপু চলে গেলেন স্ত্রস্ত পায়ে। তিনি যেতেই আমি চিরকুট খুললাম। গোটা গোটা বাংলা অক্ষরে লেখা,
‘দহনের দিনে কিছু মেঘ কিনে
যদি ভাসে মধ্য দুপুর
তবু মেয়ে জানে তার চোখ মানে
কারো বুক পদ্মপুকুর।’
কবিতাটা কয়েকবার পড়লাম। ঠিক তখনই অনুভব করলাম সেই মানুষটা এসে বসল আমার পাশের চেয়ারে। ছোট একটা চিরকুট নিজ হাতে এগিয়ে দিয়ে স্ত্রস্তপায়ে বেরিয়ে গেল ওখান থেকে আর আমি ভ্যাবলার মত চিরকুট হাতে নিয়ে বসে রইলাম। বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে সেদিন রাতে চিরকুটে দেয়া নাম্বার কল দিলাম। তিনি কল কেটে ব্যাক করলেন সঙ্গে সঙ্গে। বোধহয় অপেক্ষায় ছিলেন। রিসিভ করেই বললেন, — ‘ কেমন আছো পিহু?’ আমি খিলখিল করে হেসে ফেললাম সারাদিনই চোখাচোখি হল। দেখা হল। একটু আগে রুনু আপার বিদায় হলো। তখনও দেখা হল আর এখন কি না বলে কেমন আছো পিহু? বললাম, — ‘ ভালো আছি….’ বলতে গিয়ে থমকালাম। কারণ আমি এখনো মানুষটার নাম জানিনা! তবে মুখে স্বীকার করলাম না সে কথা! নাম না জেনে প্রেমের শুরু! এতো দারুন এডভেঞ্চার। সেদিন রাতে বেশি কথা হলোনা। ওনি বললেন ঢাকায় ফিরে দেখা করবেন। উড়ুউড়ু মন নিয়ে গোটা রাত কাটল আমার। পরদিন বউভাত। আবারও সুন্দর করে সেজেগুজে জহির ভাইয়ের বাড়ি যাবার পালা। আমরা যেতেই জহির ভাই সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন। হাসি যেন সরছেই না ওনার ঠোঁট হতে। রুনু আপার অবস্তাও একই। খুশিতে বাক-বাকুম হয়ে বলেই ফেললেন সব ছেলেরাই বোধহয় জহিরের মত শেয়ানা হয়। এখন রুনু আপা কোন অর্থে শেয়ানা বললেন আমি বুঝিনি তখনও। জহির ভাই একটু পর পর ফিসফিস করে কি যেন বলছেন রুনু আপার কানে-কানে আর রুনু আপা লজ্জায় লাল-নীল হয়ে যাচ্ছেন। তবে আমার নজর শুধু একজনকেই খুঁজছে। সেই মানুষটা? কোথায় সে? সে কি জানে না আমি এসেছি? আজ আবার উঠোন পেরিয়ে বাড়ির অন্যদিকের ঘরে যেতেই থমকালাম। মায়া আপুকে ঘরের ভেতরে দেখে সেদিকেই এগোলাম। তবে কয়েক কদম এগোতেই কদম হড়কাল আমার। মায়া আপুকে পেছন থেকে জড়িয়ে আছে সেই মানুষটা! আমার ভালোবাসার মানুষটা। সেই একই চোখ, উচ্চতা, ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল! সে ব্যস্ত অধরে। কিছু সময় পর ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছে মায়া আপুর গ্রীবার ভাঁজ। বেহায়া হাতের স্পর্শ মায়া আপুর শরীরের আনাচে-কানাচে হাতড়াচ্ছে। সেই মানুষটা মায়া আপুকে জড়িয়ে কেমন আচ্ছন্নতা নিয়ে বলল,
— ‘ ইউ আর আ ড্রাগ মায়া।’ মায়া আপু তার প্রশস্ত বক্ষপটে মুখ লুকালেন। লুকিয়ে বললেন,
— ‘ ছাড়ো! বিয়ে বাড়ি! কেউ এসে পড়েবে?’
— ‘ আসুক। হু কেয়ারস? আমি তোমাকে চাই। এক্ষুনি। ‘
— ‘ তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
— ‘ হ্যাঁ। আমার শরীরে আগুন ধরিয়েছ তুমি। একদম বাঁধা দেবে না আমাকে। শাড়িটা খোলো। ওহ না! বরং আমাকেই খুলতে দাও। ‘ বাকিটা শোনার মত ধৈর্য্য আমার আর রইলো না। আমি বাড়ি ফিরে এলাম তৎক্ষনাত শরীর খারাপের অজুহাতে। আমার সারা শরীর কাঁপছে। সেদিন রাতে সেই নাম্বার থেকে আবার ফোন এলো! ঘৃণায় আমি ফোন বন্ধ করে রাখলাম। এমন লম্পটের সঙ্গে আমি জীবনেও কোনো সম্পর্ক রাখব না। সেই রাতে একবার, দুবার করে প্রায় পঞ্চাশবার ম্যাসেজ এসেছিল। সবটাই সেই লোকের উদ্বিগ্নতা। আমি কোনো ম্যাসেজ দেখেনি। কল রিসিভ করিনি। নিজের উপর ঘৃণা জন্মাল। অমন সুন্দরী বউ আর টুইন বাচ্চা ফেলে লম্পটতা করে বেড়ায় তার সঙ্গে কথা বলতেও আমার রুচিতে বাঁধে।
পরদিনই আমরা বিয়ে বাড়ি থেকে চলে এলাম ঢাকা। নিজেকে পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখলাম। তবে সেই মানুষটার স্মৃতি মনে পড়লেই আমার নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা আসে। একদিন রুনু আপা ফোন করলেন আমাকে। বললেন, — ‘ হ্যাঁ রে পিহু? তুই নাকি বিয়েতে এসে সোহরাবের জিনিস চুরি করে নিয়ে গিয়েছিস? এখন আর ফেরত দিচ্ছিস না। তুই কবে মানুষের জিনিস নেয়া শুরু করলি? ‘
আমি বিস্ময়ের চুড়ান্তে পৌছে বললাম,
— ‘ সোহরাব কে? ‘
আমার চেয়েও দুই তিন গুণ বেশি অবাক হলেন রুনু আপা। বললেন, — ‘ যার সঙ্গে সারা বিয়ে ঝগড়া করলি, মেরে শুইয়ে দিতে চায়ছিলি এখন তাকেই চিনছিস না? তোর এত অধঃপতন হলো কেন রে পিহু?’
আমি মাথা নাড়ালাম৷ আচ্ছা এতদিন জানলাম। সেই মানুষটার নাম সোহরাব! তার নামটাই জানার আগ্রহ নেই আমার। আর না তার সম্পর্কে কিছু জানার আছে। চিবিয়ে চিবিয়ে রুনু আপাকে বললাম, — ‘ ওসব শয়তানদের সঙ্গে আমার কোনো লেনাদেনা নেই রুনু আপা। আমি কিছু চুরি করিনি। ওনি মিথ্যা বলছেন। ‘ বলেই কল কাটলাম। রুনু আপার নাম্বার ব্লকলিস্টে ফেললাম।
এরপর একদিন কলেজ থেকে বেরোতেই দেখলাম সোহরাব দাঁড়িয়ে আছেন। এখন আমি তার নাম জানি। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন। ওনাকে ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। বললেন,
— ‘ কেমন আছো পিহু?’
আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে রিক্সায় উঠে চলে এলাম। দু-চোখ ভিজে গেল ফের আমার। একটা মানুষ কতটা শয়তান, লম্পট হতে পারে এই মানুষটাকে না দেখলে আমি জানতেই পারতাম না।
পরীক্ষার কিছুদিন আগে বান্ধবীদের নিয়ে ধানমন্ডি গেলাম। আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। মায়া আপুকে অনেক বার জানাতে চেয়েছি তার স্বামীর সত্যটা। কিন্তু প্রতিবারই ওনার হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা সামনে চলে আসে বিধায় থেমে যাই। সোহরাব আমাকে নিয়মিত টেক্সট করেন। আমি উত্তর দিইনা। ধীরে ধীরে উনার টেক্সটের পরিমানও কমে গেল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।যাক! একজন লম্পটের পিছু ছাড়াতে পেরে আমি আনন্দিত।
ধানমন্ডির লেকে গিয়ে সেদিন ফের থমকালাম। সোহরাব আর মায়া আপু হাতে-হাত রেখে লেকের পাড়ে হাঁটছে। বাচ্চাদের বোধহয় আন্টির কাছে রেখে এসেছেন। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে মায়া আপুর হাত উঠিয়ে চুমু খাচ্ছেন। কপালের চুল সরিয়ে দিচ্ছেন। ফুসকা খাবার সময় নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন। আর আমি বুকে পাথর চেপে সবটা দেখলাম। ক্রমাগত ঢোক গিলে নিজেকে সংযত করে লেক থেকে ফিরে এলাম। নিজেকে পড়াশোনায় ডুবিয়ে রাখলাম। তছাড়া যে সেই মানুষটাকে আমার ভীষণ মনে পড়ে। বাসায় ফিরে সেদিন বাথরুমের কল ছেড়ে অনেক কাঁদলাম। আমি বরাবরই চুপচাপ স্বভাবের বিধায় কেউ জানতেও পারল না। একদিন আমার পৃথিবী এলোমেলো হলো। বাবা নামক মানুষটা আমাদের একা ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমালেন৷ আর এইতো আমি আজ এখানে। সেই প্রতারক, মিথ্যাচারকারী মানুষটা বাবার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমার ললাটে কালি লেপে দেয়ার সুযোগ পেল! কান্নাকাটিতে ব্যস্ত আমি খেয়াল করলাম সেই পরিচিত কন্ঠস্বর। ঝট করে মাথা তুলে তাকালাম। মায়া আপু! তিনি আজও আগের মত সুন্দরী। পরিপাটি শাড়িতে ওনাকে ভীষণ মিষ্টি লাগছে। আমাকে এসে দু’হাতে জড়িয়ে নিলেন। উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, — ‘পিহু? অবশেষে তুমি এলে আমাদের বাড়িতে। জানো আমরা তোমাকে অনেক মিস করি। ‘
বিস্ফোরিত নেত্রে আমি মায়া আপুর দিকে চেয়ে রইলাম। ওনার স্বামী আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছেন আর ওনি আমাকে জড়িয়ে ধরছেন, মিস করেছেন এসব বলছেন কেন? ঠিক তখনই চোখ পড়ল পুলিশের পোশাকে লম্বাচওড়া একজন পুরুষ মামার বাসার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি চমকে গেলাম। সোহরাব! সোহরাবের পরণে পুলিশের পোশাক কেন? সে কি পুলিশ? কই কখনো শুনিনি তো? না! আম্মা বলেছিলেন ছেলে সরকারী চাকরিজীবী। তবে সোহরাব তো আমার পাশে বসা। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। সে বাঁকা হেসে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন।
মায়া আপু আমাকে ছেড়ে গিয়ে ওই পুলিশের বাহু জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, — ‘ পিহু এই যে আমার স্বামী। ওয়ার্ল্ডের বেস্ট স্বামী, মেহরাব হাসান। ‘ মেহরাব ভাইয়া হেসে বললেন, — ‘ হ্যালো পিহু? কি চমকে গেলে তো? ‘
আমার পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে থাকল। সোহরাব হোসেন, মেহরাব হাসান! তাহলে কি ওনারা টুইন ব্রাদার। আইডেন্টিক্যাল টুইনস। যাদের চেহারা হুবহু একই রকম। তবে সেদিন আমি যাকে মায়া আপুর সঙ্গে দেখেছিলাম সে আসলে মেহরাব ভাইয়া ছিল! আর আমি তাকে সোহরাব ভেবে তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। ঠিক তখনই শুনলাম কানের কাছে হাড় হিম করা কন্ঠস্বর,
— ‘ আজ রাতে তোমার খবর আছে ননীর পুতুল। তিন বছর ধরে ভুগিয়েছো আমাকে। গবেট মেয়ে কোথাকার।’ আর আমি? আমি একটা শুকনো ঢোক গিললাম। কারণ রুনু আপার বলা ‘শেয়ানা’ কথাটার মানে আমি বুঝি।
গল্প:ননীর পুতুল
লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
অনুগল্প
(সমাপ্ত)