গল্প: অমৃত তোকে চাই (১৭)

লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা

পর্ব:১৭

আহামেদ বাড়িতে প্রবেশ করেই সবাই সোফায় ধপাস করে বসে পড়ে। বাড়িতে দুই ঝা আর এক কাজের মহিলা ছাড়া তখন কেউ উপস্থিত ছিল না। কাজের মেয়েটার বয়স ২২ বছরের মতো। ছোট থেকে এখানেই কাজ করছে। সাথি তার নাম।
সাথি হলরুম গুছাচ্ছিল। রিক্তাদের দেখে হাতের কাজ ফেলে রান্নাঘরে ছুটে যায়। রান্নাঘরে গিয়ে দুই ঝা কে বলে„“খালাআম্মা, আফামুনিরা আসছে।”
মনিরা আহামেদ হাতের কাজ থামিয়ে সাথির দিকে পিছন ঘুরে বলে„“আফামুনিরা মানে?”
„“আরে, রিক্তা আফামুনি আর ওনার বান্ধবীরা।”
„“কখন আসলো?”
„“এই মাত্র।”

সানজিদা আহামেদ তরকারি নাড়তে নাড়তে বলে„“মনিরা, তুমি গিয়ে ওদের ঠান্ডা সরবত বানিয়ে দাও। আর সাথি, তুমি হালকা কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়ে এসো।”

মনিরা আহামেদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। পাশ থেকে জগ আর ট্রেং নিয়ে ওদের জন্য ঠান্ডা ঠান্ডা সরবত বানাতে শুরু করে। আর সাথি ফল, বিস্কুট, বেকারি কেক ইত্যাদি ট্রেতে সাজাতে থাকে।
সবকিছু গুছানো শেষ হলে মনিরা আহামেদ সরবতের ট্রে নিয়ে রিক্তাদের কাছে যায়, আর পিছনে সাথি খাবার নিয়ে আসে।
রিক্তার মাকে দেখে নাহিদা, শিখা আর আরশি দাঁড়িয়ে সালাম দেয়।
মনিরা আহামেদ সালামের জবাব দিয়ে বলে„“আরে বসো তোমরা। দাঁড়াতে হবে না। বসে সরবতটা খাও।”

এই বলে টেবিলের সরবত সবাইকে দিতে থাকে।

আরশি সরবতের গ্লাস নিতে নিতে বলে„“এসবের কি দরকার ছিল আন্টি?”

নাহিদা আরশির আগেই সরবতের গ্লাস নিয়ে বলে„“আন্টি, ওর দরকার নেই, বাট আমার খুব দরকার।”

আরশি নাহিদাকে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বলে„“এটা কেমন অসভ্যতা নাহু?”

নাহিদা সরবতে চুমুক দিয়ে বলে„“আহ… দোস্ত, বিশ্বাস কর, খুব শান্তি লাগছে এটা খেয়ে।”

আরশি নাহিদার দিকে রাগী চোখে তাকায়।

তাদের খুনসুটি দেখে উপস্থিত সবাই হাসতে থাকে। মনিরা আহামেদ জানে, তার মেয়ের মতো এগুলোও এক নদীর মাছ।
মনিরা আহামেদ হেসে আরশিকে একটা গ্লাস দিতে দিতে বলে„“হয়েছে, আর ঝগড়া করতে হবে না। এটা নাও।”
আরশি হেসে গ্লাসটা নেয়।
মনিরা আহামেদ সবাইকে সরবত দিয়ে দেয়।
সানজিদা আহামেদ রান্নাঘর থেকে বের হয়ে হাত শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলে„“কেমন আছো সবাই?”

নাহিদা, আরশি, শিখা উঠে সালাম দেয়।

সানজিদা আহামেদ সালামের উত্তর দিয়ে তাদের বসতে বলে। বাকিরা বসে পড়ে আর সানজিদা আহামেদ তাদের মুখোমুখি সোফায় বসে জিজ্ঞেস করে„“কেমন আছো তোমরা?”

শিখা অত্যন্ত নমনীয় কণ্ঠে বলে„“জি, আলহামদুলিল্লাহ আমরা সবাই ভালো।”

সানজিদা আহামেদ রিক্তার দিকে তাকিয়ে বলে„“ডাক্তার কি বলেছে?”

রিক্তা ব্যাগ থেকে চশমা আর পেপার টেবিলে রেখে বলে„“চশমা পড়তে বলেছে আর কিছু মেডিসিন দিয়েছে। এখন নিয়মিত ব্যবহার করলে ঠিক হয়ে যাবে।”
„“আল্লাহ মাফ করুক।”
„“ফি আমানিল্লাহ্।”

অন্যদিকে—

মিটিং থেকে বের হয়ে নিজের কেবিনে এসে বসে আছে রাহাদ।
রাহাদ চুপচাপ কেবিনের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সামনের বড় কাঁচের জানালা দিয়ে শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখা যাচ্ছে।

টেবিল ভর্তি ফাইল এলোমেলো, ল্যাপটপে ওপেন থাকা প্রেজেন্টেশন, পাশে কফির মগ… সবকিছু ঠিকঠাক।
শুধু ঠিক নেই রাহাদ নিজে।

সকালের মিটিংয়ে সে এমন সব উল্টাপাল্টা কথা বলেছে যে পুরো বোর্ড মেম্বাররাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।
একজন স্টাফ ভয় ভয় গলায় বলেছিল„“স্যার, এই প্রজেক্টটা যদি আমরা দুবাইয়ের কোম্পানির সাথে—”

তার কথা শেষ হতে না দিয়েই রাহাদ বলে উঠেছিল„“হ্যাঁ হ্যাঁ, বিয়ে দিয়ে দেন প্রজেক্টটাকে। সুখে শান্তিতে সংসার করবে।”

পুরো মিটিং রুম থম মেরে গিয়েছিল।
কেউ হাসতেও পারছে না, আবার ভয়েও কিছু বলছে না।

রাহাদ নিজেও বুঝতে পারেনি সে কি বলছে।
মাথার ভিতর শুধু সেই দুইটা আঁখি ঘুরছে।
রাহাদ চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস ফেলে। টাইটা আলগা করে মাথা সিটে হেলিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় টোকা পড়ে।
রাহাদ শান্ত কণ্ঠে বলে„“Come in.”

রুমের ভিতরে প্রবেশ করে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট জিহাদ। ভিতরে প্রবেশ করে জিহাদ অবাক হয়ে যায়। পরিপাটি স্যারটাকে আজ এলোমেলো দেখে সে এগিয়ে যায় টেবিলের কাছে।
টেবিলের উপর একটা ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল রেখে বাকি ফাইল গুছাতে গুছাতে বলে„“স্যার, আপনার কি হয়েছে বলেন তো? মিটিংয়ে কি সব কথা বলছেন! এখন আবার ইম্পর্ট্যান্ট ফাইলগুলো এলোমেলো করে রেখেছেন?”

রাহাদ কিছু বলতে যাবে তখন গ্রুপে কল আসে রাহাদের।
রাহাদ কল অ্যাটেন্ড করে। পাশে জিহাদ কাজ করছে।
গ্রুপে ছিল সাকিব, রাহাদ, রিয়া আর রিয়ার পাশে হৃদয়। সবাই কথা বলতে থাকে।

রাহাদের উদাস মুখ দেখে শুভ জিজ্ঞেস করে„“কি হয়েছে তোর? মুখটা মলিন কেন?”

রাহাদ থতমত খেয়ে বলে„“হ্যাঁ? কবে?”
সবাই রাহাদের কথায় তার দিকে তাকায়।
রাহাদ নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে„“কি যেন বলছিলে?”

রিয়া বলে„“কি রে ভাই, তোর কি হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি?”

হৃদয় পাশ থেকে বলে„“সমস্যা থাকলে আমাদের জানাতে পারো।”

রাহাদ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে„“তেমন কিছু না। তার চোখ দুটো আমাকে শান্তি দিচ্ছে না। ওই চোখ দিয়ে আমাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। আমি ওই চোখ দুটোর নামে মামলা করবো।”

রাহাদের কথায় সবাই থ হয়ে যায়।
রাহাদের পাশে থাকা জিহাদ বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকায়।

সাকিব বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে„“লাইক সিরিয়াসলি? তোকে কেউ চোখ দিয়ে এলোমেলো করে দিচ্ছে? আমাদের হাসানোর জন্য তোর আর কোনো জোক ছিল না ভাই?”

রাহাদ তাদের বোঝাতে চেষ্টা করে বলে„“আমি সত্যি বলছি। ওই চশমা পড়া চোখ আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি ওই চোখ দুটোর নামে মামলা করে দিবো।”

শুভ রাহাদকে ভালোভাবে দেখে বলে„“আমি শিওর তুই প্রেমে পড়েছিস। এখন মেয়েটা কে?”

রাহাদ বিরবির করে বলে„“যদি বলি তোমার বোন, মানবে?”

সাকিব চেঁচিয়ে বলে„“কি বললি?”

রাহাদ থতমত খেয়ে বলে„“কই? কিছু না।”

রিয়া হেসে বলে„“এই তোরা ফ্রি হবি কবে? তোদের আমি ট্রিট দিবো। আমার ভাই কারো প্রেমে পড়েছে!”

সাকিব চেঁচিয়ে বলে„“আপু, আমি সত্যি গর্বিত! তোমার ভাইকে নিয়ে এতো গর্বে এখন আমি গর্ভবতী!”

রাহাদ কটমট করে বলে„“তুই চুপ থাকবি? নাহলে তোর গর্ভের বাচ্চা এমনিতেই জন্ম নিয়ে নিবে।”

শুভ সিরিয়াস কণ্ঠে বলে„“মেয়েটাকে?”
„“পরে বলবো। এখন না।”
„“As your wish. এখন তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে তোর বোনের বান্ধবীদের বাড়ি দিয়ে আয়।”
রাহাদ চেঁচিয়ে বলে„“কিহ…?”
„“এই ছাগল, তোর প্রবলেম কি? শুধু শুধু চেঁচাচ্ছিস কেন? এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি যা, না হলে তাদের ফ্যামিলি চিন্তা করবে!”
„“আচ্ছা যাচ্ছি।”

ছোট করে বলে রাহাদ।

চলবে……

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x