লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা
পর্ব:১৮
কল কেটে যেতেই রাহাদ ফোনটা টেবিলের উপর রেখে গভীর শ্বাস ফেলে। তার মাথার ভিতর এখনো ঘুরছে সেই চোখ জোড়া।
চশমার আড়ালে লুকানো শান্ত, মায়াবী দুটো চোখ।
জিহাদ ফাইল গুছাতে গুছাতে সন্দেহের দৃষ্টিতে রাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে„“স্যার, আপনি সত্যি সত্যিই প্রেমে পড়েছেন মনে হচ্ছে।”
রাহাদ বিরক্ত হয়ে বলে„“চুপ থাকো তো।”
„“না স্যার, সিরিয়াসলি বলছি। আপনি আজকে যা যা করেছেন জীবনে কখনো করেননি। মিটিংয়ে মানুষ বিয়ের কথা বলে নাকি?”
রাহাদ চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলে„“আমারও জানা ছিল না মানুষ চোখ দেখেও এভাবে এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।”
জিহাদ থ হয়ে যায়। তার একগুঁয়ে স্যার প্রেমের কথা বলছে! জিহাদ নাটকীয় ভঙ্গিতে উপরে দুই হাত তুলে বলে„“ইয়া আল্লাহ! আমাদের রোবট স্যার শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়েছে!”
রাহাদ এবার টেবিলের উপর থাকা একটা কলম তুলে মারতে যায়।
জিহাদ দ্রুত সরে গিয়ে বলে„“আরে স্যার! প্রেমে পড়ে মানুষ কবি হয় শুনেছিলাম, আপনি তো খুনি হয়ে যাচ্ছেন!”
রাহাদ এবার আরো বিরক্ত হলো। তার মনের কথা কেউ বুঝতে চাইছে না। তার অ্যাসিস্ট্যান্টও না।
রাহাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। পরমুহূর্তেই শুভর শেষ কথাটা মাথায় বাজে—
“তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে তোর বোনের বান্ধবীদের বাড়ি দিয়ে আস।”
রাহাদ ঘড়ির দিকে তাকায়। তারপর দ্রুত চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে„“জিহাদ, আজকের সব মিটিং ক্যানসেল করো।”
জিহাদ অবাক হয়ে বলে„“স্যার, সন্ধ্যায় তো বিদেশি ক্লায়েন্টের সাথে—”
তার কথা শেষ হতে না হতেই রাহাদ দ্রুত বলে„“পোস্টপোন করো।”
„“বাট স্যার—”
রাহাদ চেয়ার থেকে কোটটা হাতে নিতে নিতে বলে„“আমি এখন কোনো কাজ করতে পারবো না।”
জিহাদ মুচকি হেসে বলে„“জ্বি স্যার। প্রেম বড় ভয়ংকর জিনিস।”
রাহাদ কটমট করে তাকায়। জিহাদ তাড়াতাড়ি মুখ নামিয়ে ফেলে।
রাহাদ রুম থেকে বের হতে হতে জিহাদের উদ্দেশ্যে বলে„“আজ আমি আর আসবো না। কাজ শেষ করে সব গুছিয়ে চলে যেও।”
জিহাদ “ওকে” বলে মাথা নাড়ায়। রাহাদ কোট হাতে নিয়ে চলে যায়।
রাহাদ যেতেই জিহাদ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে„“আল্লাহ, আপনি আমার স্যারের জীবনটা আনন্দে ভরিয়ে দিয়েন। তিনি যাকে চান তাকেই তার নসিবে দিয়েন। অন্তত আমার রোবট স্যারের জীবনে একটা ফুল এসে তার জীবনটাও ফুল বানিয়ে দিক— আমি এই দোয়াই করি।”
কথা শেষ করে টেবিলের উপর থাকা ফাইলগুলো পাশের শেলফে রেখে দেয়।
অফিস থেকে বের হয়ে রাহাদ গাড়ির কাছে যায়। গাড়ির ভিতরে কোট রেখে দরজা লাগিয়ে দেয়। রাস্তা পার হয়ে ওপারে যায়। একটা দোকানে গিয়ে বলে„“ক্যান্ডির বক্স দেন তো।”
দোকানের লোকটা “আচ্ছা” বলে একটা ক্যান্ডির বক্স দেয়। বক্সটা হাতে নিয়ে রাহাদ জিজ্ঞেস করে„“দাম কত?”
দোকানে থাকা লোকটি বলে„“স্যার, ৬৫০ টাকা।”
রাহাদ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ৫০০, ১০০ আর ৫০ টাকার নোট দেয়। তার কাছে ভাঙতি ছিল না। বক্সটা নিয়ে গাড়ির কাছে চলে যায়।
গাড়ির ভিতরে উঠে বক্সটা সামনে রেখে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
দুপুর গড়িয়ে ধীরে ধীরে বিকেল নেমে আসছে।
রোদের তীব্রতা আগের মতো আর নেই। সোনালি আলোটা নরম হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
আকাশের একপাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দে দুলছে।
দূরে কোথাও নাম না জানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
রাস্তায় দিনের ব্যস্ততা এখন কিছুটা কমে এসেছে।
সূর্যের আলো কাঁচের জানালায় পড়ে চিকচিক করছে, যেন শহরটার গায়ে কেউ সোনালি রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে।
বাতাসে একটা অলস শান্তি মিশে আছে।
না পুরো বিকেল, না আর দুপুর— মাঝামাঝি এই সময়টায় প্রকৃতি কেমন যেন আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
চারপাশের সবকিছু ধীর হয়ে আসে, আর মনটাও অকারণে শান্ত হয়ে যায়।
রাহাদ গাড়িতে এসি ছেড়ে জানালার কাঁচ দুটো নামিয়ে দেয়।
ফোনে কল আসলে ফোনটা পাশে থেকে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে উঠে— “Shuvo Vaiya”।
কলটা রিসিভ করে লাউডস্পিকারে দিয়ে স্টিয়ারিংয়ের সামনে রেখে গাড়ি চালাতে চালাতে বলে„“হুম, বলো।”
„“কোথায় তুই?”
„“এই তো বাড়ির কাছাকাছি। কেন?”
„“ওহ! আমি তো মনে করেছি তুই এখনো প্রেমের মধ্যে পড়ে আছিস।”
„“ভাইয়া, মজা করো না তো।”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা যায়।
কিছুক্ষণ পর রাহাদ বলে„“ভাইয়া?”
„“বল।”
রাহাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলে„“ভাইয়া… একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
„“হুম বল।”
রাহাদ গাড়ির গতি একটু কমিয়ে দেয়। বাইরে নরম বিকেলের আলো ছড়িয়ে আছে। হালকা বাতাস এসে মুখে লাগছে। রাহাদ অনেকক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে বলে„“ভালোবাসা মানে কি?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর শুভ শান্ত কণ্ঠে বলে„“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
„“এমনিই… জানতে ইচ্ছে করছে।”
শুভ হালকা হেসে বলে„“ভালোবাসা আসলে একেকজনের কাছে একেকরকম। কেউ ভালোবাসাকে শুধু অনুভূতি ভাবে, কেউ দায়িত্ব, কেউ শান্তি। কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসা মানে— কারো মধ্যে নিজের শান্তি খুঁজে পাওয়া।”
রাহাদ চুপচাপ শুনছে।
শুভ আবার বলে„“দেখ, ব্যবসায় যেমন বিশ্বাস ছাড়া কিছু দাঁড়ায় না, সম্পর্কও ঠিক তেমন। তুমি কোটি টাকার কোম্পানি দাঁড় করাতে পারবি, কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া একটা সম্পর্কও টিকবে না।”
রাহাদ স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে বলে„“আর পরিবার?”
শুভ মুচকি হেসে বলে„“পরিবার হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। বাইরে হাজার যুদ্ধ করলেও মানুষ দিন শেষে পরিবারের কাছেই শান্তি খুঁজে। ভালোবাসা তখনই সুন্দর হয়, যখন সেটা পরিবারকে ভাঙে না, বরং আরো জোড়া লাগায়।”
রাহাদ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
শুভ আবার বলে„“ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে নিজের করে চাওয়া না। তার সম্মান, ভয়, স্বপ্ন— সবকিছুর দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা থাকা।”
রাহাদ ধীরে বলে„“যদি কাউকে দেখলেই বুকের ভিতর অদ্ভুত লাগে?”
„“তাহলে বুঝবি মানুষটা তোর ভিতরে জায়গা করে নিচ্ছে।”
„“আর যদি তাকে হারানোর ভয় হয়?”
শুভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে„“যাকে হারানোর ভয় হয়, তাকে মানুষ সাধারণত মন থেকে ভালোবেসে ফেলে। কারণ ভয় শুধু প্রিয় মানুষকেই হারানোর হয়।”
রাহাদ জানালার বাইরে তাকায়। সূর্যের আলো তার মুখে এসে পড়ে।
শুভ আবার শান্ত স্বরে বলে„“কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস রাহাদ… ভালোবাসা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না। ফুলকে জোর করে ফুটানো যায় না। তাকে সময় দিতে হয়, যত্ন দিতে হয়। ঠিক তেমনি মানুষকেও।”
রাহাদের বুকের ভিতর কেমন যেন শান্ত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। সে ধীরে বলে„“ভাইয়া… তুমি এতো সুন্দর করে সব বুঝাও কিভাবে?”
শুভ হেসে ফেলে„“কারণ আমি জীবনকে কাছ থেকে দেখেছি। চাকরি আমাকে টাকা চিনিয়েছে, কিন্তু পরিবার আর ভালোবাসা আমাকে মানুষ চিনিয়েছে।”
রাহাদ কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর আস্তে করে বলে„“মনে হয়… আমি বদলে যাচ্ছি।”
শুভ মৃদু হেসে বলে„“মানুষ যখন সত্যিকারের কাউকে অনুভব করতে শুরু করে, তখন সে বদলাতেই থাকে।”
রাহাদ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বাইরে তাকায়। শুভ কথার টপিক পাল্টাতে বলে„“সাবধানে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি যা।”
রাহাদ “হুম” বলে ফোন কেটে দেয়। গাড়ি হাইস্পিডে চালাতে চালাতে বিরবির করে বলে„“আমার এই ভালোবাসা কখনো পূর্ণতা পাবে না… কারণ আমি ভুল মানুষকে ভালোবেসেছি।”
দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে গাড়ি চালানোতে মন দেয়।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি আহামেদ বাড়ির গেইটে এসে থামে। গাড়ি পার্ক করে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। হলরুমে তখন কেউ ছিল না।
রাহাদ সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে রিক্তার রুমের সামনে যায়। দরজায় নক করতেই রিতু বলে„“দরজা খোলা।”
রাহাদ ইতস্তত করে ভিতরে প্রবেশ করে। রাহাদকে দেখে বাকিরা নড়েচড়ে বসে।
রাহাদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে„“বোনু, ওদের বাড়ি দিয়ে আসতে হবে এখন।”
আরশি তাড়াতাড়ি করে বলে„“না না ভাইয়া, আপনাকে লাগবে না। আমরা যেতে পারবো।”
„“আমি পাগল হয়ে গেছি? তোমরা তিনটা মেয়ে একা বাড়ি যাবে আর আমি বসে থাকবো? চলো, আমি দিয়ে আসবো।”
রিতু শিখার দুই হাত ধরে বলে„“আপু তুমি থাকো আজকে।”
শিখা রিতুর গালে হাত রেখে বলে„“আমি পরে আবার আসবো বোন। আজ যেতে হবে।”
রাহাদ শিখার দিকে এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।
নাহিদা হঠাৎ বলে উঠে„“একে বারেই ভাইয়ের বউ করে রেখে দাও রিতু!”
উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে যায়।
আরশি নাহিদার মাথায় চাটি মেরে বলে„“কোথায় কি বলতে হয় তুই ভুলে গেছিস?”
রিতু এক গাল হেসে বলে„“নাহিদা আপু ঠিক বলেছে।”
শিখা রাহাদের দিকে এক পলক তাকায়। রাহাদ শুনেও না শোনার ভান করছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
শিখা রিতুর কানে কানে কিছু বলে। রিতু ঠোঁট উল্টে ফেলে।
রাহাদ আবার পুনরায় বলে„“তোমরা চলো। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। চাইলে থাকতে পারো, নো প্রবলেম। বাট পরিবারকে জানিয়ে নিও।”
আরশি বলে„“আমরা থাকবো না। আপনি দিয়ে আসুন।”
আরশি, নাহিদা, শিখা সবাই উঠে দাঁড়ায়। রাহাদ রুম থেকে বের হয়ে গাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যায়।
রিক্তা বাকিদের নিয়ে নিচে নামে। নাহিদা, আরশি, শিখা তিনজন মনিরা আহামেদ এবং সানজিদা আহামেদের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যায়।
রিক্তা আর রিতুও এসেছিল তাদের সাথে।
আরশি আর নাহিদা আগেই পিছনে বসে পড়ে। শিখা একটু ভয়ে ভয়ে সামনে বসে। জানালার কাঁচ নামিয়ে রিক্তা আর রিতুকে টাটা দেয়।
রিক্তা আর রিতুও টাটা দেয়।
রাহাদ গাড়ি স্টার্ট দেয়।
চলবে……
( বানান বা কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারেন)