লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা
পর্ব:১৯
গাড়িটা ধীরে ধীরে আহামেদ বাড়ির গেইট পেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠে আসে।
বিকেলের সোনালি আলো তখন শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোকে অন্যরকম শান্ত একটা রূপ দিয়েছে।
চারপাশে হালকা যানজট, দোকানপাটের সামনে মানুষের ভিড়, দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
গাড়ির ভিতরে অদ্ভুত নীরবতা।
আরশি আর নাহিদা পিছনে বসে ফিসফিস করছে।
আর সামনে বসে থাকা শিখা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
রাহাদ একবার আড়চোখে চশমা পরিহিতা শিখার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নেয়।
কেন জানি আজ তার বুকের ভিতরটা খুব অস্থির লাগছে।
হঠাৎ নাহিদা সামনে ঝুঁকে বলে„“ভাইয়া একটা কথা বলি?”
রাহাদ স্টিয়ারিংয়ে চোখ রেখেই বলে„“হুম বলো।”
„“আপনি প্রেমে পড়েছেন?”
হঠাৎ নাহিদার প্রশ্নে রাহাদ কাশতে শুরু করে। শিখাও অবাক হয়ে নাহিদার দিকে তাকায়।
আরশি মাথায় হাত দিয়ে বলে„“এই মেয়ে! তোর মুখে কিছু আটকায় না?”
নাহিদা গম্ভীর মুখ করে বলে„“আমি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করছি, জ্বালাবি না তো। ভাইয়া আপনি বলুন তো?”
রাহাদ নিজেকে সামলে নিয়ে কোনো মতে বলে„“না।”
নাহিদা চোখ বাঁকিয়ে বলে „“মিথ্যা।”
রাহাদ ভ্রু কুঁচকে বলে „“কেন? আমার শরীরে কি ট্র্যাক লাগানো আছে?”
„“কারণ প্রেমে পড়া মানুষের চেহারা এমনই হয়। উদাস উদাস, আনমনা আনমনা।”
রাহাদ গাড়ি চালাতে চালাতে মুচকি হাসে সামনে তাকিয়ে।
শিখা আড়চোখে রাহাদের হাসি দেখলো। নাহিদা সোজা হয়ে তার সিটে বসে। নাহিদা ফিসফিস করে বলে„“রোবট।”
রাহাদ শুনেও কিছু বলে না।
আরশ কথাটা শুনে নাহিদার দিকে কটমট করে তাকায়। তাতে নাহিদার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
২০ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে আরশিদের বাসার সামনে আসে। আরশিদের রাস্তার অপর পাশে নাহিদাদের বাড়ি। গাড়ি ব্রেক করতেই আরশি গাড়ি থেকে বের হয়ে নেমে যায়, সাথে নাহিদা। আরশি ভদ্রভাবে বলে „“আসেন ভাইয়া আমাদের বাসায়।”
আরশির জবাবে রাহাদ বলে „“পরে সময় করে আসবো।”
আরশি মিষ্টি হেসে বলে „“আচ্ছা ভাইয়া।”
নাহিদা গম্ভীর কণ্ঠে বলে „“বান্ধবীকে রেখে যাচ্ছি, ঠিকমতো বাসায় নামিয়ে দিবেন। কোনো চালাকি করবেন না।”
নাহিদার কথায় রাহাদ থতমত খেয়ে বলে „“আচ্ছা আচ্ছা।”
নাহিদা বাঁকা হেসে শিখাকে ফিসফিস করে বলে„“বেবি চিল করো, একা রেখে গেলাম।”
শিখা কটমট করে নাহিদার দিকে তাকায়।
নাহিদা আর আরশি হাসতে হাসতে চলে যায়।
তারা যেতেই রাহাদ গাড়ি স্টার্ট দেয়। তার মুখে লেগে আছে মুচকি হাসি।
শিখা রাহাদের দিকে রাগী চোখে তাকায়।
রাহাদ মুচকি হেসে বলে „“মিস চশমিস, আপনাকে রাগলে খুব সুন্দর লাগে।”
শিখা ঠোঁট বাঁকিয়ে বাইরে তাকায়।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা সিগন্যালে থেমে যায়। হঠাৎ ব্রেক করায় তাল সামলাতে না পেরে সামনে ঝুঁকে পড়ে। রাহাদ তার হাত সামনে দিয়ে দেয়, তার ফলে শিখা কপালে ব্যথা থেকে বেঁচে গেছে। শিখা সোজা হয়ে বসে বলে „“থ্যাংকস।”
রাহাদ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে „“ঠিক আছো তুমি? ব্যথা লাগেনি তো?”
শিখা চশমা ঠিক করে বলে „“জ্বি আমি ঠিক আছি।”
ঠিক তখনই রাহাদের চোখ পড়ে সামনের ক্যান্ডির বক্সটার দিকে। শিখারও চোখ পড়ে বক্সটার দিকে।
গাড়ির ঝাঁকিতে বক্সটা বের হয়ে গেছে। রাহাদ বক্সটা নিয়ে শিখার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে „“নেও এটা।”
শিখা হতভম্ব হয়ে বলে „“এটা আমার?”
” হুমম। ”
” কিন্তু এই ক্যান্ডি তো রিক্তার পছন্দ! ”
” হুমম, বোনুর জন্যই কিনেছিলাম। এখন তোমাকে দিলাম। ”
” কিন্তু…”
” কোনো কিন্তু না চশমিস। ”
শিখা ক্যান্ডির বক্সটা কোলের উপর রেখে হেসে বলে „“থ্যাংকস।”
রাহাদ ভ্রু কুঁচকে বলে „“কেন?”
” এই যে ক্যান্ডি দেওয়ার জন্য। ”
এর মধ্যেই লাল সিগন্যাল থেকে সবুজ সিগন্যাল পড়েছে। শিখার কথায় রাহাদ মলিন হেসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
শিখা বারংবার আড়চোখে রাহাদের উদাসীন চেহারা দেখছে। রাহাদ সেটা লক্ষ করলেও কিছু বলেনি।
৫ মিনিটের রাস্তা পার করে গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষলো। হঠাৎ ব্রেক করায় শিখা একটু ভড়কে যায়। ভ্রু কুঁচকে বলে„“কি হয়েছে? গাড়ি থামালেন কেন?”
রাহাদ চোখের ইশারায় শিখাকে সামনে তাকাতে বলে। রাহাদের চোখের ইশারা লক্ষ করে শিখা সামনে তাকায়। দেখলো তাদের বাড়ির মেইন গেইট। শিখা বুঝে গেছে সে বাড়িতে চলে এসেছে। তাই ক্যান্ডির বক্স খুলে দুটো ক্যান্ডি গাড়ির ডেস্কের উপর রেখে দেয়। রাহাদ ভ্রু কুঁচকে বলে „“এটা কি?”
শিখা গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে „“আপনার জন্য।”
শিখা গাড়ি থেকে নেমে দরজা লাগিয়ে দেয়। গাড়ির জানালার উপর শিখা আঙুল দ্বারা টোকা দিলো। রাহাদ গাড়ির জানালা খুলে দেয়। শিখা ভদ্রসহিত বলে „“বাসায় আসুন।”
রাহাদ মিষ্টি করে বলে „“পরে যাবো চশমিস।”
” আপনার ফুপির সাথে দেখা করে যান? ”
” আজ না, পরে আসবো চশমিস। ”
শিখা রাগী কণ্ঠে শুধালো „“আপনি পরে আর আসবেন না জানি! আর সেই কখন থেকে চশমিস চশমিস লাগিয়েছেন? আমার নাম তায়েবা খান শিখা। মনে না থাকলে আবার বলি, আমি তায়েবা খান শিখা। ওকে? নো চশমিস!”
শিখার রাগ দেখে ঠোঁট চেপে হাসি নিবারণ করে রাহাদ শুধায় „“তুমি আমার কাছে চশমিস! বুঝলে?”
” না আমি বুঝিনি। আপনার যেতে হবে না, আমি যাচ্ছি। আল্লাহ হাফেজ। ”
এই বলে রাগ দেখিয়ে শিখা চলে যায়। শিখার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হাসে রাহাদ। গাড়ির ডেস্ক থেকে একটা ক্যান্ডি খুলে মুখে দেয়। রাহাদ রিক্তার জন্য এত ক্যান্ডি নিয়েছে, কিন্তু কখনো খেয়ে দেখেনি। আজ প্রথম খেয়েছে। রিক্তা অনেক বার খাওয়ার জন্য বলতো, কিন্তু রাহাদ খেতো না।
রাহাদ পকেট থেকে ফোন বের করে শুভর নাম্বারে কল করে। কয়েকবার রিং হতেই শুভ ফোন রিসিভ করে বলে „“হুম কোথায় তুই?”
রাহাদ আশেপাশে নজর বুলিয়ে বলে „“আছি এক জায়গায়!”
” ওদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়েছিস? ”
” হুম। ”
” কখন? ”
” এই তো কিছুক্ষণ হলো। ”
” যাক, একটা কাজ তো হয়েছে। ”
রাহাদ একটু চুপ থেকে আবার বলে „“ভাইয়া, কেউ যদি অকারণে রাগ দেখায় তার মানে কি?”
” তার মানে সে তোর প্রতি কেয়ারফুল, এবং তোর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করে। আর তুই হঠাৎ এ কথা বললি কেন? ”
রাহাদ ডেস্ক থেকে ক্যান্ডি হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে মুচকি হেসে বলে „“তেমন কিছু না। তুমি কাজ করো।”
এই বলে রাহাদ ফোন কেটে দেয়। ফোন পাশের সিটে রেখে ক্যান্ডি নিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে।
গাড়ি ঘুরিয়ে রাহাদ বাসার দিকে রওনা দিলো।
চারপাশে সন্ধ্যার আলো ছড়াচ্ছে। বাইরে মৃদু বাতাস, আকাশে বড় চাঁদ, কোনো তারা নেই। রাহাদ নির্জন রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে।
চলবে……