লেখা – আসফিয়া রহমান
পর্ব:০৯
অনুমতি ছাড়া কপি করা
কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
–
–
আজ সকালে বিনীতা বাসায় এসেছে। রাহনুমা বেগমের জরুরি তলব; যেন বাসায় না ফিরলে মহাযুদ্ধ বাঁধিয়ে ফেলবেন!
ও বাসায় এসে দেখল, সেই পুরোনো কাহিনি! আসমা আন্টির আসার কথা আজ দুপুরে, তার সঙ্গে পরিবারের সবাইও থাকবে। মায়ের এসব কান্ডে বিনীতা বড্ড বিরক্ত। কী দরকার এসবের? এতবার একই কথা শোনার পরেও আম্মু কেন বুঝতে চাইছে না?
“আম্মু, প্লিজ, আমি এখনই এসব চাইছি না, বলেছি না তোমাকে?”
বিনীতা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও জানে, এই তর্কের কোনো মানে হয় না, কারণ ফলাফল পরিবর্তন হওয়ার নয়।
রাহনুমা বেগম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, “তোর সমস্যাটা কোথায় বল তো? আসমা তো আমাদেরই মানুষ। খালি দেখে যাবে। এতে আর এমন কী?”
বিনীতা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকল। কী বলবে, নিজেও বুঝতে পারছে না। মায়ের এসব কথার উত্তর দেওয়ার মতো ধৈর্য ওর নেই। এতবার নিষেধ করার পরও একই কথা!
রাহনুমা বেগম ওর সামনে একটা হালকা রঙের শাড়ি ধরে আছেন এমন ভঙ্গিতে, যেন এই বিষয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগই নেই।
“এই শাড়িটা পরে রেডি হয়ে নাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা চলে আসবে…আচ্ছা, আসো আমি পড়িয়ে দিই। “
বিনীতা চোখ কুঁচকে তাকাল। ওর ধৈর্য শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, “আম্মু, একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?”
রাহনুমা বেগম গম্ভীর চোখে তাকালেন।
“অতিথি আসবে, একটু পরিপাটি হয়ে থাকা কি খুব বেশি কিছু?”
বিনীতার ঠোঁট কেঁপে উঠল। কিছু বলতে চাইলো, বলতে পারল না। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল ও। তারপর এক ঝটকায় মায়ের হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল ও, ঠাস করে বন্ধ করে দিল দরজাটা।
বিছানায় শাড়িটা ছুড়ে ফেলে আয়নার সামনে দাঁড়ালো বিনীতা। রাগে গাল দুটো লাল হয়ে আছে। ওর মাথার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আজকের দিনটা কীভাবে সামলাবে, ও জানে না!
____________________________________
বাইরে বেশ কিছু মানুষের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। আসমা আন্টিরা বোধহয় চলে এসেছে। টুকটাক হাসির শব্দ, পানির গ্লাস রাখার আওয়াজ, খুশি খুশি গুঞ্জন…সব মিলিয়ে বোঝাই যাচ্ছে, সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত।
বিনীতা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালো। চোখে অস্থিরতা ফুটে উঠেছে ওর, মুখ থমথমে। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য ও একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।
ফোনটা হাতে নিয়ে বার কয়েক স্ক্রল করল ও, কিন্তু মন বসছে না। নোটিফিকেশনগুলোও যেন বিরক্তিকর লাগছে। হঠাৎ করে মনে হলো, যদি এখনই দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে, ফোন সাইলেন্ট করে বিছানার নিচে লুকিয়ে থাকে, তাহলে কেমন হয়?
নিজেরই ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেললো বিনীতা।
____________________________________
কিছুক্ষণ পর রাহনুমা বেগমের ডাক এল।
“বিনীতা, মা, একবার এসো?”
বিনীতা চোখ বন্ধ করে এক গভীর নিঃশ্বাস নিল। ঘটতে যাওয়া ঘটনা ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই।
আয়নার দিকে শেষবার তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখল ও— বাইরে থেকে শান্ত দেখাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে উথাল পাথাল অবস্থা। এতগুলো মানুষের সামনে কিভাবে দাঁড়াবে ভেবেই অস্বস্তি লাগছে ওর। শাড়িটা গুছিয়ে নিয়ে ধীরে দরজার দিকে এগোল বিনীতা।
ড্রয়িং রুমের দরজায় পা রাখতেই সোফায় বসে থাকতে দেখা গেল পুরোপুরি অকল্পনীয় একজনকে। বিনীতার পা জোড়া থেমে গেল ওখানেই।
সোফায় বসে থাকা পরিচিত মুখটা দেখে এক মুহূর্তের জন্য ওর দম বন্ধ হয়ে আসলো।
অর্ণব!!
উনি এখানে কেন? কিভাবে? কী কারণে?
এই অসম্ভব কাকতালীয়তা কীভাবে সম্ভব?
আসমা আন্টির তো ওনার ছেলেকে নিয়ে আসার কথা! তার বদলে অর্ণব এখানে কি করছে?
এক মুহূর্তের মধ্যে যেন হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করল ওর মাথায়। বিনীতা দ্রুত চারপাশে তাকাল, নিশ্চিত হতে চাইল ও ভুল দেখছে কিনা। কিন্তু না! সোফায় আম্মু, আব্বু, আসমা আন্টি, আশরাফ আঙ্কেল, ফাহিম সবাই বসে আছে। কিন্তু যার আজকে আসবার কথা— আসমা আন্টির ছেলে ফাহাদ, সে কোথায়? তার পরিবর্তে অর্ণব কেন বসে!
অর্ণব বসে আছে সোফার একদম শেষ মাথায়। ওর পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, একমনে মোবাইল স্ক্রল করছে।মুখে সেই অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিটা ঠিক আগের মতো।
অর্ণব ফোন স্ক্রল করছিল, আর আনমনে কথাবার্তা শুনছিল। হঠাৎ সামনে তাকাতেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত মুখটা দেখে ওর মোবাইল স্ক্রল করতে থাকা হাতটা থেমে গেল।
বিনীতা?
এখানে?
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ভুল দেখছে। কিন্তু না!
চোখের ভুল হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
অর্ণবের ভ্রু কুঁচকে গেল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল, যেন কোনো অদ্ভুত ধাঁধায় পড়েছে কিনা নিশ্চিত হতে চাইছে।
বিনীতা তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। বিনীতাও যে ওকে দেখে অবাক হয়েছে তা ওর চোখ মুখ দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এমন আজব কাকতালীয় ঘটনার অর্থ কি?
বিনীতাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আসমা বেগম হাসিমুখে বললেন, “বিনীতা, মা, এসো, এসো। দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
আশরাফ সাহেবও যোগ করলেন সাথে, “আসো মা, বসো।”
বিনীতা অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধীর পায়ে এগিয়ে এল। প্রচন্ড নার্ভাসনেসে ওর মনে হচ্ছে, চারপাশের সব শব্দ ফ্যাকাসে হয়ে আসছে। শুধু একটাই প্রশ্ন ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে— অর্ণব আর ফাহাদ কি তাহলে একই মানুষ?
অর্ণব নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। মুখে একটা ভদ্রতাসূচক হাসি টেনে ফোনটা পকেটে রেখে বসল, যেন এই মুহূর্তটা একেবারেই স্বাভাবিক। অথচ ওর চোখের একদম গভীরে খেলা করছে একটা অস্পষ্ট কৌতূহল।
আসমা বেগম খুশি গলায় বললেন, “তোমাদের দুজনের তো এর আগে দেখা হয়নি বোধহয়, তাই না? তাহলে পরিচয় করিয়ে দিই। বিনীতা, এই আমার ছেলে ফাহাদ। আর ফাহাদ, ও হচ্ছে বিনীতা, রাহনুমার মেয়ে।”
অর্ণব বিনীতার দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা ঝাঁকালো, যেন পরিচয়ের ব্যাপারটা ওর কাছে নতুনই। মুখে আগের মতোই শান্ত, নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তি। অথচ বিনীতার মনে হচ্ছে, পুরো ঘরটায় যেন হঠাৎ করে একটা চাপা অস্বস্তি নেমে এসেছে।
রাহনুমা বেগম একগাল হাসি দিয়ে বললেন, “ফাহাদের ইন্টার্নশিপ তো শেষ, তাই না? এখন জবের জন্য কোথায় এপ্লাই করবে ভাবছো?
অর্ণব একটু মুচকি হেসে বলল, “হ্যাঁ, আন্টি। এখন কয়েক জায়গায় এপ্লাই করার জন্য ভাবছি; ব্যাপারটা একটু সময়সাপেক্ষ।”
এর মাঝে অর্ণবের বাবা বললেন,
“বিনীতা আর ফাহাদ, ওরা দুজনে একটু আলাদা কথা বললে ভালো হতো না? কি বলেন আপা?
রাহানমা বেগম হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ নিশ্চয়ই! বিনীতা, ফাহাদকে নিয়ে ছাদ থেকে ঘুরে এসো।”
বিনীতা বেজায় অস্বস্তিতে পরলো। অর্ণবের সাথে এখন আবার আলাদা কথা বলতে হবে..!! তবুও ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি ধরে রেখে বলল,
“আসুন।”
অর্ণবও হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালো। বিনীতার পেছন পেছন চলল সিঁড়ির দিকে।
_________________________________
ছাদে পৌঁছানোর পর বিনীতা রেলিং ঘেঁষে বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। অর্ণবও এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক পেছনে। অর্ণবই কথা শুরু করলে প্রথমে,
“এখানে এসে আপনাকে দেখতে পাব এটা একদমই আনএক্সপেক্টেড ছিল!”
বিনীতাও অর্ণবের দিকে ঘুরে তাকালো,
“আমিও অনেক বেশি অবাক হয়েছি আপনাকে দেখে।”
অর্ণব একটু হেসে বলল,
“কী অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে পারে মানুষের জীবনে!”
বিনীতা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার নাম ফাহাদ?”
“অর্ণব এহসান; ডাকনাম ফাহাদ।”
বিনীতা একটু ইতস্তত করল, তারপর হালকা গলায় বলল, “পাত্রী হিসেবে আমাকে আপনার পছন্দ?”
অর্ণব এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে থাকল, তারপর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি টেনে বলল,
“উম… জীবনসঙ্গী হিসেবে আপনাকে পেলে বোধহয় মন্দ হবে না।”
একটু থেমে বিনীতার দিকে তাকাল অর্ণব; বিনীতা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে পরবর্তী কথা শোনার অপেক্ষায়।
তারপর অর্ণব আবার বলল, “আর আপনি? আপনার কী মত?”
বিনীতা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ছাদের হালকা বাতাস ওর শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছে। মাথার মধ্যে হাজার রকমের সংশয় নিয়ে আস্তে করে বলল,
“হুট করে কিছু বলা কঠিন আমার জন্য।”
অর্ণব মাথা ঝাঁকালো,
“বুঝতে পারছি। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।”
একটু ভেবে অর্ণব চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কিন্তু, নিচে গিয়ে এখন কী বলব, সেটাই তো বুঝতে পারছি না!”
বিনীতা ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে জোরে জোরে দুই দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
“কিছুই তো বুঝতে পারছি না!”
অর্ণব হাসল, সে হাসি আবার মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই।
“চুপচাপ থাকলে ওরা ধরে নেবে যে, ব্যাপারটা পজিটিভ। আবার যদি সরাসরি কিছু বলি, তাতেও ঝামেলা!”
বিনীতা এবার সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেল। অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“আমরা তো মাত্র কথা বলা শুরু করলাম… এর মধ্যেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে?”
অর্ণব এবার একটু গম্ভীর হলো, “ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা কেউ বলেনি। কিন্তু কিছু তো বলতে হবে, তাই না?”
বিনীতা ধীরেসুস্থে মাথা নাড়ল, “হয়তো বলার চেয়ে কিছু না বলাই ভালো হবে।”
অর্ণব একটু চুপ করে রইল, তারপর মৃদু মাথা ঝাঁকালো। “ঠিক আছে!”
“আমি তাহলে নিচে যাচ্ছি।”
বিনীতা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে।
To be continued…
বি:দ্র: গল্পের টুইস্ট কেমন লাগলো? কমেন্টে জানাতে পারেন..💜