লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী
পর্বঃ০৯
ভোরে আলো এখন ভালো করে ফুটেনি।রাতে পাঁজা পাঁজা মেঘ থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েছিল কিঞ্চিৎ। তাই বাতাসে সতেজতার আরো এক আস্তর পরলো। ভোর হতে না হতেই মেঘগুলো ছুটিতে গিয়ে সূর্যটাকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তার কাজ করতে দিয়ে গেছে। তানিশা আকাশের অবস্থা দেখে হতাশ হলো। দেশে আসার পর থেকেই আকাশের পানে সে হাপুস নয়নে চেয়ে তাকে। কখন ঝুম বৃষ্টি হবে। কিন্তু পাজি আকাশ তার সঙ্গই দিচ্ছে না। ফাদিনের কন্ঠ স্বর শোনে আকাশের পানে থেকে চোখ সরিয়ে ফাদিনের দিকে তাকাল।ফাদিনের পিছন পিছন ফাহিমও আসছে। ওদের লক্ষ্য করে মাইশা বললো-” তাহলে রওয়ানা হওয়া যাক। সবাই চলে এসেছে যখন। “
ফারহান জোহান মাইশার কথায় সায় দিয়ে কথা বলতে বলতে আগাতে লাগলো। মাইশা তানিশাকে নিয়ে চললো ওদের পিছু পিছু। ফাহিম ফাদিন দুই ভাই প্রথমেই ছোট গেইট পার হলো। ওদের পিছু পিছু সবাই।তানিশা ধীরেসুস্থে একদম শেষে বের হলো, বড় গেইটার লাগোয়া ছোট গেইটা বেদ করে। কানে ফাদিন মাইশার উচ্চ স্বরে হইহট্টগোল শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালো তানিশা । তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। ঢিলেঢালা ধূসর রঙের একটা ট্রি শার্ট কালো টাওজার পরনে,যার আলুথালু চুল কপাল ঢেকে দিচ্ছে। চোখে ঘুম ঘুম ভাব এখনও লেপ্টে আছে। ঘুমের তারানায় হামি দিচ্ছে বারবার।এই অবস্থায় এতো ভোরে তাদের গেইটের বাইরে চৌধুরী বাড়ির বড় রাজপুত্র দাঁড়িয়ে আছেন।
ফাদিন গেইট থেকে বের হয়েই মেঘকে দেখতে পেয়ে হৈ-হুল্লোড় শুরু করেছে। মেঘ মাইশার বন্ধু হলে কি হবে? ফাদিন বিশেষ ভাবে মেঘকে পছন্দ করে। এই সকালবেলায় মেঘের দেখা পেয়ে সে যেন হাতে চাঁদ পেলো।লম্বা কদম ফেলে মেঘকে জড়িয়ে ধরে দিলো দুইটা ঝাঁকি।মেঘের ঘুম বাপ বাপ করে পালালো।ফাদিন আমোদ স্বরে বললো -” মেঘমালা তোমায় দেখে আমার দিল খুশ। যাক এই শান্তিময় দিনগুলোতে শুধু আমি একা না, অনেকের অশান্তি চলছে দেখে ভালো লাগলো। “
মাইশা খ্যাক করে উঠলো -” এই একদম আমাদের উপর দোষ চাপাবে না বললাম। আমরা মাত্র একবার ডেকেছি। তুমি ঘুম থেকে কেন উঠলে তা তুমি জানো। “
ফাদিন নাখুশ হয়ে বললো -” দেখলে মেঘমালা, চুন্নির যুক্তি দেখলে। আমার আরামের ঘুম বিনষ্ট করে এখন বলছে আমি কেন উঠতে গেলাম। “
ফাদিন মেঘকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললেও মেঘের সেই পানে ধ্যান নেই। তার সবধ্যান জ্ঞান কারো ঘুমহীন ফুলো ফুলো আঁখিজোড়াতে। আজ মেয়েটা শাড়ী পরেনি। বেগুনি রাঙা কামিজ জড়িয়েছে গায়ে।চুলগুলো আলুথালু হয়ে ফুলে আছে। মুখে নেই কোনো প্রসাধনী নেই। তবুও কতটা আকর্শনীয় দেখাচ্ছে। মেঘ চোখ সরাতে পারে না।
তানিশা বিরক্তি মুখে মেঘের পানে থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। হুট করে তানিশার এই পরিবর্তন মেঘের বুকে তীর ছুড়লো।মেঘের কপালে ভাজ পরল। তানিশা জোহানের পানে তাকালো।ওদের চোখে চোখে কি যেন কি কথা হলো। মেঘ সব লক্ষ্য করলো। ফাদিন মেঘকে আনমনা দেখে পিঠে চাপর দিলো। মেঘে অবুঝ নয়নে ফাদিনের দিকে তাকালো।ফাদিন হাসোজ্জল মুখে বলল -” কি ভায়া? কোথায় হারালে? ঘুমিয়ে গিয়েছিলে নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?”
মেঘ তার শুষ্ক ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে বলল-” না তেমন কিছু না। একটা জিনিস ভাবছিলাম তাই। “
ফাহিম সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল -” তা এই অসময়ে এখানে কি করছো? “
মেঘ হাসার চেষ্টা করলো। হেয়ালি স্বরে বলল -” ঘুম ভাঙলো কিন্তু পরে আর ঘুম আসছিলো না। তাই হাঁটে বের হয়েছিলাম।হাঁটতে হাঁটতে তোমাদের এই দিকে এসেছিলাম এই আরকি। “
ফাদিন মেঘের কাঁধ জড়িয়ে বললো-” ভালো করেছো। আমরাও হাঁটতে বের হয়েছি। আমাদের বিশিষ্ট অতিথিকে আমাদের গাধার রাজকুমারী এলাকা ঘুরিয়ে দেখাবে। “
মাইশা মেঘকে শুধু তানিশা সবাইকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছে এটা বলেছে। জোহানকে এলাকা দেখাতে শুনে তার হাত মুঠোয় হয়ে গেলো। মাইশার পানে শক্ত চোখে তাকিয়ে ছোট্ট করে বললো -” ওহহ।”
মাইশা নিজের দিক পরিষ্কার করতে নাক ছিটকে বললো-” যদি জানতাম এই আহাম্মকের জন্য বের হতে চাচ্ছে, আমি বিছানা থেকেই উঠে আসতাম না। “
মাইশার কথার প্রত্যত্তুরে মেঘ কোনো শব্দ ব্যয় করলো না। জোহান তানিশার পিছে দাঁড়িয়ে ছিলো এবার সে এগিয়ে এলো। মেঘের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলল -“গুড মর্নি ক্লাউড।”
-” জোহান তুমি কি হাঁটতে যাবে না?”জোহানকে মেঘের সঙ্গে কথা বলতে না দিয়ে তানিশা পিছন থেকে চেচিয়ে উঠলো। জোহান অবাক হয়ে তানিশার পানে তাকাল। জোহান থেকে বেশি অবাক, বিস্মিত মেঘ হলো। মেঘের মুখে আধার ছেয়ে গেলো।ফারহান সেদিকে তাড়া দিলো -” এই তোমরা কি এখানেই দুপুর গড়াবে? চলো না ভাই। হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে পারবে। “
তানিশা ফারহানের কাছে গিয়ে বললো-” চলো, আমরা চলতে শুরু করি। ওরা আসতে পারবে। “
ফারহান মাথা ঝাঁকিয়ে বোনের সাথে পা মিলিয়ে হাটতে লাগলো।ফাহিমও দৌড়ে এসে তাদের সঙ্গী হলো। তানিশাদের চলে যেতে দেখে ফাদিন বললো -” মেঘমালা আসো আমাদের সঙ্গে। একটু মর্নিং ওয়াক করে আসি।বুঝলে মেঘ, ছুটিতে এসে ভেবেছিলাম রাতদিন শুধু ঘুমাবো। এখন দেখো, সবই কপাল। “
-” হুমম।” মেঘ তীর্যক চোখে তানিশার মতিগতি লক্ষ্য করছে।অন্যদিনের চাইতে তার ব্যবহার অদ্ভুত লাগছে।
-“এইই তোরা আমাকে এভাবে রেখে যেতে পারিস না। আমাকে সঙ্গে নাও ওহে। না হলে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিবো। “
ফারহান দূর থেকে উত্তর দিলো -” তোমার প্লাস্টিকের বন্দুকের আমরা থুরাই কেয়ার করি। এলে আসো। ওখানে দাঁড়িয়ে বকবক করছো কেন? “
ফাদিন ফুসফুস করে বললো-” অপমান’স। এই তোমরা আসো আমি যাই।”
ফাদিন চলে যেতেই মেঘ পিছন থেকে মাইশাকে আঁটকে দিলো -” মাইশা! একটু দাঁড়া। “
জোহান ফাদিন সেখান থেকে যেতেই মাইশা শুষ্ক ঢোক গিলে বললো-” দেখ ভাই, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানতাম না।”
মেঘ চিন্তিত স্বরে বলল -” বিষয়টা ওইটা না। আচ্ছা কাল রাতে কি কিছু হয়েছে তোদের বাসায়? “
মাইশা ঠোঁট উল্টে বলল -” কই? না তো! “
মেঘ সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -” তানিশা কি কালকে ফেরার পর কিছু বলেছে? তানিশার সাথে কি কিছু হয়েছে? তোর আব্বু কি কিছু বলেছেন?”
মাইশা অভয় দিয়ে বললো-” আরে না! তেমন কিছুই হয়নি। সবকিছুই তো ঠিকঠাক আছে। তানিশাও ঠিকঠাক। “
মেঘ ঠোঁট কামড়ে ধরল। -” কিন্তু আমার এমন অদ্ভুত অনুভূতির মানে কি? মনে হচ্ছে তানিশা আমাকে ইগনোর করছে।চোখে চোখে পর্যন্ত রাখছে না। “
মাইশা ভরসা দিতে বললো-“তেমন কিছুই না মেঘ।তানিশা তোকে কেন ইগনোর করবে?আর তুই এখন এলি কি ঘাস খেতে? তানিশা তো চলে গেলো। চল, জলদি চল। “
মাইশা মেঘের বাহু ধরে দৌড়াতে লাগলো। ওই বেটা বিদেশিকে সরিয়ে মেঘের রাস্তা ক্লিয়ার করতেই হবে। মেঘ ওর সাথে শুধু পা মিলালো।তাতে মাইশা খ্যাক করে উঠলো -” জলদি হাঁটবি তুই?”
মেঘ মুখে দুষ্টু হাসি ছড়িয়ে বলল -” আমি জলদিই হাঁটছি।কিন্তু তুই চুন্নি দৌড়াছিস। আমার পায়ের হাঁটার গতি তোর দৌড়ে গতি থেকে উত্তম। “
মাইশা সামনের দিকে তাকিয়ে চোখ উল্টালো। বিরবির করে বলল -” ঘাউড়ার ঘাউরা।”
মেঘ লম্বা লম্বা কদম ফেলে মাইশাকে পাশ কে*টে যেতে যেতে বললো -” আমার কান খুব পরিষ্কার। “
-” তোর কানের গুষ্টি কিলাই।”বলে মাইশা ফাদিনে বাহু জড়িয়ে ধরল। ফাদিন তানিশার একপাশে ছিলো। তাকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললো -” ওই মেঘের বাচ্চার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। তুমি আমার সোনা ভাই। চলো আমার সঙ্গে। “
ফাদিন গোল গোল চোখে তানিশার পানে তাকিয়ে বলল -” হ্যা রেএএ গাধার রাজকুমারী। শেষ জামানা বুঝি এসে গেলো। “
তানিশার ওদের পানে একবার তাকিয়ে আবার জোহানের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হলো।এই মানুষগুলো একসাথে হলেই আজাইরা প্যাচাল পাড়েই। মেঘ যে ওর পাশে এসেছে তাতে তানিশা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো না। মেঘের মনটা হুট করে একটু খারাপ হয়ে গেলো।তানিশার পাশেটাকে ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
জোহান খাঁটি ইংরেজিতে বললো -” তো এই রাস্তা দিয়ে তুমি স্কুলে যেতে?তোমার কাছে গল্প শোনতে শোনতে রাস্তাটাও দেখো আমার পরিচিত মনে হচ্ছে। “
-” হুম।তোমাকে দেখানোর পাল্লায় পরে তো আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। নাহলে আমি এই রাস্তাটুকুও কখনো হেঁটে যাইনি। তাই না ভাইয়া?”
শেষের কথাটা বলে তানিশা পিছন ফিরে ফারহানকে কথাটা জিজ্ঞেস করল। ফারহান শুধু ‘হুম”তে জবাব দিলো। তানিশা উৎসাহ নিয়ে জোহানকে বললো -” জানো জোহান, আমি স্কুল কলেজ ভাইয়ার সাইকেল চড়েই পাড়ি দিয়েছি। আমাকে চড়াবে বলে ভাইয়া কখনো আধুনিক সাইকেল কিনতে চাইতো না। “
ফারহান নাকচ করে বললো-” উঁহু তেমন কিছু না। আমার ওসব ভালো লাগতো না বলে কেনা হয়নি। এখানে নিজের দিকে নিয়ে বড় গলায় গল্প করার কিছু হয়নি। “
-“ইসস! ঢং।”
ফারহান তানিশার মাথায় হাত রেখে তানিশা মুখ সামনের দিকে থাক করে দিলো। -“রাস্তায় চোখ রেখে হাঁট।”
তানিশা ভোতা মুখে সামনে তাকিয়ে আবার শুরু করল -” আর কত কিছু আছে। এই জোহান জানো, আমি যে ভাইয়ার সাইকেলের পিছন সিটে বসতাম। তখন ভাইয়া স্কুলের সাদা ইউনিফর্মের কোমড়ের অংশটুকু শক্ত করে ধরতাম। ভাইয়ার পুরো শার্টটা টিপটিপ গুছানো থাকতো শুধু কোমড়ের দিকটা কুঁচকানো। আমাদের সবার এক স্কুল ড্রেস দিয়ে যদিও কোনোরকমই একবছর চলেই যায়। আমার বদৌলতে ভাইয়া বছরে দুইটা ইউনিফর্ম লাগতো। যেই জায়গায় ধরতাম একদম জান শপে ধরতাম কিনা। দুইদিন পর পর ছিড়ে যেতো। হা হা। “
ফারহান বিরক্ত হয়ে বলল -” কি সব আজাইরা প্যাচাল? “
ফাহিম মনোযোগ দিয়ে তানিশার কথা শুনছিল। তানিশা যখন কথা বলে তখন তার মনে হয় একটা পাখি চিও চিও করছে। শুনতে ভালো লাগে। ফারহানকে ব্যাঘাত ঘটাতে দেখে সে অতি বিরক্ত মুখে বলল -” তুই মুখ বন্ধ কর না। আজব! এখন কি মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নিবি। “
ফারহান হতবাক হয়ে বলল -” আমি তা কখন বললাম? “
জোহান ওদের অবস্থা দেখে বললো -” তুমি কথা বলো প্রিন্সেস। তোমার ভাইগুলো ঝগড়া করে নিক। “
তানিশা মুচকি হাসলো জোহানের কথা শুনে। -” তুমি দেখি দুইদিনে আমার ভাইদের চিনে ফেলেছো।”
-“বুঝতে হবে না আমিটা কে?”
তানিশা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো। মেঘের রাগের পারদ আরোও বাড়লো। নিজেকে কেমন এই দুটো মানুষের পাশে অদৃশ্য মনে হচ্ছে। তানিশা একবারও তার পানে ফিরে দেখছে না। অথচ তার মুগ্ধ দৃষ্টি তানিশার দিক থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও সড়েনি। মেঘ এতো অসহায় এই জীবনে কখনও ছিল কিনা ভেবে পেলো না। এতোগুলো মানুষের মাঝে থেকেও শূন্যতা ঘিরে ধরছে তাকে।
তানিশা সামনে হেঁটে যাওয়া মাইশাকে ডেকে বললো-” এই আপু, এবার শ্রাবণেও কি ঝুম বৃষ্টি হবে না? আসার পর থেকে এখনও আকাশ কালো মেঘে ঢেকে ঝুম বৃষ্টি হলো না। আমি আমাদের বৃষ্টিতে জোহানকে বৃষ্টি বিলাশ করিয়ে ছাড়তাম। “
মাইশা নাক মুখ কুঁচকে তাকালো তানিশার দিকে। বিদেশিটাকে নিয়ে এতো আদিখ্যেতা তার সহ্য হয় না। খ্যাক করে বললো -” আমি এবার বৃষ্টিতে নিষেধাজ্ঞা জারির করেছি। এই বিদেশি পাডাকে বৃষ্টি যদি দেখা দেয়। তাহলে আমি ওরে জেলে ভরবো। “
তানিশা মুখ কালো করে বললো -” আজিব!”
মেঘ তানিশার পাশে পাশে হেঁটে স্কুল পর্যন্ত এলো। তানিশা অতি উৎসাহ নিয়ে সবকিছুর বর্ননা জোহানকে দিলো তা দেখলো। মেঘের বুকে ক্ষীণ ব্যাথার আভাস শুরু হলো। মেঘ স্কুল এন্ড কলেজের গেইটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।মেয়েটা নিজের স্কুলের সব স্মৃতি জোহানকে বলছে। মেয়েটা কি জানে। এই কলেজের সামনে ওকে নিয়ে মেঘের কতশত স্মৃতি আছে। জানে না। মেয়েটাকে জানানোই হয়নি যে। মেঘ হঠাৎ তার পা থামিয়ে নিলো। তানিশা, জোহান পরে ফারহান, ফাহিম। একে একে চলে গেলো তাকে রেখে। মেঘ সেখানে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো ওদের পানে। যখন ঘুরে চলে আসবে তখন পিছন থেকে মাইশার চেচামেচি শোনে দাঁড়ালো।
মাইশা পিছন ফিরে মেঘকে চলে যেতে দেখে ডেকে ওর কাছে এগিয়ে এলো। -” কি রে চলে যাচ্ছিস কেন? “
মেঘ নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে স্মিথ স্বরে বললো -” মেয়েটা কেন আমাকে এতো অবহেলা করছে বলতো? আমার বুক ক্ষতবিক্ষত করে মেয়েটার কি স্বস্তি বলতে পারিস? “
মাইশা ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল -” তানু তোকে অবহেলা করছে তা কেন মনে হলো তোর? তেমন…. “
মাইশার কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললো -” আমাকে তুই মিথ্যা স্বান্তনা দিস না। এই জিনিসটা আমি চাচ্ছি না আপাতত। অবহেলা অনুভব করা যায় মাইশা।আমি জানি তা তুইও উপলব্ধি করতে পারছিস। তোকে আমি তানিশার এই পরিবর্তন দেখে বলেছিলাম না? আসলে আমি এমনটা চাই। “
-” হ্যা।”
-” সত্যি বলতে আমি এমনটা চাচ্ছি না।আমি সেই তানিশাকেই চাই। যার চোখে, যার চোখে একটু হলেও আমি ছিলাম। এখনকার তানিশার চোখে আমি কোনো অনুভূতি দেখতে পাই না। ওই ছেলেটার প্রতি যেমন দেখি, তেমনটাও না। তুই কি তেমন কিছু খেয়াল করিস? “
মাইশার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। বাসায় কিছু হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে ছিলো যখন তখন মাইশার রাতের কথাটা বলতে ইচ্ছে করছিলো। রাত দুইটা তিনটার দিকে একবার রুম থেকে বের হয়েছিল মাইশা । তখন তানিশা জোহানকে নিয়ে বারান্দায় বসেছিলো। তানিশা কি করছে তা বুঝতে পারেনি সে। তানিশা বেতের সোফায় পা তুলে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছিলো। পাশে জোহান একনাগাড়ে ইংরেজিতে কিছু বলে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছিল ভীষণ রেগে আছে সে। মাইশা সেদিকে পা বাড়িয়েও থেমে গিয়ে ছিলো।জোহান তার সত্তাকে উপলব্ধি করতে পেরে তখন কথাই থামিয়ে দিয়েছিলো। মাইশার মনে হলো এটা বলেনি ভালোই করেছে সে।
মেঘ হতাশ হয়ে সামনের দিকে তাকাল। তানিশা হেসে হেসে জোহানকে কিছু একটা বলছে।জোহানের মুখেও হাসি লেপ্টানো। মেঘ স্মিথ স্বরে শুধালো -“এই ছেলেটা কি সত্যি ওর বন্ধু? আমি ভাবতে পারি না রে। আমি যাই। এখানে থাকলে আমাকে দিয়ে একটা অঘটন ঘটে যাবে। ওর অবহেলা আমি সহ্য করতে পারবো না। “
-“তুই আশাহত হচ্ছিস কেন? ও তো তোরই। “
মেঘের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো -“আমার আপন আমার দিকে তাকাও না। “
বলে মেঘ পিছন ফিরে চলে যেতে শুরু করল।মাইশার নাক লাল হয়ে গেলো। ঢোক গিলে নিজেকে থামাতে চেষ্টা করল। মেঘ আবার কি মনে করে পিছন ফিরে হাসি ভর্তি চেহারায় মাইশার পানে তাকালো। লম্বা লম্বা কদম ফেলে মাইশার সামনে এসে দাড়িয়ে মাইশার মাথার উপর একটা হাত রাখলো।হালকা ঝুঁকে মাইশার মুখমুখি হলো।-“এতো মনখারাপ করতে হবে না চুন্নি।সি ইজ মাইন।আর তা আমি আর কাউকে নিয়ে যেতে দেবো না। কারো বাপেরও সাহস নেই ওকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবার। “
বলে চোখ মারলো মাইশাকে। মাইশার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটলো। মেঘ মাইশার চুল এলোমেলো করে দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে চলে গেল। মাইশা ব্যথিত নয়নে চেয়ে তাকলো মেঘের যাওয়ার পানে।তানিশার প্রতি নাখুশের পাল্লায় আর ভেতরকার স্ফূলিঙ্গে আরেকটু হাওয়া লাগলো। শুধু মেয়েটাকে অত্যাধিক ভালোবাসে বলে কিছু বলতে পারছে না।
**********************
দুপুরে রাইশার আগমন ঘটছে মর্তুজা বাড়িতে। তখন থেকে বাড়ির সরগরমই অন্য রকম। রিদান রাশাকে পেয়ে আইয়াজও যেনো খুশিতে আত্মহারা। চাচাদের কোল থেকে কিছুক্ষণ পরপর হাত তালি দিচ্ছে। রিদানরা বাসায় এলে ফাদিনের বাদাইমা কাজ কারবারের সঙ্গী জুটে।বাড়ির কেউ তার সঙ্গ না দিলেও বোনের আণ্ডাবাচ্চাগুলো ভালোই সঙ্গ দেয়। তাই সব মামাদের মধ্যে বাচ্চাদের ফাদিন বেশি পছন্দের। ফাদিন ছুটি এসেছে আর এই কথা ওদের কানে গেছে মানেই মা বাবার জীবন শেষ।
নানাবাড়িতে আসতেই হবে যে করেই হউক। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এই যাতায়াত রাইশার কাছে অনেক কষ্টকর লাগে। আবার না এলেও শান্তি নেই। তানিশা কিচেনের থাকে বসে চাচি চাচাতো বোনের পরিবারে ঘুটঘুটি শুনলো কিছুক্ষণ। রাইশা ফর্সা গায়ে একটা বেবি পিং কালারের কারুকাজ খচিত শাড়ী পরেছে। দুহাতে সোনার চুরি,গলায় স্বর্ণের লকেট। মুখে হালকা প্রসাধনী। একদম নতুন বউ বউ। কেউ দেখলে বলবে মাত্রই কিছুদিন হলো বিয়ের বিয়ে হয়েছে। অথচ সে দুই বাচ্চার মা। জামাই বুড়ো হবে তবু বউ ঠিক ইয়াং রয়ে যাবে। তানিশা কথাটা ভেবে নিজে নিজে একটু কল্পনা করলো। তোফায়েলকে বুড়ো হলে কেমন লাগবে। ভেবে তেমন একটা খারাপ লাগলো না। বেটার চেহারা সুরত মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। তানিশা নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হলো। লাফ দিয়ে থাক থেকে নেমে গেলো।
ড্রাইনিং রুমে আসতেই দেখতে পেলো ফাদিনকে বাচ্চারা কি যেন একটা বললো। ফাদিন মুখ কুঁচকে জান বাঁচিয়ে চলে গেলো। তানিশা ঠোঁট বাকি বিরক্তি প্রকাশ করলো। এই লোকটা বাচ্চাদের নিয়ে নাচলেও বাচ্চাদের সামলাতে পারে না। নাচিয়ে কাদিয়ে চলে যাবে পরে তা ফারহানকে সামলাতে হয়। তানিশা যা ভাবলো তাই হলো। রিদান ফাদিনকে ছেড়ে দৌড়ে ড্রাইনিং রুমে আইয়াজকে কোলে নিয়ে দাড়ানো ফারহানে কাছে এলো। কিন্তু এসে ঘটলো আরেক বিপত্তি। ফারহান রাশাকে রাইশার কাছে দেওয়ার জন্য এসেছিল। একসাথে দুজনকে কোলে নিতে পারছে না সে। আইয়াজ কেলো,তাকে নামাতে পারছে না। সে নেমে গেলে যদি ছোট চাচ্চু এই পচিকে কোলে নিয়ে নেয়। আর ওই দিকে রাশার মতে ছোট মামা তাকে কোলে নিবে এই আইয়াজকে না।রিদান নিজের বোনের মনোভাব বুঝেতে পেরে ফারহানের শার্টের কোণ ধরে টানছে। ফারহানের চেহারায় অসহায়ত্ব ছেয়ে গেলো।
ফারহানরে দৃষ্টি হঠাৎ তানিশার দিকে পরলো।তানিশাকে মিটিমিটি হাসতে দেখে ধমকে বললো -” এই এই দিকে আয়। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্যালানো হচ্ছে তাই না? “
তানিশা মেকি ভোতা মুখ নিয়ে রাশাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কোলে নিলো। কিন্তু রাশার হাতের চিপসের প্যাকেটে হাত ঢুকিয়ে তানিশা দন্ডনীয় অপরাধ করে ফেললো। রাশা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো। তানিশা মুখ চেপেও থামাতে পারলো না। পরে দৌড় দিলো কিচেনের দিকে। রাইশা জিজ্ঞেস করল -” কি হয়েছে? কি হয়েছে? “
রাশা হিচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল -” তালামুনি আমাল তিপ খেপেছে।”
তানিশা রাশাকে রাইশার কোলে চাপিয়ে দিলো। রাইশা চেচিয়ে উঠলো -” এই তুই কাঁদিয়েছিস তুই শান্ত কর। “
তানিশাকে ভাগতে দেখে রাইশা চেচিয়ে আসফিয়াকে বললো-” আম্মুওওওও তোমার মেয়ে আমার মেয়েকে কাঁদিয়ে দিয়েছে। ওকে বলো নিজে ওর কান্না থামাতে। আমি বাপের বাড়িতে শান্তিতে থাকতে এসেছি। “
আসফিয়া অতিষ্ট হলেন।নিজের বাচ্চাকাচ্চা সামলাবেন না বাচ্চাকাচ্চাদের বাচ্চাকাচ্চা সামলাবেন। তিনি তানিশাকে শক্ত গলায় বলে উঠলেন -” তানিশা ওকে নিয়ে যা। “
আসফিয়া খাতুনের কন্ঠ এভাবে শোনে তানিশার আত্মা শুকিয়ে গেল।ছোটবেলার ভয়। মা চাচিদের মধ্যে আসফিয়াই তাদের শাসন করেছেন বেশি। সুলতানা হায়দারকে করতে হয়নি। ওনার উপস্থিতিই ভয়ংকর। তানিশা পিছন ফিরে আবার রাশাকে কোলে নিলো। রাশা এখন কাঁদছে চিপছের বিরহে। তানিশা রাশাকে নিয়ে বের হয়ে গেলো কিচেন থেকে। মানজুম আরা হাতের কাজ রেখে উঠে দাড়ালেন। আসফিয়াকে বললেন -” এই মেয়ে রাশাকে আবার তোফায়েলকে গছিয়ে দিয়ে আসবে। এই মেয়েটা কি একটু বদলাবে না।”
মানজুম আরার কথা মতোই তানিশা তোফায়েলকে খুজতে খুজতে বাগানে গিয়ে পেলো। রাশাকে তোফায়েলের কাছে গছিয়ে দিয়ে বললো -” আপনার আণ্ডাবাচ্চা আপনি সামলান। “
পিছন থেকে মানজুম আরা তানিশার পিঠে চাপর দিয়ে চোখ দিয়ে শাসালেন। তানিশা দৌড়ে পালালো। মানজুম আরা তোফায়েলের কোল থেকে রাশাকে নিয়ে নিলেন। মাইশা উদাস মনে তানিশার বাচ্চামো দেখলো। এই প্রথম আগেকার রুপে ফিরে এলো বোধহয় মেয়েটি। না হলে এমন চেহারা তো তার বিলীনের পথে। মাইশা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোহানের কথা মেয়েটাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করবে। এখন আবার ভাবছে এই খনিক্ষের সময়ে আগের তানিশাকে অস্বস্তিতে ফেলবে কিনা।
চলবে………..