Writer:DRM Shohag
“বয়স হয়েছে আমার। তোর আব্বুর চুলেও পাক ধরেছে। এখন আমাদের নাতি-নাতনীদের নিয়ে সময় কাটানোর বয়স। অথচ তাদের চেহারা দেখা তো দূর, এখনো ছেলের বউ এর মুখ দেখাই কপালে জুটলো না।”
একরাশ হতাশা নিয়ে কথাগুলো বললেন ছেলের উদ্দেশ্যে পারভীন বেগম।
“আম্মু আমি কী একবারো বলেছি যে আমি বিয়ে করবনা?”
“কবে করবি হ্যাঁ? নিজের পছন্দ থাকলে বল, তাও তো বলিস না! এইবার আমার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে না করে কীভাবে বাড়ি থেকে দুই পা তো দূর, এক পা ও বের করিস সেটাই আমি দেখব!”
পারভীন বেগমের কথায় রওশন মায়ের দিকে বিরক্তি ভরা চাহনিতে তাকিয়ে রইল। ছুটিতে বাড়ি আসলেই এই এক টপিক নিয়ে কথা বলতে বলতে আম্মু তার কান ঝালাপালা করে দেয়। সে মায়ের কথায় কান না দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল।
পারভিন বেগম ছেলের গা ছাড়া ভাব দেখে আরো তেতে উঠলেন। অতঃপর ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন,
“বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুুত কর। এবার আমি আর কোনো বাহানা শুনবনা। আজ বিকেলে মেয়ে দেখতে যাব। তোর আব্বু খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আমাকে যেন আর বলতে না হয়।”
এই বলে পারভিন বেগম ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রওশন মায়ের কথা শুনে বিস্ময়ান্বিত।
তাকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করে মেয়ে দেখতে যাবে? কোন মেয়ে? কোথাকার মেয়ে?
আম্মু-আব্বু করতে চাচ্ছে টা কী? সে যথেষ্ট বুঝদার একজন ছেলে। আব্বু-আম্মু কী আমায় এখনো সেই ১০ বছরের বাচ্চা ভাবছে?
এভাবে ধরে বেঁধে বিয়ে দেয়ার কোনো মানে হয়?
সে তো বলেনি, কোনোদিন বিয়ে করবেনা।
সবে অনার্স শেষ করল। মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে।ঢাকায় বাবার গার্মেন্টস আছে। পড়াশুনার সুবাদে তার ঢাকায় থাকা।
বাবার পাশাপাশি সেও টুকটাক দেখাশোনা করে গার্মেন্টস এর। আব্বু-আম্মু দুজনেই তাকে গার্মেন্টসের দায়িত্ব বুঝে নিতে বলে।
কিন্তুু তার ইচ্ছে নিজ উদ্যোগে বাইকের শো-রুম দেয়া। অথচ তার বাবা-মা বুঝতেই চাচ্ছেনা।
বিদ্বিষ্ট হয়ে ল্যাপটপ রেখে শুয়ে পড়ল। কিছু ভালো লাগছেনা।
ঢাকা ভার্সিটি পড়াশুনা করায় মেয়েদের বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেনা। ভার্সিটির সবচেয়ে ভদ্র মেয়েটাও চিপা গলি থেকে বের হয়।
এসব দেখে কীভাবে বিশ্বাস করবে! সেই থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, গ্রামের সহজ-সরল মেয়েকে বিয়ে করবে, খুব ভালো করে খোঁজ -খবর নিয়ে তবেই কবুল বলার প্রস্তুতি নিবে। তার মা যে কেমন মেয়ে দেখাতে নিয়ে যাবে তা নিয়েই রওশন চিন্তিত।
★★
মিজানুর রহমান গায়ে পাঞ্জাবি জড়িয়ে, আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করতে ব্যস্ত। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে, নিচু হয়ে পায়জামা গিরার উপর পর্যন্ত ভাঁজ করল। আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আরেকবার নিজের প্রতিবিম্বের উপর চোখ বোলাল। নিজেকে মন মতো সাজিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে নিজ স্ত্রীর পানে তাকালেন।
কোমরে এক হাত রেখে তার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ওমন আগুন চোখ দেখে মিজানুর রহমান ভড়কে গেলেন। একটু আগেও তো বউ তার ঠাণ্ডা ছিল, হঠাৎ গরম বউ-এ রূপান্তরিত হলো কেন বুঝল না।
থমথমে কণ্ঠে পারভিন বেগম প্রশ্ন করল,
“কার জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছি?”
মিজানুর রহমান বউ এর কথা শুনে কনফিউজড হয়ে গেল। ভাবল ছেলেই একমাত্র বউহীন। তার ছোট ভাইদের তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে। রওশন এর মামারাও সব মিঙ্গেল। ভাবনা রেখে সুপ্রসন্ন হেসে জবাব দিল,
“আমাদের ছেলে রওশন এর জন্য দেখতে যাচ্ছি, কেনো বলো তো? তুমিই তো সকালে আমাকে বললে। এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে? তোমার তো বয়স কমই আছে। এতো তাড়াতাড়ি ভুলতে শুরু করলে?”
পারভীন বেগম ঝড়েরবেগে স্বামীর কাছে গিয়ে টেনে পাঞ্জাবির হাতা নামিয়ে দিলেন। অতঃপর রুক্ষ কণ্ঠে বললেন,
“বয়স চোরা কোথাকার! তোমায় দেখে কেউ বিশ্বাসই করবেনা যে তোমার ঘরে বিয়ের বয়সী একটা ছেলে আছে। সবাই ভাববে তোমায় নকল বাপ সাজিয়ে মেয়ে দেখতে গেছি। বুড়োদের মতো করে সেজে যেন ঘর থেকে বের হতে দেখি এই বলে দিলাম।”
মিজানুর রহমান তার স্ত্রীর কথা শুনে তব্দা খেয়ে চেয়ে রইল। সে বুড়ো সাজবে কীভাবে? বুড়ো হওয়ার মেকাপ তো কেনা হয়নি তার।
অসহায়ভাবে তাকাল পাঞ্জাবির হাতাদুটোর দিকে। বউ তার নিজ দায়িত্বে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। অন্যসব স্বামী-বউ কোথাও যাওয়ার আগে, বউরা তাদের স্বামীকে মনের মতো করে সাজায়। আর তার এক পিস বউ নিজ দায়িত্বে তাকে এলোমেলো করে তবেই দরজার বাইরে পা রাখে। এসব ভেবে সে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর বলল, “বুড়ো কীভাবে সাজব?”
পারভীন বেগম ব্যস্ত পায়ে এসে স্বামীর মুখোমুখি দাঁড়ালো। পা দুটো সামান্য উঁচু করে মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। অতঃপর স্বামীর হাত ধরে হাঁটা দিল রওশনকে ডাকতে।
মিজানুর রহমান ছেলের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে উচ্চস্বরে ডাকলেন,
“রওশন? আব্বু তাড়াতাড়ি এসো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেও তারা ছেলের কোনো সাড়াশব্দ পেলনা। পারভীন বেগম রেগে বলল,
“ছেলেকে তোমার মতো ঘাড়ত্যাড়া বানিয়েছো, এখন সামলাতে হয় আমাকে।”
এই বলে ছেলের ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
পারভীন বেগম এর কথায় মিজানুর রহমান বোকা চোখে বউ এর প্রস্থান দেখল। দুঃখী দুঃখী মুখ করে নিজের মনে আওড়াল,
“বউ বাধ্য বর হয়েও এই ছেলের জন্য আমাকে অবাধ্য বরের উপাধি পেতে হচ্ছে। ছেলে শোনেনা মায়ের কথা, বিনিময়ে আমি হয়ে যাই ঘাড়ত্যাড়া।”
পারভীন বেগম ঘরে গিয়ে দেখল ছেলে তার আরামে ঘুমাচ্ছে। ছেলের উপর বিরক্ত হলেন। বিড়বিড় করলেন,
“এক নাম্বার ঘাড়ত্যাড়া হয়েছে। আমার হয়েছে যত জ্বালা।”
বাহুতে হাত রেখে কয়েকবার ডাকলেন। রওশন মিটমিট করে চোখ খুলে বোঝার চেষ্টা করল কী হয়েছে। মাকে ঝাপসা চোখে দেখে কপালে ভাঁজ ফেলল। তারপর উঠে বসল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“কী হয়েছে আম্মু? এভাবে ডাকছ কেন?”
ছেলের মুখে এ কথা শুনে ক্ষুব্ধ হলেন পারভীন বেগম। সকালে কী সুন্দর করে বলে গেল মেয়ে দেখতে যাবে। আর এই বেয়াদব ছেলে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে, আবার উঠে বলছে কেন তাকে ডাকা হয়েছে।
অতঃপর রওশনের উদ্দেশ্যে রাগত স্বরে বললেন,
“এতো বড় হয়ে আমার হাতে মার খেতে না চাইলে চুপচাপ রেডি হয়ে নে।”
রওশন ঘুমানোর আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, সে মেয়ে দেখতে যাবেনা। বিয়ে করার জন্য তার আরেকটু সময় চাই। মেয়ে হলে এতোক্ষণ কেঁদে ভাসাত। ছেলে হওয়ায় ঠিকঠাক কাঁদতেও পারছেনা। কে যেন বলেছিল, ছেলেদের কাঁদতে নেই।
অতঃপর তার আম্মুকে বোঝানোর স্বরে বলল,
“আমি যাবনা আম্মু। আমার আরেকটু সময় প্রয়োজন। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাদের পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করব। আমাকে আর দুই-তিনটা বছর সময় দাও প্লিজ! একটু বোঝার চেষ্টা কর !”
“তুইও বোঝার চেষ্টা কর, আমার আর তোর আব্বুর নাতি-নাতনীদের সাথে খেলা প্রয়োজন। আমাদের তো বয়স হচ্ছে বাবা। আমরা কী সারাজীবন বাঁচব বল?”
মায়ের কথা শুনে রওশনের কিছুটা মন খারাপ হলো। তার মা ইমোশনাল কথা বলে কাজ হাসিল করে নেয়। একটু ভেবে বলল,
“আম্মু বেকার ছেলেকে কোন বাবা-মা মেয়ে দিবেনা। আমাকে একটু সময় দাও! আমি নিজের কোম্পানি টা দাঁড় করাই, একটা ভালো পজিশনে যাই, কথা দিচ্ছি তারপর তোমাদের পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করব। আমি বাবার টাকায় বসে বসে খেতে চাইনা আম্মু।”
“বসে খেতে না চাইলে শুয়ে শুয়ে খাবি।
আর তোর বাবার যা আছে তা খেয়েই শেষ করতে পারবিনা। মাথা থেকে এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেল।
বেকার ছেলেকে দিয়ে মেয়েকে বিয়ে দেবে কি-না সেই ভাবনা তোর নয়। আমরা আছি এসব ভাবার জন্য। এখন চুপচাপ রেডি হয়ে নে। আমি আর তোর আব্বু অপেক্ষা করছি। দ্রুত যা।”
রওশন হাল ছেড়ে দিল। তার বাবা-মা যে তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য আটঘাট বেধেই নেমেছে , তা বুঝতে পারল। হাজার অনীহা থাকা সত্ত্বেও কোনোরকম রেডি হয়ে বের হলো বাবা-মার সাথে।
~~~~~~
রওশন অনুরক্তহীন ভাবে বসে আছে তার বাবার পাশে। সামনের সোফায় লাল শাড়ি পরিহিত নাক পর্যন্ত ঘোমটা টানা এক মেয়ে লাজুক মুখশ্রীতে বসা। মুখ দেখতে পাওয়া দুষ্কর।
পারভীন বেগম ধীর পায়ে পাত্রীর পাশে গিয়ে বসলেন। মাথার ঘোমটা সরিয়ে থুত্নী উঁচু করে মিষ্টি হেসে বললেন, “মাশাআল্লাহ”
রওশনের এর মধ্যে বিন্দুমাত্র আগ্রহের দেখা নেই মেয়ের মুখ দেখার। মায়ের কথায় একপলক লাল শাড়ি পড়া মেয়েকে দেখল। মাথা নিচের দিকে নামিয়ে রেখেছে এমনভাবে যে থুতনি একদম গলার নিচে গিয়ে ঠেকেছে।
রওশন বুঝল না এতো লজ্জা পাওয়ার কী আছে। অপছন্দ হওয়ার মতো মেয়ে না। তবে আপাতত তার এসবে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
মনে মনে আওড়াল,
“এতোই যখন লজ্জা, এই মেয়েকে পাত্রপক্ষের সামনে আসতে কে বলেছিল? এই মেয়ে রাজি না হলেই তো সে বিয়ে নামক প্যারা থেকে বেঁচে যেত। অসহ্য!”
★★
বাবার কথায় অবাক নয়নে তাকাল রওশন তার আব্বুর পানে। সে দেখতেই আসতে চাচ্ছিলনা। সেখানে এখনই নাকি বিয়ে পরিয়ে দিবে!
পাশ থেকে তার বাবা তার কানের কাছে ধীরস্বরে বলল,
“তোমার কী মত আব্বু?”
রওশন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আরো দুই-চারটা বিয়ে দিলেও আমার কোনো সমস্যা নেই আব্বু। আমি দুই পায়ে রাজি।”
মিজানুর রহমান ছেলের কথায় কৌতুকস্বরে বলল,
“আপাতত একটা কর। তুমি তোমার স্ত্রীকে সামলাতে পারলে, তাকে মানাতে পারলে আমাদের আরো কয়েকটা পাএী দেখতে কোনো সমস্যা নেই আব্বু।”
রওশন তার আব্বুর কথায় পাত্তা না দিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
“আব্বু তোমরা আমাকে একটু বুঝ! আমি তো এই মেয়েকে ঠিক করে চিনিইনা।
চিনিনা জানিনা হুট করে কীভাবে একটা অচেনা মেয়েকে বিয়ে করব বলো? একটু সময় দাও আমায় তোমরা! একটু বোঝার চেষ্টা করো!
তার বাবা মজার ছলে বলল,
“তুমিও বোঝার চেষ্টা করো আব্বু নাতি-নাতনীদের ছাড়া আমি আর তোমার আম্মু দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছি।”
অতঃপর ছেলেকে বোঝানোর স্বরে বলল,
“আমি আর তোমার আম্মু চিনি মেয়েকে। খুব ভালো করে খোঁজ -খবর নিয়েছি। অনেক ভদ্র মেয়ে। শালীনতাসম্মত একটা মেয়ে দিচ্ছি তোমায়। কোথায় আমাকে আর তোমার আম্মুকে ধন্যবাদ দিবে, তা না করে আপত্তির পর আপত্তি করছ।”
রওশন সব আশা ছেড়ে দিল। আব্বু-আম্মুকে কিছু বলে লাভ নেই। মেয়েটার উপর রাগ হচ্ছে এখন। কীভাবে অচেনা-অজানা একটা ছেলেকে বিয়ে করতে ঢেং ঢেং করে রাজি হয়েছে।
আজ খুব করে একটা বড়ভাই অথবা ছোট বোনের অভাববোধ করছে রওশন। বড়ভাই বা ছোটবোন থাকলে তাদের জন্য সে আরেকটু বিয়ের সময় পতো তাদের সিরিয়াল আগে দিয়ে। কিন্তুু সে তো একা। মনে মনে আফসোসের সুর টানল।
মিজানুর রহমান গলা ঝেড়ে মেয়ের বাবার উদ্দেশ্যে বলল,
“তাহলে কাজি ডাকুন ভাই। আমরা তৈরী।”
আনিসুর রহমান খুশি হয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলল। মেয়েটাকে নিয়ে সবসময় টেনশনে থাকত। এতো বড় ঘর থেকে প্রস্তাব আসায় এক কথায় রাজি হয়ে যায়। খোঁজ-খবর নিয়েছে। ছেলে ভালো, ভদ্র। কোনো দোষ চোখে পরেনি। সবকিছু বিবেচনা করে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করেই ঘটককে সম্মতি দিয়েছিলেন।
রওশন কিছুক্ষণ ভাবল একটা বিষয় নিয়ে। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে মেয়ে। তার থেকে মোটামুটি বয়স পাঁচ এর গ্যাপ। তবে বছর দুই পরে এডমিশন দিবে নিশ্চয়ই। চান্স হলে পাবলিক ভার্সিটিতে পড়তে যাবে। প্রতিটা ভার্সিটি তার কাছে অসুস্থ পরিবেশ লাগে। তার বউকে ওমন পরিবেশে পাঠানোর কথা ভুলেও ভাবেনা। জীবনে একটা প্রেম করলনা। বউ এর জন্যই জমা রেখেছে সব অনুভূতি।
নিজে কিছু করে তারপর বিয়েটা করতে চেয়েছিল। আব্বু-আম্মুর জন্য তা আর হলোনা। ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে হালকা কেশে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার একটা শর্ত আছে।”
ছেলের কথায় পারভিন বেগম, মিজানুর রহমান দুইজনই ভ্রু কুঁচকে তাকাল ছেলের পানে। এ আবার কী শর্ত দিবে কে জানে। এই ভেবে দুজনের কপালে চিন্তার ভাজ পরল।
সাইমা ঘোমটার ভিতর থেকে চোরা চোখে চাইল রওশনের পানে। ভাবল আসার পর থেকে কোনো কথা বললনা। গোমড়ামুখে বসে ছিল এতক্ষণ। বিড়বিড় করল,
“গোমড়ামুখো একটা”
নেহাৎ বাবা-মার বিরুদ্ধে যাবেনা। নয়তো এই গোমড়ামুখোকে দেখেই বিয়ে করার শখ মিটে গেছে তার। দেখতে সুদর্শন হওয়ায় পছন্দ হলেও এমন পেঁচামুখো মানুষকে তার পছন্দ নয়।
শর্তের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো।
“ভবিষ্যৎে পাবলিক ভার্সিটিতে পড়তে পারবেনা মেয়ে। ন্যাশনাল কলেজ থেকেই অনার্স করতে হবে।”
রওশনের এর কথা শুনে আনিসুর রহমান হেসে বলল,
“তোমরা যা চাও বাবা তাই হবে ইনশাআল্লাহ।”
রওশন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক একটা ব্যাপার তো মন মতো হচ্ছে এই শান্তি।
ঘোমটার আড়ালে থাকা রমনীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার কতো স্বপ্ন ছিল সে পাবলিক ভার্সিটিতে পড়বে। স্বপ্নের ভার্সিটি ঢাকা ভার্সিটিতে এডমিশন নিবে। এই গোমড়ামুখো বিয়ে না করতেই তার স্বপ্নের মাঝে বা হাত ঢুকিয়ে দিল।
মনে মনে ফুসল। এই লোককে দেখে নেবে।
★★
খুবই সাদামাটাভাবে বিয়ে হলো সাইমা-রওশনের।
বিয়ের আগে সাইমা ঘরে গিয়ে তার মাকে বলেছিল,
“আম্মু আমি ভার্সিটিতে পড়তে চাই, আব্বুকে বুঝিয়ে বলো। আর ওই ছেলে ভালো না আম্মু। আমি দেখেই বুঝেছি। দেখলেনা কেমন পেঁচার মতো মুখ করে রাখে!”
সাইমার এর কথা শুনে আনজু বেগম রেগে বললেন,
“থাপ্পড় খাবি একদম। তোর আব্বু খোঁজ-খবর নিয়েই এগিয়েছে। ছেলে যথেষ্ট ভদ্র।”
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল স্বরে বলল,
“মন খারাপ করিস না মা। দেখবি অনেক সুখী হবি। আমাদের তো কারি কারি টাকা নেই। এই বিয়েতে অমত করিস না মা!”
সাইমা নিশ্চুপ হয়ে মায়ের কথা শুনল। অতঃপর মুখে মিথ্যা হাসি ফুটিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। মৃদু হেসে বলল,
“আমি জানি আম্মু তোমরা যা করবা তাতেই আমার মঙ্গল।”
মেয়ের কথায় স্বস্তি পেল আনজু বেগম।
আজই যেতে হবে এই বাড়ি থেকে, ভেবে মন ভাড় হলো সাইমার।
মেয়ের কপালে আলতো চুমু আঁকল আনজু বেগম। ঝাপসা হলো চোখ। তবে তা মেয়ের থেকে আড়াল করতে দ্রুত ঘর থেকে বের হলো। যেন মায়ের কত তাড়া মেয়ের থেকে পালানোর!
সাইমার চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো। তবে তা অযত্নেও মোছার প্রয়োজন মনে করলনা। কাতর চোখে মায়ের পালানো দেখে গেল শুধু।
ভাবনার জগৎ থেকে বেরোলো সাইমা। গাড়ির ভিতর থেকে একবার বাইরে চাইল, চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। আবার কবে আব্বু-আম্মুকে দেখবে কে জানে। ছোট বোন সামিয়া ছাড়া কখনো থাকা হয়নি কোথাও গিয়ে। এতো আপন মানুষগুলোকে ছেড়ে অপরিচিত জায়গায় অপরিচিত মানুষ গুলোর সাথে মানিয়ে নিতে পারবে তো?
~~~~~~~~~~~~
“শাড়ি চেঞ্জ করে এসো। ওজু করে এসো একেবারে। ২ রাকাত নফল পড়ব একসাথে।”
রওশনের কথায় সাইমা চোখ তুলে চাইল। নিরবে বিছানা থেকে নেমে নিজের ব্যাগ থেকে কাপড় নিয়ে বাথরুমে গেল নিঃশব্দে।
এশার নামাজ পরে দুইজন একসাথে দুইরাকাত নফল নামাজ পড়ল। অতঃপর সাইমার দিকে ঘুরে বসল রওশন।
সাইমার এর মুখের আদল নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করল। মেয়েটার গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা। চোখ দুটো ভীষণ সুন্দর। অতিরিক্ত কান্না করায় চোখ-মুখ হালকা ফুলে আছে। মলিন মুখখানায় যেন আল্লাহ মায়ার সাগর ঢেলে দিয়েছে।
যখন প্রথম দেখল তখন তো এতো সুন্দর লাগেনি মেয়েটাকে! কবুল এর বুঝি এতো জোর! কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মেয়েটাকে কত আপন লাগছে! একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে সাইমার এর দিকে তাকিয়ে রইল।
রওশনের এভাবে তাকানোয় সাইমা খানিকটা বিব্রতবোধ করল। অতঃপর গলা ঝেড়ে বলল,
“কিছু বলবেন?”
রওশন সাইমার দিকে তাকিয়েই মুচকি হাসল। রওশন এর হাসি দেখে সাইমা বিস্মিত নজরে চেয়ে রইল। অস্ফুটস্বরে বলল,
“আপনি হাসতেও পারেন?”
সাইমার এর কথায় রওশন শব্দ করে হেসে দিল। অতঃপর কৌতুকস্বরে বলল,
“বউ এর হাওয়া লেগেছে গায়ে। তাই হাসি সরছেনা ঠোঁট থেকে।”
বউ বলায় সাইমা খানিকটা লজ্জা পেল।
রওশন নিজেকে স্বাভাবিক করে সাইমার এর উদ্দেশ্যে বলল,
“কিছু কথা বলি মন দিয়ে শোনো। আমার ইচ্ছে ছিল আরও দুই-তিন বছর পর বিয়ে করার। এর কারণ নিজে কিছু করার, বাবার টাকায় বসে না খেয়ে। তারপর বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।
কিন্তুু আব্বু-আম্মুর জন্য এখনই করতে হলো। তোমার উপরও রাগ হয়েছিল, তুমি রাজি না হলেই তো বিয়েটা হতোনা। পরে ভাবলাম তুমি না করে দিলে আরেক জায়গায় নিয়ে যেত মেয়ে দেখতে। আর যেহেতু বিয়ে হয়েই গেছে, এখন ঝামেলা করে লাভ নেই। আর বিয়ের পর আল্লাহর রহমত বৃদ্ধি পায়। হয়তো বিয়ের জন্য আল্লাহ আমার ইচ্ছে আরো দ্রুত পূরণ করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।
তোমার কিছু বলার থাকলে বলো!
সাইমা মন দিয়ে শুনল রওশন এর কথা। কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে মানুষটা! সে মানুষটাকে যেমন ভেবেছিল উনি আসলে তেমন নয়। আম্মু বলে মানুষের সাথে না মিশলে তাকে চেনা যায়না। আজ তার প্রমাণ পেল সাইমা। উপর থেকে মানুষ চেনা যায় না। রওশান সাইমাকে চুপ থাকতে দেখে বলল,
“কিছু বলার নেই?”
সাইমা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। রওশন মাথা নিচু করে রাখা রমনীর পানে চেয়ে থাকলো। তার জীবনের প্রথম নারী এই মেয়ে। সে বিয়ে করতে চেয়েছিল আরও কিছুদিন পর। তবে তার ভবিষ্যৎ বউকে নিয়ে হাজারো অনুভূতি জমা আছে। কবুল বলার পর থেকে তার সামনে বসা এই বউটার জন্যই সব বেরিয়ে আসছে যেন।
রওশন মৃদু হেসে সাইমার দু’হাত নিজের হাতের মুঠোয় আলতো করে ধরে বলল,
“তুমি আমার সাথে সহজ হওয়ার ট্রাই কর।”
সাইমার হাত কাঁপছে মৃদুভাবে। হঠাৎ করে এভাবে হাত ধরায় এই অবস্থা। জীবনের প্রথম কোনো পুরুষ মানুষের স্পর্শ পেয়েছে। এটুকু বোধয় স্বাভাবিক। রওশন সাইমার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কী কাঁপুনি রোগ আছে? হাত ছেড়ে দিল। সাইমা সাথে সাথে নিজের হাত দু’টো তার কোলের মাঝে গুটিয়ে নেয়। রওশন অবাক হয়ে তাকায়। তার মানে সে হাত ধরেছিল বলে এই অবস্থা! কি বলবে বুঝল না! আবার হাসিও পেল। চুলের ভাঁজে হাত চালিয়ে বলল,
“আমি তোমার হাসবেন্ড। তুমি কী আমাকে মেনে নিতে পেরেছ?” আই মিন ফ্যামিলির চাপে বাধ্য হয়ে বিয়ে করনি তো?”
সাইমা চোখ বড় বড় করে রওশনের দিকে তাকালো। দু’দিকে মাথা নেড়ে না বোঝালো।
রওশন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কথা বলো।”
সাইমা মাথা নিচু করে বলল,
“না, বাধ্য হয়ে করিনি।”
রওশন কিছু বলল না। বুঝেছে মেয়েটা তার সাথে সহজ হতে পারছে না। সময় দিতে হবে। অতঃপর বলল,
“খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।
উঠে গিয়ে একটা বক্স থেকে টাফলিন এনে সাইমার পাশে রেখে বলল,
এটা খেয়ে নিও। অনেক কেঁদেছ। নয়তো মাথা ব্যাথা করবে।”
সাইমা মুগ্ধ হলো স্বামীর যত্নে। মানুষটাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তার আম্মুর কথা মনে পড়ল।
তার আম্মু বলেছিল,
“এই ছেলের সাথেই খুব সুখী হবি মা!”
আম্মুর কথা হয়তো আল্লাহ কবুল করে নিয়েছে। মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ পড়ল।
অতঃপর একটু চিন্তিতস্বরে সাইমা বলল,
“আপনি আমাকে ভার্সিটিতে পড়তে দিতে চান না কেন?”
সাইমার কথায় রওশন হেসে বলল,
“একদিনেই সব জেনে নিবে? এটার পিছনে কারণ আছে। তবে আরেকদিন বলব। আপাতত মন দিয়ে পড়াশুনা কর, এসব চিন্তা বাদ দিয়ে।”
সাইমা আর কথা বাড়ালো না। তবে একটু মন খারাপ হলো। বিশেষ পাত্তা না দিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ল। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
একটু পর রওশন ও বিছানার একপাশে দূরত্ব রেখে শুয়ে পড়ল। রওশন এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। কারণ ছাড়াই মেয়েটাকে ভালো লেগেছে। হয়তো কবুল এর জোরেই আল্লাহ তার অন্তরে মেয়েটার জন্য অফুরন্ত মায়া ঢেলে দিয়েছে। মৃদুস্বরে বলল,
“তোমার নাম কী?”
সাইমা চোখ বুজেছিল। স্বামীর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে অবাক না হয়ে পারল না। এতোক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে এখন বউ এর নাম জিজ্ঞেস করছে। মানে এই লোকটা তার বউ এর নাম জানে না। তার স্বামী তার নাম জানে না। এসব মানা যায়? সাইমা শোয়া থেকে উঠে বসল। রওশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“মিস্টার রওশন আপনি আপনার বউ এর নাম জানেন না? বিয়ে করেছেন কাকে তাহলে?”
রওশন সাইমার এমন হঠাৎ রেগে যেতে দেখে ভড়কালো। সেও উঠে বসে বলল,
“না মানে, টেনশনে শোনা হয়নি।”
সাইমা রেগে বলল,
“তাহলে জীবনে শুনতে হবেও না। অস্বামী একটা।”
রওশন হা করে তাকালো। এই মেয়ে তো একটু আগেও কাঁপছিল। এখন কেমন রেগে গেল। কোথায় যেন শুনেছিল, ‘বাদ দেন বেডি মানুষ।’ কথাটা মনে পড়ল। আসলেই বেডি মানুষ। একটু আগেও তার সাথে কথাই বলছিল না, একটু হাত ধরেছিল বলে কাঁপছিল এখন মুখ দিয়ে খই ফুটছে।
সাইমা উল্টে ঘুরে শুয়ে পড়তে নিলে রওশন সাইমাকে হঠাৎ করেই পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। সাইমার আর শোয়া হয় না। তখন তো হাত কাঁপছিল। এখন পুরো শরীর। কথাও বেরচ্ছে না। রওশন ফিসফিস করে বলল,
“তোমার জন্য অনুভূতি জমিয়ে রেখেছিলাম। কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকাইনি। যখন কবুল বলেছি তখন থেকে আমার সেই জমানো অনুভূতি তোমার প্রতি কাজ করছে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে ভবিষ্যৎ বউ এর জন্য যে অনুভূতি জমিয়ে রেখেছিলাম, তার সম্পূর্ণরূপে তোমার প্রতি কাজ করছে। কবুলের অনেক জোর!”
এভাবে কিছুক্ষণ থেকে রওশন সাইমাকে তার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে কপালে চুমু আঁকে। এরের আবারো নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। হালাল বউ এর প্রতি জমানো অনুভূতি বাসর রাতে বউ এর সামনে উপস্থাপন করায় আলাদা এক শান্তি পাওয়া যায় তা জানলো রওশন। এদিকে সাইমা চুপটি করে তার হালাল স্বামীর বুকে মাথা রেখে কান পেতে থাকলো। সেও তো ভবিষ্যৎ স্বামীর জন্য অনুভূতি জমিয়েছে। তার প্রথম পুরুষ এই মানুষ। মৃদু হাসল।
~~~~~~~~~~~~~~
দুই বছর পর ~~~
“আপনি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো দিলেননা। সামনে এডমিশন টেস্ট। আমার বান্ধবীরা কোচিং করছে। আপনি চান না আমি এডমিশন দিই, তা জানি। কিন্তুু এখন অন্তত কারণ টা বলুন।”
বউকে পাশে নিয়ে বউ এর হাতের চা খাচ্ছিল রওশন বারান্দায় বসে, আর চন্দ্রবিলাশ করছিল। রাত প্রায় ১১ টা বাজে।
সাইমা এর কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে রওশন। বাকি চা তার দিকে তাকিয়েই শেষ করল। অতঃপর কাপ রেখে পুরোপুরি সাইমার দিকে ঘুরে বসল। নিজের দুহাত দিয়ে সাইমার এর দুই হাত মুঠোবন্দি করল।
“তোমার সবচেয়ে দামি জিনিস কোথায় রাখো তুমি? এই যেমন-সোনা,হীরা!”
“আলমারিতে তুলে রাখি। কেন বলুন তো?”
“আমি আমার দামি জিনিস আলমারিতে তুলে রাখতে পারিনা চাইলেও। তবে সুন্দর পরিবেশে রাখি, যা আলমারি না হলেও পরিবেশটা শোভনীয়।”
“কোনটা আপনার দামি জিনিস?”
রওশন সাইমারর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার একান্ত একমাএ প্রাণের বউ।”
কানে উষ্ণ নিঃশ্বাস বারি খাওয়ায় সাইমা খানিকটা কেঁপে উঠল। নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“কিন্তুু আমি তো দরকারে বাইরে যাই। আপনার সাথে ঘুরতেও যাই। নিজেকে যথাসাধ্য ঢেকে যাই। ভার্সিটিতে এভাবে গেলে কী সমস্যা?”
“চোরদের আড্ডাখানায় কী তুমি গা ভর্তি গহনা পরে যাও?”
“সেখানে গহনা পরে যাব কেন? যেখানে জানিই চুরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯০%।”
“যেখানে আমার বউকে ইফটিজিং করার ১০০% গ্যারান্টি থাকে, যেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে বখাটেদের আড্ডা জমে, যেখানে একটা মেয়ের নিরাপত্তার ১% ও নিশ্চয়তা নেই, যে দিকে তাকাবা সে দিকে শুধু হারাম রিলেশন এর ছড়াছড়ি,
এই অসুস্থ পরিবেশে কী করে আমার এতো মূল্যবান জিনিসকে আমি পাঠাই বউ?”
রওশন এর কাতর স্বরে কথাগুলে শুনে সাইমার দেহ জুড়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। মানুষটা তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসলে এভাবে আগলে রাখতে চায়! সাইমা মনে মনে অনুতপ্ত হলো। না বুঝে সে কোথায় পড়ার স্বপ্ন দেখত!
মন খারাপ করে রওশনের পানে চেয়ে বলল,
“আমি অনেক দুঃখিত। না বুঝে মাঝেই মাঝেই আপনাকে এই ব্যাপারে অনেক জ্বালিয়েছি।”
হুট করেই রওশন তার বউকে টেনে তার কোলে বসাল। পরম যত্নে বুকে আগলে নিয়ে কিছুক্ষণ অনুভব করল তার প্রাণকে। অদ্ভুত প্রশান্তি পায় এই মেয়েটার কাছে। অতঃপর মুখটা সাইমার কানের কাছে নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“তুমি আমার একান্ত অপরাজিতা ফুল।
অপরাজিতা ফুলের যেমন চারপাশে নীল রং এর ছড়াছড়ি, মাঝখানে শুভ্র রং।
তেমন তোমার চারদিক থেকে সৌন্দর্য উপচে পরে, আর ভেতরটায় খুব সুন্দর শুভ্র একটা পবিএ মন আছে।”
হাতের বাঁধন আরেকটু শক্ত করে কয়েকবার আওড়াল,
“আমার অপরাজিতা ফুল,
একান্ত অপরাজিতা বউ,
একমাএ অপরাজিতা বউ ফুল আমার তুমি।”
সাইমা পরম শান্তিতে তার স্বামীর বুকে পড়ে রইল। এমন নিরাপদ স্থান মেয়েদের জন্য পৃথিবীর বুকে আল্লাহ হয়তো কোথাও রাখেনি। মনে মনে আল্লাহকে বলল,
“মৃত্যুর পরে জান্নাতেও এই স্থানটা আমার নামেই দলিল করে দিও রহমান আল্লাহ।”
..…..সমাপ্ত …..