গল্প:মাই বিলাভড সানফ্লাওয়া (১০)

লেখা- আসফিয়া রহমান

পর্ব:১০

অনুমতি ছাড়া কপি করা

কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস।
ক্লাস শেষ। বিকেলের নরম রোদ গায়ে মেখে অর্ণব আর সাফিন ক্যাম্পাসের ফুটপাথ ধরে হাঁটছিল। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউবা নোট নিয়ে ব্যস্ত। সাফিনের মনোযোগ পুরোপুরি অর্ণবের দিকে।

সাফিন অর্ণবের কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে বলল, “কিরে মামা! মেয়ে দেখতে গিয়ে তুই দেখি বিরাট কাহিনী ঘটায় ফেলছিস!”

অর্ণব বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকাল, “কাহিনী আমি ঘটাইলাম কই! কাহিনী দেখে তো আমি নিজেই হতবাক।”

সাফিন ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “তাই নাকি? বিনীতাকে তোর ভাল্লাগে নাই?”

অর্ণব চোখ ছোট ছোট করে তাকালো ওর দিকে,
“ভালো লাগা খারাপ লাগার প্রসঙ্গ আসছে কোথা থেকে! সেদিন ওখানে গিয়ে বিনীতাকে দেখবো এটাইতো একদম আনএক্সপেক্টেড ছিল আমার কাছে!”

সাফিন এবার হেসে ফেলল।
“আরে বাহ! ভাবছিলি অন্য কেউ বসে থাকবে, আর গিয়ে দেখলি এইটা সেই মেয়ে— বিনীতা! দারুণ তো!”

অর্ণব ভ্রু কুঁচকালো,
“দারুণ বলছিস? আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না কী করব! বিনীতা নিজেও অবাক।”

সাফিন কৌতূহলী চোখে তাকাল, “তারপর? তোদের কী কথা হল?”

অর্ণব মাথা চুলকে বলল, “জাস্ট স্বাভাবিক কিছু কথাবার্তা। আমি তো পুরোটা সময় বুঝতেই পারছিলাম না, এমন কাকতালীয় ব্যাপারও আসলে হয়!”

সাফিন হেসে বলল, “আসলেই, সিনেমার মতো শোনাচ্ছে! তা, দুই পরিবার কী বলছে?”

অর্ণব গম্ভীর হলো, “ওরা বলছে, তাড়াহুড়োর দরকার নেই। আমার চাকরিটা হোক আগে, তারপর দেখি কী করা যায়। এখন শুধু যোগাযোগ রাখার জন্য নাম্বার দেওয়া-নেওয়া হয়েছে।”

সাফিন মাথা নেড়ে বলল, “বুঝছি, তাইলে এখন ব্যাপারটা কীভাবে সামলাবি?”

অর্ণব একটু থেমে বলল, “সত্যি বলতে, জানি না। এখন শুধু দেখার সময় কী বলে।”

সাফিন মুচকি হাসল, “দোস্ত, তোর লাইফ ডিরেক্ট কোনো নাটক হয়ে যাচ্ছে, শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটাই বাকি।”

অর্ণব নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “হুম, সেই মিউজিকও বোধহয় সময়ই বাজাবে।”

____________________________________

“এর মধ্যে এত কাহিনী ঘটে গেছে, আমাদের কিছুই জানাস নি!” মিথিলা হতভম্ব গলায় বলল, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে। এমনভাবে বলল যেন বিনীতা কোনো সাংঘাতিক অপরাধ করে ফেলেছে।

“ও নিজেই তো ব্যাপারটা হজম করতে পারতেছিল না, আমাদেরকে আর কখন জানাবে!” রাহাত কাঁধ ঝাঁকিয়ে মজা করল।

মিথিলার কথায় বিনীতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সত্যিই, এতকিছু ঘটে গেছে, অথচ ওদের কাউকে কিছু জানায়নি।
“আসলে… সময়ই পাইনি ঠিকভাবে বলার। নিজেই ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না।”

মিথিলা এবার হাত গুটিয়ে বসে বলল, “ঠিক আছে, এবার খুলে বল, কী কী হলো?”

বিনীতা এবার চোখ ছোট ছোট করে তাকালো,
“এত কিছুও হয়নি, যেরকম ভাবছিস। দুই পরিবার ভেবেছে, আমাদের ভাবনা-চিন্তার জন্য একটু সময় দেওয়া হোক। তাই এখন কেবল কথাবার্তা পর্যন্তই আছে, এর বেশি কিছু না।”

রাহাত হেসে বলল, “তাই নাকি? তাহলে তুই এত ভেবে যাচ্ছিস কেন?”

বিনীতা একটু চুপ করে থাকল। সত্যিই তো, ও কেন এত ভাবছে?

রূপন্তি একটু নরম গলায় বলল,
“দেখ, এত কিছুর মধ্যে তোকে একটা কথাই বলব, সময় নিয়ে ভাব। হুট করে সিদ্ধান্ত নিস না। আমাদেরও শেয়ার করিস, একা একা সব ভাবতে গেলে মাথার মধ্যে শুধু এলোমেলো চিন্তা চলতে থাকবে।”

বিনীতা মাথা নেড়ে হালকা হাসল, “হুম, বুঝছি। এখন শুধু সময়ের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। দেখি কী হয়।”

আড্ডার টেবিল কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মিথিলা হেসে বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখিস, এবার থেকে আমাদের কিছু লুকিয়ে রাখলে কিন্তু চলবে না!”

বিনীতাও হাসল, “ঠিক আছে, আর লুকাব না। তবে যদি তোরা বেশি বিশ্লেষণ শুরু করিস, তাহলে কিন্তু…”

তুহিন সাথে সাথেই বলে উঠল, “তাহলে কী?”

বিনীতা অভিমানী মুখ করে বলল, “তাহলে বলবো না।”

তুহিন নাটকীয়ভাবে মাথায় হাত দিয়ে বলল, “বাপরে! এমন নিষ্ঠুর হুমকি দিলি? ঠিক আছে, আমরা চুপচাপ শুনব, বেশি কিছু বলব না, খুশি?”

ওরা সবাই একসঙ্গে হেসে উঠলো।

______________________

রাত আটটা। অর্ণব বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। বিনীতাকে কল দেওয়া উচিত হবে কি না, সেটাই ভাবছিল। নতুন কারও সঙ্গে প্রথমবার ফোনে কথা বলার আগে এমন দ্বিধা স্বাভাবিক। তবে ওরা তো একদম অপরিচিত নয়। একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা নামিয়ে রাখল পাশে; আবার তুলে নিল হাতে। শেষ পর্যন্ত বেশি না ভেবে সরাসরি কল দিয়ে বসলো বিনীতাকে।

দুইবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে বিনীতার কণ্ঠ ভেসে এলো, “হ্যালো?”

অর্ণব একটু থামল, তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল, “হ্যালো… উম, কেমন আছেন?”

বিনীতার কণ্ঠ একটু অবাক শোনাল বোধহয়,
“ভালো। আপনি?”

“ভালো। হঠাৎ কল দিলাম… মানে, নাম্বার দেওয়া-নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কথা হয়নি। তাই ভাবলাম…”

বিনীতা একটু হাসল, “হুম, আমিও ভাবছিলাম। কিন্তু আগে কল করব কিনা, একটু দ্বিধায় ছিলাম।”

অর্ণব হেসে ফেলল, “আমারও তাই অবস্থা।”

একটা ছোট নিঃশব্দ মুহূর্ত কাটল। এরপর বিনীতা বলল, “আপনার দিন কেমন গেল?”

অর্ণব হালকা গলায় বলল,
“প্রতিদিনের মতোই… ক্লাস, হাসপাতাল, এইসব মিলিয়েই কেটেছে। আপনার?”

বিনীতা হাসল, “একইরকম। ক্লাস, লাইব্রেরি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা…”

অর্ণব মাথা হেলিয়ে বলল, “ওহ্.. তারপর? এতক্ষণ কি করছিলেন?”

বিনীতা ফোনটা এক কান থেকে আরেক কানে নিয়ে বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো,
“ঠিক কিছু করছিলাম না। খাওয়া দাওয়া সেরে বই পড়ছিলাম।”

অর্ণবের গলা বোধহয় একটু কৌতূহলী শোনালো,
“কী বই?”

বিনীতা মৃদু হাসল, “একটা উপন্যাস।”

অর্ণব জানতে চাইলো, “কার লেখা?”

বিনীতা ঠোঁট কামড়ে বলল, “হুমায়ূন আহমেদ।”

অর্ণব একটু থেমে বলল, “আপনার প্রিয় লেখক কে?”

বিনীতা একটু ভেবে বলল, “অনেকের লেখাই ভালো লাগে।তবে শরৎচন্দ্রের লেখা আমার খুব পছন্দের।”

অর্ণব মাথা ঝাঁকালো, যদিও ও জানে বিনীতা সেটা দেখতে পাবে না, “বিভূতিভূষণ পড়েন?”

বিনীতা মৃদু হাসল, “হ্যাঁ, প্রকৃতিকে পড়তে ভালো লাগে।আপনি পড়েন?”

অর্ণব গলার স্বর একটু নিচু করল, যেন নিজের কাছে নিজেই স্বীকার করছে, “এখন কিছু পড়ার মতো সময় পাই না। তবে আগে পড়তাম। বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, হুমায়ূন, কখনো কখনো সুনীল বা সমরেশও।”

বিনীতা চোখ ছোট করল, যেন ফোনের ওপাশের মানুষটাকে বিশ্লেষণ করছে,
“বাহ, বেশ মিশ্র! তবে আপনার পছন্দ শুনে একটু অবাক লাগছে। আপনাকে সিরিয়াস টাইপের লেগেছিল, যে সারাদিন একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস।”

অর্ণব একটুখানি হাসল, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। তবে মেডিকেলের আগে এত বেশি চাপ ছিল না, তখন বেশ পড়তাম।”

বিনীতা কাঁধ ঝাঁকালো, “বুঝেছি।”

ফোনের ওপাশে একটুখানি নীরবতা নেমে এল।

অর্ণব একটু হেসে বলল, “সবাই ভাবে, ডাক্তারি পড়লেই বুঝি শুধু মেডিকেলের বই ছাড়া কিছু জানি না!”

বিনীতা একটু হেসে বলল, “তাই তো মনে হয়। তবে আপনি বেশ ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে।”

অর্ণব হাসল, “সেটা ভালো না খারাপ?”

বিনীতা চুপ করে রইল কয়েক মুহূর্ত, তারপর বলল, “সেটা সময় বলে দেবে!”

অর্ণব ভ্রু কুঁচকাল, যেন বিনীতার রহস্যময় উত্তরটা বোঝার চেষ্টা করছে।
“অর্থাৎ?”

বিনীতা নরম গলায় বলল, “অর্থাৎ, এখনই কিছু বলা যাবে না। দেখা যাক, আপনি সত্যি ব্যতিক্রম কি না!”

অর্ণব হাসল, “এই প্রথম শুনলাম, কেউ আমার সম্পর্কে রিভিউ দিতে চাইছে!”

বিনীতা হেসে ফেলল, “রিভিউ না, পর্যবেক্ষণ। পার্থক্য আছে!”

অর্ণব আবারো হাসলো, “ঠিক আছে, আপনার পর্যবেক্ষণ চলুক তাহলে।”

ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।

অর্ণব বলল, “ফোনটা রাখছি তাহলে? শুভরাত্রি।”

বিনীতা মৃদু স্বরে বলল, “ঠিক আছে। শুভরাত্রি।”

কল কেটে গেলেও, দু’জনের কেউই ফোনটা সরিয়ে রাখল না। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুই প্রান্তের দুটো ফোনে স্ক্রিনের আলোতে জ্বলজ্বল করলো দুটো নাম— বিনীতা নাওয়ার এবং অর্ণব এহসান।

To be continued…

বি:দ্র: এত কষ্ট করে লেখার পর যখন দেখি গল্পের রিচ নেই, খুবই খারাপ লাগে! গল্পটা কি আসলেই ভালো হচ্ছে না? রিচ নেই কেন বলুন তো? ☹️

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments