লেখিকা:নাদিয়া ফেরদৌসী
পর্বঃ১০
সকাল সাতটার দিকে তানিশার ঘুম ভেঙ্গে গেলো নাজমুল মর্তুজার চেচামেচিতে। তানিশা চোখমুখ কুঁচকে দরজার পানে তাকাল। বিরক্তে তার মুখ দিয়ে চ সূচক শব্দ বের হয়ে আসলো। পাশে ঘুমানো মাইশার দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো। দরজাটা ঘুমানোর আগে মাইশা ভালো করে লাগায়নি। তাই নাজমুল মর্তুজা ফাদিন ফাহিমকে ফজরের নামাজ কাজা করায় গালি দিচ্ছেন। যা তা স্পষ্ট এসে কানে বাজছে। নাজমুল মর্তুজা গালিগালাজ করে চলে গেলেন। কিন্তু তানিশার আর চোখে ঘুম নামলো না। কিছুক্ষণ ঘড়াঘড়ি করে উঠে বসলো। আর ঘুমুতে পারবে না।বসে থেকে অষ্টাদশী কন্যা মাইশাকে আলুথালু অবস্থায় ঘুমাতে দেখে কাঁথাটা জড়িয়ে দিলো ওর গায়ে। ফ্রেশ হয়ে এসে পা টিপে টিপে রুম থেকে বের হলো যাতে মাইশার ঘুম না ভাঙ্গে। নিচে গিয়ে একবার কিচেনে একবার মায়ের রুমে উঁকি দিলো।কিচেনে আসফিয়া মানজুম আরা সকালের নাস্তা তৈরি করতে ব্যস্ত।সুলতানা হায়দার রুমে জরুরি ফাইল গুছিয়ে রাখছেন। আজ কোর্টে যেতে হবে। ইদানীং ভালোই ব্যস্ত তিনি। তানিশা মায়ের রুম থেকে বের হয়ে গার্ডেনে আসলো। গার্ডেনে ফাহিমকে দেখতে পেয়ে ভীষণ খুশি হলো।
জুতা জোড়া খুলে একপাশে রেখে খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটতে লাগলো। রাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েছে। তা এখন শিশিরের মতো ঘাসের গায়ে লেপ্টে আছে। তানিশা তার খালি পায়ে শিশিরে মতো বৃষ্টির কণাগুলো মাখলো। বৃষ্টির কণাগুলো পায়ে লাগতেই পুরো গা শিরশির করে উঠলো। হঠাৎ পাশে নিজের জোতা জোড়া দেখে মাথা তুলে তাকাল। ফাহিম দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। চোখের ইশারায় বললো জুতা জোড়া পায়ে দিতে। তানিশা একবার জোতা একবার ফাহিমের দিকে তাকাল। ফাহিম ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেসুক দৃষ্টিতে দেখছে তাকে। তানিশা ঝুকে জুতা জোড়া হাতে নিয়ে দূরে ছুড়ে মারলো।ফাহিম কপালে ভাজ ফেলে বললো-” এটা কি করলি? জুতা পরলি না কেন? ঠান্ডা কি আমার লাগবে? “
তানিশা প্রফুল্ল মুখে বললো-” ঠান্ডা লাগবে না তো। কি আরাম! দেখো, তুমিও করো। “
ফাহিম মুখ বাকিয়ে বলল -” আমার দরকার নেই। “
তানিশা হুট করে ঘাসের উপর বসে গিয়ে ফাহিমের জুতা জোড়া ধরে টানতে লাগলো। ফাহিম আঁতকে উঠল -” এই এই কি করছিস? “
-” খুলো, খুলো এই গুলো। নাহলে আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।খুলো ফাহিম ভাই। খুলো বলছি। “
তানিশার টানাটানিতে হার মেনে ফাহিমকে জুতা জোড়া খুলতে হলো। জুতা খুলতে তানিশা সেগুলো হাতে নিয়ে ওর জুতার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ফাহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে বিজয়ী হাসি হাসলো। ফাহিম ওকে ব্যাঙ্গিয়ে চলে গেল আগে আগে। হাঁটতে গিয়ে শিরশির অনুভূতিটা ভীষণ ভালো লাগলো। তবুও তানিশার দিকে তাকালো ভোতা মুখে। তানিশার এখন আর ওর দিকে ধ্যান নেই। সে টগর গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ছে। তানিশাকে উঁকি দিয়ে ফুল নিতে দেখে সেই দিকে এগিয়ে গেলো ফাহিম। তানিশাকে বললো -” তুই ওড়নাটা মেলে ধর আমি নিয়ে দিচ্ছি। “
ফাহিমের কথা মতো তানিশা নিজের ওড়নাটা মেলে ধরল। ফাহিম ধীরে ধীরে তার কুচ ভরে দিলো। ফুল নেওয়া শেষ হতেই তানিশা গাছের নিচে পা ছড়িয়ে বসে পরলো। ফাহিমের মেজাজ খারাপ হলো। তানিশার বাহু ধরে অর্ধ ঝুলিয়ে ফেললো মেয়েটাকে -” ওঠ ওঠ এখান থেকে। পচা মেয়ে! যেখানে সেখানে বসে পরে। “
তানিয়া সরল মনে শুধালো -” গোসল করবো তো। “
-” তোর গোসল হতে হতে যা পিছনে লাগিয়েছিস তা পুরো বাড়িতে লাগি দিবি। “
ঠিক তখনই ফাহিমের পিঠে একদারের কয়েকটা কিল পরলো। -” ওই ওরে ছাড়।হাত ছিঁড়ে নিবি না কি? “
ফাহিম পিঠে হাত দিয়ে উঠে দাড়াল। মুখ কুঁচকে বলল -” মারলি কেনো? ভালোর জন্যই তো ধরলাম ওরে। দেখ কিভাবে বসেছে?”
মাইশা নিজেও ধপ করে বসে পরলো তানিশার পাশে -” নে আমিও বসলাম। তাতে তোর কি? যা এখান থেকে। “
ফাহিম রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো -” আমার? আমার কিছুই না থাক তোরা তোদের। আমি গেলাম। “
মাইশা কটাক্ষের সঙ্গে বললো -” আরে যা যা।তোর মতো হাঁদা পাশে থাকলে আমার গা জ্বলে। “
ফাহিম দুপদাপ শব্দ করে কিছুটা পথ পাড়ি দিয়ে আবার ঘুরে এলো। মাইশা মুখ তুলে তাকানোর আগেই ওর পিঠে একটা কিল দিয়ে ছুট দিলো। পিছন থেকে মাইশা অকাথ্য গালি দিয়ে পাশে বসে থাকা তানিশার কান ঝালাপালা করে ছাড়লো।ফাহিম অদৃশ্য হতেই মাইশা তানিশার দিকে তাকাল। তানিশা একটা সেফটিপিন দিয়ে ফুলের মধ্যে ফুটো করছে। -” কি করবি এসব দিয়ে তুই? “
তানিশা নিজের কাজ করতে করতে একপলক দৃষ্টি মাইশার পানে দিলো। উষ্কখুষ্ক চুল। মুখ থেকে ঘুমের রেশই কাটেনি মাইশার। তানিশা ভাবলেশহীন ভাবে বললো -” মালা গাঁথবো তোমার বিয়ের। “
মাইশা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। একটা চাপর দিলো তানিশার মাথায়। -” শুধু আজেবাজে কথাবার্তা। হুম।আচ্ছা দেয় আমিও গাঁথি। সুতো এনেছিস? “
-” না। “
-” তাহলে গাঁথবি কিসে? “
-” তোমার ওড়নার ওই ঝুলন্ত সুতোগুলো ছিঁড়ো তো। ওইগুলাতে গাঁথবো। আমার ওড়নায়ও আছে। “বলে তানিশা নিজের ওড়নার কোণ থেকে লম্বা একটা সুতো ছিঁড়ে আনলো দাঁত দিয়ে। তা দেখে মাইশা নিজের ওড়নার দুইতিনটা সুতোয় একসাথে টান মারলো। সুতো আসবে কি মাইশার পুরো ওড়না কুঁচকে গেলো। তেরো বছর বয়সী তানিশা তা দেখে কপাল ভাজ করলে। আপুটা তার সবকাজে তাড়াহুড়ো করে গন্ডগোল লাগিয়ে দেয়।তানিশা নিজের ওড়না থেকে সুতো ছিঁড়ে দিলো। মাইশা আয়েশ করে বসলো ভেজা ঘাসের উপর। মাঝে মধ্যে তানিশার বাচ্চামো কাজের সঙ্গী হতে মন্দ লাগে না তার।মাইশা ফুলগুলো এক এক করে সুতোয় ভরতে ভরতে জিজ্ঞেস করল -” ফুলগুলো এভাবে ছিঁড়ে আনলি কেন?মালা গেঁথে কি বা করবি?ফুল যে ছিঁড়লি রাইশা আপুর গাছ থেকে, দেখলে তো পিঠের ছাল তুলে নিবে। “
তানিশা নিজের কাজ করতে করতে বললো-” তোমার জন্য গাঁথছিলাম।তুমি ঘুম থেকে উঠে আসার আগে করে দিয়ে আসতে চাইছিলাম। কিন্তু তুমি তো ওঠেই চলে এলে। রাইশা আপুকে দিলে ঘরে থাকা হবে না। এখন ভাবছি আম্মুকে দিয়ে আসবো । “
তানিশার কথা শুনে মাইশা কোমল দৃষ্টিতে তাকাল ওর পানে। আবার তড়িৎ গতিতে স্বাভাবিক হলো। বেশি নরম হলে দেখা যাবে মাথায় ওঠে নাচবে। মালা গাঁথা শেষ হওয়ার পর তানিশা একটা মালা মাইশার হাতে পেঁচিয়ে দিলো। আরেকটা নিজের হাতে। বাকি রইল আরও দুইটা।
সুলতানা হায়দার কিচেনে এসে মানজুম আরাকে হাতে হাতে কিছু কাজ এগিয়ে দিচ্ছেন। নয়টার দিকে কাজে বের হবেন। এই সময়টুকু বাসার কাজে সাহায্য করতে পারবেন। তাই হাত লাগালেন। হঠাৎ ঝড়ের গতিতে মাইশা এলো কিচেনে।হাতে তার ঝুলন্ত একটা মালা।এসেই হৈ-হুল্লোড় করে আসফিয়া খাতুননের মাথায় পড়িয়ে দিলো। মানজুম আরা সুলতানা সেদিকে তাকালেন। মানজুম আরার মনটা হুট করে খারাপ হয়ে গেল। মাইশা আসফিয়াকে জড়িয়ে ধরে আম্মু আম্মু করছে। আসফিয়া খাতুন নাক মুখ কুঁচকাছেন তবুও ঠোঁটে নরম হাসি। মায়েদের এসব ঠুকঠাক আনন্দ তো মেয়েদের ঘিরেই।মানজুম আরার মেয়ের অনেক শখ ছিলো। অন্যের মেয়েকে যতই ভালোবাসুক। তাদের প্রথম প্রায়োরিটি তাদের আপন মা।সুলতানা হায়দার মানজুম আরার চেহারা দেখে বুঝতে পারলেন।
খানিক পরে তানিশা এলো ধীরস্থির ভাবে।তার হাতেও একটা মালা। মানজুম আরা নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন। আকস্মিক খোপায় কারো ছোঁয়া পেয়ে পিছনে তাকালেন। তানিশাকে ছোট ছোট হাত দিয়ে নিজের খোপায় মালা গাঁথতে দেখে উনার চোখ ছলছল করে উঠলো। তানিশা মালাটা মানজুম আরার খোপায় পেঁচিয়ে দিতে দিতে সুলতানা হায়দারের দিকে তাকিয়ে কৈফিয়ত দিচ্ছে। কেন উনার জন্য মালা গাঁথতেনি। সুলতানা হায়দার মেয়ের কান্ড দেখে তৃপ্তি পেলেন।উনি বুঝালেন উনার কোনো অসুবিধা নেই তাতে।
মানজুম আরা আবেগে আপ্লূত হয়ে তানিশার কপালে চুমু খেলেন। তানিশা ওনার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল -” তুমি কি পেঁয়াজ কা*ট ছিলে? “
মানজুম আরা সাথে সুলতানা হায়দারও শুধু মুচকি হাসলেন। সেইদিন তানিশার ভোজনই অন্য রকম ছিলো।মানজুম আরা যেনো ওর পিছু ছাড়ছিলেন না।
তানিশা সেই পুরনো টগর গাছটার দিকে তাকিয়ে পুরনো দিনে হারিয়ে গিয়েছিল। স্বর্ণীলি দিনগুলো। তানিশার এখন একটাই চাওয়া জীবনের পুরনো সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া। এখনকার প্রতিটাদিন বিষাক্ত। দম নিতে কষ্ট হয় তার। শান্তির ঘুম ঘুমায় না কত দিন।
রাইশা তানিশার কাঁধ হাত রেখে ডাকলো -” কি রে? কোথায় হারালি?”
তানিশা সংবিৎ ফিরে পেলো। রাইশার দিকে তাকিয়ে বললো -” কি হয়েছে বড় আপু?”
-” আরে,দেখো পাগলির অবস্থা! এতোক্ষণ ধরে যে এতো কথা বললাম তার কিছুই শোনেনি। “
তানিশা অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে বসলো বেতের সোফাটায়। সন্ধ্যা থেকে আইরাকে নিয়ে তিন বোন বারান্দায় বসে গল্প করছিলো। রাইশা আইরা গল্প করছিল।মাইশা তানিশা শোনছিল। তানিশার গল্প শোনতে শোনতে দৃষ্টি টগর গাছটায় চলে যাওয়া ধ্যানে চলে গিয়েছিল। আইরা কখন উঠে গেল আর রাইশা কখন তার সঙ্গে বকবক করতে শুরু করেছে খেয়ালই করেনি। -” এখন বলো কি বলছিলে? “
-” তোর পড়াশোনা কেমন চলছে তাই বলছিলাম। ওখানে তোর কোনো অসুবিধা হয়নি তো।”
-“ভালোই।অসুবিধা হবার কোনো সুযোগই ছিলো না। খালা খালো, খালাতো বোন আঠার মতো লেগে থাকতেন। “
-” ভালো।এসব জিজ্ঞেস করার জন্য তো তোকে আবার কলে মিলতো না। পাঁচ মিনিটেই কল রেখে দিতি। “
-” ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম খুব। সময় পেতাম না যে, তাই কল করতে পারতাম না সবাইকে। “
-“কিসের এতো ব্যস্ততা তোর? এতো ব্যস্ত কাকে নিয়ে হয়েছিলি তানু? যে আপনদেরও কল করে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করতি না। আবার বড়ভাইয়ার সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলতি। না কি আমার ওই কথাটাই সঠিক। বড়ভাইকে ছাড়া তুই আমাদেরকে আপন ভাবিস না। বড়ভাইয়ার আপন বোন তুই হয়স আমরা না। “
মাইশা শক্ত গলায় কথাগুলো বলে অপলক দৃষ্টি চেয়ে থাকলো তানিশার পানে।
তানিশা অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে চাইল মাইশার পানে। মাইশার এমন কথা শোনে রাইশা ধমকে উঠলো মাইশাকে। -” চুপ, একটাও কথা বলবি না। মুখ বন্ধ । ওই বিষয়টি কি এখন সমাপ্ত হয়নি। আড়াই বছর হয়ে গেছে। সেই কথার রেশ ধরে এখন এই স্বাভাবিক কথার সাথে মিলানোর মানে কি? যা চলে গেছে, গেছে। দোষটা তোমার ছিলো। তুমি তোমার মনে কথা আগে সিরিয়াস হয়ে বলোনি। তানিশা বলেছে তাই সে পেরেছে। “
-“বড়আপু, আপু তেমন করে বলেনি। তুমি ভুল ভাবছো। “
রাইশা তানিশার কথাশোনে ওকেও ধমকে উঠলো -” তুই মুখ বন্ধ কর। দুপুর থেকে দেখছি তোর সাথে কেমন রুড বিহেভ করছে। “
-” বলছি তো তুমি ভুল ভাবছো। আমাদের মাঝে তেমন কিছুই হয়নি। আজ আপুর মনটা খারাপ তাই। “
-“আমাকে জ্ঞান দিবি না তানু। দুদিন পর বিয়ে আর মেয়েটাকে দেখ।”
মাইশা গাল ফুলিয়ে চুপটি করে বসে আছে। দৃষ্টি তার মহল্লার নিরিবিলি রাস্তাটায়। বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করা শখ কোনো কালেই তানিশার ছিলো না। কিন্তু মাইশার ছিল। বলেও ছিলো একবার সবাইকে। কেউ তেমন আমলে নেয়নি। কিন্তু তানিশাকে ফাইয়াজ হুট করে বিদেশে পড়াশোনায় পাঠাচ্ছে বলে মাইশার সবার সঙ্গে মনোবিবাদ হয়েছে ছিল। সেই জেদ ধরে মাইশা অনেকদিন ফাইয়াজ এবং তানিশার সাথে কথাও বলেনি। তবে তার এই মেকি জেদ আত্মার টানের কাছে হার মেনেছে। এখন এসব কথা বলার কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না। কিন্তু সকাল থেকে তার ভেতরকার স্ফূলিঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। সবকিছু দোষ মাইশা জোহানকে দিচ্ছে। ওদের বোন ওর জন্যই ওদের কাছ থেকে দূরে চলে গেছে। আচরণও কেমন পাল্টে গেছে।তানিশার আচরণ কেমন অতিরিক্ত শান্ত।
তানিশা মাইশার দিকে তাকিয়ে বললো -” আপু তুমি কিছু বলো।”
-” ও কি বলবে? যা বলার বলেই তো….”
-” ওই রশি, তোর আণ্ডাবাচ্চা গুলো বিদেশি চকলেট পেয়ে আমাদের রেখে ওই বিদেশিটার চক্করে পরে গেছে। “
ফাদিন কথা বলে রাইশাকে দেখলো বারান্দায়। রাইশা কথা থামিয়ে দিলো ফাদিনের চেচামেচিতে। ফাদিন রাইশার নাম ডাকতে ডাকতে এই দিকে এগিয়ে।মাইশা বিরক্ত হয়ে খ্যাক করে বলল -” গলা ফাটিয়ে ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছো কেনো? “
ফাদিন এসেছিল একটু আমোদ করতে কিন্তু এখানের অবস্থা বেশ থমথমে দেখে মুখ সিরিয়াস করে বললো -“তোদের আবার কি হলো? “
রাইশা কিছু না বলে উঠে গেল। আইরা রুম থেকে বের হয়ে রাইশাকে যেতে দেখে অবাক হলো।ওর ছোট খালার কল আসায় একটু উঠে গিয়েছিল।এরই মধ্যে কি এমন হলো যে পরিবেশ পাল্টে গেল। আইরা ফাদিনকে জিজ্ঞেস করল -” বড়মনি কোথায় গেল? “
ফাদিন ইশারায় বললো সে জানে না।মাইশাও উঠে পা বাড়াতেই তানিশা পিছু ডাকলো। -” আমি জানি কেন তোনার মন খারাপ ? আমি এখন আর ছোট না। তাই বলছি এতো ভাবতে যেও না। ভাবনাগুলো সময় উপর ছেড়ে দাও। প্রকৃতি কখনো তার নিয়ম কাউকে ভাঙ্গতে দেয় না। “
***************
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে যাচ্ছে গিটারে টুং টাং শব্দে।গিটারটা হিমালয়ের। হিমালয়ের এসবের ভারি শখ।মেঘ তাকে বলেছিল সে চাইলে এসব দিয়ে তার ক্যারিয়ার গড়তে পারে। হিমালয়ে নাকচ করে দিয়েছে৷ এটা তার শখ।ক্যারিয়ার না। সে বাবা ভাইয়ের মতোই হতে চায়। তাই আর মেঘ জোর করেনি। হিমালয়ের কালেকশন অনেক মডেলের গিটার আছে। মেঘ সেখান থেকে পিআরএস সিলভার স্কাই গিটারটা নিয়ে বসলো লিভিং রুমে।এই গিটারটা রঙ তার বেশ লাগে, স্টোন ব্লু। লিভিং রুমের ডিভানে বসে শুধু টুংটাং শব্দ করেই যাচ্ছে মেঘ। খুলা জানালা দিয়ে মৃদুমন্দ হাওয়ায় আসছে।মেঘ জানালার বাইরে তাকিয়ে। ভাবলো, এবার বৃষ্টির হয়েছেটা কি? এতো অভিমান কেন? কথাটা ভেবে হেসে ফেললো।
তানিশা তাদের বাসায় প্রথম যেদিন এলো সেদিনের বৃষ্টি ছিলো না। কিন্তু এর আগের একসপ্তাহ টানা ঝুম বৃষ্টি হয়েছিল। তাই তানিশা শ্লেষাত্মক স্বরে বলেছিল -” আজ বৃষ্টি ঝড়ালেন না যে? অভিমান করেছেন? “
মেঘ ফাহিম ফারহান মাইশাদের ঘুরে লিভিং রুমটা দেখাচ্ছিল। হঠাৎ তানিশার কথাটা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে বললো -” কিছু বলেছো তানিশা?”
-“বললাম আজ কেন বৃষ্টি ঝড়ালেন না? “
মেঘ ঠোঁট চেপে হেঁসে বললো -“আমি বুঝি বৃষ্টি ঝড়াই?”
-“তাহলে কে ঝড়ায়? বৃষ্টি তো মেঘ থেকেই ঝরে পরে। “
-“কিন্তু আমি যে সেই মেঘ না। আমি হলাম মেঘালয়। “
তানিশার বিস্ময়কর চাহনিতে চেয়ে বললো -” কি বলছেন আপনি এসব? আপনি মেঘ হবেন না কেন? না না। আপনি মেঘ। মেঘালয় টেগালয় নন। “
ফারহান তানিশার মাথায় চাটি মারলো। -” বেশি বকিস।মেঘ ভাইয়ার আসল নাম জানিস? ‘
তানিশা অভিমানী কন্ঠে বললো -” না জানি না। আর জানতেও চাই না। মেঘ মানে তো মেঘই।মেঘালয় কারো নাম হয় না কি?ধ্যাত! কথাই বলবো না কারো সাথে। “
তানিশা অভিমানে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গিয়েছিল সবাইকে রেখে। মেঘের এখন মনে আছে সেদিনের তানিশার চোখে কষ্টগুলো।সামান্য কারণে মেয়েটা কত কষ্ট পেলো।মেঘের নাম মেঘ নয় এটাই যেন তাকে বিশাল পাহাড়ের সমান কষ্ট দিতে সক্ষম। মেঘকে ঘিরে তার কত কৌতূহল। আর এখন! মেঘের বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে আসলো।
-“তুমি এখানে কি করো? “
হিমালয়ের কন্ঠ শুনে মেঘে ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো। হিমালয় দরজার দুপাশে উচ্চু করে হাত রেখে অতি উৎসাহ নিয়ে ভাইকে দেখছে।
-“তেমন কিছু না। “
হিমালয় হেঁটে এসে ধপ করে মেঘের পাশে বসলো। -“মা তোমাকে খুঁজছে। তোমার উপর মামলা দায়ের করাবেন। “
মেঘ নিরুত্তাপ স্বরে শুধালো -” আমি আবার কি করলাম? “
-“একটা বিষয় তুমি মাকে বলোনি। আমি তো ভেবেছিলাম জানিয়েছো। মা আজ জানতে পেরেছে। কেনো বলোনি তাই নিয়ে খেপেছেন।”
মেঘ সন্দিহান হয়ে বললো -” তানিশার কথাটা নাকি? “
-“রাইট। “
-“আপু বলবে বলে আমি আর বলিনি। আর এখন বলেও কাজ নেই।”
-“ওসব আমি জানি না। মাকে তুমি সামলিও। “
মেঘ মাতা ঝাঁকিয়ে বললো -“হিমু একটা গান ধরতো। “
হিমালয় নাকচ করে বললো -” তুমি গাও আমি বাজাই।আমার থেকে তোমার গলা ভালো। “
-” শুনতে ইচ্ছে করছে গাইতে না। তুই গা। “
হিমালয় খানিকটা ভেবে চোখ বুঁজে নিলো। গলা ছেড়ে গাইল-:
তোমার জন্য নীলচে তারার একটুখানি আলো
ভোরের রঙ রাতের মিশকালো
কাঠগোলাপের সাদার মায়া মিশিয়ে দিয়ে ভাবি
আবছা নীল তোমার লাগে ভালো
ভাবনা আমার শিমুল ডালে লালচে আগুন জ্বা
মহুয়ার বনে মাতাল হাওয়া খেলে
এক মুঠো রোদ, আকাশ ভরা তারা
ভিজে মাটিতে জলের নকশা করা
মনকে শুধু পাগল করে ফেলে
*************
তানিশা ওয়াশরুমের দরজা খুললো। যতই দরজাটা খুলছে ততই রুমের মধ্যে থাকা ঝড়ের আভাস পাচ্ছে। পুরো দরজাটা খুলে যখন রুমটা অক্ষিপটে স্পষ্ট হলো তখন রুমের অবস্থা দেখে হতাশ হলো।রিদান রাশার আবদার ওরা ছোট খালামনির রুমে ঘুমাবে। সেই আবদার অনুযায়ী রাইশা ওদের নিয়ে তার রুমে এসেছে। রিদান বিছানায় উঠে লাফাচ্ছে। বিছানা কেঁপে কেঁপে উঠছে। শরীরে সঙ্গে মুখটাও চলছে। কাল মার্কেটে গিয়ে কি কি কেনা হবে তা রাইশাকে বলছে। রাইশা রাশার কাপড় পাল্টে দিচ্ছে। সেই মেয়েটাও শান্তি দিচ্ছে না। যেটা পরানো হয়েছে সেটা ওর পছন্দ হচ্ছে না। সেই নিয়ে চেচামেচি করছে। রাইশার পাগল পাগল অবস্থা। রাইশা তানিশাকে লক্ষ্য করে বলল -” তানু ওইটাকে নামাতো বিছানা থেকে। “
তানিশা হাতের টাওয়ালটা চেয়ারে রেখে রিদানকে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। রিদান তানিশাকে দেখে বললো -” আমি তোমার কাছে ঘুমাবো খালামনি। “
রিদানের উত্তর তানিশা দেওয়ার আগে অর্ধ ফ্রক পরা রাশা দিলো -” না তালামুনি পাতে আমি ঘুমু দুবো।”
রিদান দৃঢ় স্বরে বলল -” না আমি। “
রাশা কান্না শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তার মধ্যে রুমের দরজাটা ঠাস খুলে খুলে গেলো। -” আমিও আজ এখানে ঘুমাবো। “
রাইশা মাইশাকে ঠেস দিয়ে তানিশাকে বললো -” তানিশা বল এখানে জায়গা হবে না। “
মাইশা বগলদাবা করে আনা বালিশটা ছুড়ে মারলো বিছানায়।-” হয় না কেমন করে আমিও দেখবো। না হলে এই দুলাভাইর ছেলেকে বাতিল ঘোষণা করবো। “
মাইশার কথার কতা শুনো রিদান শক্ত করে তানিশার গলা জড়িয়ে ধরল। ভাব এমন, যেনো বলছে এখন বিদায় করে দেখাও। রিদানের হাতের চাপে তানিশার জান যায় যায় অবস্থা। তানিশা মোচড়ামুচড়ি করে নিজেকে ছারালো।
চলবে…………..