পর্বঃ১৫
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]
আইসিইউর কাঁচের আড়ালে ভগ্ন হৃদয়ে দাড়িয়ে আছে এক অভাগা পিতা। যার মাত্র উনিশ মাসের শিশু কন্যাটি ওই সুরক্ষিত কাঁচের আড়ালে সফেদ বিছানায় নির্জীব হয়ে পড়ে আছে৷ হাতে ক্যানুলা, নাকে কৃত্রিম অক্সিজেন নল পরিহিত। বিশালাকৃতির বিছানায় শুকিয়ে কঙ্কালসার শিশু দেহটি যেন ক্ষুদ্রতম কোন মৃতপ্রায় প্রাণ!
মাতৃ বিয়োগের ধাক্কাটা বোধহয় অবুঝ শিশুটি সইতে পারেনি, তাইতো মাত্র পাঁচদিনেই বিছানাশায়ী হয়ে পড়েছিল। এখন ঠাঁই মিলেছে হাসপাতালের জরুরী এই কক্ষে যার নাম আইসিইউ। এখানে সাধারণত মুমূর্ষ রোগীদের এডমিট করা হয়। এই কক্ষে থাকা প্রায় নব্বই ভাগ প্রাণেরই বরণ করে নিতে হয় মৃত্যু!
— মিষ্টার চৌধুরী আপনি তো জানেন আপনার বাচ্চা এমনিতেই প্রি ম্যাচুয়ারড বেইবি। আপনি কি জানেন না এই ধরণের শিশুদের খুব সহজেই যেকোন ডিজিজ আক্রান্ত করতে পারে? আর বাচ্চাটা মনে হচ্ছে অনেক দিন মায়ের বুকের দুধ পায়নি৷
ঐক্যর কোন নড়চড় নেই। তার সুখী জীবনে হঠাৎ ভয়ঙ্কর ঝড়ের মতো আসা একের পর এক ধাক্কায় তার কন্ঠ ভাষা হারিয়েছে। তাইতো নিশ্চল জড় বস্তুর ন্যায় পাথরের মতো ঠায় দাড়িয়ে আছে।
ঐক্যর কোন ভাবাবেগ না দেখে ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে ওকে সামান্য ঝাকিয়ে বললো,
— মিষ্টার ঐক্য, আপনি আদৌও শুনছেন আমার কথা?
ঐক্যর সংবিৎ ফিরে যেন। বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করে,
— আ….মার আম্মা…জান… আমার মেয়েটা বাঁচবে তো ডক্টর?
ডাক্তার কথাটা শুনে নির্বাক বনে গেল। ঐক্যকে দেখতে কিছুটা উন্মাদের মতো দেখাচ্ছে। ওর অবুঝ দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে এতক্ষণের কোন কথাই শোনেনি সে? ডাক্তার হতাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আল্লাহকে ডাকুন। আমার আর কিছু বলার নেই!
ঐক্যর চোখ বেয়ে টুপ করে একফোঁটা গরম অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ে। শ্যামলা সুদর্শন মুখটা এই কয়েকদিনের মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে খানিকটা কালো হয়েছে। সেই গম্ভীরমুখো ঐক্যর সাথে এই ভঙ্গুর পিতার কোন মিল নেই। এই ঐক্যর দু’চোখে নিজের সন্তান হারানোর আতঙ্ক!
— ভাইয়া?
ঐক্য তড়িঘড়ি করে চোখ মোছে। ঐশী ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকায়। ধরা গলায় বলে,
— ওয়াফাকে দেখে নাও ভাইয়া। সন্ধ্যার পর আর দেখতে পারবেনা।
যদিও ঐশী কথাটা মিথ্যে বলেছে। ঐক্য আজ পাঁচদিন ধরে হাসপাতালের এই ইমারজেন্সি কেবিনটার সামনে একিভাবে পড়ে আছে৷ না আছে গোসল আর না আছে খাওয়া। মা বা ও নিজে জোর করে একটু খাইয়ে দিলে তো খায়। নাহলে দিন রাত কেমন অপ্রকৃতস্থের মতো কাঁচের দেয়ালটা ধরে দাড়িয়ে থাকে।
ঐক্যর মেন্টাল কন্ডিশন যে দিন দিন খারাপ হচ্ছে তা সদ্য মেডিকেল শিক্ষার্থী ঐশী অনুমান করতে পারছে। একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া এখন অত্যাবশ্যক। কিন্তু এই অবস্থায় কি করে তাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবে ঐশী ভেবে পায়না৷ তার আগে বুঝিয়ে সুজিয়ে বাড়ি পাঠাতে হবে। এভাবে কতদিন না ঘুমিয়ে, না খেয়ে কাটিয়ে দেবে?
ঐক্য টালমাটাল পায়ে আইসিইউ নামক কক্ষটিতে প্রবেশ করলো। প্রবেশের সাথে সাথে ওর নাকে এসে লাগে ফিনাইলের কড়া গন্ধ। ঐক্য হা করে শ্বাস টানে। এই রুমটিতে প্রবেশ করলেই ওর হাঁসফাঁস লাগে। মনে হয় নিঃশ্বাস টুকুও নিতে পারছেনা। পারবে কি করে তার জীবনসঞ্চারীণি যে ওই বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে! ঐক্যর চোখজোড়া টলমল করে উঠে। নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তানের করুণ দশা ও কিছুতেই মানতে পারছেনা।
ওর মনে পড়ে আজ থেকে পাঁচদিন আগের দৃশ্য…
জন্মের পর থেকেই ওয়াফা ভীষণ দূর্বল প্রকৃতির বাচ্চা। অল্প যে কোন কিছুতেই বাচ্চাটা নাজুক হয়ে পড়ে। তার উপর ও সম্পূর্ণ মায়ের বুকের দুধে অভ্যস্থ। শত চেষ্টা করেও তাকে অন্য কোন খাবার খাওয়ানো কষ্টসাধ্য। মাহিরা চলে যাওয়ার তখন একমাস ঘনিয়েছে। প্রথম দিন পনেরো বহু কষ্টে সামলিয়ে রাখতে পারলেও বেশকিছুদিন ধরে বাচ্চাটা এক নাগাড়ে কান্না করছিল। না ফিডার মুখে তুলছিল আর না কারো কাছে শান্ত হচ্ছিল। একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠে একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ঐক্য বিন্দুমাত্র দেরী না করে ওকে হসপিটালে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করায়। ডাক্তাররা টেস্ট করে জানান ওয়াফার খিঁচুনি উঠেছিল সাথে শিশু ডায়রিয়া। সেদিন রাতেই বাচ্চাটার অবস্থা বেগতিক হলে তাকে জরুরী অবস্থায় আইসিইউতে শিফট করা হয়। কিন্তু এখন অবধি বাচ্চাটার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি দেখছেন না ডাক্তাররা।
.
সাদা বিছানায় উদাম শরীরে কতগুলো যন্ত্রপাতি দিয়ে বাচ্চাটাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এই কয়েকদিনে ফুলকো আদুরে গালগুলো ভেঙ্গে হাড় ভেসে উঠেছে।
যে মানুষটা নিজের পিতার মৃত্যুতে কাঁদেনি তার চোখ গুলো থেকে আজ অজান্তেই টপটপ করে বারিধারার মতো নিঃশব্দে অশ্রু বইছে। ঐক্য ধপ করে ওয়াফার বেডের কাছে মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে। কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মনে মনে প্রার্থনা করে, ‘ ওর সন্তানের কিছু হলে যেন উপরওয়ালা ওকেও নিয়ে নেয়।’
কর্তব্যরত চিকিৎসক ওয়াফার শরীরিক গতিবিধি নিরিক্ষণ করতে করতে বললো,
— বাচ্চাটাকে বোধহয় হঠাৎ করে ফর্মুলা মিল্ক দেওয়া হয়েছে। তাই ওর ডাইজেস্ট করতে সমস্যা হয়েছে। হঠাৎ করে এই বয়সে ফর্মুলা কেন খেতে দিয়েছিলেন?
ঐক্যর কোন ভাবাবেগ নেই। যেন শোনেইনি কিছু। ডাক্তার নিজের মতো পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
— বাচ্চাটার মা কোথায়? ,
ঐক্য ওয়াফার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নিষ্প্রাণ স্বরে বলে,
— মরে গিয়েছে!
*
সব শুনে আবৃতি কতক্ষণ থম মেরে রইল। ঐশী উদাস নয়নে অদূরে তাকিয়ে আছে। অশ্রুতে চোখযুগল ভরে উঠেছে ততক্ষণে। আবৃতি চোখ তুলে ঐশীকে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
— এমন মাও হয়?
ঐশী চোখ ফিরিয়ে তাকায়। ফিচেল হেসে বলে,
— স্বার্থান্বেষীরা পারে আপু। যেই মা নিজের মাতৃত্ব, বিবেক, দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে দেয় সে সবই পারে।
আবৃতি কি বলবে ভেবে পেলনা৷ যেখানে আরশানের শরীরে তিলসম আঁচড়েও ও পাগলপ্রায় হয়ে যায়। সেখানে অতটুকু দুধের শিশুকে ছেড়ে মাহিরার মতো মা কিভাবে থেকেছে।
— জান আপু৷ ওয়াফা যখন রাতের পর রাত ওই পিশাচিনীর জন্য কাঁদতো। ভাইয়া তখন নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে পাগলের মতো ওর নাম্বারে কলের পর কল দিতে থাকতো। কিন্তু ওই নিষ্ঠুরতম মানবী ফোনটা তুলতো না। অতীতের ওই ধাক্কাগুলো ভাইয়ার মন-মস্তিস্কে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এতগুলো বছর পর এখনো ভাইয়া স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।
বলতে বলতে ঐশী ঝরঝরিয়ে কেঁদে দেয়। আবৃতি অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টি ফিরিয়ে দূরে স্লাইডারের কাছে বাচ্চাদের নজরে রাখা চুপচাপ পুরুষটিকে এই প্রথমবার পূর্ণ মনোযোগের সহিত চাইলো। কে বলবে এই লোক এত যন্ত্রণা বুকে জমিয়ে বেঁচে আছে? আবৃতি নিজেও তো একই নৌকার মাঝি। তাই হয়তো ঐক্যর যন্ত্রণাটা ও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলো। ঐশী এখনো ফুপিয়ে কাঁদছে। ঐক্যর দিকে নিষ্পলক আবৃতি হঠাৎ আনমনে বলে উঠে,
— কেঁদনা ঐশী। দেখবে একদিন এমন কেউ তোমার ভাইয়ার জীবনে আসবে, যে অগোচালো ঐক্যকে গুছিয়ে দেবে। যে মাতৃস্নেহ বঞ্চিত বাচ্চাটাকে পরম মমতায় আগলে নেবে!
ঐশী চোখ মুছে বললো,
— সে কোন একজন আসার সুযোগ তো দিতে হবে আপু। গত কয়েক বছর ধরে সবাই মিলে কত বোঝালাম ভাইয়াকে। কিন্তু ভাইয়াকে কিছুতেই রাজি করানো যায়নি। তার এক কথা। ‘ যেখানে জন্মদায়িনী মা নিজের পেটের সন্তানকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, সেখানে সৎ মা কি করে তার সন্তানকে আগলে নেবে?’ কিন্তু আপু এভাবে তো চলতে পারেনা। ওয়াফা সবসময় মনমরা থাকে। আমি বুঝি ওর মন মায়ের অভাব সবসময় বোধ করে। আশেপাশে বাচ্চাদের যখন তাদের মা আদর করে, নিজ হাতে খাইয়ে দেয়, স্কুলে নিয়ে আসে। তখন অবুঝ বাচ্চাটা কেমন করে যেন চেয়ে থাকে। তখন না আমার কলিজাটা কেউ যেন খামচে ধরে। ভাইয়াকে আমি দোষ দিচ্ছিনা। মাহিরা আর ভাইয়া তখন ডিপার্টমেন্টের সেরা জুটি ছিল। তাদের ভালবাসাকে সবাই আদর্শ হিসেবে নিত। সেই ভালবাসা কিভাবে যেন বদলে গেল হঠাৎ । নীল দুনিয়ার লোভ মাহিরাকে পুরোপুরি অন্ধ বানিয়ে দিল। ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেল ভালবাসার মতো পবিত্র বন্ধন। বিসর্জন দিল একজন নারীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মাতৃত্ব!
আবৃতি মূক হয়ে বসে আছে৷ হায়রে মানুষ! কেউ ভালবাসার মতো মূল্যবান সুখ পেয়েও স্বেচ্ছায় হারায় তো কেউবা ভালবাসার তরে নিজের সংসার ভাঙ্গে। অন্যমনস্ক আবৃতির হঠাৎ চোখ যায় বাচ্চাদের দিকে। তাড়াহুড়ো করে স্লাইডারের মই চঁড়তে নিলে ওয়াফার পা ফসকে যায়। আবৃতি আঁতকে উঠে ওয়াফা বলে চিৎকার করে উঠে। চেয়ার থেকে উঠে দুনিয়া ভুলে প্রাণপনে ছুটে যায়। ঐশী হতবুদ্ধি হয়ে দাড়িয়ে আছে। কি থেকে কি ঘটেছে ওর বোধগম্য হচ্ছেনা। ওয়াফাকে বুকে আগলে নিয়ে আবৃতি হাঁপাচ্ছে। ওর বুকটা হাপড়ের মতো উঠানামা করছে। আবৃতি চোখ তুলে দেখে স্লাইডারটা বেশ উঁচু। আরেকটু দেরী করলে কি ঘটে যেতে পারতো? মনে করেই ও আঁতকে উঠছে।
— ওয়াফা মামনি? তুমি ঠিক আছ?
হঠাৎ ঐক্য কোত্থেকে ছুটে এসে ওয়াফাকে চিলের মতো ছোঁ মেরে নিজের বাহুডোরে আগলে নেয়। ঐক্য পাগলের মতো ওয়াফার সারা শরীর হাতড়ে বিড়বিড় করে,
— আম্মাজান, আমাজান! তুমি ঠিক আছ?
ওয়াফা পিটপিট করে উপর-নীচ মাথা নাড়ায়। ঐক্য মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে নিজেকে খানিকটা ধাতস্থ করে। আবৃতির দিকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে বলে,
— থ্যাকস আ লট মিস আবৃতি৷ আজ আপনি না থাকলে আমার মেয়েটার হয়তো বড় কোন ক্ষতি হয়ে যেত। কোনদিন যদি এই ঋণ পরিশোধের সুযোগ হয় তো আমি অবশ্যই পিছপা হবনা।
— আরে এসব কি বলছেন মিষ্টার ঐক্য? ওয়াফা আমার মেয়ের মতো। আমি কোন কিছুর বিনিময়ে তো কারো ওকে সেইভ করিনি।
এতসব কিছুর মধ্যে ঐশী স্থির দৃষ্টিতে দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর কর্ণকুহরে হঠাৎ বেজে উঠলো আবৃতির কিছুক্ষণ পূর্বের কিছু কথা!
— একদিন দেখবে তাদের আগলে রাখার জন্য কেউ না কেউ আসবে। ঠিকই আসবে!
ঐশীর চোখের পলক এক মুহুর্তের জন্যও পড়েনা। ওর চোখে যেন ভেসে উঠলো একটি সুখি পরিবারের দৃশ্য! যেটার কল্পনা ও সবসময়ই করে আসছে।
চলমান…….