গল্প: কাছে আসা বারণ(০২)

লেখক:হুমায়রা মুর্তজা 
পর্ব — ২




— 'বাসায় যেতে চাও ওয়াইফি?' 

গম্ভীর, শীতল কণ্ঠস্বরটা কর্ণকুহরে যেন গরম সীসার ন্যায় প্রবেশ করল রিমঝিমের। সে তখনও অসাড় ভঙ্গিতে পড়ে আছে মেঝেতে। শারিরীক ব্যথা ছাপিয়ে গিয়েছে মনের পীড়ায়। বেঁচে থাকাটাই যেন বিষা ক্ত শুয়োপোকা দংশনের ন্যায়। গায়ে জড়ানো শুধু মাত্র একটা তোয়ালে। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা নেই ওর। আর তো কিছু বাকি খোয়ানোর। বাঁধভাঙা কান্নার জোয়ারে কেঁপে উঠছে রিমঝিম। অতিরিক্ত কান্নাকাটির কারণে মাথাটা ভার হয়ে আছে।কন্ঠস্বরও ভেঙে গিয়েছে ওর। আচমকাই বিস্ফোরিত হল রিমঝিমের ধৈর্য্যের বাঁধ। আহত বাঘিনীর ন্যায় ঝাপিয়ে পড়ল শুদ্ধর উপর। উদ্ভ্রান্তের মতো আওড়াতে থাকে, — 'মে রে ফেলব... মে রে ফেলব তোকে জানো..য়ার... ' বলেই প্রশস্ত বক্ষপটে  ক্রমাগত কিল-ঘুষি মারতে উদ্যত হয়। কিন্তু কয়েক পলের মধ্যে পুনরায় নিজেকে আবিস্কার করল শূন্যে। রিমঝিমের আচম্বিতে করা আক্রমণ প্রতিহত করতে বলশালী উস্ম হাতটা খা মচে ধরেছে বিউটি বোনের একাংশ। অন্যহাতে চেপে রেখেছে কোমর। ওভাবেই চেপে কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিসিয়ে উঠল শুদ্ধ,  — ' ওকে ওয়াইফি। আপনার আদেশ শিরোধার্য। আমার জানা ছিলনা আপনি এতটা পারফেক্ট বউ হতে পারবেন। প্রথম ইন্টিমেন্সির পরই পাকা হয়ে যাবেন। আচ্ছা আপনি কি বুঝেছেন ব্যাপারটা নাকি বুঝিয়ে বলব?' 

— ' আমি কোনো কথা শুনতে চাইনা।'

— '  কেন? স্বামীর কথা শুনবেন না কেন? আচ্ছা তাও আপনাকে একটু খোলসা করে বোঝায়। হাজার হোক স্বামী তো আমি আপনার। ফেলে দিতে পারিনা। ' 
বলেই কিছুক্ষণ ভাবনার অভিনয় করল শুদ্ধ। যেন গভীর ভাবনায় মত্ত সে। তারপর ঠোঁটের কোনে রহস্যময় হাসি এনে ফের বলল, — ' আপনাকে বোঝাতে হলে আপনার কাছাকাছি আসবার সুযোগ দিন।  কিন্তু এবারে জ্ঞান হারালে চলবেনা।' 
শুদ্ধর কথার অর্থোদ্ধার করে ফের জ্বলে উঠল রিমঝিম। নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, — ' তুই একটা জানো য়ার।' 

— ' বউয়ের কাছে সব পুরুষই জা নো য়ার হয় ওয়াইফি। দ্যাটস নট আ বিগ ডিল। এনিওয়ে আপনি বাসায় যেতে চান? যদিও এতক্ষণ আমি আপনাকে যেতে দিতে চাইছিলাম। কিন্তু এখন আর ওটা সম্ভব নয়। '

— 'ছাড়ুন আমায় শুদ্ধ।'

— ' আমাদের বিয়ের এখনো এক সপ্তাহ বাকি তাইনা? অতদিন আপনাকে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারবনা। সো আই ওয়ান্ট ইউ ওয়ান মোর টাইম..'

দু-চোখ ছাপিয়ে ফের নামল জল রিমঝিমের। আকুতিভরা কণ্ঠে বলল, — ' প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমি.. আমি পারব না। আমি মরে যাব। ' 

— ' আর আপনাকে ছাড়া যে বাকি দিন গুলোতে আমি প্রতিনিয়ত মরে যাব? আমার বিরহের দহনে আমি ভস্মীভূত হয়ে যাব সেদিকে কেন খেয়াল নেই আপনার ওয়াইফি? হু? আমায় বাঁধা দেবেন না।' বলেই রিমঝিমকে নিয়ে বিছানার দিকে এগোলো শুদ্ধ। নিজ কার্যে মত্ত হবার আগে ফুঁপিয়ে উঠল রিমঝিম। ভাঙাস্বরে বলল,— ' আপনি না আমায় ভালোবাসেন? ' 

— ' অফকোর্স আই লাভ ইউ। ' 

— ' ভালোবাসার মানুষকে হিং স্র জানো য়া রের মত খুব লে ছিন্নভিন্ন করাটা আপনার কাছে ভালোবাসা?'

 এতক্ষণ রিমঝিমের উপর ঝুঁকে থাকলেও এবারে সোজা হয়ে বসল শুদ্ধ। হাত বাড়িয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে উঠিয়ে নিল সিগারেট। লাইটার হাতে থাকলেও আগুন না জ্বালিয়ে শান্তি দৃষ্টিতে, একধ্যানে চেয়েই থাকল শলাকাটির পানে। ওটা যেন বিদ্রুপ করছে শুদ্ধকে, — ' আমার ভালোবাসাকে দিনের পর দিন পায়ে মাড়িয়ে, বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অন্য ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা অপরাধ নয় রিমঝিম? '

শুদ্ধর কথায় ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে রিমঝিমের মুখশ্রী। চকিতে চাইল শুদ্ধর ক্রমেই শক্ত হয়ে উঠা চোয়ালের দিকে। একটা ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল ওর গোটা আনন জুড়ে। তোতলানো কন্ঠে বলল, — ' আপনি? আপনি সব জানেন? ' 
ঘাড় ঘুরিয়ে রিমঝিমের পানে চাইল শুদ্ধ। সেই একই তুখোড়, জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে। ব্যথাতুর হাসল খানিক। তারপরই সিগারেটটা দূরে ফেলে দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল রিমঝিমের উপর.... 

--------------

কয়েক মাস পূর্বে... 

তখন প্রায় গোধুলি। চারিদিকে শীতের আমেজ ভরপুর পুরান ঢাকার অলিগলি। একটি মালবাহী ট্রাক এসে থামলো পুরান ঢাকার নবাবপাড়া সংলগ্ন সড়কের একটি দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবনের সামনে। গাড়িটির পিছু-পিছু  রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়ায় রিমঝিম। পরণে কালো চুড়িদার। অফহোয়াইট রঙা শাল চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছে আপদমস্তক। বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে আশপাশটা পরখ করতে থাকে।  ভবনটির প্রবেশদ্বারে নেইম-প্লেটে চমৎকার ক্যালিগ্রাফি ফন্টে লেখা 'বঁধুয়া-নীড়'।  মালিকের রুচির তারিফ না করলেই নয়। বিল্ডিংটা ঢাকার অন্যান্য কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের মত নয়। সামনে বেশ বড় একটা লন পেরিয়ে তবেই বিল্ডিংয়ের সুচনা। লনের বাগান দেখে খুশি ই হলো রিমঝিম। শীতকালীন মৌসুমী বাহারি ফুলের পাশাপাশি, বড়সড় কাঠগোলাপের বেশ কয়েকটি গাছও রয়েছে। অন্যপাশে ঝাকড়া বেলীফুলের গাছ। ইটপাথরের শহুরে জীবনে এমন সাজানো গোছানো বিল্ডিংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াটা রিমঝিমের কল্পনাতীত ছিলো। সে তো ভেবেই নিয়েছিল নিশ্চিত কোনো ঘুপচি গলিতে থাকতে হবে। পাশেই দাঁড়ানো ওর ছোটভাই মাহিন। চমশার উপর দিয়ে নজর বুলিয়ে সে-ও ব্যস্ত তাদের বর্তমান আবাসস্থল সম্পর্কে জানতে। সামনের রিক্সা থেকে নেমে এলেন ওর চাচা-চাচী। ভাড়া মিটিয়ে ভাজিতির কাছে এলেন নাজিম সাহেব। এতক্ষণে তার মুখশ্রীতে ফুটে উঠা মুগ্ধতাও আঁচ করে ফেলেছেন। আদুরে গলায় জানতে চাইলেন,
— 'বাসা পছন্দ হয়েছে আম্মাজান?'  
চাচার কথায় ঝকঝকে হাসল রিমঝিম। বলল,
— 'ভীষণ।'

—' আমি জানতাম আমার আম্মাজানের পছন্দ হবে সেজন্যেই এত খুঁজে বের করেছি৷ এখন ইট-পাথরের শহরে থাকতে কোনো সমস্যা নেই তো? '
আবারও হাসলো রিমঝিম। মাথাটা নাড়িয়ে সে গেলো ফুল গাছের দিকে। উজ্জ্বল শ্যামরঙা গাত্রবর্ণের রিমঝিম মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে থাকে ফুলগুলোকে। ইশ এত সুন্দর! 

 মেয়েটাকে হাসি-খুশি দেখে নাজিম সাহেব প্রসন্ন হোন।  হোক সে তার ভাইয়ের মেয়ে। কিন্তু রিমঝিমকে নিজের মেয়ের মতই মানুষ করেছেন তিনি। মেয়েটা তার ভাইয়ের আমানত। মেয়ে বড় হলে পাত্রস্থ করা প্রতিটি কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার ন্যায় তিনিও একজন সুযোগ্য পাত্রের আশায় পাড়ি জমিয়েছেন মফস্বল শহর ছেড়ে। এবার একটা গতি করবেন তিনি । এরপর এগোলেন মালপত্র নামানোর লোকেদের তদারকীর কাজে। 
নাজিম সাহেব পেশায় একজন  সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। জীবনের বহুবছর কাটিয়েছেন রংপুরে৷ আচমকা সরকার পতনের কারণে তার মতো একজন সৎ এবং যোগ্য অফিসারের ডাক পড়েছে রাজধানীর ব্রাঞ্চে। অথচ এতগুলো বছর দূর্নীতিবাজ চক্র সক্রিয় থাকায় তার মতো চৌকস অফিসাররা অগোচরেই থেকে গিয়েছেন ৷ঢাকায় বদলি হবার কারণে প্রথমে নাজিম সাহেব নিমরাজি হলেও উনার সহধর্মিণী শিরিন বেগম অবশ্য খুশিই হলেন। ছেলে-মেয়েদের ঢাকার ভালো স্কুল-কলেজে পড়াবেন সেই আশা নিয়েই পাড়ি জমিয়েছেন গঙ্গাবুড়ির শহরে। তিনি অবশ্য কুচুটে মহিলাদের মত নন। ভীষণ স্নেহ করেন রিমঝিমকে তিনি। তাছাড়া প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বপ্নালু ইচ্ছেগুলোকে বক্সবন্দি করে ছুটে আসছে লাখো জনতা। সকলকেই সাদরে নিজের বক্ষে ঠায় পেতে দেয় প্রাণের ঢাকা শহর। দূর্নীতি,সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, চোর-ছ্যাঁচড় কি নেই শহরটাই! ওয়ার্ল্ড পোলুইশান রেকর্ড অনুযায়ী বসবাসের অযোগ্য হিসেবে ঢাকার স্থান দ্বিতীয় হিসেবে গণ্য হলেও এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকেই জানে সে বড়ই আদুরে একটি শহর। কাক ডাকা ভোর কিংবা তীব্র গরম কিবা কুয়াশাজড়ানো গভীর রাতেও সে সজাগ থাকে তার বুকে ঠায় চাওয়া, স্বপ্নাচ্ছন্ন মানুষদের সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে। এমনই এক কুয়াশো মোড়ানো শীতের গোধুলিবেলায় ঢাকা শহরে এলো উনিশ বছরের তরুনী রিমঝিম। চাচার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল ট্রাক থেকে মালামাল নামানোর সময়। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর সুযোগ হলোনা। ছোট ভাই মাহিন বড়ই পেটুক। ওর কাছে এসে হাতটা ঝাঁকিয়ে বলল,
— ' ছোটাপু? চল পুরান ঢাকার বিরিয়ানি খাই। আমার পেটে হাতি দৌড়াচ্ছে ক্ষুধায়। '
— 'হাতিটাকে বেঁধে রাখ এখন বাবু। চাচা কতটা ব্যস্ত দেখছিস না? '
— 'আপু? হাতি একবার দৌড় শুরু করলে আর থামেনা গো। চল না?  সামনেই বিরিয়ানির দোকান দেখে এসেছি আমি। দু প্যাকেট নিয়েই চুপ করে চলে আসব। প্লিজ আপু?  যাবা? বল? আপু? চল? একটু যাই? প্লিজ?' 

চশমার আড়ালে ঢাকা বুদ্ধিদীপ্ত চোখে একরাশ আকুতি নিয়ে মাহিন চেয়ে আছে রিমঝিমের দিকে। আর সে জানেও তার ছোট আপুকে রাজী করানো এই পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। একটু আহ্লাদ করলেই আপু গলে যায়। 
চোখ সরু করে ভাইয়ের কর্মকাণ্ড দেখছিল রিমঝিম। সন্দিহান হয়ে বলল,— ' যদি আমরা হারিয়ে যাই বাবু? তখন? আমি এই এলাকার কিছু চিনিনা। ' 
সবগুলো দাঁত বের করে ঝকঝকে হাসল মাহিন। আত্মবিশ্বাসের সহিত জানাল, — ' আসার সময় আমি গলির মোড়ে বিরিয়ানির দোকান দেখেছি। রাস্তা পুরোটা মনে আছে। এবার যাবা? বল? যাবা? ' 
ভাইকে মানা করতে পারেনা রিমঝিম। ও তো জানে মাহিন তার ছোট আপুকে কতটা ভালোবাসে। চাল-চুলোহীন রিমঝিমকে কোনো কারণ ছাড়াই তো ভালোবাসে ছেলেটা। তাই তো মাহিনের কপালে পড়ে থাকা চুল গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিতে দিতে বলল , — ' চল।' 

----------

ছোট ছোট কদম ফেলে, মাহিনের হাতটা মুঠোয় পুরে গলির মোড়ের দিকে এগোতে থাকে রিমঝিম। রংপুরে প্রচুর ঠান্ডা পড়লেও ঢাকায় তেমন একটা শীত অনুভুত হচ্ছেনা। কোলাহল, যানবাহনের ধাক্কাধাক্কিতে পরিবেশটা গুমোট হয়ে আছে। আশপাশটা দেখতে দেখতেই যাচ্ছিল রিমঝিম। নয়তো আবার রাস্তা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু গলির মোড়ে এসেও যখন বিরিয়ানির দোকান পাওয়া গেল না তখন কড়া চোখে চাইল মাহিনের দিকে। বলল — ' গলির মোড়ে তো কোনো দোকান নেই মাহিন? তুমি আমাকে মিথ্যে বলে এনেছো?' 
মাহিন অবশ্য থেমে নেই।ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক খুঁজছে বারবার। কারণ ওর স্পষ্টত মনে আছে এখানেই দোকানটা দেখেছিল। এখন গেল কোথায়? আমতা-আমতা করে রিমঝিমকে বলল,— ' মনে হয় সামনের গলিতে আছে দোকানটা আপু। চল একটু সামনের দিকে যাই?' 

— 'ঠিক আছে।তবে এখন ফিরে চলো৷চাচার সঙ্গে এসো। দেখো সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।অপরিচিত এলাকায় এখন বাইরে থাকা ঠিক নয়। ' 

— ' আপু? আমার পেটে হাতিটা তো বিরিয়ানি না খেয়ে যাবেনা এখান থেকে। দেখো?  কেমন মন খারাপ করে আছে হাতিটা। প্লিজ একটু সামনে চলো? '
অগত্য ভাইয়ের হাত ধরে বড় রাস্তা পেরিয়ে কয়েকটা গলি পেরিয়ে এলো রিমঝিম। এদিকটা অবশ্য খুব একটা ব্যস্ত গলি নয়। এবং একটা বিরিয়ানির দোকান পেয়ে খুশিতে ঝুমঝুম করে উঠল মাহিন। বোনের হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে চলে গেল সেদিকে। পেটুক একটা বিড়বিড় করল আপন মনে রিমঝিম। তারপর সে নিজেও এগোলো সেদিকে। 

কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে নিয়ে দোকান থেকে বেরোতেই কেউ যেন জোরে ধাক্কা দিল রিমঝিমকে। ফলাফল সে তো ছিটকে পড়লই, হাতে ধরা বিরিয়ানি উড়ে গিয়ে পড়ল রাস্তার অন্যপ্রান্তে। সারা রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল সুস্বাদু বিরিয়ানি। আর সেদিক থেকে ছুটে আসছে একপাল ছেলেপুলে। সবার হাতে হকিস্টিক, ক্রিকেট ব্যাট আর  রাম-দা! ঠিক ওদের সামনে এসে দলটা থেমে গেল। একটা ছেলেকে মাটিতে ফেলে দিয়ে বেধড়ক মারধর করতে থাকে ছেলেগুলো। মার খেতে খেতে পিষ্ট হতে থাকা ছেলেটির অবস্থা শোচনীয়। ছেলেটা ইতোমধ্যে  র ** ব মি করা শুরু করেছে। একেকটা আঘাতে পর তার তীক্ষ্ণ আর্তনাদে কেঁপে উঠল রিমঝিম। 

রিমঝিমের বিমূঢ় ভাব কাটল কয়েক সেকেন্ডে। যখন দেখল একটা ছেলে রা ম দা দিয়ে কোপ বসাতে যাচ্ছে ছেলেটার পায়ে! সকলে অদেখা করলেও আচমকাই কিছু একটা ভর করল ওর উপর। মাহিনের হাত ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো গন্ডগোলের মাঝামাঝি। চেঁচিয়ে বলল, 
— ' আপনারা মানুষ?  দেখছেন উনার কি অবস্থা? এই ছেলেটা মরে যাবে। দিনে-দুপুরে গুন্ডামি করতে আপনাদের এত ভালো লাগে? দেশে কি আইন কানুন কিছু নেই?  ' বলেই রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটিকে উঠতে সাহায্য করল রিমঝিম। হাতে একটা পানির বোতল ছিল সেটা খুলে একটু পানিও দিল মুখে।

অন্যদিকে এতক্ষণে মারামারি করতে থাকা ছেলে গুলো হতবিহ্বল হয়ে গেল কয়েক মুহুর্তের জন্য। আজ পর্যন্ত ওদের কাজে কেউ বাঁধা দিতে পারেনি। সেখানে এই মেয়ে কে? ওদের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে এসে শাসাল, — ' এই আপা এই? জানেন আমরা কারা? আমাদের কাজে বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা কারো নাই। ভালোয় ভালোয় কেটে পড়েন। আমরা বেশিক্ষণ ভালো মানুষী দেখাতে পারব না। ' 

ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল রিমঝিম। আঙুল উঁচিয়ে বলল, — ' রাস্তাঘাটে দিনে-দুপুরে গুন্ডামি করবেন, মা র্ডার করবেন আর আমরা কিছু বললেই দোষ? হ্যাঁ?  আপনাদের আমি পুলিশে দেব।' 

রিমঝিমের পুলিশে দেবার  কথা শুনে যেন একটা হাসির রোল পড়ে গেল ছেলে গুলোর মধ্যে। ওদের মধ্যেকার কয়েকজন এগিয়ে এসে গোল গোল হয়ে ঘুরতে থাকে চারিপাশে। বিশ্রীভাবে হেসে একজন বলল,— ' আপার বাপ কি পুলিশ? ওইডা আমাদের শশুর বাড়ি। আপনি চাইলে আমরা যাইতেই পারি শশুরবাড়ি। কিন্তু বউ ছাড়া শশুরবাড়ি যায়ে মজা আছে?' 

— ' বউরে আদর করমু শশুর বাড়ি যেয়ে।' আরেকজন বলল বেশ রসিয়ে রসিয়ে।এতগুলো ছেলের মধ্যে আচমকা পড়ে গিয়ে যেন কুল-কিনারাহীণ মহাসমুদ্রে পড়ছে বলে মনে হল রিমঝিমের। ওই ছেলেটাকে ছেড়ে নিয়ে নচ্ছার গুলো এবার ওর পেছনে লেগেছে। নাহ! এদেরকে ভয় পেলে চলবেনা। চিবিয়ে চিবিয়ে ছেলেগুলোকে উদেশ্যে করে বলল,— ' আমার পথ আটকানোর চেষ্টা করবেন না। ভালো হবেনা। সরে যান বলছি?' 
— ' আরেহ আপা আমরা তো আপনার লগে শশুরবাড়ি যাবার জন্য অপেক্ষা করতাছি।' 
তখনই রিমঝিমের কাছে দৌড়ে এলো মাহিন। ছেলেকে অগ্নিদৃষ্টিতে দেখে বলল,— ' আমার আপুকে যেতে দাও বলছি?' 
— ' ওরে ছোট মরিচ। মরিচের বিচিতে এত ঝাল? ' বলেই সব গুলো ছেলে খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল একযোগে। একজন গাল টিপে দিয়্র বলল, — ' নামকি বাবু?' 
— 'মাহিন চুপ। এদের সঙ্গে একটা কথাও বলবিনা।' বলেই অসহায় হরিণের ন্যায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল রিমঝিম। যেচেপড়ে ঝামেলা কাঁধে নিয়ে ফেলেছে এতক্ষণে বুঝে ফেলেছে। এরা সম্ভবত এই এলাকার মাস্তান। ঠিক তক্ষুনি পেছন থেকে ভেসে এলো এক ভারীকন্ঠস্বর, 

— ' তমাল?' 

সেই ভারীকন্ঠস্বরের মালিকের চেহারার দর্শন এখনো পায়নি রিমঝিম। তবে তার ডাকে কাজ হল তড়িৎগতিতে। ওকে ঘিরে থাকা ছেলে গুলো সরে গেল সামনে থেকে৷ এবং নজরে এলো সেই ব্যক্তিকে। বিশাল লম্বা-চওড়া একটা মানুষ বাইকের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে জলন্ত সিগারেট। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, মাথাভর্তি এলোমেলো ঝাকড়া চুল, চওড়া কপাল আর তামাটে বর্ণের এক যুবক সে। কব্জিতে শোভা পাচ্ছে বড় ডায়ালের ঘড়ি। আরেক কব্জিতে কয়েকরকমের রিস্টলেট। মুখের অর্ধেকটা ঢেকে আছে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে, তাকে অনায়াসে বনমানুষের আধুনিক ভার্সন হিসেবে চালিয়ে নেয়া যাবে। তার তুখোড়, জ্বলজ্বলে চোখ জোড়া রিমঝিমের উপরেই নিবন্ধ। সিগারেট ঠোঁটে চেপে সামান্য কাঁধ ঝাকাল সে। তারপর ফের তার ভারীকন্ঠে যেন সাবধানবানী ছুড়ল, 
—' ম্যাডামকে যেতে দে। ' 

—' কিন্তু ভাই?' তাতক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখালো রিমঝিমকে উতক্ত করা ছেলেটি। তবে হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দেয় সেই যুবক। ফের বলল,—  'উনাদের যেতে দে এখান থেকে। বাচ্চা মানুষ। ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু এমন ভুল আর যেন না হয়। '

 এতক্ষণ বাইকে হেলান দিয়ে থাকলেও এবারে সোজা হল সে। এগিয়ে এসে দাঁড়াল রিমঝিমের সামনে। সিগারেটের ধোঁয়াটা ছাড়ল রিমঝিমের মুখ বরাবর। যেন বিদ্রুপ করতে চাইছে রিমঝিমকে৷ 

রিমঝিমের হতবিহ্বল ভাব কাটতেই প্রথমে ওর সামনে এসে দাঁড়ানো তালগাছের মত লম্বা মানুষটাকে ঘাড় উঁচিয়ে দেখল। তারপর চাইল আশেপাশে। চারিদিকে কেমন যেন নীরব হয়ে আছে। এই লোক যে গুন্ডাদের দলের মেইন ওস্তাদ বুঝতে বাকি নেই ওর। এতক্ষণে ভয় পেলেও রাগটা ফিরে এলো পুনরায়। কোনো কিছু না ভেবেই হাতে ধরা পানির বোতলটা ছুঁড়ে দিল সেই যুবকের মুখ বরাবর৷ তেজীগলায় বলল,— ' পরের বার কোনো মেয়েকে রাস্তায় উতক্ত করার আগে আজকের অপমান মনে রাখবেন। '  তারপর মাহিনের হাত ধরে বেরিয়ে এলো জায়গাটা থেকে। পেছনে ফেলে গেল হতবম্ভ হয়ে থাকা ছয় ফুটের বেশি উচ্চতার ঝাকড়া চুলের এক যুবককে। সে তখনও চেয়ে আছে তার জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে। যেখানে খেলা করছে অবিশ্বাস্য ঘোর.... 

চলবে...

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x