পর্বঃ২৮
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]
ঐক্যর গাড়িটা সজোরে ব্রেক কষে আবৃতিদের দোতলা বাড়িটির সামনে। গাড়িটা ভেতরে না নিয়ে গিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তার পাশেই পার্ক করে। চাবিটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামতেই ঐক্যর ভ্রু কুঁচকে যায়। আবৃতিদের বাড়ির গাড়ির গেইট পেরিয়ে একটি গাড়ি পার হয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে আবছা পরিচিত একটা মুখ চক্ষুগোচর হতেই ঐক্য হতবাক হয়ে যায়। আপনমনে বিড়বিড় করে বলে,
— ইরা? এই মহিলা মিস আবৃতিদের বাড়িতে কি করছেন?
.
বড় বড় পা ফেলে ঐক্য আবৃতিদের দোতলার দিকে অগ্রসর হয়। সদর দরজার সামনে পৌঁছাতেই দরজাটা খোলা পায় সে। বিড়াল পায়ে দরজার সামনে আসতেই ঐক্য পা যুগল থমকে যায় ভেতরের দৃশ্য দেখে। আবৃতি মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে৷ আপ্রাণ চেষ্টা করছে যেন ওর কান্নাগুলো কেউ না শুনতে পায়। একজন কুচক্রী নারীর বিষাক্ত ছোবলে আজ ও সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ এক নারী। ঐক্য মন্থর গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। আবৃতির সেদিকে খেয়াল নেই। ও কাঁদছে আজ দিন দুনিয়া ভুলে। ভেতরের রুম থেকে অনবরত দরজা ধাক্কানোর শব্দ ভেসে আসছে। ঐক্য দেখলো বাইরে থেকে দরজাটা আটকানো।
— আবৃতি দরজা কেন খুলছিস না? তুই ঠিক আছিস? দেখ আরশান ভয় পাচ্ছে ভীষণ! আবৃতি?
অনবরত দরজা ধাক্কাধাক্কি আর আহানের উদ্বিগ্ন চিৎকারেও আবৃতি নড়লোনা। ঐক্য এগিয়ে এসে সরাসরি আবৃতির সামনে দাঁড়ায়। কোন শব্দ না করে নির্মিশেষ তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।
সামনে কারো উপস্থিতি লক্ষ্য করে আবৃতি মুখ তুলে তাকায়। ঐক্যর বুক ধ্বক করে উঠে। হৃদয় অলিন্দে প্রবল ভাবে আন্দোলিত হয় সম্পূর্ণ নতুন কিছু অনুভুতিরা। আবৃতির ফোলা ফোলা অশ্রুসিক্ত চোখ,কান্নার তোড়ে লালচে নাক, তিরতিরিয়ে কম্পিত রক্তজবার ন্যায় ঠোঁট, ওই মেদুর মুখে সর্বত্র বিরাজমান অসীম মায়া ঐক্যর অন্তঃপুরের দরজায় আবার একবার কড়া নাড়ল। আর্জি চাইল ওই বিধ্বস্ত হৃদয়ে নতুন করে জায়গায় নেওয়ার। অনুভব করলো ওর মনে ফের জন্ম নিয়েছে কয়েক বছর আগে দাফন করা সেই অনুরক্তি!
আবৃতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সামনে। এই অসময়ে ঐক্যকে দেখে ও ভূত দেখার মতো চমকে উঠে। আচ্ছ লোকটা কি সত্যিই সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাকি সব নিছকই ভ্রম। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে ঐক্য রাশভারী আওয়াজে বলে উঠে,
— অল ডান?
— মা..মানে?
আবৃতির বিভ্রান্ত স্বর। ঐক্য কটাক্ষ করে বললো,
— মানে কান্নাকাটি শেষ হয়েছে নাকি আরো একটু কাঁদবেন?
আবৃতি বিহ্বল বনে যায়। ঐক্য সামনে সোফায় বসতে বসতে ফের বলে উঠে,
— আচ্ছা সমস্যা নেই। আপনি নাহয় আরেকটু কেঁদে নিন। আমি অপেক্ষা করছি৷ কিন্তু হারি আপ। আমার আম্মাজান কেক সামনে নিয়ে বসে আছে। আপনি গেলে তবেই কাটা হবে সেই কেক।
আবৃতি হতবুদ্ধের ন্যায় চেয়ে থাকে ঐক্যর শ্যামলা কঠোর আননে। ঐক্য ভাবলেশহীন। আবৃতি বিরবিরিয়ে আওয়ায়,
— আপনি মজা করছেন মিষ্টার ঐক্য?
ঐক্য আবৃতির চোখে চোখ রেখে বললো,
— মজা তো আপনি করছেন নিজের সাথে মিস আবৃতি। এভাবে নিজের মূল্যবান চোখের জল গুলো কেন নষ্ট করছেন?
আবৃতি ঢোক গিলে বললো,
— কখনো কখনো চোখর জল ও বেঈমানী করে বসে মিষ্টার ঐক্য।
— আপনি কাঁদুন৷ মন প্রাণ খুলে কাঁদুন। কান্না ও একটা শ্রেষ্ঠ মাধ্যম নিজেকে হাল্কা করার। কিন্তু তাই বলে নিজের নোংরা একটা পাস্টের জন্য কাঁদবেন? যেই পাস্টকে আপনি লাথি মেরে এগিয়ে গিয়েছেন নিজের লাইফে।
আবৃতি কিছু বললেনা৷ ওদিকে দরজার ধাক্কানোর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আরশানের কান্না। বাচ্চাটা ভীষণ ভয় পেয়েছে। আবৃতি হঠাৎ বাইরে থেকে দরজা আটকে দেওয়ায় সবার শ্বাস গলায় আটকে গিয়েছে। ঐক্য হতাশ শ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল। আহান হুড়মুড় করে রুম থেকে বের হয়ে দেখে আবৃতি থম মেরে সোফায় বসে আছে। আহান হাঁপাতে হাঁপাতে কতক্ষণ চেয়ে রইলো ওর দিকে। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে দাঁত মুখ খিচিয়ে ঠাশ করে এক থাপ্পড় মারলো আবৃতির ডান গালে। ঐক্য চোখের আকার প্রকট হয়৷ গোল গোল চোখে ও তাকিয়ে থাকে গালে হাত দিয়ে ঝিম ধরে বসে থাকা আবৃতির দিকে। আবৃতি কতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আহানের দিকে। পরক্ষণেই ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিয়ে বললে,
— তুই আমাকে মারলি আহান।
আহান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো,
–বি গ্রেটফুল যে চড়িয়ে তোর সামনের কপাটির দুটো দাঁত যে ভাঙ্গিনি। দরজা কেন আটকেছিলি হ্যাঁ?
এদিকে আবৃতির কান্না দেখে আরশানের কান্নার বেগ তরতর করে বাড়ল৷ ঐক্য বিহ্বলিত হয়ে সবাইকে দেখছে। চট করে আরশানকে কোলে তুলে কান্না থামাতে নরম সুরে বললো,
— কেঁদোনা বাবা। তোমার মাম্মা আর মামু তো হাইড এন্ড সিক খেলছিল।
আরশান এখনো ফোপাঁচ্ছে। ঐক্য ওর চোখের পানি মুছে বললো,
— একদম কান্না করেনা বাচ্চা। ওয়াফা যদি জানে তুমি কেঁদেছ তাহলে তোমাকে খুব পঁচাবে।
ব্যাস। ঝুপ করে কান্না থেমে গেল আরশানের। আবৃতি নিজের কান্না ভুলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ঐক্যর দিকে৷ লোকটা কি অভিনব কায়দা কপচালো। নাহলে এই ছেলে কাঁদেনা কাঁদেনা কিন্তু একবার শুরু হলে ননস্টপ টেপ রেকর্ডারের মতো নিরন্তর বেজে চলে।
আরশানের কান্না থামতেই ঐক্য আবৃতির দিকে চেয়ে রাশভারী আওয়াজে বললো,
— চলুন কান্নাকাটির পর্ব শেষ। এবার তাহলে যাওয়া যাক। আমার মেয়ে অপেক্ষা করছে।
— আমি বাইক নিয়ে আসব। আপনারা চলে যান।
এই বলে গটগট পায়ে আহান বের হয়ে যায়৷ জাহানারা বেগম ব্যাপক লজ্জা পেয়ে বললেন,
— বাবা তুমি বসোনা৷ আমি সরবত নিয়ে আসছি৷
— আন্টি প্লিজ ব্যস্ত হবেন না৷ আমাদের জলদি যেতে হবে।
— তুমি একমিনিট দাঁড়াও বাবা৷ কত ঘেমে গিয়েছ৷ দুইমিনিট লাগবে শুধু
এই বলে জাহানারা বেগম কিচেনের দিকে ছুটলেন।আবৃতি উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষীণ স্বরে বললো,
— আমি চোখমুখে একটু পানি ছিটিয়ে আসছি৷
— শুনুন।
আবৃতি পিছু ফিরে বললো,
— জি বলুন৷
— আপনার লিপস্টিক উঠে গিয়েছে। আরেকবার টাচ আপ করে নেবেন। আর পারলে একটু কাজল দেবেন। আপনার বড় বড় চোখ দুটিতে দারুণ মানাবে।
আবৃতির ঠোঁট জোড়া আপন গতিতে ফাঁক হয়।ঐক্যর চোখে আজ অন্য ভাষা৷ এই ভাষা একজন নারীর বহুল পরিচিত৷ আবৃতি একটা শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করে। তারপর একপ্রকার পালিয়ে যায় ঐক্যর সামনে থেকে।
.
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা হাতে কাজলটি তুলে নেয় আবৃতি। পরবে না কি পরবেনা এরুপ দ্বিধাদ্বন্দে শেষমেশ কাজলটা টানে নিজের হরিণ আঁখিদ্বয়ে। তারপর ঠোঁটজোড়ায় লিপস্টিকটা আরেকবার ঘষে নেয়। সেজেগুজে আয়নায় নিজেকে দেখে আবৃতির এত লজ্জা লাগলো। সাথেও অদ্ভুত অনুভূতি হলো কেন সে ঐক্যর কথায় প্রাধান্য দিল?
.
— চলুন৷
ঐক্য সোফায় বসে আরশানের সাথে খুনসুটিতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে মনে হয় ধাক্কার মতো খেল। সদা সাজসজ্জাহীন নারীটিকে আজ এই সাজে দেখে চোখ রীতিমতো ধাঁধিয়ে গেল। মেয়েটিকে নিজের কথা মতো সজ্জিত হতে দেখে ঐক্য ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো। আবৃতি এদিকসেদিক চোখের এলোমেলো পাতা ফেলে বললো,
— চ.. চলুন। দেরী হচ্ছে।
ঐক্য সোফা থেকে উঠতে উঠতে বললো,
— জি জি চলুন৷
★
একটা চেয়ারে গালে হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে ওয়াফা। ডাগর ডাগর আঁখিদ্বয় টলটল করছে উপচে আসা নোনাজলে। থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে লালচে নাকের ডগাটি। বোঝাই যাচ্ছে কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টায় রত বাচ্চাটি। এতগুলো মানুষ আশেপাশে না থাকলে হয়তো এতক্ষণে কেঁদেকুটে গাল ভাসাত।
— ইজ এনিথিং রং ঐশী?
ঐশীর সকল মনোযোগ ফোনের মধ্যে ছিল। চমকে উঠে তাকিয়ে দেখে ওয়াফার ফ্রেন্ডস তিথির মা। ওনাকে দেখে ঐশী হাসার চেষ্টা করে বললো,
— নো মিসেস মাহমুদ। এভরিথিং ইজ অল রাইট।
— না আসলে ওই দেখ ওয়াফা মন মরা হয়ে বসে আছে তাই বললাম। তুমি গিয়ে একটু দেখ। হয়তো কোন কিছু নিয়ে আপসেট।
মহিলাটির কথায় ঐশী সেদিকে তাকাল। ওয়াফার উদাস মুখশ্রী দেখে ওর অন্তর ব্যথিত হলো। এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ ওয়াফার মুখের সামনে ভাও বলে উঠলো। ওয়াফা খানিকটা ঠিক চমকালো। কিন্তু পরক্ষণেই তুলতুলে মুখটা আবার কালো করে নিল। ঐশী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রাত বাড়ছে হুড়হুড় করে৷ ঐক্য বের হয়েছে সেই ন’টা নাগাদ৷ এখন দশটা পঁয়ত্রিশ। কখন আসবে। আজকের দিনেও বাচ্চাটা মনমরা হয়ে বসে আছে।
— ওয়াফা সোনা?
এই ডাক এক মমতাময়ীর। যার অকৃত্রিম স্নেহ মা হারা নিষ্পাপ এক বাচ্চার হৃদয়ে অমোঘ এক টানের জন্ম দিয়েছিল সেই কবে। সময়ের সাথে সেই স্নেহের টানকে উপেক্ষা করতে পারেনি আবৃতি ওয়াফা কেউই। ওয়াফা সামনে তাকিয়ে দেখে আবৃতি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। ঐক্য আরশানকে কোলে নিয়ে পেছনে এসে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলে,
— এই নিন আম্মাজান।ইউর মোস্ট ওয়ান্টেড গিফট!
ওয়াফা লাফিয়ে নামলো উঁচু চেয়ারটা থেকে। আবৃতি আঁতকে উঠে হাত বাড়িয়ে দেয়। ওয়াফা সেই বাড়ন্ত হাতে একপ্রকার ঝাপিয়ে পড়ে। আবৃতিকে জড়িয়ে ধরে ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলে,
— তুমি খুব পঁচা সুইটি আন্টি।
আবৃতি হেসে মেয়েটাকে বুকে আগলে নিয়ে বলে,
— এই বাবা ঠিক করে বলোতো তো পঁচা আন্টি নাকি সুইটি আন্টি?
আরশান ঐক্যর কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
— আঙ্কেল দেখেছ ওয়াফাও কাঁদছিল। এখন ও আমাকে পঁচালে আমিও পঁচাব। হুম।
ঐক্য হাসতে হাসতে বললো,
— আচ্ছা পঁচিও।
— মাশাল্লাহ ওয়াফা সোনাকে তো একদম প্রিন্সেসের মতো দেখাচ্ছে। মিষ্টার ঐক্য, তা রাজকুমারীর রাজকুমার কোথায়? তার জন্য যে রাজকুমারী কাঁদতে কাঁদতে ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলেছেন দেখছেন না?
সবাই সমন্বয়ে হেসে উঠলো৷ লজ্জার লাল হয় ওয়াফার ফুলকো গাল দুটো। লজ্জায় হাত দিয়ে চোখ ডেকে বললো,
— যাহ!
ঐক্য হাসতে হাসতে পিছু ফিরে গেল। মিস আবৃতি না আসলে আজ কি যে হতো। জোবায়দা চৌধুরী হাসিমুখে ওদের থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণ ধরে তিনি জহুরি চোখে আবৃতিকে গভীরভাবে পরখ করছিলেন। মেয়েটার রুপে যতটুকু না মুগ্ধ হলেন তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ হলেন অমায়িক আচরণে। মনে মনে বাকিসব মায়েদের মতো যতটুকু সংশয় ছিল তা নিমিষেই দূরীভূত হলো। ঐশী চোখ দিয়ে মাকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলো,
— কেমন?
জোবায়দা চৌধুরী হাসলেন। ঐশী বুঝে নিল তার মতো তার মায়েরও আবৃতিকে প্রথম দেখায় পছন্দ হয়ে গিয়েছে। একটু পর আহান ডুকলো হাতে বিরাট একটা বাক্স নিয়ে। ও এটা শপ থেকে রিসিভ করে আনতেই লেট হলো একটু৷ আহান ডুকতেই ঐশীর সাথে চোখাচোখি হলো। আহান চমকে ঐশীর আপাদমস্তক চোখ বুলালো৷ কোনদিন শাড়ি নামক বস্ত্রে ঐশীকে দেখতে পাবে এটা কল্পনা করেনি ও। ঐশী লজ্জায় কুঁকড়ে গেল আহানের মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে।
— ওই দেখ মামু চলে এসেছে৷
সবাই এবার সেদিকে তাকাল। আহান এগিয়ে এসে সহাস্যে বিশাল বাক্সটা ওয়াফার দিকে এগিয়ে ধরলো,
–প্রিন্সেস ওয়াফা। আরশানের তরফ থেকে এই ছোট্ট তোহফা গ্রহণ করলে কৃতার্থ হতাম৷
ওয়াফা বক্সটা হাতে নিতে নিতে বললো,
— থাংকস পঁচা ছেলে৷
আরশানের হাসিমুখ দপ করে নিভে যায়। কঠোর চোখে ওয়াফার দিকে তাকায়।
— আম্মাজান!
ঐক্য টেনে ডাকলো। ওয়াফা হড়বড় করে বলে,
— থাংকস থাংকস আরশান৷
আরশান নাক ফুলিয়ে উত্তর দিল,
— ইউ আর ওয়েলকাম।
— চলো দাদুভাই তোমার সুইটি আন্টি চলে এসেছে। এবার কেক কাটো৷
আবৃতি অবাক হয়ে দেখে একটা ক্রিম কালারের জামদানী পরা একজন পৌঢ় নারী ওদের সামনে। ঐশী পরিচয় করিয়ে দিল,
— আপু আমার আম্মু৷
আবৃতি সলজ্জে সালাম দিল৷ ইশ এতক্ষণ খেয়ালই করলোনা ওনাকে।
জোবায়দা আবৃতির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
— চলো মা৷ তোমরা বোধহয় অনেক ক্লান্ত। বসবে চলো।
— না না আন্টি। আগে ওয়াফা সোনা কেক টা কাটুক। এমনিতেই অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।বাচ্চারা তো এত রাত জাগতে পারবেনা
— আচ্ছা চলো তবে৷
.
একটা বারো কি তের পাউন্ডের ডিজনি প্রিন্সেস থিমের কেককে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। আবৃতি ওয়াফাকে কোল থেকে নামিয়ে সরে যেতে নিলেই ঐক্য সবার অলক্ষে খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেলে। আবৃতির আপাদমস্তক তিরতিরিয়ে কেঁপে ওঠে। বিকট ভাবে হৃদয় ধড়ফড় করে। ঐক্য অপ্রস্তুত হয়ে সাথে সাথে হাতটা ছেড়ে দিল। ও নিজেও কিছুটা লজ্জিত বোধ করলো। চাপা স্বরে বললো,
— এখানে চুপচাপ দাঁড়ান মিস আবৃতি। ওয়াফা নাহয় কাঁদবে৷
আবৃতি এখনো ঘোরে আছে। কি হচ্ছে তখন থেকে ওর বোধগম্য হচ্ছে না৷
সবার অট্টহাসি শুনে ওদের হুশ ফিরে সেদিকে। ওয়াফাকে যে কেকটারর সামনে দাঁড় করানো হয়েছে সেটা ওয়াফা থেকে প্রায় দ্বিগুণ উঁচু। ওয়াফা হাত উঁচু করে কেকটার নাগাল পাওয়ার চেষ্টায় আছে। আবৃতি ফিক করে হেসে দিল। হাসতে হাসতে বললো,
— মিষ্টার ঐক্য কেকটা বোধহয় একটু বড় হয়ে গিয়েছে। অর্ডার করার আগে ওয়াফার সাইজের কথা মাথায় রাখা উচিত ছিল।
ঐক্য দুপাশে মাথা নাড়িয়ে হেসে বলে,
— ঠিক বলেছেন।
এগিয়ে এসে ওয়াফাকে কোলে তুলে নেয় ঐক্য। ডান গালে চুমু খেয়ে বললো,
— এবার কাটুন আম্মাজান।
ওয়াফা হাসিমুখে কেক কাটলো। ঐক্য একটা পিস সুন্দর মতো কেটে ওয়াফাকে খাইয়ে দিল। কপালে চুমু খেয়ে বললো,
— হাজার বছর বেঁচে থাকুন আম্মাজান আমার৷ পাপার সব আয়ু আপনার হোক৷
ওয়াফা বুঝলোনা এত কথা। ঐক্যর কোলে থেকেই সবাইকে কেক খাওয়ালো। কেক কাটার পালা শেষ হতেই জোবায়দা চৌধুরী সবাইকে তাড়া দিলেন ডিনার করার জন্য।
.
আবৃতিদের জোবায়দা চৌধুরী নিজেদের মানুষদের সাথেই বসালেন টেবিলে। আবৃতি ভীষণ ইতস্তত ভাবে বসলো৷ এদিকে আহান আরশানকে আবৃতির সাথে বসিয়ে নিজে ঐশীর একদম সামনাসামনি বসলো। দু’জন দুজনের আজ চোখে চোখে অনুভূতি বিনিময় হচ্ছে। হঠাৎ কোত্থেকে সোহান এসে একদম ঐশীর পাশের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। ঐশীর দিকে তাকিয়ে হাসলো৷ বিপরীতে ঐশীও হাসলে। আহানের চোখ এড়ালো না কিছুই৷ ও ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছে এই যুবক কে?
— ঐশী তোমার সোহেলি আন্টিকে বিফ এগিয়ে দাও।
জোবায়দা চৌধুরী বললেন। ঐশী বিনীত হেসে চামচ তুলে বিফ দিতে গিয়েই বাঁধলো গন্ডগোল। পাশে সোহান থাকায় তরকারীর ঝোল ছিটকে খানিকটা ওর শার্টে পড়লো। ঐশী আঁতকে উঠে। তড়িঘড়ি করে টিস্যু নিয়ে সোহানের শার্ট মুছতে মুছতে বললো,
— আ’ম রিয়েলি স্যরি সোহান ভাইয়া৷।
— ইটস ওকে ঐশী।
— আহ ঐশী। একটু দেখেশুনে কাজ করবে তো। এত অপটু হলে চলে।
সোহানের মা হেসে বললেন,
— সমস্যা নেই জোবায়দা আপা৷ বিয়ের আগে মেয়েরা অপটুই থাকে।
জোবায়দা চৌধুরী হতাশ স্বরে বললেন,
— মেয়েটা ঘরের কাজ কিছুই পারেনা সোহেলি।
তিনি গদগদ হেসে বললেন
— আরো রাখোতো। আমি আমার ঘরের মেয়ে নিয়ে যাব। তোমার ঘরে যেরকম আছে, আমার ঘরেও ঠিক সেরকম আহ্লাদে থাকবে। আমার একমাত্র ছেলের বৌয়ের যত্নে কোন ত্রুটি থাকবেনা হ্যাঁ।
চলমান…..