লেখিকা:জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০৭
মেহেরুন এক গ্লাস শরবত নিয়ে ঘরে এলো। ওয়াহীদকে দেখল ঘর জুড়ে পায়চারি করছে আর কথা বলছে কারোর সাথে। মেহেরুন দাঁড়িয়ে রইল এক কোণায় চুপটি করে। ওয়াহীদ ফোন কাটল আরও কতক্ষণ পর। এরপর মেহেরুন এগিয়ে এল। শরবতের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল তার দিকে। ওয়াহীদ তাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে গ্রহণ করল সেটা। চুমুক বসিয়ে বলল,
‘লেবুর টেস্ট কম পাচ্ছি।’
‘ঘরে যা ছিল তাই দিয়েই করেছি।’
ওয়াহীদ আর কিছু বলল না। সে ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি ফেলতেই মেহেরুন জিজ্ঞেস করল, ‘সেহেরিতে আজ কী খাবেন?’
ভ্রু উঁচাল ওয়াহীদ। বিস্ময় নিয়ে মেহেরুনের দিকে চাইল সে। অদ্ভুত ভাবে মেহেরুনের দিকে কয়েক পল চেয়ে কপাল কুঁচকাল আবার। বলল হেঁয়ালি করে, ‘উদ্দেশ্য কী? হঠাৎ এত বদল?’
মাথা নুইয়ে মৃদু হাসল মেহেরুন। নরম সুরে বলল, ‘মেনে নেওয়াটা কষ্টের তাই মানিয়ে নিতে চাইছি।’
তাচ্ছিল্যের হাসির দেখা মেলল ওয়াহীদের ঠোঁটে। মেহেরুনের আগাগোড়া দেখে নিয়ে বলল, ‘ভালো বলেছ। তাছাড়া তোমার কাছে আর কোনো পথও খোলা নেই। আপাতত খালার কাছ থেকে জেনে নিয়ে রান্না বসাও। আমার ওতো পছন্দ অপছন্দ নেই।’
মেহেরুন কিছু না বলে ওযু করে নামাজটা সারল আগে। এরপর গেল রান্নাঘরে। ততক্ষণে খালা মোটামুটি সব সেরে নিয়েছেন। মেহেরুন টুকটাক বাকি কাজগুলো করতে করতেই খালাকে বলল, ‘আচ্ছা খালা, বাবা এত নরম সরম একজন মানুষ, তাহলে উনার ছেলেটা এমন কেন হলো? মা কি খুব কঠিন ধাঁচের মানুষ ছিলেন? উনি বোধহয় মায়ের মতোই হয়েছেন, তাই না?’
খালা এঁটো বাসনগুলো মাজছিলেন। হঠাৎ হাত থামল তার। খানিক কী ভেবে যেন বললেন, ‘না, ছোট আব্বার কপাল অত ভালা না। উনি উনার মায়ের ছায়ায় বড়ো হন নাই।’
‘মা বোধহয় খুব অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিলেন, তাই না? আমার মনে হয়, উনি মায়ের ভালোবাসাটা যথাযথ পাননি বলেই একটু এমন কাঠখোট্টা হয়ে গেছেন। আসলে সন্তানদের জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত মা’কে লাগে।’
খালা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘আপা তো মারা যান নাই।’
সেই কথা আর মেহেরুনের কানে গেল না। সে মনোযোগী নিজের কাজে। খালাও ব্যাপারটায় আর কথা বাড়ালেন না এরপর।
___
হাতমুখ ধুয়ে মুছে বিছানায় এসে বসল মেহেরুন। ওয়াহীদ বারান্দায় ছিল। ফোনে করছিল কিছু একটা। এখন দরজাটা আটকে দিয়ে ঘরে এসেছে। মেহেরুনকে আমলে না নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল লম্বা হয়ে। মেহেরুন আড় চোখে তাকে দেখল একবার। শুতে গিয়েও কী ভেবে যেন বলল,
‘আপনার পা টিপে দিব?’
চোখ বোজা ছিল ওয়াহীদের। মেহেরুনের প্রশ্নে কপালের চামড়া টেনে তাকাল সে। হয়তো মেয়েটার হাবভাব কিংবা উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে সে। কালও যে কাজের কথা বললেই মেজাজ হারাত, আজ সে সেধে সেধে কাজ করতে চাইছে কেন? কোন উদ্দেশ্যে? পরক্ষণেই আবার ভাবল, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, সে সেটা কখনোই সফল হতে দিবে না। তাই চোখ বুজল আবার। বলল, ‘দাও।’
মেহেরুন পায়ের কাছটায় বসল গিয়ে। সত্যি সত্যিই টিপে দিতে লাগল। সঙ্গে বলল, ‘তাছাড়া হাত, মাথা, গলা যা বলবেন তাই টিপে দিতে পারব, আমার কোনো অসুবিধা নেই।’
তড়াক চোখ মেলল ওয়াহীদ। হালকা চেঁচানোর সুরে বলল, ‘কী?’
মেহেরুন হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল, ‘না মানে, হাত বা মাথা-টাথা ব্যথা করলে বলবেন। আমি মাথায় খুব সুন্দর ম্যাসাজ করতে পারি।’
‘প্রয়োজন নেই। পা ছাড়ো। ঘুমাও।’ ওয়াহীদ বোধহয় মেজাজ হারাল।
‘কেন? আরাম পাচ্ছেন না আজ?’
‘আমার আরামের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমাকে যা বলা হয়েছে তাই করো।’
মেহেরুন গাল ফুলাল এমন ভাবে যেন পা টিপতে না দেওয়াই তার ভীষণই মন খারাপ হয়েছে। সে লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে এসে শুয়ে পড়ল চুপচাপ। ভাবল, বাবার কথাই বোধহয় সত্যি। এভাবেই লোকটাকে জব্দ করতে হবে।
সেহেরিতে খেতে বসে ওয়াহীদের প্রতি ভীষণ আহ্লাদ দেখাল মেহেরুন। জোর করে এটা ওটা দিয়ে দিত চাইল তার পাতে। এত যত্ন দেখাল যে ওয়াহীদ খাওয়ার মাঝেই বিষম খেল কয়েকবার। চোখ পাকিয়ে বারংবার তাকালেও মেহেরুন সেসবে মাথা ঘামাল না। সে দ্রুত উঠে যেতেই মেহেরুন বসল। নিজের পাতে খাবার তুলতে তুলতে শ্বশুরকে বলল,
‘আপনার টোটকা বোধহয় কাজে দিচ্ছে, বাবা।’
ভদ্রলোক হাসলেন সশব্দে। বললেন, ‘লেগে থাকো। ইনশাআল্লাহ, ভালো ফল পাবে।’
ঈদের আর বেশি বাকি নেই। তিন থেকে চারদিন হয়তো। ছেলেকে নিয়ে বসে সকালের খবরের কাগজটা পড়তে পড়তেই মামুন শিকদার বললেন, ‘হাতে আর সময় নেই বেশি। শহরে গিয়ে মেহেরুনকে নিয়ে ঈদের শপিংটা সেরে এসো।’
খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে বাবার দিকে তাকাল ওয়াহীদ। অভিব্যক্তিতে বিরক্তির ছাপ। বাবার কথা পছন্দ হয়নি তা যে কেউ বুঝবে। রাশভারী স্বরে বলল, ‘ছোট বাচ্চা নয় যে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে শপিং করাতে হবে। টাকা দিয়ে দিব, ও ওর পছন্দ মতো কিনে নিবে।’
‘ছোট বাচ্চা না কিন্তু তোমার স্ত্রী। তাকে নিয়ে ঈদের শপিং এ যাওয়া তোমার দায়িত্ব। এবং তুমি অবশ্যই সেই দায়িত্ব পালন করবে। আমাকে যেন আর বলতে না হয়।’
মামুন শিকদার উঠে দাঁড়াতেই ওয়াহীদ চোয়াল দৃঢ় করে বলল, ‘আব্বা, আপনি সবকিছু আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।’
‘তোমার ভালোর জন্য বাধ্য হচ্ছি। আশা করছি, একদিন তুমি বুঝবে ঠিক।’
চলে গেলেন তিনি। ওয়াহীদ আগের মতোই বসে। হাতের খবরের কাগজটাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিল নিচে। এরপর গলা উঁচিয়ে ডাকল, ‘মেহেরুন! মেহেরুন!’
ফিহাকে দিয়ে ঐ বাড়ি থেকে কিছু কাপড় আনিয়েছিল মেহেরুন। সেসবই ভাঁজ করে আলমারিতে রাখছিল এখন। আচানক ওয়াহীদের গলা পেতেই সব কাজ ফেলে সে ছুটে যায়। বেলকনিতে গিয়ে বড়ো নিশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, ‘ডাকছিলেন?’
নিজেকে সংযত করল ওয়াহীদ। বলল, ‘তৈরি হও। আমার সাথে বেরুবে।’
‘কোথায় যাব?’
চট করে উঠে দাঁড়াল ওয়াহীদ। আমর্ষ গলায় বলল, ‘জাহান্নামে। কোনো সমস্যা আছে?’
মাথা নাড়ল মেহেরুন। কোনো সমস্যা নেই। ওয়াহীদের সাথে সে সব জায়গায় যেতে পারবে। ওয়াহীদের বড্ড বাধ্যগত বউ কিনা!
সত্যি সত্যিই আর কোনো প্রশ্ন ছাড়া তৈরি হলো মেহেরুন। নতুন বউ হিসেবে শাড়ি পরে একটু ভালো মতোই তৈরি হলো সে। ওয়াহীদ বেলকনি থেকে ঘরে এসে আরও চটল। এমনিতেই মেজাজ খারাপ, তারউপর মেহেরুনের এত আয়োজন করা সাজ দেখে রাগে ধমকে উঠল সে, ‘শপিং এ যাচ্ছি। বিয়ে খেতে না। ঠোঁট, চোখ মুছে এসো, যাও।’
মেহেরুন রাগের কারণ বুঝল না। সে তো অতিরিক্ত কিছু করেনি। কাজল আর লিপস্টিকটাই দিয়েছিল। তাও লোকটার মনে ধরল না? ফুঁস করে নিশ্বাস ফেলল মেয়েটা। তর্ক করল না। লিপস্টিক আর কাজল তুলে এল। তাকে আরেক ঝলক দেখে নিয়ে ওয়াহীদ বলল,
‘মাথায় কাপড় দাও। বাইরে গেলে যেন মাথা থেকে কাপড় না সরে।’
মেনে নিল মেহেরুন। বাধ্য মেয়ের মতো মাথায় কাপড় দিল। এরপর ওয়াহীদের সাথে রওনা দিল পেছন পেছন। ওয়াহীদ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে না। ভুলভাল কোনো জায়গায় নিয়ে গিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলার ভয়টা অবশ্য তার নেই। মেজাজ যা দেখছে, নিশ্চিত বাবার কথাতেই কোথাও নিয়ে যাচ্ছে হয়তো।
গাড়িটা গ্রাম পেরিয়ে শহরের রাস্তায় উঠতেই চমকাল মেহেরুন। জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা শহরে কেন যাচ্ছি?’
‘গেলেই বুঝতে পারবে।’ কাঠকাঠ গলায় জবাব ছুড়ল ওয়াহীদ।
মেহেরুন কিছু বলল না আর। সিটে মাথা হেলিয়ে একবার অনুরোধ করল, ‘এসিটা বন্ধ করে জানলার গ্লাসগুলো একটু নামিয়ে দিবেন?’
‘না।’
জবাবে মন খারাপ হলেও মেহেরুন কিছু মনে রাখল না। চুপচাপ চেয়ে রইল বাইরে। গাড়ি গিয়ে থামল শহরের সবচেয়ে বড়ো শপিং মলটার সামনে। এবার কিছু আন্দাজ করতে পারল মেহেরুন। গাড়ি থেকে নেমেই বলল, ‘আমার ঈদের শপিং হয়ে গিয়েছে আরও আগেই। আর লাগবে না।’
ওয়াহীদ গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমি বেকার কিংবা ছোটলোক না যে, আমার স্ত্রীকে তার বাপের কিনে দেওয়া ড্রেস দিয়ে ঈদ করাব।’
ওয়াহীদ হাঁটা ধরল। মেহেরুন ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে পেছন পেছন পা বাড়াল তার।
চলবে….