লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০৬
~
তনিমাকে নিজের রুমে দেখে তনিমার শাশুড়ি রিনা রহমান কিছুটা অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন,
‘কি হয়েছে,তনু?’
তনিমা কিছু না বলে তার শ্বাশুড়ীর পাশে গিয়ে বসে পড়ল তারপর মন খারাপ করে চুপচাপ বসেই রইল। রিনা রহমান কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে তাকে খেয়াল করলেন, তনিমা কিছুই বলছে না শুধু মুখ কালো করে বসে আছে। রিনা রহমান এবার তনিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
‘ কি হয়েছে মা তোর?
তনিমা বিষন্ন চোখে তার দিকে তাকাল, বলল,
‘মা, তোমার ছেলে আমার সাথে শুধু শুধু রাগ দেখায়। ওকে একটু বলেছিলাম আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে তাতেই ও রেগে যায়। বলে কিনা সারাদিন রান্নাবান্না করেছো এখন গিয়ে রেস্ট নাও। আর উনি ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকবেন। তাই আমিও চলে এসেছি ওই রুমেই থাকবো না, তোমার সাথে এখানে থাকবো।’
রিনা রহমান হেসে বললেন,
‘তোদেরকে নিয়ে না আর পারিনা। বিয়ে হয়ে গিয়েছে তবুও তোদের ঝগড়া কমলো না।’
তনিমা তার শাশুড়ির কথার পিঠে কিছু বললো না। চুপচাপ বিছানার একপাশে শুয়ে পড়ল। তারপর তার শাশুড়ি মা কে বলল,
‘মা আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও তো আমি ঘুমাবো।’
রিনা রহমান তনিমার পাশে শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
.
.
মাগরিবের আযান দিতেই ফায়াজ ল্যাপটপ টা বন্ধ করে রুম থেকে বের হলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে তনিমাকে খুঁজতে লাগল কিন্তু তাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে ফায়াজ ফিহার রুমে গিয়ে একটু উঁকি দিয়ে দেখল তনিমা আছে কিনা। কিন্তু, সেখানে কেবল ফিহা আর তার কাজিনরা আড্ডা দিচ্ছে তনিমা সেখানেও নেই। তনিমাকে কোথাও না পেয়ে ফায়াজ তার মার রুমে গেল। দরজায় নক করে বললো,
‘ মা আসবো?’
ভেতর থেকে রিনা রহমান বললেন,
‘ হ্যাঁ আয়।’
ফায়াজ ভেতরে এসে দেখল রিনা রহমানের পাশে তনিমা ঘুমিয়ে আছে। তা দেখে ফায়াজ কপাল কুঁচকে বললো,
‘ এই মেয়ে কে খুঁজতে খুঁজতে আমি শেষ আর এ এখানে মরার মত ঘুমাচ্ছে।’
রিনা রহমান বললেন,
‘ ঘুমাবে না তো কি করবে মেয়েটা? একটু ঘুরতে যেতে চেয়েছিল তাও তো নিয়ে যাচ্ছিস না। উল্টো নাকি ওর সাথে রাগ দেখিয়েছিস। তাই ও ও রাগ দেখিয়ে আমার রুমে এসে শুয়ে পড়েছে। তোর রুমে নাকি আর যাবেই না। তুই নাকি শুধু শুধুই ওর সাথে রাগ দেখাস।’
ফায়াজ তার মার পাশে বসে বলল,
‘রাগ কবে দেখালাম মা? আমি তো ওকে শুধু রেস্ট নিতে বলেছিলাম তাতেই ও রেগে গিয়েছে, এখানে আমার কি দোষ বল তো?’
কথাটা শেষ করতেই হঠাৎ করে তনিমা শোয়া থেকে উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠলো, বললো,
‘ওই মিথ্যা বলিস কেন? একটু ঘুরতে নিয়ে যেতে বলেছিলাম বলে তুই আমার সাথে উল্টাপাল্টা কথা বলিসনি? এখন মায়ের সামনে ভদ্র সাজা হচ্ছে তাই না?’
ফায়াজ চোখমুখ কুঁচকে তনিমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘এই তুই জেগে আছিস?’
তনিমা বড় একটা হাই তুলতে তুলতে বলল,
‘তোর কথা শুনে আর ঘুমিয়ে থাকতে পারলাম না।’
তারপর সে তার শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ মা এবার তোমার ছেলেকে আমায় সরি বলতে বল। আমার সাথে ও কেন শুধু শুধু রাগ দেখালো তার জন্য ওকে সরি বলতে হবে, শুধু সরি না কানে ধরে সরি বলতে হবে।’
ফায়াজ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো,
‘আমার কি আর খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই যে আমি তোকে সরি বলতে যাব তাও আবার কানে ধরে।’
তনিমা গাল ফুলিয়ে ক্রোধ নিয়ে বললো,
‘মা, তুমি তোমার ছেলেকে কিছু বলবা?’
রিনা রহমান তেতো মুখে বললেন,
‘তোরা দুজনেই এখন আমার হাতে মার খাবি। বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখনো তোরা এক জন অন্য জনকে তুই তুকারি করছিস? এটা কেমন কথা? আমি যেন আর তোদের কারো মুখে তুই সম্বোধন না শুনি। মনে থাকবে তো?’
তনিমা মাথা হেলিয়ে বললো তার মনে থাকবে। ফায়াজ তখন বললো,
‘মা, ওকে আমি কালই বলেছিলাম, আমরা তো হাসবেন্ড ওয়াইফ তাই আমরা আর এখন থেকে তুই তুকারি করবো না। কিন্তু ও তো আমার কথা শুনবেই না। তাই দেখনা এখনও তুই করেই বলছে।’
তনিমা সরু চোখে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ভালো সাজার চেষ্টা করছিস? তুই আমাকে কাল কি বলেছিলি সব কিন্তু আমার মনে আছে। মায়ের সামনে একদম বানিয়ে বানিয়ে কোন কথা বলবি না।’
ফায়াজ ফ্যালফ্যাল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ সুরে বললো,
‘মা, দেখেছ তোমার বউমা আমাকে এখনও তুই করেই বলছে। ও কারো কথায় শুনে না। না তোমার কথা না আমার কথা।’
রিনা রহমান ব্রু বাঁকিয়ে তনিমার দিকে তাকাতেই তনিমা দাঁত কেলিয়ে হাসল। বললো,
‘না মানে ইয়ে, আর ভুল হবে না। এখন থেকে তুমি করেই বলবো।’
তনিমার চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে ফায়াজ ঠোঁট চেপে হাসল। তনিমা আড় চোখে ফায়াজের হাসি দেখে রাগে জ্বলে উঠল। চোখের ইশারা দিয়ে ফায়াজকে বুঝাল একবার তাকে একা পেলেই খবর করবে।
ওদের কথার মাঝেই হঠাৎ নিচ থেকে কারোর চেঁচানোর শব্দ শোনা গেল।
‘সন্ধ্যা সাতটা বাজতে চললো অথচ এখনও আমি আমার চা পেলাম না। মানুষগুলো গেল কই সব? আর বাড়ির বউ সে কই? বিকেলের বিশ্রাম নেওয়া কি এখনও শেষ হয়নি? কোথায় সে? সন্ধ্যা হয়েছে কই এখন নিচে এসে সকলের জন্য চা নাস্তা বানাবে তা না করে সে এখনও রুমে দোর দিয়ে বসে আছে। আজ কালকার মেয়েগুলো একটু আদব কায়দাও জানে না।’
কথাটা বলেই জোরে একটা নিশ্বাস টেনে মুখে একটা পান পুরে দিলেন শেফালী খাতুন। তারপর সোফাটার মধ্যে গা এলিয়ে দিয়ে বসলেন।
তনিমা মুখ গম্ভীর করে বললো,
‘মা, জেঠীমা এমন কেন করেন? সবসময়ই এত রেগে কেন থাকেন উনি?’
রিনা রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,
‘আমি জানি নারে মা। আমার বিয়ের পর থেকেই উনাকে এমন দেখে আসছি। এই পর্যন্ত এত বছর পার হলো উনার মধ্যে এইটুকুও বদল ঘটল না। বড় ভাই মারা যাওয়ার পর তো আরও বেড়ে গিয়েছে। উনার এই অতিরিক্ত রাগ আর ক্রোধের জন্য উনার ছেলের সংসারও ভেঙ্গেছে। তারপরও উনি বুঝেন না। কিছু থেকে কিছু হলেই চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলেন। রাগ আর বিদ্বেষে পারেন না সবকিছু ধ্বংস করে ফেলেন। তবে জানিস তো, উনার একটা ভালো দিক আছে। উনার যদি একবার কাউকে পছন্দ হয় তাহলে উনি তাকে মাথায় তুলে রাখেন। তাই মা, তুই একটু কষ্ট করে কয়টা দিন উনার সাথে এডজাস্ট করে নে। কিছুদিন পরই উনি চলে যাবেন তারপর আর কোন সমস্যা হবে না।’
তনিমা কোন প্রতিত্তুর করলো না। ফায়াজ হঠাৎ রাগ দেখিয়ে বললো,
‘জেঠীমার এই রাগের পেছনে কিন্তু বাবারও হাত আছে মা। বাবা জেঠীমাকে কিছু বলেন না। জেঠীমা অন্যায় করলেও বাবাও উনার তালে তাল মেলান। আর এই জন্যই জেঠীমা আরও বেশি বিগড়ে যাচ্ছেন। কিছু হলেই বাবার কাছে এটা ওটা লাগিয়ে দেয়। আর বাবা আমাদের কোন কথা না শুনেই রাগারাগি করেন। এটা কি ঠিক তুমিই বলো?’
রিনা রহমান নিশ্চুপ বসে রইলেন। তনিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
‘মা, আমি নিচে গিয়ে সবার জন্য চা বানাচ্ছি। তোমরা কথা বলো।’
এই বলে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
তনিমা বেরিয়ে যেতেই রিনা রহমান চোখ তুলে তার ছেলের মুখ পানে চাইলেন। ফায়াজের চোখে মুখেও তিনি স্পষ্ট ক্রোধের ছাপ দেখতে পাচ্ছেন। তিনি তখন মিঁইয়ে যাওয়া গলায় বললেন,
‘তুই খুব ভালো করেই জানিস ফায়াজ, তোর বাবা ভাবিকে তার বড় বোনের মতো ভালোবাসেন। আর ভাবির কাছেও তোর বাবা তার ছোট ভাই। তোর বড় চাচা মারা যাওয়ার পর ভাবির সমস্ত দায়িত্ব তোর বাবা নিয়েছে। কোনদিন ভাবিকে এইটুকু সমস্যাতেও পড়তে দেয়নি। সবসময় একজন ভাইয়ের মত আগলে রেখেছেন তাকে। তুই তো বুঝিস বাবা, তনিমা হয়তো এতকিছু জানে না। তাই ওর খারাপ লাগে। তুই সব জেনে শুনেও কেন এত রাগ দেখাস বলতো? একটু ধৈর্য ধরে মেনে নিলে কি হয়। মানুষটা তো কয়টা দিনের জন্য শুধু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে। সবসময় তো আর থাকে না। এই কিছুদিন একটু সহ্য করে নিতে পারবি না?’
ফায়াজ শক্ত দৃষ্টি কোমল হলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন হেসে বললো,
‘ঠিক আছে। তোমার কথাই মেনে নিলাম। জেঠীমা যতদিন আছে আমি আর উনার কোন কথায় রাগ দেখাবো না। তবে হ্যাঁ, উনি যদি তনিমার সাথে কোন প্রকার খারাপ ব্যবহার করে তাহলে কিন্তু আমি ছেড়ে কথা বলবো না।’
ফায়াজের মা অধর ছড়িয়ে হেসে বললো,
‘মেয়েটাকে খুব ভালোবাসিস, তাই না?’
ফায়াজ কিছু বললো না। কেবল ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
চলবে..