লেখিকা:তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
পর্ব:২
[কপি করা নিষিদ্ধ]
– আমি সাজিদ মাহতাব বলছি। আপনার সাথে আমার বিয়ের কথা চলছে।
নিশির গলা শুকিয়ে এলো হঠাৎ ফোনকলে। সে ভাবতেও পারেনি সাজিদ কল দিবে তাও এই সময়ে। অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলো,
– জ…জ্বি চিনেছি।
– আপনার আব্বুর অনুমতি নিয়েই নম্বর নিয়ে কলটা দিয়েছি। আপনাকে কি বিরক্ত করলাম? ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? আপনার সাথে একটু কথা বলা যাবে?
সাজিদের কথাবলার স্টাইলটা সোজাসাপ্টা। নিশি আমতা আমতা করে বললো,
– না মানে.. জেগেই ছিলাম।
সাজিদ বোধহয় মৃদু হাসলো।
– আচ্ছা… তবুও এই সময় কল দেওয়ার জন্য দুঃখিত আসলে আমার দিনে ডিউটি ছিলো আগামীকাল ও ডিউটি আছে তাই এই সময়টাতেই ফ্রি হয় তাই আরকি
– জ্বি সমস্যা নেই।
– তো যেটা বলতে চেয়েছিলাম, আমি আসলে ভনিতা করতে চাই না। আজকে আপনার পরিবার থেকে জানানো হয়েছে তারা রাজি। আপনারও মতামত আছে আসলে আমি আপনার কাছে সরাসরি জানতে চাইছি। আমার পরিবার থেকে তো আগেই জানানো হয়েছে সকলের সম্মতি রয়েছে। তাই আপনার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম আপনার মতামত… আপনার কোনো দাবি বা শর্ত আছে?
নিশির হৃদপিন্ড যেন গলায় এসে গেছে সে সরাসরি এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। নিশিকে চুপ থাকতে দেখে সাজিদ নরম কণ্ঠে আবার বললো,
– নিশি, আপনার কোনো সমস্যা থাকলে বিনা দ্বিধায় বলতে পারেন
– না.. মানে আব্বু আম্মু যা চেয়েছেন তাই হবে। আমার… আমার কোনও সমস্যা নেই।
এবার সাজিদ ওপাশ থেকে স্পষ্ট করে হাসলো।
– যাক। তবে আপনি কি সবসময়ই জ্বি আচ্ছা এমন ছোট উত্তর দেন? এই একটা লাইন বলতেই আপনার নার্ভাসনেস বেরিয়ে আসছে!
নিশি থতমত খেলো। কোনরকম বললো,
– না আসলে… আমি আসলে কারো সাথে এভাবে কথা বলিনি তো তাই।
– বুঝতে পারছি সমস্যা নেই। ভয় নেই কোনো। আরেকটা কথা!
– জ্বি
– আমি খুব ছোট করে বিয়ের অনুষ্ঠান করবো আপনার কোনও সমস্যা নেই তো?
নিশি খুশিই হলো এটা শুনে তাই সে স্পষ্ট করেই জবাব দিলো,
– না কোনও সমস্যা নেই। আমি নিজেও চাই না কোনও ঝাঁকজমক অনুষ্ঠান।
সাজিদ হেসে বললো,
– বাহ বেশ। আমি ছুটি কাটিয়েছি মাত্র আবার কিছুদিন পর ছুটিতে যাব তবে লম্বা ছুটি পাবো না,হয়তো দু সপ্তাহ পর তাই এর মধ্যেই সবকিছু শেষ করতে হবে। হয়তো কাল আপনাদের বাড়িতে যাবে আমার বাড়ির লোকজন।
– আচ্ছা।
– রাখছি তবে। ভালো থাকবেন।
– জ্বি, আসসালামু আলাইকুম
– ওয়াআলাইকুমুস সালাম।
কল কেটে আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়লো নিশি। বুকের ধুকপুকানি এখনো কমে নি। প্রথমবার এভাবে কোনও পরপুরুষের সাথে কথা বললো সে। গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা তার মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যতটা গম্ভীর ভেবেছিল ততটা মনে হয়নি যদিও তবে কথাবার্তা ক্লিয়ারকাট। কথাবার্তায় কতৃত্ব লুকিয়ে আছে তবে সেটার আড়ালে ভদ্রতা!
—————
পরদিন সকাল থেকে তোড়জোড় লেগে আছে। সাজিদের বাড়ির লোকেরা আসবেন বিকেলেই। খুব বেশি কেও নয় সাজিদের ঘরের মানুষজনই।
বিকেল হতেই গাড়ি এসে থামলো নিশিদের বাড়ির সামনে। নিশির রুমের দক্ষিণের জানালা হতে নিচে সব দেখা যায়। নিশি সেখানেই দাঁড়িয়ে দেখছিল। সাজিদের মা বাবা আর সাথে বোধহয় বোন আর বোন জামাই।
– আসাদ ভাই, আমরা কিন্তু মেয়ে নিতে একদম প্রস্তুত এখন শুধু একটা ভালো দেখে ডেট ফেলেন।
সাজিদের বোন বললো,
– হ্যাঁ ভাইয়া খুব লম্বা ছুটি পাবে না তাই বলছিল এই সপ্তাহের মধ্যে সব তোড়জোড় শেষ করে পরের সপ্তাহের শুরুতে ডেট ফেলতে।
নিশির বাবা আসাদুজ্জামান হতবাক হয়ে বললেন,
– কিন্তু এত দ্রুত?
– আসলে ভাই বুঝেনই তো ছুটি পাইনা যখন তখন আমরা নাহয় গ্রাম থেকে আসতে পারি কিন্তু ও শহরে থাকলেও ওর প্রতিদিন ডিউটি থাকে দিন রাত চলে যায়।
আসাদুজ্জামান মাথা নাড়লেন। সত্যিই তো এত ঘন ছুটি পাবে কিভাবে।
– ঠিক আছে তাহলে সাজিদের সুবিধা মতো একটা ডেট ঠিক করেন আমাদের কোনও সমস্যা নেই।
কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা চললো। তারপর এই সিদ্বান্তে আসলো যে কাল বাদে পরশু শুক্রবার এবং সেই শুক্রবার বাদে পরের শুক্রবার শুভকাজ সেরে ফেলা যাবে! ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিতে মুখরিত হলো পুরো ড্রইং রুম। মিষ্টি মুখ চললো।
নিধি তো খুশিতে আত্মহারা। আপুর বিয়ে, অনেক মজা করবে!
তারপর খাওয়াদাওয়া করে বিদায় নিলেন সকলে।
সাজিদের বোন সাজিয়া মাহতাব নিশিকে বলেছিল সাজিদ শহরে ফ্ল্যাটে থাকে আর তাদের বাবা মা গ্রামে থাকে। আর তার বোনের তো বিয়ে হয়েছে সে থাকে শশুরবাড়ি অন্য জেলায়। তার মতে বিয়ের পর নিশি থাকবে সাজিদের সাথে শহরেই আর সাজিদের মা বাবা গ্রামে। মাঝে ঘুরতে আসেন তবে একেবারে থেকে যেতে নারাজ তারা। অগত্যা সাজিদকে একা থাকতে হয় তবে এখন নিশি আসবে এই ভেবে সকলে স্বস্তি। কিন্তু নিশি ভাবছে কিভাবে একা থাকবে শুধু সাজিদের সাথে, কেউ নেই! কোনো অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়া ছাড়া নতুন একটা সংসার সামলাতে শিখবে কিভাবে?
নিশির মা ঘরে এসে নিশিকে শান্ত হয়ে থাকতে দেখে বললো,
– কি হয়েছে আমাদের চঞ্চলা রানী এমন নিশ্চুপ কেন?
নিশি ভাবনা থেকে বেরিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। নিশি খুব শান্ত না খুব চঞ্চল ও না তবে আপন মানুষগুলোর সামনে খুবই প্রাণখোলা। মায়ের সাথে তার সম্পর্ক খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সবকিছু শেয়ার করে সবটা জানায়। সে মাকে পাশে বসিয়ে বললো,
– আম্মু, তোমরা আমার চঞ্চলতা মেনে নিয়েছো কিন্তু পরে কি হবে? ওরা কি মানবে? সাজিদ?
– এটা কেমন কথা? ওরা তো জানে তুই কেমন সেটা দেখেই তো পছন্দ করেছে নাকি? তবে হ্যাঁ একটু তোহ বুঝদার হতে হবে। কিন্তু তোর স্বভাব পাল্টাতে বলেনি কেউ।
– তবে আমার অগোছালো চঞ্চল স্বভাব নিয়ে যদি তাদের সমস্যা হয়?
– হবে না ইনশাআল্লাহ। সাজিদকে একদিন যতটুক দেখলাম বুঝলাম ছেলেটা যথেষ্ট ভালো। তার এসব নিয়ে কোনও সমস্যা মনে হয়নি। আর সবাই চাই জীবনসঙ্গী যেন প্রাণখোলা হয় ঠিক ডায়রির মতো।নাহয় দুজনই যদি চুপ করে বসে থাকে সেটা তো নিস্তব্দ গুমোট পরিবেশ তৈরি করবে।
নিশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
– ওনার বোন বলছিল ওনি নাকি শহরে একা থাকে! আমি একা কিভাবে সামলাবো? আমি তো কিছুই জানি না।
নিশির মা হাসলেন। মেয়েকে আদর দিয়ে বললেন,
– সবাই কি সব শিখে আসে রে মা? এই আমাকে দেখ তোর বাবার হাত ধরে যে এসেছি তখন নুন চিনির তফাতটাও বুঝতাম না। সময়ের সাথে সবটা শিখেছি। তুই তো অনেকটাই পারিস বাকিটা শিখে যাবে। আর সাজিদ বিবেচক ছেলে তোর বাবার পরিচিত একজনের চেনার সুবাদে তার খোঁজ খবর নিয়েছে। সে তোকে আগলে রাখবে আমার বিশ্বাস। আর ভুল করবি শিখবি এভাবেই তো সংসার। আর কিছু হলে আমি আছিই আমাকে কল দিবি।
মায়ের আশ্বাসে নিশি একটুখানি স্বস্তি পেলো বটে কিন্তু মনের কোণে আশঙ্কা রয়েই গেল কারণ একা হাতে সংসার সামলানো বা গড়ে তোলা কোনোটাই সে কখনোই করেনি।
রাতে নিশি শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখনই হঠাৎ টুং করে বেজে একটা মেসেজ আসলো নিশির ফোনে। নিশি ফোন তুলে দেখলো নোটিফিকেশনে ‘মিস্টার মেজর’ নামটা জ্বল জ্বল করছে। নিজের দেওয়া নামে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল নিশি। পরক্ষণেই মেসেজ অন করে দেখলো
“ডেট তবে ফাইনাল হলো! আপনার ওই বাড়িতে সময়সীমা আর দশদিন। আমার একাকিত্বের দিনগুলো বোধহয় এবার শেষ হতে চলেছে? মেজর সাজিদ মাহতাবের ছোট্ট, শৃঙ্খলিত, অগোছালো জীবনে আপনার চঞ্চলতাকে ওয়ার্মথ ওয়েলকাম জানানোর অপেক্ষায় আছি। আপনি কি তৈরি?”
এইটুক পরে নিশি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মনের কোণে আঁকা গম্ভীর রাগী মুখশ্রীর ব্যক্তিটি এতো সুন্দর করে মেসেজ লিখতে জানেন? এতো সহজে নিজের জীবনে আহ্বান জানাতে পারেন? তার মানে হতে পারে নিশি নিধির ধারণা ভুল? সবাই তো আর একই হয় না!
অনেক ভেবে চিনতে এপাশ থেকে নিশি শুধু বললো,
“তৈরি কিনা জানি না তবে চিন্তা, নার্ভাস, ভয় সব ঘিরে ধরেছে”
চলবে…