লেখিকা:তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
পর্ব:৪
– তুই কি ভেবে বিয়েতে রাজি হলি বল তো সাজিদ?
সাজিদ হেসে বললো,
– আরেহ কি ভেবে মানে? বিয়ে করতে হবে না?
সাজিদের সামনে দাঁড়ানো তার সহকর্মী কম বন্ধু বেশি নাবিল অবাক গলায় বললো,
– মেজর জেনারেল সাজিদ মাহতাবের মুখে এ কি গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনলাম! আমি তো ধন্য হয়ে গেলাম!
– নাবিল নাটক করিস না তো।
– যা করলাম না কিন্তু তোর মতলব কি বল তো?
সাজিদ বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,
– কিসের মতলব ভাই?
– না মানে এতদিন তো বিয়ের কথা বললে রেগে যাইতি, তোর এই জীবনে অন্য কাউকে কেন জড়াবি এটা বলতি তা এখন কি এই জীবন অন্য জীবন হয়ে গেল বুঝি?
সাজিদ আয়েশ করে বসতে বসতে বলল,
– উহু জীবন আগেরটাই আছে শুধু মত পাল্টেছি। সবাই বলে বিয়ে করলে নাকি জীবন সুন্দর তাই একটু এপ্লাই করে দেখি নাহয়!
নাবিল ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় বলে উঠলো,
– এইটা তো তোকে আগে থেকেই বুঝাচ্ছে কিন্তু এখন তো অন্য কোনও কাহিনি মনে হচ্ছে!
– কি কাহিনী?
– আগে বলতি এমন শৃঙ্খলতার জীবনে কাউকে বেঁধে আটকে রাখতে চাস না। অনিশ্চিত জীবনে কাউকে জড়িয়ে তার জীবনও অনিশ্চিত করতে চাস না ব্লা ব্লা এখন কি হলো?
সাজিদ কিছু আনমনা হয়ে বললো,
– জীবন তো এমনিতেই অনিশ্চিত… সেখানে একটু সুখে শান্তিতে থাকতে যদি অনিশ্চিত নিয়ে ভয় পাই তাহলে সেটা বোকামো হবে। তাই মত পাল্টে ভাবলাম চেষ্টা করি এই অনিশ্চিত জীবন নিয়েই ভালো থাকার। বিয়ে করে যদি প্রশান্তি আসে তাহলে সেটাই করি।
নাবিল অবাক হলো সাজিদের হুট করে এমন পরিবর্তনে। কিন্তু সে অবাকতা লুকিয়ে ফিক করে হেসে বললো,
– মেজর তাহলে একজনের কাছে কুপোকাত হলো! তা ভাবি সাহেবার নাম যেন কি বললি? ন.. নিশি রাইট?
সাজিদ মাথা নাড়লো।
– তাহলে দেখতে হয় সেই মহিয়সী নারীকে যে আমার বন্ধুকে এক পলকে সোজা করে দিয়েছে।
– সে তোর সামনে আসবে না দেখবি কিভাবে?
নাবিল ভ্রু কুঁচকে বললো,
– মানে?
– ও পর্দা করে।
– বাহ বেশ তো তোর সাথে মিলবে ভালোই!
কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ সাজিদ অন্য মনস্ক হয়ে বললো,
– ও এসে আমার #হৃদয়_কপাটে_দস্তক দিয়েছে। হৃদয়ের শক্ত কপাট এমনভাবে ভেঙে দিয়েছে না পারছি বন্ধ করতে আর না পারছি মন থেকে ঠেলে ওকে বের করতে!
নাবিল হো হো করে হেসে উঠলো।
– বন্ধু! তুমি তো গেছো! ভাবি সাহেবকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে দিয়ো আমার পক্ষ থেকে তোমাকে মানুষ করে দেওয়ার জন্য।
সাজিদ কি বলেছে বুঝতে পেরে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
– যা তো ডিউটি না করে এখানে কি করছিস? সর!
সে উঠে চলে গেল পেছনে ফেলে গেল হাসতে থাকা এক যুবককে। পেছন থেকে আসা হাসির শব্দে সাজিদ নিজেও মুচকি হাসলো।
__________
পরেরদিন সকাল থেকে সাজিয়া বিরক্ত করে ছাড়ছে কারণ বিকেলে তাদের শপিংয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু সকাল থেকে লাফালাফির কারণ দেখছে না সাজিদ। শেষমেশ বিরক্ত হয়েই বললো,
– কিরে সাজিয়া কি শুরু করেছিস সকাল থেকে! মার্কেটে যাবো বলেছি বিকেলে!
সাজিদ ভেংচি কে’টে বললো,
– বিয়ের শপিং মানে বুঝিস? কত কম সময়ে অনেক কিছু কিনতে হবে!
– এত বুঝার শখ নেই আমার। আমায় ডিসটার্ব করবি না আমি ঘুমোবো।
– তোর মধ্যে আসলে কোনো এক্সাইটমেন্ট নেই তাই না?
– যার বিয়ে তার খবর নেই পাড়া পড়শির ঘুম নেই!
বলেই রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল খট করে। সাজিয়া বিড়বিড় করতে থাকলো।
– আমার ভাই এটা কেন যে এমন হলো! উফ নিশির জীবনটা ত্যানা না বানিয়ে ফেলে ছেলেটা।
গলা উঁচিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মা তোমার ছেলেকে কে সেনাবাহিনীতে যোগ বলেছিল? আগে যেইটুক মানুষের সাথে মিশতো এখন তো মনে হয় তাও গেছে! নিজের বিয়ে অথচ কোনো এক্সসাইটমেন্ট নাই যেন সবসময় করে!
রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এলো,
– তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর আমায় জিজ্ঞেস না করে। সাহেবের খুব ইচ্ছে একমাত্র ছেলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের জন্য কাজ করবে।
সামনে পেপার পড়তে থাকা মোস্তফা মাহতাব খুক খুক করে কেশে উঠলো। কিছু বলার জন্য খুঁজে পেলেন না। সাজিদের মা এবং বাবার মধ্যে এইটা প্রতিদিনকার টপিক। ছেলেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ানো নিয়ে মায়ের অভিযোগ অনুযোগ সব মোস্তফা মাহতাবের প্রতি কারণ তিনিই জোর খাটিয়ে ছেলেকে ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়েছেন। তবে সাজিদ খুব একটা আপত্তি করেনি কিন্তু তার মায়ের অভিযোগ আছে। থাকাটা স্বাভাবিক, ছেলেকে মাসের পর মাস কাছে পান না। সেই কম বয়স থেকে দূরে দূরে থাকতে হয়েছে সেটা তাকে খুব কষ্ট দেয়। মা তো! একটা মাত্র ছেলেকে এভাবে দূরে দূরে রেখে অনেক কষ্ট পেতেন। ছেলে যখন কষ্ট করত তখন গ্রামে বসে তিনি কাঁদতেন তার অবস্থা মনে করে আর দোয়া করতেন। সাজিদ ও জানে মায়ের এইসব ব্যাপার কিন্তু কি করবে?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো। সাজিদ আর সাজিয়া বেরিয়ে পড়েছে ওদিকে নিশি, নিধি আর তার বাবা এসেছে তার মা আসতে চান নি। সাজিদরা গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই দেখলো নিশিরাও এসেছে। সাজিয়া গিয়ে নিশিকে জড়িয়ে ধরে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলো। নিশির বাবা সবার খবর নিলেন। এর মধ্যে নিশি সাজিদের দিকে তাকালো না কিন্তু সাজিদের চোখ ঘুরে ফিরে নিশির দিকে যাচ্ছে। একটু পর তারা একটা শাড়ির দোকানে ঢুকলো। বেশ অনেকক্ষণ কিছু শাড়ি উল্টেপাল্টে বসে আছে নিশি এবং সাজিয়া। কোনটা নিবে ঠিক করতে পারছে না। সাজিয়া যাই বলছে নিশি হ্যাঁতে হ্যাঁ মিলাচ্ছে। কিন্তু সাজিয়ার মন ঘুরে যাচ্ছে আর না পারতে পেছন ফিরে সাজিদের দিকে ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে আছে। নিশির বাবার একটা ফোন আসায় তিনি একটু দূরে গিয়ে কথা বলছেন। সাজিদ সাজিয়ার চেহারা দেখে চোখ গরম করে তাকাল তারপর মনে মনে বললো,
– আল্লাহ! এই মেয়েদের পাল্লায় ফেললে শাড়ি চুজ করতেও আমায় খুঁজছে।
এগিয়ে গিয়ে একটু উল্টেপাল্টে তারপর শাড়ির ভাঁজ থেকে মেরুন রঙের একটা বেনারসি বের করে আনলো তারপর তাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে পিছিয়ে আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। সাজিয়ার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে বেশ পছন্দ হয়েছে সে নিশিকে জিজ্ঞেস করলো কেমন লাগছে। নিশিও নাড়াচাড়া করে চেহারায় বুঝা গেল পছন্দ হয়েছে।
– ভালোই
– তোমার জামাই চুজ করে দিল ভালো তো লাগবেই। যাইহোক এটা ফাইনাল করি?
– আচ্ছা!
একে একে নিশির জন্য শাড়ি গয়না বোরকা হিজাব সব কেনা হয়ে গেছে এবার সাজিদের পালা। সাজিদ একেকটা শেরওয়ানি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর রাখছে। আড়চোখে নিশির দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু নিশি নিচে তাকিয়ে আছে নাহয় অন্য দিকে। এই মেয়েটা একবার এদিকে তাকাচ্ছেও না! সাজিদ নিশির শাড়ি হিজাব আরও অনেক কিছুই পছন্দ করেছে তাই নিশির কি উচিত না সাজিদের জন্য পছন্দ করে দেওয়া? কিন্তু ম্যাডাম তো তাকাবে না বলে অনশন করেছে। সাজিদের কেন যেন রাগ লাগছে। সে একটা শেরওয়ানি ঝাড়া মে’রে রেখে বলে উঠলো,
– পছন্দ হচ্ছে না চল।
সাজিয়া অবাক হয়ে বললো,
– কোথায়?
– বাসায়। সব কেনাকাটা তো শেষ।
– সব কই? তুই শেরওয়ানি কিনবি না? তোর ছুটি পেতে পেতে তো বিয়ে চলে আসবে! তখন বিয়েতে কি পড়বি?
– ঘরের জামা।
দাঁতে দাঁত পিষে বলল সাজিদ। নিশি অবাক হয়ে তাকালো এবার। ও অন্যদিকে ফিরে থাকলেও সাজিদ যে ওর দিকে তাকাচ্ছিলো এটা ভালো করেই বুঝতে পারছিল। কিন্তু লজ্জায় সে আর তাকায়নি। সাজিদ বেরিয়ে পড়েছে শপিং মল থেকে।
– ভাইয়া রেগে গেল কেন হঠাৎ? কি যে হয় এই ছেলের!
সাজিয়া অবাক হলেও নিশি শুকনো ঢোক গিললো। সে যা ভাবছে সেই কারণে যদি রাগ করে তাহলে তো খুব ভয় পাচ্ছে সে। এইটুক কারণে কেউ রাগ করে! ভবিষ্যতে কি হবে?
– চলো নিশি। দেখি শেরওয়ানির কি করা যায়! ভাইয়ার তো ছুটি পেতে পেতে বিয়ের কাছাকাছি চলে আসবে।
– দাঁড়ান আপু।
চলবে…
(আপনাদের রেসপন্স এমন কমছে কেন?🫠 গল্পটা কি ভালো লাগছে না?)