গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩২)

পর্বঃ৩২

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]

সময়টা বসন্তের প্রথম মাস ফাল্গুন হওয়ায় রাতের মৃদু সমীরনে ভেসে আসছে জানালার পাশে আপন সৌন্দর্যে বিস্তারে দাঁড়িয়ে থাকা কামিনী ফুলের মিষ্টি সুবাস। থেকে থেকে আকাশে খানিক পরপর গর্জন তুলছে বজ্রপাত। সেই সাথে আকাশে ভেসে উঠছে সেই বজ্রপাতের আঁকাবাঁকা রেখা। হয়তো আজ আকাশ দাপিয়ে বৃষ্টি নামবে। তারই পূর্বাভাস স্বরুপ এই বজ্রপাত।

— One, two, buckle my shoe,
Three, four, knock at the door,
Five, six, pick up sticks,
Seven, eight, lay them straight,
Nine, ten, a big fat hen.

ছড়াটা পড়া শেষে আরশান মাথা তুলে তাকাল। পাশে আবৃতি মূর্তির মত বসে। স্থির দৃষ্টি জানালা পার করে অন্ধকারের পানে চেয়ে কি যেন ভাবছে। আরশান আদো গলায় ডাকলো,

–মাম্মাম?

আবৃতির নড়চড় নেই৷ আরশান ওর হাতটা ধরে ঝাঁকালো,

— মাম্মাম?

আবৃতির হুশ ফিরে যেন। চটক কাঁটার ন্যায় তাকিয়ে বলে,

— কি হয়েছে বাবা? পড়া হয়েছে?

— হ্যাঁ মাম্মাম।

— আচ্ছা আজ আর পড়তে হবে না৷ নানুমনিকে গিয়ে বলো তোমার দুধ রাখা আছে হরলিক্স মিশিয়ে দিতে। মাম্মাম বিছানা করছি৷

আরশান মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। আবৃতি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। বিছানাটা ঠিকঠাক করে আরশানের নাইট স্যুট বের করে। আরশান ফিরে এলে ওকে নাইটস্যুট পরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়।

— মাম্মা আজকে কোনটা বলবে স্টোরি?

আবৃতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,

— আরশান?

আরশান আবৃতির চুল নিয়ে খেলতে খেলতে বলে,

— হুম মাম্মাম।

— তোমার ঐক্য আঙ্কেলকে কেমন লাগে তোমার?

আরশান আবৃতির তাকিয়ে উৎসুক গলায় বললো,

— ঐক্য আঙ্কেল?

— হুম।

আরশান হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বললো,

— ঐক্য আঙ্কেল তো অন্নেক ভাল। আমাকে কত্ত আদর দেয়, চকোলেট দেয়। কোলেও নেয়। তুমি তো আমাকে কোলে নাওনা।

আবৃতি সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বললো,

— আমারও তোমার ঐক্য আঙ্কেলকে ভাল লাগে বাবা।

আরশান বালিশ থেকে মাথা তুলে বললো,

— তাই? তোমার ঐক্য আঙ্কেলকে ভাল লাগে? কিন্তু আঙ্কেল তো তোমাকে কখনো চকোলেট দেয়নি। তাহলে তোমার কেন ভাল লাগে মাম্মাম?

— কারণ তিনি একজন সুপুরুষ বাবা ।

— সুপুরুষ কি মাম্মাম?

আবৃতি চোখ বন্ধ করে বলে,

— যারা একজন নারীকে সম্মান করতে জানে, যাদের ভালবাসা কেবল নিজ স্ত্রী সন্তানের জন্য বহাল থাকে, যাদের কাছে একজন নারীর অনূভুতিগুলো মূল্যবান তারাই সুপুরুষ।

মাম্মাম কি বললো কথাগুলো আরশানের মাথার উপর দিয়ে গেল। তবুও বুঝেছে ওমন বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নেড়ে বললো,

— হ্যাঁ হ্যাঁ আঙ্কেল অনেক সুপুরুষ। আঙ্কেল কখনো ওয়াফা মনিকে বকে না। মাম্মাম তুমি আঙ্কেলের মতো সুপুরুষ নও, কারণ তুমি আমাকে বকে দাও।

আবৃতি ফিক করে হেসে দিল। হাসতে হাসতে বলল,

— আমি তোমার আঙ্কেলের মতো সুপুরুষ হতেও চাইনা৷ কারণ মেয়েরা সুপুরুষ হতেও পারে না বাবা।

— তাহলে মেয়েরা কি হয় মা?

আবৃতি ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে বললো,

— ঘুমাও বাবা৷ অনেক রাত হয়েছে কাল আবার স্কুলে জন্য তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।

কিন্তু আরশান ঘুমিয়ে গেলেও ঘুম ধরা দিলনা আবৃতির দুই চোখে৷ আরশানের পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই মানসপটে ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে উঠে আজকের দুপুরের কিছু স্মৃতি যেগুলো আবৃতিকে এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে….. ….

আজ যখন চৌধুরী ভিলার ছাদে ঐক্য নিজের মনের আকাঙ্খাটুকু আবৃতির সামনে ব্যক্ত করলো বিনা সংকোচে, তখন আবৃতি শুধু হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে ছিল। অমোঘ বাসনায় হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলেও মুখে উচ্চারণ করতে পারলনা কিছুই। শুধু অনুভব করল ওর কান্না পাচ্ছে। ভীষণরকম কান্না। ঐক্য যখন ওর চোখের কোণের অশ্রু কণা গুলো নিজের শক্ত হাতের নরম পরশে মুছে দিচ্ছিল তখন আবৃতির কান্নার বেগ আরো দ্বিগুণ গতিতে বৃদ্ধি পেল। তার শব্দহীন বোবা কান্নাগুলো কেউ কখনো যত্ন নিয়ে মুছে দেয়নি যে। ঐক্য আকুল স্বরে বলল,

— আমি জানি আবৃতি, প্রথম জীবনে বাজে ভাবে ঠকে যাওয়া ভগ্ন হৃদয়ের আমাদের জন্য দ্বিতীয়বার জীবনকে সুযোগ দেওয়াটা বড় কঠিন। কিন্তু আবৃতি, আমাদের এই সময়টা, সন্তানদের শৈশবের স্বর্ণালি সময়গুলো আমরা কি কখনো ফিরে পাব?

আবৃতি ঘোলা চোখে তাকাল। ভাঙ্গা স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো,

— ভয় হয় ঐক্য সাহেব। বড্ড ভয়৷ এক জীবনে নিজের সম্পূর্ণ যত্ন, চেষ্টা, হৃদয় নিংড়ে দেওয়া ভালবাসার বিনিময়ে পেয়েছি কেবল নিজের অনুভূতির অবহেলা, ধোঁকা,বিশ্বাসঘাতকতা! তাই এখন আর মনেই হয়না আমার অনুভুতিরও মূল্য আছে। দিনশেষে নিজের জীবনের ভরাডুবির ভার যে নিজের উপরই বর্তায়।

— আমাদের ভুলটা কোথায় জানেন আবৃতি?

আবৃতি চোখ তুলে তাকাল। ঐক্য বিরস হেসে বললো,

— আমরা সবসময় আমাদের অনুভূতি গুলোকে ভুল মানুষের তরে বিলাই।

— ওই ভুল মানুষটাকে তো আমি নিজে থেকে আমার জীবনে চেয়ে আনিনি। তবে কেন আসলো সে?

— কখনো কখনো জীবনে ভুল কিছু আসেই আমাদের সঠিক কিছুর প্রকৃত মূল্য বোঝাতে।

আবৃতি কিছুই বলতে পারলনা। ওর অনুভূতি গুলো এলোমেলো৷ মনে হাজার সংশয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। ঐক্য ফের অস্ফুটে ডেকে উঠলো,

— আবৃতি?

আবৃতি ফিরে চাইল। ঐক্য চোখে চোখ রেখে কোনরকম সংকোচন ছাড়াই বলল,

— আমি অপেক্ষা করব আপনার জবাবের।

আবৃতি মাথা নুইয়ে নিল। ঐক্য মোলায়েম স্বরে বললো,

— বিশ্বাস করুন একটা সুন্দর নতুন সূচনা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

ঐক্য বলে থামল। ঢোক গিলে কম্পমান গলায় বললো,

— একবার আমার হয়েই দেখুন না এই এক্যের রাণী করে রাখব ইনশাআল্লাহ।

আবৃতির সারা অঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। কিছুটা স্বস্তি, ভয়,কষ্ট মিলে মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আলোড়ন সৃষ্টি করল। আবৃতি কাঁপা গলায় কোনমতে এটুকু বলতে পারল,

— আমি ভেবে দেখব ঐক্য সাহেব। এবার অন্তত একটু নিজেকে নিয়ে ভাবতে চাই। নিজের আধূরা স্বপ্নগুলোর একটু মূ্ল্যায়ন করতে চাই৷

চট করে চোখ খুলে তাকাল আবৃতি। প্রচন্ড হাসফাসে গলা বুঁজে এল। মাথা থেকে সকল চিন্তা ঝেড়ে ফেলল একটু ঘুমানোর তাগিদে৷ কিন্তু ঘুম যেন ওর শত্রু হয়ে চোখে ধরাই দিতে চাইছেনা৷ এদিকে বাইরে ঘুটঘুটে তিমির ফেটে যাচ্ছে হঠাৎ উড়ে আসা ঝড়ের কবলে। প্রচন্ড বজ্রপাতে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। আবৃতি পায়ের নিচ থেকে কাঁথাটা তুলে আরশানের গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর আরশানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সারারাত এপাশ ওপাশ করেও যখন ঘুম আসলোনা তখন রাতের শেষভাগে বিছানা ছাড়ল। বাথরুম থেকে ওযু করে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে চার রাকাত তাহাজ্জুদ আদায় করল। মা বলে যখন কোন কিছু নিয়ে মনে দ্বিধা সৃষ্টি হবে তখন রবের দরবারে মাথা ঠুকতে। তিনিই সঠিক পথের দিশা দেখিয়ে দেবেন৷ আবৃতি আজ সারাদিন ভেবেছে কিন্তু কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। আবৃতি এই পঁচে যাওয়া সমাজের ধার ধারেনা।
এই সমাজ কোনদিনও চাইবেনা আবৃতি আবার নতুন করে সুখি হোক, আবৃতির ভাঙ্গা হৃদয় আবার জোড়া লাগুক। হ্যাঁ আবৃতি যে চায় কেউ ওকে আগলে নিক নিজের বাহুডোরে। দিনশেষে আবৃতির অনুভূতি গুলো কেউ যতন করে নিজের মনে লালন করুক, কেউ গোটা এক আবৃতির দায়িত্ব নিক নিষ্ঠার সাথে। কিন্তু শুধুমাত্র নিজের কথা চিন্তা করে বিয়েতে মত দেওয়া যে সম্ভব নয় আবৃতির পক্ষে। তার আরশান? আরশানের কি হবে? ঐক্য সাহেব যতটা সহজভাবে সবকিছু চিন্তা করছেন,আদতেই কি সবকিছু এতটা সহজ হবে? ঐক্য যে আরশানের জন্য একজন বেস্ট পিতা হবে তা নিয়ে আবৃতির মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। হয়তো আরশানের বাচ্চা মন খুব সহজেই ঐক্যর সাথে মানিয়ে নেবে। কিন্তু আরশান যখন বুঝতে শিখবে আসল বাবা আর সৎ বাবার তফাত, তখন? তখন আবৃতি কি জবাব দেবে৷ সমাজের সাথে সাথে তার নিজের অংশ কি তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাবেনা? তখন তার নিষ্পাপ সন্তানের এই প্রশ্নটা যদি ওকে তীর বিদ্ধ করে যে, ‘কেন তুমি নিজের সুখের কথা ভেবে আরেকজনের সাথে ঘর বাঁধলে?কেন আমার বাবার জায়গা আরেকজনকে দিলে? কেন?’

আবৃতি আর কিছু ভাবতে পারেনা। জায়নামাজে হু হু করে কেঁদে উঠে। ও আর পারছেনা? এত দ্বিধা, ভবিষ্যতের অনিশ্চিতয়তা, কারো পবিত্র আহ্বানে সাড়া দিতে না পারার ব্যর্থতা ওর ভেতরটা কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে নিচ্ছে। আবৃতির কেন একটু ভালবাসা পাওয়ার অধিকার নেই। এই সমাজ কেন কেবল একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীর পা শিকলে বাঁধে। কই ধ্রুব তো সুখেই আছে। এত কিছুর পরেও ঠিক ওর ভালবাসার মানুষটা ওর সাথে আছে। একটা আগাম সন্তানসহ পরিপূর্ণ সংসার একটা আছে। তাহলে আবৃতি কি দোষ করেছে? ওর যে সংসার করার সাধ সেটা কি কখনো পূরণ হবার নয়? যদি একবার সবকিছু একদম সবকিছু ভুলে আবৃতি ঐক্যর প্রস্তাবটা গ্রহণ করেও নেয়, কিন্তু ধ্রুব থাকাকালীন বাবা হিসেবে কি করে আরশান ঐক্যকে মেনে নেবে?

পুরনো ফাইল পত্রের আলমারিটা খুলতেই সবগুলো কাগজের স্তুপ মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। ক্লান্ত ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেঝেতে বসে ছড়িয়ে থাকা সবগুলো ফাইলের বান্ডল গোছাতে লাগল। কাল অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। ধ্রুব যেহেতু একাউন্ট হেড ম্যানেজার তাই গুরুত্বপূর্ণ নথি গুলো ওর কাছেই জমা থাকে। তাই ঐক্যর নির্দেশ স্বরুপ পুরনো কিছু ফাইলের ইনফরমেশন অফিস মেইলে জমা দিতে হবে। তাই এত রাতে এগুলোই খুঁজতে স্টোর রুমে এসেছে। হঠাৎ হাতের সাথে ধাক্কা লেগে খালি আলমারিটা একটু নড়ে উঠল। ফলে উপর থেকে একটা ছোট বস্তু ধ্রুবর মাথায় পড়ল। ধ্রুব বিরক্ত হয়ে মাথা ডলতে ডলতে বস্তুটিকে কুঁড়িয়ে নেয় মেঝে থেকে। ভ্রু কুঁচকে দেখে বস্তুটা একটা ডায়েরি। ধ্রুবর কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হয় ডায়রিটা ভাল করে দেখে। হালকা ব্রাউন রঙা মোটা মলাটের ডায়েরিটা ধ্রুবর নিকট পরিচিত ঠেকল। মনে পড়ল ডায়েরিটা আবৃতির। প্রায় গভীর রাতে দেখা যেতো আবৃতি টেবিলে বসে ডায়রির পাতায় কলমের খসখস শব্দ তুলে কি যেন লিখে চলেছে। ধ্রুবর কখনো কৌতুহল হয়নি আবৃতি কি লিখছে। আসলে তখন আবৃতি ছিল ওর কাছে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা কোন অবহেলিত জড় বস্তুর ন্যায়। এই মেয়েটা নিজের সকল ধ্যান জ্ঞান সব দিয়েছে এই সংসারে। কিন্তু নিজের প্রথম ভালবাসা হারানোর হতাশা এবং বাবার প্রতি প্রতিশোধপরায়ণতায় ধ্রুব সম্পূর্ণ অন্ধ বনে যায়। লোপ পায় হিতাহিত জ্ঞান। আবৃতিকে নানারকম ভাবে মানসিকভাবে অত্যাচারে এক প্রকার পৈশাচিক তৃপ্তি পেত। কেননা ওকে কষ্ট দিয়ে নিজের বাবার প্রতি ক্ষোভ মেটাতে পারতো। প্রথম প্রথম বিয়ের পর নিজের বিয়ে করা স্ত্রীর প্রতি কোন দায়িত্বের তোয়াক্কা না করে ধ্রুব পড়ে থাকতো বাইরে রাতের পর রাত। গভীর রাতে বাসায় ফিরে দেখতো আবৃতি ডাইনিং টেবিলে ঘুমিয়ে আছে ওর অপেক্ষায়। ধ্রুব চিলাপাল্লা করতো আবৃতির কাজকে ন্যাকামো আখ্যা দিয়ে। কিন্তু ওর চিৎকার চেঁচামেচি আবৃতির উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতোনা। পূর্বের ন্যায় আবৃতিকে কখনো ডায়নিংয়ে ঝিমাতে অথবা ডায়রিটা নিয়ে মনোনিবেশনে দেখা যেত। ধ্রুব ফেরার আওয়াজ কানে আসতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে খাবার গরম করে দিত। ধ্রুব জানত আবৃতি প্রতিদিন না খেয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করে কিন্তু পাষাণ ধ্রুব কখনো মেয়েটাকে সাথে খেতে সাধতোনা।

একটা শুকনো ঢোক গিলে ধ্রুব বর্তমানে ফিরলো। ডায়রিটা হাতে নিয়ে কি মনে করে ধুলো জমা একটা চেয়ারে বসে পড়ল। আবৃতি জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর ওর ব্যবহৃত বহু জিনিস ধ্রুবর ঘরে যেখানে একসময় আবৃতির বাস ছিল সেখানে পড়ে ছিল। ধ্রুবর টাকায় কেনা একটা সুতোও আবৃতি নিজের সাথে নিয়ে যায়নি। কেবল নিয়েছে ধ্রুবর অংশটুকু। সেই অংশটুকুর বিনিময়েও মেয়েটাকে ছাড়তে হয়েছিল নিজের অধিকার। তারপর ইরা যখন আবৃতির জায়গায় আসলো তখন ধ্রুব আবৃতির নামমাত্র একটা চিহ্নও খুঁজে পায়নি কোথাও। হঠাৎ করেই চেনা রুমটা অপরিচিত হয়ে উঠল ধ্রুবর নিকট। এই ডায়রিটা হয়তো আবৃতি সাথে নিতে ভুলে গিয়েছে। একসময়ের সঙ্গী ডায়রিটার কথা মেয়েটার কি মনে পড়েনা। দুরুদুরু বুকে সাহস সঞ্চার করে ধ্রুব ডায়রিটার পাতা উল্টালো। এভাবে কারো ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়া সমীচীন না এটা জেনেও আজ ধ্রুব কেন জানি নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলনা। যে মেয়েটা থাকাকালীন তার জন্য কোনদিন টান অনুভব করেনি আজ তার ফেলে যাওয়া জিনিসটার প্রতি এক অমোঘ টান বাধ্য করে ধ্রুবকে কাজটা করতে। কাঁপা কাঁপা হাতে ধ্রুব ডায়রির প্রথম পাতাটা উল্টালো। সেখানে সুন্দর করে লেখা,

‘একজন মেয়ে যে কিনা স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। আমি এক স্বপ্নচারিণী। কিন্তু আমার সব স্বপ্নই কেন যেন অপূর্ণ থেকে যায়। পূর্ণতা পায়না কভু।’

ব্যস প্রথম পৃষ্ঠায় কেবল এতটুকু লেখা। ধ্রুবর তারপরের পেজগুলো উল্টালো। সব গুলো পৃষ্ঠায় আবৃতির ডক্টর হওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে লেখা। ধ্রুব এর পরের পৃষ্ঠা গুলো উল্টাতেই ধাক্কার মতো খেল। কেননা পরের পৃষ্ঠা গুলো ধ্রুবর সাথে বিয়ের পর থেকে লেখা৷ ধ্রুব মন দিয়ে প্রতিটা পৃষ্ঠা পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এই পৃষ্ঠা গুলোতে লেখা কেবল আবৃতির অব্যক্ত কষ্ট, যন্ত্রণা যেগুলো ধ্রুব ছয়বছরে ওকে তিলে তিলে দিয়েছে। ডায়রির সাদা রঙা কাগজে কালো কালিগুলোতে যেন আবৃতির হাজার অভিযোগ মিশে আছে। ধ্রুবর বুকটা টনটন করে উঠে। চোখদুটো কখন ভরে উঠেছে নোনাজলে টের পেলনা৷ ধ্রুবর হঠাৎ করে এত বছরে এই প্রথমবার উপলব্ধি হলো কি হতো যদি নিজের অতীতটাকে ভুলে আবৃতিকে নিয়ে বাঁচলে? কি হতো মেয়েটার বাড়িয়ে রাখা হাতটা আঁকড়ে ধরলে? কি হতো নিজের স্ত্রী সন্তানকে সাথে নিয়ে একটা সুখের সংসার পাতলে। কি হতো আবৃতিকে একটু ভালবাসলে? এই প্রশ্নগুলো যেন ফলা হয়ে ওর হৃদয়ে বিঁধছে। এই বদ্ধ ঘরে ধ্রুবর দম বন্ধ হয়ে আসছে। যেন এখনি দম আটকে মরে যাবে। প্রচন্ডভাবে বুকটা কাঁপছে। অকষ্মাউ উন্মাদের মতো উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,

— আমার এখনি আবৃতির কাছে যেতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে। আমি আবৃতির পায়ে পরব৷ ওর ক্ষমা না পেলে আমি মরেও শান্তি পাবনা৷

নিজের রুমে ফিরে ধ্রুব বিকার গ্রস্থের ন্যায় নাইটস্ট্যান্ডের ড্রয়ার খুলে হাতড়িয়ে নিজের গাড়ির চাবি হাতে নেয়। ইরা চোখ বুজে শুয়ে ছিল। ধ্রুব পাশে না থাকায় ঘুম আসছিলনা। এমনিতেও রাতে ওর বিশেষ ঘুম হয়না কোনদিন। ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে জানায় ও ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত। প্রচন্ড মানসিক চাপে ঘুম না হওয়ার সমস্যাকে ইনসোমনিয়া বলে। তাই অল্প আওয়াজেই ওর তন্দ্রা ছুটে গেল। চোখ খুলে ধ্রুবকে এত ব্যতিব্যস্ত হয়ে এটা সেটা খুঁজতে দেখে ইরা অবাক গলায় শুধায়,

— কি করছ তুমি?

ধ্রুব একটু অপ্রস্তুত হয় হঠাৎ ইরাকে উঠে যেতে দেখে। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললো,

— আমি একটু আসছি৷

বাইরে তখনো প্রচন্ত বজ্রপাতের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইরা হতবাক গলায় বললো,

— কোথায় যাচ্ছ তুমি এত রাতে?

— ঘুমাও তুমি। আমি চলে আসব দ্রুত৷

— পাগল হলে? দেখছোনা বাইরে কি পরিমাণ ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। তুমি যাচ্ছটা কোথায় এত রাতে?

— পাপের পায়শ্চিত্ত করতে।

ইরা আঁতকে উঠে পেট চেপে বিছানা থেকে নেমে যায়। ব্যস্ত গলায় উদ্বিগ্ন স্বরে বললো,

— ধ্রুব প্লিজ শান্ত হও। তোমাকে ঠিক লাগছেনা আমার।

ধ্রুব নিজের মাথার চুল খামচে ধরে পাগলের মতো বিরবিরায়,

— আমি পাগল হয়ে যাব ইরা৷ একদম পাগল হয়ে যাব। তুমি কেন ফিরে আসলে। আমি না সত্যিই আবৃতিকে ভালবাসতে শুরু করছিলাম। কিন্তু তু.. তুমি ফিরে এসে সব ভেস্তে দিলে। আমি হারিয়ে ফেললাম ওকে সারাজীবনের জন্য। নিজের সন্তান, নিজের সুখ, স্বস্তি সব হারিয়ে গেল আবৃতির সাথে৷ সব হারিয়ে গেল!

ইরা স্তব্ধ হয়ে গেল৷ পা দুটো জমে গেল একদম মেঝের টাইলসের সাথে। হতবিহ্বল চোখ দুটো নিবদ্ধ ওর ধ্রুবর মুখ পানে। অনেক কষ্ট করেও ইরা কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারলনা। ধ্রুব অপেক্ষাও করলোনা। অস্থির পায়ে বের হয়ে গেল। ইরা নিজের কাঁপা হাতটা তুলে পিছু ডেকে চেষ্টা করলো কিছু বলতে। কিন্তু পারলনা। ততক্ষণে ধ্রুবর অবয়ব মিলিয়ে গিয়েছে ঘুটঘুটে তিমিরের আঁধারে!

.

অসময়ের উথাল-পাতাল ঝড়ের মধ্যেই ধ্রুব গাড়িটা শাই শাই করে ছুটছে। এই বৈরী আবহাওয়ায় এভাবে দ্রুত বেগে গাড়ি চালানো যে কতটা যে ভয়ংকর সেটা অস্থিতিশীল ধ্রুবর মস্তিষ্ক ঠাহর করতে পারছেনা। ওর মন মস্তিষ্ক কেবল ছুটছে আবৃতি নামক এক রমনীর পানে। ওর মাথায় এটাও আসছেনা এখন রাতের শেষ প্রহর। এই সময় কারো বাড়ি যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু যে এই প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়াই মানছেনা তার কাছে আবার কিসের রাত-দিন। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা হয়তো ধ্রুবর ক্ষমাটুকুও আবৃতির নিকট পৌঁছে দিতে রাজী নন তাইতো হঠাৎ মোটা কড়ই গাছের একটা ডাল ভেঙ্গে ঠিক ধ্রুবর গাড়ির উপর পড়লো। অকস্মাৎ মোটা ডালটি পড়ায় ধ্রুবর গাড়িটা একদম ঢেবে গেল। সেই সাথে থেতলে গেল গাড়ির অভ্যন্তরে থাকা ধ্রুবর মাথাটা! ততক্ষণে হুইল থেকে হাতটা সরে চালক বিহীন গাড়িটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেল উঁচু রাস্তা থেকে কয়েক ফিট নিচুতে থাকা নদীতে। কতক্ষণ নদীর টলটলে জলে গাড়িটা ভেসে থেকে ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল অশান্ত নদীর গভীর থেকে গভীরে!

চলমান……

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x