পর্বঃ৩৭[বিয়ে স্পেইশাল🤍]
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
মৃদু বাতাসের দাপটে আবৃতির সাদা শাড়িটার আঁচল ছাদের কার্ণিশ ছুঁয়ে শূণ্যে উড়ছে। তুরন্ত হাওয়ায় দুলছে রেশমের মতো কালো দীঘল কেশমালা। গুটিকয়েক চুল এসে আবৃতির মসৃণ কপোল ঢেকে দিচ্ছে। আবৃতি সেগুলো একটু পরপর আঙুলের সাহায্যে সরিয়ে দিচ্ছে। ঐক্য বিমুগ্ধ নেত্রে সেসবই তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে। নিবিষ্ট দৃষ্টি এলো-মেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে আবৃতির গোটা কাটাকাটা পেলব কপোলে। এখন আর লুকিয়ে চুপিসারে নয় বরঞ্চ প্রকাশ্যে অনিমেষ চেয়ে আছে হবু স্ত্রীর সুশ্রী আননে।ঐক্যের ওমন জ্বলজ্বলে চাহনিতে আবৃতি কুন্ঠায় নুইয়ে গেল। হাঁসফাঁস করে উঠে চারদিকে এলোমেলো চোখের পাতা ফেললো।
ঐক্য আবৃতির সংকোচ টের পেয়ে স্মিত হেসে চোখ সরিয়ে ছাদের কার্ণিশে দু’হাতে ভর দিয়ে দাঁড়াল। নীলাভ গগনের পানে স্থির চোখে তাকিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করলো,
— আর ইউ ওকে?
আবৃতি বিষন্ন মেদুর চোখ তুলে তাকাল। মিহি স্বরে বললো,
— হু? হ্যাঁ ঠিক আছি। কি হবে আমার?
ঐক্য জানে কঠিন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর ভয়ে তড়পাচ্ছে আবৃতি।
— আবৃতি, আমি জানি এই বিয়েটা আপনার জন্য এতটাও স্বস্তির না।
আবৃতি তটস্থ ভঙ্গিতে বললো,
— না না ঐক্য সাহেব। বিষয়টা তেমন টা। আসলে আমি একটু নার্ভাস।
— আমি আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি আবৃতি।কিন্তু আপনি যেটা নিয়ে মনে মনে শঙ্কিত হয়ে আছেন,আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি আপনি এবার সেটা ফেইস করবেন না৷ আমি আপনাকে হয়তো এখনই ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছিনা। কিন্তু আমি আপনাকে ভালো রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করব আবৃতি। আপনার আবেগ, বিশ্বাস আমার কাছে সারাজীবন আমানত থাকবে। আই প্রমিজ।
আবৃতির অক্ষিকূটে হঠাৎ পানি জমে উঠে। ধরা গলায় বলে,
— আমি আর কারো কাছে ফেলনা কোন বস্তু হতে চাইনা ঐক্য সাহেব৷ কেউ অন্তত আমাকে মানুষ মনে করে আমাকে আগলে নিক। আমার ভালবাসার বদলে একটু ভালবাসা ফিরিয়ে দিক।
ঐক্য ধীর কদমে এগিয়ে একদম আবৃতির সন্নিকটে দাঁড়ায়। কোনপ্রকার সংকোচ ছাড়াই খরখরে হাত তুলে আবৃতির চোখের কার্ণিশ টপকে গড়ানো অশ্রুকণা মুছে দেয়। ফিসফিস করে বলে,
–একবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে দ্বিতীয়বার আমি আপনাকে পেয়েছি আবৃতি, তাহলে ভাবুন আপনি আমার জন্য কি?
সহসা আবৃতি থমকে গেল। জল চাপা স্তব্ধ লোচনে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ঐক্যর সহজ, জড়তাহীন মুখটায়। ব্যস আর কিছু বলার প্রয়োজন পড়লনা ঐক্যর। এই একটা বাক্যই আবৃতির উথাল-পাতাল ঝড় বয়ে যাওয়া হৃদয়কে এক লহমায় প্রশান্ত করে দিল।
— তৈরী থাকবেন। শুক্রবারে আপনাকে চিরদিনের জন্য আমার করে নিতে আসছি। আজ আসি। আল্লাহ হাফেজ।
বিস্মিত, স্তম্ভিত আবৃতিকে পেছনে রেখে ঐক্য পকেটে হাগ ঢুকিয়ে গটগট পায়ে ছাদের দরজা পেরিয়ে আড়াল হয়ে গেল। আবৃতি ঘোলাটে চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
★
সপ্তাহ কি খুব দ্রুত চলে গেল? না তো সপ্তাহ তার গতানুগতিক নিয়মেই পেরিয়েছে। কিন্তু কারো কাছে মনে হয়েছে খুব দ্রুত সময় চলে গিয়েছে আবার কারো কাছে মনে হয়েছে সপ্তাহটা খুব ধীর গতিতে পার হয়েছে। সে যাই হোক সব ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে কাঙ্খিত শুক্রবারটা এলো। সেইদিন, যেইদিনে আবৃতির জীবনে দ্বিতীয় সূচনা হতে চলেছে। সমাজ, সম্পর্ক, বাস্তবতা সবকিছু পশ্চাতে ফেলে আবৃতি শুধুমাত্রর নিজের সুখের পথে বাড়িয়েছে নিজের সাহসী কদম। এই এক সপ্তাহের লম্বা একটা সময় আবৃতির জন্য মোটেও সুখকর ছিলনা। আশপাশের পাড়াপ্রতিবেশি, কিছু আত্মীয় নামক বিষ পোকা তাদের বিষাক্ত কথার বাণে চেয়েছিল আবৃতিকে ভেঙে দিতে। কিন্ত পারেনি আবৃতিকে একটুও টলাতে। যখনই এদের কটু কথাগুলো ওর মনে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তখনই বাঁশির সুরের মতো বেজে উঠে ওর হতে যাওয়া একান্ত মানুষটার দারাজ গলা,
— — তৈরী থাকবেন। শুক্রবারে আপনাকে চিরদিনের জন্য আমার করে নিতে আসছি।
এই একটা বাক্যে কি শক্তি রয়েছে আবৃতি জানেনা। কিন্তু এরপর আর আবৃতি একটি বারের জন্যেও দ্বিধান্বিত হয়নি। কারো কটু বাক্য ওর মনের মনোবলের ভীতকে সামান্য নড়াতে পারেনি। হ্যাঁ আবৃতির ডিভোর্সের ছয়মাস না পার হতেই বিয়ে করে নিচ্ছে,তাতে এই সমাজের কি? এই সমাজ কি আবৃতির ভাঙনকালে একটিবার এসে মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিয়েছিল?আবৃতি কেবল নিজের সুখের কথা ভাববে। এই সমাজকে দেখিয়ে দেবে একটা ডিভোর্সি নারী এই সমাজের বোঝা নয়, ওরাও পারে একটা পুরুষের মতো দ্বিতীয়বার নিজের জীবনে এগিয়ে যেতে। সুখে থাকতে।
বিছানায় দুটো ট্রলি ভরতি বিয়ের পয়নামা। আবৃতির কাজিনরা সবকিছু খুলে বিছানায় রাখছে। ঘরোয়া ভাবে আজ বাদ জোহর আবৃতি আর ঐক্যের জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো নব্য সূচনা হতে যাচ্ছে। আবৃতি দেখলো ওর বিয়ের শাড়িটা সম্পূর্ণ শুভ্র রঙের। এমনকি দোপাট্টাটিও। আবৃতির ওষ্ঠকোণে আনমনে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠে সকালের মেসেজটা মনে করে,
— শুভ্র মানে পবিত্র! নিজেদের ভাঙ্গাচোরা জীবনটাকে নতুনভাবে শুরু করতে এই শুভ্র রঙটি বাছাই করলাম আবৃতি। এই রঙটি আজ নিজের পবিত্র শরীরে জড়িয়ে আমার অশান্ত হৃদয়টাকে শান্ত করার আর্জি রইল।
গত কাল অব্দি লোকটা জ্বালিয়ে মারছিল বিয়ের জন্য কি রঙের শাড়ি আবৃতি পরতে চায়, আবৃতি নিজে চয়েজ করে কিনতে চায় কিনা? কিন্তু আবৃতি স্পষ্ট বলে দিয়েছিল ঐক্যের যে রঙ পছন্দ সেটি সানন্দে আবৃতি নিজের বদনে জড়াবে। এই লোকটা আবৃতিকে পছন্দ করে নিজের স্ত্রী রুপে স্বীকৃতি দিচ্ছে, আর আবৃতি কিনা তার পছন্দের শাড়িটি পরবেনা। এও সম্ভব? শাড়িটার সাথে একসেট ছোট্ট সাইজের সাদা পাঞ্জাবি। আবৃতি পাঞ্জাবিটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। জাহানারা মৃদু হেসে বললেন,
— দেখেছিস মা ছেলেটা নানুভাইয়ের জন্যেও ছেলেটা মনে করে পাঞ্জাবি দিল। নানুভাই আসো জামাটা খুলে এই পাঞ্জাবিটা পরে নাও।
আরশান খুশি মনে উঠে দাঁড়ায়। জাহানারা নাতিকে পাঞ্জাবিটা পরিয়ে দিলেন। একদম খাপে খাপ কিভাবে যেন পাঞ্জাবিটা বাচ্চাটার শরীরে ফিট হয়ে গেল। আরশান নিজের শরীরে জড়ানো পাঞ্জাবিটা হাসি হাসি মুখে ছুঁয়ে দেখছিল। জাহানারার নেত্রদ্বয় হঠাৎ টলমল করে উঠে। আজ মেয়ের সাথে সাথে এই ছোট্ট আদরটাকেও ওনাকে বিদেয় দিতে হবে। বিয়ের আগেই ঐক্যের অঘোষিত আদেশ, ‘ও শুধুমাত্র আবৃতির স্বামী নয়,আরশানের পিতাও হতে চায়।’আজ বৌয়ের সাথে ছেলেকেও ও নিজের করে নেবে সারাজীবনের জন্য। আবৃতি দেখার আগেই সহসা নিজের চোখ ব্যস্ত হাতে মুছে নিলেন জাহানারা। আহান বারবার বারণ করে দিয়েছে যেন আবৃতি আর আরশানের সামনে কোনপ্রকার কান্নাকাটি না করা হয়। জাহানারা নিজেকে শক্ত করলেন। আজ তার কাঁদার দিন নয়। তার অভাগী মেয়েটা সারাজীবনের জন্য নিজের সুখের নীড়ে যাচ্ছে, উনি কেন কাঁদবেন?
— মাম্মাম দেখ, তোমার আর আমার ম্যাচিং ম্যাচিং।
আবৃতি আলতো হাসল। ছেলেকে নিজের কাছে টেনে কপালে স্নেহের পরশ এঁকে বলে,
— মাশাল্লাহ আমার রাজপুত্র।
আরশান হেসে নিজেও মায়ের গালে ভেজা চুমু খেল।
আবৃতির কাজিন বললো,
— আপু আসো সাজানো শুরু করি।
আবৃতি বুকভরে প্রলম্বিত শ্বাস টেনে উঠে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভ্র শাড়িতে আচ্ছাদিত হয় ওর সমগ্র কায়ায়।
— আপু দেখ রজনীগন্ধার গাজরা। একদম সতেজ। বাহ দুলাব্রো দেখি খুবই চার্মিং। হিজ টেস্ট ইজ ভেরি ইউনিক!
আবৃতি গাজরাটা চেয়ে দেখল অপলক। হঠাৎ করেই ওর হৃদয়টা আন্দোলিত হলো নয়া অনুভুতির জোয়ারে। নিজের ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘ জীবদ্দশায় এই অনুভুতি সম্পূর্ণ নতুন ওর কাছে। বিবাহিত জীবনে অন্যসব নারীর মতো ওর কোনদিন সৌভাগ্য হয়নি এমন একটি সামান্য গাজরার, যেথায় একটা নারীর আবেগ লুকিয়ে থাকে। আবৃতি গাজরাটা হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দিল। ওষ্ঠকোণ আনমনে প্রসারিত হলো আপন শক্তিতে।
— আপু এসো আগে এটা চুলে লাগিয়ে দিই। তারপর বেইজ মেকআপ শুরু করব।
আবৃতির চুলে খোপা করে গাজটারা পরিয়ে দিল ওর কাজিন। তারপর আবৃতির কথামতো খুবই সিম্পল আর ন্যাচারাল লুকে সাজিয়ে দিল। সাদার সাথে মানানসই ক্লাসি লুকে আবৃতিকে খুবই সুশ্রী দেখতে লাগছিল। সাজ মোটামুটি কম্প্লিট হতেই জাহানারা আলমারি খুলে ও বাড়ি থেকে পাঠানো গহনার বক্সগুলো বের করে দিলেন। হিরের আর সোনা দুটোর দুটো করে সেট পয়নামায় পাঠানো হয়েছে।
— আপু ডায়মন্ড পরিয়ে দেব? হোয়াইটের সাথে ডায়মন্ড ভালো যাবে।
আবৃতি আস্তে করে বললো,
— তোদের ইচ্ছে। আমার সাজগোজ সম্পর্কে ততটা অভিজ্ঞতা নেই।
— আপু কোনটা পরাব দেখ।
আবৃতি সিম্পল একসেট গহনা চুজ করলো। ফুল সাজ
কম্লপিট করে সাদা দোপাট্টাটা আবৃতি মাথায় মেলে দিল। আবৃতির দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যেও আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব থেকে সরেনা। আবৃতির কাজিন গদগদকণ্ঠে বলে,
— ওয়াও আপু। ইউ লুকস সো প্রিটি। সাদা রঙেও যে ব্রাইডকে এত সুন্দর দেখায় জানতাম না তো।
আবৃতি নিজের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই ম্লান হাসল।
ওর অকস্মাৎ মনে পড়ে যায় আজ থেকে প্রায় সাত বছর পেছনের আজকের ন্যায় একটি দিনের কথা। উনিশ বছরের তরুণি আবৃতি সেদিন একটা লাল টুকটুকে শাড়ি পরে বৌ সেজেছিল। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই আবৃতি মনে নয়া অনুভুতির শিরশিরে আমেজ নিয়ে ধ্রুবর বৌ সেজে বসেছিল। কিন্তু সেই আমেজ এক লহমায় বিষাদে রুপান্তরিত হলো বাসর রাতে। যেদিন ধ্রুব ওর নারীত্বের অপমান করে ঘোষণা দিল, ‘ও এই বিয়ে মানেনা।’ ছয়টা বছরের সংসার জীবন আবৃতির কেটেছে ভীষণ দূর্বিষহভাবে। এই ছয়টা বছরের প্রতিটি ও ডাঙায় খাবি খাওয়া মাছের মতন ছটফটিয়েছে। অতীতের স্মৃতিচারণে আবৃতির বুক ছিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নির্গত হয়। অতীত কোনদিন ভোলা সম্ভব নয় আবৃতি জানে। কিন্তু আবৃতি চেষ্টা করবে নিজের বর্তমানকে নিয়ে সর্বোচ্চ খুশি থাকার এবং তাকে খুশি রাখার। বিছনায় চুপচাপ বসে আবৃতি নিজের মেহেদী রাঙা হাতের পানে চাইল। দুই হাতের তালুতে মেহেদীর মধ্যে জ্বলজ্বল করছে ‘Oikko’ নামটি। আবৃতি নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল নিজের হাতের তালুতে লেখা নামটির দিকে। এই নামটি আজ থেকে আবৃতির জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে যাবে। আজকের পর থেকে আবৃতিকে এই নামটির সাথে জড়িয়েই সারাটা জীবন চলতে হবে।
★
— পাপা, পাপা!
ব্যস্ত পায়ে ঢুকতে ঢুকতে গলা চড়াও করে বললো। সাদা শেরওয়ানীর উপরের কটিটা গায়ে জড়িয়ে ঐক্য আয়নায় তাকাল। ওয়াফা চোখ পিটপিট করে পাপাকে আগাগোড়া দেখে গালে হাত দিয়ে বলে,
— ও পাপা, তোমাকে কত্ত সুন্দর দেখাচ্ছে।
আয়নায় মেয়ের চঞ্চল মুখের দিকে তাকিয়ে ঐক্য স্মিত হাসলো। ওয়াফার পরনে একটা সফেদ রঙা গাউন। ঐক্য মুচকি হেসে পিছু ফিরে মেয়ের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে কোমল গলায় বলে,
— আমার আম্মাজানকেও খুব খুব সুন্দর লাগছে। একদম প্রিন্সেসের মতো।
ওয়াফার নেত্রদ্বয় চকচক করে উঠে। কেউ ওর প্রশংসা করলে বাচ্চাটা বেজায় আনন্দিত অনুভব করে।
— ভাইয়া তোমার হলো?
ঐশী ঐক্যকে ডাকতে ডাকতে ব্যস্ত কদমে রুমে ঢুকে থমকে দাঁড়ায়। ঐক্যকে আগাগোড়া পরখ করে সহাস্যে বলে,
— ওয়াও ভাইয়া, ইউ লুকিং সো হ্যান্ডসাম!
— থ্যাংকস ফর ইওর কমপ্লিমেন্ট বনু৷
ঐশীর আজকের খুশিটা ব্যাখ্যাতিত। তার ভাইটা অবশেষে নিজের জীবনে একটু সুখ পেতে যাচ্ছে। সে মুচকি হেসে বললো,
— চলো ভাইয়া তোমার বৌ ওয়েট করে আছে।
ওয়াফা শশব্যস্ত হয়ে ঐক্যের এক হাত জড়িয়ে ধরল। ঐক্য তাকালে ওয়াফা তাড়া দিয়ে বললো,
— পাপা তাড়াতাড়ি চলো। সুইটি আন্টিকে নিয়ে আসতে হবে।
ঐশী হেসে দিল। ঐক্য মৃদু হেসে মেয়ের সামনে হাঁটু ভেঙে বসলো। মেয়ের নিষ্পাপ চোখে চোখ রেখে শুধাল,
— আম্মাজান? তোমার সুইটি আন্টি কিন্তু আমাদের সাথে একা আসবে না। আরশান বাবাও আসবে সাথে। আরশান আজ থেকে তোমার ভাই। তোমার মনে আছেনা?
ওয়াফা চোখ পিটপিট করে মাথা নাড়ায়। ঐক্য ফের দারাজ গলায় বলে,
— তুমি যদি আরশানকে কষ্ট দাও তাহলে তোমার সুইটি আন্টিও অনেক হার্ট হবে। তুমি কি তোমার সুইটি আন্টিকে কষ্ট দেবে?
ওয়াফা তড়াক দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বলো,
— নো নো পাপা। আমি সুইটি আন্টিকে একটুও হার্ট করবনা। প্রমিজ৷
— আর আরশান? ও তো তোমার ভাই হতে চলেছে। তুমি তাকে আদর করবে তো?
ওয়াফা মাথা নাড়িয়ে বললো,
— হ্যাঁ আরশানকেও আদর করব। ওকে আমার টয় দিয়ে খেলতেও দেব। ওকে বলে দিও যেন সুইটি আন্টিকে মাম্মাম ডাকতে দেয়।
— দেবে মা। তোমার সুইটি আন্টিকে আজকের পর থেকে ‘মাম্মাম’ ডাকার অধিকার পেয়ে যাবে সারাজীবনের জন্য।
ওয়াফা এত ভারী ভারী কথা বোঝেনা। ও শুধু জানে আজকে ও প্রথমবারের মতো কাউকে মাম্মাম ডাকতে পারবে। ঐক্য অপলক তাকিয়ে থাকে মেয়ের প্রাণবন্ত নিষ্পাপ মুখটার দিকে। মাহিরা যখন ওয়াফাকে ফেলে চলে যায় তখন সবাই মিলে অনেক চেষ্টা করেছে ঐক্যকে দ্বিতীয় বিয়ে করাতে। কিন্তু অনড় ঐক্য কিছুতেই রাজী হয়নি৷ মা বিহীন মেয়েকে যে ঐক্য খুব দেখবাল করে বড় করেছে বিষয়টা তেমনও না। মাহিরার থেকে প্রাপ্ত ধাক্কায় ঐক্য নিজেই তখন বিধ্বস্ত হয়ে ছিল । ওই অবস্থায় তার দুধের বাচ্চাটাকে সে বুকে আগলে মানুষ করতে পারেনি ভালভাবে। কিভাবে যেন মা ছাড়া তার মেয়েটা এর হাতে, ওর হাতে বড় হয়ে গেল। ঐক্য হয়তো কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলেছে মেয়ের পেছনে। কিন্তু একটা শিশুর বেড়ে উঠার জন্য মায়ের মমতা আর বাবার স্নেহের সঙ্গ প্রয়োজন সেটা ঐক্য দিতে পারেনি। সেই আক্ষেপ বুকে নিয়ে ঐক্য এতদিন বেঁচে ছিল। কিন্তু আজ এতবছর বাদে ঐক্যের বুকে পুষে রাখা আক্ষেপ টুকু কেউ একজন স্বযত্নে দূর করতে চলেছে।
ঐক্য জোবায়দা চৌধুরীর থেকে দোয়া নিল। জোবায়দা চৌধুরীর চোখে জল জমে। ঐক্য হতভম্ব জয়ে ওনাকে আগলে উদগ্রীব হয়ে শুধায়,
— আম্মু আপনি কাঁদছেন কেন?
জোবায়দা চৌধুরী ধরা গলায় বলে,
— মেয়েটা কেন যে আরো কয়টা বছর পূর্বে তোদের জীবনে এলোনা।
ওনার গলায় আফসোস আর হাহাকার। ঐক্য ম্লান হেসে ওনাকে জড়িয়ে ধরল। অস্ফুটস্বরে বললো,
— মা হয়তো একটু দেরী করে, কিন্তু তোমার ছেলের জীবনে অবশেষে সঠিক মানুষটি আসতে চলেছে। তুমি শুধু দোয়া করো ওই মেয়েটাই যেন তোমার ছেলের অন্তিম শ্বাস অব্দি পাশে থেকে যায়।
*
— বর এসেছে, বর এসেছে৷
বাইরের থেকে কয়েকটা সমন্বিত গলায় একসাথে প্রতিধ্বনিত হলো শব্দ দুটি৷ এই দুটি ডাকে অভ্যস্ত আবৃতি কেঁপে উঠে জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো। এক পশলা কম্পন খেলে গেল ওর অন্তঃস্থলে। আরশান ঐক্য এসেছে শুনে আর একমুহূর্ত দেরী না করে ছুটলো।
— আস্তে বাবা। পড়ে যাবে।
আরশান যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলতে শোনা যায়,
— মাম্মাম পাপা এসেছে। আমাদের নিতে চলে এসেছে।
আবৃতি টলমল চোখে সেদিকে তাকিয়ে প্রলম্বিত শ্বাস টানে। এসে গিয়েছে, ওর অপেক্ষারত সুখগুলো ওকে নিতে এসে গিয়েছে।
আবৃতির কাজিনরা গেইট ধরলো। ওদের দাবী মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা। ঐশী চোখ কপালে তুলে বললো,
— আপুরা পঞ্চাশ হাজারে কয়টা শূন্য জানেন?
আহান এতক্ষণ নীল জর্জেট লেহেঙ্গা পরিহিত শ্যাম সুন্দরীকে মেয়েটাকে কোণা চোখে হা করে দেখছিল। ঐশীর কথায় হঠাৎ অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসে।
— জি আপু জানি। বেশি মাত্র চারটা শূন্য। আর দুলাভাইয়ের দেখুন এক হালি শালি। শূন্যের পরিমাণ যে আরেকটা বাড়াইনি এই ঢের।
সোহান ঐক্যের কানে কানে ফিসফিস করে বলে,
— ভাই এরা দেখি এক একটা জল্লাদ। পঞ্চাশ হাজারে রাজী হয়ে যাসনা। এখনো আরো বহুট স্তরে স্তরে এই চুন্নিগুলো টাকা হাতিয়ে নেবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এমন জানলে রুপন্তিকে বিয়েই করতে যেতাম না। কাজি অফিসে সেরে ফেলতাম।
পাশে থাকা সোহানের নতুন বৌ কনুই দিয়ে ওর পেটে গুঁতো মারে।
— কি হলো? কি এত ফুসুরফাসুর করছেন আপনারা? দেখুন বেশি গাঁইগুঁই করলে শূন্যের পরিমাণ যেকোন সময় আরেকটা বেড়ে যেতে পারে।
ঐশী দাঁত কটমট করে হা করে কিছু বলতে নেবে। ঐক্য ওকে থামিয়ে মুচকি হেসে বলে,
— শালিকাদের আদেশ চির ধার্য। আচ্ছা এই নিন।
ঐক্য পকেট থেকে একটা টাকার বান্ডেল বের করে দিল। মেয়েগুলো একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে টাকাগুলো গুনতে লাগল। গুণে ওদের চোখ কপালে উঠে যায়। কেননা ঐক্য পঞ্চাশ হাজারের জায়গায় এক লাখ টাকার বান্ডিলটা। ওরা অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকায়। ঐক্য ফিচেল হেসে বলে,
— কি টাকা ঠিক আছে? নাকি আরো লাগবে?
ওরা থতমত খেয়ে বলে,
— না না দুলাভাই। একদম ঠিক আছে। এই তোরা সর। দুলাভাইকে ঢুকতে দে।
ঐক্য রিবন কেটে ভেতরে ঢুকল। ঐশী যেতে যেতে একবার আহানের সাথে চোখাচোখি হলো। বেচারা আহান মুখ লটকে দাঁড়িয়ে আছে। বহু চেষ্টা করেও ঐক্যকে রাজি করাতে পারেনি বিয়েতে। ঐক্য ঘোষণা করেছে অন্তত চারমাস ঐশীর প্রফ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।
বিয়েটা ঘরোয়াভাবে আয়োজন করা হলেও আহান চেষ্টা করেছে বোনের জন্য স্পেইশাল কিছু করতে। তাই ঐশীর কথামতো বিয়ের আসরে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। ঐক্য আরশান, ওয়াফাকে নিয়ে সেখানে বসে। ওর বুকটা ঢিপঢিপ করছে অব্যক্ত অনুভূতিতে। আচ্ছা আবৃতিকে কেমন লাগছে? উনি কি ঐক্যের মন মতো সেজেছেন? সাদা শাড়িতে কেমন দেখতে লাগছে ওনাকে? ঐক্যের মনের সকল অস্থিরতাকে মুক্তি দিয়ে কাজি সাহেব তার রাশভারী গলায় বললেন,
— কনেকে নিয়ে আসুন৷
কাজি সাহেবের বলতে দেরী ঐক্যের শালিকারা ছুটলো আবৃতিকে নিয়ে আসতে। দুলাভাইয়ের কাজে আজকে তারা সন্তুষ্ট। ঐক্য একটু পরপর কপালের ঘাম মুছছিল। হঠাৎ অনুভব করে একজোড়া পা খুব ধীর গতিতে সামিয়ানার অপর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আবৃতি মাথা নিচু করে বসলো। ঐক্য আবৃতির আবছা ছায়া দেখলো সামিয়ানার আড়ালে। ওয়াফা তড়াক করে উঠে ওদিক দিয়ে আবৃতির কাছে চলে গেল। আবৃতি ওকে দেখে মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়। ওয়াফা ঝাপ দেয় ওর বাহুডোরে। আবৃতি পরম মমতায় ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। আজ থেকে এই আদুরে প্রাণটা তার, শুধু তার। কাজি সাহেব সময় বিলম্ব না করে বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন,
— জবাব ওয়াসিম চৌধুরীর একমাত্র পুত্র ঐক্য চৌধুরীকে নগদ বিশলক্ষ দেনমোহরে বিবাহ করিতে রাজি থাকিলে বলো মা কবুল!
আবৃতি ওয়াফার নরম হাতটা আঁকড়ে ধরে ঢোক গিলে। ওর দুচোখ টলমল করছে। আহান পেছন থেকে আবৃতির কাঁধ আঁকড়ে ধরলো। আবৃতি তাকালে চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে। আবৃতি একটা লম্বা শ্বাস টেনে অস্ফুট স্বরে বলে,
— কবুল, কবুল, কবুল।
সবাই সমন্বয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠে। ঐক্য অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে আলহামদুলিল্লাহ বলে। কাজি একই নিয়মে ঐক্যকে কবুল বলতে বললেন। ঐক্য স্পষ্ট করে মৃদু আওয়াজে বললো,
— কবুল,কবুল,কবুল।
ফের আরেকবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিত হলো পুরো কক্ষটিতে।
কাজি সাহেব বিগলিত হেসে বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ। আজ থেকে আপনারা দুজন একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। আল্লাহ আপনাদের সম্পর্কে বারাকাহ দান করুক। আমিন।
সবাই একযোগে আমিন বলে উঠে।
ফুল দিয়ে তৈরী সামিয়ানাটির আড়ালে দুজন মানব মানবী সাথে সাথে দুজন দুজনের দিকে তাকাল। কাজি সাহেব উঠে গেলে ঐশী হেসে বললো,
— ভাইয়া এবার তোমার বৌকে তুমি দেখতে পার।
ঐক্য জড়তাহীন উঠে দাঁড়ালো। হাত দিয়ে সামিয়ানাটি সরিয়ে দেখল একটা শুভ্র পরী মাথা নিচু করে বসে আছে। ঐক্যের ঠোঁট দুটো প্রসারিত হয় অকৃত্রিম হাসিতে। আবৃতি চোখ তুলে তাকাতেই মিলিত হলো একজোড়া মুগ্ধ দৃষ্টিতে। যেই দৃষ্টির মায়া আজ থেকে ওর পরম নির্ভরতা হয়ে থাকবে। আবৃতিকে অবাক করে দিয়ে ঐক্য এগিয়ে এসে দ্বিধাহীন নিজ অর্ধাঙ্গিনীর ললাটে চুম্বন এঁকে দিল। আবৃতি চোখ বন্ধ করে নিল পরম আবেশে। বন্ধ চোখের কোল ঘেষে একফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
চলমান…..
[কেমন লাগলো আজকের পর্বটা বিনা দাওয়াতের মেহমানরা? মন্তব্য করে জানাবেন কেমন? হ্যাপি রিডিং এন্ড ইনজয় দিজ সুইট মেরিজ চেরিমনি।😊]