অনু গল্প

১০৩° জ্বর নিয়েই বিছানায় হেলান দিয়ে কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে চিপস খেতে খেতে ‘Twilight’ মুভির একটা সিজন দেখছিলাম। অসাধারন একটা ভ্যাম্পায়ার মুভি। প্রত্যেকটা সিরিজই অসাধারণ। আসলে আমি এমনই যখনই ইচ্ছে করে একটা করে ভ্যাম্পায়ার মুভি দেখি। তো গভীর জঙ্গলে হিরো গাছের আড়াল থেকে ভ্যাম্পায়ার হয়ে বেড়িয়ে আসবে এখন, খুব ইন্টারেস্টিং সিন, আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছি আর মুখে চিপস ঢুকাচ্ছি। এমন সময় হুট করেই হোয়াটসঅ‍্যাপে ভিডিও কল এলো, ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে এল ‘ Half Pagol’ মানে আদ্রিয়ান ভাইয়া। ওনার নাম্বারগুলো আমার ফোনে আলাদা আলাদা নামে সেভ করা, হোয়াটসঅ‍্যাপে যেটা আছে সেটা এই নামেই সেভড। একটু বিরক্ত হলাম, এই লোকটা আমায় জীবনেও শান্তি দেবেনা। দূর! ভেবেছিলাম ইউ কে গিয়েছে কয়েক বছরের জন্যে শান্তি পাবো। কিন্তু না! এ যদি মঙ্গল গ্রহেও চলে যায় আমায় প্যারা দেওয়া কোনদিন বন্ধ করবেনা। আমার কোন কালের আত্মীয় লাগে এ যে এত খবরদারি করে। মানছি উনি আমার বাবার বন্ধুর ছেলে, আমায় এক্কেবারে জন্ম থেকে চেনে, আমার আর ওনার বাবা দুজন দুজনকে ভাই ভাবে, আমিও মানিক আঙ্কেলকে নিজের কাকার মতই দেখি। কিন্তু তাই বলে একে আমার কাজিন ভাই হতে কে বলেছে? আমার কাজিন ভাইরাও তো আমায় নিয়ে এত তদারকি করেনা যতটা এ করে। আমি তাড়াতাড়ি চুল, টিশার্ট ঠিক করে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলাম উনি যাতে বুঝতে না পারে আমার জ্বর এসছে, তাহলে আমি শেষ। একেবারে শেষ! প্রায় ৮০৮৭ কিলোমিটার দূরে থাকা মানুষটাকেও যে কেন আমি এত ভয় পেয়ে যাই বুঝতেই পারিনা। সাক্ষাৎ একটা ভ্যাম্পায়ার। আমি সব ঠিকঠাক করে কলটা রিসিভ করলাম। কিন্তু স্ক্রিনে তাকিয়েই আমি একটু চমকে গেলাম। সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো উষ্কোখুষ্কো হয়ে আছে, আকাশি রঙের ফুলহাতা টিশার্টটা হালকা ভিজে আছে, চোখে হালকা লালচে ভাব রয়েছে। আমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে, এত এত পড়াশোনার চাপে পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি? উনি শান্ত দৃষ্টিতে আমায় কয়েক সেকেন্ড দেখে তারপর বললেন,

— ” কী করছিলি?”

আমি একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম,

— ” এইতো ঘুমোচ্ছিলাম। বিকেলবেলা ঘুমটা স্বাস্থ্যের জন্যে বেশ ভালো তাইনা?”

উনি চোখ মুখ শক্ত করে বললেন,

— ” তুই ল্যাপটপে ডেটা অন করে, ল্যাপটপ খুলে রেখে, ঘুমোচ্ছিলি তাইনা? এমন একটা থাপ্পড় মারব না ঠিক কতদিন কানে শুনতে পাবিনা আমিও জানিনা, সারাজীবনের জন্যে বয়রাও হয়ে যেতে পারিস। জানিসনা আমি মিথ্যে কথা পছন্দ করিনা?”

আমি কিছু না বলে মুখ ভার করে বসে রইলাম। উনি ধমকের সুরে বললেন,

— ” যদিও তুই বয়রা হলে আমারই কপাল পুড়বে। যাই হোক। নিশ্চয়ই বসে বসে ওই ভ্যাম্পায়ার দের গুষ্ঠি গিলছিলি? ওইসব ফালতু জিনিস কেউ এমন হা করে কীকরে গেলে সেটাই ভাবি আমি।”

আমি মুখ ফুলিয়ে বললাম,

— ” দেখুন আমায় যা বলার বলুন কিন্তু আমার ভ্যাম্পায়ারদের নিয়ে কিচ্ছু বলবেননা। ভালো হবে না কিন্তু!”

— ” আচ্ছা? কী খারাপ করবি তুই আমার?”

আমি কিছু না বলে একটা মুখ ভেংচি দিলাম বললেন,

— ” জ্বর কীকরে বাঁধালি?”

আমি চমকে তাকালাম ওনার দিকে। ভ্রু কুচকে বললাম,

– ” আপনাকে কে বলল?”

— ” সেটা তুই জেনে কী করবি? কীকরে বাঁধালি সেটা বল!”

আমি এবার নিচু কন্ঠে বললাম,

— ” জানি না।”

উনি এবার রেগে ধমকের স্বরে বললেন,

— ” তিনদিন আগে সন্ধ্যাবেলায় দেড় ঘন্টা শাওয়ার নিয়েছিস, মামনী বকাবকিতে হুডিটা মাঝেমাঝে পরিস কিন্তু তাও চেইন পুরোটা খুলে রেখে। রাতে ঘুমোনোর সময় আর্ধেক শরীরে কম্বল থাকে বাকি আর্ধেক ফাঁকা। তুই জানিস না তো কী আমি জানি?”

শেষের কথাটা এতটা জোরে বলল যে আমি কেঁপে উঠলাম। ভয় পেয়ে মাথা নিচু করে বসে আছি। জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিয়ে বলল,

— ” কী খাচ্ছিস?”

আমি অসহায় দৃষ্টিতে একবার চিপসের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে তারপর ওনার দিকে বললাম,

— ” চ্ চিপস।”

উনি ঠান্ডা গলায় বলল,

— ” কে কিনে দিয়েছে?”

আমি কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বললাম,

— ” স্ সাইফুল ভাইয়া এসছিল দেখতে উনিই নিয়ে এসছে।”

উনি ওনার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে একটা শ্বাস নিয়ে বলল,

— ” অসুস্থ মানুষ দেখতে এলে ফলমূল নিয়ে আসে। এইসব জঘন্য জিনিস কে আনে হ্যাঁ? আর একটু জ্বরই তো হয়েছে, মরে তো আর যাসনি দেখতে আসার কী ছিলো?”

— ” আসলে..”

উনি আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই বললেন,

— ” জ্বর কত এখন?”

অামি এবার কী করব? এখন সত্যি বললেও জ্বালা মিথ্যে বললে মহাজ্বালা। তাই ভয়ে ভয়ে নিচু কন্ঠে সত্যিটাই বললাম,

— ” ১০৩°”

বেশ কয়েক সেকেন্ড সে চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইল এরপর হঠাৎ করেই ডিসকানেক্ট হয়ে গেল। আমি জানতাম এমনটাই হবে। নিশ্চয়ই ‘ঠাস’ করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিয়েছে। না জানি এই আধ পাগল এখন কী করবে? শুধু ঘরের জিনিস ভাঙচুর করলে করুক। কিন্তু হাত-ফাত কেটে ফেলবে না তো? আমি তাড়াতাড়ি ফোন বেড় করে ফোন করলাম ওনাকে কিন্তু তার ফোন ইতিমধ্যেই বন্ধ। ছুড়ে টুরে ফেলে দিয়েছে নিশ্চয়ই। ধূর এখন ততক্ষণ শান্তি নেই যতক্ষণ না কথা হচ্ছে। সব দোষ আমার মায়ের। নিশ্চয়ই এ সব কিছু ওনাকে আম্মুই পুরো দায়িত্ব নিয়ে বলেছে। আজব! এখানে পান থেকে চুন খসে গেলেই ওখানে বলার কী দরকার? এরকম কুটকাচালির তো মানুষ নিজের মেয়ের নামে মেয়ের জামাইর কাছেও করেন না যতটা আম্মু আদ্রিয়ান ভাইয়ার কাছে আমার নামে করে। ডিসগাসটিং।

লেখিকা:অনির কলমে আদ্রিয়ান ❤

[ বেশ কয়েকদিন যাবত অনেকে চাপ দিচ্ছিলেন এটা দেওয়ার জন্যে, তাই দিলাম। এবারও ‘এটা বাস্তব বা কাল্পনিক?’ একই প্রশ্ন করে এই বাচ্চাটাকে লজ্জা দেবেনা। ]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x