লেখিকা:হুমা আবেদীন
অণুগল্প
পুস্পিতা ওয়াহিদকে প্রথম দেখেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের বাইরে। ঝাকড়া চুল, ঠোঁটের ভাজে জলন্ত সিগারেট, শ্যামলা চেহারার সুদর্শন এক যুবক।গায়ের রঙ চাপা হওয়ায় যেন আরো বেশি সুপুরুষ সেই যুবক।গিটারে টুং-টুং সূর তোলা যেই যুবকের প্রতিটা অঙ্গে মুগ্ধতা ছড়ানো!সেই দেখে নিজের ধ্যান -জ্ঞান খুয়িয়ে ফেলেছিল পুস্পিতা। তবে কাছে গিয়ে কথা বলতে বা পরিচিত হবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা ও।
কুস্টিয়ার কুমারখালি এলাকার এক মফস্বল শহরের মেয়ে পুস্পিতা।পড়ালেখাতে ছোট থেকে বরাবরই মেধাবী। সম্পুর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় রাবিতে ফলিত রসায়নে চান্স পেয়েছে ও। অবশ্য ওকে এই পর্যন্ত পাঠাতে ওর মায়ের ভূমিকা অসামান্য। তিনি নিজের সবটা বিলিয়ে দিয়েছেন ওকে পড়ানোর জন্য।
বিশাল বড় যৌথ পরিবার পুস্পিতার। বাবা-চাচা-ফুফু মিলে মোট দশ জন। চার জন চাচা এবং ছয় জন ফুফু।আরো দাদা-দাদি, চাচাতো ভাই বোন , সেই সঙ্গে দাদির বোনেরা সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন মানুষ ওদের বাড়িটায়।ফুফুদের বিয়ে হলেও কেউ-ই নিজের সংসারে যাননা।গেলেও মাসের বিশ দিন বাপের বাড়ি থাকেন।তাদের ছেলেমেয়েরাও মায়ের সঙ্গে ওদের বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা।আর বাড়ির বড় বউ হিসেবে সব রান্নার দায়িত্ব ওর মায়ের। চাচীরাও সাহায্য করে।তারপর ও এত এত মানুষের কাজ, রান্নাবান্না, সেই ফজরের আগে উঠে ওর মা রেহানা বেগম!আর ঘুমাতে যান সবার শেষে। এর মধ্যে গৃহস্ত ঘর হওয়ায় ফসল আসে। সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব ও ওর মায়ের! ফুফুরা আসলেও কোনো কাজ করেনা। শুধু হুকুমের পর হুকুম করতে থাকে।আর ভাইয়ের ছেলে-মেয়েদের পিছনে লাগতে থাকে।পানের বাটা সাজিয়ে পা ছড়িয়ে বসে কপাল চাপড়ে হায় হায় করতে থাকেন। কথার বাণে বিদ্ধ করতে থাকে রেহানা বেগমকে।
-বড় ভাইয়ের ঘরে পোলা নাই কুনু।দুয়োডা মাইয়া!ভাইয়ের বংশের পিড়ি থাইমা যাইব।ভাইরে বিয়া করায় দিতে হইবো”
বাকি ফুফুরাও মাথা নেড়ে সায় জানায়।এসবে ইন্ধন যোগায় পুস্পিতার দাদি।মায়ের এত কষ্ট সহ্য হয়না পুস্পিতার। ফজরে মায়ের সাথে কাজ করার জন্য ও উঠে যায়। তখন হাসি মুখে রেহানা বেগম মেয়েকে ঠেলে বের করে দেন রান্নাঘর হতে।পুস্পিতা পড়াশোনা করে শিক্ষিত হলে তবেই তার কষ্ট সার্থক হবে।
পুস্পিতার এখনো মনে পড়ে রাবিতে ভর্তি পরিক্ষার আগে কত রকম কটূক্তি করা হয়েছে ওর মাকে।মাইয়ারে ব্যা** বানাতে চায় রেহানা। এজন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চায়।ফুফুরা সমানে চিল্লাচিল্লি করেছে।অথচ রেহানা বেগম নিজের সিদ্ধান্তে অটল!মায়ের অপমানে চোখ ফেঁটে জল নামে পুস্পিতার। ওর মা সেদিন জোর গলায় ফুফুদের থামিয়ে দিয়েছিল।স্বামীর দুই পা পর্যন্ত চেপে ধরেছিল পুস্পিতাকে যেন পরীক্ষা দিতে দেন।সেদিন ওর মেজো চাচা ওকে এনেছিল রাবিতে পরিক্ষা দিতে।তিনি নিজেও রাবির ছাত্র ছিলেন।ভাইয়ের মেয়েটা মেধাবী তিনি জানতেন। বোনদের কড়া ধমক লাগিয়েছিলেন তিনি।মেজো চাচার সেই অবদান ভুলতে পারবে না পুস্পিতা কোনোদিন! এরপর যখন ওর স্বপ্ন পূরণ হলো, রেহানা বেগম সেদিন একশ রাকাত শুকরিয়া নামাজ আদায় করেছিলেন।মায়ের বিশ্বাস কোনো ভাবেই চূর্ন করতে পারবে না পুস্পিতা , জানেন তো রেহানা।ফুফুরা মুখ বাঁকায়! মা -বেটির ঢঙে তাদের গা জ্বলে যাচ্ছে যেন!ভাই বউ কে শাসায় মেয়ের কুকীর্তি ধরতে পারলে মা-মেয়েকে একসঙ্গে বাড়ি ছাড়া করা হবে।
পুস্পিতা জানে ওর ফুফুরা ওৎ পেতে আছে। প্রেম বা ছেলে ঘটিত কোনো ব্যপার জানতে পারলে তার ফলাফল ভোগ করতে হবে ওর মাকে।অবশ্য বানিয়ে কম কথা বলেনি এই পর্যন্ত।ভাইয়ের ছেলে মেয়েদের নাকি ফুফুরা অনেক আদর করে,তাহলে ওর ফুফুরা এত বিষাক্ত কেন বুঝে আসে না পুস্পিতার। ওর দেখাদেখি ছোট বোনটাও ভালো পড়াশোনা করছে ইদানীং। রেহানা বেগমের চোখে খুশির ঝিলিক দেখতে পায় পুস্পিতা।এজন্যই প্রেম ভালোবাসার দিকে এগোয় না।আবার ওয়াহিদকে ভুলতেও পারেনা।ওর অবস্থা কিছুটা ওই গানটার মত।
“দূর হতে আমি তারে সাধিব, গোপন বিরহ ডোরে বাধিব ”
ওয়াহিদকে প্রায় দেখা যায় শহিদ মিনারে বসে গানের আসর জমিয়েছে। পুস্পিতা দূর থেকে চুপিসারে দেখে চলে আসে।কখনোবা আড়ালে দাঁড়িয়ে গান শুনে। নিজের মনে মনে সাজাতে থাকে ওয়াহিদের সাথে ওর ছোট্ট স্বপ্নের এক দুনিয়া!যে স্বপ্ন শুধুমাত্র কল্পনায় সীমাবদ্ধ।
একদিন গাছের আড়ালে বসে কয়েকজন বান্ধবীর সাথে গল্প করছিল পুস্পিতা।তবে কান ছিল অদুরে বসা স্বপ্নপুরুষের গানের দিকে।কিছুক্ষণের মধ্যে গান থেমে গেলে উশখুশ করতে থাকে পুস্পিতা।হুট করে ওয়াহিদকে নিজের পাশে বসে পড়তে দেখে চমকে যায়!
– কি ব্যপার? মিস ফ্লাওয়ার? লুকিয়ে গান শুনে আর কত দিন কাটাবে? এবার অন্তত মন দেয়া-নেয়াটা সেরে ফেলা যাক। কি বলো?
লজ্জায় গান দুটো লাল হয় পুস্পিতার। ইশ দেখে ফেলেছে ওয়াহিদ ওকে! এরপর না চাইতেও একটু একটু কাছাকাছি আসা,কথা বলা, ক্লাস শেষে একসাথে হলে ফেরা সবকিছুতে কখন যে মায়ায় জড়িয়ে ভালোবাসায় বেঁধে গেলো পুস্পিতা নিজেও জানেনা।মনের আনাচে-কানাচে উপচে পড়ে দুজনের ভালোবাসা। টি বাধ, রাবির ক্যাম্পাস, কখনোবা ট্রেনে চড়ে অজানায় হারিয়ে যাওয়া,হাতে হাত রেখে কখনো ছেড়ে না যাওয়ার অঙ্গীকার। ইশ ওয়াহিদকে এভাবে পেয়ে যাবে কখনো ভাবতেই পারেনি পুস্পিতা!
পুস্পিতা যখন তৃতীয় বর্ষে, হুট করে খবর এলো ওর দাদা ইন্তেকাল করেছেন।দাদা মারা যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যায় ওর দাদি। এরপর থেকে বদলে যেতে থাকে পুস্পিতার বাড়ির দৃশ্যপট।দীর্ঘদিনের অত্যাচারের পর ফুফুদের আর কেউই দেখতে পারেনা ওর চাচীরা।আর বৃদ্ধ প্যারালাইজড মায়ের দেখাশোনার ভয়ে কোনো ফুফুকেই আর পাওয়া যায়না।
সংসারের রাশ আলগা হয়েছে বুঝে আস্তে আস্তে ফুফুরাও নিজেদের ছেলে মেয়ে নিয়ে কেটে পড়তে থাকেন।কমতে থাকে সদস্য সংখ্যা।কয়েক মাস শয্যাগত অবস্থায় থেকে মারা যায় ওর দাদিও।পুস্পিতার মায়ের জীবনেও বেশ শান্তি এসেছে তখন।বহু বছর একটানা খাটাখাটুনি করে তিনিও ক্লান্ত।শরীর আর সায় দেয়না!
ওয়াহিদের সাথে প্রনয়ের তখন প্রায় তিন বছর চলে, এর মধ্যে সরকারি চাকরি পেয়েছে ওয়াহিদ।বিসিএস দিয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডার হিসেবে জয়েন করেছে।পুস্পিতার ও গ্রাজুয়েশন শেষ ততদিনে।এরপরের সময়টা কেটেছে খুব দ্রুত। প্রতিষ্টিত ওয়াহিদকে মেনে নিতে বিন্দুমাত্র আপত্তি করেনি পুস্পিতার বাবা।দুজনের বিয়ে, আরো কাছাকাছি আসা,মিষ্টি মুহুর্তে আসন্ন থাকে পুস্পিতা!
ঢাকায় নিজের বাসা সাজায় ওরা।আজীবন যৌথ পরিবারে থাকা পুস্পিতা নিজের সংসার সাজিয়েছে দুহাত ভরে।ওয়াহিদ কখনো কিছুতেই মানা করেনি।রেহানা বেগমের সমস্ত শখ পূরণ করেছে পুস্পিতা।ছোট বোন প্রেমাকে এনে রেখেছে নিজের কাছে।ঢাকায় দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছে।ফুফুদের জন্য ওর মা কোনো দিন ভালো শাড়ি পড়তে পারেনি। তাইতো সব রঙের শাড়ি মাকে কিনে দেয় পুস্পিতা।ওয়াহিদ যদি কিছু মনে করে সেজন্য নিজেও চাকরি করা শুরু করে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।আহা সুখের জীবন! সুখের সংসার পুস্পিতার।
ওয়াহিদের জন্মদিন ছিল সেদিন।সেই কারণে অফিস থেকে জলদি ফিরেছিল পুস্পিতা। সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছে অনেক কিছু।বাসাটা সাজাতে হবে।কত কাজ ওর ! কেক অর্ডার করেছে,ফুল কিনেছে, ক্যান্ডেলস, ফাস্ট ফুড আরো কত কিছু। দরজা খোলার আগে গিফট বক্সটা আরো একবার দেখে নেয়। টাইটানের এই লিমিটেড এডিশন ঘড়িটা অনেক দিন ধরে টাকা জমিয়ে ওয়াহিদের জন্য কিনেছে ও।নিশ্চয় অনেক খুশি হবে ওয়াহিদ! আপন ভাবনায় ডুবে থাকা পুস্পিতা লক খুলে ভিতরে এসে বুঝতে পারে কেউ আছে বাসায়। হাসাহাসি শোনা যাচ্ছে।তবে তার সাথে আরো কিছু শব্দ আছে যা শুনে ওর শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়! নর-নারীর এই বেহায়া শীৎকার! বেডরুমে যেয়ে আবিস্কার করে নিজের বোন আর প্রানপ্রিয় স্বামীর বেহায়াপনা! এই মুহূর্ত টা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি পুস্পিতা! ওকে দেখেও যখন বোন কিংবা স্বামী কারো মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা দেখা গেলো না।বরং আবারো লিপ্ত হলো বেহায়াপনায় তখন বুকে চাপ অনুভব করতে থাকে পুস্পিতা।বুকে এতটা ব্যথা কেন করছে? জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে যেন। অন্ধকার নেমে আসে চারপাশে! আহ! শান্তির ঘুম বুঝি বুকে ব্যথার পরই পাওয়া যায়।
আজ ওয়াহিদ আর প্রেমার বিয়ে।বড় মেয়েকে হারিয়ে এত ভালো জামাইটাকে হাত ছাড়া করতে চায়নি পুস্পিতার বাড়ির লোকজন। ওয়াহিদ নিজেও অনেক শোকাহত পুস্পিতার জন্য।এত অল্প বয়সে পুস্পিতা স্ট্রোক করে মারা গিয়েছে ও কিছুতেই মানতে পারছে না।এজন্য যতদ্রুত সম্ভব রেহানা বেগম বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন ছোট মেয়ের সঙ্গে।
(Based on a true story)
……সমাপ্ত…..