পর্ব:০৩
লেখনীতে:মিফতাহুল জান্নাত জেমিম
সকাল সাতটা বেজে বিশ মিনিট।
জানলার পাতলা পর্দা ভেদ করে এক ফালি অবাধ্য রোদ আতিকার মুখের ওপর এসে পড়েছে। সেই রোদে ঘুমের রেশটুকু পুরোপুরি কাটার আগেই আতিকা ধড়ফড়িয়ে বিছানা ছাড়ল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত হাতে স্কার্ফটা ঠিক করে নিতে নিতে সে দেখল নিজের প্রতিবিম্ব—চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া, যা গত কয়েক রাতের নির্ঘুম পড়াশোনার সাক্ষী দিচ্ছে। কিন্তু সেই ক্লান্তিকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত সংকল্প তার চোখের মনিতে চিকচিক করছে।
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে যখন ঘরের দরজা খুলল, তখনো তার হাতে একটা পিন; স্কার্ফের কোণটা ঠিক করতে করতে সে বিড়বিড় করে নিজেকেই শাসন করল, “উফ! সাতটা বেজে গেছে! আজকে আবার সকালের টিউশনটাও আটটায়। এরপর সরাসরি ভার্সিটি… এক মিনিট দেরি মানেই রিমির মায়ের সেই বিরক্ত মুখ। একদম দেরি চলবে না আজ।”
রান্নাঘর থেকে ভাজা পিঠার মিষ্টি সুবাস ড্রয়িংরুমের বাতাসে ভাসছে। সেই সুবাসের রেশ ধরেই ভেসে এল রাহনুমা বিবির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর।
“আতিকা! এই যে, না খেয়ে আবার বেরিয়ে যাচ্ছিস? তোর ওই ভার্সিটি আর টিউশনের চাপে নিজের শরীরটা শেষ করে ফেলবি একদিন! একটু মুখে দিয়ে যা মা।”
আতিকা জুতো পরতে পরতে উত্তর দিল, “আম্মু, জানোই তো, ওই বাসায় রিমির মা ঘড়ির কাঁটার দিকে চেয়ে থাকে। একটা দিন দেরি হলে মনে হয় যেন আমি অপরাধ করে ফেলেছি। এখন খাওয়ার একদম সময় নেই।”
রাহনুমা বিবি চুলার আঁচ কমিয়ে মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখেমুখে এক ধরণের অসহায়ত্ব। তিনি জানেন, এই মেয়েকে আটকানো কঠিন। তবুও মা হিসেবে তার দাবিটুকু ছাড়তে পারেন না।
“সবার আগে নিজের শরীর, এই কথাটা কবে বুঝবি তুই? একবেলা খালি পেটে কেউ ঘর থেকে বের হয়? মানুষের বাড়িতে খাটতে যাস, শরীর ঠিক না থাকলে পারবি সামলাতে?”
আতিকা অস্থির হয়ে ব্যাগটা সামলে নিয়ে বলল, “সকালবেলা ঝগড়া করো না তো আম্মু। প্রমিস করছি, ফিরেই একবারে ভাত খাবো। এখন ছাড়ো।”
রাহনুমা বিবির দীর্ঘশ্বাসটা ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। তিনি করুণ স্বরে বললেন, “তুই কখনও বুঝিস না রে আতিকা। শুধু দায়িত্ব আর কাজ নিয়ে থাকিস। মা হিসেবে আমি কি একটু চাইতে পারি না—তুই ভালো থাকিস? সুস্থ থাকিস?”
আতিকা দরজার হাতল ধরে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়াল। মায়ের দিকে না তাকিয়েই ধীর স্বরে বলল, “আমিও তো চাই আম্মু, তুমি ভালো থাকো। কিন্তু বর্তমান সময়ে নিজেকে প্রমাণ করতে গেলে কিংবা এই যান্ত্রিক শহর আর সমাজের সাথে পাল্লা দিতে গেলে হয়তো একটু কম খেতে হয়, একটু কম ঘুমোতে হয়। আরাম দিয়ে জীবন গড়া যায় না।”
রাহনুমা বিবি চুপ করে গেলেন। তার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। আতিকা যখন দরজার দিকে পা বাড়ালো, তিনি দ্রুত রান্নাঘর থেকে একটা ছোট টিফিন বক্স নিয়ে এলেন। তাতে যত্ন করে রাখা গরম গরম পাটিসাপটা পিঠা।
“যা মা, অন্তত এগুলো নিয়ে যা। গাড়িতে বসে খেয়ে নিস। আর শোন, বাইরে কুয়াশা আছে এখনো, রিকশাও হয়তো পাবি না। ফরিদ চাচাকে বলি বাড়ির গাড়িটা বের করতে? উনি তোকে ঠিক সময়ে পৌঁছে দিয়ে আসবেন।”
আতিকা হাসল। তবে সেই হাসিতে কিছুটা তেতো ভাব ছিল। সে বক্সটা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “তুমি সবসময় ঠিক সময় ঠিক কাজটা করো আম্মু। কিন্তু তোমাকে আগেও বলেছি, আমি এই বাড়ির গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করতে পারব না। গাড়ি নিলে আমার নিজের স্বাধীনতাটুকু থাকে না। মনে হয় আমি খাঁচায় বন্দি। সবসময় ওই ফরিদ চাচার নজরদারি, আর বাড়িতে এসে তোমার কাছে রিপোর্ট দেওয়া—এসব আমার ভালো লাগে না।”
“তুই এমন করছিস কেন? মাথার মধ্যে কী যে ঢুকেছে তোর!” রাহনুমা বিবির কণ্ঠে এবার বিরক্তি আর অভিমানের মিশেল। “প্রয়োজনের সময় নিজের বাড়ির সম্পদ ব্যবহার করতে কীসের এতো দ্বিধা?”
আতিকা এবার মায়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে এক দৃঢ় আভিজাত্য ফুটে উঠল, “নিজেকে ছোট ভাবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই আম্মু। কিন্তু আমি চাই না কারো ওপর নির্ভর করে বাঁচতে। এই বিলাসবহুল গাড়িটা আমার উপার্জনের নয়। নিজের উপার্জনে যেদিন একটা রিকশা ভাড়া করার ক্ষমতা রাখবো, সেদিনই আমার আসল জয়। নিজের পথ নিজে তৈরি না করলে কোনোদিন নিজের জায়গাটা মজবুত হবে না। আসি এখন।”
দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
রাহনুমা বিবি জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাইরে আতিকার দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি এক গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। এই বিশাল বাড়ি, গ্যারেজে পড়ে থাকা দামি গাড়ি, আর প্রাচুর্যের অভাব নেই—তবুও তার মেয়ে কেন এমন যাযাবরের মতো জীবন বেছে নিল? কেন তার একটা সাধারণ, শান্ত এবং স্বাভাবিক সংসার জীবন হলো না? জীবনের কোন ভুলের মাশুল আজ তিনি দিচ্ছেন, তা কেবল তিনিই জানেন। তার বৈবাহিক জীবনের তিক্ততা আর একাকীত্ব কি তবে আতিকাকে এমন কঠোর করে তুলেছে?
গেইট পেরোনোর আগে আতিকা একবার থমকে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটা বের করে দেখল। পিঠার মিষ্টি গন্ধটা নাকে আসতেই তার অস্থির মনটা কিছুটা শান্ত হলো। সে ভাবল, মা কীভাবে সবসময় এত নিখুঁত পিঠা বানায়? যেন জীবনের সব কটু কথা তিনি এই পিঠার মিষ্টির নিচে লুকিয়ে রাখেন।
সামনে একটা ফাঁকা রিকশা আসতেই সে হাত তুলল। রিকশায় বসে ব্যাগটা কোলের ওপর নিয়ে সে যখন পিঠার বক্সে হাত রাখল, তার মনে হলো শরীরটা এক অদ্ভুত অস্থিরতায় কাঁপছে। আজকের সকালটা যেন তার জীবনের অন্য সব সকালের চেয়ে বেশি দ্রুতগামী। প্রতিটি সেকেন্ড যেন তাকে শাসন করছে। রিকশাচালকের প্যাডেল মারার শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে আতিকা ভাবল—এই সংগ্রামের শেষ কোথায়? নাকি সংগ্রামই তার গন্তব্য?
_______________________________________
ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে যখন আতিকা প্রবেশ করল, তখন ঘড়ির কাঁটা আটটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট। টিউশন শেষ করে বাসে করে আসতে গিয়ে আজ একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে। পিঠের ওপর ব্যাগের ভার, হাতে একগাদা রেফারেন্স বই আর নোটস। দ্রুত পায়ে করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় তার ওড়নার এক প্রান্ত বাতাসে অবাধ্য হয়ে উড়ছে। আতিকার কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম, কিন্তু তার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত মনোযোগ এখন তিনতলার ১০৪ নম্বর রুমের দিকে, যেখানে হয়তো ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।
তবে ক্লাসরুমে ঢোকার ঠিক আগে, করিডোর সংলগ্ন আমতলার সেই পরিচিত জায়গাটায় চোখ পড়তেই আতিকার পা দুটো এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সেখানে বাইকের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে শিহাব। সেই পরিচিত কালো জ্যাকেট, অবিন্যস্ত চুল আর চোখে এক অদ্ভুত উদাসীনতা। কিন্তু আতিকা আড়াল থেকে লক্ষ্য করল, শিহাবের সেই উদাসীন চোখের দৃষ্টি আজ স্থির হয়ে আছে তার ওপর। গতকালের সেই অপ্রীতিকর ঘটনার পর শিহাবের সামনে পড়তে আতিকার এক ধরণের সংকোচ হচ্ছিল।
সেদিন শিহাব কোনো উত্তর দেয়নি, শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আতিকার দিকে। সেই দৃষ্টিতে রাগ ছিল না, ছিল এক অমোঘ বিস্ময়।
শিহাব বাইকের হাতলে আঙুল বোলাতে বোলাতে দেখছিল আতিকার চলে যাওয়া। মেয়েটার হাঁটার ভঙ্গিতে এক ধরণের আভিজাত্য আছে, যা তাকে ভিড়ের মাঝেও আলাদা করে রাখে। ক্যাম্পাসের রঙিন দুনিয়ায় যেখানে মেয়েরা নিজেদের প্রসাধনী আর হাসির আড়ালে ঢেকে রাখে, সেখানে আতিকা এক সতেজ ব্যতিক্রম। তার চোখেমুখে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল এক অস্থির ব্যস্ততা আর নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা।
শিহাব মনে মনে হাসল। নিজের একাকীত্বকে সে এতদিন এক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। কিন্তু আতিকাকে দেখার পর থেকে তার সেই ঢাল যেন একটু একটু করে খসে পড়ছে।
গত রাতে বাবার সাথে খাওয়ার টেবিলে আতিকার নামটা হঠাৎ করেই উঠে এসেছিল। তার বাবা, অর্থাৎ কলেজের কঠোর স্বভাবের প্রিন্সিপাল স্যার, সাধারণ কারও প্রশংসা করেন না। কিন্তু আতিকার কথা উঠতেই তার চোখের চশমাটা ঠিক করে তিনি বলেছিলেন,
“আতিকার দাদা ছিলেন আমার কলেজের ইংরেজি বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। স্যার যেমন তুখোড় মেধাবী আর আদর্শবান ছিলেন, নাতনিটা ঠিক তেমন ধাতে গড়া। এমন শান্ত আর মার্জিত মেয়ে আজকালকার দিনে বিরল। শিহাব, এমন শিক্ষার্থীই কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব।”
বাবার সেই কথাগুলো শিহাবের কানে বার বার বাজছে। প্রিন্সিপাল স্যারের চোখে যে মেয়ে গর্বের পাত্রী, শিহাবের হৃদয়ে সে মেয়ে এক স্নিগ্ধ আলোর উৎস। শিহাব বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল, “আতিকা, তুমি হয়তো জানোও না, তোমার ওই শান্ত চাহনি আমার ভেতরের এই অন্ধকার ঘরটায় কত বড় একটা জানালা খুলে দিয়েছে। আমি তোমাকে কোনোদিন হারাতে দেব না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে হালকা এক ঝলক বসন্তের বাতাস বয়ে গেল ক্যাম্পাস চত্বরে। আতিকা তখন তিনতলার সিঁড়িতে পা রেখেছে। বাতাসের ঝাপটায় তার ওড়নার অংশটা একটু উড়ে এল নিচের দিকে। শিহাব নিচ থেকে দেখল, যেন আকাশের এক টুকরো মেঘ তার খুব কাছে এসে আবার দূরে সরে গেল।
আতিকা একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার ক্লান্ত চোখের কোণায় সূর্যের আলো পড়ে এক মোহনীয় আভা তৈরি হয়েছে। শিহাবের সাথে এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো তার। সেই এক সেকেন্ডের চাহনিতে আতিকা কী দেখল? মায়া, নাকি অন্য কিছু? সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
শিহাবের মনে হলো, পুরো পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে গেল। তার রুক্ষ বাইকের হাতলটাকেও এখন যেন খুব আপন মনে হচ্ছে। সে জানে, এই পথ সহজ হবে না। আতিকার মতো স্বাবলম্বী আর জেদি একটা মেয়েকে জয় করতে হলে কেবল প্রেম নয়, প্রয়োজন হবে এক অতল শ্রদ্ধা আর ধৈর্যের।
আতিকা অদৃশ্য হওয়ার পরেও শিহাব সেই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। রোদ বাড়ছে, ক্যাম্পাসের শোরগোল বাড়ছে, কিন্তু শিহাবের হৃদয়ে তখন এক নীরব বসন্তের সুর বেজে চলেছে।
________________________________________
করিডোরের ভিড় ঠেলে আতিকা যখন সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া হাত এসে তার কাঁধ জাপটে ধরল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথায় মৃদু এক টোকা আর সেই পরিচিত হাসিমাখা কণ্ঠস্বর— “কি ব্যাপার, মেরি দোস্ত!! কাল তো মনে হয় ঝগড়াটা ভালোই করেছিস সিনিয়রদের সাথে। নতুন নামও পেয়েছিস শুনলাম। তোর মুখটা কালকে মনে হয় পিঠার মতো ফুলে ছিল, তাই না…?”
আতিকা থমকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছিমছাম গড়নের, ফর্সা আর চঞ্চল এক তরুণী— সাবিহাতুল সোহা। আতিকার প্রাণের বান্ধবী।
আতিকা মেকি রাগ দেখিয়ে বলল, “তুই একদম চুপ করবি সোহা! ওই লোকটার মতো করে কথা বলবি না আমার সাথে। ‘আতিক্কা পিঠা’! এটা কোনো নাম হলো? বিরক্তিকর! আর তুই তো কাল ভার্সিটিতে আসিসনি, জানলি কীভাবে?”
সোহা হোহো করে হেসে গড়িয়ে পড়ল আতিকার গায়ের ওপর। হাসি সামলে নিয়ে বলল, “আরে, ডিপার্টমেন্টের গ্রুপ চ্যাট এখন তোর আর শিহাব ভাইকে নিয়ে গরম! ঢুকে দেখলেই বুঝতি তোকে নিয়ে কী পরিমাণ মাতামাতি চলছে। যে সিনিয়র ক্রাশের জন্য ক্যাম্পাসের অর্ধেক মেয়ে পাগল, সেই কিনা আমার এই ‘ম্যাচিউর’ বান্ধবীকে দেখে থমকে গেছে! তবে শিহাব ভাই নিজে যেচে তোকে নাম দিয়েছে, ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। সচরাচর কোনো মেয়ে বিষয়ক কিছুতে ওনাকে তো দেখাই যায় না।”
আতিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়াল। “সোহা, তুই কি ভার্সিটিতে ‘ইখতিয়ার শিহাব’-এর ওপর পিএইচডি করতে এসেছিস? আমার কিন্তু এই বিষয়ে কোনো ইন্টারেস্ট নেই, পরিষ্কার বলে রাখলাম।”
সোহা নাছোড়বান্দার মতো পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগল, “আরে ইয়ার, রেগে যাচ্ছিস কেন? দেখ, শিহাব ভাইকে আমাদের ডিপার্টমেন্টের প্রায় সব মেয়েই পছন্দ করে। কতজন যে ওনাকে ফুল আর বেনামি চিঠি পাঠায়! কিন্তু উনি কী করেন জানিস? সব ওনার ওই দুই মানিকজোড় বন্ধুকে দিয়ে দেন। ওনার অ্যাটিটিউডই আলাদা!”
“আশ্চর্য! এসব তথ্য জেনে আমি কী করব? উনি আমাকে কালই প্রথম দেখেছেন, তাও আমাদের ক্লাসরুম চেঞ্জ হওয়ায় ভুল করে ওনার সামনে পড়ে গিয়েছিলাম বলে।” আতিকার কণ্ঠে বিরক্তি থাকলেও সোহার উৎসাহে তাতে কিছুটা ভাটা পড়ল।
সোহা চোখ বড় বড় করে বলল, “লাইক সিরিয়াসলি আতিকা! তুই শিহাব ভাইয়ের ব্যাপারে একটুও জানতে ইচ্ছুক না? আমি তো ওনাকে আমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দিন দেখেই ইমপ্রেস হয়ে গিয়েছিলাম। হোয়াট এ হ্যান্ডসাম এন্ড স্টানিং লুক, হাইইইইই!! কিন্তু আমি ওনাকে…”
সোহা তার আবেগের ঝুলি আরও খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আতিকা মোক্ষম চালটি চালল। ঝটপট ব্যাগ থেকে মায়ের দেওয়া সেই পিঠার বক্সটা বের করল সে। একটা আস্ত পাটিসাপটা পিঠা বের করে সোহার কথার মাঝেই তার মুখে পুরে দিল।
“এই পৃথিবীতে কোনো কিছু যদি তোর মুখ বন্ধ করতে পারে, তবে সেটা হলো খাবার। এই নে, পুরো বক্সের সব পিঠাই তোর। এবার দয়া করে চুপচাপ ক্লাসে চল।”
সোহা প্রথমে চমকে গেলেও পিঠার স্বাদ মুখে লাগতেই তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে সেও একটা পিঠার অর্ধেকটা ভেঙে আতিকার মুখে তুলে দিল। মুখ ভর্তি পিঠা নিয়ে সে ‘গো গো’ শব্দে অদ্ভুত এক আওয়াজ করে ধন্যবাদ জানাল। দৃশ্যটা এমন ছিল যেন আতিকা তাকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কোনো সম্পত্তি দান করে দিয়েছে।
সাবিহাতুল সোহা আতিকার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তাদের বন্ধুত্বের শুরুটা ছিল বেশ নাটকীয়। প্রথম বর্ষে সোহা ভুল করে আতিকার প্রিয় লাইব্রেরি বুকের ওপর এক কাপ কফি ঢেলে দিয়েছিল। আতিকা সেদিন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সোহা তার নিজস্ব স্টাইলে এমনভাবে হাসিয়ে ক্ষমা চেয়েছিল যে আতিকা আর রাগ ধরে রাখতে পারেনি।
আতিকা যদি হয় শরতের গম্ভীর আকাশ, তবে সোহা হলো ফাল্গুনের উদাস বাতাস। আতিকা যেখানে রুক্ষ, জেদি আর আত্মমর্যাদাপূর্ণ; সোহা সেখানে নরম তুলোর মতো—হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত। তাদের বন্ধুত্ব যেন রাতের আকাশের চাঁদ আর তারা—আলাদা হলেও একই বিশাল ক্যানভাসের অংশ।
সোহার বাবা-মা বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সোহা সেখানে না গিয়ে নিজের দেশ আর এই হোস্টেল জীবনকে বেছে নিয়েছে। আতিকার প্রতিটি লড়াইয়ে, প্রতিটি দুঃসময়ে সোহাই সবার আগে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। আতিকা মুখে কোনোদিন ‘ভালোবাসি’ বলতে পারে না, কিন্তু সোহার জন্য তার ব্যাগে সবসময় একটা বাড়তি টিফিন কিংবা পছন্দের চকলেট ঠিকই থাকে।
দুই বান্ধবী পিঠা খেতে খেতে আর হাসতে হাসতে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আতিকার সকালের সেই অস্থিরতা সোহার সাহচর্যে যেন নিমেষেই উবে গেল। তবে মনের কোনো এক কোণায় ‘শিহাব’ নামটা আর ‘আতিক্কা পিঠা’র সেই বিদ্রূপাত্মক সম্বোধনটা কেন জানি!
_______________________________________
লাইব্রেরির সামনের প্রশস্ত সিঁড়ি। ব্রেক টাইমে জায়গাটা সাধারণত বেশ কোলাহলপূর্ণ থাকে, কিন্তু আতিকা যেখানে বসেছে, সেখানে এক ধরণের নির্জনতা আছে। সে গভীর মনোযোগে একটি মোটা রেফারেন্স বইয়ের পাতায় ডুবে আছে। বাতাসের ঝাপটায় তার কয়েক গোছা চুল অবাধ্য হয়ে কপালে এসে পড়ছে, কিন্তু তার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তার এই একাগ্রতা দেখে মনে হয়, যেন সে বইয়ের কালো অক্ষরগুলোর মাঝে নিজের কোনো হারিয়ে যাওয়া জগত খুঁজে ফিরছে। তার পাশে সোহা আধশোয়া হয়ে আতিকার কাঁধে মাথা রেখে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে আছে, নিরবচ্ছিন্নভাবে রিলস দেখে সময় কাটাচ্ছে।
ঠিক তখন এক দীর্ঘ ছায়া আতিকার বইয়ের পাতার ওপর এসে পড়ল। রোদ আড়াল হতেই আতিকা চোখ তুলে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং ইখতিয়ার শিহাব। তার এক হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি, আর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিদ্রূপাত্মক কিন্তু রহস্যময় হাসি।
শিহাব কফি কাপে আলতো চুমুক দিয়ে বলল, “তুমি সবসময় এভাবে বইয়ের সাথে মারামারি করো? নাকি বইগুলো তোমাকে হেরে যাওয়ার ভয় দেখায়?”
আতিকা বইটা সপাটে বন্ধ না করে কেবল মুখ ভার করে তাকাল। তার কণ্ঠে বিরক্তির রেশ, “আপনার কাছে মনে হচ্ছে আমি বইয়ের সাথে মারামারি করছি? আপনার চোখে বোধহয় পৃথিবীর সবকিছুই খেলাধুলা মনে হয়, তাই না?”
শিহাব মৃদু হাসল। এই মেয়েটার গাম্ভীর্যই তার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সে কফির কাপটা আতিকার দিকে একটু বাড়িয়ে দিয়ে নাটুকে গলায় বলল, “শান্তির জন্য যুদ্ধ করতে হলেও শক্তি লাগে, মিস যুদ্ধবিদ। এই নাও, এক কাপ কফি। তোমার মগজটা একটু রিফ্রেশ করা দরকার।”
আতিকা সোজাসুজি প্রত্যাখ্যান করল, “ধন্যবাদ, তবে আমি বাইরের সাহায্যে যুদ্ধ করি না। আমি নিজের লড়াই একা লড়তেই পছন্দ করি।”
শিহাব ভ্রু কুঁচকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ওহ, এতো গর্ব! আমি তো ভেবেছিলাম সৌজন্যবশত অন্তত একটা ‘ধন্যবাদ’ দেবে। ঠিক আছে, কফিটা ফিরিয়ে দিচ্ছ তো? আমি কিন্তু চলে যাচ্ছি…”
“ধন্যবাদ!” আতিকা চটজলদি উত্তর দিল, “আমাকে বিরক্ত না করে চলে যাওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
শিহাব থমকে দাঁড়াল। বুকে হাত দিয়ে কপট ব্যথার অভিনয় করে বলল, “আহা! অপমানের এই তীব্রতা! সত্যি বলছি আতিকা, ভার্সিটির ইতিহাসে তুমিই প্রথম মেয়ে যে আমার কফি রিফিউজ করলে আর একই দিনে একজন সিনিয়রকে দু-দুবার অপমান করলে। তুমি তো একটা রেকর্ড গড়ে ফেললে!”
আতিকা এবার সামান্য হাসল। সেই হাসিতে কোনো তাচ্ছিল্য ছিল না, ছিল এক ধরণের নির্ভারতা। সে বইটা বন্ধ করে বলল, “আপনার বুঝি রেকর্ড তৈরি করার খুব শখ?”
“তুমি তো নিজের অজান্তেই রেকর্ড গড়ে ফেলেছ, ‘মিস থাপ্পড়-কুইন’!” শিহাবের মুখে এই সম্বোধন শুনে
আতিকা চোখ সরু করে তাকাল।
শিহাব এমন ভান করল যেন সে খুব ভয় পেয়েছে। “আচ্ছা বাবা, শান্তি চাই! এবার আমি যাচ্ছি।”
সে সিঁড়ির এক কোণে কফির কাপটা সাবধানে রেখে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক পা গিয়েই আবার পেছন ফিরে চাইল। “সাবধানে থেকো আতিক্কা পিঠা! লাইব্রেরির ভূতেরা নাকি সিরিয়াস পড়ুয়াদের চুল টেনে ধরে!”
আতিকা এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “আবার ওই নামে ডাকলেন কেন শিহাব ভাই? আমার একটা সুন্দর নাম আছে— আয়রাতুল সিদ্দিক আতিকা। মনে রাখবেন।”
শিহাবের কপালে এবার যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠল। সে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “এই যে, এই ‘ভাই ভাই’ ডাকটা বন্ধ করো তো! আমার এইচএসসির রেজিস্ট্রেশন কার্ডে কি নামের পাশে ‘ভাই’ লেখা ছিল? আমাকে দয়া করে আর এই নামে ডাকবে না।”
পাশে বসে থাকা সোহা এতক্ষণ এই নাটকীয়তা উপভোগ করছিল। সে হাসতে হাসতে বলল, “আহা! ভাইয়ের দেখি বেশ রাগ হয়েছে!”
শিহাব সোহার দিকে একবার তাকিয়ে আবার আতিকার দিকে ফিরল। “তুমি সেকেন্ড ইয়ারে, আমি ফোর্থ ইয়ারে—তাতে কী? সিনিয়র হিসেবে নাম ধরে ডাকো, তাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু ‘ভাই’ ডাকটা তোমার মুখে একদম মানাচ্ছে না।”
আতিকা একটু থতমত খেয়ে গেল। নিজের আভিজাত্য বজায় রেখে ধীর স্বরে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু শিহাব… ভাই না বললে আপনি বুঝবেন কী করে যে আমি আপনাকে সম্মান করি?”
শিহাব হাঁটতে শুরু করার আগে শেষবারের মতো বলল, “যখন শুধু নাম ধরে ডাকবে, তখনই বুঝবো তুমি আমার প্রতি তোমার সেই অহেতুক ভয়টা একটু একটু করে কমাচ্ছো।”
শিহাব চলে যাওয়ার পর সোহা যেন দমকা হাওয়ার মতো আতিকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। “তুই আর শিহাব ভাই! উফ আতিকা, জাস্ট ভাবা যায় না! লোকটা লিটারেলি তোকে লাইক করে। তুই কি ওনার চোখ দেখিসনি? কী এক তৃপ্তি ছিল ওনার চোখে!”
আতিকার ভেতরটা হঠাৎ কেন জানি বিষিয়ে উঠল। সে রুক্ষ স্বরে বলল, “সোহা, আরেকবার এই ধরনের ফাজলামি করবি না আমার সাথে। তুই সব জানিস, তার পরেও কেন এমন করছিস? মাইন্ড ইট।”
আতিকার আকস্মিক রোষ দেখে সোহার হাসি থেমে গেল। সে বুঝতে পারল, সে সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। সোহা অপরাধী মুখে বলল, “সরি রে আতি। একটু বেশি বকে ফেলেছি। কিন্তু অনেকদিন তো হয়ে গেল, ওসব ভেবে আর লাভ কী? ভুলে যা সেই অদেখা মানুষটাকে।”
আতিকা সিঁড়িতে বসে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুক চিড়ে বেরিয়ে এল। “ভাবতে তো চাই না রে সোহা, কিন্তু মন থেকে তো মুছতে পারছি না।”
সোহার কণ্ঠ এবার কোমল হলো। “কেমন করে ভুলবি? ভোলার জন্য তো জীবনে অন্য কাউকে জায়গা দিতে হয়। তুই কি এখনো সেই আদিয়ান ভাইয়ের কথা ভাবিস? কাল রাতেও কি তার সাথেই কথা হচ্ছিল?”
আতিকা মাথা নিচু করে বলল, “হ্যাঁ। সে শুধু জানতে চেয়েছিল আমি কেমন আছি। খুব সাধারণ কিছু কথা।”
সোহা এবার একটু ঝাঁঝালো গলায় বলল, “আতি, তুই আর কতদিন নিজের স্বপ্ন আর নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিবি? ওই লোকটা তো জানেই না যে তুই তাকে কতটা ভালোবাসিস। আর ওনার পরিবার, তোর মেজ আম্মু-আব্বু—ওরা তো তোকে সহ্যই করতে পারে না। তুই কেন এখনো একটা মৃত অতীতকে আঁকড়ে ধরে আছিস?”
আতিকার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। সে ধরা গলায় বলল, “আমি জানি সে আমার কিছু না। সে জানেও না আমার অনুভূতির কথা। কিন্তু আমার ভেতরটা জুড়ে যে ওই ছায়াটাই রাজত্ব করে, সোহা। আমি কীভাবে সেই অস্তিত্বকে মুছে ফেলব?”
সোহা আতিকার হাতটা জড়িয়ে ধরল। “ভালোবাসা মানে তো শুধু কষ্ট পাওয়া নয় রে। তুই যদি কাউকে ডিজার্ভ করিস, তবে সে একদিন ঠিক আসবে। হয়তো সে তোর আদিয়ান ভাই না, হয়তো সে অন্য কেউ—যে তোকে তোর সবটুকু দিয়ে আগলে রাখবে।”
আতিকা কোনো উত্তর দিল না। লাইব্রেরির শান্ত ছায়ায় সে কেবল মাথা নিচু করে রইল। দূরে শিহাবের ফেলে যাওয়া কফি কাপটা থেকে তখনো হালকা ধোঁয়া উড়ছে—ঠিক আতিকার মনের অবদমিত ইচ্ছের মতো, যা দৃশ্যমান হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
______________________________________
লেকচার শেষের ঘণ্টা পড়তেই করিডোর দিয়ে একঝাঁক শিক্ষার্থী বেরিয়ে এল। আতিকা বইয়ের গাদাগুলো ব্যাগে ভরে ধীর পায়ে হাঁটছিল। দিনভর ক্লাস আর টিউশনির ক্লান্তি তার কাঁধে ভর করেছে, মনটা একটু আনমনা। ঠিক তখনই পেছন থেকে কাঁধের ওপর বইয়ের এক হালকা চড়াচড়ি অনুভব করল সে।
চমকে ফিরে তাকাতেই দেখল শিহাব। মুখে সেই পরিচিত কৌতুকী হাসি। শিহাব বলে উঠল, “এই যে আতিক্কা পিঠা, কই যাচ্ছো তুমি বৃষ্টিভেজা নায়িকার মতো অত ভাব করে?”
আতিকা নিজেকে সামলে নিয়ে খুব শান্তভাবে উত্তর দিল, “শিহাব ভাই, বাড়ির পথ না ধরে এখানে করিডোরে কী করছেন?”
‘ভাই’ শব্দটা কানে যেতেই শিহাবের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। “কী বললে? আবার বলো তো?”
আতিকা পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “বললাম তো—আপনাকে ডাকলাম, শিহাব ভাই বলে। কোনো সমস্যা হয়েছে?”
শিহাব চোখেমুখে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে তুলল। “হ্যাঁ, গুরুতর সমস্যা। এই ‘ভাই’ শব্দটা একটু কম ব্যবহার করো প্লিজ। আমি ওই ‘ভাই’ টাইপ লেভেলের মানুষ না, বুঝেছ?”
আতিকা এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। যুক্তি দিতে সে কারো চেয়ে কম নয়। “কেন করবেন না? আপনি আমার চেয়ে দুই ব্যাচের সিনিয়র, প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলে, আর এই ভার্সিটির সো-কল্ড ক্রাশ। আপনাকে ভাই না ডেকে কী ডাকব বলুন তো?”
“আরে আমিও তো মানুষ!” শিহাব হাত নেড়ে প্রতিবাদ জানাল। “সবাই যদি এমন ভাই-ভাই করো, তবে একসময় তো মনে হবে সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছি।”
আতিকা এবার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তুলল। “ওটা তো আপনার সমস্যা শিহাব ভাই। আমি তো কেবল সম্মান দেখালাম। তবে আপনি যদি খুব বেশি বিরক্ত হন, তবে সম্মানের খাতিরে আপনাকে ‘শিহাব আঙ্কেল’ বলতেও আমার কোনো আপত্তি নেই!”
বলেই আতিকা আর উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে শিহাব নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল, “এই মেয়ে না… একদম ঠিক জায়গায় ছুরি চালায়! আঙ্কেল!”
***ভার্সিটির বাইরে বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে ছায়া ঘেরা জায়গায় শিহাবের বাইকটা দাঁড়িয়ে আছে। বাইকের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে শিহাব। সামনে তার দুই দীর্ঘদিনের বন্ধু—রিশাদ আর সাকিফ। শিহাবের চোখে সানগ্লাস থাকলেও তার ভেতরের অস্থিরতা বন্ধুদের চোখ এড়াল না।
রিশাদ কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বলল, “তোর ছায়া আজ কই ছিল রে শিহাব? সকাল থেকে তোকে ক্লাসেও দেখলাম না। ব্যাপারটা কী?”
শিহাব সানগ্লাসটা কপালে তুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আতিকা নামের এক মিষ্টি বুদ্ধিমতী পিঠা—আমার আত্মসম্মান আজ ভাপে দিয়ে দিয়েছে রে ভাই! সেই মনোকষ্টে অডিটোরিয়ামে বসে ধ্যান করছিলাম।”
সাকিফ হো হো করে হেসে উঠল। “ওই পিঠা আবার কী? তুই কি নতুন কারো প্রেমে পড়লি নাকি?”
শিহাব বিরক্ত হয়ে বলল, “পছন্দ করা তো দূরের কথা, মেয়েটা এখন আমাকে ‘ভাই’ ডাকা শুরু করেছে! বললাম ভাই ডাকটা একটু কম বলো—সেই উত্তর দিল, ‘আপনাকে আঙ্কেল বলব নাকি?’ ভাবা যায়?”
রিশাদ হাসির চোটে প্রায় গড়িয়ে পড়ল সাকিফের ওপর। “আহারে বেচারা! সারা ভার্সিটির মেয়েরা যার জন্য পাগল, সে কিনা আজ ক্রাশের মুখে ‘ভাই’ ডাক শুনে হজম করতে পারছে না! তা আমাদের হবু ভাবীর পুরো নামটা কী?”
“আতিকা। দ্বিতীয় বর্ষের।” শিহাবের কণ্ঠে এবার একটু গাম্ভীর্য এল। “কিন্তু ওর কথা বলার ধাঁচ এমন যেন বয়সের তুলনায় অনেকটা বেশি ম্যাচিউর। একটা কথা বলি তোদের… মেয়েটার ভেতরে অন্যরকম কিছু আছে। মাথা ঠান্ডা, কথায় ধার, আর চোখে এক অদ্ভুত তেজ। যখন চোখে চোখ পড়ে… মনে হয় খেলাটা এবার সত্যিই জমবে।”
সাকিফ কৌতুকী চোখে তাকাল। “হুম, নতুন ক্রাশ? তুই তো এতদিন কাউকেই পাত্তা দিসনি। এই একদিনে কী এমন জাদু করল মেয়েটা যে তুই তাকে চোখে হারাচ্ছিস?”
শিহাব সামনে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে কিছুটা আনমনা হয়ে গেল। “এই ক্যাম্পাসে চার বছর ধরে আছি। তোরা তো আমাকে ছোটবেলা থেকে চিনিস। কোনোদিন দেখেছিস কোনো মেয়ে নিয়ে এমনভাবে মন্তব্য করতে? কতজনকে দেখলাম, কত সুন্দর হাসি দেখলাম, কিন্তু কারো চোখের দিকে তাকালে হৃদপিণ্ডটা এমনভাবে থমকে যায়নি। আতিকা কেমন জানিস? সে নিজের সম্মান নিয়ে অসম্ভব সচেতন, অথচ আচরণে দারুণ ভদ্র। না বেশি রাগী, না বেশি নরম। আর তার ওই ‘ভাই’ ডাকার মাঝেও আমি এক অদ্ভুত মাধুর্য খুঁজে পাই রে!”
রিশাদ সাকিফের কাঁধে হাত রেখে টিপ্পনী কাটল, “যাক ভাই, বাঁচালি! এবার থেকে অন্তত আমাদের তোর হয়ে কোনো মেয়েকে রিজেক্ট করতে হবে না। এমনিতেও তোর ছায়ায় ঢাকা পড়ে কোনো মেয়ে আমাদের দিকে তাকাত না। বন্ধু আমার ‘মিঙ্গেল’ হয়ে গেলে আমরাও হয়তো একটু পাত্তা পাবো!”
সাকিফ মাথা নাড়ল। “তোর তো ওই এক চিন্তা রিশাদ। আমাকে এসবের মধ্যে টানিস না। কোনোমতে ফাইনাল ইয়ারটা পার করতে পারলেই আমি বাঁচি।”
শিহাব ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল, “তোরা আছিস তোদের তালে! এদিকে আমার বিপদটা কেউ দেখছিস না। আতিক্কা পিঠা যে লেভেলের স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড কথা বলে, ওরে সামলানো চাট্টিখানি কথা না। তার ওপর ওই ‘ভাই’ ট্যাগটা কপালে সেঁটে দিয়েছে!”
সাকিফ হেসে উঠে শিহাবের বাইকে একটা চাপড় দিল। “তোর ঝামেলা তো শুরু হয়েই গেছে দোস্ত। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কখন এই ‘শিহাব ভাই’ নামটা বদলে গিয়ে শুধু ‘শিহাব’ হয়!”
গাছের তলায় বন্ধুদের হাসির রোল উঠল, কিন্তু শিহাবের মনে তখন কেবল আতিকার সেই মুচকি হাসি আর জেদি চোখের ভাষাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে জানে, এই পথটা যতটা বন্ধুর, ঠিক ততটাই রোমাঞ্চকর হতে চলেছে।
চলবে ইনশাআল্লাহ.. .