– তুই কবুল বলবি নাকি তোর মায়ের গলায় ছু’রি চা’লাবো?
এই কথায় আঁতকে উঠে মাথা তুলে তাকালো কান্নারত রমণী স্নিগ্ধা। সে মাথা তুলেই দেখলো সামনে মায়ের গলায় ছু’রি ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। এই দৃশ্য দেখে সে চিৎকার করে বলে উঠলো,
– না…না! আমার মাকে ছেড়ে দিন আমি….আমি কবুল বলছি!
কবুল কবুল কবুল। এবার আমার মাকে ছেড়ে দিন।
স্নিগ্ধার সামনে বরবেশে বসে থাকা লোকটা বাঁকা হেসে ছু’রি ধরা লোকটিকে ইশারা করলে সে স্নিগ্ধার মাকে ছেড়ে দেয়। তারপর লোকটি বলে উঠে,
– কাজী সাহেব এবার দ্রুত বাকি কাজ শেষ করেন। বউ নিয়ে বাড়ি যাব আমি। কি কি সাইন বাকি তাড়াতাড়ি করেন।
স্নিগ্ধা একবার লোকটার দিকে তাকায় আবার কাজির দিকে তাকালো। লোকটার সাথে যেতে হবে ওর? জীবনটা এমন কেন! টাকা ক্ষমতা নেই বলে? কাজী সাহেব তাকে বললো সাইন করতে। সে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখল রেজিস্ট্রি পেপার। সে তার বাবা মায়ের দিকে তাকালো। তাদের চোখেও পানি। স্নিগ্ধা ডুকরে কেঁদে ওঠে। লোকটা বিরক্ত হয়ে বলে,
– এতো কান্নাকাটি আর সহ্য করা যাচ্ছে না দ্রুত সাইনটা করো। আমার মাথা খারাপ করে নিজের পরিবারের উপর বিপদ বাড়িও না।
স্নিগ্ধা কাঁপা কাঁপা হাতে সাইন করে দিলো। সে জানে এখন কিছু বলে আর লাভ নেই। তারপর লোকটা ও দ্রুত সাইন করে উঠে দাঁড়াল। পাশ থেকে তার বাবা বললো,
– তুমি এই মেয়েটাকে নিয়ে যাও ফাহাদ, আমরা পেছনের গাড়িতে আসছি
স্নিগ্ধা লাফিয়ে উঠলো,
– আ..আমি যাবো না আপনাদের সাথে। বিয়ে করতে চেয়েছেন করেছি। আমার সময় চাই!
– কোনো সময়-টময় লাগবে না চুপচাপ আমার সাথে যাবা তুমি নাহলে…
বলেই বাঁকা হাসলো ফাহাদ। স্নিগ্ধা ভয় পেয়ে একবার বাবা মায়ের দিকে তাকালো তারপর মাথা নিচু করে নিলো। ফাহাদ পৈশাচিক হেসে বললো,
– গুড গার্ল। কথা শুনলে বিপদ কম হয়, সেটা তো বুঝতেই পারছো।
তারপর স্নিগ্ধার বাবার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
– আপনাদের মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি। চিন্তা করবেন না খাওয়া-পড়ার অভাব হবে না। তবে হ্যাঁ, খবরদার! আমার পারমিশন ছাড়া ওর সাথে দেখা করার চেষ্টা করবেন না। আর নিয়ে আসার কথা চিন্তা করা তো দূরের ব্যাপার।
বলেই স্নিগ্ধার হাত টেনে গাড়ির কাছে চলে গেল। স্নিগ্ধা মা বাবার দিকে তাকালেও তাদের কাছে যেতে পারলো না কারণ ফাহাদ শক্ত করে তার কব্জি ধরে রেখেছে। টেনে এনে স্নিগ্ধাকে গাড়ির পেছনের সিটে এক প্রকার ছুড়ে ফেলে দিল ফাহাদ। এরপর নিজে পাশে বসে ধড়াম করে দরজাটা আটকে দিল। গাড়ি স্টার্ট নিতেই স্নিগ্ধা জানালার কাঁচের ওপাশে তাকাল… চিৎকার করে বলতে চাইল ‘আমাকে বাঁচাও বাবা, আমি এই নরকে যাব না!’ কিন্তু পারলো না!
স্নিগ্ধা পেছনে তাকাতেই ফাহাদ স্নিগ্ধার চুল মুঠো করে ধরে নিজের দিকে টানল। স্নিগ্ধা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে আর্তনাদ করে উঠল,
– আহ্!
– পেছনের দিকে অত কীসের তাকানো, হ্যাঁ? আজ থেকে তোর চেনা জগত শেষ স্নিগ্ধা। এখন থেকে তুই শুধু আমার দিকে তাকাবি। এই মাঝরাস্তায় নাটক করলে গাড়ি ঘুরিয়ে তোর ভাই আর বাপের ওপর গাড়ি তুলে দিতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না, মনে থাকে যেন!
স্নিগ্ধার দিকে টিস্যু বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
– এই চোখে আর কখনো অন্য কারও জন্য জল দেখলে আমি সহ্য করব না। তুই এখন ফাহাদ জামানের সম্পত্তি। কাঁদবিও আমার ইশারায়, হাসবিও আমার ইশারায়।
স্নিগ্ধা আর কিছু বলার ভাষা পেল না। যে তাকে “সম্পত্তি” বলে আখ্যায়িত করে তাকে আর কি বলবে? পুরো রাস্তায় স্নিগ্ধা গাড়িতে রোবটের মতো বসে ছিলো যেন তার ভেতরকার সকল অনুভূতি ম’রে গিয়েছে।
আধ ঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামলো বিশাল এক প্রাসাদের মতো বাড়ির সামনে। কিন্তু স্নিগ্ধার কাছে এটা প্রাসাদ নয় একটা খাঁচা বলেই মনে হচ্ছে। ফাহাদ হাত টেনে নিতে নিতে গম্ভীর স্বরে বললো,
– ভেতরে চলো। মা আর দাদি অপেক্ষা করছেন। ওখানে যেন কোনো নাটক না দেখি।
স্নিগ্ধা নিজের কান্না গিলে নিল। তার সাথে সামনে কি কি হতে পারে তা ধারণা করার চেষ্টা করছে মনে মনে। কিন্তু সে জানতো না এই বাড়িতে কাটানো প্রতিটি দিন তার জন্য বি’ষাক্ত হয়ে উঠবে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই স্নিগ্ধা বুঝতে পারল ফাহাদের দাপট কতখানি। অবশ্য দাপট থাকবে নাই বা কেন বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া একমাত্র সন্তান বলে কথা!
ভেতরে ঢুকেই ফাহাদ তার মা আর দাদির উদ্দেশ্যে বললো,
– বলেছিলাম না? এই মেয়েকেই বিয়ে করবো? করে আনলাম।
– তুই চেয়েছিস আর পাস নি এমন কিছু আছে নাকি দাদুভাই? এখন তোর খেলনা সামলানোর দায়িত্ব তোর।
ফাহাদের দাদির মুখে ‘ খেলনা ‘ শব্দটা শুনে স্নিগ্ধার বুক ফেটে কান্না আসছিল। সে খেলনা! তাকে কি তবে একটা খেলনার মতো টেনে আনা হয়েছে এই বিলাসিতার নর’কে?
ফাহাদের দাদি এবার স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললো,
– তোমার বাপ মা আর তুমি আমার দাদু ভাইয়ের কথা প্রথমে শুনলেই এতো কিছু হত না বুঝলে? আমার দাদুভাই চেয়েছে কিন্তু পাবে না সেটা তো হবে না কিন্তু তোমরা সেটা বুঝতে দেরি করে ফেলেছো।
বেশ কিছুক্ষণ রোবটের মতো অনেক কথা শুনে তাকে রেখে যাওয়া হলো একটা রুমে। বেশ ভালোই বিলাসী রুমটা কিন্তু স্নিগ্ধার সেসব দেখার মন নেই তার। সে ভাবছে কি থেকে কি হলো তার সাথে! তার মনে পড়ছে আট মাস আগের কথা…
তখন সদ্য কলেজে পা দিয়েছে ❝সেহরিশ জাহান স্নিগ্ধা❞ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা মা আর দু’ভাইকে নিয়ে তাদের পরিবার। আট মাস আগে সুখের পরিবারে কালো ছায়া হয়ে এসেছে ❝ফাহাদ জামান❞
জামান পরিবারের বড় ছেলে। তার বাবা এলাকার বড় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। টাকা এবং ক্ষমতার অভাব নেই তাদের আর সেই টাকাওয়ালা বাপের একমাত্র এবং বিগড়ে যাওয়া সন্তান হলো ফাহাদ। রাস্তায় গু’ন্ডাগি’রি করা মেয়েদের ইভটি’জিং করায় ওর কাজ। বাবার ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে কেউ কিছু বলতে পারে না। আর তার করা সব অপ’রাধ টাকার নিচে চাপা দিয়ে দেন তার বাবা ❝চৌধুরী আকবর জামান❞ আর তেমনই একদিন ফাহাদের চোখে পরে স্নিগ্ধা। সেদিন থেকে সে স্নিগ্ধার সাথে কথা বলার জন্য উঠে পরে লেগেছে। স্নিগ্ধা ওকে এড়িয়ে চললে একদিন সে স্নিগ্ধার গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে আর স্নিগ্ধা নিজেকে রক্ষা করতে তাকে থা’প্পড় দেয়। এতে ফাহাদের জেদ বেড়ে যায়।ধীরে ধীরে ফাহাদ প্ল্যান সাজায় এবং স্নিগ্ধাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় কিন্তু এমন ব’খাটে ইভটি’জার ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিবেন না বলে নাকচ করে দেন স্নিগ্ধার বাবা। এক প্রকার পাগল হয়ে ফাহাদ স্নিগ্ধাকে পাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। বারবার স্নিগ্ধাকে জোর করেও লোভ দেখিয়েও স্নিগ্ধাকে টলাতে পারে নি! স্নিগ্ধার রিজেকশনও ওর মনে জেদ সৃষ্টি করেছে যার কারণে শেষ পর্যন্ত বাবার ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্নিগ্ধাকে জোর করে বিয়ে করে। স্নিগ্ধার মায়ের গলায় ছু’রি ধরে বাবা ভাইদের বেঁধে রেখে তারা স্নিগ্ধাকে কবুল বলায়। এছাড়া ফাহাদকে বিয়ে না করলে স্নিগ্ধার নামে বিভিন্ন কথা এবং কল’ঙ্গ রটিয়ে দেবার হুমকি পর্যন্ত দেয়। আর স্নিগ্ধা পথ না পেয়ে বিয়েটা করে নেয়। টাকা এবং ক্ষমতার কাছে হেরে যেতে হয় তাদের। তারপরই এই ঘটনা!
অতীতের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিগুলো হাতড়াতে হাতড়াতে কখন যে গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়েছে স্নিগ্ধা তা টেরও পায়নি। দরজার খিল দেওয়ার শব্দে তার ঘোর কাটে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফাহাদ। তার পরনের শেরওয়ানিটা এখন অবিন্যস্ত আর চোখেমুখে এক ধরণের পৈশাচিক তৃপ্তি। স্নিগ্ধা চোখ সরিয়ে নিলো। ফাহাদ এগিয়ে এসে গমগমে সুরে বলল,
– কিরে কার কথা ভাবছিলি? শুনছিলাম তোর কেউ ছিলো না তাহলে বিয়ে করতে এত আপত্তি করছিলি কেন? প্রথমদিন রাজি হতি আমার আর এত কষ্ট করা লাগতো না আর না তোদের কষ্ট হতো!
– কি চাই আপনার? কেন আমার জীবন নিয়ে খেলা শুরু করেছেন? আপনাকে তো আমি চিনিও না আর না কখনও দেখেছি তাহলে কীসের জন্য আমার সাথে আমার পরিবারের সাথে এমন করছেন?
– তুই আমার কাছে জেদ যেটা তুই নিজেই তৈরি করছিস। ফাহাদ জামান যা চাই তা নিয়েই ছাড়ে সেটা ভালোবেসে হোক কিংবা গলা টি’পে ধরে!
– ছিহ! এতো নিচ আপনাদের মতো বড়লোকেরা!
ফাহাদ আরো এগিয়ে এসে স্নিগ্ধার থুতনি চেপে ধরে খারাপ একটা গা’লি দিয়ে দাঁত পিষে বললো,
– অ্যাই! কীসের ছি? দেখ তুই আমার ঘরে আছিস! সেদিন এই হাত দিয়ে আমারে মা-রছিলি না? দেখ আজ তোর সাথে যা ইচ্ছে করার দলিল আছে!
স্নিগ্ধার ব্যথায় চোখের জল উপচে পড়ছে সে অনেক কষ্টে উচ্চারণ করে,
– ম…মানি না এই দলিল! ক্ষমতার অপব্যবহার করে করেছেন এই বিয়ে! আপনার মতো এমন নি’কৃষ্ঠ নি’ষ্ঠুর মানুষকে আমি মানি না।
– তোর মানা না মানায় আমার কিচ্ছু যায় আসে না। এই চার দেওয়ালে বন্দি থাকবি তুই। যদি কখনও পালানোর চেষ্টা করেছিস তাহলে নিশ্চয়ই জানিস তো তো কি হবে?
তারপর স্নিগ্ধাকে ছেড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো ফাহাদ। স্নিগ্ধা বিছানায় বসে ফুপাতে থাকে। ফাহাদ একটু পর বেরিয়ে স্নিগ্ধাকে দেখে বললো,
– যাও ফ্রেশ হয়ে এসে ঘুমাও। আমার মেজাজ গরম করবে না নাহলে যা হবে তাতে তোমারই ক্ষতি হবে। আমার কিচ্ছু হবে না! এক কথা বারবার বলতে পারব না আমি।
স্নিগ্ধা চুপচাপ উঠে চলে গেল। কিছু না বলায় স্রেয় মনে করলো সে। একটু পর ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়লো। সে জানে ফাহাদের মধ্যে তার জন্য কোনো ভালোবাসা নেই যা আছে সবটা হলো নারী আস’ক্তি আর নে’শা। সে অনেক নারীর সাথে সময় কাটিয়েছে! তার মতো বিগড়ে যাওয়া পুরুষের কাছে এটা স্বাভাবিক বিষয়। স্নিগ্ধার রিজেকশন তার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু স্নিগ্ধা এখন কি করবে? এই পরিবেশে কিভাবে বাঁচবে সে? এইটুকু ভাবতেই তো দমবন্ধ লাগছে! বাকি জীবন কিভাবে কাটাবে তাহলে? তার পরিবারের তো এমন কোনো ক্ষমতা নেই যে তাকে এই ন’রক থেকে বের করবে! তার জীবনটা এবার কোনদিকে মোড় নিবে? এসব ভাবতে ভাবতেই স্নিগ্ধার চোখ আবার ভিজে উঠলো।
চলবে…
লেখিকা:তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
[বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে]