লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
গল্প: কাছে আসা বারণ
পর্ব — ৯
— ‘ এইই পিচ্চিইই…. ‘
কথাটা শোনামাত্র রিমঝিম পিছু ফিরল। আর ফিরতেই ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে শুরু করল। গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে থামল ওকে পিচ্চি সম্বোধন করা কিশোরের কাছাকাছি। ছোট হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল, — ‘ তুমি? তুমি কোথায় ছিলে? ‘ ছেলেটা আজও টিস্যু এগিয়ে দিল রিমঝিমকে। আর ঠিক সেদিনের মতই টিস্যু চেপে চোখ মুছে তারপর নাক মুছল রিমঝিম। মুছে টিস্যু আবার ফেরত দিল ছেলেটাকে। কান্নার দমকে সে তখনও ফোঁপাচ্ছে, — ‘ না-ও ধরো। ‘
বলেই চলে যাবার জন্য পা বাঁড়াল সে। তার কাঁধ ছেড়ে অনেকটা নিচে নেমে আসা চুলে ঢিলেঢালা পনিটেইল বাঁধা। চুলটা যে ভীষণ অযত্নে বাঁধা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নীল-সাদা ইউনিফর্ম, পায়ে কেডস আর গোলাপি স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে সে হেঁটে হেঁটে একাই ফিরছিল স্কুল থেকে। বাকি বাচ্চাদের বাবা না-হয় মা সঙ্গে থাকলেও আট বছরের রিমঝিমের পাশে কেউ ছিল না। সেই ছেলেটাও হাঁটা শুরু করল রিমঝিমের পাশাপাশি। রাস্তা পার হবার সময় ছোট্ট হাতটা মুঠোয় পুরে নিয়ে বলল, — ‘ তুমি কাঁদছিলে কেন পিচ্চি?’
ভাসা ভাসা চোখ জোড়ায় এক রাশ অভিযোগ এনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, — ‘ মিরাজ আমাকে মেরেছে। চুল টেনে দিছে। আমার পেন্সিল নিয়ে নিছে। আমার বই ছিঁড়ে দিছে। আর.. আর জানো বলেছে আমি পঁচা মেয়ে। তুমি মিরাজকে একটু বকে দিবা? ‘ অভিযোগের বাহার দেখে হেসে ফেলল ছেলেটা। বলল,
— ‘ আচ্ছা বকে দিব। ‘
— ‘ কখন বকা দিবা? ‘
— ‘একটু পর। ‘
— ‘ আচ্ছা। ‘
— ‘ প্রতিদিন তোমাকে রাস্তা পার করে দেয় কে পিচ্চি? ‘
— ‘ কেউ না। আম্মু যখন ছিল তখন আম্মুর সঙ্গে আসতাম। জানো আমার আম্মুর বিয়ে হয়ে গেছে। আর আসবেনা আমাকে নিতে। সবাই তাই বলে। আমাকে নিয়ে গেলে কি হয় বলো? আমি আম্মুকে ছাড়া ঘুমাতে পারিনা। ‘ বলতে বলতে ফের ঠোঁট ফোলালো বাচ্চাটা৷
— ‘ আইসক্রিম খাবে পিচ্চি? ‘
সেই ছেলেটার হুট করে আইসক্রিমের কথা শুনে লাফিয়ে উঠল আট বছরের রিমঝিম। চকচকে চোখে তাকাল রাস্তার পাশে মুদি দোকানের আইসক্রিম ফ্রিজারের দিকে।
রিমঝিমকে লাফাতে দেখে হাসল সেই ছেলেটা। হাতটা ফের শক্ত করে ধরে বলল, — ‘ চলো আইসক্রিম খেয়ে আসি। ‘
দোকান থেকে দুইহাতে দু’টো আইসক্রিম হাতে নিয়ে খেতে থাকে রিমঝিম। এখন অবশ্য ওর পিঠের স্কুল ব্যাগটা ঠায় পেয়েছে ওর পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার কাঁধে। তার হাতেও আইসক্রিম। তবে সে রিমঝিমের খাওয়া দেখতেই বেশি ব্যস্ত। হাতে রাখা টিস্যু দিয়ে আইসক্রিম লেগে থাকা খাঁজকাটা থুতনি মুছে দিয়ে বিনাকারণে হেসে ফেলল সে। আদুরে শাসন করে বলল, — ‘ আস্তে খাও পিচ্চি। ‘
অমনি আইসক্রিম খাওয়া হাত থেমে গেল রিমঝিমের। সন্দেহ নিয়ে তাকাল ছেলেটার দিকে। বলল, — ‘ তুমি আইসক্রিম দিয়ে কি কিডন্যাপ করবা আমাকে? ‘
ফের হাসল ছেলেটা। তার ঝাকড়াচুল বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেলে চুলের গোড়ায় ব্যস্তভাবে হাত চালিয়ে বলল, — ‘ তুমি বড় হলে কিডন্যাপ করব। এই ধরো আর দশ বছর পর। ওকে? ‘
— ‘ কিডন্যাপ করে কি আমার হাত-পা-চোখ বিক্রি করে দিবা?’ কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইল বাচ্চাটা।
— ‘ না। ‘
— ‘ কিন্তু বাবা যে বলে কিডন্যাপ করলে হাত-পা কেটে দেয়। তুমি কাটবা না কেন? ‘
— ‘ পিচ্চিদের আদর করতে হয় কিডন্যাপ করে। হাত-পা কাটতে হয়না। ‘
— ‘ ওহ আচ্ছা।’ বলেই বিজ্ঞের মত মাথা নাড়াল রিমঝিম। ফের ব্যস্ত হলো আইসক্রিমে। আর ততক্ষণ রিমঝিমের গোলাপি ব্যাগ যার উপর সিন্ডারেলার ছবি আঁকা সেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল ছেলেটা। সে-ই বাড়িতে পৌছে দিল রিমঝিমকে। গেটের কাছে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসল রিমঝিমের উচ্চতায়। তবুও সে রিমঝিমকে ছাড়িয়ে গিয়েছে অনেকটা। আর কিছু বছর পর সন্দেহাতীত ভাবে সে একজন ঝাকড়াচুলের সু-উচ্চ সুপুরুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে। আদুরেস্বরে বলল,
— ‘ আমি কাল ঢাকা চলে যাচ্ছি পিচ্চি। ওখানকার স্কুলে ভর্তি হব। ততদিন তুমি নিজেকে সেইফ রাখবে। বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে যাবেনা। রাতে বাইরে বের হবেনা। কেউ কিছু দিলে খাবেনা। কেউ একা কোথাও ডাকবে যাবেনা। সব কিডন্যাপার আমার মত ভালো নয়। হাত-পা কেটে দিবে যদি তুমি ওদের সঙ্গে যাও। ওকে? আমার কথা মনে রেখো। আমি ছুটিতে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব। ‘
— ‘ আমাকে কিডন্যাপ করলে কি তোমার খারাপ লাগবে? ‘ সরল কন্ঠে আওড়ালো বাচ্চা মেয়েটা। সে ভীষণই উৎসুক।
— ‘ আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। ‘
বলেই ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটা রিমঝিমের হাতে দিয়ে ওদের বাড়ির সামনে রাখা গাড়ি থেকে একটা বড় ব্যাগ বের করে আনল। সেটাও একটা স্কুল ব্যাগ। ব্যাগটা রিমঝিমকে এগিয়ে দিয়ে বলল, — ‘ এটা রেখে দাও। তোমার গিফট। তোমাকে কেউ মারলে তাকে ও মারবে, একদম ছাড়বেনা, বুঝছো পিচ্চি? যাও বাসায় যাও। তোমার আম্মু এসেছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে।’
মায়ের কথা শোনামাত্র আর এক মুহুর্ত থামল না রিমঝিম। সেই ছেলেটাকে পেছনে ফেলে দৌড়ে গেল। আঙিনায় সুমনা বসে আছেন। পরণে ভাঁজভাঙা শাড়ি, সোনার গহনা আর তার উজ্জ্বল মুখাবয়ব। দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল রিমঝিম। খুলে বসল আদরের ঝাঁপি। আর সুমনা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে শুধু পরম মমতায় মেয়েকে বুকের কাছে জড়িয়ে রাখলেন। সেদিন গোটা দিন মেয়ের সঙ্গে কাটালেন সুমনা। মেয়ের জন্য জামা,জুতো, ব্যাগ, চুলের ক্লিপ উপহার এনেছেন। রাতে নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তারপর সেই যে সুমনা চলে গেলেন। ছ’মাস পেরিয়ে গেলেও আর ফিরে এলেন না……চোখ মেলে উঠে বসল রিমঝিম। সে তখনও আলিশান কামরায় বন্দি। পরণে সুতো অব্দি নেই। সাদা কম্ফর্টারে আবৃত অবস্থায় উঠে বসতেই টের পেল অপরিচিত ব্যথায় আচ্ছন্ন গোটা তনু। এলোমেলো ভেজা চুল লেপ্টে আছে কপালের চারপাশে। ঝট করে মাথার উপরে তাকাল সে। সিলিং ফ্যানের দিকে মোহাবিষ্টর ন্যায় চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। মার্বেলের পাথুরে মেঝেতে জুতোর আওয়াজ পাওয়া গেল সেই মুহুর্তে। রিমঝিম ঘৃণাভরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল শুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।একহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা, আরেকহাতে ধরা লেটেস্ট মডেলের নেভিব্লু রঙের আইফোন।কোথায় বিন্দুমাত্র কুঁচকে না থাকা সাদা শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট, গলায় কালো টাই এবং কালো ব্লেজার। ঠিক যেমনটা হয় কোনো কর্পারেট কোম্পানির বস্। কয়েক ঘন্টার আগে যেই হিংস্র মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রিমঝিমের, চেহারায় তার লেশমাত্র নেই। ঠোঁটের কোনে রহস্যময় হাসিটা অমলিন রেখে কব্জিটা বাঁধা কালো ঘড়িটা দেখল শুদ্ধ। স্বাভাবিকভাবে বলল, — ‘ তুমি এখনো তৈরী হওনি কেন রিমঝিম? উই আর গেটিং লেইট। ‘
শুদ্ধর কন্ঠস্বর এতটাই স্বাভাবিক, সাবলীল যেন কয়েকঘন্টা পূর্বে তারা দ্বারা কোনোরুপ সাংঘাতিক অ পরা ধটা হয়নি। বরং এমন কোনো মুহুর্ত অব্দি তাদের মাঝে আসেনি৷ তারা বরাবরই কোনো আদর্শ দম্পতি৷ যাদের মাঝে কোনো তিক্ততা নেই।
শুদ্ধর কন্ঠস্বরের নিরুত্তাপ উদাসীনতা বুঝেও চুপ করে থাকল রিমঝিম। ওর কিছু বলার নেই। আজ যা হলো! তারপর আর কি-ইবা বলার আছে? কেন করলো এই লোকটা ওর সঙ্গে পশুর ন্যায় আচরণ? চাচীকে কিভাবে মুখ দেখাবে সে? দশ বছর বয়স থেকে শিরিন চাচী বিনা কোনো তিক্ত বাক্যবাণ বা অযাচিত ভেবে রিমঝিমকে অবহেলা করেননি। সেই মানুষটা তার প্রতিদান চাইল তখন রিমঝিম কিভাবে পারত তাকে এড়িয়ে যেতে? শিরিন চাচী তো রিমঝিমের ভালো চান। শুদ্ধর মত একজন বদমেজাজি, জেল ফেরত আসামীর সঙ্গে কিভাবে মেনে নেবেন? তিনি যে কসম দিয়েছিলেন! চাচী ঠিকই বলেন ভদ্রতার মুখোশ, কুমিরের মায়াকান্না জুড়ে ওর মায়ের কথা বিশ্বাস করা উচিত নয়। শিরিন চাচী রিমঝিমের মা। জন্ম না দিলেও তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি ওর ভালো চান। এতগুলো বছর চাচীই তো ওকে সামলে আসছেন। আর আজ শুধুমাত্র এই লোকের কারণে চাচীর কথা অমান্য করে ফেলল রিমঝিম। গলার কাছটাই কান্নারা ঝট পাকিয়ে ওঠল ফের৷
— ‘ গেট আপ ওয়াইফি। উই আর গেটিং রিয়েলি লেইট।যেতে ইচ্ছে আমারও করছে না আপাতত আমার জরুরি মিটিং আছে।’
বলেই অপেক্ষমান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল শুদ্ধ। ওদিকে শুদ্ধকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কান্নাদের চেপে আহত স্বরে রিমঝিম বলল,
— ‘ আমি একা যেতে পারব।’
— ‘ আর ইউ শিউর?’
— ‘ কেন? আপনার কেন মনে হয় আমি বাড়ি যেতে ইচ্ছুক নয়? আপনার বন্দিশালায় আটকে থাকতে আমার ভালো লাগছে?’
শুদ্ধ খানিকটা ঝুঁকে এলো রিমঝিমের দিকে। অমনি কম্বলটা শক্ত করে চেপে ধরে পেছনে সরে গেল রিমঝিম। সেঁটে গেল দেয়ালের সঙ্গে। চেঁচিয়ে বলল, — ‘ দূরে.. একদম দশ হাত দূরে। ‘
ওদিকে শুদ্ধ হেসে ফেলল ঠোঁট টিপে। যেন মাত্রই সে খুবই হাস্যরসাত্মক কোনো দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। নিচের দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভাবল বোধহয়। তারপর বলল, — ‘ রিল্যাক্স। আমার মিটিং আছে। তোমার সঙ্গে ডেটিং করার সময় নেই আপাতত। বাসায় ড্রপ করে দিই তোমাকে। গেট রেডি।’
— ‘ অভিনয় করতে করতে আপনি ক্লান্ত হোন না?’
— ‘ না। ‘
— ‘ কেন? ‘
— ‘ তোমাকে বিয়ে করতে হবে যে তা-ই। নাও গেট রেডি। উফফ প্যানপ্যানানি বন্ধ করো। সাজতে বসে যেও না আবার। তোমার সাজগোজ করা দেখলে মিটিং ক্যান্সেল করিয়ে দিতে পারি। উফফ! বিয়ের পর পুরুষ মানুষ অফিসে টাইম মত পৌছাতে পারেনা কেন আজ বুঝেছি।’ বলেই গালের দাড়িতে হার বুলিয়ে ফিচেল হাসল শুদ্ধ।
— ‘ইতর কোথাকার। ‘ বিড়বিড়িয়ে বলল রিমঝিম। সে তখনও দেয়ালের সঙ্গে চেপেই আছে।
আবার ঘড়ি দেখে তাড়া দিল শুদ্ধ, — ‘ তোমার ফেরেশতা তূল্য চাচী ওদিকে তোমাকে না পেয়ে ছোট আম্মুর সঙ্গে ঝামেলা করছে। জলদি চলো। একটা মহিলা এতটা ডায়নী হতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারিনা। আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আলমিরাতে কাপড়চোপড় আছে। ওখান থেকে পরে নিও। আবার কম্বল পেঁচিয়ে বাইরে চলে এসোনা। আগুন জ্বালানো রুপ শুধুমাত্র আমার জন্য বরাদ্দ, তাইনা? ‘ বলেই ফের মেইন দরজার কাছে এগিয়ে গেল শুদ্ধ।
চাচীর বিরুদ্ধে কথা শুনে পুনরায় গর্জে উঠল রিমঝিম, — ‘ একদম আমার চাচীর নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না। ডায়নী আমার চাচী নন। আপনার আদরের ছোট মা যার গুণগান গাইতে গাইতে আপনার মুখে ফ্যানা উঠে যায়। ‘
রিমঝিমের কথায় একবিন্দ পাত্তা না দিয়ে দরজাটা খুলে বাইরে যাবার উদেশ্যে বেরিয়ে গেল শুদ্ধ। বেরোনোর আগে বলল, — ‘ এইই পিচ্চি… দেরি করোনো। ‘
শিরিন চাচীকে ব্যাঙ্গ করায় এমনিতেও মেজাজ খারাপ হয়েছিল রিমঝিমের। সে তো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলও না শুদ্ধর কথা। কিন্তু শেষে ওটা কি বলে গেল লোকটা? নাহ! বিস্ফোরিত নেত্রে শুদ্ধর অবয়ব যেখানে অদৃশ্য হয়েছে সেদিকে চেয়ে থাকল রিমঝিম। এই লোকটা ওকে ‘পিচ্চি’ বলে সম্বোধন করল কেন? ব্যাপারটা শুধুই কি কাকতালীয়?
—————-
মাগরিবের আজান দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। আজ ঠান্ডার প্রকোপও কমে এসেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে কুয়াশাহীন শীতের সন্ধায় আজ বুটিক্সের দোকানের আপা ওকে দেড়শ টাকা দিয়েছেন! সন্ধ্যায় কেয়ার অনেক ঠান্ডা লাগলেও আজ যেন ঠান্ডা বাতাসটাও ভালো লাগছে। থানা মোড়ের গলিতে একজন লোক ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবিশ্বাস্যভাবে লোকটার দোকানের বাচ্চাদের প্রত্যেকটা কাপড়চোপড় এত সুন্দর, সফট। অথচ লোকটা মাত্র দশ টাকা পিচ হিসেবে বিক্রি করছে। কেয়ার প্রথমে খটকা লেগেছিল। কাপড় গুলো হয়তো ভালো না,ছেঁড়া ফাটা কিছু একটা হবে। কিন্তু হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল প্রত্যেকটা কাপড় নতুনের মত চকচকে। এমনকি ব্র্যান্ডের মত লাগছে। একবার ঈদে রাফির সঙ্গে তিতিরের জন্য ড্রেস কিনতে ধানমন্ডির বেবিশপে গিয়েছিল কেয়া। ওখানে এমন অনেক ভ্যারাইটিজের ড্রেস দেখেছিল। ঠিক তেমনই ড্রেস এই লোকের ভ্যানের উপরও আছে। তাও আবার দশ টাকা পিস! কেয়া তিতিরের জন্য পাঁচ সেট ড্রেস কিনল। দুই জোড়া মোজা আর তিনটা ট্রাউজার। প্রতিটা ড্রেস অসম্ভব সুন্দর। দোকানদার কাপড় গুলো পলিব্যাগে দিলেও আজ আর ভুল করেনি কেয়া। কাঁধের ব্যাগে রেখে দিয়েছে। হাতে এখনো পঞ্চাশ টাকা আছে। এই টাকাটা কেয়া জমাবে। তারপর তিতিরপাখিকে সামনের দিনে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে। আগামীমাসে সেলাই মেশিনও কিনে ফেলবে কেয়া। মা-মেয়ের দিন আগামীতে ভালো হবে বলেই সে আশাবাদী। কেয়া অনেক কাজ করবে বাচ্চাটাকে ভালো রাখার জন্য। আপন ভাবনায় হেঁটে চলা কেয়া হয়তো খেয়ালও করেনি ঠিক ওর পেছনে ধীর গতিতে চলতে থাকা গাড়িটা। খেয়াল করলে হয়তো দেখতে পেত ফ্রেমবিহীন চশমার আড়ালে থাকা একজোড়া আকুল অনুভূতি আর দীর্ঘশ্বাস মেশানো দৃষ্টির। আচমকা সে চাপ বাড়াল এক্সেলেটরে। আজও কেয়াকে একটা ছোট খাট ধাক্কা দিয়ে ফেলবে এমনই ভাবসাব তার। তবে ঝড়ের বেগে উড়ে গেলেও ঠিক সময় মত ব্রেক চাপল সে৷ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। এসে দাঁড়াল কেয়ার সামনে।
ভাবনার সাগরে বুদ কেয়া আজও ঝড়ের গতিতে উড়ে আসা গাড়ির অস্তিত্ব অনুভব করতেই কাঁধের ব্যাগ চেপে ধরল। তিতিরের জামাকাপড় গুলো ড্রেনে ফেলতে চায়না সে। গাড়ির মালিক ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে তার উড়োজাহাজ হতে। রাগে চেঁচিয়ে উঠল কেয়া,
— ‘ এই-ই.. রাস্তাটা কি কিনে নিয়েছেন? ‘
তবে বিদ্যুৎ বেগে গাড়ির মালিক ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল। বলল, — ‘ আম এক্সট্রিমলি স্যরি। ‘ বলতে বলতে সম্মুখে সটান দাঁড়ানো যুবকের মুখাবয়ব ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পরিস্কার দেখতে পেলো কেয়া। নীল শার্ট, নেভিব্লু প্যান্ট আর অফহোয়াইট ব্লেজার পরিহিত নিঃসন্দেহে একজন সুদর্শন মুখবিবরের অধিকারী সে। লম্বায় কেয়া তার বুক অব্দিও পৌছাবে না। তার দামী পারফিউমের ঘ্রাণ কেয়া কয়েক হাত দুরত্বেও অনুভব করতে পারছে৷ আপাতত এই লোকের ‘ লুক এনালাইসিস’ করা বাদ দিয়ে তাকে ধমকে উঠল কেয়া, — ‘ আপনি গতদিনও আমাকে ধাক্কা দিয়েছেন তাইনা? আজ আবার ধাক্কা দিলেন? মতলবটা কি? গতকাল আমার কতটা ক্ষতি হয়েছে জানেন? ‘ বলেই ফের যুবকের পানে চাইল কেয়া। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটা ওর দিকেই চেয়ে আছে যেন কিছু স্মরণ করতে চাইছে। আচমকাই লোকটা বলল,
— ‘ কেয়া আপু ? ‘
এতবড় হাট্টাগোট্টা সাইজের লোক ওকে আপু সম্বোধনে অজান্তেই একটা মেদুর ছায়া পড়ল কেয়ার মুখশ্রীতে। কবে কবে এত বয়স হয়ে গেল ওর! টেরই পেল না। জীবনটা সুন্দরমত উপভোগ করার আগেই সমস্ত রঙ ফিকে হয়ে গিয়েছে ওর। ওর পোড়াকপালের ফেরে তিতিরের শৈশবে দাগ লাগছে। কোনোরকমে বলল, — ‘ জী? ‘
— ‘ আপনি কেয়া আপু না? মাইলস্টোন কলেজ, ১৫ ব্যাচ? ‘
— ‘ জী! ‘
— ‘ আমাকে চিনতে পেরেছেন আপু? ‘
হতচকিতভাবে দু’পাশে মাথা নাড়াল কেয়া। সে কোনোভাবেই এই ছেলেটাকে মনে করতে পারল না।
— ‘ আমি মাহাদ। মুশফিকুর মাহাদ। আলী স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তাম আপনার ব্যাচে।’ মাহাদের নাম বলা মাত্র চমকে উঠল কেয়া। হুট করেই মানস্পটে ভাসল একটা অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। চেহারায় দৃশ্যমান মেদুর ছায়াটা আরও গাঢ় হলো৷ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ভীষণ দোটানায় পড়ে কি বলবে কিছুই বুঝল না সে। কোনোরকমে বলল,
— ‘ কোন মাহাদ? আমার ঠিক মনে নেই। অনেকদিন আগের কথা তো।’ বলেই এক মুহূর্তের জন্য থামল না কেয়া। দ্রুত গতিতে হেঁটে মাহাদের সামনে থেকে চলে এলো সে। ঠিক তখনই শুনল মাহাদের কন্ঠস্বর, — ‘ বিয়ে করা স্বামীকে কেউ ভুলে যায় কেয়া আপু? ‘
চলবে…..