Story: kache asha baron(09)

কাছে আসা বারণ
লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা
পর্ব—৯

 

কেয়া বাড়ি ফিরল বেশ দেরিতে। এসে দেখল ডাইনিং টেবিলে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসা রাফি আর ওর মা। বহুদিনের পুরোনো সাবেকি আমলের কাঠের ডাইনিং টেবিলে দৃশ্যটা দেখে ফের ঝাপসা হল ওর আঁখিযুগল। তিতিরকে রাফি কোলে বসিয়ে রেখেছে আর চামচ দিয়ে ফরিদা বেগম ওকে সুজি খাইয়ে দিচ্ছেন পরম মমতায়। চিনির অভাবে বাচ্চাটা না খেয়ে ছিল উপলব্ধিটা উনিও করেছিলেন বোধহয়। বাচ্চা মেয়েটা পা দুটো উঠিয়ে দিয়েছে নানুমনির কোলের উপর। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল কেয়া। খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে তিতিরের মাথা আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে দিচ্ছিল রাফি। ভাগ্নিকে আদুরে কন্ঠে বলল,
— ‘ তিতিরপাখি জলদি খেয়ে না-ও। তাহলে মামা তোমাকে গিফট দেবে। ‘
খাওয়া থামিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে মামার দিকে চাইল তিতির। বড় বড় চোখ করে জানতে চাইল,
— ‘ তে..বিবিয়ার দিবা মাম্মা?’
— ‘তে..বিবিয়ার!’ মায়ের দিকে জিজ্ঞাসাসূচক নজরে চাইল রাফি। কারণ তিতিরপাখির চাইনিজ ভাষা সে একটুও বোঝেনি।
ফরিদার হাত থেমে নেই। স্টিলের গোল চামচ দিয়ে তিতিরকে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন,
— ‘ পান্ডার কথা বলছে? ‘
— ‘ পান্তা না.. তেবি বিয়ার.. ‘ মুখের খাবারটুকু গিলে নিয়ে প্রতিবাদ করল তিতির৷ এবারে রাফিও বুঝল। এই তেবি বিয়ার আসলে টেডিবিয়ার। সে-ও তাল মিলিয়ে মাকে মেকী ধমকাল,
— ‘ নানুমনি কিচ্ছু জানেনা। তাইনা তিতিরপাখি? আমরা আজই তেবিবিয়ার কিনতে যাব। খাওয়া শেষ করো। ‘
— ‘ ছত্তি?’
— ‘ সত্যি। এবার জলদি ফিনিশ করো৷ তোমার পঁচা মাম্মাম এলে আবার মারবে।’
ঠোঁট উল্টাল তিতির। বলল,— ‘ মাম্মাম ভায়ো। তুমি পতা মাম্মা।’
হেসে ফেলল রাফি। সেই দুমাস বয়স থেকে তিতির ওদের সঙ্গে থাকে। প্রথমদিকে সারারাত কাঁদত মেয়েটা। কলিক বাচ্চা ছিল সে। একটুও ঘুমোতে দিত না কেয়াকে। মেয়ের সঙ্গে কেয়াও কাঁদত। একদিকে কেয়া আরেকদিকে তিতির! কাকে সামলাবে রাফি? অবশ্য রাফি বোনকে একটু কম আগলে তিতিরকে বুকে জড়িয়ে নিত। আর অমনি তিতিরের কান্নাকাটি বন্ধ হয়ে যেত। শুধু খাওয়ার সময়টা কেয়ার কাছে গেলে, পেট ভরে গেলে ফের কান্নাকাটি জুড়ত তিতির। তখন রাফি ওকে বুকে নিয়ে দোতালার টানা বারান্দায় হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়িয়ে দিত। কিছুটা বড় হবার পর তিতির যখন আধো আধো বুলিতে কথা শিখল তখন রাফি কতকরে ‘মামা’ ডাক শেখাতে চাইল! কিন্তু সেই ছোট থেকে তিতির ওকে মাম্মা বলে ডাকে। এখন তো রাফির নিজেরও মাম্মা ডাক ছাড়া অন্যকিছু ভালো লাগেনা। মামারা তো মায়ের চেয়েও আপন হয়। এইজন্যই তাদের দুবার মা বলে সম্বোধন করা হয় তাইনা?

তিতিরের খাওয়া শেষ হতেই সটকে পড়ল তিতির।মোচড়ামুচড়ি করে সে নেমে পড়ল মামার কোল থেকে। মাথা নাড়িয়ে বলল,— ‘পেত ভলে গেতে নানু।’ বলেই সে ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেল ওখান থেকে।
ভরা পেটে সে এখন চিল মুডে আছে। টিভিতে কিছু একটা দেখছিল। প্রশান্তি নিয়ে ভাগ্নিকে দেখছিল রাফি। বাচ্চাটার জন্য হলেও আজ থেকে দু’ঘন্টা বেশি পড়বে রাফি। একটা চাকরি তার অবশ্যই নিতে হবে। মেয়েটাকে অমন হাসি-খুশি দেখে ফরিদাকে উদেশ্যে করে রাফি কঠিনস্বরে বলল,
— ‘ ওর সুজির চিনি আলাদাভাবে রেখে দেবে মা। ফুরানোর আগে আমাকে জানাবে। মেয়েটাকে যেন আমি কষ্ট দিতে না দেখি আর। তোমার মেয়েটা? সে কোথায়? তিতিরকে না খাইয়ে রাখছে কেন? আমি কি ম রে গিয়েছি? হুম? আমি নতুন একটা টিউশনি পেয়েছি। ক’টা দিন সবুর করো৷ অভাব-অনটন আল্লাহ মিটিয়ে দেবেন। তুমি দোয়া করো আমার জন্য। ‘

রাফির কথা শেষ হতেই তখন ঘরে প্রবেশ করল কেয়া। ভীষণ শুকনো মুখে এগিয়ে এলো। দীর্ঘদিনের অযত্নে গায়ের রঙ ফিকে হয়েছে ওর। চোখের নিচে একপোচ কালি, ভাঙা চোয়াল আর তীব্র বিষাদ লেপ্টে থাকা মুখশ্রীতে জমা হয়েছে অলিখিত শতশত অভিযোগ। অনেক সময় নিয়ে কান্নাকাটিতে নাক লাল হয়ে আছে। চোখের পাতাও ফুলে গিয়েছে ওর। বোনের মুখটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল রাফি। বুঝতে বাকি নেই কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। বোনের দিকে শান্ত এবং শীতল দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে পলেস্তারা খসে পড়া সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে যেতে যেতে বলল,— ‘তিতিরকে তৈরী করে দাও আপু।’

তখন রাফির সঙ্গে বাইরে গিয়ে একটা গোলাপি টেডিবিয়ার, গোলাপি কিচেন সেট আর একটা বড় বল কিনে এনেছে তিতির।ওকে দিয়েই ফের বেরিয়ে গিয়েছে রাফি। সেগুলা নিয়েই বিছানায় বসে খেলছিল আপন মনে বাচ্চাটা৷ রান্নাবান্না করে টেডিবিয়ারকে খাওয়াচ্ছে৷ কখনো বল নিয়ে খেলছে। মেয়ের দিকে অনুভুতিশূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কেয়া। ঠান্ডা পড়ছে আবার। মেয়েটার পা খালি। ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে পা জোড়া। ঠিক কেয়ার মত। কাল কেয়া মেয়ের জন্য দু জোড়া মোজা কেনার মত করে কাজ করবে…. ওর রুমের সঙ্গে একটা বারান্দা আছে। বাহিরে হিম-শীতল পরিবেশ হওয়া সত্ত্বেও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল কেয়া। ওদের বাড়ির সামনের দিকে একটা কালো গাড়ি থেমে আছে। গাড়িটার কাঁচ উপরে তোলা। অন্ধকারে কাঁচের ওপাশে দেখা যাচ্ছেনা। নিগূঢ়তম নজরে চেয়ে রইল সেদিকে কেয়া। কে আছে সেখানে?

————-

রাফি গোপনে তপ্তশ্বাস ফেলল। ফেলে টেবিলে ওয়ালেট এবং মোবাইল রাখা ছিল। সেখান থেকে মোবাইল উঠিয়ে ব্যস্তহাতে শুদ্ধর নাম্বার বের করে ডায়াল করতে করতে বলল, — ‘ তুমি বরং শুদ্ধর সঙ্গে কথা বলে ইংরেজিটা জেনে নাও ইরা।’
টেবিলের ওপাশে ইরার মুখটা শুকিয়ে গেল তৎক্ষনাত। ভয়ের একটা ছাপ পড়ল তার আদুরে আননে। ভাসা ভাসা চোখে রাগ নিয়ে তাকাল রাফির দিকে। ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,— ‘ মজা করছিলাম ছার।’
— ‘ আবার মজা করতে ইচ্ছে হলে আগেভাগে জানিও। শুদ্ধকে কল করে একসঙ্গে শুনব, কেমন? বই বের করো। পড়া বাদে অন্য কোনো বিষয়ে আমি যেন একটা কথাও না শুনি। বুঝেছেন? ‘ বেশ শক্ত কন্ঠে আওড়ায় রাফি। সে নিজেকে যতই শেয়াল মনে করুক তবুও বন্ধুত্বের খাতিরে নিজেকে সংযত রাখবে সে। তার ইরাবতীর যোগ্য হয়ে ওঠা অব্দি নিজের অনুভুতি লুকিয়ে রাখবে। আর যদি যোগ্য না হয়! মাঝেমাঝে আমাদের জীবনে যদি নামক শব্দটা খুব কঠিন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। মাথাটা নিচু করে বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে রাফি।

— ‘ জ্বি ছার। ‘ বলেই বিড়বিড়িয়ে ইরা ফের বলল, — ‘ সিনেমার হিরো সামনে থাকলে কোনোদিন পড়ালেখা করা যাই?’ কথাগুলো শুনল ঠিকই কিন্তু না শোনার ভান করে পড়ানো শুরু করল। ভালোভাবে বোধহয় দশমিনিট মত পড়িয়েছে রাফি। তখনই এলেন সুমনা। চা-নাস্তা এনেছেন। টেবিলে রেখে রাফিকে উদেশ্যে করে বললেন,
— ‘ স্টুডেন্ট কেমন পড়ছে বাবা? ‘
— ‘ ফাঁকিবাজ, মহাফাঁকিবাজ। ‘ সালাম দিয়ে সুমনার উদেশ্যে বলল রাফিন।
মৃদু হাসলেন সুমনা।বললেন, — ‘ শুদ্ধই তোমার কথা জানাল আমাকে। একটু ধরে ধরে পড়িও। নয়তো এবছর আর পাশ করতে পারবেনা। ‘
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী কন্ঠে আওড়ায় ইরা,
— ‘ আমার পড়তে ইচ্ছে করেনা আম্মু। ‘
— ‘ না পড়লে বিয়ে দিই? ‘ মেয়েকে বললেন সুমনা।
— ‘ দাও। ‘
সবেই চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছিল রাফি৷ বিষম খেল মুহুর্তে। নাক-তালুতে উঠে গেল চা। ইরাও হড়বড়িয়ে বলল,— ‘ ষাট, সত্তর, আশি। ঠিক হয়ে যা কাশি। ‘
অদ্ভুত দৃষ্টিতে ইরাকে দেখে নিয়ে হেসে ফেলল। রাফি৷ হাসলেন সুমনাও। কাপটা রেখে বলল,
— ‘ আমার খোঁজে একজন পাত্র আছে আন্টি। আমাদের গলিতে বাড়ি। ছেলে পাইলট৷ বাংলার উড়োজাহাজ চালায়। ‘
— ‘ বাংলার উড়োজাহাজ কি স্যার?’
স্যার শব্দটা কানে বাজল রাফির। এতক্ষন ওকে ছার সম্বোধন করে মায়ের সামনে স্যার বলছে বিচ্ছু মেয়েটা। হাসিটা আটকে বলল,— ‘ যেটাতে চড়ে তুমি কলেজে যাও। ‘
ভাসা ভাসা চোখ জোড়া বিস্ময়ে ফেটে যাবার উপক্রম হল ইরার৷ মানে রাফি ওকে রিক্সাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছে! হাসলেন সুমনাও। মেয়েকে কড়াকড়ি করে যেতে যেতে বললেন,
— ‘ চুপচাপ পড়ো। ভাইয়াকে বিরক্ত করবে না। ‘
মায়ের প্রস্থানে সাহস বাড়ল তরুনীর। মুখ বাঁকিয়ে বলল,— ‘ আপনার কামের বেটিদের সঙ্গে বিয়ে হবে ছার। ‘
— ‘ হলে আমার হবে। তোমার কি? বই বের করো।’
একটা ভেংচি টেন্সের তিন প্রকার লেখায় মনোযোগ দিল ইরা। তার আগে বিড়বিড়িয়ে বলল, — ‘ খবিশ। ‘

————–

রিমঝিম বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হাতে একটা গল্পের বই। উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল তার মাকে দেখা যায় কি না? তবে মাকে দেখল না। কিন্তু তখনকার ধাক্কা লাগা মেয়েটা পা টিপে টিপে খোলা ছাদে এলো। এতক্ষণ উজ্জ্বল আলোয় ছাদটা আলোকিত হয়ে থাকলেও মেয়েটা এসেই বাতিটা নিভিয়ে দিল তবুও ঘরের ভেতর থেকে আসা আবছা আলোয় মেয়েটার সাদা জ্যাকেট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পা টিপে টিপে ফুলের টবের কাছে এগিয়ে গেল সে। কুয়াশায় ভেজা মাটি উঠিয়ে নিয়ে গোল করল। তারপর রেলিংয়ের ধারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল৷ কৌতুহল নিয়ে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষন করতে থাকে রিমঝিম। এই আধাপাগল মেয়েটা কি করবে? ঠিক তখনই দেখল গেট দিয়ে একটা ছেলে বেরোচ্ছে। আর বুঝতে কিছু বাকি রইল না রিমঝিমের। ঠোঁট টিপে হাসল রিমঝিম। ঠিক ওর মত দেখতে হলেও মেয়েটার স্বভাব ওর একেবারেই উলটো। ছেলেটা কিছুদূর এগিয়ে যেতেই মাটি ছুড়ে মার ল ইরা। ছুঁড়ে দিয়েই সে পগারপার। তবে রিমঝিম দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। বারান্দার লাইট সে বন্ধ করে নিয়েছে। তাই ওর ধরা পড়ার কোনো চান্স নেই। ঠিক তখনই দেখল সে ওই ছেলেটার ঠিক সামনে শুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। আর মাটির গোলাটা গিয়ে পড়েছে তার ঝাকড়া চুলে। সাদা পাঞ্জাবি ভিজে মাটিতে যাচ্ছেতাই অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় উঁচিয়ে উপরের দিকে চাইল শুদ্ধ আর ওই মুহুর্তে রিমঝিমের চাচী বারান্দার লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। তিনি এসেছেন ওকে খাবার জন্য ডাকতে। উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করে উঠল রিমঝিম। চোখাচোখি হল শুদ্ধর সঙ্গে। সে হতবাক হয়ে একবার মাটিতে মাখামাখি নিজেকে দেখছে। আরেকবার দেখছে চারতালার উপরে থাকা রিমঝিমকে। যেন এখনো বিশ্বাসই করতে পারছেনা এটা ওর সঙ্গে ওই মুহুর্তে কি ঘটে গেল! দৃশ্যটা রাফিও দেখল। সে তো ভেবেছিল এটা বোধহয় তার ইরাবতী। জোর করে অনেক পড়া দেয়ার প্রতিশোধ নিয়েছে। কিন্তু এখানে তো কেস পুরো উলটো। মেয়েটার দিকে রাফিও তাকাল। সেদিন সকালে ভালোভাবে খেয়াল না করলেও আজ দেখল। মেয়েটা চেহারা-ছবি অবিকল তার ইরাবতীর ন্যায়। যেন দু’জন আপন বোন? তবে নজর সরিয়ে নেয় সে। বরং ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলল, — ‘ বাড়ি ফিরে ফুলের বদলে মাটির গোলা পেলে বন্ধু? আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিস নাকি? দেরি করে বাড়ি ফেয়ায় বউ শাস্তি বর্ষণ করল নাকি তোকে? সত্যি করে বল তো? ‘
তখনও হতচকিত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি শুদ্ধ। রাফির কথাও বোধহয় শুনল না৷ কোনোরকমে বলল,— ‘ তোকে বাড়ি পৌছে দেয়া লাগবে? ‘
— ‘ না। তুই যা। তোর বউ অপেক্ষায় আছে ‘ বলেই ঠোঁট টিপে হেসে চলে গেল রাফি।
আর শুদ্ধ? রাফি চলে গেলেও সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। নড়াচড়ার কথাও যেন ভুলে গেল….

চলবে…..?

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x