বিচ্ছেদের আজ প্রায় ছয় বছর পর অনাকাঙ্খিতভাবে
প্রাক্তনের মুখোমুখি হয়ে কথা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইল দুপল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব কথার শীরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আজ এতগুলো বছর পর মানুষটাকে নিজ সম্মুখে দেখে শ্বাসটা যেন গলায় আটকে আসে কথার। পরমুহূর্তেই চোখের কোণ ভিজে ওঠে। ঝাপসা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখে সামনে নির্বিকার মুখে বসে আছে তার প্রাক্তন ‘স্নিগ্ধ শাহরিয়ার।’ ঠিক প্রাক্তন বলা যায়না। কারণ তার সামনে বসা দেশের টপনচ বিজনেসম্যান স্নিগ্ধ শাহরিয়ারের সাথে ওর এখনো একটা অলিখিত সম্পর্ক রয়ে গিয়েছে। যে সম্পর্কের সুতো কেটে লোকটা ওকে ছুঁড়ে ফেলে চলে আসলেও বিধাতা কর্তৃক নির্ধারিত অমোঘ সম্পর্কটা ছিন্ন করতে বোধহয় ভুলে গিয়েছিল। তাইতো এখনো এই লোকটার দেওয়া পবিত্র স্বীকৃতি আর একটা অমূল্য স্মৃতি এখনো পরম যত্নে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে কথা।
- ম্যাম প্লিজ সিট।
এতগুলো বছর পর স্নিগ্ধকে দেখে কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠলেও কথা নিজের আবেগ সামলে নেয়। একটা ব্যথাতুর ঢোক গিলে ত্রস্ত চোখ নামিয়ে নেয়। বহু কষ্টে ঠেলে আসা কান্না গিলে নিয়ে কাঁপা হাতে চেয়ার টেনে বসলো। ওর ইচ্ছে করছে এই ঠকবাজ লোকটার সামনে থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে। কিন্তু কোন উপায় নেই, ওর হাত-পা যে বাঁধা। একটা চাকরির খুব প্রয়োজন কথার। এই যাদুর শহরে দুটো প্রাণকে জিইয়ে রাখতে যে প্রয়োজন টাকা! স্নিগ্ধ শাহরিয়ার এই কোম্পানির মালিক এটা আগে জানলে হয়তো কথা কস্মিনকালেও এই লোকটার দুয়ারে এসে দাঁড়াতো না। আচ্ছা কথা নাহয় সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল, কিন্তু স্নিগ্ধও কি জানতো না? সিভিতে তো স্পষ্ট লিখা ছিল “অনন্যা ইয়াসমিন।” তাহলে? যাকে একদিন তীব্র ঘৃণার সাথে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, যার ছায়া মাড়াবে না বলে শহরটাই ছেড়ে চলে এসেছিল। তবে তাকে কেন জেনেশুনে চাকরিটা দিল?
- আপনার সিভিটা আমাদের কর্তৃপক্ষ হতে সিলেক্টেড হয়েছে। আপনি সামনের সপ্তাহ থেকেই অফিসে জয়েন করতে পারবেন। আদার্স প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন আপনাকে মেইল করে দেওয়া হবে।
স্নিগ্ধর এসিস্ট্যান্ট সাইফের মৃদু গলায় কথার সম্বিৎ ফেরে। হরিণী আঁখি দ্বয়ের দীঘল পাতাগুলো মৃদু কেঁপে উঠে। জলচাপা চোখ গুলোর পলক ঝাপটে আঁড়চোখ বুলিয়ে কথা দেখল সামনের মানুষটিকে। পেশিবহুল ফর্সা সুঠাম গতরে অলিভ গ্রিন শার্ট, ব্ল্যাক ভেস্ট, ব্ল্যাক টাই জড়িয়ে। চোখে ফুল রিম রিডিং গ্লাস। ছাব্বিশের সেই হ্যাংলা পাতলা যুবক আজ একত্রিশের এক বলিষ্ঠ তাগড়া সুপুরুষ। যার আপাদমস্তকে জড়িয়ে আছে আভিজাত্যপূর্ণ দৃঢ় প্রত্যয়! তীক্ষ্ণ চোয়ালে অনিমেষ তাকিয়ে আছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে। লম্বাটে আঙুলগুলো নিরন্তর চেপে চলছে ল্যাপটপের কীবোর্ডে। সামনে বসে থাকা অতি পরিচিত কথার প্রতি তার কোনরূপ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। কথা তার নিকট যেন নিছকই তুচ্ছ এক প্রাণী যার দিকে খেয়াল করার বিশেষ প্রয়োজন নেই। অপমানে আর চাপা কষ্টে কথার বুকটা মুষড়ে উঠে। এই লোকটাই কিনা কোন একসময় ওকে পাগলের মতো ভালোবাসত! পরক্ষণেই মস্তিষ্কের স্পষ্ট উত্তর আসে, ‘ভালোবাসলে কি আর অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলে চলে আসা যায়?’ কথার চোখদুটো আবার ঝাপসা হয়ে উঠে। বহুকষ্টে নিজের আবেগ সংবরণ করে গলা ঝেড়ে ক্ষীণ স্বরে বললো,
- ধন্যবাদ। আমি কি এখন আসতে পারি?
এসিস্ট্যান্ট যুবক ছেলেটা কথার ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে ঈষৎ হেসে বললো,
- জি আজ আসতে পারেন। সো, সি ইউ নেক্সট মানডে। বেস্ট উইশেস ফর ইউ।
কথা একটা শুলনো ঢোক গিলে চোখের কোণা তুলে অনুভূতিশূন্য হয়ে বসে থাকা স্নিগ্ধকে আরেকবার পলক দেখে নিয়ে নিভু স্বরে বললো,
- থ্যাংকস আসি।
কথা নিজের ব্যাগ আর ফাইলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বড় বড় পা ফেলে একপ্রকার পালিয়ে যায় স্নিগ্ধর সামনে থেকে। ওর ভীষণ কান্না পাচ্ছে। পুরনো অনুভূতি আর আবেগ গুলো নতুন করে ওর গলা চেপে ধরেছে। মনে হচ্ছে এই লোকটার সামনে আর একমিনিট থাকলে ও দম আটকে মরেই যাবে। কথার অবয়ব নিমিষেই মিলিয়ে গেল আধুনিক কক্ষটি থেকে। কিন্তু রয়ে গেল চিরচেনা ওর অস্তিত্বের সেই মিষ্টি সুবাস। কিন্তু একটিবারের জন্যেও কথার দৃষ্টিগোচর হলোনা ওর সামনে এতক্ষণ নির্লিপ্ত বসে থাকা স্নিগ্ধর হাতের গ্রিপ ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠেছে। হাতটা এত জোরে মুষ্টি বদ্ধ করে ধরে রেখেছে যে ফর্সা হাতের পৃষ্ঠের নীল শিরা, উপশিরা সব ভেসে উঠেছে। দাঁত দাঁত চেপে সে ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। হালকা ব্রাউন চোখের মনিদুটো ইতোমধ্যে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু হায়!
ওর ভেতরে বয়ে চলা ভাঙচুরের আওয়াজ এতক্ষণ সামনে বসে থাকা কথা সামান্য আঁচ পেলনা।
.
অফিস থেকে বের হয়ে কথা উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে লাগল। ওর গোটা শরীটটা থরথর করে কাঁপছে। বহুদিন বাদে পুরনো প্যানিক অ্যাটাকটা মনে হয় ফিরে আসছে। কথা টলমল চোখে হা করে বড় বড় শ্বাস ফেলে। ওর মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর বায়ু ওর জন্য নিঃশ্বেষ হয়ে গিয়েছে। তা না হলে ও নিঃশ্বাস নিতে পারছে না কেন?
কথা অপ্রকৃতস্থের ন্যায় রাজধানীর ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে হাঁটছে। সামনে কি, ও কোথায় যাচ্ছে সেই ধ্যান আপাতত ওর মাথায় নেই। হঠাৎ সামনে থেকে দ্রুতবেগে একটা কার একদম ওর দু’কদম সামনে এসে সবেগে ব্রেক কষে। হঠাৎ কি ঘটলো মস্তিষ্কে প্রসেস করার আগেই হতবিহ্বল কথা টাল হারিয়ে পিচ ঢালা রাস্তায় আছড়ে পড়ল। সাথে সাথে নরম হাতের তালুদ্বয় সামান্য ছিঁলে গেল। কিন্তু কথার যেন ব্যথার অনুভূতিটুকুও হচ্ছেনা। ও রাস্তায় বসে ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকাল। হঠাৎ কারটা থেকে রুদ্ধশ্বাসে বের হলো এক যুবক। যুবকটা কথার সামনে রাস্তায় হাঁটু মুড়ে বসে তীব্র উৎকন্ঠায় জিজ্ঞেস করলো,
- অনন্যা আর ইউ ওকে? কোথায় লেগেছে দেখি।
পরিচিত একটা কন্ঠ কর্ণপাত হতেই কথা চমকে মুখ তুলে তাকাল। ঝাপসা চোখের পলক ঝাপটে দেখল পরিচিত এক পুরুষ অবয়ব৷ একটা শুষ্ক ঢোক গিলে কথা নিজেকে সামলায়, কম্পিত গলায় বলে,
- আ..আমি ঠিক আছি আবির।
- সত্যি ঠিক আছো তো? ব্যাথা পেলে প্লিজ আমাকে জানাও। আমি হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি।
কথা নিজেকে ধাতস্থ করে আস্তে করে বললো,
- না আবির। আমি সত্যই ব্যথা পাইনি। আসলে দোষটা আমারই ছিল।
- দেখি উঠে আসো।
আবির নামের ছেলেটা কথাকে টেনে তুলে রাস্তা থেকে।
- তুমি এই মধ্যদুপুরে বনানীতে কি করছ?
কথা হাত দিয়ে পরনের গোলাপি জামাটা ঝেড়ে বলে,
- একটা চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলাম।
- হয়েছে জবটা?
কথা উপরনিচ মাথা নাড়ায়। আবির সহাস্যে বলে,
- ওহ গ্রেট অনন্যা। কংগ্রাচুলেশনস টু ইউ। গ্রাজুয়েশন কম্প্লিট করতেই তুমি জব পেয়ে গেলে। আর আমাকে দেখ এখনো বেকার ঘুরছি।
কথা মলিন হেসে বলে,
- আমার যে চাকরিটা পেতেই হতো আবির। এই টাকার শহরে আমাকে একা টিকে থাকতে হয় যে।
কথার ম্লান কন্ঠে আবির থমকালো। হঠকারিতায় বেফাঁস কথা বলে মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে বলে মনে মনে গ্লানিবোধ করলো। নরম সুরে বললো,
- চলো তোমাকে বাসায় ড্রপ করে দিচ্ছি।
অন্যসময় হলে কথা মানা করে দিত। কিন্তু আজ মনে হয়না ও ঠিকভাবে বাসায় ফিরতে পারবে৷
কথা চুপচাপ আবিরের কারে উঠে বসলো। আবির আর ও সেইম ব্যাচের। এইতো কিছুদিন আগে দু’জনেই গ্রাজুয়েশন কম্পলিট করেছে। গাড়ি স্ট্যার্ট হতেই কথা
সিটে মাথা এলিয়ে দিল। ও যতই অতীত থেকে পালাতে চায়, কিন্তু অতীত যেন ওকে সবসময় ধাওয়া করে বেড়ায়। যার হাত থেকে কথার নিস্তার নেই। নেই!
*
সামনে থাকা ল্যাপটপটা মাথায় তুলে এক আঁছাড় মারলো স্নিগ্ধ । চোখের পলকে মেঝেতে বিকট শব্দ তুলে যন্ত্রটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। হঠাৎ শান্ত অফিস কক্ষ থেকে এত ভয়ানক আওয়াজে কয়েকজন স্টাফ, ম্যানেজার সহ, স্নিগ্ধর এসিস্ট্যান্ট সাইফ ছুটে আসে। তাদের সদা শান্ত অবিচল বসকে রাগে অগ্নিমূর্তি হয়ে উগ্র আচরণ করতে দেখে সকলে বিমূঢ় বনে গেল। সাইফ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল স্নিগ্ধর পানে। বোধগম্য হলোনা এটুকু সময়ের মধ্যে কি এমন হয়ে গেল যে বস এত চটে গেলেন। একটু আগে তো ঠিকই ছিলেন। স্নিগ্ধর হুঁশ নেই। সাইফের ভাবনার মাঝেই স্নিগ্ধ হিতাহিতজ্ঞানশূন্যের মতো ডিভানের সামনে থাকা কাঁচের সেন্টার টেবিলটায় সপাটে লাঠি মারে। মুহুর্তেই সেটা মারবেল মেঝেতে আছড়ে পড়ে বিকট শব্দে ভেঙে খানখান হয়ে গেল। উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠে দু’পা পিছিয়ে গেল। সবাই ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে স্নিগ্ধর ভয়াবহ তান্ডব। হঠাৎ স্নিগ্ধর এমন হিংস্ররূপ অফিসের সবাইকে হতবিহ্বল করে দিয়েছে। একে অপরের সাথে ভয়ার্ত চোখাচোখি, ফিসফিস করছে।
স্নিগ্ধর গাল,কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। সামনের সিল্কি চুলগুলো ঘামের সাথে আটকে আছে ললাটে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাইফ অফিসের সবাইকে খানিকটা ধমকে উঠল,
- এখানে কি করছেন আপনারা। তামাশা চলছে এখানে? গেট ব্যাক টু ইওর ওয়ার্ক। গো।
সাইফের ধমক খেয়ে স্টাফরা সবাই চুপসে যায়। তৎক্ষনাৎ সবাই সুড়সুড় করে জায়গা ত্যাগ করলো। মনে হাজার প্রশ্ন নিয়ে সাইফ স্নিগ্ধকে একপলক দেখে নিয়ে নিজেও নীরবে প্রস্থান নিল।
কিন্তু যার জন্য এই তান্ডব সেই কথা জানতেও পারলনা ও বের হওয়ার পর পরই শীততাপনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক অফিস কক্ষটিতে প্রচন্ড আকারে একটা সুনামি বয়ে গিয়েছে। লণ্ডভণ্ড জিনিষপত্র গুলো যেন সেই ঝড়ের নীরব সাক্ষী। তান্ডবের প্রণেতা স্নিগ্ধ শাহরিয়ার রক্তলাল চোখে মেঝের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফোঁসফোঁস করছে। রক্তাভ নেত্রদুটি টলটল করছে। স্নিগ্ধ কাঁদছে কি?
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচের ভাঙা টুকরো গুলোর পানে চেয়ে স্নিগ্ধ হঠাৎ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড়িয়ে বলে,
- তোমার মতো ছলনাময়ীকে এই স্নিগ্ধ শাহরিয়ার ঘৃণা করে। আই জাস্ট হেইট ইউ।
★
লাগাতার কলিং বেলের আওয়াজে বাসায় থাকা বছর পঁচিশের এক রমনী ছুটে আসলো। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ব্যগ্র কন্ঠে বললো,
— আসছিইই।
দরজা খুলতেই দেখল একটা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ফর্সা ঘর্মাক্ত মুখশ্রী সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফারহা তাকে দেখে আলতো হেসে বললো,
- কথা তুই এসেছিস। আয় ভেতরে আয়।
অবসন্ন কথা ভারী পা ঠেলে ভেতরে ঢুকে সোফায় বসলো। গলার ওরনা টেনে মুখের ঘাম মুছে বললো,
- তোকে খুব জ্বালিয়েছে তাই নারে ফারু?
ফারহা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললো,
- আরে না আমাদের কুটু বুড়ি আজ একদম দুষ্টমি করেনি, তোর জন্য কাঁদেওনি। চুপচাপ ফাইয়াজ ভাইয়ার সাথে খেলেছে। এই নে পানিটা খেয়ে নে। অনেক ঘেমে আছিস।
কথা ঢকঢক করে পুরো পানিটা খেয়ে শুধালো,
- নাহিদ ভাই এখনো বাসায় ফেরেনি?
- না আজ নাকি অফিসে লাঞ্চের দাওয়াত আছে। তুই যা ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি৷ এখন আর বাসায় গিয়ে রান্না করতে হবেনা।
- তুই এতো ব্যস্ত হোস না ফারহা। আমি বাসায় গিয়ে কিছু একটা রান্না করে খেয়ে নেব৷
ফারহা কিচেনে যেতে যেতে বললো,
- বেশি কথা বলিস না কথা। চুপচাপ খেতে আয়। সবসময় তোর বারণ আমি শুনবোনা।
ফারহা যেতেই কথার মাঝে উদাসীনতা ভর করলো।
চোখদুটো আবার টলমল করে উঠল। পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে রক্ত বের হওয়ার মতো যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে কথার। হঠাৎ কি মনে করে কথা টালমাটাল পায়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। একটা কক্ষের ভেতরে কথা তাকিয়ে দেখে একটা বছর ছয়েকের ছেলে বাচ্চার সামনে অতি মনোযোগে পাযেল হাউজ বানাচ্ছে একটা সাড়ে চার বছরের তুলতুলে মেয়ে বাচ্চা। ডাগরডাগর চোখে নিমগ্ন চিত্তে ছোট্ট ছোট্ট হাতে পাযেল মেলানোর চেষ্টা করছে সে
। ফর্সা কপালে তার বিরক্তির মৃদু কুঞ্চন। ফোলা ফোলা আদুরে গালদুটোতে সহজাত লালিমা। বিধাতা যেন গোটা মুখটাতে এক পৃথিবীর সমস্ত মায়া ঢেলে দিয়েছেন। রেশমের মতো মসৃণ চুলগুলো মাথার উপরে তালগাছের মতো দুটো ঝুঁটি বাঁধা। কিছু কপালে পড়ে বাচ্চাটার কার্যে ব্যঘাত সৃষ্টি করছে। বাচ্চাটা ঈষৎ বিরক্ত হয়ে ছোট ছোট আঙুল দিয়ে চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে আবার মনোযোগ দেয়।
ছোট্ট নরম শরীরটায় একটা পিচ কালারের কটনের সফট ফ্রক। জামার রঙটা তার দুধে আলতা গায়ের বরণের সাথে মিশে অমায়িক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। বাচ্চাটা যেন আগাগোড়া সাক্ষাৎ যেন একটা ননির পুতুল, একটু ছুঁয়ে দিলেই গলে যাবে। ছোট হাতের কব্জিতে দুটো ছোট ছোট রুপোর চুড়ি। কথা স্থির দৃষ্টিতে বাচ্চাটাকেই দেখে চলেছে। হঠাৎ মায়াপরীটা খিলখিলিয়ে হাসল। কথার বুকের মধ্যে এতলক্ষণ ঢাবিয়ে রাখা গ্লানি, কষ্ট, হতাশা, আক্ষেপ গুলো নিমিষে ধসে পড়ল বাচ্চা মেয়েটার মুক্তো ঝরা হাসিতে। ধরা গলায় বড্ড মায়া নিয়ে ডাকল,
- স্নিগ্ধতা! সোনা মা আমার!
কথার আদুরে ডাকে বাচ্চাটা তরিৎ চোখ ফেরায়। কথাকে দেখেই টকটকে গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁটযুগল প্রসারিত করে আদো স্বরে টেনে টেনে ডাকল,
- মাম্মা!
চলবে
কলমেঃআফসানা শোভা
সূচনা পর্ব
★