পর্বসংখ্যা:১৬
লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী
বিকেল নামবার আগেই কায়েশী বড় টিফিন বক্সটায় যত্ন করে খাবার সাজিয়ে নিলো। প্রতিটা পদে ছিলো কায়েশীর যত্ন মাখা ভালোবাসা। কায়েশীর মানুষকে রান্না করে খাওয়াতে খুব ভালো লাগে। সে প্রচুর তৃপ্তি পায় এতে যদি কেও তার রান্না পেট ভরে খায়। তাও আজ তো এই খাবারগুলো তার প্রিয় মানুষটির জন্য। তাই ভালোলাগার পরিমাণ সীমাহীন। যদিও সেই মানুষটির থেকে প্রসংশা পাওয়ার আশাও করে না কায়েশী। তবুও নিজের তৃপ্তিতে রান্না করে খাওয়াবেই।
কায়েশীর জীবনে আপন বলতে তিনকুলে কেউ নেই। তার জন্মের পর কেও তাকে অনাত আশ্রমে রেখে এসেছিলো, খোঁজ নিয়ে এতটুকুই জানতে পেরেছে কায়েশী। খুব ছোটবেলায় এক বিধবা নারী তাকে অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছিলেন। সেই নারীকেই কায়েশী মা বলে জেনেছে, মেনেছে পৃথিবীর সবটুকু আশ্রয় হিসেবে। যদিও খুব একটা আরামদায়ক জীবন ছিলো না ঠিকই, তবে সেই পালিত মায়ের স্নেহে কোনো অভাব বোধ করেনি সে। দরিদ্র হলেও কায়েশী ভালো ছিলো। কায়েশী সবসময় ভাবতো মাথার ওপর একটা ছাদ আছে, পেটে দু’মুঠো ভাত আছে। এর চেয়ে বেশি আর কীই বা চাই জীবনে! কিন্তু বিপর্যয় নেমে আসে তার পালিত মায়ের মৃত্যুর পর। তখন কায়েশীর বয়স মাত্র ষোলো। কি করবে না করবে ভেবে পায় না। তখন থেকে একদম একা হয়ে যায় কায়েশী। হঠাৎ করেই পৃথিবীটা তার জন্য অন্ধকারময় হয়ে যায়। তবে মৃত্যুর আগে কায়েশীর মা ছোট্ট বাড়িটুকু কায়েশীর নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন বলে অন্তত মাথার ওপরের ছাদটা অটুট ছিল। সামান্য জমানো টাকা ছিল তাঁর মায়ের। সেই টাকাতেই প্রতিবেশীর সহায়তায় কায়েশী শুরু করে একটি ছোট অনলাইন ব্যবসা। জামাকাপড় আর মেয়েদের জন্য হাতে বানানো বিভিন্ন অলংকার। ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে সে। এভাবে নিজেকে সাবলম্বী করে তোলে। পড়াশোনাও চালিয়ে যায় এর পাশাপাশি। মাসের খরচ চলে যায় ভালোভাবেই।
এদিকে যুবতী মেয়ে, একা থাকে। সমাজের চোখে ব্যাপারটা সহজে ভালো ঠেকে না। কটু কথা, বাঁকা দৃষ্টি কম আসেনি। কিন্তু সমাজ কি তার পেটের ভাতের যোগান দেবে? তাকে আশ্রয় দেবে টাকা ছাড়া? নাহ! কিন্তু কায়েশীর সৎ পথে রোজগার করা দেখে একসময় মানুষের মুখও বন্ধ হয়ে যায়। দেখতে দেখতে কেটে যায় তিনটি বছর। কায়েশীর বয়স এখন উনিশ।
এইভাবেই চলছিলো তার জীবন। এর মধ্যেই বছর দুয়েক আগে এক ভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ধীরে ধীরে তাকে চেনা, জানা। লোকটা ঘাড়ত্যাড়া, বদমেজাজি প্রকৃতির। কথায় কথায় ঝগড়া করা স্বভাব। কিন্তু মনটা বিশুদ্ধ, পরিষ্কার। মানুষ হিসেবে খাঁটি। একই এলাকায় থাকার দরুন সাধারণ কথাবার্তা থেকেই বন্ধুত্ব। দু’ বছরে তারা হয়ে ওঠে খুব ভালো বন্ধু। যদিও এই বন্ধুত্বটা আগলে রাখে মূলত লোকটাই। কায়েশী তো অনেক আগেই অনুভুতির ব্যাড়াজালে নিজেকে জড়িয়েছে। নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েও দিয়েছে। কিন্তু প্রতিউত্তরে লোকটা নিরুত্তরই থেকেছে। আগে কষ্ট হতো, এখন আর কায়েশীর এসবে খুব কষ্ট হয় না। অভ্যেস হয়ে গেছে বোধহয়।
চিন্তার ঘোর কাটিয়ে টিফিন বক্স বন্ধ করে বাড়ির দরজায় ছিটকিনি লাগায় কায়েশী। পাড়ার দক্ষিনের বড় পুকুরপাড়ে আজ দেখা করার কথা তাদের। সময়মতো পৌঁছে সে বড় গাছটার পাটায় বসে অপেক্ষা করতে থাকে কাঙ্খিত মানুষটির জন্য। সময় গড়ায় ধীরে। আধঘণ্টা পরে অবশেষে দেখা মেলে তার, যার জন্য এই অপেক্ষার প্রহর গুনছিলো কায়েশী।
আসা মাত্র কায়েশীর পাশে ধপ করে বসে পড়ে কাবির। শরীরটা ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কাজ থেকে ফিরেছে, ক্লান্ত চোখে তার ছাপ স্পষ্ট। ওল্ফ কাট চুল ভেজা ভেজা লাগছে, নিশ্চয়ই এই ছেলে পানি দিয়ে আবার চুল ভিজিয়েছে ব্যাক সাইডে নিতে। তাই কপালে ঘামের বিন্দু বিন্দু ফোঁটা জানান দিচ্ছে কাবিরের ক্লান্তির মাত্রা। আবার অল্প গোফ রেখেছে কাবির। খাড়া নাক, দৃঢ় চোয়াল, ধুসর চোখ এসবে কার সাথে যেন চেহারার মিল পেলো কিন্তু কার মনে পড়লো না কায়েশীর। যাগগে, অনেকদিন পর দুজনের আজ দেখা হয়েছে। তাই কায়েশী খুটিয়ে খুটিয়ে কাবিরকে পরোখ করছিলো। কাবির দেরি করেছে আসতে তা মনে পড়তেই কায়েশী মেকি রাগ দেখিয়ে বলে,
“আজও তুমি লেট, কাবির। কখনো তো সময়ে আসো!”
কাবির হালকা হেসে জবাব দেয়,
“প্রেমিকা প্রেমিকা ভাব নিলেই চলবো খালি! অপেক্ষা করা লাগবো না! নাহলে কিসের প্রেমিকা?”
কায়েশী চোখ বড় বড় করে তাকায়,
“তুমি আমাকে প্রেমিকা মানলে কবে?”
ভাবলেশহীন গলায় কাবির বলে,
“মানি নাই তো! তবে একটা সত্যি কথা কই রাগ কইরো না। তোমারে দেখলে আমার বইন বইন ফিল আসে, সিরিয়াসলি! এইডা কি আমার দোষ, কও?”
এই বলে হু হু করে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে কাবির।
কায়েশীর চোখে হতাশার ছায়া নামে। সে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“তুমি আর তোমার ফিলিংস! শোধরাবে না কখনো, তাই না?”
“নোপ!”
কায়েশী আর কিছু না বলে টিফিন বক্স খুলে দেয়। তারপর কাবিরের হাতে দিয়ে বলে,
“নাও। কষ্ট করে রেঁধে এনেছি। আজ আর তোমায় বাসায় গিয়ে রাঁধতে হবে না। শুরু করো, এমনি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।”
কাবির তাকিয়ে একপল দেখলো কায়েশীকে। এই মেয়েটার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই সে অবাক হয় বারবার। এতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কীভাবে হতে পারে? বিনিময়ে কাবির তো কিছুই দিতে পারেনি তাকে। তবুও কায়েশী তাকে মারাত্মক ভালোবাসে, সেটা সে জানে, অনুভব করে। কিন্তু কাবিরের মনে কোনো অনুভূতি জন্মায়নি এখনো। কেন জন্মায়নি! অনুভূতি কি জোর করে বানানো যায়? গেলে সে বানাতো। সে সবসময় সত্যটাই বলেছে কায়েশীকে, মিথ্যা সম্পর্ক সে চায় না। কায়েশীও বলে, সময় লাগবে হয়তো। আর বিয়ের কথা উঠলে কাবির অবশ্যই চোখ বন্ধ করেই কায়েশীর নাম নেবে। কারণ যে তাকে এতটা নিঃস্বার্থ ভালোবাসে, তাকে হারানোর প্রশ্নই ওঠে না। হয়তো সময় এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কাবিরেরও অনুভুতি জন্মাবে। ভাবনার মাঝেই খাওয়া শুরু করে কাবির। খেতে খেতে কাবির জিজ্ঞেস করে,
“তুমি খাইছো?”
কায়েশী তো কাবিরকে দেখছিলো। কাবিরের প্রশ্নে মাথা নাড়ায় কায়েশী। অর্থাৎ, খায় নি সে। কাবির জানতো! তাই নিজের খাবার থেকে এক খাবলা তুলে তাকে খাওয়াতে গেলে কায়েশী মাথা সরিয়ে নিয়ে বলে,
“আরে! এইভাবে খাবলা দিয়ে ভাত খাওয়াবে নাকি! কমাও ওখান থেকে। অর্ধেক দাও।”
কাবির সত্যি এক খাবলা ভাতই তুলে ধরেছিলো খাওয়াতে। আসলে কাবির নিজেও ওভাবেই খায়। কাবিরের খাওয়ার ভঙ্গি এমনই। ওর খাওয়ার স্টাইল খুবই বাজে! তাই কায়েশীর জন্য ভাত কমিয়ে অল্প করেই খাইয়ে দিলো কাবির। কায়েশী খেতে খেতে বলে,
“আচ্ছা, আমি পার্মানেন্টলি কবে থেকে তোমার জন্য রাঁধবো? আর তুমি কবে থেকে আমাকে পার্মানেন্টলি খাওয়াবে?”
কাবির হাসে,
“ভাইজানের বিয়ার আগে তো আমি বিয়া করতে পারুম না। ভাইজান বিয়া করুক, তারপর তোমার কথা বলমু।”
বিরক্ত স্বরে কায়েশী বলে,
“তোমার দাম*ড়া ভাই নিজেও বিয়ে করছে না, আমারটাও হতে দিচ্ছে না! খুব রাগ হচ্ছে তার ওপর!”
কাবির অবাক হয়ে যায়।
“এই, এক মিনিট! তুমি বিয়ার জন্য এতো ফাল পারতাছো ক্যান? পড়াশোনার ইচ্ছা নাই নাকি?”
কায়েশী মুচকি হেসে নিজেও কাবিরের মুখে এক খাবলা ভাত ঢুকিয়ে দিয়ে বলে,
“মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি! আমার তো উনিশ চলছে। এখনই পারফেক্ট টাইম। আর পড়াশোনা তো লোক দেখানো। আমার উদ্দেশ্য তো তোমাকে বিয়ে করা।”
এই বলে কায়েশী এবার শব্দ করে হেসে ওঠে। কাবির অবিশ্বাস্য ভঙ্গিমায় মাথা নেড়ে বলে,
“আমার সাথে থাইকা জাওরা হইতাছো দিন দিন। ভালো হও, ভালো হইতে পয়সা লাগে না। ”
“হ্যাঁ, তুমি তো খুব ভালো! আসছে আমাকে জ্ঞান দিতে!”
এই বলে উঠে দাঁড়ায় কায়েশী। হাত ধুয়ে বলে,
“বাকিটা খেয়ে টিফিন বক্স ধুয়ে আমার বাসায় দিয়ে আসবে। এবার আমি উঠি। আজ অনেক পার্সেল রেডি করতে হবে। বাই। ”
কাবির নিজেও হাত নেড়ে বিদায় জানায়। এরপর খাওয়া শেষ করতে থাকে সে। কিন্তু মনোযোগ বর্তমানের খাওয়াতে নয়, ভবিষ্যতের অনড় চিন্তায় আটকে যায় সে।
——————————————
বাজার থেকে ফিরতে ফিরতেই কায়েশীর প্রায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার হয়েছে। পার্সেলের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস কিনতেই দেরি হয়ে গেলো। সদর দরজার সামনে এসে পা রাখতেই সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। বুকের ভেতর কেমন একটা ধক করে উঠলো। দরজাটা সম্পুর্ন উন্মুক্ত ছিলো। পুরোপুরি। কিন্তু এ কিভাবে অসম্ভব! কায়েশীর স্পষ্ট মনে আছে
আসার সময় সে নিজ হাতে সব দরজা বন্ধ করে গিয়েছিলো। সে আরও এক ধাক্কা খেলো যখন দেখলো ভেতরের ঘরের দরজাটাও উন্মুক্ত। অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেমন করে উঠলো। মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো, আবার চোর এলোনা তো? তাই আর দেরি না করে ধরফরিয়ে প্রায় দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটলো কায়েশী। দরজার ভেতরে পা রাখতেই সে যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো।
একটি চেয়ারে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে কায়রাভ। হাঁটুর ওপর এক পা তুলে অলস ভঙ্গিতে দোলাচ্ছে। চারপাশে দু-তিনজন অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে। তাদের সামান্য কথপোকথনে উপস্থিতিটা ভারী। কায়রাভ কায়েশীকে দেখামাত্র ঘাড়টা সামান্য কাত করলো, ঠোঁটের কোণে একপেশে হাসি ফুটে উঠলো। যেনো ওরই অপেক্ষা করছিলো এতক্ষন।
এই মানুষটাকে দেখলেই কায়েশীর ভেতরটা জ্বলে ওঠে। সেদিনের ঘটনার পর থেকে তার প্রতি বিরক্তি রাগে পরিণত হয়েছে। আজ আবার দলবল নিয়ে তার ফাঁকা বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। সাহস কত! রাগ হওয়াই স্বাভাবিক। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“এভাবে ফাঁকা বাড়িতে দলবল নিয়ে ঢোকার মানে কী? ভোট চাইতে এসেছেন নাকি? তাহলে পরিষ্কার করে বলে রাখি, জীবনেও আমি আপনাকে ভোট দেবো না।”
কায়রাভ উঠে দাঁড়ালো। মুখে সেই অদ্ভুত শান্ত হাসি, কায়েশীর কথার কোনো তাপ তাকে ছুঁতেই পারলো না। হাসিমুখেই বলল,
” নাহ, তোমার কাছে ভোট চাইতে আসিনি।”
একটু থেমে বলল,
” ক্ষমা চাইতে এসেছি। ”
কায়েশীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
” ক্ষমা? সেটা কিসের জন্য? ”
কায়রাভের ঠান্ডা গলায় বলল,
“ওইদিনের কথা মনে আছে? বিনা অনুমতিতে তোমার হাত ধরায় তুমি থাপ্পড় মেরেছিলে। বিশ্বাস করো, ওই এক চড়েই আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি আমার ভুলের জন্য ভীষন অনুতপ্ত। তাই ভাবলাম তোমার কাছে ক্ষমাটা চেয়ে নেই। ”
কায়েশীর মনটা কেমন যেন অস্বস্তিতে ভরে উঠলো। কায়রাভের কথাগুলো স্বাভাবিক শোনালেও কোথাও যেন একটা অদৃশ্য ফাঁক রয়ে যাচ্ছে। কায়েশী কায়রাভের এমন কথায় কেন জানি অন্য মানে পাচ্ছে। স্বাভাবিক লাগছে না কিছু। তবু নিজেকে বোঝালো, চোখ নামিয়ে নরম গলায় বলল,
“আমার পক্ষ থেকেও আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ওভাবে জনসম্মুখে থাপ্পড় মারা উচিত হয় নি। সেদিন আমি একটু বেশি রুড হয়ে গিয়েছিলাম।”
কায়রাভ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
“আরে তুমি কেন ক্ষমা চাইছো? তুমি যা করেছো একদম ঠিক করেছো। অবশ্যই ওভাবে তোমার হাত ধরা আমার উচিত হয় নি। আমারই ভুল ছিলো। আরেকটা কথা, হয়তো তুমি জানো না কিন্তু ইতিমধ্যেই তোমাকে-আমাকে জড়িয়ে বিপরীত দল নানান কাহিনি রটাচ্ছে। এসব ভবিষ্যতে তোমার-আমার জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।”
কায়েশীর মুখের রং নিমেষে বদলে গেল। কায়েশী ভয়ার্ত গলায় বলে,
“কিহ! কাহিনি রটিয়েছে মানে? এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে কি কাহিনি বানাচ্ছে?”
কায়রাভ গভীর চোখে কায়েশীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“মাঝে মাঝে সামান্য ব্যাপারের অনেক বড় মূল্য চোকাতে হয়, কায়েশী।”
কায়রাভের কথা শুনতে পেলেও তা নিয়ে আপাতত ভাবছে না সে। কায়েশীর চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে সেটা নিজ ভাবনায়। এই ভয়টা প্রতিটা মেয়েরই। একবার বদনামের ছোঁয়া লাগলে তা সহজে মুছে যায় না। কায়রাভ তা লক্ষ করে কণ্ঠ নরম করে বলে,
” চিন্তা করো না। ভুল তোমার ছিলো না। আমারই ছিলো। তাই সেই ভুল শোধরানোর দায়িত্বও আমার। ”
কায়েশী বিধ্বস্ত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” কীভাবে?”
কায়রাভ ফিরোজের হাতে থাকা শপিং ব্যাগ দুটো নিয়ে কায়েশীর হাতে তুলে দিলো। তার ঠোঁটের কোণে হালকা একচিলতে হাসি,
“এখানে শাড়ি-গয়না আছে। এবার ভালো মেয়ের মতো তৈরি হয়ে নাও। বিয়ের জন্য।”
কায়েশীর ভেতরে জমে থাকা রাগ এবার বাঁধ ভাঙলো। আর নিজেকে সামলাতে পারলো না সে।
একজন মানুষ খারাপের শেষ সীমানায় পৌঁছালে ঠিক কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে আজ কায়েশী তা নিজের চোখে দেখলো এই লোকটার মাঝে। মুহুর্তেই শপিং ব্যাগ দুটো ছুড়ে ফেলল মাটিতে। এক ঝটকায় কায়রাভের পাঞ্জাবির কলার মুঠোয় চেপে খামচে ধরে চিৎকার করে উঠলো,
“এইটাই ছিল তোর আসল উদ্দেশ্য! তাই এতক্ষণ কথা ঘুরিয়ে-পিছিয়ে বলছিলি? অভিনয় করছিলি আমার সাথে!”
এই কথাতেও কায়রাভের ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা সেই গা-জ্বালানো হাসিটা একচুলও নড়লো না। বরং আত্মতৃপ্ত কণ্ঠে বলল,
“আমি কোথায় কথা ঘুরালাম? আমি তো পরিস্থিতি বোঝালাম তোমায়। আর বিয়ের প্রস্তাব, ওটা তো একদম সোজাসাপ্টাই ছিল। আসলে কী জানো, তোমার সেই থাপ্পড় খাওয়ার পর থেকে না… আই ফিল সামথিং।”
কায়েশী উন্মাদপ্রায় হয়ে ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠলো,
“তুই কী করে ভাবলি আমি তোকে বিয়ে করবো! তাও তোর মতো জানোয়ারকে!”
এই বলে একরাশ ঘৃণা নিয়ে থুথু ছুড়ে মারলো সে। তা গিয়ে লাগলো কায়রাভের চোয়াল বরাবর। কায়রাভের মুখ কুচকে উঠে তখন। কায়রাভ কায়েশীর হাত থেকে নিজের কলার ছাড়ালো অতি সন্তপর্ণে। এতক্ষনে অন্য মেয়ে হলে কি করতো কায়রাভ নিজেও জানে না। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে গাল মুছতে মুছতে বলল,
“ট্রাস্ট মি, কায়েশী। আমি তোমাকে বোঝাতেই এসেছিলাম। কিন্তু এখন তো তুমি আমার জেদটাকে দশগুণ বাড়িয়ে দিলে!”
পরের মুহূর্তেই কায়েশীকে কাঁধে তুলে নিলো কায়রাভ। কায়েশীর শত চিৎকার, কিল-ঘুষি, কান্না কিছুই কাজে এলো না। পাষাণের মন গললো না একটুও। শত আটকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো সে। কায়রাভ সোজা গাড়িতে তুলে নিয়ে গেলো কাজি অফিসে। এমনকি কায়রাভ এতটাই তারাহুরোয় ছিলো যে ধৈর্যহীনতায় দরজা খোলার বদলে লাথি দিয়ে ঢুকেছে দরজা দিয়ে।
কায়েশী সেখানে গিয়েও যে তাণ্ডব চালাবে, তা কায়রাভ জানতো। তাই আগেভাগেই বন্দি করে রেখেছিলো তার বান্ধবীকে। ফোন বের করে সেই ভিডিও দেখিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“বিয়ে তোমার আমাকেই করতে হবে। আজ না হলে কাল। কিন্তু আজ না হলে মাঝখান থেকে শুধু প্রাণটাই যাবে তোমার বান্ধবীর। বিশ্বাস করো আমি এটা চাই না।”
এইবার কায়েশী সত্যিই ভেঙে পড়ল। নিঃশেষ হলো সে। বড্ড বিধ্বস্ত লাগছিলো তাকে। কান্নাভেজা চোখে সবুজের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“আপনার বোনকেও যদি তুলে এনে বিয়ের জন্য জোর করা হতো, তবুও কি আপনি এভাবে চুপ থাকতেন? একটুও কি মায়া লাগছে না আমার উপর!”
সবুজ একটু অপ্রস্তুত হলো। তারপর গম্ভীর মুখে বলল,
“প্রথমত, আমার কোনো বোন নাই। আর থাকলেও তুইলা আনতে হইতো না। ভাই যে মানুষ, আমি নিজে দাঁড়ায় থাইকা বিয়া দিতাম। সত্যি কইতাছি ভাবি, রাজি হইয়া যান। ভাই খারাপ না। সে আপনারে বহুত ভালোবাসে।”
প্রতিক্রিয়ায় কায়েশী তেড়ে যেতে চাইলে কায়রাভ তাকে আটকে দিলো। সবুজ ভয় পেয়ে ফিরোজের আড়ালে লুকালো। এই ক্ষ্যাপা মহিলাকে তার প্রচন্ডরকমের ভয় করে। কায়েশী গর্জে উঠে বলল,
“আমারই ভুল ছিলো তোদের কাছে সাহায্য চাওয়া! তোরা সবাই যে তোদের ভাইয়ের পা-চাটা কু*ত্তা, তা আমি ভুলে গেছিলাম!”
কায়রাভ ধমকে উঠে বলল,
“চুপ করো! সবুজ তোমার থেকে অনেক বড়। এভাবে তুই তোকারি করতে পারো না ওকে।”
কায়েশী রাগে কষ্টে ভেতরে ভেতরে ফোপাচ্ছে। এইসব দৃশ্য দেখে পাশ থেকে কাজি বললেন,
“এভাবে তো বিয়ে পড়ানো যায় না। জোর করে কি বিয়ে হয়?”
কায়রাভের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কাজির মুখ বন্ধ করে দিলো তৎক্ষনাৎ। শেষবারের মতো কায়েশী কায়রাভের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটা থাপ্পড়ের প্রতিশোধ এভাবে নিলেন? এর বদলে দশটা চড় মারতেন! কিন্তু আমাকে তো আপনি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিলেন!”
কায়রাভ নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল,
“ধ্বংস করিনি। এটা সুচনা, আমাদের সুচনা। ”
কায়েশী গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরে একফোঁটা। অস্ফুটে বলল,
“আ…আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি।”
এমন কথায় কায়রাভের মুখে আশ্চর্যজনকভাবে কোনো বিস্ময় ফুটে উঠলো না। যেন খুব স্বাভাবিক কথা শুনলো। কায়েশীর দিকে এগিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে তার গালের অশ্রুর ফোঁটাটুকু মুছে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“বিয়ের আগে ওসব ভালোবাসা টালোবাসা বলে কিছু হয় না। ওসব হচ্ছে ক্ষনিকের আবেগ। সত্যিকারের ভালোবাসার জন্ম হয় কবুল বলার পর।”
সবুজ পাশে দাঁড়িয়ে সায় দিলো,
“ঠিক কইছেন, ভাই। আমাগো পাড়ায় কত দেখি কিছু বাপরা মেয়াগো প্রেমিকের থেকে আলাদা কইরা জোর কইরা বিয়া দিয়া দেয়। মেয়ারা হাজার কান্নাকাটি করে বিয়ার দিন পর্যন্ত। অথচ, বছর যাইতে না যাইতেই জামাইসহ নাচতে নাচতে বাচ্চা নিয়া হাজির হয়। তাইলে বুঝেন কিসের ভালোবাসা আছিলো!”
এসব শুনে মুখে ক্রুর হাসি ফুটলো কায়রাভের মুখে। আর কায়েশী অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালে সবুজ আবার ফিরোজের আড়ালে লুকালো। ফিরোজ ফিচেল হাসলো। কায়রাভ আর কোনো কথা বলল না। কায়েশীকে জোর করে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিলো। এবার কায়েশী শরীর ছেড়ে দিয়েছে। লড়াই করার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। ও বুঝে গেছে আর কোনো উপায় নেই, কিছুই করার নেই তার। এবার সব শেষ হয়ে যাবে, সব।
শপিং ব্যাগ থেকে বিয়ের ওড়না বের করে নিজ হাতে কায়েশীর মাথায় পরিয়ে দিলো কায়রাভ। এরপর কাজি বিয়ে পড়ালেন। কাজির কণ্ঠে ভেসে এলো কিছু বাক্য। সে শব্দগুলো বাতাসে ভাসলো। অথচ কায়েশীর কানে পৌঁছালো শূন্যতার মতো। যা সম্পুর্ন অর্থহীন, অনুভূতিহীন। নিকাহনামায় কায়রাভ স্বাক্ষর করে কায়েশীর দিকে এগিয়ে দিলো, আর হাত দিয়ে ইশারা করলো কায়েশীকে স্বাক্ষর করতে। কায়েশী জীবন্ত লাশের ন্যায় স্বাক্ষর করেও দিলো। সেদিন কায়রাভের জীবনে শুরু হলো নতুন অধ্যায়। আর কায়েশীর মনে হলো, তাকে সাজিয়ে, গুছিয়ে, নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হলো বিয়ের নামে। প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের মাঝে লুকিয়ে ছিলো তার অপ্রকাশিত, বুকভরা আর্তনাদ। সে শব্দ কেও শুনতে পেলো না। কাওকে দেওয়া কথা রাখতে পারলো না সে। নিজের ভালোবাসার বলি চড়ালো। তার ইচ্ছেগুলোকে শৃঙ্খল ভাবে, নিখুঁত পরিকল্পনায় ছিন্নভিন্ন করা হলো। একটি জীবনকে সামাজিক স্বীকৃতির মোড়কে মুড়ে নিষ্ঠুরভাবে বিধ্বংস করে দেওয়ার একটি সুন্দর নাম মাধ্যম পেলো সে, বাধ্য হয়ে করা বিয়ের।
~ অতীত সমাপ্ত ~
*************************************
~ বর্তমান ~
কায়রাভ দেয়ালের কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ভরা স্মৃতি আর পুরনো ভাবনার ঘোরে ডুবে সে। কায়েশীকে এক পল দেখে ভাবলো, আজকের কায়েশী আর আগের কায়েশীর মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। কায়েশীর রাগ অনেকটা কমে গেছে, ধৈর্য্য বেড়েছে। এখন আগের মতো ছেলেমানুষী স্বভাবটাও নেই, বেশ ম্যাচিউরড আচরণ প্রকাশ পায়।
এদিকে কায়রাভকে একমনে তাকিয়ে থাকতে দেখে কায়েশী নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কি ভাবছেন এতক্ষণ? জগ খালি হয়ে গেছে। পানি ভরে আনুন, পানি লাগবে।”
কায়রাভ হঠাৎ তার ভাবনার জাল ছেড়ে বেরিয়ে এসে কায়েশীর কথামতো গিয়ে জগে পানি ভরে আনে। সেই সময়ে ফিরোজ আর সবুজ ধীরে ধীরে এসে পৌঁছায়। তারা ড্রয়িং রুমের কোণে বসে কথাবার্তা বলছে। বাকিরাও আসবে।
কায়েশী রান্নাঘরে কাজ করেই চলেছে। বসার ফুসরত নেই তার। রান্নাও প্রায় শেষের দিকে। আর কায়রাভ এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে, মাঝে মাঝে বিরক্তও করছে। এদিকে কায়েশী ভাবছে কি অদ্ভুত মানুষ! একটুখানি স্থির হয়ে বসার নাম নেই। এই পেছন পেছন ঘুরছে, আবার এই সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। আশ্চর্যজনক কাজ-কারবার! কায়েশী কণ্ঠে বিরক্তি ঢেলে বলল,
“এভাবে পেছন পেছন ঘুরে জ্বালাচ্ছেন কেন? এক জায়গায় বসতে পারছেন না স্থির হয়ে?”
হঠাৎ চোর ধরে পরার মতো করে খানিকটা হকচকিয়ে গেলো কায়রাভ। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সে বলল,
“আমি তো… তোমাকে হেল্পই করছিলাম।”
কায়েশী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কপাল ভাঁজ হয়ে চোখে অবিশ্বাসের রেখা দৃঢ় হলো। অবাক হয়ে বলল,
“হেল্প! ঠিক কী ধরনের হেল্প বলুন তো? কখনো চুল খুলে দিচ্ছেন, কখনো আবার শাড়ির আঁচল ধরে টানাটানি করছেন! এসব হেল্প?”
কায়রাভ হেসে উঠলো। কায়েশীর সেসব কথার জবাব না দিয়ে উল্টো কায়েশীর দু-হাত ধরে কাছে টেনে নিলো। তারপর আশেপাশে সর্তকতার সহিত তাকিয়ে কায়েশীর গাল আলতো করে টেনে দিয়ে শব্দ করে চু’মু খেয়ে এক নিঃশ্বাসে বলল,
“এতো রেগে যাচ্ছো কেন? রাগ করলে তো আরও কিউট লাগে! আচ্ছা ওসব ছাড়ো, একটা ইম্পর্টেন্ট কথা শোনো। বিষয়টা হচ্ছে তুমি গলছো, কায়েশী। ইউ আর জাস্ট…স্লোলি মেল্টিং… ইন দ্য ওয়ার্মথ অফ মাই লাভ।”
কথাটা বলে আর এক মুহুর্ত রান্নাঘরে দাঁড়ালো না কায়রাভ, ছুটে বেরিয়ে গেলো রান্নাঘর ছেড়ে। কারণ, এখানে আর এক সেকেন্ড দাঁড়ালে এই মেয়ে নিশ্চিত চিল্লাপাল্লা শুরু করবে! আপাতত ভরা বাড়িতে মান সম্মান খোয়াতে চায় না সে। এদিকে এসব কান্ডে কায়েশী মুহূর্তের জন্য নির্বাক। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে আছে এখনো। ঘোর ছেড়ে বেরোতে পারেনি। তবে আজ কায়রাভের এমন কাজে চেঁচায়ও নি। কেন, কি কারণে জানে না সে। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারছে কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে আস্তে আস্তে। আনমনে নিজের ডান হাত উঠিয়ে গালে ছোঁয়ায় কায়েশী। ঠোঁটের কোণে আটকে থাকা শব্দ অস্ফুটে বেরিয়ে এলো কোনোভাবে,
” আসলেই…! ”
#চলমান…….
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]