গল্প: অমৃত তোকে চাই (১৪)

লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা
পর্ব:১৪

চারজন হাসপাতাল থেকে বের হয়।
রাস্তায় প্রচুর জ্যাম, তার কারণ হাসপাতাল। হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট, অ্যাম্বুলেন্স, প্রেসিডেন্টের পরিবার তাকে দেখতে এসেছে, সিকিউরিটি—সব মিলিয়ে এক বিরক্তিকর পরিস্থিতি।
চারজন একসঙ্গে রাস্তা পার হয়। দুটো রাস্তা পাশাপাশি, তারপর স্বপ্ন নীল নীড় মল।
চারজন রাস্তা পার হয়ে মলের সামনে দাঁড়ায়।
মলটা পুরো কাঁচের, বাইরের ডেকোরেশন খুব সুন্দর। গেটের ওপর বড় করে লেখা—”স্বপ্ন নীল নীড়”। চারপাশে মানুষ আসছে—কেউ শপিং করতে, কেউ প্রেমিক-প্রেমিকা নিয়ে আড্ডা দিতে, আবার কেউ পরিবার নিয়ে কেনাকাটা করতে। সবাই যেন নিজের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত।
তারা গেটের সামনে আসতেই সিকিউরিটি গার্ড উঠে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে দেয়। রিক্তা প্রথম ঢোকার জন্য পা বাড়ায়।
রিক্তার হাতে পাথরের সেই ব্রেসলেটটা, যেটা রিয়া দিয়েছিল সেটা দেখে গার্ডটা তাকে স্যালুট করে। আচমকা রিক্তা ভয় পেয়ে যায়। সাথে বাকিরাও।
রিক্তা কিছু বলে না। ভাবে এটা হয়তো নিয়ম। তাই বেশি গুরুত্ব না দিয়ে চারজন ভিতরে ঢোকে।
বড় গ্লাসের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা এয়ারকন্ডিশনের বাতাস মনে হলো যেন অন্য এক জগৎ।
আরশি হাত দুটো ছড়িয়ে বলে „“আহহ! জীবন! কী শান্তি লাগছে!”
নাহিদা বলে„“এই জন্যই মল ভালো লাগে। এসি থাকে, অলটাইম ফিলিংসটাই আলাদা।”
শিখা নরম স্বরে শুধায় „“এই মলে আমরা প্রায়ই আসি। এখানে সবার ব্যবহার ভালো। কিন্তু বাইরের গার্ডটার ব্যবহার আজ একটু অদ্ভুত লাগল। আগে তো এমন করত না।”
নাহিদা বলে„“বাদ দে, হয়তো নতুন নিয়ম।”
„“হুম, এখন চল আগে কোল্ড ড্রিংকস খাই।”

তারা ফুড কোর্টে গিয়ে এক কোণের টেবিলে বসে। একজন ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করে „“হ্যালো ম্যাম, আপনাদের কী লাগবে?”
লোকটা কথা শেষ করেই মাথা নিচু করে রিক্তাকে সালাম করে।
রিক্তা বিভ্রান্ত হয়ে যায়। শিখা, নাহিদা, আরশিও অবাক।
রিক্তা কিছু বলতে যাবে, শিখা থামিয়ে বলে„“চারটা কোল্ড ড্রিংকস আর কিছু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিন।”
লোকটা “আচ্ছা” বলে চলে যায়।
লোকটা যেতেই নাহিদা বলে„“ আমার মনে হচ্ছে রিক্তা খুব ফেমাস কেউ! যেখানে যায়, সবাই স্যালুট করে! আর কিছুদিন পর ভাব বেড়ে যাবে!”
আরশিও মজা করে বলে„“ বিগ ফ্যান, রিক্তা বেবি গার্ল!”
রিক্তা চোখ রাঙিয়ে বলে„“ আমার সাথে ফাজলামি হচ্ছে?”
নাহিদা অবুঝ ভাব নিয়ে„“ ও মা! সেলিব্রিটি বেবির সাথে ফাজলামি করা যায়? পরে দেখা যাবে তার ফ্যানরা এসে আমাকে কেলাবে!”
„“দেখ নাহু, মজা করিস না।”
„“তোর সাথে মজা হাও ফান!”
„“হইছে, নাহিদা আর জ্বালাস না।”
নাহিদা শিখার কানে ফিসফিস করে„“ ওকে রাগাতে খুব ভালো লাগে।”
„“আর ওর রাগও খুব সুন্দর।”
তাদের কথার মাঝে ওয়েটার খাবার সাফ করে যায়। সুন্দর করে সাজিয়ে বলে„“ ম্যাম, আরও কিছু লাগলে বলবেন।”
এই বলে ওয়েটার চলে যায়। তারাও খেতে শুরু করে।
নাহিদা স্ট্র দিয়ে জুস খেতে খেতে বলে„“ তো বল, ডাক্তার সাহেব নিজে চশমা পরিয়ে দিল অনুভূতি কেমন?”
রিক্তা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে খেতে বলে„“ নরমাল।”
আরশি চিৎকার করে„“এই মিথ্যা বলার জন্য আলাদা শাস্তি হওয়া উচিত!”
শিখাও চেচিয়ে বলে„“অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত!”
রিক্তা বিরক্ত হয়ে বলে„“ মিথ্যা কী বললাম? চশমা পরিয়েছে, অন্য কিছু না!”
নাহিদা ফিসফিস করে„“ লুমিনা আপুকে দেখে কেমন লাগল?”
রিক্তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে„“ ভালো।”
আরশি ভ্রু তুলে বলে„“ শুধু ভালো?”
রিক্তা এবার একটু জোরে„“হ্যাঁ, ভালো!”
কিন্তু তার ভেতরে লুমিনাকে নিয়ে হাজারো প্রশ্ন ঘুরছে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ„“ এই যে… রিক্তা?”
সবাই ঘুরে তাকায়। তাদের দুই টেবিল পরে রিফাত!
রিফাত হাসিমুখে এগিয়ে এসে তাদের কাছে দাড়িয়ে বলে„“ তোমরা এখানে?”
শিখা ভ্রু কুঁচকে„“ আপনি এখানে?”
„“বন্ধুদের সাথে এসেছি।”
রিফাতের চোখ বারবার রিক্তার দিকে যাচ্ছে মিষ্টি করে বলে„“ আপনি কেমন আছেন?”
রিক্তা ছোট করে„“ ভালো।”
আরশি আর নাহিদা একে অপরের দিকে তাকায়।
“চলো না, সবাই মিলে আইসক্রিম খাই।”
শিখা কিছু বলার আগেই রিক্তার ফোন বেজে ওঠে
স্ক্রিনে লেখা “ডাক্তার সাহেব”।
রিক্তা টেবিলের উপর থেকে ফোন নিয়ে কল রিসিভ করে„“ হ্যালো…”
ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ  ভেসে আসে „“কোথায় তুই?”
„“মলে…”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুভ নরম করে বলে „“ রিফাতের সাথে?”
রিক্তা অবাক হয়ে যায়। কানে ফোন রেখে রিক্তা আশে পাশে ভালো করে দেখে কিন্তু পরিচিত কাউকে দেখছে না ওপাশ থেকে আবার মোলায়েম কন্ঠে শুনায় „“ আমাকে খুজছো? ”
„“আপনি জানলেন কিভাবে?”
„“আমি সব জানি। এখনই বাসায় যাবে।”
„“কিন্তু আমরা তো ঘুরতে এসেছি…”
„“ঘোরার সময় অনেক আছে। এখন go to home. okay?”
রিক্তা ছোট করে„“হুম…”
শুভ ফোন কেটে দেয় ।
ফোন কেটে যেতেই রিফাত বলে„ “কি হয়েছে? any problem?”
রিক্তা ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলে„ “না… এখন বাসায় যেতে হবে। শুভ ভাই ফোন করে বলেছে।”
রিফাত একটু অবাক হয়ে শিখার দিকে তাকিয়ে বলে„ “ওনার ভাই শুভ?”
শিখা মাথা নাড়ে বলে „“ হুম। রিক্তার ফিউচার হাজবেন্ড”
শিখার মুখে ফিউচার হাসবেন্ড শুনে রিফাতের মুখ কালো হয়ে যায় „“ওহ… এখনই যাবে? আইসক্রিম খাবে না?”
রিক্তা জোর করে হালকা হাসি দিয়ে বলে „“আজ না… অন্য কোনোদিন।”
“তোমার যেটা ইচ্ছে।”
চারজন উঠে দাঁড়ায় যাওয়ার জন্য
নাহিদা বিরবির করে বলে „“ শালা একটা খবিশ! তার জন্য খাবারটাই শেষ করতে পারলাম না!”
আরশি চাপা হেসে বলে „“চুপ কর, কেউ শুনে ফেলবে!”
রিক্তা কোনো কথা বলে না। তার মনটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে আছে।
রিক্তা বিল দেওয়ার জন্য কাউন্টারের দিকে যায়।
কাউন্টারে অল্প বয়সি একটা মেয়ে ছিলো তাকে রিক্তা বলে „“ চারটা কোল্ড ড্রিংক আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই—কত হয়েছে?”
কাউন্টারের মেয়েটা রিক্তার হাতে থাকা ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে যায়।
তার চোখে এক ধরনের ভিন্ন সম্মান আর ভয় মিশে যায়।সে সাথে সাথে উঠে মাথা নিচু করে সম্মান জানায়। তাকে এমন করতে দেখে বাকি স্টাফ দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়।
তাদের কান্ঠে রিক্তা বিস্ময় হয়ে যায়।

চলবে…..

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x