লেখক:DRM Shohag
পর্ব:০৭
কান্নামাখা গলায় বলা রজনীর কথাটা শুনতে পেয়েছে হৃদয়।
মা’র’বেন না শব্দটা শুনে সে বোধয় রজনীর মনোভাব কিছুটা
আঁচ করতে পেরেছে। তবে তার ধারণা, তখন রজনীকে হাতে
মা’রা’র জন্য রজনী তাকে ভ’য় পাচ্ছে। ব্যাপারটিতে সে বিরক্ত
হলো না, বরং এনজয় করল। দৃষ্টি ঘোরালো রজনীর
সারামুখে। একটু কান্নাতেই মেয়েটার মুখ লাল হয়ে উঠেছে,
বিশেষ করে ফর্সা নাকের পাটা। রজনীর সারা মুখে দৃষ্টি
ঘোরালেও হৃদয়ের মাঝে তেমন কোনো ভাবান্তর হলো না।
কিন্তু যখনই তার দৃষ্টি রজনীর ভেজা টলমলে বাদামি চোখে
পড়ে, সাথে সাথে ছেলেটার গলা শুকিয়ে আসে। হৃদয় শুকনো
ঢোক গিলল। হঠাৎ-ই দাদুর কণ্ঠে হৃদয়ের ধ্যান ঘুরে যায়।
আরমান নওরোজ কথা বলতে বলতে উপরে উঠে আসছেন।
ব্যাপারটি হৃদয় খেয়াল করার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে একটি
রুমাল বের করে। এরপর চোখের পলকে সেই রুমাল হৃদয়
তার ডান হাতে পেঁচিয়ে রজনীর বা হাত তার ডান হাতের
মুঠোয় নিয়ে নেয়। রজনী কিছু বোঝার আগেই হৃদয় বড় বড়
পায়ে রজনীকে টেনে একেবারে তার ঘরের ভেতরে এসে
থামে। এরপর রজনীর হাত ছেড়ে শব্দ করে দরজা আটকে
দেয়৷
হৃদয় যখন রজনীর হাত ধরল, তখন-ই মেয়েটা ভ’য়ের চোটে
একেবারে চুপ হয়ে যায়, অর্থাৎ কান্না থামে। কিন্তু শরীরের
কাঁপুনি বাড়ে। আর এখন তাকে ঘরে এনে হৃদয়ের দরজা
আটকানো দেখে ভীতির কারণে সৃষ্ট ভীতির পরিমাণ কয়েকশ
গুণ বেড়ে যায় রজনীর। বুক ধুকধুক করছে মেয়েটার। হৃদয়
তার সাথে কি করবে? এভাবে একটা রুমে সে আর একটি
ছেলে, কথাটি ভাবতেই রজনীর শরীরের কাঁপুনি বাড়লো তো
বাড়লোই। সে কোনোরকমে হৃদয়কে পাশ কাটিয়ে দরজার
দিকে এগোতে নেয়, তখনই হৃদয় উল্টো ঘুরে দ্রুত রজনীর
একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। রজনীর পা থেমে যায়। মেয়েটার
দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। রজনীর মন বলে ওঠে,
গতরাত থেকে ছেলেটা নিজেকে যেমনটা দেখিয়েছে তা
আসলে মিথ্যা। কারণ এখন তার স’র্ব’নাশ করতে এভাবে
ঘরের দরজা আটকে দিয়েছে। তার স’র্ব’না’শ হয়ে গেলে সে
তার গ্রামে কি করে মুখ দেখাবে? গ্রামের কেউ যদি শোনে সে
আর একটি ছেলে এক রুমে থেকেছে কিছুক্ষণ, তবে তাকেসহ
তার পরিবারকে হয়ত গ্রাম থেকেই তাড়িয়ে দিবে। কথাগুলো
ভেবে রজনী হুট করে আবারও ফুঁপিয়ে ওঠে। হৃদয়ের দিকে
চেয়ে ফোঁপানি কণ্ঠে বলে,
“দয়া করে আমার স’র্ব’না’শ করবেন না।”
কথাটার অর্থ বুঝতে হৃদয়ের এক সেকেন্ডেও সময় লাগলো
না। রজনীর চিন্তাধারায় সে প্রচন্ড বিরক্ত হলো। অতঃপর
হাতের রুমাল ডান পকেটে রেখে, দু’হাত প্যান্টের পকেটে
গুঁজে রজনীর দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“কান্না থামাও। নয়তো এক্ষুনি তোমার সাড়ে স’র্ব’না’শ করব
ম্যানারলেস মেয়ে।”
হৃদয়ের কথা শুনে রজনীর কান্নার বেগ বাড়ে। হৃদয় চরম
বিরক্ত হয়ে রজনীর দিকে এক পা এগিয়ে এসে রজনীর দিকে
সামান্য ঝুঁকে বলে “তুমি মেবি চাইছ, আমি তোমার সাড়ে
স’র্ব’না’শ করি, রাইট? ওকে ফাইন, করছি তোমার সাড়ে
স’র্ব’না’শ। বি রেডি।”
কথাটা শুনে বিস্ময়ে রজনীর চোখের আকার বড় হয়ে যায়।
কান্নার তোড়ে মেয়েটার হেঁচকি উঠে গিয়েছে। হৃদয়ের
চোখমুখ শ’ক্ত হয়ে গেল। অ’সহ্য লাগছে এর কান্না। সোজা
হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“কান্না থামাবে না-কি সাড়ে স’র্ব’না’শ করা স্টার্ট করব?”
রজনী দ্রুত ডানহাতে মুখ চেপে কান্না থামানোর চেষ্টা করে।
মেয়েটা যেমন ভ’য় পাচ্ছে তেমনি গ্রাম থেকে পালিয়ে আসার
দুঃখে ক’ষ্টে বুক ফে’টে যাচ্ছে। তবে মুখ চেপে ধরায় কান্নার
তোড় কমে এসেছে। হৃদয় ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“রিল্যাক্স! তোমাকে তোমার বাসায় রেখে আসবো। কোথায়
তোমার বাসা?”
হৃদয়ের কথায় রজনীর কপালে ভাঁজ পড়ে। মেয়েটার কান্নার
বেগ একেবারে কমে আসে। অবাক চোখে তাকায় হৃদয়ের
দিকে। ভাবে, উনি কি সত্যিই তাকে তার গ্রামে রেখে আসবে?
রজনী মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“নওগাঁর পাহাড়পুর এলাকার মালঞ্চ গ্রামে আমার বাড়ি।”
রজনীর ঠিকানা শুনে হৃদয়ের কপালে এক দীর্ঘ ভাঁজ পড়ে।
অদ্ভুদচোখে তাকায় রজনীর দিকে। এটা তো বৌদ্ধবিহারের
কোল ঘেঁষা একটি গ্রাম। গ্রামটি তার ভীষণ পরিচিত।
বেহিসাব সেই গ্রামে তার যাওয়া হয়েছে। কারণ তার দাদুর বন্ধু
অর্থাৎ নিলয়ের দাদুর বাড়ি মালঞ্চ গ্রামে। এখন যেই গ্রামটি
তারা নিলয়দের গ্রাম নামে চেনে। হৃদয় হয়ত নিলয়দের গ্রামে
গিয়ে দীর্ঘদিন কখনো থাকেনি। তবে কারণে অকারণে স্বল্প
সময়ের জন্য অসংখ্যবার গিয়েছে সেই গ্রামে। এইতো
গতকালকেই ফিরল মালঞ্চ গ্রাম থেকে। এতোবার সেই গ্রামে
যাওয়ার পরও এই মেয়েকে তো কখনো তার চোখে পড়েনি।
ভাবনাগুলো অহেতুক মনে হতেই হৃদয়ের কপালে বিরক্তির
ভাঁজ পড়ল।
দরজার ওপাশে আরমান নওরোজ দাঁড়িয়ে। যিনি দরজায়
টোকা দেয় আর হৃদয়কে ডাকে ব্যস্ত কণ্ঠে। দাদুর কণ্ঠ কানে
আসতেই হৃদয় দ্রুত টি-টেবিলের উপর রাখা এক ঝুঁড়ি ফলের
মাঝ থেকে একটি ফল কা’টার ছু’রি নিয়ে রজনীর গলা
বরাবর নিক্ষেপ করে ধরে।
আরমান নওরোজের কণ্ঠ রজনী চিনতে পেরে মাত্র দাদু বলে
ডাকতে নিয়েছিল তার আগেই হৃদয়কে তার গলা বরাবর ছু’রি
ধরতে দেখে রজনীর চোখদু’টোর আকার বড় হয়ে যায়।
মেয়েটা বিস্ময় আর ভীত চোখে তাকায় হৃদয়ের দিকে।
হৃদয় গলার স্বর নিচু করে রজনীর উদ্দেশ্যে শ’ক্ত বাণী ছুড়ে
দেয়,
“মুখ দিয়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করলে এই ছু’রি তোমার
গ’লায় একদম গে’ড়ে দেব মেয়ে।”
হৃদয়ের কথার টোনে রজনী কেঁপে ওঠে। বেচারী ঢোক
গিলতেও ভ’য় পাচ্ছে। এই ছেলেটা যে আস্ত একটা গু’ন্ডা, সে
প্রমাণ মেয়েটা ইতোমধ্যে অনেকবার পেয়েছে। রজনীর
চোখদু’টো টলমল করে ওঠে। সে যে আর কতবার বাড়ি থেকে
পালানোর জন্য আফসোস করবে সেটাই ঠিক করে বুঝতে
পারছে না।
হৃদয় বা হাতে ছু’রিটি রজনীর গ’লা বরাবর ধরে রেখে সামান্য
ঝুঁকে ডিভানের উপর থেকে ডান হাতে তার একটি শার্ট তুলে
নেয়। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের ছু’রিটির কিছু অংশ
মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বা হাত ফাঁকা করে নেয়। রজনী ৫
ফুট আর হৃদয় ছয় ফুট। ফলস্বরূপ রজনী হৃদয়ের বুক সমান
হয়েছে। আর হৃদয় মুখে ছু’রি নিয়ে মাথা নিচু করে রজনীর
চোখ বরাবর ছু’রিটি তাক করে রেখেছে। ভ’য়ে রজনীর শরীর
এখনো কাঁপছে। কিন্তু মেয়েটা সামান্য নড়েচড়ে দাঁড়ানোর
শ’ক্তি হারিয়েছে। তার মনে হচ্ছে একটু নড়লেই হৃদয় এই
ছু’রি তার চোখ নয়তো গলায় একেবারে বিঁধে দিবে।
এদিকে হৃদয় সময় ন’ষ্ট করে না। সে রজনীর চোখে চোখ
রেখে তার শার্ট দ্বারা রজনীর দু’হাত শ’ক্ত করে বেঁধে দেয়।
অদ্ভুদ ব্যাপার হলো, রজনীর হাতের সাথে হৃদয়ের হাত
বিন্দুমাত্র স্পর্শ হয়নি।
রজনী হৃদয়ের কান্ড দেখে কম্পিত কণ্ঠে কথা বলতে নিলে
হৃদয় তার মুখে ধরে রাখা রজনীর দিকে তাক করে ধরে রাখা
ছু’রিটি নিয়ে রজনীর দিকে আরেকটু এগোয়, রজনী ভ’য়ে
দ্রুত চোখদু’টো বন্ধ করে নেয়। সে ভেবেই নিল, আজ হয়ত
তার শেষ দিন। কথাটা ভেবে রজনীর বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে
জল গড়ায়।
রজনীকে ভ’য় পেয়ে চুপ দেখে হৃদয় সূক্ষ্ম হাসলো বোধয়। সে
ডান পকেট থেকে তার রুমালটি আবারও বের করে এবারেও
রজনীকে স্পর্শ ছাড়া রজনীর মুখ বেঁধে দেয় শ’ক্ত করে।
রজনী সাথে সাথে চোখ মেলে তাকায়। হৃদয়ের গম্ভীর চোখে
চোখ পড়ে মেয়েটার। যার দৃষ্টি তার-ই চোখে। ততক্ষণে হৃদয়
কাজ শেষ করে তার মুখ থেকে ফল কা’টার ছু’রিটি বের করে
টি-টেবিলের উপর ছেড়ে ফেলে।
রজনী তার বাঁধা দু’হাত মোচড়ায়। কথা বলতে চেয়ে বাঁধা
মুখে ছটফট করে, যা তার ভেজা চোখজোড়ায় স্পষ্ট। রজনীর
এহেন মনোভাব হৃদয় বুঝলেও সে এর প্রেক্ষিতে কিছুই বলল
না। উল্টে সে আগের চেয়েও গলার স্বর নিচু করে বলে,
“লাভ নেই। আমি যতক্ষণ চাইবো, ততক্ষণ এভাবেই থাকতে
হবে।”
কথাটা বলে হৃদয় রজনীকে পাশ কাটিয়ে ব্যস্তপায়ে
বেলকনির দিকে গেল। রজনী দ্রুত উল্টো ঘুরে হৃদয়ের দিকে
তাকায় কিছু বলতে। কিন্তু মুখ বাঁধা থাকায় তা পেরে ওঠেনা।
ওদিকে হৃদয়ও ততক্ষণে বেলকনিতে চলে গিয়েছে। দরজায়
আরমান নওরোজ সমানে দরজা ধাক্কাচ্ছে আর হৃদয়কে
ডাকছে। রজনী অসহায় চোখে দরজার দিকে চেয়ে রইল। কি
যে হচ্ছে তার সাথে! মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারছেনা। এই
বাড়ি থেকে একবার বেরোতে পারলে তার শান্তি।
এদিকে হৃদয়ের দাদু দেখেছে হৃদয় রজনীকে টেনে তার ঘরে
এনে দরজা আটকে দিয়েছে। হৃদয়ের কাজটি আরমান
নওরোজের তখনই চোখে পড়েছে যখন সে প্রায় অর্ধেক সিঁড়ি
উঠে এসেছিল। সে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসেও লাভের লাভ
কিছুই করতে পারলো না। বেচারার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। এই
হৃদয় করতে চাইছে টা কি?
.
.
হৃদয় বেলকনিতে এসে পকেট থেকে ফোন বের করে নিলয়ের
নাম্বারে ডায়াল করে ফোন কানে ধরে। ডান হাত চাপ দাঁড়িয়ে
মাঝে চলছে। দৃষ্টি নিচু।
নিলয় নীতিকে মে’রে উল্টোপথে অনেকটা পথ এগিয়ে এসে
একটি গাছতলার পুকুর পাড়ে বসে আছে। ট্রেনের সময়
পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। হাদি তো ওর প্রবলেম এর
কারণে গ্রামে আসতেই পারেনি। হৃদয় গতকাল চলে গেল।
আর গ্রামে নিলয়সহ তার আরও চারজন বন্ধু ছিল। যার মাঝে
তিনজন আলাদাভাবে যাবে। কারণ তারা একেকজন একেক
জায়গায় যাবে। নিজস্ব বাড়িতে। একজন নিলয়ের সাথে
রংপুর ফেরার কথা ছিল। যার নাম ‘ইমতিয়াজ সাজ্জাদ’।
মূলত নিলয়, সাজ্জাদ আর নীতি রংপুর ফিরত। কিন্তু এর
আগেই নীতি, রিয়াদের সাথে নিলয়ের কেলেঙ্কারি হয়ে গেল,
ফলস্বরূপ নিলয় আর স্টেশনের দিকে যায়নি। যেদিকে ইচ্ছে
হয়েছে এসেছে। এরপর এক পুকুর পাড়ে এসে বসেছে। বেলা
বেড়েছে অনেক। রৌদ্রের তেজ বেশ। তবে নিলয়ের মাথার
উপর গাছের ছায়া। ছেলেটা মনমরা হয়ে বসে আছে তো
আছেই। একটু পর পর পাশ থেকে ছোট ছোট ইটের টুকরো
নিয়ে পুকুরের মাঝে ছুড়ে মা’রে। এর ফলে পুকুরের মাঝে
মাঝে কিছু জায়গায় ছোট্ট ছোট্ট গর্তের মতো তৈরী হয়ে, ইটের
টুকরোগুলোর জায়গা হয় পুকুরের তলদেশে। নিলয় এই কাজ
অনেকক্ষণ যাবৎ করছে। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে ঘাড় বাঁকায়
ডানদিকে। তার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে সাজ্জাদ রোদের
মাঝে এদিক-ওদিক ঘুরছে। হাতে তার জীবনের চেয়েও দামী
ক্যামেরা৷ যে ক্যামেরা দিয়ে সে প্রকৃতির সাথে এমনভাবে মিশে
যায়, যেন সে এই দুনিয়ায় নেই।
সাজ্জাদ নিলয়কে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে গ্রামের এ মাথায়
এসে নিলয়কে খুঁজে পেয়েছে। ট্রেন মিস হওয়ার পরও
সাজ্জাদের রিয়েকশন ছিল একেবারে ঠান্ডা। নিলয়
সাজ্জাদকে জানায়, সে আজ রংপুর ফিরবে না। সাজ্জাদ
ছোট করে বলেছিল, ‘আচ্ছা।’ এরপর সে তার মতো প্রকৃতির
ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেছে।
হৃদয় আর সাজ্জাদের মধ্যে অনেক মিল। এই যেমন এরা
হাসে খুবই অল্প। হৃদয় তবুও গোমড়ামুখে পেট ফাটা হাসির
কথা বলে। কিন্তু সাজ্জাদ? এর মুখ দিয়ে কথা বের করা
তাদের সাধ্যের বাইরে। তাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের মাঝে হৃদয়
আর সাজ্জাদকে তারা হাতে গুণে দু থেকে তিনবারের বেশি
হাসতে দেখেছে বলে মনে পড়েনা। তবে এরা আবার এক দিক
দিয়ে পুরো বিপরীত মেরুর। এই যেমন হৃদয়ের গায়ে টোকা না
দিতেই ও রে’গেমেগে আ’গু’ন হয়ে যায়। টপিক ছাড়াই রে’গে
বোম হয়ে বসে থাকে। রা’গের মাথায় কি করে না করে নিজেই
ভেবে পায়না। কিন্তু সাজ্জাদ? একে দেখলে মনে হয়, সে এক
শিশু। যে টোটালি রা’গতে জানেনা। তাদের ফ্রেন্ডসার্কেলের
সবাই হৃদয়ের রা’গ হজম করতে করতে, আর সাজ্জাদের
রা’গ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে করতেই বড় হয়েছে। কিন্তু
এরা দু’জন যেই লাউ সেই কদু-ই রয়ে গেছে।
হৃদয় আর সাজ্জাদের মাঝে এই একটি দিক ছাড়া বেশিরভাগ
বৈশিষ্ট্যের মিল আছে। এই যেমন, দু’জনেই গ্রাম দেখলেই নাক
ছিটকায়। অবশ্য ওদের দু’জনেরই এক প্রবলেম। গ্রামের
ধূলোয় না-কি কিছু মেশানো থাকে, আর তাতেই ওদের
শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তবে সাজ্জাদ একেবারে
ঠান্ডা মাথার মানুষ। ওকে কিছু বললে, ও চুপচাপ মেনে নেয়।
কিছু কিছু কাজ সাজ্জাদের বিরুদ্ধে গেলে, ও কোনো রিয়েক্ট
ছাড়াই নিজের মতো সেই কাজটি করে ফেলে। এই যে আজ
রংপুর ফেরার জন্য সাজ্জাদের মুখে তাড়া না থাকলেও মনে
ভীষণ তাড়া ছিল। কারণ গ্রামে দু’দিন থেকে ও পুরো অতিষ্ঠ
হয়ে গেছে। কিন্তু সবশেষে নিলয় আরেকদিকে এসে যে ট্রেন
মিস করে দিল, এর ফলে সাজ্জাদের নিলয়ের উপর চরম
রা’গ করার কথা। কিন্তু সাজ্জাদ একটা টুঁ-শব্দটিও করেনি।
আর এইজন্য নিলয়ের রা’গ লাগছে। ইচ্ছে করল এর পাছায়
এক লাথি মে’রে তার সামনের গরম গরম পুকুরের পানির
মধ্যে ফেলে দিয়ে বলতে, ‘এই বে’য়া’দ’ব রা’গ দেখা।’ কিন্তু
দুঃখের বিষয় হলো, সাজ্জাদকে সত্যি সত্যি এই পুকুরের মধ্যে
ফেললেও ও উঠে এসে বলবে,
‘দোস্ত তোর কাছে শুকনো তাওয়াল হবে? আমার তাওয়ালটা
ভেজা।’
কথাটা ভেবে নিলয় দু’হাতে নিজের মাথার চুল ধরে টানলো।
এ শা’লা হাজারটা কারণ থাকলেও রা’গে না, আর এজন্য
নিলয়-ই রে’গে বোম হয়ে যায়। এই যেমন এখন রা’গ লাগছে।
এমনিতেই বাড়ির মানুষের সাথে ঝামেলা করে এখানে এসে
দেবদাস হয়ে বসে আছে। মে’জা’জ এমনিই চটে আছে।
কারণ ছাড়াই তার রা’গ লাগছে। এই যেমন সাজ্জাদ কারণ
থাকলেও তার উপর রাগলো না কেন, এটা ভেবেই তার রা’গ
লাগছে।
তখনই সাজ্জাদ এগিয়ে এসে নিলয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট
করে জিজ্ঞেস করে,
“দোস্ত তোর কি মাথা ব্য’থা করছে?”
নিলয় সাথে সাথে মাথা উঁচু করে চেঁচিয়ে বলে,
“আমার বা’ল ব্য’থা করছে।”
সাজ্জাদ থমথমে মুখে তাকায় নিলয়ের দিকে। তাদের
ফ্রেন্ডসার্কেলের সকলের বয়স ২৫। এর কমও নয়, বেশিও না।
আর গায়ের রঙ বাকি তিনজনের একটু উজ্জ্বল হলেও নিলয়,
হৃদয়, হাদি, সাজ্জাদ এদের গায়ের রঙ সেইম অর্থাৎ শ্যামলা।
সাজ্জাদ ছেলেটা নিলয়ের ব্যবহারে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল
কিছুক্ষণ। এরপর ছোট করে বলে, “ওহ।”
কথাটা বলে সাজ্জাদ তার ক্যামেরায় মন দিল। এতোক্ষণ
ক্যামেরায় বন্দি করা পিকগুলো দেখায় ব্যস্ত হলো সে। আর
এদিকে নিলয়, সে তো রা’গে ফুঁসছে। মানে সে এরকম একটা
উদ্ভট কথা বলল, আর এ বলল, ওহ! মানে কোনো এক্সপ্রেশন
নেই। নিলয় উঠে দাঁড়িয়ে সাজ্জাদের সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাতে
সাজ্জাদের শার্টের কলার টেনে রা’গে ফুঁসছে ফুঁসতে বলে,
“তুই আসলেই একটা হা’রা’মি নামের গ’ন্ডার। এতো বলার
পরও রা’গিস না। আজ তোকে রা’গা’ই লাগবে। রা’গ দেখা
বলছি।”
নিলয়ের কাজে সাজ্জাদের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। কিন্তু
তার মাঝে রা’গের ছিটেফোঁটা দেখা গেল না। উল্টে সে তার
স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় বলে,
“আমার রা’গ আসছে না, তো আমি কি করব?”
নিলয় সাজ্জাদের কলার ছেড়ে দু’হাত কোমরে রেখে বলে,
“আচ্ছা আমি তোকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, গ্রামে থাকার কারণে
তোর পুরো শরীরে ফোসকা পরে গেছে। আজ শহরে না গেলে
তোর শরীর পঁচে যাবে শহুরে পোলা। আমার কারণে ট্রেন মিস
করলি, এখন আমাকে একটু রা’গ দেখা। নয়তো আমি কিন্তু
রে’গে যাচ্ছি। তুই আমাদের গ্রামে বেড়াতে এসেছিস।
আপাতত তুই আমার অতিথি। আমি রে’গে গিয়ে তোকে
মা’র’তে চাইছি না। তাই ভালোয় ভালোয় বলছি, আমাকে
রা’গ দেখা।”
নিলয়ের কথা শুনে সাজ্জাদ অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকালো নিলয়ের
দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোট করে বলে, “পারছি না।
স্যরি দোস্ত!”
কথাটা শুনতেই নিলয় কটমট চোখে তাকালো সাজ্জাদের
দিকে। রে’গে কিছু বলতে নিলে পকেটের শব্দ করে ফোন
বেজে ওঠে। অনেকক্ষণ থেকেই বাজছে। বাড়ির ফোন ভেবে
পকেট থেকে ফোন বের-ই করেনি। এবার ভাবল ফোন অফ
করে রেখে দিবে। অতঃপর পকেট থেকে ফোন বের করে
ফোনের স্ক্রিনে হৃদয়ের নাম্বার দেখে নিলয় বিলম্ব না করে কল
রিসিভ করে কানে দেয়। সাথে সাথে ওপাশ থেকে হৃদয়ের
ক’র্ক’শ কণ্ঠ ভেসে আসে,
“হোয়াট ইজ ইয়্যুর প্রবলেম? কতহাজার বার কল করতে হবে
তোকে? কতগুলো কল করেছি, কানে যায়না কেন তোর?
বে’য়া’দ’ব কোথাকার।”
নিলয় চুপচাপ হৃদয়ের বলা কথাগুলো শুনলো। এতক্ষণ মনে
হচ্ছিল সে এক রোবটের সাথে ছিল। হৃদয়ের সাথে কথা বলে
মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ পর তার কপালে একটা মানুষ জুটেছে।
নিলয় ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“আরে জানি জানি, তোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধু আদব
আর আদব। তা আদবওয়ালা হৃদয় বাবাজীবন এবার
আপনার দরকারখানা বলে আমাকে উদ্ধার করেন।”
হৃদয় ধমকে বলে, “স্টপিট বে’য়া’দ’ব!”
নিলয় ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। এর সাথে কথা বললে হুটহাট ঝাড়ি
নয়তো ঠাসঠুস থা’প্প’ড় খেয়ে পেট ভরাতে হয়, আর তার
সামনে এই রোবটের সাথে থাকলে জীবন একেবারে পানসে
হয়ে যায়। এই দুই বন্ধুর পাল্লায় পড়ে তার জীবনটা বৈচিত্র্যময়
হয়ে গেছে। শুধু হাদিটাকেই একটু তার জাতের লাগে।
নিলয়কে চুপ দেখে হৃদয় ফোনের ওপাশ থেকে দাঁত কিড়মিড়
করে বলে,
“কি প্রবলেম? কথা বলছিস না কেন?”
নিলয় হতাশার স্বরে বলে,
“লে! তুই তো একটু আগে চুপ করতে বললি।”
হৃদয় ফোঁস করে শ্বাস ফেলে নিজের রা’গ সংবরণ করে বলে,
“টাকা লাগবে।”
কথাটা শুনে নিলয় সাজ্জাদের ঘাড়ের উপর হাত দিয়ে বলে,
“ওরে বাবারে! তোর বাপদাদার সম্পত্তি তো তোর চৌদ্দ গুষ্টি
খেয়েও শেষ করতে পারবি না। আর তাদের পোলা আমার
কাছে টাকা চায়!”
এটুকু বলেই নিলয় তার কান থেকে ফোন সরিয়ে সাজ্জাদের
কানে ফোন ধরে। তখনই ফোনের ওপাশ থেকে হৃদয় রাগান্বিত
স্বরে বলে,
“দিবি তুই?”
সাজ্জাদ ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। তার মনোযোগ ক্যামেরায় ছিল।
হঠাৎ হৃদয়ের ধমকে বেচারা ভ’য় পেয়েছে কিছুটা। কিন্তু
নিলয়ের কাজ বুঝতে পেরে সে হৃদয়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে,
“কি দিব?”
সাজ্জাদের অহেতুক কথায় হৃদয় আরও চটল। দাঁত কিড়মিড়
করে বলে, “বা’ল দে।”
সাজ্জাদ খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর করে,
“স্যরি দোস্ত! আমি তোকে বা’ল দিতে পারবো না। কজ, এসব
দেয়ার জিনিস নয়।
”সাজ্জাদের আজগুবি কথায় হৃদয় রা’গে ফেটে পড়ল৷
এমনিতেই তার রা’গার জন্য বিশেষ কোনো কারণ লাগে না।
তার উপর এতক্ষণ নিলয়ের কল রিসিভ না করা, আর এখন
সাজ্জাদের গা জ্বা’লা’নি কথা শুনে হৃদয় ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
“তুই একবার রংপুর আয়। তোকে আমি খু’ন করে এসব উদ্ভট
কথা বলা বের করাবো বে’য়া’দ’ব কোথাকার।”
সাজ্জাদের গম্ভীর গলায় সিরিয়াস উত্তর,
“আজ মেবি ফিরছি না। আমাকে খু’ন করতে চাইলে তোকে
নেক্সট ডে প্রিপারেশন নিতে হবে। আজকে প্রিপারেশন নিলে,
তোর প্রজেক্ট লস হয়ে যাবে।”
হৃদয় চেঁচিয়ে বলে, “সাজ্জাদের বাচ্চা তোকে তো….
কথাটা বলতে বলতে হৃদয় বেলকনির এপাশ-ওপাশ করে।
রা’গে কথা বলতে পারছে না সে।
এদিকে নিলয় সাজ্জাদের কান থেকে ফোন নিয়ে কল মিউট
করে শব্দ করে হেসে দেয়। সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে
হাসতে বলে,
“ভাইরে ভাই তুই একটা জিনিস। একটা মানুষকে হাসাতে
আমাদের কত পরিশ্রম করতে হয়, আর তুই শা’লা হাসিসও
না, কাঁদিসও না, রা’গিসও না। কিন্তু বিনোদন দেয়ার বেলায়
১৬ আনা।”
সাজ্জাদ ছোট করে বলে, “থ্যাংক্স!”
সাজ্জাদের মুখে উচ্চারিত এই ছোট্ট শব্দটুকু শুনেই নিলয়ের
মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। কটমট চোখে তাকায়। এর সাথে
আর দু’মিনিট থাকলে সে আবার রে’গে যাবে। এর চেয়ে
হৃদয়ের হাতের দু’টো চটকানা খাওয়া ভালো আছে। ফোনের
দিকে তাকালে দেখল হৃদয় কল কে’টে দিয়েছে। উপরে
মেসেজ উঠেছে,
‘তিন হাজার টাকা পাঠা। নয়তো পাহাড়পুর গিয়ে তোকে খু’ন
করে মাটি চাপা দিয়ে আসব বে’য়া’দ’ব।’
নিলয় মেসেজের রিপ্লে করে,
“পাঠাবো না। তোর দাদুর কি রে?”
মেসেজটি পাঠিয়ে নিলয় একটু হাসলো। সত্যি বলতে,
সামনের মানুষটা রা’গলে একটু শান্তি শান্তি লাগে। এই যেমন
হৃদয়। কিন্তু হৃদয়ের ফ্যামিলি থেকে টাকা না নেয়ার ব্যাপারটি
নিলয়ের ভালো লাগেনা। হৃদয়ের দাদু আর বাবার কানে
কথাটা গেলে তারা দু’জনেই ভীষণ ক’ষ্ট পায়। কিন্তু হৃদয়ের
তাতে কি আর যায় আসে? নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার বিকাশ
থেকে হৃদয়ের নাম্বারে তিনহাজার টাকা ট্রান্সফার করে দেয়।
____________________
সূর্যের আলো তখন খাড়াভাবে আলো ছড়িয়ে দেয়ার প্রস্তুত
নিচ্ছে। পাটোয়ারী বাড়ির উঠানের সামনে একটি বড়সড়
পেয়ারা গাছ। সেই গাছের ছায়ার নিচে একটি পেতে রাখা
বেঞ্চের উপর নীতি মলিন মুখে বসে আছে। কেঁদেকেটে মুখ
ফুলিয়ে ফেলেছে। রিয়াদের সাথে বাড়ি আসার পর সবাই
তাকে ঘিরে ধরলেও সে একটি কথাও বলেনি৷ সবাইকে
উপেক্ষা করে ঘরের ভেতর দৌড়ে চলে গিয়েছিল। এরপর
রিয়াদ সবাইকে সবটা জানানোর পর রিয়াদের বাবা নিলয়ের
উপর খুব রা’গ করেছে। রিয়াদ কিছু না বলে বাড়ি থেকে
বেরিয়ে যায়। বাড়ির পরিবেশ একটু ঠান্ডা হলে নীতি শরীর
থেকে বোরখা ছাড়িয়ে বাড়ির উঠানে এসে বসেছে। পরনে
একটি কালো রঙের থ্রি-পিস। মেয়েটা একটু পর পর ঝাপসা
চোখ দু’হাতে স্বাভাবিক করছে।
মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়েছে
নিলয়ের বাবা ইমাম পাটোয়ারী৷ ভদ্রলোকের পরনে সাদা
পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর মাথায় টুপি। তার নজর পেয়ারা গাছের
দিকে পড়লে সে এগিয়ে এসে রজনীর পিছনে দাঁড়ায়। মৃদুস্বরে
ডাকে, “নীতি মা?”
বড় বাবার কণ্ঠ কানে আসতেই নীতি দ্রুত দু’হাতে চোখমুখ
ডলে স্বাভাবিক করে বেঞ্চের উপর থেকে উঠে বড় বাবার
দিকে ফিরে তাকায়। মেয়েটার ফর্সা মুখ লাল হয়ে আছে। সে
ভদ্রতাসূচক বলে,
“জ্বি বড় বাবা!”
ইমাম পাটোয়ারী এগিয়ে এসে নীতির সামনে দাঁড়ানো মাত্রই
নীতি নিজেকে সামলাতে না পেরে তার বড় বাবার বুকে মাথা
রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে। বলে, “তোমার ছেলে আমাকে মে’রেছে
বড় বাবা। তুমি তোমার ছেলের বিচার কর।”
মেজো ভাইয়ের মেয়ে নীতির অভিযোগ শুনে ইমাম পাটোয়ারী
দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রিয়াদের মুখে সব শুনে নিলয়কে কতবার যে
কল করেছে, তার দু’ভাইও করেছে। কারো কল রিসিভ করেনি
ছেলেটা। উল্টে এখন ফোন দিলে ফোন বন্ধ পাচ্ছে। ভদ্রলোক
নীতির মাথায় হাত রেখে বলে,
“করবো মা। ও বাড়ি আসুক, তারপর দেখ ওকে কি করি!
আমার মায়ের গায়ে হাত তুলেছে ও। আমি বিচার না করে
পারি!”
নীতি তার বড় বাবা বুক থেকে মাথা তুলে নিজেকে
সামলানোর চেষ্টা করে। নাক টানে বেশ ক’বার। ইমাম
পাটোয়ারী মৃদুস্বরে বলে,
“আর কান্না না। ভেতরে যা। তোর বড় মা খাবার বাড়ছে সবার
জন্য। চুপচাপ গিয়ে খেয়ে নিবি। আর বিকালে রেডি হয়ে
থাকবি। মেলায় ঘুরতে নিয়ে যাবো, কেমন?”
নীতি খুশি হলো। তার বাবা তো তাকে জীবনেও সময় দেয় না।
তার বড় বাবা আর ছোট চাচা-ই তাকে সবচেয়ে বেশি আদর
করে। মেয়েটার যত আবদার এই দু’জন মানুষের কাছেই
থাকে।
বাড়ির বাইরে থেকে উঠানে প্রবেশ করে নিলয়ের বাবার ছোট
ভাই ইনামুল পাটোয়ারীর মেয়ে ইরাম পাটোয়ারী। মেয়েটির
বয়স ১৫ বছর। সবে ক্লাস নাইন-এ উঠেছে।
ইরামের পরনে গ্রাম্য স্টাইলে শাড়ি পরা। আঁচল কোমরে গুঁজে
রাখা। পিঠ সমান চুলে মাঝখানে সিঁথি করে দু’টো বেনি করা।
যা কাঁধের সামনে দু’পাশে দিয়ে রেখেছে। বেনি দু’টোয় লাল
ফিতা বাঁধা। কপালে একটি ছোট্ট কালো টিপ। খালি পা
দু’টোয় ধূলো মাখামাখি।
পেয়ারা গাছের নিচে বড় বাবা আর মেজো বাবার মেয়ে
নীতিকে দেখে, সাথে বড় বাবার মেলায় যাওয়ার কথা শুনে
ইরাম এক দৌড়ে এসে ইমাম পাটোয়ারীর পাশে দাঁড়িয়ে
হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“ও বড় বাবা, তুমি শুধু নীতি আপাকে নিয়েই মেলায় যাবা?
আমারে নিয়া যাবানা?”
ইরামের কথা শুনে ইমাম পাটোয়ারী হেসে ফেলে। ইরামের
মাথায় হাত রেখে বলে,
“আমার দু’টো মা-ই আছে। একজনকে ছাড়া-ও আমি কি
যেতে পারি? আমি আমার দুই মাকেই মেলায় নিয়ে যাবো,
বুঝলি?
এরপর ইরামের দিকে খেয়াল করে বলে,
সারা গায়ে এসব কি মাখিয়ে নিয়ে এসেছিস?”
ইরাম ঠোঁট উল্টালো। হাতে পায়ে কাঁদামাটি মাখানো। সে হেসে
বলে,
আজ আমি কাঁদামাটি দিয়ে অনেক হাঁড়ি-পাতিল বানিয়েছি
বড় বাবা। ওগুলো সব রোদে শুকাতে দিয়েছি। পরে তোমাকে
দেখাবো।”
ইমাম পাটোয়ারী বলেন,
“আচ্ছা দেখব। এখন তাড়াতাড়ি গোসল করে খেতে যা। আমি
নামাজে যাচ্ছি। নয়তো দেরি হবে।”
এরপর ইমাম পাটোয়ারী মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।
ইরাম নীতির লাল লাল ফোলা মুখ দেখে কোমরে হাত দিয়ে
বলে,
“ও নীতি আপা। তোমার কি হইছে গো?”
নীতি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কিছু না। তুই যা তো যা। গোসল করে আয়। দেখে মনে হচ্ছে
সারাদিন মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে ফিরলি।”
নীতির কথায় ইরাম হেসে ফেলল। বাড়ির পাশে পুকুরের দিকে
দৌড়ে যেতে যেতে বলে,
“আমি একটু খেলি বলে তোমরা আমার সাথে খালি এমন
কর।
বলতে বলতে মেয়েটা দৌড়ে গিয়ে পুকুরে ঝাঁপ দেয়। নীতি
বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে ইরামের দিকে। এসব চালচলন তার
মোটেও ভালো লাগেনা। তাদের বাড়ির ভেতরে কত সুন্দর
ওয়াশরুম আছে৷ কিন্তু এই ইরামকে জীবনেও ওখানে গোসল
করতে নিয়ে যাওয়া যায় না। সারাদিন পুরো গ্রামে টো টো করে
ঘুরে বেড়িয়ে পুকুরে এসে ঝাঁপ দিবে। সে কিছু একটা ভেবে
ইরামের উদ্দেশ্যে গলা উঁচিয়ে বলে,
“ইরাম রজনীর সাথে দেখা হয়েছিল তোর?”
ইরাম সাঁতার কাটতে কাটতে বলে,
“না তো নীতি আপা। রজনী আপারে তো খুঁজে পায়নি
এখনো। রজনী আপার আব্বা খুব কাঁদছিল জানো?”
নীতির মুখটা মলিন হয়। মেয়েটা হুট করে কোথায় হারিয়ে
গেল? যেখানেই থাকুক মেয়েটা ভালো থাকুক।
ইরাম চিত হয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে নীতির উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে
বলে,
“ও ইরাম আপা, মায়ের থেকে আমার এক সেট কাপড় এনে
পুকুর পাড়ে রাখবা? কাপড় নিতে মনে নাই আমার।”
নীতি ছোট করে ‘আচ্ছা’ বলে বাড়ির ভেতর চলে যায়।
____________________
ঘড়ির কাটা তখন রাত ১১ টার ঘরে। হৃদয় তার ঘরের এক
পাশে ইজেল এর সামনে চেয়ার টেনে বসেছে। ইজেলে রাখা
ড্রয়িং বোর্ডের উপর মাস্কিং টেপ দিয়ে শ’ক্ত করে আটকানো
সাদা স্কেচ পেপার। যার উপর স্কেচ করতে ব্যস্ত হৃদয় গ্রাফাইট
পেন্সিল দ্বারা। পাশে আরও প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র।
হৃদয় খুব মনোযোগ দিয়ে একটি চারতলা বাড়ি স্কেচ করছে।
ছবিটি প্রায় শেষের পথে।
হাদি দরজা ঠেলে হৃদয়ের ঘরে প্রবেশ করে। এগিয়ে এসে
হৃদয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হৃদয়ের কাজ
দেখল। ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে বিরক্ত হলো। ঘরের যে
পাশে হৃদয় আঁকাআকি করে, সে পাশটা অনেক বেশি
অগোছালো। যখন কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে তখন যদিও
বোঝা যায় না তেমন, কিন্তু হৃদয় এসব কাজ করার জন্য সব
মেলে ধরে বসলে এ ঘর একটা জঙ্গল লাগে। হৃদয় ছোটবেলা
থেকেই আঁকাআকি করে। ভীষণ পছন্দের একটা সাবজেক্ট
বলা যায়। একসময় তো ও এটা নিয়ে পড়তেও চেয়েছিল।
তারপর এইচএসসি এক্সামের পর কি হলো কে জানে, ও
ডক্টরের দিকে পুরোপুরি ফোকাস করল। কাউকে কৈফিয়ত
তো হৃদয় দেয় না। সে বেলায়ও দেয়নি। তবে হৃদয়
প্রফেশনালি আঁকাআঁকির বিষয়টা না নিলেও এর র’ক্তে মিশে
আছে এই দিকটা।
এ ব্যাপারে ছেলের এতো বেশি আগ্রহ দেখে হৃদয়ের বাবা
হৃদয়ের শখ পূরণের জন্য আলাদা করে খুব সুন্দর একটি ঘর
বানিয়ে দিয়েছেন বছর তিন আগে। ঘরটা এতো সুন্দর!
কতকিছুর যে ব্যবস্থা করেছিলেন ছেলের জন্য। কিন্তু দুঃখের
বিষয় সেই ঘরে হৃদয় আজও পা রাখেনি। তারা বন্ধুরা সবাই
হৃদয়ের জন্য বানানো ঘর দেখে এসে হৃদয়কে কত প্রলোভন
দেখানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু হৃদয় বরাবরই ছিল নির্বিকার।
কথাগুলো ভেবে হাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এগিয়ে এসে একটি
চেয়ার টেনে হৃদয়ের থেকে সামান্য দূরত্বে বসে বলে,
“তোর ঘর অনেক অগোছালো রে হৃদয়। এসব গুছিয়ে দেয়ার
জন্য এবার তোর একটা বিয়ে করা প্রয়োজন।”
হাদির কথায় হৃদয়ের হাত থেমে যায় ক’সেকেন্ডের জন্য।
এরপর আবারো পেন্সিল ঘোরাতে ঘোরাতে গম্ভীর গলায় বলে,
“তুই বিয়ে কর। এরপর তোর বউকে পাঠিয়ে দিস আমার ঘর
গোছানোর জন্য।”
হাদি হেসে বলে,
“চাকরিটা পেয়ে গেলে আমি এমনেই বিয়ে করব মামা।
ন্যাশনাল থেকে পড়ে আদোও চাকরি কপালে জুটবে কি-না!
তাও তো জানিনা। তোর কি আর সে চিন্তা আছে না-কি?
তোরা ডক্টর মানুষ ভাই৷ দু’দিন পর চেম্বার দিয়ে বসবি।
তাছাড়া তুই সারাজীবন বসে খাইলেও দিব্যি বিলাশবহুলভাবে
জীবন চলে যাবে তোর বাপ-দাদার টাকায়।”
হাদির কথাটা হৃদয়ের বিন্দুমাত্র পছন্দ হলো না। সে ঘাড়
ফিরিয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“শাহরিয়ার হৃদয় দু’দিন না খেয়ে দিনমজুরি করে টাকা
কামিয়ে তারপর খাবার মুখে তোলার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু বাপ-
দাদার টাকায় খেয়ে নিজের কা’পু’রু’ষ’তার পরিচয় দেয়ার
ক্ষমতা তার নেই। হিসাব করে কথা বলবি হাদি।”
হাদি ঢোক গিলল। ভাবলো, এই বুঝি হৃদয় তার দিকে তেড়ে
এলো। কিন্তু হৃদয় কথাটা বলে আবারো তার কাজে আবারে
মনোযোগ দিল। হাদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। এ নিয়ে আর
কিছু বলল না। কিছু একটা মনে পড়তেই বলে,
“কিছুক্ষণ আগে কুরিয়ার থেকে একটি বড়সড় বক্স ভর্তি
চকলেটের বক্স দিয়ে গিয়েছে। ওগুলো কার জন্য…..
মাঝখান থেকে হৃদয় বলে ওঠে,
“রজনীর জন্য।”
হাদি ঠোঁট চেপে হাসলো। সকালে হৃদয়ের রজনীকে ঘরে
আটকে রাখা, দাদুর প্রেসার বেড়ে যাওয়া, এরপর দাদু ঘুমিয়ে
গেলে হৃদয়ের রজনীকে ঘর থেকে ছেড়ে দেয়া, রজনীর জন্য
সেই ছেলেকে হৃদয়ের উড়া ধুরা মার, আর সবশেষে মেয়েটির
জন্য আনা হৃদয়ের চকলেট। সবমিলিয়ে হৃদয়ের জন্য হাদির
বেশ ভালোই লাগলো। সে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলতে নেয়,
“মেয়েটাকে তুই পছ…..
এবারেও হৃদয় মাঝখান থেকে বলে ওঠে,
“আমার পাতায় রজনীকে পছন্দ করার লেভেল অনেক
উঁচুতে। স্পেশালি ওর ব্রাউন আইজ।”
হাদি কেশে ওঠে। অকপটে হৃদয়ের এরকম স্বীকারোক্তি
ছেলেটা মোটেও আশা করেনি। হৃদয়ের মনোযোগ স্কেচে,
বাড়িটির শেষ ফিনিশিং দিতে ব্যস্ত সে। কয়েক মিনিট পর হাদি
নিজেকে সামলে বলে,
“তার মানে তুই ওই মেয়েটাকেই বিয়ে করবি?”
হৃদয় পেন্সিলটির মাথা একেবারে শেষ প্রান্তে এনে থামিয়ে
দেয়৷ কাজ শেষ তার। হাতের পেন্সিলটি রেখে নিজের কাজের
খুঁত ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু সফল হলো না। অতঃপর পেন্সিল
রেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাদির দিকে চেয়ে বলে,
“বলেছি সে আমার পছন্দের। বলিনি এই ফিলিংস পার্মানেন্ট।
আজ ভালো লাগছে, কাল ভালো লাগবে না। সিম্পল।”
হৃদয়ের কথা শুনে হাদি তব্দা খেয়ে চেয়ে আছে। এ শা’লা
বলে কি?
হৃদয় কাভার্ড এর দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি শপিং ব্যাগ বের
করে হাদিকে পাস করে যেতে নিলে হাদি হৃদয়ের হাত টেনে
ধরে বলে,
“আরে মামা পুরোটা ক্লিয়ার করে যা।”
হৃদয় তাকালো হাদির দিকে। বলে,
“আর এক ঘণ্টা পর পাহাড়পুরের ট্রেন। রজনীকে গ্রামে রেখে
আসবো। আমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর দাদুকে জানিয়ে
দিস। নয়তো দাদু ঝামেলা করবে।”
হাদি অবাক হয়ে বলে,
“এইতো বললি মেয়েটাকে তোর পছন্দ করার লেভেল অনেক
উঁচুতে। তাহলে…..
হৃদয় বলে, “সেটা আগামীকাল সকাল পর্যন্ত। কারণ ততক্ষণ
আমি ওর সঙ্গে থাকবো। ওকে ওর বাড়ি পৌঁছে দেয়ার পর এই
নামে এই দুনিয়ায় কোনো মেয়ে আছে,, আই গেজ, আমি
সেটাই ভুলে যাবো।”
হাদি বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“স্ট্রেঞ্জ! বিষয়টা তুই যতটা ইজি ভাবছিস ততটা ইজি নয়।”
হৃদয়ের ভাবলেশহীন উত্তর, “আই নো, বিষয়টা আমার
ভাবনার চেয়েও ইজি।”
“রজনীকে তোর গতরাতে ভালো লাগলো। মাঝে একদিন এর
স্থায়ীত্ব থাকলো। আর তারপর তুই মেয়েটাকে
আগামীকালকেই ভুলে যাবি? হাউ মামা?”
হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলে,
“টাইমটা মেবি বেশি হয়ে গেল, রাইট?”
হাদি কি বলবে বুঝল না৷ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“গ্যারান্টি দিচ্ছিস তুই মেয়েটাকে আগামীকালকেই ভুলে
যাবি?”
হৃদয়ের কাটকাট জবাব, “হান্ড্রেড পার্সেন্ট।”
“যদি তোর কথা রাখতে না পারিস?”
হৃদয়ের দৃঢ় কণ্ঠ,
“আমি শাহরিয়ার হৃদয় এক কথার মানুষ। আমার কথা
উল্টানোর রাইট আমি নিজেকেও দিইনি।”
কথাটা বলে হৃদয় তার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে
বড়বড় পায়ে দরজার দিকে এগোয়। হাদি হৃদয়ের উদ্দেশ্যে
বিড়বিড় করে,
“যদি মেয়েটার প্রতি তোর পছন্দের লেভেল এতোটাই উঁচু হয়,
তবে মাটিতে থুতু ফেলে সেই থুতু চেটে খাওয়ার মতো অবস্থা
হবে তোর। আমি এটা আজ আমার নিজস্ব খাতায় লিখে
রাখলাম। সময়মতো শুধু মেলাবো।”
চলবে ………