গল্প : আড়ালে আবডাল...
 
Notifications
Clear all

গল্প : আড়ালে আবডালে শুধুই তুই (লেখিকা: রাহা ইসলাম)

Page 2 / 2

Posts: 72
Admin Registered
Topic starter
(@sojib)
Member
Joined: 5 months ago
 
পর্ব:০৫
 
 
 
পেছন থেকে ঠান্ডা কণ্ঠটা আবারও ভেসে এলো—
“ছবিটা যেখানে ছিল, সেখানে রাখ।”
 
কথাটি শ্রবণ হতেই
রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। রাহার পুরো শরীর যেন জমে গেল। হাত সহ ফ্রেমটা কেঁপে উঠলো। ভয় ভয় চোখে ঘুরে দাঁড়াল..
 
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে— অভ্র।
আলো-আঁধারির ভেতরেও তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে জ্বলছে যা ছিল স্থির। চোখে কোনো কোমলতা নেই, আবার পুরোপুরি কঠোরতাও না—
কেমন যেন গভীর, অচেনা এক দৃষ্টি।
 
রাহার গলা শুকিয়ে এলো। ভয়ে বারবার ঢোক গিলছে,
 
“আ..আপনি… এখানে…?”
 
অভ্র ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
প্রতিটা পদক্ষেপ যেন মেপে মেপে—
 
“আমি এখানে মানে..! আমার ঘরে আমি ছাড়া আর কে থাকবে। এই রুমে ঢোকার অনুমতি তোকে কে দিয়েছে?”
 
– “দ..দ…দরজা খোলা ছিল”।
 
–”তো”..!
 
–”দুঃখিত ” ।
 
 হঠাৎই হাত বাড়িয়ে রাহার হাত থেকে ফটোফ্রেমটা নিয়ে নিল অভ্র।
 
রাহা সাহস সঞ্চার করে বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে আবারও ছেড়ে বলে উঠল,
 
“ছবিটা,, ওটা আমি, তাই না?”
 
অভ্র থেমে গেল।
এক ক্ষণ,,দুই ক্ষণ,
ঘরের ভেতর নীরবতা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।
তারপর মুখ ফিরিয়ে রাহার দিকে চেয়ে রইলো।
চোখে এবার ভিন্ন এক অনুভূতি—যেন দীর্ঘদিনের সঞ্চিত স্মৃতিগুলো হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রেমটা যেখানে ছিল, সেখানেই রেখে সে এগিয়ে এলো।
রাহার সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালো।
একটু নিচু হয়ে টেবিলের দিকে দৃষ্টি ফেলল—মনে হলো নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
তারপর আস্তে আস্তে চোখ তুলে সরাসরি রাহার চোখে দৃষ্টি আটকালো আর বলল,
 
“সবকিছু জানার এত শখ কেন তোর?”
 
রাহা ঠোঁট কামড়ে ধরল। “আমি..আমি তো শুধু—”
 
“শুধু?” অভ্র তার কথা কেটে দিল।
 
ধীরে ধীরে একটু ঝুঁকে এলো তার দিকে।
 
“যেখানে যাওয়া উচিত না, সেখানেই কেন যাস?? রাহা।”
 
তার নামটা এত ধীরে, এত গভীরভাবে বলল— রাহার বুক কেঁপে উঠল।
রাহার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো।
“আপনি....কে..?”
 
অভ্র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানলো—
কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই, আছে রহস্য।
 
“যে তোর সব জানে,”
আর যাকে তুই ভুলে গেছিস।”
 
রাহার চোখ বড় হয়ে গেল।
 
“অসম্ভব…!”
 
সে মাথা নাড়লো,
“আমি আপনাকে কখনো—দেখি....”
 
-“চুপ।”
 
অভ্র হঠাৎ থামিয়ে দিল।
 
ধীরে ধীরে রাহার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে।
রাহাও পেছাতে শুরু করল।একদম দেয়ালে গিয়ে তার পিঠ ঠেকে গেল। দেয়ালটা ছিলো খুবই শীতল—কেননা রুমে এসি চলছিল।
সেই শীতলতার শিরশিরে স্পর্শ তার শরীর জুড়েও বয়ে গেল। রাহা নিঃশ্বাস আটকে, চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
 
অভ্র দুই পাশে হাত রেখে তাকে ঘিরে ফেলল—তবে তার হাত রাহাকে স্পর্শ করল না। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার 'ফেইরি টেইল' এর পানে।
 
রাহার শ্বাস আটকে রেখেছে দেখে অভ্র নিচু গলায় বলল,
 
— “এত অল্প বয়সেই মরে যাবি নাকি?.. নিঃশ্বাস নে, ইডিয়ট।”
 
হঠাৎই চোখ মেলে তাকালো অভ্রের দিকে—
ফট করে যেন ভেঙে গেলো সেই মুহূর্তের স্থিরতা।
দু’জনের দৃষ্টি এসে এক বিন্দুতে মিলিত হলো।
 
অভ্র তার মুখে একটু ফু দিলো।
 
রাহা আবেশে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেললো।
কারণ সে চোখে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার মতো সাহস সে পাচ্ছিল না।
 
অভ্র হাত তুলে রাহার কপালের উড়ন্ত চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে সরে গেল।
 
অভ্রের স্পর্শে রাহা আবারও কেঁপে উঠল।
রাহা তখনও থরথর করে কাঁপছে। গভীরভাবে শ্বাস নিতে নিতে শুধু বলল,
 
— “অভ্র ভাই!”
 
অভ্র থেমে গেল, কিন্তু পেছন ফিরল না।
রাহার গলা কাঁপছিল—
 
— “আপনি, সত্যিই কি আজ রাতে আমার রুমে গিয়েছিলেন…?”
 
অভ্র হালকা করে হাসল, কিন্তু সেই হাসি দেখা গেল না।
 
— “তুই কী মনে করিস?”
 
রাহা থমকে গেল।
— “মানে…?”
 
হঠাৎ অভ্র কঠিন গলায় বলে উঠল,
 
– “জাস্ট শাট আপ,গেট আউট ।“অ্যান্ড আফটার টুডেই, ডোন্ট কাম ইন্টু দিস রুম এনিমোর।”
 
কথাটা শেষ করেই সে বারান্দার দিকে চলে গেল।
 
আর সঙ্গে সঙ্গে রাহার চোখে জমে উঠল কান্না। চোখের কোণে টলমল করতে লাগল জল।
রাহা ভারী মন নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। তার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
“লোকটা এমন করে কেন!… দুর আর কখনও আসবো না।”
 
 অভ্র - রাহার অস্তিত্ব টের না পেয়ে
দুইহাত মুষ্টিবদ্ধ করে দূর আকাশের দিক একধ্যানে তাকিয়ে আছে। 
নিজেও কষ্ট পাচ্ছে তার ফেইরী টেইল কে কষ্ট দেওয়ার জন্য। কিন্তু এই মুহূর্তে তার এটাই ঠিক মনে হয়েছে।
 
___________
 
রাহা রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিলো, তারপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল—একটু ঘুমাবে ভেবে।
কান্নার কারণে চোখ দুটো ফুলে উঠেছে, নাকটাও লাল হয়ে আছে।
 
হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল—
গিফট বক্স!
বিছানার ওপর পড়ে আছে সেই চকচকে বাক্সটা,
চাঁদের আলোয় নরম ঝলকে যেন আরও রহস্যময় লাগছে।
 
রাহা বক্সটা হাতে নিয়ে বারবার ঘুরিয়ে দেখছে।
র‍্যাপিং খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো পার্পল রঙের একটা বক্স দেখতেই যেন ভীষণ এক্সক্লুসিভ, আভিজাত্যে ভরা।
 
ধীরে ধীরে বক্সটা খুলতেই—
ভেতরে ছোট্ট সাদা ডায়মন্ডের পেনডেন্টটা হঠাৎ করেই ঝিলিক দিয়ে উঠলো।নরম আলোয় তার দীপ্তি যেন চোখে লেগে থাকে স্বচ্ছ, নির্মল, আর অদ্ভুত সুন্দর। এক নজরেই বোঝা যায়, এটা খুবই দামি… শুধু দামেই না, অনুভূতিতেও যেন অমূল্য।
পেনডেন্টটা হাতে নিতেই তার ঠান্ডা, মসৃণ স্পর্শে রাহার শরীর হালকা কেঁপে উঠলো। হীরের সেই ক্ষুদ্র খণ্ডটুকু যেন নিজের ভেতরেই হাজারটা আলো লুকিয়ে রেখেছে।
 
ঠিক তখনই তার চোখে পড়লো—
নিচে ভাঁজ করা একটা ছোট্ট চিরকুট নীরবে পড়ে আছে।চুরকুটটি খুলতেই তার চোখ থেমে গেল এক লাইনে–
 
“এটি যেন সবসময় গলায় দেখি…
নইলে শরীর থাকবে ঠিকই, কিন্তু গলা থাকবে না।”
 
লাইনগুলো পড়তেই রাহার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। আঙুলগুলো কাঁপছে, কাঁপা কাঁপা হাতে পেনডেন্টটা চোখের সামনে তুলে ধরলো সে।
মনে অদ্ভুত এক শিহরণ, সাথে ভয় মেশানো কৌতূহল… এই অচেনা সতর্কবার্তার মানে কী?
 
তবুও—
মনের ভেতর কোথাও একটুকরো ভালো লাগা নীরবে জায়গা করে নিচ্ছে।যেন এই রহস্যের মাঝেও লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক টান।
 
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
এই গিফটটা কে দিলো তাকে?
 
হয়তো শিফা আপুই রেখে গেছে,নাকি অন্য কেউ? 
আপু আমাকে তাও এই ভাবে ওয়ার্নিং দিবে..!
 
“যাই হোক, পরে জানা যাবে…”
নিজেকেই আশ্বস্ত করলো রাহা।
 
পেনডেন্টটা গলায় পরে নিল সে। আর পরার সাথে সাথেই মনে হলো, পেনডেন্টের সৌন্দর্য যেন রাহার গলায় এসে দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে বরং গলাটাই যেন নতুন এক দীপ্তিতে ঝলমল করে উঠলো।
খুশি মনে রাহা শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের পাতা ভারী হয়ে এল, আর ঘুম এসে তাকে পুরোপুরি ঢেকে ফেললো।
 
কিন্তু রুমের দরজার ঠিক বিপরীত দিকটায়—
আরও একজন ছিল, যে নীরবে রাহার সবটা কর্মকান্ডও নিখুঁত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল। তার উপস্থিতি, তার দৃষ্টি সবটাই রাহার অজানাই থেকে যাবে হয়তো।
 
প্রিয়তমার গলায় নিজের আনা উপহারটা দেখে অভ্রের চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো—যেন দীর্ঘদিনের অস্থিরতার ভেতরেও হঠাৎ করে একটুকরো শান্তি খুঁজে পেল সে।
ইতালি থেকে বিশেষভাবে কাস্টোমাইজ করে বানানো সেই পেন্ডেন্টটি ছিল একেবারেই অনন্য। এমনকি যেন দ্বিতীয়টি তৈরি না হয়—সে আগেই কড়া এগ্রিমেন্ট করে রেখেছিল। কারণ, তার কাছে প্রিয়জনের জন্য দেওয়া জিনিস শুধু গিফট নয়, একদম একান্ত কিছু।
 
প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের সেই ডায়মন্ড পেন্ডেন্ট। বাইরে থেকে যতটা বিলাসবহুল, তার চেয়েও বেশি বিশেষ ছিল ভেতরের একটি ছোট্ট সংযোজন—একটি জিপিএস ট্র্যাকার।
এটা যার কাছে থাকবে, সে যেখানেই যাক না কেন, অভ্র চাইলে মুহূর্তেই তার অবস্থান জানতে পারবে। দূরত্ব যতই হোক, তার নজর এড়ানো সম্ভব নয়। এতকিছু ভাবেই এটা বানিয়ে ইতালি থেকে আসার সময় সাথে নিয়ে এসেছিলো।
 
তবুও অভ্রের কাছে বিষয়টা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের নিশ্চিন্ততা—প্রিয়জনকে ঘিরে থাকা নিরাপত্তার নীরব প্রতিশ্রুতি।
 
___________
 
অভ্র রুমে ঢুকে গিটারটা তুলে নিল। কাউচের পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে পরলো সে।
গিটারের তারে আঙুল ছুঁতেই মৃদু টুংটাং শব্দে ঘরটা ভরে উঠলো।একটা নরম সুর ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে—যেন রাতের নীরবতার ভেতরেই নিজের জায়গা খুঁজে নিচ্ছে।সে আস্তে আস্তে সুরের সাথে গলা মেলালো।
গিটার আর কণ্ঠের মিশেলে তৈরি হলো এক অদ্ভুত শান্ত আবহ, যেখানে কথার চেয়ে অনুভূতিটাই বেশি কথা বলছিল। চোখ বন্ধ করে গাইতে শুরু করলো...
 
----- "মন আকাশে বৃষ্টি আসে, রৌদ্র মেঘের জুটি
আজ নতুন আলোয় আঁধার কালোর খুনসুটি।
ঝড়ের বেশে এলোকেশে, কাজল সে চোখ দুটি
দিলো কঠিন কথার, বিষন্নতার ছুটি। 
 
তারই সাথে খেলনা পাতে, অযথা হাসাহাসি
হাজার বারণ, আর অকারণ তবু সে দ্বারেই আসি।
চলনা সুজন, মিলে দু'জন নীল ঐ আকাশে ভাসি
দেখুক লোকে এ দু'চোখে, তোর ঐ দু'চোখের হাসি।
চলনা সুজন, হারাই দু'জন, বিনা দোষেই হোক ফাসি
দেখুক লোকে অবাক চোখে, কতটা ভালোবাসি। 
 
চোরাবালির পিছুটানে, বুঝি না এই ভাষার মানে
অশান্ত মন কি উচাটন খোদা জানে।
ঘরের কাজে সকাল সাঁঝে, জ্যামিতির ভাঁজে ভাঁজে
কিসের ছায়া, এ কোন মায়া বুঝি না যে।
ধীরে ধীরে চেনা ভিড়ে, অচেনা বাড়াবাড়ি
অবুঝ এ মন, কি জ্বালাতন, এ কেমন আহাজারি।
 
চলনা সুজন, মিলে দু'জন, আরেকটুকু ভুল করি
দেখুক লোকে এ দু'চোখে, ছায়া যে শুধু তোরই।
চলনা সুজন, মিলে দু'জন, অচেনা শহর গড়ি
সেই শহরে আপন করে, বৃষ্টি ফোঁটা হয়ে ঝরি।
 
বাদাম খোসায়, ভালোবাসায়, নিয়ন আলোয় কাছে আসায়
স্মৃতির খাতায়, চোখের পাতায় কিসের ফাঁকি?
আপন কথার গোপন ব্যথায়, বন্দী খাঁচার বিষন্নতায়
কিসের জ্বালা বিষের মালায়, বোঝ নাকি?
গোপন করে আপন তোরে, বুকের পাঁজরে রাখি"……
 
তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের চাপা ব্যথা, আবার সেই ব্যথার ভেতরেই লুকিয়ে থাকা কোমলতা।
তার সামনের টেবিলে ছড়িয়ে ছিল কয়েকটি দামী ড্রিঙ্কসের বোতল। ঘরের আবহটা ভারী হয়ে উঠেছিল সেই তীক্ষ্ণ, তেতো গন্ধে।
গিটার থেকে বের হওয়া প্রতিটা সুর যেন রুমের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে আসছে। অভ্র চোখ বন্ধ করে গাইছিল,
কিন্তু মনের ভেতর কোথাও রাহার ছবি ঠিকই জেগে ছিল—নীরবে, গভীরভাবে।…..
 
 
 
 
চলবে....... 
 
 
 
 
যারা প্রতিদিন গল্পটি পড়ছেন তাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা। গল্পটি কেমনে লাগছে কমেন্টে বলবেন। সবাই গঠনমূলক মন্তব্য দিবেন। গল্পটি ভালো লাগল রিয়েক্ট,কমেন্ট শেয়ার দিবেন সাথে ফলো করে দিবেন🫶💖
হ্যাপি রিডিং 🌸
Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner