গল্প: চলো না আজ এ র...
 
Notifications
Clear all

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (Writer:Priynshi Chowdhury)

Page 3 / 7

Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:৩০
 
 
পরদিন বিকেলে প্রীতিষা বেশ আনন্দ নিয়ে নিজেকে সাজাতে বসেছিলো ঘুরতে যাবে বলে। পরনে তার সাদামাটা সুন্দর নীল জর্জেট গোল জামা, গলায় সাদা ওড়না জড়ানো। কানে ট্যাসেল ঝুমকা দুলছে, হাতে সাদা চুড়ির মৃদু ঝনঝন শব্দ বাজছে। ফর্সা, গোলগাল মুখশ্রীর উপর একটু গাঢ় করে টানা কাজলের রেখা চোখ দু’টিকে করেছে আরও অভিব্যক্তিময়। সাজ বলতে এতটুকুই সেজেছে আজ। তবে প্রীতিষার সৌন্দর্যের আসল জাদু লুকিয়ে থাকে তার হাসিতে। গালে ওঠা মিষ্টি টোলে। সেই টোলেই বারবার হার মানে কাবির। হাসির মুহূর্তগুলোতে কাবির প্রতিবার নতুন করে ঘায়েল হয় প্রীতিষা খেয়াল করে। ওর চোখ দেখে টের পায় প্রীতিষা। তবে কাবির জীবনে সরাসরি প্রশংসা করবে না। ঘুরিয়ে পেচিয়ে সেই সুন্দর লাগছে কথাটায় থামবে। প্রীতিষা তো ওকে এখন পুরোপুরি চেনে, বোঝে। তাই বুনো ষাড়টার ত্যাড়ামিতেও বিশেষ রাগ হয় না এখন। নিজের এমন ভাবনায় মিষ্টি লাজুক হাসি ফুটে উঠলো প্রীতিষার ঠোঁটে। আয়নার সামনে শেষবার নিজেকে দেখে নিয়ে সে কাঁধে তুলে নিলো লম্বা ব্যাগটি।
 
ঘর আজ নিরব। কারণ, আজ প্রীষান নেই। বাচ্চাদের নিয়ে পার্কে গেছে সে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। এই ফাঁকে প্রীতিষার ছোট্ট স্বাধীনতাটুকু তাকে নতুন উচ্ছ্বাস দিচ্ছে। সে জানে, সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবে, তাই কারও চোখে পড়ার ভয় নেই। ভাইয়াও টের পাবে না। এই ভেবে সে ধীরে ধীরে মেইন দরজা টেনে বন্ধ করলো। তার প্রস্থানটাও নিঃশব্দ হলো।
তারপর হাঁটা দিলো মোড়ের দিকে। যেখানে কাবিরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার কথা। 
 
আজ প্রীতিষাকে খুব বেশি অপেক্ষা করায়নি কাবির। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন ভেঙে দিলো সকল অপেক্ষা, কোলাহল। দূর থেকে প্রীতিষাকে দেখে থামলো সে। কাবির আজ ব্ল্যাক শার্ট পরেছে, বুকের দিকের দুটো বোতাম খোলা রেখে। প্রীতিষার পছন্দ বলে এই রঙের শার্ট পরা। যদিও কাবির অগোছালো ভাবে থাকলেও মাঝে মাঝে পোশাক-আশাক পরিপাটি করেই পরে। সবই তার মন মতলবি। তবে কাবির মানুষটা কখনো পরিপাটি হয় নি। যেমন আজকেও তার চুলগুলো অগোছালো, এলোমেলো। বাহ্যিক ছকে নিজেকে গুছিয়ে নিতে চায় শুধুমাত্র প্রীতিষার জন্য। সে চেষ্টা করে, যতটা পারে। 
 
হঠাৎ কাবির সানগ্লাসটা কপালে ঠেলে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে প্রীতিষার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরোখ করলো। অত্যাধিক সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে। কিন্তু ত্যাড়া কাবির তো বলবে না। তাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর'রে! চেনাই যায় না তোমারে! পুরা খালেদা জিয়া লাগতাছো!”
 
প্রীতিষা চোখ রাঙিয়ে তাকালো। গলায় রাগের আভাস।
“খালেদা জিয়া মানে কী? এটা কেমন কথা, কাবির? একে তো পাঁচ মিনিট ওয়েট করিয়েছো, তার ওপর প্রশংসা না করে এমন কথা শোনাচ্ছো!”
 
কাবির বাইক থেকে নেমে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, 
“হায়'রে মাই'য়া মানু'ষ! তুমি আমারে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করাইছো, এই নিয়া জীবনে কিছু কইছি? আর আজকে পাঁচ মিনিটেই এত ক্ষেইপা গেছো?”
 
প্রীতিষা এবার রেগেমেগে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলে কাবির দ্রুত এগিয়ে এসে তার পথ রোধ করলো। তারপর ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
“আচ্ছা আচ্ছা, স্য'রি। এত অল্পতেই রাগ করলে চলবো? আমি কাবির সারাজীবন জ্বালামু তোমারে, সহ্য করা লাগবো না!”
 
এই বলে কাবির আলতো করে প্রীতিষার হাত ধরে বাইকের সামনে নিয়ে এলো। ইশারা করলো বাইকে বসতে। প্রীতিষা কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে বাইকের দিকে তাকিয়ে রইলো। কারণ কাবিরের বাইক আছে সে জানতো না। দেখেও নি কখনো। তাই প্রশ্ন করলো,
“নতুন কিনেছো নাকি? আগে তো দেখিনি।”
 
কাবির বাইকের গায়ে হাত বুলিয়ে হেসে বলল,
“না, পুরান'ই। এক্সিডেন্টের জন্য সার্ভিসিং দিছিলাম। পরে আমারই আনাইতে দেরি হইছে।"
 
এক্সিডেন্টের নাম শুনে প্রীতিষা স্তম্ভিত হয়ে তাকায় কাবিরের দিকে। চোখ বড় বড় করে বলল,
"এক্সিডেন্ট? কবে হলো? আমি কেন কিছু জানি না?"
 
কাবির প্রীতিষাকে থামিয়ে দিয়ে হালকা গলায় বলল,
"আস্তে আস্তে! কিছুই হয় নাই। খালি হাত ছুঁলছিলো একটু। এই যে..."
 
এই বলে সে কনুই উঁচু করে প্রীতিষার সামনে ধরলো। কব্জিতে সেলাইয়ের লম্বা দাগ দেখে প্রীতিষা আঁতকে উঠে। বলছে এটা নাকি একটু! কাঁপা কাঁপা হাতে ক্ষতস্থানে আঙুল বুলিয়ে স্পর্শ করতেই প্রীতিষার চোখ ছলছল করে উঠে। সেই ছলছল চোখেই তাকালো কাবিরের দিকে। কাবির মুহূর্তেই থমকে গেলো। মনে মনে ভাবলো, 'ইশ, এইসব দেখানোটা ঠিক হয়নি। এখন কাঁদলে বিপদ।' প্রীতিষার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে যাবে তার আগেই কাবির তড়িঘড়ি বলল,
“এই! খবরদার, এক ফোঁটা পানি জানি না পড়ে!এমনে ফ্যাচ কান্দুনি মাইয়া জীবনে দেখি নাই আমি!”
 
প্রীতিষা কাবিরের বাহু চাপরে রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“তুমি কখনো নিজের যত্ন নাও না। সেসব মানলাম। কিন্তু তোমার এই হঠকারিতার জন্য আমি কেন কষ্ট পাবো, হ্যাঁ? তোমার জীবনের সাথে আমি জুড়ে গেছি ভুলে যাও তুমি? আমার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে।”
 
কাবির বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা এত বিগড়ে যাবে।তাই প্রীতিষাকে সামলাতে তার হাত শক্ত করে ধরে নরম স্বরে বলল,
"আমি ঝামেলাই জড়াই নাই, ট্রাস্ট মি। তোমার জন্য আমি নিজেরে হেফাজতে রাখি, রাখা শিখছি। এই এক্সিডেন্ট আমার দোষ না। তাছাড়া ঠিক হইয়া গেছে দেখো। অনেক আগের কাহিনি এটা!"
 
প্রীতিষা দেখলো ক্ষতটা, আসলেই ঠিক হয়েছে। কিন্তু তার অশ্রু ইতিমধ্যে গড়িয়ে পড়ে গেছে অলরেডি। কাবির তা দেখে পকেট একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে সচেতন করে বলে,
"ঘষা না দিয়া আস্তে কইরা মুছো। নাহলে কাজল নষ্ট হইয়া যাবো। পরে ভুতনি লাগলে আমি যামুগা কিন্তু!"
 
কান্নার মাঝেও প্রীতিষা হালকা হাসলো। কাবিরের বাহু চাপড়ে ব্যাগ থেকে আয়না বের করে সাবধানে চোখ মুছে দেখলো কাজল অক্ষত। কাবির আফসোস করে বাইকে বসতে বসতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমরা দুইজনেই ম্যাচিউরড মানুষ। অথচ মাঝে মাঝে নিব্বা নিব্বির মতো কাহিনি করা লাগে তোমার জন্য। এখন তারাতাড়ি পেছনের সিটে বসো। দেরি হইয়া গেলো।"
 
প্রীতিষা সাবধানে বাইকে বসে কাবিরের কাঁধে হাত রাখলো। জিজ্ঞেস করে, 
“এত তাড়াহুড়ো কেন? কোথায় নিয়ে যাবে?”
 
কাবির বাইকে চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে হালকা হাসলো। পাল্টা জিজ্ঞেস করে,
"জায়গার নাম বলতেই হইবো?"
 
প্রীতিষা আলতো হেসে কাবিরকে জড়িয়ে ধরে পেছন থেকে। বলল,
"নাহ, বলতে হবে না। তুমি যেখানেই যাবে আমি তোমার সাথে যাবো।"
 
কাবির হালকা হেসে বলে 
“তাও বলি, একটা স্পেশাল জায়গায়।”
 
প্রীতিষা প্রতিউত্তরে স্নিগ্ধ হাসলো শুধু। আর কাবিরকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলো। মৃদু গুঞ্জনে বাইকটা বেশ জোরেই এগিয়ে গেলো সামনে। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে দু’জনের খুনসুটিময় কথপোকথন মিশে গেলো বাতাসে। 
 
-----------------------------------------
 
কাবির প্রীতিষাকে নিয়ে উঠে এসেছে পরিত্যক্ত এক বারোতলা ভবনের ছাদে। পুরো পথজুড়ে মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলো সে। জায়গাটা নির্জন, চারপাশে মানুষের চিহ্ন নেই বললেই চলে। তাই একটু ভয় পেয়েছিলো প্রীতিষা। কিন্তু কাবিরের উপস্থিতিই ভয়কে সরিয়ে দিয়েছে, সাহস যুগিয়েছে। তার হাতের উষ্ণতায় ভর করেই প্রীতিষা চোখ বন্ধ করে অজানা সিঁড়িগুলো পেরিয়েছে।
 
সবচেয়ে উপরের ছাদে উঠে কাবির ঢিবির মতো উঁচু এক জায়গায় বসে পড়লো। পাশেই রাখলো কিছু সদ্য কেনাকাটার ব্যাগ। তারপর প্রীতিষার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত টেনে তাকে বসালো নিজের পাশে। ছাদের সামনে কোনো বেষ্টনী নেই, নেই কোনো সীমারেখা। একপ্রকার খোলা ছাদ। খোলা আকাশের নিচে বসে মনে হচ্ছে পুরো শহরটাই চোখের সামনে বিস্তৃত। বিভিন্ন দোকানপাট, বাসাবাড়ির ছোট ছোট আলো দৃশ্যমান হচ্ছে। শো শো করে দমকা বাতাস বইছে চারপাশে। শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে দুজনের মুখ, চুল উড়ছে হালকা দোলায়। প্রীতিষা হঠাৎ পাশ ফিরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা তোমার সেই স্পেশাল জায়গা?”
 
কাবির মাথা নাড়লো। ভ্র কুচকে প্রশ্ন করে, 
“ক্যান? ভাল লাগে নাই তোমার? আমি তো মাঝেমধ্যেই আসি এইজাগা।”
 
প্রীতিষা ঠোঁট চেপে মৃদু হাসলো,
“অতটাও খারাপ না। আমাদের একসাথে সময় কাটানোর জন্য বেশ ভালো জায়গা। তাছাড়া কোথাও বসার জো আছে নাকি! সব জায়গায় শুধু ভির, কোলাহল। এটা ঠিক আছে।"
 
কাবিরের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। তারপর কি যেন মনে পড়তেই মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠে। আজ কিছু কথা বলবে প্রীতিষাকে। বলা দরকার। এসব ভেবে নিয়ে গলা ঝেড়ে একটু গম্ভীর স্বরেই বলল,
"হুমম। শোনো, একটা খুবই ইম্পর্টেন্ট কথা বলার আছে তোমারে। যদিও সম্পর্ক শুরুর আগেই বলা উচিত আছিলো। মানে আমার অতীতের ব্যাপারে আরকি।"
 
প্রীতিষা কিছুক্ষণ চুপ রইলো। কি ভেবে যেব সেও ধীর স্বরে বলল,
"তোমার যা কিছু অতীত হোক কাবির, সব সয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু কখনো এটা বলো না, যে আমার আগে তোমার ভালোবাসা অন্য কেউ ছিলো। তাহলে আমি সহ্য করতে পারবো না। একেবারে ভেঙে পরবো। জানি এখনকার দিনে এসব নরমাল, মানুষের অতীত থাকে। কিন্তু আমার জীবনে তুমি প্রথম পুরুষ যাকে আমি ভালোবেসেছি। বিয়েও আমি তোমাকেই বিয়ে করবো। তাই তোমার কাছেও আমার এক্সপেকটেশন একটাই, আমিই যেন তোমার জীবনে প্রথম নারী হই।"
 
কাবির মন দিয়ে প্রীতিষার সব কথা শুনছিলো। ওর চোখে ছিলো গভীর কোমলতা। মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
"এই ব্যাপারে সিওর থাইকো তুমি আমার ফার্স্ট লাভ। নিঃসন্দেহে! আসলে অতীতটা অন্য কিছু। আমার পরিচয়ের ব্যাপারে। যাতে বিয়ের পর তোমার কোনোদিন আফসোস না হয় যে, না জাইনা ক্যান এমন পোলারে বিয়া করলাম!"
 
প্রীতিষা কাবিরের মুখে ফার্স্ট লাভ কথাটি শুনে নিশ্চিন্ত হলো। ব্যস, আর কিছু শোনার নেই তার। প্রীতিষা কাবিরের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,
"ওইযে তুমি বললে না আমি তোমার ফার্স্ট লাভ? ব্যস কথা শেষ। তোমার অতীত, পরিচয় দিয়ে আমার কি? তুমি কাবির তাশরিফ খান, রাইট? আমি এটুকু জেনেই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।"
 
কাবির আবারও বলল,
"আমি কিন্তু কোনো পারফেক্ট পোলা না। আমি আমার মন মতলবে চলি। সেরকম সেভিংস নাই, তবে একজীবনে বউ-পোলপান নিয়া চলার মতো মোটামোটি আছে। কিন্তু সৌখিনতা, স্বাচ্ছন্দ্য আমার জীবনে টোটা'লি নাই। দেখছোই তো, একটা ভবঘুরে টাইপ জীবনে আছিলাম। তুমি আসার পর অবশ্য অনেক কিছুই চেঞ্জ হইছে। আগের কাবিরও অনেকটাই চেঞ্জ হইছে। কিন্তু দিনশেষে সত্য এইটাই পারফেক্ট না আমি!"
 
প্রীতিষা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দৃঢ় গলায় স্বীকারক্তি জানালো, 
“পারফেক্ট-ইমপারফেক্ট কিছু জানি না। আমি তোমাকেই ভালোবেসেছি, তোমাকেই চাই। এখানেই সব কথা শেষ। তাছাড়া একটু প্রেম করতে এসেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে কাঁদাতে চাইছো!”
 
কাবির হেসে উঠলো। যাক, একটা ব্যাপারে মিল পেলো প্রীতিষার সাথে। যে প্রীতিষার এই সম্পর্কের ব্যাপারে অনেক জোর। 'তোমাকেই চাই' টাইপের জোর। এমন কাবিরও। কাবির বলেই ফেললো, 
" জানো প্রীতি, পৃথিবীতে দুই ধরনের সম্পর্ক হয়। এক নাম্বার হইলো, তোমারে পাইলে ঠিক আছে, না পাইলেও সমস্যা নাই। দুই নাম্বার হইলো, তোমারেই আমার লাগবো, তোমারে ছাড়া চলবো না। আমরা দুইজন কিন্তু দুই নাম্বার দলের পাবলিক!"
 
প্রীতিষা মাথা নাড়ালো। এ বিষয়ে সেও সহমত। এরপর সামনে তাকিয়ে রইলো দুজনেই। প্রীতিষা আরেকটু কাছে বসে মাথা রাখলো কাবিরের শক্ত-দৃঢ় কাঁধে। এখানে প্রীতিষার সবটুকু ভরসা আছে। ওভাবে বসেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো তারা। কিছুক্ষণ পর কাবির হাত বাড়ালো সামনে। তার সেই আহ্বানে কোনো দ্বিধা ছিলো না, ছিলো শুধু একান্ত নিশ্চয়তা। প্রীতিষা একটুও সময় না নিয়ে নিজের হাত কাবিরের হাতে সমর্পন করলো। কাবির ধীরে ধীরে প্রীতিষার আঙুলগুলোর ফাঁকে নিজের আঙুল গেঁথে নিলো। সেই হাত মুঠোয় ভরে টেনে নিজের বুকের কাছে এনে রাখলো কাবির।
 
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে ততক্ষণে। প্রীতিষা সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। কাবিরকে পেলে এমনিতেই হুস-জ্ঞান হারায় সে। আজও তাই হলো। এদিকে দূরের শহরের আলো ঝলমল করছে। খোলা আকাশের নিচে বসে দুজন নীরব হয়ে উপভোগ করছিলো একে অপরের উপস্থিতি। শব্দ ছিলো না, কোলাহল ছিলো না সেথায়। শুধু ছিলো একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, আর ভালোবাসার শব্দহীন প্রতিশ্রুতি।
 
---------------------------------
 
প্রীতিষার ফিরতে ফিরতে রাত নেমে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় আটটা ছুঁইছুঁই। কাবির নিজেই তাকে বাইকে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। সারাটা পথ জুড়ে প্রীতিষা চিন্তায় নীরব ছিলো। মনে মনে যদিও প্রস্তুতি নিয়েছে, সাজানো অজুহাতও ছিলো। কিন্তু তবুও চিন্তা থেকেই যায়। দরজার সামনে এসে বাড়ির ভেতর পা টিপে টিপে ঢুকলো প্রীতিষা। এমনভাবে যাতে কেউ যেন তার উপস্থিতি টের না পায়। ঘরের ভেতর ঢুকেই এক মুহূর্তের স্বস্তি পেলো সে। ভাইকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তারমানে প্রীতিষা সেফ। এই ভেবে স্বস্তির শ্বাস ফেলে সে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ পেছন থেকে প্রীষানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
"দাঁড়া! কোথায় ছিলি এতক্ষণ?"
 
প্রীতিষা থমকে গেলো। চলন্ত পা দুটো থেমে গেলো। গলা শুকিয়ে এলে শুকনো ঢোক গিললো সে। ধীরে পেছন ফিরলো ঠোঁটে এক টুকরো কৃত্রিম হাসি এনে। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে পরিস্থিতি সামলাতে চাইছিলো সে। ঠোঁটের আগায় অজুহাতও তৈরি ছিলো। কিন্তু কথা ফোটার আগেই প্রীষান হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে। প্রীষান নিজেই বলল,
 
" কী বলবি, জানি। ইসরাতের সাথে ছিলি, তাইনা? কিন্তু আনফরচুনেটলি, তোর ডায়েরি থেকে ওর নাম্বারে ফোন করে জেনেছি ইসরাত এখন তার খালার বাড়িতে। এখন তুই নিশ্চয়ই ওর খালার বাড়ি যাস নি! তাহলে? ইসরাত ছাড়া আর কোনো বন্ধু আছে, যার নাম নিয়ে অজুহাত দিবি এখন? সত্যিটা বল!"
 
এইবার প্রীতিষার বুকের ভেতর ভয় জমে উঠে। ঘাম জমতে শুরু করেছে কপালে। তার ভাইয়ের এমন অনুসন্ধান সম্পর্কে সে কল্পনাও করেনি। তার ভাই একদিনে এতটা খুঁটিনাটি জানবে, এই ধারণা তার ছিলো না। ঘরের পাশের দরজার আড়াল থেকে প্রিহা আর প্রীভান উঁকি দিচ্ছিলো কাহিনি বুঝতে। সেটা টের পেয়ে প্রীষান গম্ভীর কণ্ঠে বলল, 
"বাচ্চারা, দরজা লাগিয়ে পড়তে বসো। এখানে বড়দের কথা হচ্ছে। যাও!"
 
প্রীষানের ধমকে দুইজনেই মুখ ছোটো করে কোনো দ্বিধা না করেই দরজা টেনে বন্ধ করে দিলো। ঘর যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে গেলো। প্রীষান এবার সোফায় গিয়ে বসলো। কনুই হাঁটুর ওপর রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে ধীর অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“আর ইয়্যু ইন এ রিলেশনশিপ?”
 
প্রীতিষা তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। হাত-পা কাঁপছে তার। শব্দ গলায় আটকে গেছে। বের হচ্ছে না। প্রীষান প্রায় চিৎকার করে ধমকে জিজ্ঞেস করে, 
" ডিড আই আস্ক সামথিং? কথা কানে যাচ্ছে না!!"
 
তীব্র ধমকের ঝাঁকুনিতে প্রীতিষার শরীর মৃদু কেঁপে উঠলো। ঠোঁট কাঁপছে তার, চোখ ভিজে আসছে অশ্রুতে। প্রীতিষা কোনোভাবে মাথা নেড়ে জানালো হ্যাঁ। প্রীষান স্তব্ধ হয়ে গেলো মুহুর্তেই। নিজের কল্পনার বাইরের কোনো সত্য হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তার। প্রথমে বিস্ময়, তারপর ধীরে ধীরে মুখে রাগের ছায়া ভেসে উঠে আসতে থাকে। কিন্তু সে চিৎকার করলো না দ্বিতীয় বার। ঠোঁট চেপে গভীর শ্বাস নিলো। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে আদেশ করে বলল,
 
"ওই ছেলেকে এখনই ফোন কর! এখনি আমার বাসায় আসতে বল! সাহস থাকলে আজকেই যেন আমার সামনে দাঁড়ায়। এক্ষুনি! আর যদি সেটা না করতে পারে…দেন ইয়্যু’ল এন্ড দ্য রিলেশনশিপ রাইট হিয়ার!"
 
চলমান.......
 
( ধুমতানানা ধুমতানানা পর্ব! এখন, প্রীষান দ্য ভিলেন ব্রাদার!🧛‍♀️)
 
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 
 
Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago
পর্বসংখ্যা:৩১
 
 

নিজাম উদ্দীন ঘুমের ঔষধ খেয়ে গভীর ঘুমে। তাই বাড়ির ঠান্ডা আবহাওয়া সম্পর্কে অবগত নয় সে। এদিকে প্রীষানের গলার কঠোরতা হঠাৎ করে ঘরের চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। সেই কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, শুধুই অটল সিদ্ধান্তের শীতল ঘোষনা আছে। কথাগুলো শুনে প্রীতিষার বুক কেঁপে উঠলো অজান্তেই। প্রীতিষার ভয়টা শুধু রাগের জন্য নয়, বরং সেই অচেনা অবিশ্বাসের জন্য যা হঠাৎ করে নিজের আপন ভাইয়ের চোখে দেখতে পেলো সে। সত্যি, প্রীতিষার থেকে এমন কিছু এক্সপেক্ট করেনি প্রীষান। তাছাড়া নিজের ভাইয়ের রাগ সম্পর্কে প্রীতিষার অজানা কিছুই নেই। ছোটবেলা থেকেই জানে, প্রীষান যখন এমন কন্ঠে কথা বলে তখন তার রাগ কোন পর্যায়ে থাকে। তবুও আজকের পরিস্থিতি প্রীতিষাকে এমন এক কোণে ঠেলে দিয়েছে যেখানে দাঁড়িয়ে সে নিজেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। অসহায় দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে প্রীতিষা বলল,
“সম্পর্ক শেষ করে দেওয়ার মতো কথা এত সহজে বলে দিলে, ভাইয়া?”

প্রীষান কোনো উত্তর দিলো না এ কথার। তার চোখে কোনো নরম ভাব নেই। কণ্ঠে কোনো দ্বিধাও নেই। আবারও একই দৃঢ় উচ্চ স্বরে সে বলল,
“ডু এক্সাক্টলি হোয়াট আ'ই সে!"

হতাশার ভারে চোখ বুজে এলো প্রীতিষার। এক মুহূর্ত থেমে থেকে সে ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। পা দুটো নিজের ইচ্ছেতেই তাকে টেনে নিয়ে গেলো বাইরের উঠোনের সামনে। কাঁপা কাঁপা আঙুলে নম্বর ডায়াল করলো কাবিরের।

ওদিকে, কাবির তখন সবে ঘরে ফিরেছে। তখন বাজে ন'টার কাছাকাছি। ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিতেই যাচ্ছিলো কাবির, ঠিক এমন সময় ফোনটা বেজে উঠলো রিংটোনের সুরে। বিরক্তি নিয়ে ফোন তুললেও স্ক্রিনে নামটা দেখে তার বিরক্তি নিমেষেই উধাও হলো। কারণ, প্রীতিষার বেলায় তার সব নিয়ম উল্টো। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো। খুব বেশি অপেক্ষা না করিয়ে কল রিসিভ করে কাবির বলল,
“আরে আরে! আজকাল একটু বেশিই মিস করো নাকি? এই তো আধঘন্টা আগে তোমারে বাড়িতে দিয়া আইলাম। আর এখনি ফোন... ”

কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো চাপা কান্নার শব্দ। প্রীতিষা ফু্ঁপিয়ে কেঁদে উঠেছে। ওপাশ থেকে তা স্পষ্ট কর্নগোচর হয় কাবিরের। তাই
মুহূর্তেই বদলে গেলো কাবিরের দুষ্টুমি স্বর। হাসি মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিলো উৎকণ্ঠা। তাই ঘাবড়ে গিয়ে তারাহুরো করে কাবির বলল,
"প্রীতি! কি হইছে? কানতাছো ক্যান? কেউ কিছু কইছে?"

নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে বাম হাতে চোখ মুছে প্রীতিষা। তারপর ভাঙা কণ্ঠে বলল,
"এত কথা বলার সময় নেই, কাবির। ভাইয়া সব জেনে গেছে। তুমি… তুমি জলদি আমার বাসায় এসো, যত তারাতাড়ি পারো এসো। প্লিজ!"

কথাগুলো শুনতেই এদিকে কাবির আর এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করলো না। তাড়াহুড়ো করে শার্ট গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল,
“ব্যস, দশ মিনিট। আমি আসতাছি। তুমি একদম চিন্তা কইরো না, ঠিক আছে? রাখো এখন।”

"হুম।"

এই বলে ফোনটা কেটে দেওয়ার পর প্রীতিষা এক নিঃশ্বাসে চোখের জল মুছলো। কিন্তু বুকের ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই কমলো না। কাবির না আসা পর্যন্ত কমবেও না।

অন্যদিকে, কাবির ফোন পকেটে পুরে দরজায় তালা লাগিয়ে বাইকে চড়ে বসেছে। রাতের বাতাস কেটে সে এগিয়ে চললো দ্রুত গতিতে। মাঝপথে হঠাৎ থেমে সে এক কেজি মিষ্টি কিনে নিলো। তারপর আবার শো করে বাতাসের বেগে দশ মিনিটের মধ্যে হাজির হলো প্রীতিষার কাছে।

প্রীতিষা তখন উঠোনের বারান্দায় বসে ছিলো নিচে।
বাইকের শব্দে চমকে উঠে গেট খুলতে ছুটে এলো প্রীতিষা। কাবিরকে সামনে দেখে মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, 'সব ঠিক হয়ে যাবে, কাবির সব ঠিক করে দেবে।' এক মুহুর্তের জন্য স্বস্তির শ্বাস ফেলে সে বড্ড আহ্লাদী হয়ে ফুপিয়ে উঠে কাবিরের সামনে। প্রচন্ডরকম ভরসা থাকায় বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না আবারও ফেটে পড়লো মানুষটার সামনে। কাবির এগিয়ে এসে প্রীতিষাকে আলতো করে আগলে নিলো। ভরসা দিয়ে কাবির বলল,
"এইই! আইছি তো আমি! কান্দাকাটির কি আছে? একদিন না একদিন তো জানাতোই, তাইনা? তাছাড়া আমি কইছিলাম না পিরিতির বহুত জ্বালা! তখন তো শুনো নাই, খালি কাবির কাবির কইয়া দৌড় পারছো! এহন ক্যা?"

প্রীতিষা হাত মুঠো করে কাবিরের বুকে ঘুষি মারলো। যদিও কাবিরের বিন্দু পরিমাণও লাগে নি। তা বুঝে প্রীতিষা রেগে গিয়ে বলল,
"এই সিচুয়েশনেও মজা আসছে তোমার!"

কাবির কথা না বাড়িয়ে হেসে বলল,
"যাইহোক, আইছি যখন আমি সব সামলায় নিমু, চলো। আসোও!"

এই বলে কাবির প্রীতিষার হাত ধরে ভেতরের দিকে এগোতে যাচ্ছিলো। কিন্তু প্রীতিষা হঠাৎ কাবিরের হাত টেনে তাকে থামিয়ে দিলো। তারপর ধীর গলায় বলল, 
"দাঁড়াও দাঁড়াও! এভাবে যাওয়া যাবে না। শার্টের উপরের বাটনগুলো লাগাও। এভাবে গুন্ডার মতো যাবে নাকি ভাইয়ার সামনে! "

কাবির ভ্রু কুঁচকে তাকালো। চোখে একটু বিরক্তির ছাপ। তবে নিজেকে নিয়ে বেশ গর্ব করে বলল,
“আমি যেমন, তেমন ভাবেই যাইমু। ফেক ইমপ্রেশন দেখানোর কী দরকার, প্রীতি? কাবির বাটপারি করে না কারো লগে!”

প্রীতিষা নিজের কপালে নিজেই হাত ঠুকলো।  কাবিরকে বোঝানোর মতো বা তার সাথে তর্ক করার মতো সময় নেই এখন। তাই প্রীতিষা নিজেই ব্যস্ত হাতে কাবিরের শার্টের উপরের দুটো বোতাম লাগাতে শুরু করলো। খোলা থাকায় বুক দেখা যাচ্ছিলো। এরপর প্রীতিষা পায়ের উপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে কাবিরের এলোমেলো চুলগুলোও হাত দিয়ে একপাশে গুছিয়ে দিলো যত্ন করে। কাবির এসবে বিরক্ত হয়ে হালকা গলায় বলল,
“মেকআপ নিয়া আসি? এইডাই বাকি আছে, লাগায় দেও! একবারে চ'কচ'ক করমুনে তোমার ভাইয়ের সামনে যাইয়া!”

প্রীতিষা ফিক করে হেসে ফেললো কাবিরের কথায়। বলল,
“লাগবে না… আমার কাবির এমনিতেই সুন্দর। আমি ব্যস একটু পরিপাটি করে দিলাম। এবার চলো।”

এরপর দুজনেই একসাথে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো একটি অনিশ্চিত মুহূর্তের দিকে। 

---------------

কাবির যখন প্রীতিষার সাথে ধরে ঘরে ঢুকলো, হাঁটার সময় তার চোখে পড়লো মেয়েটির মুখ। গালের দু’পাশে অশ্রুর রেখা শুকনো রেখা স্পষ্ট। অনেকটাই কেঁদেছে তা বুঝতে সময় লাগলো না কাবিরের। ওমনি কাবিরের হৃদয়ে অচিন্ত্য রাগের আগুন তরতর করে জ্বললো। ভাবলো, কি এমন খারাপ কাজ করে ফেলেছে প্রীতিষা! ভালোই তো বেসেছে, ভুল কি? এই নিয়ে নিশ্চয়ই ওর ভাই কথা শুনিয়েছে! কতটা কষ্ট পেয়েছে ভাইয়ের জন্য মেয়েটা। প্রীতিষা আনমনেই নিভু নিভু গলায় বলল,
"আজকের এই ভাইয়াকে চিনতেই পারলাম না, জানো? এভাবে জীবনেও আমার সাথে কথা বলেনি, ভাইয়া। এত রাগও কখনো দেখায়নি আমার সাথে!"

কাবির বুঝলো এবার বেশ বড়সড় ঝামেলা হয়েছে এই ভাইবোনের। তাই কাবির বলেই ফেললো,
"হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার ভাইরে দেইখা নিমু আজকে! কত্তবড় সাহস আমার প্রীতিরে কান্দাইছে! তা কোথায় হে তোমার ভাই?"

এই বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চারদিকে তাকালো কাবির। যেন আজকে একটা হেস্তনেস্ত করেই ফিরবে সে। পাশ থেকে প্রীতিষা আঙুল তুলে সামনের রুমে ইশারা করলো। দেখিয়ে দিলো ড্রয়িং রুমের সোফায় ধীর-স্থির হয়ে বসা প্রীষানকে। কাবির সেদিকে তাকিয়ে থমকে গেলো। ওর সব চটপটানি, হম্বিতম্বি ভাব মিলিয়ে গেলো এক নিমেষে। এক ভ্রু উঁচু করে ঠোঁট নাড়ালো ধীরে। আর অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটাই বাক্য,

“আইলা জাদু!” 

আওয়াজ শুনে প্রীষান পাশ ফিরে তাকালো। চোখ মুহূর্তেই বিস্ময়ীভাবে বড় বড় হয়ে গেলো। হঠাৎ চট করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। চোয়াল যেন ঝুলে পড়ার উপক্রম! এই ছেলে এখানে কেন? ভাবামাত্র খানিকটা উঁচু গলায় চিৎকার করে বলল,
“তুমিহ!”
 
অদূরে কাবির বত্রিশ পাটি বের করে দাঁত দেখিয়ে হেসে উঠলো। কেন হাসলো, সে নিজেও জানে না। পাশ ফিরে কাবির প্রীতিষার দিকে এক পলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এইডা তোমার ভাই? সিওর?”

প্রীতিষা হালকা চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আমার ভাইকে আমি চিনবো না! এখন অন্তত মজা করো না, কাবির! বি সিরিয়াস!”

কাবির ঠোঁট কামড়ে বেশ কয়েকবার কপাল চাপড়ে বিরবির করে বলল,
“খাইছে রে! এইডাই তাহলে তোমার ভাই! দুনিয়ায় আর কোনো ভাই আছিলো না?”

প্রীতিষা শুনলেও বুঝতে পারলো না কথাগুলোর মানে কী! তাই সে কাবিরকে বলল,
“ভাইয়ার সামনে গিয়ে বসো, যাও।”

কাবির মাথা নাড়লো। এদিকে প্রীতিষাকে কাবিরের পাশে এভাবে দেখে প্রীষান একেবারে নিশ্চিত হলো সব। কাবির মিষ্টির বাক্স প্রীতিষার হাতে তুলে দিলো। এদিকে প্রীতিষা অবাক হয়ে ভাবছে, 'ভাইয়ার, কি হলো আবার?' 

এরপর কাবির ধীরে ধীরে এগিয়ে প্রীষানের সামনের সোফায় পাশে দাঁড়ালো। কাবির নিজেকে প্রস্তুত করেই এসেছিলো। প্রীষানকে প্রীতিষার ভাই হিসেবে দেখে স্বাভাবিকভাবে চমকেছে একটু, ব্যস আর কি বলার। এতক্ষণের কপালে তোলা সানগ্লাসটি পকেটে রেখে  কাবির গলা খাকারি দিয়ে প্রীষানকে বলল,
“কাম ডাউন, বসেন স্যার! আ'ম অলসো শকড!”

প্রীষান মাথা উঁচু করে কোমরে হাত দিয়ে গভীর শ্বাস ফেললো ত্রস্ত ভঙ্গিতে। তারপর ধপ করে সোফায় বসলো। কাবিরও বসলো বেশ আরাম করে। কিছুক্ষণে সব সামলে নিজেকে ধাতস্থ করে প্রীষান জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার পুরো নাম?”

কাবির স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলো,
“কাবির তাশরিফ খান।”

প্রীতিষা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। পাশে প্রীতিষাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রীষান বলল,
“বাড়িতে মেহমান এসেছে। খাবার-দাবার নিয়ে এসো।”

“জ্বি ভাইয়া।” 

প্রীতিষা কাবিরের দিকে তাকালে কাবির চোখ দিয়ে ইশারায় আস্বস্ত করে তাকে। এরপর প্রীতিষা মিষ্টির বাক্স নিয়ে হেঁটে গেলো রান্নাঘরের দিকে। ওদিকে প্রীষান কাবিরকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে। কিন্তু কাবিরের মুখে চিন্তার ছিটেফোঁটা নেই। সে অলওয়েজ কুল, যেমনটা থাকে। নীরব আড়ম্বর ভাব। অথচ প্রীষানের সাথে পুর্ব পরিচিত হয়েও ভাবাবেগ দেখা যাচ্ছে না তার মুখে। প্রীষান এবার বিস্মিত হয়ে বলল,
“কত দিন ধরে চলছে এসব? তাও আমার বোনের সঙ্গে?”

কাবির এবার চোখ তুলে প্রীষানের দিকে তাকালো। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“বছর হয় নাই আমাদের সম্পর্কের। এই আট-নয় মাসের মতো হইছে মেবি। অনেস্টলি, প্রীতি আপনার বোন আমি জানতাম না। আপনারে চিনছি মাত্র এক-দুই মাস, আর প্রীতিরে… আরও অনেক আগে থেকে। সুতরাং, আপনার বোন বিষয়ক লেনাদেনা নাই এই কাহিনিতে।”

প্রীষান গম্ভীর স্বরে বলল,
“প্রীতিষা বাচ্চা মেয়ে, বোঝে কম। আর এই যুগে সঠিক লাইফ পার্টনার চুজ করা ভীষন কঠিন। এই ক্ষেত্রে আবেগটা আমাদের ভেতর বেশি কাজ করে।”

কাবির তাতে সায় দিয়ে হেসে বলল,
“এইটা ঠিক, প্রীতি আসলেই বাচ্চা। কিন্তু এডাল্ট মেয়ে। অতটাও অবুঝ না যে আবেগের চোটে নিজের ভালো-মন্দ বুঝবো না।”

কথাবার্তার সময়ে প্রীতিষা ট্রেতে করে খাবার নিয়ে এলো। স্ন্যাকস, মিষ্টি আর চা সাজিয়ে। এসব টেবিলে দুজনের সামনে রেখে প্রীতিষা আবার ভদ্রভাবে দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো। হঠাৎ প্রীষান কাবিরের দিকে তাকিয়ে মোক্ষম প্রশ্নটা ছুঁড়লো এবার,
“যদি আমি এই সম্পর্ক মেনে না নিই, তো?”

কাবির প্রতিউত্তরে হালকা হাসলো। মৃদু কণ্ঠে বলল,
“অপেক্ষা করমু আপনার মাইনা যাওয়ার। দুই পরিবারের দোয়া নিয়াই বিয়ে করমু, ইনশাআল্লাহ। দেরি হোক, সমস্যা নাই। বিয়ার জন্য আমরা কেউ'ই ফা'ল পারতাছি না।”

প্রীষান এই উত্তরে খানিকটা স্বস্তি পেলো। কাবিরের স্বভাব পুর্ব পরিচিত তাই অবাক হয় নি কথার ভঙ্গিতে। প্রীষান এবার প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তাও যদি না মানি? তোকে যদি অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিই? আমার বিরুদ্ধে যাবি, প্রীতিষা?”

প্রীতিষা হঠাৎ থমকে গেলো এমন প্রশ্ন শুনে। সঙ্গে কাবিরও থমকালো। ভয় তার মনে জমে গেলো মুহুর্তেই। এতক্ষনে কাবিরের মস্তকে দুশ্চিন্তা হানা দিলো। প্রীতিষা ধীরে ধীরে হলেও দৃঢ় গলায় বলল,
“না ভাইয়া। আমি কোনোদিন তোমার বিরুদ্ধে যাবো না।”

কাবির অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো প্রীতিষার দিকে। তার মানে কি প্রীতিষা তাকে ছেড়ে দেবে? আর এদিকে প্রীষান বিজয়ের হাসি দিলো। প্রীতিষা আবার সেভাবেই দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“এটার মানে এই নয় যে আমার ভালোবাসার বলিদান দেবো আমি। যতদিন লাগুক তোমার মানার অপেক্ষা করবো, ভাইয়া। কিন্তু কাবিরকে ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে নয়। আমি ভালোবাসি কাবিরকে, আর ওর সঙ্গেই সারাজীবন কাটাতে চাই।”

এমন দৃঢ় স্বীকারক্তিতে প্রীষানের মুখ নিভে গেলো নিমেষেই, আর কাবির বিজয়ের হাসি হাসলো। দম যেন এক মুহূর্তের জন্য বেরিয়েই যাচ্ছিলো কাবিরের। তবুও কাবির ঘাবড়ায় নি, কারণ তার প্ল্যান ছিলো এক্ষুনি উঠে গিয়ে কষে থাপ্পড় মারা প্রীতিষাকে। কমপক্ষে দুই-তিনটি থাপ্পড় মারার জন্য প্রস্তুত ছিলো সে কাবিরকে ইনকার করার জন্য। কিন্তু আজ প্রীতিষার মুখে প্রথমবার ঠিক জায়গায় ঠিক সময় ভালোবাসার স্বীকারক্তিতে কাবির সন্তুষ্ট হলো, ভীষণরকম সন্তুষ্ট হলো। 

এদিকে প্রীষানের ভাবনা অন্য কিছু। সে জানে কাবির সৎ, চরিত্রবান, ভালো ছেলে। একটু ছন্নছাড়া বটে, কিন্তু খারাপ নয়। রোজগার করার মতো কাজও করে। খুব বেশি টাকাপয়সা নিয়ে মানুষ জাজ করা চিপ মেন্টালিটির লোক নয় প্রীষান। তবুও বোনের সারাজীবনের প্রশ্ন। তাই এবার কাবিরকে বলল,
“প্রীতিষার সাথে তোমার আকাশ-পাতাল তফাৎ। দুজনের জীবনধারাও সম্পুর্ন অন্যরকম। তারপরও এসব কিভাবে সম্ভব হলো, মাথায় আসছে না। আচ্ছা, এগুলো বাদ দিই আপাতত। প্রীতিষাকে নিয়ে ফিউচারে কি ভেবেছো, বলো?”

কাবির স্পষ্ট স্বরে দিলো,
“কিছুই না। ও পড়াশোনা করতাছে। আমি কি ভাবমু? বিয়া-সাদির প্ল্যান করি নাই এখনো। হুট কইরা আপনি ধইরা ফালাইছেন। এবারে আপনি সরাসরি বলেন, আপত্তি আছে আমারে নিয়া?”

প্রীষান খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
“আপত্তিকর কিছু বলার মতো পাচ্ছি না।"

কাবির কিছু বলল না। সে প্রীষানকে দেখছে, খানিকটা চিন্তিতই লাগছে। বোনের জীবনের প্রশ্ন, বোঝে সে। প্রীষান এবার কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"ব্যস, এতটুকু ইনসিওর করে দিতে পারবে যে আমার বোনকে সারাজীবন ভালো রাখবে, খুশি রাখবে?"

কাবির প্রীষানের হাত দুটো ধরে ভরসা দিয়ে বলে,
"নিঃসন্দেহে!"

প্রীষান এবার গভীর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে স্বস্তি নিয়ে বলল,
“ওকে, তাহলে বিয়ে করে ফেলো প্রীতিষাকে।”

কাবির আর প্রীতিষা একসাথে বিস্মিত হয়ে বলল,
“কিহ?”

প্রীষান ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিলো,
“কেন? বিয়েতে কি সমস্যা? হারাম রিলেশনের থেকে বিয়ে করা অনেক বেটার।”

কাবির চমকপ্রদ হাসি দিয়ে প্রীতিষার দিকে তাকালো। প্রীতিষা তো বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। এদিকে কাবিরের বিয়েতে কোনো সমস্যা নেই। সুযোগ পেলে না কেন করবে যখন সহজভাবে সব হয়ে যাচ্ছে, প্রীতিষাকে সে পেয়ে যাচ্ছে। যদি আবার এই লোক বেঁকে বসে! রিস্কের কি দরকার, তাই প্রীষানকে বলল,
“আমি রাজি, সমস্যা নাই। শুধু কাজি ডাকেন আপনে, হেহেহে!”

প্রীষান এদিকে অবাক হয়ে বলল,
“বিয়ে করতে বলেছি, কিন্তু এখনি না!”

কাবির ঠোঁট কামড়ে উত্তর দিলো,
“না না ভাইয়া, আপনি আমার চোখ খুইলা দিছেন। আসলেই তো রিলেশনশিপ জিনিসটাই হারাম। এর থেকে বিয়া করাই ভালো। তাইলে দেরি কিসের? শুভ কাজে দেরি করতে নাই।”

প্রীতিষা কাবিরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বড় করে বলল,
“কি বলছো? এখনি মানে?”

কাবির স্থির কন্ঠে বুঝিয়ে বলল,
“এখনি কি সমস্যা? হোক বিয়ে। তাছাড়া ভাইয়া ছাড়া তোমার পরিবার বলতে আছেই বা কে? আমারও দুই ভাইবোন আছে, ওদের এখনি ডাকতাছি। বাকি নামমাত্র আত্মীয়দের খাওয়ায় লাভ নাই, সেই খাবারের বদনামই করবো! এর থেকে ওই টাকা জমায়া আমরা হানিমুনে যামু, তাও লাভ।”

প্রীষান বিস্মিত, প্রায় আশ্চর্যজনিত চোখে তাকিয়ে রইলো কাবিরের এমন অযাচিত, উদ্ভট কথা শুনে। প্রীতিষা তা খেয়াল করে কাবিরের বাহু চাপড়ে রেগে বিরবির করে কাবিরকে বলল,
“কি বলছো এসব? ভাইয়া আছে!”

কাবির বিনিময়ে হাসলো ঠোঁট চেপে। সে কবে কার পরোয়া করেছে। এদিকে প্রীষান ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো দু-পাশে। প্রসঙ্গ বদলে কাবিরের উদ্দেশ্যে বলল,
“একদিকে ঠিকই বলেছো,  কে বা আছে আমাদের। আমি কাজিকে ফোন করছি, তুমি তোমার পরিবারকে খবর দাও।”

প্রীষান ফোন নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে গেলো কাজিকে কল করতে। অন্যদিকে কাবির প্রীতিষার বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। প্রীতিষা আচমকা ধাক্কা খেয়ে ভরকালেও মনোযোগ ঘোরালো কাবিরের দিকে। কাবির প্রীতিষার নরম হাত দুটো ধরলো। আর তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। তা দেখে প্রীতিষা বলল,
"এভাবে আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছো কেন?"

কাবির নিজের বুকে প্রীতিষার হাত চেপে ধরে বলবে
"বুকে ব্যাথা করতাছে রে প্রীতি! ইশশ! এত সুন্দর বউ হবো আমার! ইচ্ছা করতাছে চুম্মা খাইতে খাইতে শ্যাষ কইরা দেই!"

প্রীতিষা লজ্জা পেলেও সরল হাসলো। এরপর প্রীতিষার দিকে ঝুঁকে স্বস্তির শ্বাস ফেলে একটা গান গাইল কাবির,

"দুপুরে চাঁদ দেখি, সূর্য রাতে
এ কি হলো আজ, হায় হায় হায়...
হুমকিতে সব গেল holiday-তে
তোর রুপে সব কেটে যায় যায় যায়..."

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩২

 

 

প্রীতিষা ত্রস্ত পায়ে প্রিহার ঘরে ঢুকলো। তখন ঘরজুড়ে একদম নিস্তব্ধতা, অন্ধকার। শুধু ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় দেখা গেলো দুই ভাইবোন দুটো বালিশ জড়িয়ে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। বাইরের পৃথিবীর কোনো কোলাহল তাদের ছুঁতেও পারেনি। অথচ এদিকে বাড়ির ভেতর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে, ঘটেছে কত ঘটনা, কত অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত! সেসব ঘুনাক্ষরেও জানে না এরা। তাই দ্রুত পায়ে প্রীতিষা বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে পড়লো। প্রিহার বাহু ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে ডাকলো,
"প্রিহা! এই প্রিহা! ওঠ! আর কত ঘুমাবি?"

হঠাৎ ডাকায় ঘুমের ঘোরে বিরক্ত হয়ে প্রিহা মুখে বালিশ চেপে ধরে। ভেবেছে তার মণি হয়তো মুভি দেখার জন্য ডেকেছে। কারণ, মাঝে মাঝে প্রীষানের আড়ালে তারা রাত জেগে হরর মুভি দেখে। তাই প্রিহা বিড়বিড় করে ঘুমু ঘুমু গলায় বলল,
"ডিস্টার্ব করো না, মণি… আজ মুভি দেখবো না। ঘুমাতে দাও।"

প্রীতিষা আবার ডাকলেও শুনলো না প্রিহা। উল্টে পাল্টে শুয়ে পড়লো। তাই প্রীতিষা এবার ধৈর্য হারালো। একটানে প্রিহার মুখের উপর থেকে বালিশটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
"আরে পাগল, মুভির জন্য ডাকছি না। আমার বিয়ে হবে একটু পর! ওঠ তাড়াতাড়ি! মিস করবি নাকি!"

কথাগুলো প্রিহার কানে পৌঁছালেও মন সায় দিলো না। আধো ঘুমে সে হেসে উঠে বলল,
"কাবির আংকেলের সাথে গল্প করতে করতে নিশ্চয়ই আবার বিয়ের স্বপ্ন দেখছো তুমি! এখন তো মাঝরাত! তুমিও ঘুমিয়ে যাও। গুড নাইট।"

এই বলে বড় একটা হাই তুলে আবার ঘুমিয়ে যেতে লাগে প্রিহা। এবারে প্রীতিষার কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো,
"স্বপ্ন না, সত্যিই আমার বিয়ে! আর এখন মাঝরাত কে বলেছে তোকে, মাত্র দশটা বাজে। অবেলায় ঘুমিয়ে দিন-রাত গুলিয়ে ফেলেছিস নাকি?"

এই কথায় যেন হঠাৎ বজ্রপাত হলো। প্রিহা ধপ করে উঠে বসলো। চোখে বিস্ময়ের ছায়া তার। আচমকা বিয়ের কথা শুনে কণ্ঠে অস্থিরতা জেকে বসে। চমকে বলে,
"এখন বিয়ে মানে? পাপা তো সন্ধ্যায় তোমাকে কিছু নিয়ে বকছিলো! এরই মধ্যে হুট করে বিয়ে?"

প্রীতিষা আর সময় নষ্ট করলো না। তারও রেডি হতে হবে। কাজিকে অলরেডি ফোন করা শেষ প্রীষানের। কাবিরের বাড়ির লোকজনরাও চলে আসবে। তাই তারাহুরো করে প্রীতিষা বলল,
"এত কথা বলার সময় নেই। আমি আমার ঘরে গিয়ে রেডি হচ্ছি। তুই প্রীভানকে জাগিয়ে সোজা ড্রয়িং রুমে আয়। আর নিজেও রেডি হয়ে আসিস। লোকজন আসবে।"

কথাগুলো বলে প্রীতিষা ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো। প্রিহার ঘরে তখনও বিস্ময়ের আবহ। প্রিহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো বিছানায়। সে এখনো বুঝতে পারছে না এটা স্বপ্ন, না বাস্তব। আসলেই মণির বিয়ে আজ? তারপর ধীরে ধীরে বাস্তবতায় ফিরলে প্রিহা পাশ ফিরে ছোট ভাই প্রীভানকে ঝাঁকিয়ে ডাকতে লাগে। কিছুক্ষণ পর প্রীভান চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
"কি আপু… এখন ডাকছিস কেন?"

প্রিহা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
"ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হ। মণির বিয়ে আজ!"

কথাটা কানে যেতেই প্রীভান বিস্ময়ে চমকে উঠলো,
"এসব কি বলিস আপু!"

প্রিহা নিজেও আর সময় নষ্ট করলো না। আলমারি খুলে তাড়াহুড়ো করে নিজের আর ভাইয়ের জন্য পোশাক বের করতে করতে বলল,
"এত উত্তর দেওয়ার সময় নেই। আমি ওয়াশরুমে যাচ্ছি। তুই এখানে চেঞ্জ করে নে।"

অবুঝের মতো মাথা নাড়লো প্রীভান। আর উঠে চোখ-মুখ ধুয়ে পাঞ্জাবি পরতে লাগে। এখন প্রীভানের মাথায় ঘুরছে যে, হচ্ছেটা কি বাড়িতে? কখনো পাপার বিয়ে ঠিক হচ্ছে, কখনো মণির বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে! সব হঠাৎ হঠাৎ! মানে তারা কিছু জানতেই পারছে না। এ বাড়িতে গুরুত্বই নেই তাদের!

এদিকে প্রিহা হাতে করে কালো গাউন নিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। তার মনেও তখনও প্রশ্ন যে কিভাবে কি হলো! একটু কি ঘুমিয়েছে ওমনি নাকি বিয়ে! আশ্চর্য সব কান্ডকারখানা! 

-----------------------------

প্রীষান নিজের ঘরের আলমারির ভেতর থেকে যত্নে রাখা কয়েকটি ব্যাগ বের করলো। মায়ের স্মৃতি আছে এখানে। শাড়ি, গহনা এসব। যেগুলো সব প্রীতিষার প্রাপ্য। ব্যাগটি নিয়ে প্রীষান কিছুটা ধীর, কিছুটা ভারী পায়ে এগিয়ে গেলো প্রীতিষার ঘরের দিকে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিলো। তা দেখে সে নক করতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলো প্রীতিষা। ঘরে ঢুকেই প্রীষান দেখলো প্রিহা ইতিমধ্যেই সেখানে প্রীতিষার পাশে দাঁড়িয়ে সব গোছাতে ব্যস্ত। ছোট্ট মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে প্রিহা বাবাকে দেখে বলে উঠলো,
“পাপা, দেখো না! মণি তো সাজতেই চাইছে না। এভাবে কি বিয়ে হয়? এত নরমাল ভাবে!”

প্রীষান হালকা হেসে মেয়ের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলো। তারপর প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন? কাবিরের বাড়ির লোকজন তো এখনও এসে পৌঁছায়নি। দেরি আছে।”

প্রীতিষা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমার এত সাজগোজের দরকার নেই। হাতভর্তি চুড়ি, একটু কাজল, কপালে টিকলি… আর বিয়ের শাড়ি, এই তো! হয়ে গেলো না বিয়ের সাজ! আর কি চাই?”

প্রীতিষার সরল কথায় এক অদ্ভুত নিরাভরণ সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিলো। সাধারণের মাঝেও অসাধারণ সে। প্রীষান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো বোনের দিকে। কত তারাতাড়ি বড় হয়ে গেলো, বিয়ে আজ! তারপর ভাবনার মাঝে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেলো প্রীষানের। বলল,
“ওহ, যেটা বলতে এসেছিলাম…”

“কি?”

প্রীতিষা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো। প্রীষান  হাতে ধরা ব্যাগগুলো এগিয়ে দিলো তার দিকে। ধীর গলায় বলল,
“এটা… মায়ের বিয়ের শাড়ি। মা চেয়েছিলো, তোর বিয়েতে তুই এই শাড়িটাই পরিস। আর এই ব্যাগের ভেতরে মায়ের সব গয়নাও আছে। এগুলো সবই তোর।”

কথাগুলো বলতে বলতে প্রীষান গলায় অদৃশ্য এক কাঁপন বয়ে যায়। আজ এইদিনে বাবা-মায়ের থাকার কথা ছিলো। কিন্তু ভাগ্যে নেই যে। 

প্রীতিষা ধীরে ধীরে ব্যাগগুলো হাতে নিলো। এগুলো শুধু শাড়ি নয়। মায়ের স্মৃতি, ভালোবাসা আর অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো প্রীতিষার হাতে আজ। বাবা-মায়ের কথা ভীষন মনে পড়ছে আজ। প্রীষান বোনের থমকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোর জন্য তেমন কিছুই করতে পারি নি। আজ বিয়েটাও কেমন যেন হঠাৎ করে দিয়ে দিচ্ছি। সত্যি বলতে… আমি নিজেই বুঝতে পারছি না, কি করছি, কি হচ্ছে। সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগছে।”

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই প্রীতিষা এগিয়ে এসে তার ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। মাথা নাড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“এসব বলো না ভাইয়া। তুমি না থাকলে আমার কি হতো? আমার আর কে আছে? আর তাছাড়া আমি স্যরি। তোমাকে আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে সবকিছু আগেই বলা উচিত ছিলো। তাহলে আজ তোমাকে এত ডিসাপয়েন্ট দেখতে হতো না। আমি অনেক স্যরি।”

প্রীষান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। সেই স্পর্শে ছিলো মায়া, দায়িত্ব আর আশ্বাস। বলল,
“একটু অবাক হয়েছিলাম, আনএক্সপেক্টেড ছিলো সব। তাতে কি, তোর খুশিটাই আসল। তাছাড়া কাবির ভালো ছেলে, আমি জানি। নাহলে এমনি এমনি ওর হাতে তুলে দিচ্ছি নাকি নিজের বোনকে!”

প্রীতিষা মৃদু হাসলো। এখন কিছুটা হালকা লাগছে তার। প্রীতিষা তবুও নিশ্চিত হতে বলল,
"তুমি রাগ করে নেই তো, ভাইয়া?"

প্রীষান না তে মাথা নাড়ে। প্রীতিষা একেবারে নিশ্চিন্ত হলো এবার। তারপর প্রীষান মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
"ইয়্যু আর লুকিং সো গর্জিয়াস, প্রিন্সেস! আমার প্রিন্স কোথায়?"

"ও তো ড্রয়িং রুমে, পাপা।"

“আচ্ছা, খুব বেশি লেট করো না, প্রিন্সেস। তোমাদের মণিকে সাজিয়ে নিচে নিয়ে এসো। আর এদিকটা তুমি সামলাও, ঠিক আছে? আমাকে নিচে যেতে হবে।”

প্রিহা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
“ওকে পাপা, ডোন্ট ওয়ারি। তুমি যাও।”

---------------------------

এক ফাঁকে প্রীষান চট করে পাঞ্জাবি পরে নিয়েছে। তার সঙ্গে আছে প্রীভানও। দুজনের ম্যাচ হয়েছে মেরুন রঙের কারণে। তবে প্রীভান অন্যদিনের মতো উৎসাহিত নয়। কয়েকদিন ধরে বেশ চুপচাপ সে। নিজের আপু ছাড়া কারো সঙ্গে সে কথা বলছে না। প্রীষান লক্ষ্য করলো, আজ সে তার সাথেও কথা বলছে না। প্রয়োজন ছাড়া এ সপ্তাহে তেমন কথা হয়নি তাদের। দূরে দূরে থাকছে ছেলেটা, তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে প্রীষান। আসলে প্রীভান তার বাবার বিয়ের খবরে আপসেট। প্রীভান যখন বাচ্চাদের কাছে মত আনতে গিয়েছিলো তখন প্রিহা সম্মতি দিলেও প্রীভান চুপ ছিলো। কারণ প্রীভান মানতে পারছে না, কিন্তু বাবার মুখের উপর কিছু বলেনিও সে। 

এদিকে কায়রাভ বাড়ির সবাইকে নিয়ে কাবিরের ফোন পেয়েই বেরিয়ে পড়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা প্রীষানের বাড়িতে পৌঁছায়। প্রীষান তাদের যথেষ্ট আপ্যায়ন করছে। কাবির আগের সেই সাধারণ শার্ট-প্যান্টেই বসে আছে। বিয়ের কোনো প্রস্তুতি নেই। যদিও কায়রাভ একটা শেরওয়ানি এনেছিলো কিন্তু ত্যাড়াটা শুনলো না। তার নাকি গা ম্যাজম্যাজ করে এসবে। কায়রা নিজেও জোর করলে কাবির আগের মতোই নির্লিপ্ত। কায়রাভ হঠাৎ প্রশ্ন করলো,
“আর কেউ ছিলো না? প্রীষান স্যারের বোন! বিশ্বাসই হচ্ছে না।”

কাবির হেসে বললো,
“কাহিনি ওইডা না। আমি প্রীষান স্যারের বোনের লগে প্রেম করি নাই। যার লগে প্রেম করছি, সেই প্রীষান স্যারের বোন। মানে চমলক্য ব্যাপার-স্যাপার!”

কায়রাভ হেসে ফেললো। সামনে কায়েশী অন্য সোফায় চুপচাপ বসে আছে কায়ানের পাশে। তার পাশেই কায়রা বসে। আপাতত এখানে প্রীষান স্যার নেই দেখে কায়রা পাশ থেকে বলল,
“কিভাবে কী করলে ভাইজান? এত সহজে প্রীষান স্যার রাজি হয়ে গেলো তোমাদের বিয়েতে? কোনো ঝামেলা হলো না?”

কাবির বাঁকা হেসে বললো,
“তোর ভাই কি চিজ ভুইলা গেছস!”

কায়রা শুধু মাথা নাড়ালো। আর শব্দ ছাড়া হাত তালি দিয়ে ভাইয়ের বাহবা দিলো। আসলেই মারাত্মক কাজ করে ফেলেছে তার ভাইজান। এবার কাবির কায়েশীর দিকে তাকালো একপলক। একটা লাল রঙের কাঞ্চিপুরম শাড়ি পরেছে সে, আর বরাবরের মতো চুল খোপা করে। তা দেখে কাবির মৃদু হেসে বললো,
“বাহ ভাবী! আজকে আপনারে খুব সুন্দর লাগতাছে।”

কায়েশী ছোট করে উত্তর দিলো,
“থ্যাংক ইয়্যু।”

কাবির এমনিতে কাজ পাচ্ছে না। বসে বসে বোর হচ্ছিলো। আবার কায়েশীও চুপচাপ। তাই কায়েশীকে জ্বালানোর উদ্দেশ্যে বলল,
"কিন্তু আমার বিয়েতে আপনার সাজগোজ কম হইয়া গেছে, আরও সাজা লাগছিলো। আফটার অল, আপনার ওয়ান এন্ড অনলি দেবরের বিয়ে!"

কায়েশী মৃদু হেসে বলল,
"তোমার ভাবীর ন্যাচরাল বিউটি আছে, ভুলে গেছো নাকি! ন্যাচরাল বিউটি ওমেনদের আলাদা করে সাজতে হয় না।"

"বাহ, রুপ নিয়া অহংকার করলেন নাকি? অহংকার করা কিন্তু ভালো নাহ।" 

"তুমিও তো কম করো না। সব সময় স্টাইল মেরে কপালে চশমা তুলে ঘুরতে থাকো। আর মেয়েরা নাকি ঠাস ঠাস করে তোমাকে দেখে পিছলে পরে, বলোনা এসব?"

এইটুকু বলে থামলো কায়েশী। এরপর কায়েশী কিছু বলল না আর। কাবির নিচের ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো শুধু। সেও আর পেছনে লাগলো না। কায়রাভ এবার পাশ কাবিরের কাঁধে হাত রেখে থেকে বলে,
"আমি খেয়াল করে দেখেছি, যখনই তোরা দেবর-ভাবী একসাথে হোস, খোঁচাখোচি করিস কেন ভাই? দু'মিনিট ভালো ভাবে কথা বলিস না! "

কায়রা পাশ থেকে বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
"ঠিক বলেছো ভাইজান, আমিও খেয়াল করেছি।"

কাবির বাঁকা হেসে বলল,
"ভাবীরে ভাল লাগে জ্বালাইতে, বুঝোনা! একটা মাত্র ভাবী আমার! আর কার পেছনে লাগমু? আছেই আর কে?"

কায়রাভ আর কায়রা দুজনেই হাসলো এসব শুনে। এদিকে কায়েশী বিরবির করে কাবিরকে শ-খানেক গালি দিলো। ভাবলো, সবসময় জ্বালায় এই ছেলেটা! জীবনেও ভালো হবে না এ! এর কাছে মেয়ে দিলো কোন দুঃখে কে জানে! বদমাশ, বেয়াড়া একটা! 

হঠাৎ করে কাবির সামনে থেকে এক গ্লাস জল খাওয়ার পর বিষম খেয়ে কায়েশীকে বলল,
"কি ভাবী, গালি দেন নাকি? নাইলে বিষম খাইলাম ক্যান?"

কায়েশী বড় বড় চোখে তাকালে কাবির চুপ হয়ে যায়। তবে কায়রা জোরে হেসে ফেলে। এরই মধ্যে প্রীষান এসে পরে, তার পাশেই কাজি সাহেবকে নিয়ে। 

----------------------------------

প্রীতিষাকে নিচে এনে কাবিরের পাশে বসানো হয়েছে। প্রীতিষা তার মায়ের সেই লাল বেনারসি শাড়িটাই পড়েছে। প্রসাধনী ছাড়াই বড্ড আদুরে লাগছে তাকে আজ। কাবির নিজের বউকে দেখে নির্লিপ্ত ছিলো। কারণ, সে সব প্রশংসা তুলে রেখেছে পরে করার জন্য। প্রীতিষা নিজেও অবাক হয়েছে কাবিরের মুখ থেকে কিছু না শুনে। তবে প্রীতিষা আশা করেছিলো কিছু বলবে, তাই মন খারাপ করে মাথা নিচু করে রইলো সে। এদিকে কাবিরের মাথায় চলছে অন্যকিছু। আপাতত এসবের মুডে নেই সে।

কাজি সাহেব এসে শান্ত গলায় বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন। ঘরের ভেতর এক ধরনের পবিত্র আবহ ছড়িয়ে পড়লো। শব্দগুলো শুধু উচ্চারণ নয়, দু’টি জীবনের বন্ধনে জড়িয়ে যাওয়ার সাক্ষী। নিজাম উদ্দীনও উপস্থিত ছিলেন, সবকিছু গভীর মনোযোগে দেখছিলেন। বিয়ে পড়ানো শেষ হলে উপস্থিত সবাই নবদম্পতির জন্য হাত তুলে দোয়া করলো। মুহূর্তটা ছিলো শান্ত, গম্ভীর, আর সকলের আশীর্বাদে ভরা। কাজি সাহেব উঠে বিদায় নিতে উদ্যত হতেই হঠাৎ কাবির তার এক অপ্রত্যাশিত চাল চাললো। কাজি সাহেবকে আটকে বলল,
“কই যান কাজি আংকেল? বসেন বসেন… আপনারে আবার লাগবো।”

কাজি সাহেব থমকে গেলেন। কাবিরকে তিনি ভালো করেই চেনেন এলাকার ছেলে হিসেবে। ছেলেটার মাথায় কী ঘুরছে, তা বোঝা দায়। আশ্চর্যজনকভাবে কায়রাভের বিয়েও তিনিই দিয়েছিলেন। কায়রাভকে দেখে চিনতে পেরেছেন। সেই বিয়েটা কি ভয়াবহই না ছিলো। তবে একটা জিনিস দেখে কাজি সাহেব স্বস্তি পেয়েছেন, যে কায়রাভ বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে আছে। এদিকে কাবিরের কথায় কাজি একটু ভরকে গিয়েই বললেন,
“আমার কাজ তো শেষ বাবা… আবার কী?”

কাবির ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল,
“আরেকটা বিয়ে পড়ানো লাগবো আপনার।”

কায়রাভ ভ্রু কুচকে তাকালো কাবিরের দিকে,
“কি বলছিস এসব? আবার কার বিয়ে?”

কাবির এবার স্পষ্ট, দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমাদের বোনের বিয়ে। প্রীষান ভাইয়ার সাথে আজই হোক।”

পাশ থেকে প্রীতিষা চমকে উঠলো। প্রীষান চমকায়নি, শুধু ভ্রু কুচকে ফেলে। এখন আবার এগুলো কি বলছে কাবির! তার চোখে বিস্ময়ের ছায়া। প্রীতিষা কাবিরকে বলল,
“মানে? কাবির, কি বলছো তুমি?”

কায়েশীও দ্বিধাভরা গলায় বলল,
“এভাবে হুট হাট বিয়ে করতে হবে কেন? সময় তো চলে যায় নি।”

কাবির মৃদু গলায় বলল,
"আমাদের বংশে স্বাভাবিক বিয়ে হয় না। আপনার হয় নাই, আমারও হয় নাই। বইনের বিয়েটা স্বাভাবিকভাবে হবো, এই বিষয়টা মানাইতাছে না। যদিও লজিকলেস কথা কইলাম।"

কায়েশী চুপ করে রইলো। প্রীতিষা অবাক হয়ে বলল,
"আসলেই লজিকলেস কথা!"

কাবির বলল,
“আমি বুঝি না, বিয়ের কথা শুনলেই সবাই এমন চমকায় ক্যান! এটা তো নরমাল একটা বিষয়।”

কায়রাভ খানিকটা রেগেই বলল,
"নরমাল বিষয়টা নরমাল থাকতে দিচ্ছিস কোথায়?"

এরপর কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রীষানের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“ভাইয়া, এখন সিরিয়াসভাবে কিছু কথা বলি শুনেন। আপনার কি খুব জাকজমক করে বিয়ের অনুষ্ঠান করার প্ল্যান আছে? তা থাকলে আলাদা কথা। আর না থাকলে, আমার মনে হয় আজকেই হয়ে যাক বিয়েটা। সাতদিনের বেশি হয়েই গেছে বিয়ে ঠিক হইছে। অযথা ভাবাভাবি কইরা দেরি করতাছি। কী দরকার? অবশ্য আমি শুধু বললাম। আপনাদের সমস্যা থাকলে হবে না।”

এবার চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। প্রিহা আর প্রীভান প্রীষানের পাশেই ছিলো। প্রীষান হাত আড়াআড়িভাবে বুকের কাছে ভাজ করে দাঁড়িয়ে ছিলো নিরবে। এসব কথা হতেই হঠাৎই পাশ থেকে প্রীভান হনহনিয়ে চলে গেলো উপরের সিড়ি বেয়ে। প্রীষান তা দেখে প্রিহাকে ইশারা করলে প্রিহাও ভাইয়ের পেছনে পেছনে চলে যায়। 

এদিকে সবাই নিজের ভেতরে কিছু হিসাব কষছে।
কাবির এবার কায়রাভের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইজান, তোমার আপত্তি থাকলে বলো।”

কায়রাভ চুপ করে আছে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে। এইমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে সে, চাচার বিয়ে পুরোটা দেখতে পারেনি। কাবিরের কথায় কায়রাভের অবশ্যই আপত্তি আছে। কারণ, বোনের বিয়ে সে এভাবে দিতে চায় না। বড় করে দেবে। কিন্তু কাবিরকে দ্বিমত করলে কাবির নিশ্চিত বলে উঠবে কায়রা তার নিজের বোন বলে বেশি অধিকার দেখাচ্ছে। তাই অগত্যা কাবিরের কথা মেনে কায়রাভ মাথা নাড়িয়ে বোঝায় তার আপত্তি নেই।

কায়রা একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“বললেই বিয়ে হলো নাকি, ভাইজান?”

কাবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে সহজ গলায় বলল,
“তুই অলমোস্ট বিয়ের ড্রেসেই আছিস… আর ভাইয়া পাঞ্জাবি পরে আছে, কাজি আংকেলও আছে। তাহলে প্রবলেমটা কোথায়?”

নিজাম উদ্দীন সায় জানিয়ে বললেন,
"কাবির কথাটা খারাপ বলেনি।"

কাবির ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলল। যাক কেউ তো বুঝলো। প্রীতিষা এদিকে নির্লিপ্ত। কিন্তু কায়রা বুঝতে পারছে না তার ভাইজানের পাগলামির মানে। তাই সে বলল,
"ভাইজান মাথা ঠিক আছে তোমার!!"

কায়রা তড়িঘড়ি করে বলল কথাটা। তার ছোট ভাইজানের সাথে তাল মেলালে তো চলবে না। উল্টোপাল্টা বকছে কি থেকে কি! এভাবে কি করে সম্ভব! সময় তো চলে যাচ্ছে না। তাছাড়া, এভাবে প্রিপারেশন ছাড়া বললেই হলো নাকি! ক'দিন আগে ভালোয় ভালোয় সব ঠিকঠাক হলো। এদিকে এসব শুনে প্রীষান স্যার না রেগে যায় সেই ভয় পাচ্ছে কায়রা। এই ভেবে কায়রা দ্বিমত করে কিছু বলতেই যাবে তার আগেই প্রীষান সবাইকে অবাক করে গম্ভীর স্বরে বলেই দিলো,
"আই সি নো রিজন টু অবজেক্ট। আগে হোক বা পরে, কি আসে যায়? আফটার অ'ল… উই আর অল হিয়ার টুডে। সো… ইট’স নো বদার টু মি। আমি রাজি।"

কায়রা তড়িৎ বেগে ঘুরে তাকালো প্রীষানের দিকে। তার অবিশ্বাস্য চোখ বড় বড় আকার ধারন করেছে। বাকি সকলেও বিস্মিত, বিমুঢ়। শুধু কাবিরের ঠোঁটে হাসি বিরাজমান। এদিকে কায়রা মাথা নেড়ে বলল,
"স্যার আপনার প্রেশারাইজ হয়ে কোনো ডিসিশন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভাইজান তো..."

প্রীষান কায়রাকে থামিয়ে দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
"আমাকে প্রেশারাইজ করে সিদ্ধান্ত নেওয়াবে এমন দ'ম কারো হয় নি। আমার আপত্তি নেই সেটাই বললাম। তোমার আপত্তি আছে?"

কায়রা উত্তর দেয় না। সে তো প্রীষানের জন্য আপত্তি করতে যাচ্ছিলো। সে রাজি থাকলে তার পক্ষ থেকে আপত্তির প্রশ্নই আসে না। কায়রার নিরবতাকেই বাকিরা সম্মতির লক্ষন ধরে নেয়। এদিকে কাবির কাজিকে চিনে ফেলে। তাই তারাহুরো করে বলে,
"অ্যাই, কাজি আংকেল! বিয়ে পড়ান শিগগিরই! আপনি তো আমার বড় ভাইজানেরও বিয়ে দিছিলেন। যে কাম করছিলেন, ভুলমু না জীবনে! এবার আমাদের বোনের বিয়েও আপনিই পড়াবেন, ফাইনাল!"

চলমান.......

(আজকের পর্বে রেসপন্স চাই।🔪)

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩৩
 

 

খান ভিলায় ফিরতে ফিরতে রাত একটু বেশি হয় কায়রাভদের। আধঘণ্টা আগেই তারা পৌঁছেছে বাড়িতে। তবে আজ কায়রাভের মুখটা গম্ভীর। সারাটা পথ সে নির্লিপ্তভাবে শুধু গাড়ি ড্রাইভ করেছে, একটাও কথা বলেনি। সেই নীরবতার ভেতরেই তার অস্থিরতা, ক্ষোভ আর অপার দুশ্চিন্তা একসাথে গুমরে উঠেছে বোনটার জন্য। কায়রাভের মাথা গরম হয়ে আছে এই ভাবে হুট করে বোনটার বিয়ে হওয়ায়। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে সে কিন্তু কিছু বলছে না। কায়েশী অনেকক্ষণ ধরে কায়রাভকে লক্ষ্য করেছে। ঘরে ফিরে পোশাক বদলে কায়রাভ এখন সোফায় বসে আছে। ফোন কানে দিয়ে জরুরি কোনো কলে ব্যস্ত সে। 

এদিকে কায়েশী নিজের মতো ব্যস্ত ছেলেকে নিয়ে। কায়ানকে পোশাক বদলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে সে। আজ ছেলেটা ঠিকমতো খায়ও পারেনি, ওই বাড়িতে সামান্য মিষ্টি খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। মায়ের মন তা মানে না। তাই কায়েশী রান্নাঘরে গিয়ে দুধ গরম করে ফিডারে ভরে আনে। ঘরে ফিরে দেখে কায়ান ঘুমের মাঝেই নিঃশ্বাস ফেলছে ধীরে ধীরে। ঘুমটা গভীর বোঝা যাচ্ছে। এখন জাগানো যাবে না। তাই কায়েশী আলতো করে তাকে শোয়ানো অবস্থাতেই খাওয়াতে শুরু করে। আশ্চর্যভাবে, বাচ্চাটা আধো ঘুমেই ঢকঢক করে পুরো দুধ খেয়ে নেয়। এই ছোট্ট তৃপ্তিটুকু দেখে কায়েশীর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। ফিডারটা রেখে এসে কায়েশী ধীর ভঙ্গিতে বসে কায়রাভের পাশে। নীরবতা প্রথমে ভাঙে সে-ই। কায়েশী বলল,
“হুট করে এভাবে কায়রার বিয়ে হয়ে যাওয়াটা আপনার ভালো লাগেনি, তাই না?”

কায়রাভ একটু পাশ ফিরে তাকায়। ভারী কণ্ঠে বলে, 
“অবশ্যই না। কাবির এটা কি করলো? আমাদের বোন তো আর পালিয়ে যাচ্ছিলো না। এত তাড়াহুড়োর কি দরকার ছিলো?”

কায়েশী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তার স্বভাবসিদ্ধ সরলতায় প্রশ্ন করে,
“তাহলে কাবির যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করলো, তখন আপত্তি করলেন না কেন?”

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে কায়রাভের বুক থেকে।
“তাহলে ও বলতো আমি বেশি অধিকার খাটাচ্ছি বোনের উপর।”

কায়েশী চুপ করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এই সম্পর্কের জটিল হিসাব সে জানে না, জানতে চায়ওনি কখনো। তবুও ধীরে বলে,
“কায়রা তো আপনাদের দুজনেরই বোন। ওর উপর আপনাদের দুজনেরই সমান অধিকার আছে। অধিকার কম-বেশির কাহিনি তো আমি জানি না। এতটুকু বলবো আপনি ভুলে যান এসব। কায়রার যখন বিয়ে হয়েই গেছে এখন আর কি বলার? এবার ভালোয় ভালোয় সংসার করুক মেয়েটা।"

কায়রাভ হাত মুঠো করে ফেলে। চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া গাঢ় হয় বোনের জন্য। সে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“প্রীষান স্যারের অত বড় মেয়ে… আর ছেলেটার বিহেভিয়ার অদ্ভুত লাগলো। কায়রা কীভাবে সব সামলাবে? এসব ভেবে ভেবেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার!”

কায়েশী আলতো করে তার হাত ধরে। সে শান্তভাবে আশ্বাস দিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না। আমাদের কায়রা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে। ও পারবে সব সামলাতে।”

কায়রাভ মাথা নাড়ায় আলতো ভাবে। কিন্তু দুশ্চিন্তা পুরো কাটে না তার। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামে কায়েশীর হাতের ওপর। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে কায়েশীর চোখে চোখ রাখে সে। কিছুক্ষণ কায়রাভ এভাবেই তাকিয়ে থাকে, অপলক। অপ্রস্তুত হয়ে কায়েশী চোখ সরিয়ে ফেলে। এদিক সেদিক চোখ পিটপিট করে কায়েশী বলে,
“এভাবে আমাকে দেখছেন কেন?”

কায়রাভের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠে।
“এখন কি বউকে দেখতেও পারবো না?”

কায়েশীর মুখেও হাসি ছড়িয়ে পড়ে। ছোট ছোট চোখে বলে,
“এই তো, আবার নিজের ফর্মে ফিরছেন। ভালো লাগছে। আপসেট মানায় না আপনাকে।”

ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রিনে নাম মালি চাচার। কায়রাভ উঠে দাঁড়িয়ে কায়েশীকে বলল,
“তুমি গিয়ে শোও, আমি কথা বলে আসছি।”

কায়েশী মাথা নাড়ালে কায়রাভ কল রিসিভ করে বারান্দার দিকে এগোয়। কানে ফোন রেখে বলে,
“হ্যাঁ বলুন চাচা, ব্যাগগুলো পাঠিয়ে দিয়েছেন?”

এদিকে কায়েশী এসে বিছানায় বসে কায়ানের পাশে। চুল বেণি করা শেষে বালিশটা ঠিক করে শুয়ে পড়তেই যাবে তখন হঠাৎই বুকের ভেতরটা কেমন উল্টে উঠে। গা গুলিয়ে ওঠার তীব্রতায় সে তড়িঘড়ি উঠে ওয়াশরুমে ছুটে যায়। প্রায় দৌড়ে। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে গলগল করে বমি করে ফেলে। কপাল বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজে যায়, শ্বাস নিতে সামান্য কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ কল ছেড়ে দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে উপরে মুখ তুলে জোরে জোরে শ্বাস নেয় সে। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকায়। কেমন যেন অস্থির লাগছে তার। ভেতরে কোনো অজানা আশঙ্কা ধীরে ধীরে শিকড় গাঁথছে। তখন ঘর থেকে কায়রাভের ডাক আসে, 
“কায়েশী! ওয়াশরুমে তুমি?”

কায়েশী দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। চোখ-মুখ আঁচল দিয়ে মুছে ট্যাপ বন্ধ করে বলল,
“হ্যাঁ… আসছি আসছি।”

ঘরে ফিরে দেখে কায়রাভ কায়ানের পাশে শুয়ে পরেছে। কায়রাভ তাকে দেখে স্বাভাবিক গলায় বলে,
“ঘুমাবে না? এসো।”

কায়েশী ছোট্ট করে জবাব দেয়,
“হুম।”

--------------------------

রাত তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। ড্রয়িংরুম ভরে উঠেছে হাসি-ঠাট্টার উচ্ছ্বাসের মশগুলে। কায়রা, প্রিহা আর নিজাম উদ্দীন গোল হয়ে বসেছে। তাদের হাসির শব্দ দেয়াল পেরিয়ে ঘরের প্রতিটি কোণায় উপচে পরছে। নিজাম উদ্দীনের বেশ পছন্দ হয়েছে মেয়েটাকে। সে কি আড্ডা দুজনের! প্রিহা তো আছেই। কায়রাও বাবার মতো এমন লোককে পেয়ে খুশি। অথচ এই হাসি-খুশির প্রতিধ্বনি কারও কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে ক্রমেই। নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে প্রীভান মাথার ওপর বালিশ চেপে ধরে রেখেছে। শব্দগুলোকে থামাতে নয়, নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে দমন করতে। তার ঘর অন্ধকার। তার মনটাও তেমনই নিভু নিভু।

ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে প্রীষান। আলো জ্বালাতেই প্রীভানের বিরক্ত স্বর ফেটে পড়ে,
“কি সমস্যা? লাইট কে....” 

কিন্তু বাবাকে দেখে বাকিটুকু আর উচ্চারিত হয় না। শব্দগুলো গলায় গিয়ে থেমে যায়। ঠিক যেমন অনেক অপ্রকাশিত অভিমান থেমে থাকে মানুষের ভেতরে।
প্রীষান এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে। প্রীভান পাপাকে দেখে বলে,
"প্লিজ পাপা, আই নিড স্লিপ। কাল আমার ম্যাথ টেস্ট আছে।"

প্রীষান ছেলের এড়িয়ে যাওয়া স্পষ্ট বুঝতে পারে। তাই  মৃদু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“বাহানা দিচ্ছো? নাকি আমার সাথে কথা বলতে চাইছো না?”

প্রীভান তখনও চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখেছে। তবে চোখ সরিয়ে রাখতে চাইলেও পারেনা। বাবার কণ্ঠে এমন এক টান, যা উপেক্ষা করা কঠিন। প্রীষান বলে উঠে, 
“তাকাও আমার দিকে,” 

প্রীভান তবুও তাকায় না। প্রীষান আবারও বলে,
“যা বলার, আমার দিকে তাকিয়েই বলো। না বললে পাপা বুঝবো কিভাবে? এভাবে ইগনোর করে তুমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছো!”

'কষ্ট' শব্দ শুনে প্রীভান তাচ্ছিল্য হাসে। তা স্পষ্টই দেখতে পায় প্রীষান। অবাক হয় না সে। এরপর প্রীভান তাকায় তার বাবার চোখে। তার ঠোঁটে মেকি হাসি লেগে। প্রীষানকে উপেক্ষা করে সে বলে,
“আমার কি বলার থাকতে পারে। আমি তো ছোট মানুষ! এনিওয়ে, প্লিজ পাপা, আমরা কাল কথা বলি!”

এই বলে প্রীভান আবার শুয়ে পরে। কথাগুলো যতটা সহজ, তার ভেতরের ভার ততটাই গভীর। প্রীষান আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে আলো নিভিয়ে বেরিয়ে যায়। সব বুঝেও না বোঝার ভান করলো। হয়তো সময়ের হাতে ছেড়ে দিলো সবকিছু। 

হাঁটতে হাঁটতে ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে প্রীষান প্রিহাকে নরম স্বরে বলল,
“রুমে যাও, প্রিন্সেস। কাল স্কুল আছে। লেট করো না।”

প্রিহা উঠে দাঁড়ায়। তারও ঘুম ঘুম ভাব এসে গেছে। তাই পাপার কথায় সম্মতি দিয়ে বলল,
 “হুম যাচ্ছি। গুড নাইট, পাপা… গুড নাইট আন্টি।”

কায়রা মৃদু হেসে উত্তর দেয়। প্রিহা চলে যেতেই প্রীষান ভারী গলায় বলে,
 “আমিও রুমে যাচ্ছি। বাবা, আপনিও শুয়ে পড়ুন। রাত হয়েছে। ঘুমোনোর আগে যেসব মেডিসিন আছে ওগুলো মনে করে নেবেন। ”

নিজাম উদ্দীন হালকা হাসেন,
“তা নাহয় যাচ্ছি। কিন্তু তুমি একা ঘরে যাচ্ছো কেন? মেয়েটাকে নিয়ে যাও। বেচারি কি সারারাত এখানে বসে থাকবে নাকি?”

এই কথাটুকুই কায়রার বুকের ধুকপুকানি বাড়াতে যথেষ্ট। সে ইতস্তত করে, শব্দ খুঁজে পায় না। মনে মনে নিজেকেই শাসায় সে, বিয়ের জন্য তেরিবেরি করেছো এতদিন, নাও বোঝে ঠেলা! এমন উল্টো পাল্টা ভাবনার মাঝেই প্রীষানের গম্ভীর গলার ডাক আসে,
“তোমাকে রুমে আসার জন্য ইনভাইট করতে হবে নাকি? এসো।”

কথায় আদেশ থাকলেও তাতে অদ্ভুত এক নিরাবেগতা। কায়রা দ্রুত উঠে দাঁড়ায়, তারপর প্রীষানের পিছু পিছু হাঁটে। মনে মনে ভাবে, নতুন বউয়ের সাথে এভাবে কে কথা বলে? এখন কি রোজ বকাঝকা শুনতে হবে নাকি! অবশ্য কি বা করার? নিজেই এই পথ বেছে নিয়েছে। এটাই কি তার নতুন জীবন? নতুন সম্পর্কের শুরুটা কি এমনই শুষ্ক হয়?হাহুতাশ করতে করতে প্রথমবার স্বামী নামক মানুষটার ঘরে পা রাখে কায়রা।

ঘরে ঢুকে প্রীষান দেখিয়ে দেয় ডিভানের উপর ট্রলি ব্যাগগুলো। বলল,
“ব্যাগগুলো তোমার বাড়ি থেকে এসেছে। নিয়ে নাও।”

কায়রা মাথা নাড়ে। আর ধীর গলায় বলে,
"হ্যাঁ, মালি চাচা এনেছে সম্ভবত। আমার জামাকাপড় আছে এতে।"

যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে কায়রা। ব্যাগ খুলে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। খানিকপর ফিরে আসে সাদা থ্রি-পিস পরে। তখন প্রীষান নির্লিপ্তভাবে ডিভানের একপাশে বসে। পুরোপুরি ভাবলেশহীন ভাব তার। প্রীষানকে এক পলক চোরা চোখে দেখে নেয় সে। কায়রার এদিকে ঘুম পাচ্ছে। তাই দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“বলছি যে, আমি… আমি কোথায় ঘুমোবো?”

প্রীষান চোখ তুলে তাকায়। ভ্রু কুচকে বলে, 
“এত বড় বেড দেখতে পাচ্ছো না?”

কথাটা শুনে কায়রার বুক ধক করে ওঠে। প্রত্যাশা আর অপ্রত্যাশার মাঝখানে দুলতে থাকে সে। আশাও করেনি প্রীষান তাকে বিছানায় ঘুমাতে দেবে। তাই কায়রা প্রতিউত্তর না করে গুটিগুটি পায়ে বিছানায় বসে যায়। কৃত্রিম পায়ের লক সিস্টেম খুলে পাশে রাখে। তারপর গায়ে ব্ল্যাংকেট টেনে শুয়ে পরে আস্তেধীরে। ওপাশে প্রীষান সবকিছুই লক্ষ্য করে নীরবে, গভীরভাবে। কায়রা মাথা তুলে জিজ্ঞেস করে,
“আপনি ঘুমাবেন না?”

প্রীষান উঠে দাঁড়িয়ে ভারী গলায় বলল,
“আমার লেট হবে। তুমি ঘুমাও।”

তারপর সেল্ফ থেকে দুটো বই হাতে নিয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে বারান্দায় চলে যায় সে। সেখানে গিয়ে রকিং চেয়ারে বসে পরে প্রীষান। ঘরটা আবার অন্ধকারে ডুবে যায়। শুধু বাইরের আলো আসছে বিধায় কায়রা দেখতে পায়। কায়রা বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে প্রশ্ন, মনে অনিশ্চয়তা। এই মানুষটা ঠিক কেমন বোঝে না কায়রা। দূরে থেকেও যেন খুব কাছে, আবার কাছে থেকেও অচেনা দূরত্বে দাঁড়িয়ে। কায়রা জানে, এই সম্পর্ক খুব সহজে স্বাভাবিক হবে না। সময় লাগবে, অপেক্ষা করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, তা কায়রার ধৈর্য্য। সেটা যথেষ্ট আছে তার। হঠাৎই এই ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে বাইরে বসে থাকায় চিন্তা হয় প্রীষানের জন্য। পরক্ষণেই ভাবতে থাকে, জীবন কি অদ্ভুত! কালকেও প্রীষানের সাথে কায়রার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। আর আজ সে প্রীষানের ঘরে স্ত্রী হিসেবে তারই বিছানায় রয়েছে। অধিকারের সাথে! ভাবনা শেষে চিত হয়ে শুয়ে বুকের উপর দু-হাত রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকে সে। ঘুম আসে না তারও। রাতটা নির্ঘুম কাটে দুই প্রান্তে থাকা দুজনেরই।

-------------------------------

প্রীতিষা খাটের প্রান্তে চুপটি করে বসে আছে। কাবিরের এই খাট'টা বেশ উঁচু। পুরোনো বলে হয়তো। খাটের কিনারায় তার পা দু’টো আলগোছে দুলছে একেবারে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো। পরনে খয়েরি রঙের শাড়ি। চেঞ্জ করেছে এই একটু আগে। তারপর থেকে বসে আছে এভাবে। যদিও মনে অদৃশ্য এক শূন্যতা। ভাইয়া আর বাচ্চা দুটোর কথা মনে পড়ছে তার। প্রীতিষা খুব মিস করছে তাদের। আবার কায়রা আপুর জন্যও চিন্তা হচ্ছে, বিয়েটা তো কোনোমতে হয়ে গেলো। এবার ভাইয়ার একটা সুন্দর, সুখী সংসার দেখতে পেলেই হয়। এই দোয়াই প্রীতিষা সবসময় করছে। 

বাইরে গেটের তালা লাগানোর শব্দ শোনা গেলো। কাবির তালা লাগিয়ে ঘরে ঢুকলো। দরজা বন্ধ করে একটুখানি থেমে ধীর পায়ে এসে প্রীতিষার পাশে বসলো। তার উপস্থিতি টের পেয়েই প্রীতিষা একটু সরে বসলো অভিমানে। কাবির সেটা একদমই আমলে নিলো না। গলা একটু ভারী করে, মুখে চাপা ক্ষোভের ছাপ এনে বলল,
"তোমার ভাইরে দেইখা যতই জেন্টালম্যান লাগুক না ক্যান, আসলে সে একেবারে ধুরন্ধর লোক! একদম হিসাব কইরা আমার উপর প্রতিশোধ নিছে। আমি তো এক মিনিটের জন্য একেবারে তব্দা খাইয়া গেছিলাম! যে এইসব মনেও রাখছে!"

প্রীতিষা ভ্রু কুঁচকে তাকালো কাবিরের দিকে। তার কণ্ঠে হালকা বিস্ময়,
"কেন? ভাইয়া আবার কি করলো?"

কাবির মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"আমার মুখে আমান মিষ্টি গুঁইজা দিছে! যদিও ওইদিন আমিও অমন করছিলাম, কিন্তু তাই বইলা এমনভাবে শোধ নিবো!"

প্রীতিষা ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
"ভালো করেছে।"

কাবির এবার সত্যিই অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। মনে একফোঁটা অভিমান হলো। কেন সে স্বামীর সাপোর্ট না নিয়ে ভাইয়ের সাপোর্ট নিলো?কাবির আলতো করে প্রীতিষার হাত ধরতে এগোতেই প্রীতিষা মুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিলো। এখন মহাশয়া অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। কাবির ভ্রু কুচকে তাকালো। প্রীতিষা কেন এমন করলো প্রথমে কাবির তা বুঝতে পারেনি। পরে মনে পড়লো, প্রীতিষার প্রশংসা করেনি কাবির। সত্যি বলতে এত কাহিনিতে মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলো। কাবির মৃদু গলায় ডাকলো,
"প্রীতি!"

প্রীতিষার এই ডাকটা খুব পছন্দ। ওর ভালো লাগে যখন কাবির এভাবে ডাকে। ও ভালোবাসা খুঁজে পায় এই ডাকে। কিন্তু সে উত্তর দিলো না। কাবির একটু পাশ ঘেঁষে আবার ডাকলো, 
"অ্যা'ই প্রীতি!"

এবারেও প্রীতিষা নিরুত্তর। কাবির এবার খানিকটা উদ্বেগ নিয়ে বলল,
"কি হইছে, কথা কও না ক্যান আমার লগে? গুস'সা করছো?"

প্রীতিষা এবারেও চুপ। নিজের একগুঁয়ে অভিমান তার ঠোঁট সেলাই করে দিয়েছে। না মানে না, সে কথা বলবে না। কারণটাও খুব বড় কিছু নয়, ওইতো কাবির আজ তাকে দেখে একটুও প্রশংসা করেনি। অথচ এই ছোট্ট না-পাওয়াটাই তার মনে জমিয়ে দিয়েছে এক টুকরো কালো মেঘের ভার। কাবির অবশ্য বুঝেছে। বউয়ের রাগের কারণ তার অজানা নয়। কিন্তু সে তো ত্যাড়া কাবির। সরাসরি 'সুন্দর লাগছে' বলা তার ধাতে নেই। তাই সে বেছে নিলো অন্য পথ। অভিমানের জবাব অভিমানে নয়, অন্যভাবে দেবে। যাতে কাবিরের লাভ আর লাভ। লস নেই।

কাবির আচমকাই এক ঝটকায় প্রীতিষার কোমর ধরে নিজের দিকে টেনে নিলো। অপ্রস্তুত প্রীতিষা সামলে উঠতে না উঠতেই দু’জনের শরীর একসঙ্গে নরম বিছানায় পড়ে গেলো। খাটের ঢেউ খেলানো গদিটা হালকা দুলে উঠলো তাদের হঠাৎ ঘনিষ্ঠতার সাক্ষী হয়ে।বিছানার আশেপাশের পর্দাগুলো পড়ে গেলো খাটের মৃদু দুলুনিতে। প্রীতিষা তখন কাবিরের উপরে ঝুঁকে ছিলো। অকস্মাৎ ঘটনায় চমকে উঠে প্রীতিষা বিস্মিত চোখে তাকায় কাবিরের দিকে। তার দৃষ্টি অগনিত প্রশ্নে ভরা। সে রেগে জিজ্ঞেস করে, 
"এটা কি করলে? ছাড়ো! কোনো কথা নেই তোমার সাথে।"

এই বলে প্রীতিষা নিজেকে ছাড়াতে চাইলো, ছটফট করলো। কিন্তু কাবিরের বাহু এতটাই শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেছে তার নাজুক শরীরটা, যে সে চাইলেও নিজেকে ছাড়াতে পারছে না। ততক্ষণে কাবিরের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি হানা দিয়ে দিয়েছে। মেয়েটাকে আরেকটু কাছে এনে কাবির মিটিমিটি হেসে বলল,
“উহু'ম, ময়না পাখি! এখন তো আর ছাড়মু না। গুইনা গুইনা একশোটা চুম্মা দিমু তোমারে… তারপর থামমু কিনা, সেটা পরে ভাইবা দেখবোনে। আপাতত লেট'স স্টার্ট, পাখি! ”

এসব শুনে প্রীতিষা ভরকে গেলো। কাবির কী বলছে এসব! একশোটা চু'মু দিলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে নাকি? কথাটা ভাবতেই গাল গরম হয়ে উঠলো প্রীতিষার। সে আরও ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু কাবির এবার আরও শক্ত করে তাকে জাপটে ধরেছে। পরক্ষণেই একের পর এক চু'মু পড়তে লাগলো প্রীতিষার ফুলো ফুলো গালে। অবিরাম, নির্লজ্জের মতো চু'মু দিতে থাকলো কাবির। প্রীতিষার চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে উঠে একেবারে রসগোল্লার মতো। বেশ অনেকগুলো চু'মু দেওয়ার পরও কাবির থামছে না দেখে প্রীতিষা হাঁপিয়ে উঠে বলল,
“আল্লাহর দোহাই! ছাড়ো! তোমার এই খোঁচা খোঁচা দাড়িতে লাগছে আমার! উ'ফ'ফ!”

কাবির একটু থামলো। তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি লেগে। কাবির নিজেও হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“লাগলে লাগুক! কইছি না, রাগ না কমলে থাম'মু না আমি।”

এই বলে কাবির আবার এগিয়ে আসতেই প্রীতিষা তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“কমেছে কমেছে! রাগ কমেছে! এবার ছাড়ো!”

শেষমেশ কাবির জয়ের হাসি হেসে ছেড়ে দিলো। প্রীতিষা কাবিরের উপর থেকে উঠে পাশে বসলো আস্তে-ধীরে শ্বাস নিতে নিতে। কাবিরের ঠোঁটে তখন বিজয়ের হাসি। সে নির্ভার, আত্মতৃপ্ত বউয়ের রাগ কমাতে পেরে। সেটা দেখে প্রীতিষা ঠোঁট উল্টে কাবিরের বাহু চাপড়ে বলল,
“সবসময় তুমিই জিতে যাও, কাবির!”

কাবির হেসে ফেললো। প্রীতিষার গাল টিপে কাবির নরম গলায় বলল,
“আসো, ঘুমাই।”

প্রীতিষা একটু অবাক হয়ে তাকালো,
“আসলেই ঘুমোবে?”

কাবির ছোট ছোট চোখে তাকালো। কুবুদ্ধি মাথায় আসতেই ভ্রু নাচিয়ে নাচিয়ে বলল,
“ক্যান, তুমি কি চাইতাছো? ঘুমাবা না?”

প্রীতিষা আরেকদফা ভরকে গিয়ে তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল,
“না না, ঘুমাবো তো!”

কাবির উঠে গিয়ে লাইট বন্ধ করে বিছানায় এসে ধপ করে শুয়ে পড়লো প্রীতিষাকে বুকে জড়িয়ে। সেই বুকে এক অদ্ভুত শান্তি এখন। অবশেষে মেয়েটা তার হয়ে গেছে, সারাজীবনের জন্য। 

দুজন মুখোমুখি কাত হয়ে শুয়ে আছে। প্রীতিষা কাবিরের বুকে মাথা রেখে অন্যমনস্ক হয়ে কাবিরের শার্টের বোতাম নিয়ে খু্ঁটছে। আর কিছু একটা ভাবছে। এদিকে কাবির মিটিমিটি হাসছে। হঠাৎ প্রীতিষার কোমর আঁকড়ে নিজের আরও কাছে এনে কানে কানে বলল,
“ফুল ছাড়া বাসর করমু না।”

কথাটা শুনে প্রীতিষা চোখ-মুখ খিঁচে ফেললো। সে তো একদম স্বাভাবিকভাবেই কথাটা বলছিলো, আর এই ত্যাড়াটা নরমাল কথার ভেতর থেকে কীসব মানে বের করে ফেলছে! সে কখন বাসরের কথা বলল আজব! লজ্জায় তার শরীরটা যেন গুটিয়ে আসছে। কি না কি ভাবলো কাবির! প্রীতিষার হৃদস্পন্দন দ্রুত বেগে বাড়ছে, গাল ক্রমাগত লাল বর্ন ধারণ করছে। আর তার চোখে একটুখানি লাজুক বিরক্তি। কাবিরের কেন যেন মনে হচ্ছে প্রীতিষা লজ্জা পাচ্ছে। তাই আগ্রহের সাথে বলল, 
"প্রীতিইই! লজ্জা পাইতাছো নাকি? দেখমু আমি!"

প্রীতিষা আর না পেরে কাবিরের দু-চোখের উপর হাত রেখে বলল,
"কোনো দেখাদেখি নেই। চুপ করে ঘুমাও তো এখন! আর একটাও কথা না, হু'শ! বুনো ষা'ড় একটা!"

কাবির হেসে মেয়েটার ফুলো ফুলো গাল টিপে দিয়ে বলল,
"আর তুমি আমার মিষ্টি গরু...."

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩৪

 

 

 
আড়মোড়া ভেঙে কায়রা বেশ সকালেই ঘুম থেকে উঠলো। বিছানায় খানিকক্ষণ মোচড়ানোর পর উঠে বসে রইলো নিজেকে ধাতস্থ করতে। চোখে এখনও ঘুমের রেশ। ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে, সাতটা বাজে।
কায়রা পাশ থেকে নিজের পায়ের সাথে লক সিস্টেম জুড়ে নেয়। তারপর ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটাহাটি করে। এখন এই কৃত্তিম পা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। চলাফেরায় এই বস্তুটা ছাড়া তার গতি নেই। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগলেও সময়ের সাথে সাথে মেনে নিয়েছে। অভ্যাস করেছে কৃত্তিমতার সাহায্য নিয়ে হাঁটাচলায়। আগে অবশ্য খুব সমস্যা হতো, ভালোভাবে হাঁটতে পারতো না সে। কিন্তু এখন এই জিনিসটা বেশ আয়ত্তে এসেছে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না। 

কায়রা হাতমুখ ধুয়ে প্রথমে খেয়াল করলো ঘরে প্রীষান নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে উঁকি দিয়ে দেখলো। নাহ, কোথাও নেই! মনটা খানিকটা খারাপ হয়ে গেলে ঘরে ফিরে এলো সে। কি ভেবে যেন বারান্দায় যেতেই পাশে চোখ পড়লো। থমকে গেলো কায়রা। রকিং চেয়ারে প্রীষান ঘুমিয়ে আছে। বুকের ওপর রাখা খোলা বই, চোখে রিডিং গ্লাস, সিল্কি ঘাড়সম এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে হালকা দুলছে।
হঠাৎ, এই শান্ত, অপ্রত্যাশিত দৃশ্য কায়রার চোখে অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে দিলো। মুহূর্তটা চোখে ধরার মতো হয়ে গেলো তার কাছে। সদ্য প্রস্ফুটিত টগর ফুলের মতো লাগছে প্রীষানকে। সফেদ, কোমল, ঝরঝরে। অত্যাধিক ফর্সা হওয়ায় কায়রা নিজের মনে এই উপমাই দিলো তাকে। ভাবনা ছেড়ে ধিমি গলায় কায়রা ডেকে উঠলো,
"এইযে… শুনছেন? স্যার?"

প্রীষান আস্তে আস্তে চোখ মেললো। অবাক না হয়ে কায়রাকে দেখে স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলো,
"উঠে গিয়েছো? কয়টা বাজে?"

"সাতটা।"

প্রীষান বুক থেকে বই সরিয়ে রিডিং গ্লাস খুলে উঠে দাঁড়ালো। তারপর সোজা রুমের ভেতরে চলে গেলো। ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল করলো নিত্যদিনের অভ্যাস অনুযায়ী। তার প্রতিটি নড়াচড়া কায়রার চোখে শান্ত, অভ্যস্ত মনে হলো। ততক্ষণে কায়রা সোফায় বসে রইলো। তার মাথা ভারী ভারী লাগছে। মাথায় একটাই ভাবনা বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে তখন থেকে। যে, বারান্দায় সারারাত প্রীষান স্যার তার জন্য কাটিয়েছে, কষ্ট করে। আর সে নাকি দিব্যি বিছানায় আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়েছে! এই উপলব্ধি তাকে চরম অপরাধবোধে ভরিয়ে দিলো। 

তখন প্রীষান গোসল শেষ করে ছাইরঙা টিশার্ট পরে হাতে তোয়ালে নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ঘরে প্রবেশ করলো। কায়রা কিছুটা সংকোচ করে জিজ্ঞেস করলো,
"আপনি কাল সারারাত বারান্দায় ছিলেন?"

প্রীষান সংক্ষেপে শুধু বলল,
"হুম।"

কায়রা চোখে অল্প শঙ্কা, অল্প অনুশোচনার মিশ্রন। কায়রা ধিমি গলায় বলল,
"শুধু শুধু কষ্ট করার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। আমি নাহয় অন্য রুমে চলে যেতাম। তাছাড়া একটা রুম তো খালি আছেই। আপনি অযথা কেন কষ্ট করবেন?"

প্রীষান ঘাড় বাকিয়ে পিছু ফিরে তাকালো। বিমুঢ়, কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
"তোমাকে বিয়ে করেছি আমি। উই আর নট অ্যাক্টিং লাইক আ টিপিকাল কাপল ফ্রম এন ইন্ডিয়ান সিরিয়াল! তাই অন্য রুমে যাওয়ার কথা বলা বন্ধ করো। জাস্ট গিভ মি আ লিটল টাইম টু গেট মাইসেল্ফ মেন্টা'লি প্রিপেয়ার্ড।"

কায়রা ধীরে ধীরে উত্তর দিলো,
"আমি তাড়া দিচ্ছি কোথায়? আপনি যত ইচ্ছে সময় নিন। আমার এই সম্পর্কে কোনো জোর নেই। রিলাক্স।"

প্রীষান অবাক হয়ে একটু ভ্রু উঁচু করে বলল,
"কেন জোর নেই?"

"আমাদের তো আর পাঁচটা দম্পতির মতো ভালোবাসার সম্পর্ক নয়। সবকিছুতে অনেক জটিলতা আছে। তাহলে আমি কি নিয়ে জোর করবো, বলুন? অতটা অবুঝ নই আমি।"

প্রীষান তা শুনে কায়রার দিকে গভীর দৃষ্টি রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
"আর পাঁচটা দম্পতির মতো আমাদেরও স্বাভাবিক সম্পর্ক হবে। আই প্রমিস! তবে সেই পর্যন্ত আমাদের দুজনকেই যেতে হবে, একটু সাফা'র করে।"

কায়রা নরমভাবে মাথা নাড়ালো। তারপর স্নিগ্ধ ধীরতায় নিচে চলে গেলো। প্রীষান তার যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘুরে আলমারি থেকে পোশাক বেছে রেডি হতে লাগলো। ঘড়ি দেখে বোঝা গেলো ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আবার বাচ্চাদেরও স্কুল নিয়ে যেতে হবে।

----------------------

কায়রা আজ ওড়নাটা কোমরে বেঁধে একেবারে  গৃহিণীর ভঙ্গিতে রান্নাঘরে নেমেছে। নতুন সংসারের এক মৃদু উচ্ছ্বাস ঝিলমিল করছে তার মনে। সে তো সবাইকেই আপন করতে চায়। তার শুরুটা আজ থেকেই হোক। আপাতত আজকের নাস্তার প্ল্যান হচ্ছে, গরম গরম পরোটা আর আলুর দম। খালা অবশ্য বারবার এসে রান্না করে দিতে চাইছিলেন, কিন্তু কায়রা আলতো হেসে না করে দিয়েছে। বাকিসব কাজ খালার হাতে ছেড়ে দিয়ে রান্নার দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে নিয়েছে। তার যুক্তি একটাই- তার সংসার, তার পরিবার… রান্নাটাও তার'ই হওয়া উচিত।

এরই মাঝে নিজাম উদ্দীন ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছেন। রান্নাঘর আর ডাইনিংয়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়। জানালা দিয়ে একটু উঁকি দিলেই দেখা যায়। রান্নার সুঘ্রাণ পেতেই তিনি মুচকি হেসে বললেন,
"তো আজ বউমার হাতে ব্রেকফাস্ট খাবো?"

কায়রা জানালার দিকে তাকিয়ে খুশিমনে বলল,
"জ্বি জ্বি। তাও খুব সুস্বাদু খাবার! নিজের প্রশংসা নিজেই করলাম, হাহাহা!"

ঠিক তখনই প্রিহা স্কুল ড্রেস পরে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। ডাইনিং এ বসতেই দাদুর সাথে কথার ফাঁকে কায়রা খাবার এনে টেবিলে সাজিয়ে দিলো দুজনের সামনে। নিজাম উদ্দীন আনন্দ নিয়ে খাওয়া শুরু করলেন এবং অবশ্যই বউমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। কিন্তু প্রিহা খাবার দেখে একটু নাক কুঁচকালো। সন্দেহভরা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"এটা কি খুব অয়েলি খাবার?"

কায়রা মনে মনে হেসে ফেললো এই ভেবে, হাইজিন বাপের হাইজিন কন্যা! কিন্তু মুখে বলল,
"না, সব একদম কম তেল দিয়েই বানানো। খেয়ে দেখো।"

প্রিহা ধীরে পরোটার একপাশ থেকে টুকরো ছিঁড়ে মুখে দিলো। পরের মুহূর্তেই তার ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়লো এক তৃপ্তির হাসি। উচ্ছসিত স্বরে বলল,
"ফার্স্ট টাইম আলুর দম ট্রাই করলাম… আসলেই টেস্টি!"

কায়রা অবাক হয়ে বলল,
"ফার্স্ট টাইম?"

প্রিহা খেতে খেতে হেসে বলল,
"হ্যাঁ সত্যিই! মণি তো সবসময় ভেজিটেবল আর হেলদি খাবারই বানায়। কম তেল, কম মশলায়। পাপা আর মণি দুজনেই হাইজিন এক্সপার্ট। সেই সুবাদে আমরাও! হেলদি ফুডের নামে প্রতিদিন ঘাসপাতা খেতে হয় আমাদের!"

প্রিহার কথায় কায়রা হেসে ফেললো। চোখে মৃদু স্নিগ্ধতা নিয়ে বলল,
"হেলদি ফুড খাওয়া অবশ্যই ভালো। কিন্তু মাঝে মাঝে মুখের স্বাদেরও একটু গুরুত্ব দেওয়া উচিত।"

তখন শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো প্রীষান। তার মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীরতা থাকলেও, ডাইনিং টেবিলের হাসিঠাট্টা এক মুহূর্তের জন্য সেই কঠিন রেখাগুলো নরম করে দিলো।
প্রিহা তার বাবাকে দেখে হাসিমুখে বলল,
"গুড মর্নিং, পাপা!"

প্রীষান তার পাশের চেয়ারে বসে মৃদু স্বরে উত্তর দিলো,
"গুড মর্নিং, প্রিন্সেস।"

কায়রা নীরবে এগিয়ে এসে তার সামনে খাবার পরিবেশন করলো। প্রীষান খাবার দেখে ভ্রু কুচকে কিছু বলার আগেই নিজাম উদ্দীন হেসে বললেন,
"অয়েলি নয়, খাও।"

প্রীষানের কপালের রেখা সরে যায়। এরপর কিছু না বলে খেতে শুরু করলো সে। আলুর দমে মশলাটা একটু কম হলে হয়তো পারফেক্ট হতো। কিন্তু সে তা প্রকাশ করলো না। বরং খাওয়ার ফাঁকে ছোট করে বলল,
"ভালো হয়েছে।"

এই সামান্য প্রশংসাতেই কায়রার চোখে এক টুকরো তৃপ্তি ভেসে উঠে। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো প্রীভান। পরনে স্কুল ড্রেস, ব্যাগ নিয়েই নেমেছে সে। তবে তার মুখে হালকা বিরক্তির ছাপ। প্রিহা জিজ্ঞেস করলো,
"লেট করলি কেন?"

প্রীভান নিচু গলায় বলল,
"মোজা পাচ্ছিলাম না।"

প্রীষান ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
"খেতে বসো, বাবা। স্কুলের সময় হয়ে আসছে।"

প্রীভান চুপচাপ এসে বসে পড়লো চেয়ারে। কায়রা অন্যদের মতো প্রীভানের প্লেটেও খাবার তুলে দিলো।
প্রীভান সরু চোখে একবার খাবারের দিকে, একবার কায়রার দিকে তাকালো। মনে মনে হিসেব কষছে, এই রান্না কি এই মহিলার বানানো? তার ভাবনার মাঝেই প্রিহা খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। হাত ধুতে যেতে যেতে হাসিমুখে কায়রাকে বলল,
"সব মিলিয়ে খাবার দারুণ ছিলো, আন্টি। রিয়েলি ডিলিশিয়া'স!"

কায়রা মৃদু হেসে প্রিহার কথার জবাব দিলো। এই এতটুকু কথাই যেন প্রীভানের সন্দেহকে নিশ্চিত করে দিলো যে রান্নাটা কায়রার করা। প্রীভান হঠাৎ করেই মুখ গোমড়া করে বলল,
"আমি খাবো না। খিদে নেই আমার।"

প্রীষান ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকালো। গলায় মিশ্র স্বর তার, 
"খিদে নেই মানে? কাল রাতেও ঠিক করে কিছু খাওনি। তাছাড়া দেখো, আজ তোমার পছন্দের ব্রেকফাস্ট হয়েছে। আই থিংক, ইয়্যু লাইক ইট।"

কিন্তু কথাগুলো প্রীভানের কানে পৌঁছালো না। সে হঠাৎ করেই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো। টেবিলের চারপাশের হালকা উষ্ণতা মুহূর্তেই থমকে গেলো। বলল,
"আমি খাবো না, পাপা। বললাম তো খিদে নেই! এখন কি জোর করে খাওয়াবে?"

প্রীষান এবার চুপ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। তার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। হাত থেমে গেলো, খাবারও। তারপর ধীরে, দৃঢ় গলায় বলল,
"খেতে বসো, প্রীভান। সিট।"

কিন্তু প্রীভান আজ ক্ষোভে হুস হারিয়েছে। বিরক্তি জমে উঠে এলো কণ্ঠে। উচ্চস্বরে বলল,
"বলছি তো খাবো না! বার বার একই কথা কেন বলছো? এই মহিলার রান্না করা কোনো খাবারই খাবো না আমি!"

কথাটা যেন ছুরির মতো বিধলো কায়রার গায়ে।
প্রীষান অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো ছেলের ঔদ্ধত্যের উপর। কায়রাও থমকে গেলো। মুহূর্তেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে। প্রীভান তাকে পছন্দ করেনি… একদমই না। তাই ইগনোর করে চলছে তাকে। কিন্তু এত ঘৃনা কেন? প্রীষানের কণ্ঠ এবার শক্ত হলো,
"এই 'মহিলা' মানে? এসব কী ধরনের ল্যাংগুয়েজ? সে তোমার থেকে যথেষ্ট বড়। ইয়্যু শুড রেসপেক্ট হার।"

প্রীভান ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিলো। বাবার কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বলল,
"আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি। তোমরা খাওয়া শেষ করে এসো।"

সে ঘুরে পা ফেলতেই ঠা'স করে শব্দ হলো। একটা তীব্র শব্দ পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিলো। সেই শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো চার-দেয়ালে। ভয়ে পা থেমে গেলো প্রীভানের। প্রীষান টেবিলে এমন জোরে থাবা মেরেছে যে প্লেটগুলো কেঁপে উঠলো ঝনঝন শব্দে। কায়রা অনিচ্ছাসত্ত্বেও চমকে উঠলো। প্রিহা দু-পা পেছনে সরে গেলো ভয়ে। নিজাম উদ্দীন নিশ্চুপ, স্থির হয়ে আছে। বাবার শাসনে সে কিছু বলবে না। 

প্রীষান রাগ এবার আর চেপে রাখতে পারলো না। তার গলা ভারী, তীক্ষ্ণ, হিসহিসে,
"খেতে বসো, প্রীভান। এক্ষুনি বসবে! নিজের বাবার সাথে ঔদ্ধত্য আচরণ করেছো! এত অবাধ্য কবে থেকে হয়েছো!!"

প্রীভান ভয়ে গুটিয়ে গেলো। চোখ দুটো কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো মুহুর্তেই, ঠোঁট কাঁপছে হালকা। শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসে পরলো সে। খিদে তো লেগেছিলোই, কিন্তু জেদ আর ক্ষোভের দেয়ালে আটকে ছিলো সেই চাওয়াটা। পাপার কঠোর দৃষ্টির সামনে আর টিকতে পারলো না। কোনো রকমে পরোটার টুকরো মুখে দিলো, গিলে নিলো তাড়াহুড়ো করে। খাওয়া নয়, একটা বাধ্যতা পালন করলো।
খাওয়া শেষ হতেই আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না সে। চেয়ার ঠেলে উঠে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে। কান্নাটা আর চেপে রাখা যাচ্ছিলো না। কিন্তু বাইরের কারো সামনে প্রীভান কাঁদবে না। তার মনে অভিমান জমলো পাপাকে নিয়ে। আর ওই মহিলাকে নিয়ে ক্ষোভ দ্বিগুণ হলো। কারণ আজ ওই মহিলার জন্যই পাপা তার সঙ্গে এমন করেছে! 

ঘরের ভেতর নিঃশব্দ চাপা উত্তেজনা তখনও ঘনীভূত।
প্রীষান গভীর, অস্থির একটা শ্বাস ফেললো। তারপর কায়রার দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,
"পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসবে, কায়রা। আজ থেকেই কলেজ যাবে। আমি গাড়ি নিয়ে ওয়েট করছি।"

কথাগুলো বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো সে।
প্রিহা একবার কায়রার দিকে তাকালো। তারপর সেও বাবার পিছু পিছু চলে গেলো। কায়রা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো হতবম্ব হয়ে। পুরো দৃশ্যটা এখনো তার মাথায় ঠিকমতো বসছে না। তারপর ধীরে ধীরে নিজাম উদ্দীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
"বাবা… স্যারের এত রা'গ কেন? আমি তো ভাবতাম আমার ভাইদেরই রাগ বেশি। কিন্তু এখন তো দেখছি, প্রীষান স্যার এদের বা'প! এনার সাথে আপনার মেয়ে সংসার কীভাবে করেছে? আল্লাহ, আল্লাহ!"

নিজাম উদ্দীন হেসে ফেললেন। সেই হাসিতে ছিলো অভিজ্ঞতার শান্ত ছায়া। কায়রাকে তাড়া দিয়ে বলল,
"তুমি গিয়ে তৈরি হয়ে নাও, আম্মা। না হলে দ্বিতীয় ঝড় কিন্তু তোমার ওপর দিয়েই বয়ে যাবে।"

কায়রা আর এক মুহূর্ত নষ্ট করলো না। তাড়াহুড়ো করে ঘরের দিকে পা বাড়ালো। অতি দ্রুতবেগে, দৌড়ে।

---------------------------

প্রীষান বাচ্চাদের স্কুলে ড্রপ করে দেয়। এরপর কায়রাকে নিয়ে রওনা দেয় ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। প্রীষানের মুখটা গুরু-গম্ভীর। চোখের দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ। হাত গাড়ির স্টিয়ারিং-এ দক্ষভাবে চলছে। কায়রা পাশ ফিরে প্রীষানের গম্ভীর মুখ দেখতে থাকে। নিরবতা ভেঙে কায়রা ধীর স্বরে বলে,
"বাচ্চাদের উপর রেগে, বকাঝকা করতে নেই। ধীরে-সুস্থে বোঝাতে হয় তাদের।"

সে কথার প্রতিউত্তর প্রীষান দেয় না। তার দৃষ্টি সামনে অটল। কায়রা আবারও বলল,
"আমি ভাবছি... আমাদের বিয়ের কথাটা কাউকে জানাবো না।"

প্রীষান চোখ সামনে রেখে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
"কেন? কি সমস্যা?"

কায়রা ইতস্তত করে বলে,
"সবাই কি ভাববে? এভাবে হুট করে.. কন্ট্রোভার্সি হবে শুধু শুধু।"

প্রীষান হালকা গম্ভীর গলায় বলল,
"উইথআউট রিলেশন আমার সাথে গাড়িতে আসবে-যাবে। স্টুডেন্টরা সেটা দেখবে। তখন তারা কি ভাববে? কন্ট্রোভার্সি কমবে এতে? ঘটে এত বুদ্ধি তোমার!"

কায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাবলো, আসলেই তো! সে কি বলদের মতো কথা বলছে। তাই কায়রা মাথা নেড়ে বলে,
"তাও ঠিক। কিন্তু সবাই তো আর জানবে না। বড়জোর আমার ক্লাসের স্টুডেন্টরাই জানবে।"

প্রীষান ধীর কন্ঠে বলল,
"যারা জানার জানবে। কাল রাতে ম্যারিড স্ট্যাটাস দিয়ে দিয়েছি। কন্ট্রোভার্সির কোনো সুযোগ নেই।"

কায়রা হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলো। কিছু বলার আগেই প্রীষান গমগমে গলায় বলল,
" ক্লাসে আমাকে সারাক্ষন দেখা বন্ধ করো! এসব ইরিটেড করে আমায়। আর পারলে আমি কি পড়াই সেটাতে মনোযোগ দেবে।"

কায়রা অবাক হয়ে বলে,
"আপনি লক্ষ্য করেছেন?"

প্রীষান হালকা হেসে বলে,
"সারা সপ্তাহ তোমাকে খুজে পাওয়া যায় না। অথচ সপ্তাহে দু'দিন ইকোনোমিক্স ক্লাসে ম্যাডাম উপস্থিত থাকে। তাও ফার্স্ট বেঞ্চে! হা'হ!"

কায়রা তো অবাকের উপর অবাক। এবার সে বেশ রয়ে-সয়ে জিজ্ঞেস করে,
"আগে একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে হতো? কিন্তু ভয়ে বলতে পারতাম না। কিন্তু এখন বলি, আচ্ছা আপনি আমাকে দেখতে পারেন না কেন?"

প্রীষান সে কথার উত্তর দিলো না। শুধু গাড়ি থামিয়ে বলল,
"নামো। এসে গেছি।"

কায়রা মুখ বাকিয়ে নেমে পরলো। তারপর সামনে এগোতে শুরু করলো একাই, ত্রস্ত পায়ে। হ্যাঁ, সে একাই যাবে ক্লাসরুমে।

-----------------

দুপুর দুটোয় ক্লাস শেষ হতেই কায়রা ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে আসে বন্ধুদের সাথে। তার পাশে হাঁটছে দিপ্তি আর জিহাদ। কথাবার্তা বলতে বলতে ক্যাম্পাসের রোদমাখা পথ ধরে তারা ধীরে ধীরে হাঁটছিলো। হাঁটতে হাঁটতে দোতলা বিল্ডিং এর নিচে চলে যায় তারা। ছুটির আগে প্রীষান অলরেডি কায়রাকে মেসেজ করে রেখেছে যে আড়াইটার সময় গাড়িতে বসে ওয়েট করতে। তার অফিশিয়াল কিছু জরুরি কাজ আছে, সেসব শেষ করেই প্রীষান আসবে।

আজ কায়রার সঙ্গে থাকায় তার বন্ধুরা বেজায় খুশি। দিপ্তি আনন্দের সাথে কায়রার এক হাত জড়িয়ে বলল,
“তুই আবার মুভ অন করেছিস দেখে ভালো লাগছে। আমরা ভয়ে পেয়ে গেছিলাম! ওই বিভৎস ঘটনা আজও চোখে ভাসে আমাদের।”

কায়রা ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসি খেলে বলল,
“বাদ দে। আমি ওসব ভুলে গেছি, ইয়ার। আগে যখন আপসেট থাকতাম তখন ছোট ভাইজান মাথায় এমন মোটিভেশন ঢুকিয়েছে যে ওসব স্মৃতিতে রাখার অবকাশই নেই। আ'ম টোটালি ফাইন।”

জিহাদ মাথা নেড়ে বলল,
“ভালো হলেই ভালো। ওহ, তোকে বলতে ভুলেই গেছি।প্রীষান স্যারের আইডিতে দেখলাম, ম্যারিড স্ট্যাটাস। বিয়ে কবে হলো? তুই যে বললি দেরি আছে!”

দিপ্তি চমকে জিজ্ঞেস করলো,
“কিহ, বিয়ে! আমরা জানি না কেন?”

কায়রা ঠোঁট চেপে হালকা গম্ভীর স্বরে বলল,
“আমি নিজেই জানতাম না। হয়ে গেছে যখন, আর কি বলার!”

জিহাদ হতাশ গলায় আওড়ালো,
“আর কেউ না ভাই, প্রীষান স্যার! ভাবতেই ভয়ংকর লাগছে।”

কায়রা প্রসঙ্গ বদলে দুষ্টুমি স্বরে বলল,
“ওসব বাদ দে তো। একটা জিনিস ভেবে দেখেছিস? আমি কিন্তু তোদের ম্যাডাম লাগি! এখন থেকে ম্যাডাম ডাকবি, হু'হ!”

দিপ্তি মুখ কুচকে বলল,
“যাহ তো!”

কায়রা জোরে হেসে ফেলে। ঠিক তখন পাশ দিয়ে একজন মেয়ে এগিয়ে এসে তাদের পথ রোধ করে বলে,
“এখানে কায়রা কে?”

কায়রা অবাক হয়ে উত্তর দিলো,
“আমি… কেন?”

মেয়েটি গম্ভীর গলায় বলে,
“ওইযে....ওই সিনিয়র ভাইয়া ডাকছে তোমাকে, যাও।”

দিপ্তি আর জিহাদ একে অপরকে অবাক চোখে দেখলো। জিহাদ পাশে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওটা তো ফোর্থ ইয়ারের রাহুল ভাইয়া! ওই ব্যাটা তোকে ডাকছে কেন?”

কায়রা কাঁধ ঝাকিয়ে বলল,
“কিজানি, দেখে আসি। তোরা এখানেই দাঁড়া।”

এই বলে সেখানে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কায়রা ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে সরল গলায় বলল,
“জ্বি, ভাইয়া, বলুন।”

ছেলেটা মুচকি হাসলো কায়রাকে দেখে। অদূর থেকে প্রীষান সব কিছু লক্ষ্য করছিলো। টিচার্স রুম থেকে বেরোতেই ক্যাম্পাসে তার চোখ পড়ে ছেলেটার উপর। নজরে আসে ছেলেটার হাতে থাকা গোলাপের ওপরও। প্রীষানের সরু চোখ মুহুর্তেই জ্বলজ্বলে আকার ধারণ করে ছেলেটার ভাবমূর্তি উপলব্ধি করে। কায়রাকে এভাবে ডাকার কারণ বুঝে ফেলে সে। দপ করে জ্বলে উঠে মাথাটা। নিমেষেই দৃঢ় পুরুষালী চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে প্রীষানের। খুব একটা দূরত্ব ছিলো না বিধায় পেছন থেকেই প্রীষান নিজেকে সামলে পকেটে এক হাত রেখে তাড়া দেওয়ার ভঙ্গিমায় কায়রাকে ভারিক্কি স্বরে ডেকে বলল,

“ওয়াই'ফি! উই আর গেটিং লেট, কাম!”

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Page 3 / 7
Share:

Loading spinner