পর্বসংখ্যা:৩৫
কায়রা পেছন ফিরে প্রীষানকের দিকে তাকাতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। চোখে বিস্ময়ের তীব্রতা, বুকের ভেতর অকারণ ধুকপুকানি বেড়েই চলেছে। প্রীষানের ভারী কণ্ঠে 'ওয়াইফি' সম্বোধনটা কানে যেতেই কায়রা নিজের কল্পনা এবং বাস্তবতার ফারাক খুইয়েছে। নিজ মনে সে প্রশ্ন শুরু করলো, ওয়াইফি বলে ডাকলো? এটা কি সত্যিই তাকেই ডাকলো প্রীষান স্যার? নাকি কল্পনার কোনো বিভ্রমে আটকেছে সে?
ওদিকে রাহুল, যে কিছুক্ষণ আগেও নিজের উপস্থিতি কায়রার সামনে জাহির করতে ব্যস্ত ছিলো, সে প্রীষানকে দেখেই আচমকা ভোল পাল্টে ফেললো। কারণ, তার বুঝতে বাকি নেই কায়রা কে? অতি ভদ্র, শান্ত ছেলেটির ন্যায় অকস্মাৎ গলার টোন বদলে ফেললো। হাতে থাকা গোলাপ পকেটে ভরে নরম সুরে কায়রাকে বলল,
“কলেজে কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে, বুঝেছো? তুমি একদম আমার বোনের মতো দেখতে। তাই ডেকেছিলাম। এখন যাও, স্যার ডাকছেন।”
কথা শেষ করেই রাহুল তার দলবল নিয়ে দ্রুত সরে পড়লো ক্যাম্পাস ছেড়ে। হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো তার আগের সব হিরোগিরি। কিন্তু কায়রার মনোযোগ তখন আর কোথাও নেই। তার সমস্ত সত্তা আটকে আছে সেই একটি শব্দে, “ওয়াইফি”। চারপাশের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে এলো। জিহাদ আর দিপ্তিও চুপচাপ নিজেদের পথে হাঁটা দিলো প্রীষানকে দেখে।
খানিক্ষন নিরবতার পর কায়রার সম্বিৎ ফেরে প্রীষানের আরেকটা ডাকে,
“বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই নাকি?”
প্রীষানের দ্বিতীয় ডাকটা কায়রাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না সে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো প্রীষানের পাশে। অগত্যা প্রীষান মুখে গম্ভীর ভাব রেখেই হাঁটা শুরু করলো। কায়রা তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে দ্বিধাভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তখন... আপনি আমাকে ডাকলেন?”
“হুম।”
“আসলেই?”
প্রীষান থেমে গেলো। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি স্থির হলো কায়রার চোখে। সেই দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক গভীরতা। বলল,
“কেন? আমি ডাকায় খারাপ লেগেছে তোমার?”
কায়রা হতবাক হলো। কি বলছে স্যার? তার নাকি খারাপ লাগবে? তার তো ঠিক উল্টোটা হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, পেটের ভেতর অজস্র প্রজাপতি উড়ো-উড়ি করছে। নিজের সন্দেহ দূর করতে আরও একটু নিশ্চিত হতে হঠাৎই কায়রা প্রীষানের হাতে জোরে চিমটি কাটলো।
সহসা চিমটির তোপে প্রীষান মৃদু আর্তনাদ করে বসে।প্রীষানের মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠলো তৎক্ষনাৎ! কায়রার উপর রেগে গিয়ে বলল,
“ইডিয়ে'ট! এটা কি করলে?”
কায়রা দু’পা পিছিয়ে গেলো বাস্তবতা টের পেতেই। কিন্তু চোখেমুখে লুকানো আনন্দ স্পষ্ট। তার তো নাচতে ইচ্ছে করছে। বাড়িতে গিয়ে নাহয় একবার নাচ'বে। কিন্তু আপাতত প্রীষানকে ঠান্ডা করতে তারাহুরো করে বলল,
“স্যরি, স্যরি... আসলে আমি সিওর হতে চাচ্ছিলাম
এটা স্বপ্ন নাকি!”
প্রীষান দিরুক্তি করলো না। কায়রার পাগলামো আচরণ সম্পর্কে সে আগে থেকেই অবগত। আর এখন তো আটকানোর সুযোগও নেই। এরই মধ্যে তারা হাঁটতে হাঁটতে গ্রাউন্ড পেরিয়ে গাড়ির কাছে এসে পৌঁছেছে। প্রীষান ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই কায়রাও নিঃশব্দে পাশের সিটে বসে পড়লো সংকোচ ছাড়াই। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনে চোখ রেখে প্রীষান গম্ভীর স্বরে বলল,
“এত ওভার রিয়েক্ট করার কিছু হয়নি। এটা শুধু একটা সাধারণ সম্বোধন ছিলো এটা প্রিটেন্ড করার জন্য যে তুমি আমার ওয়াইফ। তাছাড়া ওই ছেলেটার উদ্দেশ্য ভালো ছিলো না।”
কায়রা অবাক হয়ে তাকালো পাশ ফিরে। ছেলেটা তো আর কায়রাকে খারাপ কিছু বলে নি। তাই কায়রা বলল,
“কই! ভাইয়া তো আমাকে বোন ডেকেই কথা বললো। কোনো অসুবিধা হলে জানাতে বলেছে। এতে তার মধ্যে খারাপের কি দেখলেন?”
প্রীষানের কণ্ঠে তীব্র বিরক্তির ছোঁয়া,
“বোন ডাকলেই কেউ বোন হয়ে যায় না। আর তোমারও তো কোনো সেন্স নেই। যে যখন খুশি ডাকলেই তুমি নাচতে নাচতে চলে যাও। এভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনো। আনভিলিভেব'ল!”
কথাগুলো কায়রার মনে হালকা প্রহার করলো, কিন্তু সে থামলো না। মৃদু অভিমান মেশানো স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, তো কি হয়েছে? আপনি আছেন তো আমাকে প্রোটেক্ট করার জন্য। আমি যত ভুল করবো, আপনি সব ঠিক করে দেবেন। সব মানুষ তো জন্ম থেকেই পারফেক্ট হয় না, আপনার মতো।”
প্রীষান আর কিছু বললো না। তার চোখ তখন সামনে রাস্তায় নিবদ্ধ। মুখে অদ্ভুত এক নিরাবেগ স্থিরতা। শুধু গাড়ির গতি আর বাইরের বাতাসের শব্দ ভেসে আসছে। কায়রা জানালার দিকে ফিরে বসে রইলো। হঠাৎ কায়রার খেয়াল হলো, এটা তো তাদের বাড়ির রাস্তা নয়। ভ্রু কুচকে ফেললো সে। তাই কায়রা কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কোথায় যাচ্ছেন? বাড়ির রাস্তা তো উল্টো দিকে।”
প্রীষান সামনে চোখ রেখেই ছোট করে উত্তর দিলো,
“প্রীতিষার কাছে।”
------------------------------
আজ সকালটা শুরুই হয়েছিলো ব্যস্ততার ছন্দে। কাবির আর প্রীতিষা দু’জন মিলে সংসার গুছিয়ে তোলার অদম্য উচ্ছ্বাসে ডুবে ছিলো। বাজেটের হিসেব কষে কষে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রীতিষা একে একে কিনে ফেললো কতশত জিনিস। সংসার সাজাতে বাজেট অনুযায়ী অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেছে প্রীতিষা বুদ্ধি করে। তার চোখে ছিলো দায়িত্বের দীপ্তি, আর কাবিরের চোখে অপার মুগ্ধতা তার বউটির প্রতি। এতসব দৌড়ঝাঁপের মাঝে যে সকালের নাস্তাটাও বাদ পড়ে গেছে তাদের। তা খেয়াল করার সময় কারও হয়নি। যখন ঘড়ির কাঁটা দুপুর দু’টোর ঘরে এসে ঠেকলো, তখন শরীরটা নিজের দাবি জানালো। মারাত্মক ক্ষুধার দাবি।
সব কেনাকাটা শেষে কাবির মালপত্রগুলো একটা ভ্যানে তুলে দিলো। পরিচিত লোক হওয়ায় ঠিকানামতো সব পৌঁছে দেবার আশ্বাস আছে। তাই কাবির আর গেলো না। এবার কাবির প্রীতিষার হাতটা আলতো করে ধরে বলল,
“হইছে চলো। কিছু খাইয়া নেও। সকাল থেকে না খাওয়া তুমি।”
প্রীতিষার সত্যিই খিদে পেয়েছিলো, কিন্তু ব্যস্ততার ভারে মুখে বলল,
"একদিন ঝুড়-ঝামেলার মধ্যে খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম হতেই পারে। ব্যাপার না। তুমিও তো কিছু খাও নি সারাদিন!"
কাবির একটু হেসে মাথা নাড়লো,
“এখন সারাদিন এত কাম-কাজের পরে রান্নার এনার্জি আমাগো কারোর'ই থাকবো না। আজকের মতো হোটেলে খাইয়া আসি চলো। বিরিয়ানি চলবো?”
প্রীতিষার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটলো,
“দৌড়াবে।”
তারপর দু’জন মিলে কাছের এক হোটেলে গিয়ে পেট ভরে বিরিয়ানি খেলো। খাওয়া শেষে রাস্তায় বেরোতেই তারা বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। এমন সময় হঠাৎই প্রীতিষার চোখ আটকে গেলো পাশের এক দোকানের শো-উইন্ডোতে। সাদা একটা শার্টে। তার পা যেন নিজে থেকেই থেমে গেলো। প্রীতিষাকে থামতে দেখে কাবির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হইছে? থামলা ক্যান?”
প্রীতিষা আঙুল তুলে ইশারা করে শার্ট'টা দেখালো,
“ওটা পছন্দ হয়েছে। কিনবো, চলো!”
কাবির ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুমি শার্ট পরবা? কিন্তু ওইডা তো লেডিস শার্ট না!”
প্রীতিষা হেসে উঠলো,
“ধুর! আমি কেন পরবো? তোমার জন্য। দারুণ মানাবে তোমাকে। তাছাড়া তোমার তো সবই কালো
শার্ট। সাদা শার্ট একটাও নেই!”
কাবির মুখ কুচকে প্রায় অসহায়ের মতো বলল,
“ভাই, আমার কাছে আর টাকা নাই! আর কিছু কিনতে পারমু না!”
কিন্তু প্রীতিষার জেদ থামে না। সে কাবিরের হাত টেনে জোর করে নিয়ে গেলো শো-রুমের ভেতরে। বলল,
“আমার আছে। আমি'ই কিনে দেবো। এসো।”
অগত্যা, বউয়ের জেদের কাছে হার মেনে কাবির ঢুকে পড়লো দোকানে। প্রীতিষা দোকানদারকে বলল,
“ওই হোয়াইট শার্ট'টা বের করেন, ভাইয়া।”
দোকানদার বের করে দিলেন। প্রীতিষা শার্টটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো। কাপড়, কাট, সবই বেশ সুন্দর। দোকানদার নিজেও প্রশংসার সুরে বলল,
“আপার চয়েস কিন্তু দারুণ, আপা।”
প্রীতিষা মৃদু হাসলো। ওদিকে কাবির মুখ কুচকে দাঁড়িয়ে আছে। প্রীতিষা এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে বলল,
"এটার দাম কত, ভাইয়া?"
প্রীতিষা দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদারের উত্তর এলো,
"বেশি দামাদামি করমু না, আপা। যদিও এই শার্টের দাম বারোশো টাকা নিতাম তয় আপনার জন্য এক হাজার। কমায়া কইছি কিন্তু আপা!"
কাবির আঁতকে উঠে প্রায় চিৎকার করে বলল,
“মাইরা ফালান ভাই আমারে!”
তার সেই নাটকীয় প্রতিক্রিয়ায় দোকানদারও একটু থমকালো। তবুও দোকানদার কাবিরকে বলল,
"ভাই, আপনে তো আমাগো পরিচিত। আপনে তো জানেনই কত ভালো ভালো মাল রাখি আমরা!"
কাবির হেসে বলল,
“পৃথিবীতে সবচেয়ে মিছা কথা কয় কোন দুইজন জানেন? উকিল আর দোকানদার।”
দোকানদার আরেকদফা ভরকালেন। প্রীতিষা কাবিরকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তুমি চুপ করো, আমি কথা বলছি তো।”
কাবির এবার ভান করে নিজের ঠোঁটে তর্জনী আঙুল চেপে ধরে। প্রীতিষা এবার দোকানদারকে বলে,
"দেখুন ভাইয়া, আমিও দামাদামি করবো না। পাঁচশো টাকায় হলে বলেন, নাহলে চলে যাচ্ছি।"
দোকানদার জিভ দাত দিয়ে কেটে বলল,
"কি কইলেন আপা! আরেকটু বাড়ান! লস হইয়া যায় এই দামে।"
“ওকেহ, সাড়ে পাঁচশো।”
দোকানদার হাঁ করে তাকিয়ে রইলো,
“আপা, আরেকটু বাড়ান!”
শেষমেশ প্রীতিষা যখন কাবিরের হাত ধরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়, তখনই দোকানদার হার মেনে বলল,
“আচ্ছা, নিয়া যান, আপা!”
শার্টটা প্যাক হয়ে গেলো। টাকা দিয়ে বেরোতেই প্রীতিষা দেখে কাবির চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রীতিষা লক্ষ্য করলো, তার দৃষ্টি এবার গিয়ে থেমেছে শাড়ির দোকানের দিকে। তাই জিজ্ঞেস করলো,
“ওদিকে কি দেখছো?”
কাবির উচ্ছসিত হয়ে বলল,
"ওই শাড়িডা ভাল লাগবো তোমারে। আসো, কিনা দেই।"
প্রীতিষা অবাক হয়ে বলল,
"তোমার না টাকা নেই, ফাজিল! এখন আবার বলছো শাড়ি কিনে দেবে!"
কাবির মৃদু হাসলো, কিছু বলল না। প্রীতিষা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“থাক, লাগবে না। আমি তো এমনিতেও শাড়ি পরি না।
শুধু শুধু কিনে দেখা যাবে ঘরেই রেখে দিয়েছি। অযথা খরচের কি দরকার!”
কিন্তু কাবির তা শুনতেই পেলো না। তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো শাড়ির অন্য পাশের শো রুমের দিকে। তারপর দোকানদারকে বলে,
"ওই শাড়িডা বাইর করেন।"
কালো শিফনের পাতলা শাড়িটা সামনে আসতেই প্রীতিষার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে কাবিরের দিকে ত্রস্ত চোখে তাকায়। তার মানে এই শাড়ি পছন্দ হয়েছে কাবিরের! কাবির পাগল হয়ে গেছে নিশ্চিত! এসব বাইরে পরলে লোকে কি ভাববে! তাই প্রীতিষা কাবিরের কানে ফিসফিস করে বলল,
“পাগল নাকি তুমি! এই পাতলা শাড়ি পরা আর না পরা তো একই! সব তো দেখাই যাবে!”
কাবির ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“তাই তো কিনতাছি।”
প্রীতিষার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠলো মুহুর্তেই,
“মানে? তুমি চাও সবাই আমাকে এভাবে দেখুক?”
এইবার কাবিরের চোখ স্থির হয়ে গেলো। ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“জানে মাইরা ফালামু! এইটা শুধু আমার জন্য পরবা।”
এইবার প্রীতিষা চুপ হয়ে গেলো। শেষমেশ শাড়িটাও কিনে ফেললো কাবির। পুরো পথ জুড়ে প্রীতিষা লজ্জায় মুখ নিচু করে হাঁটলো। তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত অনুভূতির ঢেউ। লজ্জা, অস্বস্তি, আর কোথাও লুকিয়ে থাকা এক মিষ্টি উষ্ণতা। কি বিচিত্র অস্বস্তিকর সেই অনুভুতি! পুরো রাস্তা প্রীতিষা লজ্জা পেতে পেতে এসেছে। আর কাবির ওর দিকে বেহায়া'র মতো তাকিয়ে মিটিমিটি হেসেছে।
---------------------------
কাবির আর প্রীতিষা বাড়ি ফিরেছিলো তিনটের মাঝে। দিনভর নতুন সংসার গোছানোর ব্যস্ততা এখনো সামলে উঠতে পারেনি তারা। দুজনের অনেকটাই খাটুনি যাচ্ছে আজ। প্রীতিষা ধীরে ধীরে গুোছাতে শুরু করলো কিছু কাজ। নতুন আনা আলমারিটা খুলে জামা কাপড়গুলো যত্ন করে সাজাতে লাগে বিভিন্ন তাকে তাকে। কাবির তখন হালকা ক্লান্ত গলায় বলল,
“আমি গোসল দিয়ে আসি।”
প্রীতিষা চোখ না তুলেই মৃদু স্বরে জবাব দিলো,
“হুম, যাও।”
কাবির বাথরুমে চলে যেতেই প্রীতিষা পুরো আলমারি সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। এই আলমারি আজই বাড়িতে এনেছে। সাথে এসেছে দুটো সোফাসেটও। সেগুলোর কাভার লাগিয়ে সোফাটা গোছালো। এছাড়া আরও অনেক কাজ বাকি। প্রীতিষা একে একে সব গুছিয়ে ফেললো যতটা পারে। কিন্তু আপাতত এগুলো কাজ শেষ করে সে এক গ্লাস পানি খেয়ে ক্লান্ত শরীরটা খাটে এলিয়ে দিলো ধপ করে।
কিন্তু তখনই ঘটে এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের সূচনা। হুট করে মটমট শব্দের পরেই ঠাস করে খাটের একপাশ ভেঙে নিচে পড়ে গেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিষাও ধপ করে মেঝেতে পরে যায়।
কি ঘটেছে তা সে বোঝারই সুযোগ পেলো না। কোমরে হালকা ব্যথা নিয়ে উঠে বসে তোষক সরিয়ে দেখে
খাটের কাঠ একপাশে ঘুণে খেয়ে ফেলেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত ঠেকালো সে। বিরবির করে আওড়ালো,
"এবার এটাও কিনতে হবে!"
ঠিক তখনই কাবির ফিরে এলো। খালি গায়ে, ভেজা চুল আর চেক চেক লুঙ্গি পরা স্বাভাবিক অবয়বে। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো ভাঙা খাটে। চমকে উঠে কাবির বলল,
“খাট কেমনে ভাঙলো!"
প্রীতিষা ধিমি কন্ঠে বলে,
"আমার জন্যই ভেঙেছে। ঘুনে ধরেছিলো একপাশে, দেখো। আমি ধপ করে শুয়েছিলাম, ওমনিই ঠাস করে ভেঙে গেলো।"
কাবির খাটের দিকে দ্বিতীয়বার তাকালও না। তার উদ্বেগপুর্ন চোখ স্থির হয়ে রইলো প্রীতিষার ওপর। কাবির চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি ব্যথা পাও নাই তো? দেখি!”
প্রীতিষা মাথা নেড়ে মৃদু হাসলো,
“না, আমি ঠিক আছি। তবে… আমাদের এবার খাটও কিনতে হবে।”
কাবির ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেললো। বলল,
"আমি কিনতেই চাইছিলাম। এমনিতেও খাটটা অনেক পুরান। তাই মেলা দিন টিকছে! আরও আগে ভাঙা উচিত আছিলো! "
প্রীতিষা সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। কাবির আবার বলল,
“তুমি যাও এখন, গোসল কইরা আসো।”
প্রীতিষা বলল,
"হুম, যাচ্ছি। এমনিতেও জামায় ধুলোবালি লেগে শেষ!"
এই বলে সে এবার তোয়ালে আর জামাকাপড় নিয়ে চলে যায় বাথরুমে। তখন কাবির একটা টি-শার্ট গায়ে পরে কাজে লেগে পরে। একটা কাঠের চেয়ারের হাতল ভেঙে গিয়েছিলো। সেটাই হাতুড়ি দিয়ে ঠিক করছে কাবির।
এইমাত্র নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো প্রীষান আর কায়রা। কাবির টেরই পেলো না। সে তো উল্টোদিক হয়ে নিচে বসে চেয়ার ঠিক করতে ব্যস্ত। ঘরে এসে প্রথমেই তাদের চোখ যায় ভাঙা খাটের উপর। প্রীষান চমকায়, থমকায়। ওর চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম প্রায়। কায়রা নিজেও হতবাক। ওদিকে কায়রা অস্ফুটে প্রায় জোরেই বলে উঠে,
“আস্তাগফিরুল্লাহ!”
কায়রার গলা পেয়ে কাবির তড়িৎ বেগে ফিরে তাকালো। প্রীষান আর কাবিরের চোখাচোখি হয়। কাবির তো নিজেই থমকে গেছে তাদের এভাবে দেখে, তার চটপটানো বুলি হারিয়েছে ঘরের পরিস্থিতি বুঝে। এদিকে কাবিরের ভেজা চুল নজরে আসে প্রীষানের।
ঠিক তখনই বাথরুম থেকে বের হলো প্রীতিষা। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে বাঁধা, মুখে সফেদ স্নিগ্ধতা। সদ্য গোসল করা বোনকে দেখে, ঘরের এমন অবস্থা বুঝে প্রীষানও ভুল মানেটাই ভাবলো। প্রীতিষা ভাইকে দেখে খুশি হলেও পরক্ষনেই ঘরের অবস্থা দেখে বুঝলো তাদের সাক্ষাৎকারের এই পরিস্থিতিটা অবান্তর। আনন্দ ভুলে মুহুর্তেই অপ্রস্তুত হয়ে পরলো প্রীতিষা। বুঝতে পারলো না কি বলবে বা বলা উচিত। তবে স্থান কাল না ভেবে কায়রা চোখ বড় বড় করে অবাক কন্ঠে মুখ ফসকে বেহায়ার মতো বলেই ফেলে,
“ভাইজান এতটা এগ্রেসি'ভ!”
চলমান.......
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]