গল্প: চলো না আজ এ র...
 
Notifications
Clear all

গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (Writer:Priynshi Chowdhury)

Page 4 / 7

Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩৫ 

 

কায়রা পেছন ফিরে প্রীষানকের দিকে তাকাতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। চোখে বিস্ময়ের তীব্রতা, বুকের ভেতর অকারণ ধুকপুকানি বেড়েই চলেছে। প্রীষানের ভারী কণ্ঠে 'ওয়াইফি' সম্বোধনটা কানে যেতেই কায়রা নিজের কল্পনা এবং বাস্তবতার ফারাক খুইয়েছে। নিজ মনে সে প্রশ্ন শুরু করলো, ওয়াইফি বলে ডাকলো? এটা কি সত্যিই তাকেই ডাকলো প্রীষান স্যার? নাকি কল্পনার কোনো বিভ্রমে আটকেছে সে? 

ওদিকে রাহুল, যে কিছুক্ষণ আগেও নিজের উপস্থিতি কায়রার সামনে জাহির করতে ব্যস্ত ছিলো, সে প্রীষানকে দেখেই আচমকা ভোল পাল্টে ফেললো।  কারণ, তার বুঝতে বাকি নেই কায়রা কে? অতি ভদ্র, শান্ত ছেলেটির ন্যায় অকস্মাৎ গলার টোন বদলে ফেললো। হাতে থাকা গোলাপ পকেটে ভরে নরম সুরে কায়রাকে বলল,
“কলেজে কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে, বুঝেছো? তুমি একদম আমার বোনের মতো দেখতে। তাই ডেকেছিলাম। এখন যাও, স্যার ডাকছেন।”

কথা শেষ করেই রাহুল তার দলবল নিয়ে দ্রুত সরে পড়লো ক্যাম্পাস ছেড়ে। হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো তার আগের সব হিরোগিরি। কিন্তু কায়রার মনোযোগ তখন আর কোথাও নেই। তার সমস্ত সত্তা আটকে আছে সেই একটি শব্দে, “ওয়াইফি”। চারপাশের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে এলো। জিহাদ আর দিপ্তিও চুপচাপ নিজেদের পথে হাঁটা দিলো প্রীষানকে দেখে।
খানিক্ষন নিরবতার পর কায়রার সম্বিৎ ফেরে প্রীষানের আরেকটা ডাকে,
“বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই নাকি?”

প্রীষানের দ্বিতীয় ডাকটা কায়রাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না সে। ব্যাগটা কাঁধে তুলে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো প্রীষানের পাশে। অগত্যা প্রীষান মুখে গম্ভীর ভাব রেখেই হাঁটা শুরু করলো। কায়রা তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে দ্বিধাভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তখন... আপনি আমাকে ডাকলেন?”

“হুম।”

“আসলেই?”

প্রীষান থেমে গেলো। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি স্থির হলো কায়রার চোখে। সেই দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক গভীরতা। বলল,
“কেন? আমি ডাকায় খারাপ লেগেছে তোমার?”

কায়রা হতবাক হলো। কি বলছে স্যার? তার নাকি খারাপ লাগবে? তার তো ঠিক উল্টোটা হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, পেটের ভেতর অজস্র প্রজাপতি উড়ো-উড়ি করছে। নিজের সন্দেহ দূর করতে আরও একটু নিশ্চিত হতে হঠাৎই কায়রা প্রীষানের হাতে জোরে চিমটি কাটলো। 

সহসা চিমটির তোপে প্রীষান মৃদু আর্তনাদ করে বসে।প্রীষানের মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠলো তৎক্ষনাৎ! কায়রার উপর রেগে গিয়ে বলল,
“ইডিয়ে'ট! এটা কি করলে?”

কায়রা দু’পা পিছিয়ে গেলো বাস্তবতা টের পেতেই। কিন্তু চোখেমুখে লুকানো আনন্দ স্পষ্ট। তার তো নাচতে ইচ্ছে করছে। বাড়িতে গিয়ে নাহয় একবার নাচ'বে। কিন্তু আপাতত প্রীষানকে ঠান্ডা করতে তারাহুরো করে বলল,
“স্যরি, স্যরি... আসলে আমি সিওর হতে চাচ্ছিলাম
এটা স্বপ্ন নাকি!”

প্রীষান দিরুক্তি করলো না। কায়রার পাগলামো আচরণ সম্পর্কে সে আগে থেকেই অবগত। আর এখন তো আটকানোর সুযোগও নেই। এরই মধ্যে তারা হাঁটতে হাঁটতে গ্রাউন্ড পেরিয়ে গাড়ির কাছে এসে পৌঁছেছে। প্রীষান ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই কায়রাও নিঃশব্দে পাশের সিটে বসে পড়লো সংকোচ ছাড়াই। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনে চোখ রেখে প্রীষান গম্ভীর স্বরে বলল,
“এত ওভার রিয়েক্ট করার কিছু হয়নি। এটা শুধু একটা সাধারণ সম্বোধন ছিলো এটা প্রিটেন্ড করার জন্য যে তুমি আমার ওয়াইফ। তাছাড়া ওই ছেলেটার উদ্দেশ্য ভালো ছিলো না।”

কায়রা অবাক হয়ে তাকালো পাশ ফিরে। ছেলেটা তো আর কায়রাকে খারাপ কিছু বলে নি। তাই কায়রা বলল,
“কই! ভাইয়া তো আমাকে বোন ডেকেই কথা বললো। কোনো অসুবিধা হলে জানাতে বলেছে। এতে তার মধ্যে খারাপের কি দেখলেন?”

প্রীষানের কণ্ঠে তীব্র বিরক্তির ছোঁয়া,
“বোন ডাকলেই কেউ বোন হয়ে যায় না। আর তোমারও তো কোনো সেন্স নেই। যে যখন খুশি ডাকলেই তুমি নাচতে নাচতে চলে যাও। এভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনো। আনভিলিভেব'ল!”

কথাগুলো কায়রার মনে হালকা প্রহার করলো, কিন্তু সে থামলো না। মৃদু অভিমান মেশানো স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, তো কি হয়েছে? আপনি আছেন তো আমাকে প্রোটেক্ট করার জন্য। আমি যত ভুল করবো, আপনি সব ঠিক করে দেবেন। সব মানুষ তো জন্ম থেকেই পারফেক্ট হয় না, আপনার মতো।”

প্রীষান আর কিছু বললো না। তার চোখ তখন সামনে রাস্তায় নিবদ্ধ। মুখে অদ্ভুত এক নিরাবেগ স্থিরতা। শুধু গাড়ির গতি আর বাইরের বাতাসের শব্দ ভেসে আসছে। কায়রা জানালার দিকে ফিরে বসে রইলো। হঠাৎ কায়রার খেয়াল হলো, এটা তো তাদের বাড়ির রাস্তা নয়। ভ্রু কুচকে ফেললো সে। তাই কায়রা কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কোথায় যাচ্ছেন? বাড়ির রাস্তা তো উল্টো দিকে।”

প্রীষান সামনে চোখ রেখেই ছোট করে উত্তর দিলো,
“প্রীতিষার কাছে।”

------------------------------

আজ সকালটা শুরুই হয়েছিলো ব্যস্ততার ছন্দে। কাবির আর প্রীতিষা দু’জন মিলে সংসার গুছিয়ে তোলার অদম্য উচ্ছ্বাসে ডুবে ছিলো। বাজেটের হিসেব কষে কষে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রীতিষা একে একে কিনে ফেললো কতশত জিনিস। সংসার সাজাতে বাজেট অনুযায়ী অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেছে প্রীতিষা বুদ্ধি করে। তার চোখে ছিলো দায়িত্বের দীপ্তি, আর কাবিরের চোখে অপার মুগ্ধতা তার বউটির প্রতি। এতসব দৌড়ঝাঁপের মাঝে যে সকালের নাস্তাটাও বাদ পড়ে গেছে তাদের। তা খেয়াল করার সময় কারও হয়নি। যখন ঘড়ির কাঁটা দুপুর দু’টোর ঘরে এসে ঠেকলো, তখন শরীরটা নিজের দাবি জানালো। মারাত্মক ক্ষুধার দাবি।

সব কেনাকাটা শেষে কাবির মালপত্রগুলো একটা ভ্যানে তুলে দিলো। পরিচিত লোক হওয়ায় ঠিকানামতো সব পৌঁছে দেবার আশ্বাস আছে। তাই কাবির আর গেলো না। এবার কাবির প্রীতিষার হাতটা আলতো করে ধরে বলল,
“হইছে চলো। কিছু খাইয়া নেও। সকাল থেকে না খাওয়া তুমি।”

প্রীতিষার সত্যিই খিদে পেয়েছিলো, কিন্তু ব্যস্ততার ভারে মুখে বলল,
"একদিন ঝুড়-ঝামেলার মধ্যে খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম হতেই পারে। ব্যাপার না। তুমিও তো কিছু খাও নি সারাদিন!"

কাবির একটু হেসে মাথা নাড়লো,
“এখন সারাদিন এত কাম-কাজের পরে রান্নার এনার্জি আমাগো কারোর'ই থাকবো না। আজকের মতো হোটেলে খাইয়া আসি চলো। বিরিয়ানি চলবো?”

প্রীতিষার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটলো,
“দৌড়াবে।”

তারপর দু’জন মিলে কাছের এক হোটেলে গিয়ে পেট ভরে বিরিয়ানি খেলো। খাওয়া শেষে রাস্তায় বেরোতেই  তারা বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। এমন সময় হঠাৎই প্রীতিষার চোখ আটকে গেলো পাশের এক দোকানের শো-উইন্ডোতে। সাদা একটা শার্টে। তার পা যেন নিজে থেকেই থেমে গেলো। প্রীতিষাকে থামতে দেখে কাবির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
“কি হইছে? থামলা ক্যান?”

প্রীতিষা আঙুল তুলে ইশারা করে শার্ট'টা দেখালো,
“ওটা পছন্দ হয়েছে। কিনবো, চলো!”

কাবির ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুমি শার্ট পরবা? কিন্তু ওইডা তো লেডিস শার্ট না!”

প্রীতিষা হেসে উঠলো,
“ধুর! আমি কেন পরবো? তোমার জন্য। দারুণ মানাবে তোমাকে। তাছাড়া তোমার তো সবই কালো
শার্ট। সাদা শার্ট একটাও নেই!”

কাবির মুখ কুচকে প্রায় অসহায়ের মতো বলল,
“ভাই, আমার কাছে আর টাকা নাই! আর কিছু কিনতে পারমু না!”

কিন্তু প্রীতিষার জেদ থামে না। সে কাবিরের হাত টেনে জোর করে নিয়ে গেলো শো-রুমের ভেতরে। বলল,
“আমার আছে। আমি'ই কিনে দেবো। এসো।”

অগত্যা, বউয়ের জেদের কাছে হার মেনে কাবির ঢুকে পড়লো দোকানে। প্রীতিষা দোকানদারকে বলল,
“ওই হোয়াইট শার্ট'টা বের করেন, ভাইয়া।”

দোকানদার বের করে দিলেন। প্রীতিষা শার্টটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো। কাপড়, কাট, সবই বেশ সুন্দর। দোকানদার নিজেও প্রশংসার সুরে বলল,
“আপার চয়েস কিন্তু দারুণ, আপা।”

প্রীতিষা মৃদু হাসলো। ওদিকে কাবির মুখ কুচকে দাঁড়িয়ে আছে। প্রীতিষা এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে বলল,
"এটার দাম কত, ভাইয়া?" 

প্রীতিষা দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদারের উত্তর এলো,
"বেশি দামাদামি করমু না, আপা। যদিও এই শার্টের দাম বারোশো টাকা নিতাম তয় আপনার জন্য এক হাজার। কমায়া কইছি কিন্তু আপা!"

কাবির আঁতকে উঠে প্রায় চিৎকার করে বলল,
“মাইরা ফালান ভাই আমারে!”

তার সেই নাটকীয় প্রতিক্রিয়ায় দোকানদারও একটু থমকালো। তবুও দোকানদার কাবিরকে বলল,
"ভাই, আপনে তো আমাগো পরিচিত। আপনে তো জানেনই কত ভালো ভালো মাল রাখি আমরা!"

কাবির হেসে বলল,
“পৃথিবীতে সবচেয়ে মিছা কথা কয় কোন দুইজন জানেন? উকিল আর দোকানদার।”

দোকানদার আরেকদফা ভরকালেন। প্রীতিষা কাবিরকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তুমি চুপ করো, আমি কথা বলছি তো।”

কাবির এবার ভান করে নিজের ঠোঁটে তর্জনী আঙুল চেপে ধরে। প্রীতিষা এবার দোকানদারকে বলে,
"দেখুন ভাইয়া, আমিও দামাদামি করবো না। পাঁচশো টাকায় হলে বলেন, নাহলে চলে যাচ্ছি।"

দোকানদার জিভ দাত দিয়ে কেটে বলল,
"কি কইলেন আপা! আরেকটু বাড়ান! লস হইয়া যায় এই দামে।"

“ওকেহ, সাড়ে পাঁচশো।”

দোকানদার হাঁ করে তাকিয়ে রইলো,
“আপা, আরেকটু বাড়ান!”

শেষমেশ প্রীতিষা যখন কাবিরের হাত ধরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়, তখনই দোকানদার হার মেনে বলল,
“আচ্ছা, নিয়া যান, আপা!”

শার্টটা প্যাক হয়ে গেলো। টাকা দিয়ে বেরোতেই  প্রীতিষা দেখে কাবির চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রীতিষা লক্ষ্য করলো, তার দৃষ্টি এবার গিয়ে থেমেছে শাড়ির দোকানের দিকে। তাই জিজ্ঞেস করলো,
“ওদিকে কি দেখছো?”

কাবির উচ্ছসিত হয়ে বলল,
"ওই শাড়িডা ভাল লাগবো তোমারে। আসো, কিনা দেই।"

প্রীতিষা অবাক হয়ে বলল,
"তোমার না টাকা নেই, ফাজিল! এখন আবার বলছো শাড়ি কিনে দেবে!"

কাবির মৃদু হাসলো, কিছু বলল না। প্রীতিষা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“থাক, লাগবে না। আমি তো এমনিতেও শাড়ি পরি না।
শুধু শুধু কিনে দেখা যাবে ঘরেই রেখে দিয়েছি। অযথা খরচের কি দরকার!”

কিন্তু কাবির তা শুনতেই পেলো না। তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো শাড়ির অন্য পাশের শো রুমের দিকে। তারপর দোকানদারকে বলে,
"ওই শাড়িডা বাইর করেন।"

কালো শিফনের পাতলা শাড়িটা সামনে আসতেই প্রীতিষার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে কাবিরের দিকে ত্রস্ত চোখে তাকায়। তার মানে এই শাড়ি পছন্দ হয়েছে কাবিরের! কাবির পাগল হয়ে গেছে নিশ্চিত! এসব বাইরে পরলে লোকে কি ভাববে! তাই প্রীতিষা কাবিরের কানে ফিসফিস করে বলল,
“পাগল নাকি তুমি! এই পাতলা শাড়ি পরা আর না পরা তো একই! সব তো দেখাই যাবে!”

কাবির ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“তাই তো কিনতাছি।”

প্রীতিষার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠলো মুহুর্তেই,
“মানে? তুমি চাও সবাই আমাকে এভাবে দেখুক?”

এইবার কাবিরের চোখ স্থির হয়ে গেলো। ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“জানে মাইরা ফালামু! এইটা শুধু আমার জন্য পরবা।”

এইবার প্রীতিষা চুপ হয়ে গেলো। শেষমেশ শাড়িটাও কিনে ফেললো কাবির। পুরো পথ জুড়ে প্রীতিষা লজ্জায় মুখ নিচু করে হাঁটলো। তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত অনুভূতির ঢেউ। লজ্জা, অস্বস্তি, আর কোথাও লুকিয়ে থাকা এক মিষ্টি উষ্ণতা। কি বিচিত্র অস্বস্তিকর সেই অনুভুতি! পুরো রাস্তা প্রীতিষা লজ্জা পেতে পেতে এসেছে। আর কাবির ওর দিকে বেহায়া'র মতো তাকিয়ে মিটিমিটি হেসেছে।

---------------------------

কাবির আর প্রীতিষা বাড়ি ফিরেছিলো তিনটের মাঝে। দিনভর নতুন সংসার গোছানোর ব্যস্ততা এখনো সামলে উঠতে পারেনি তারা। দুজনের অনেকটাই খাটুনি যাচ্ছে আজ। প্রীতিষা ধীরে ধীরে গুোছাতে শুরু করলো কিছু কাজ। নতুন আনা আলমারিটা খুলে জামা কাপড়গুলো যত্ন করে সাজাতে লাগে বিভিন্ন তাকে তাকে। কাবির তখন হালকা ক্লান্ত গলায় বলল,
“আমি গোসল দিয়ে আসি।”

প্রীতিষা চোখ না তুলেই মৃদু স্বরে জবাব দিলো,
“হুম, যাও।”

কাবির বাথরুমে চলে যেতেই প্রীতিষা পুরো আলমারি সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। এই আলমারি আজই বাড়িতে এনেছে। সাথে এসেছে দুটো সোফাসেটও। সেগুলোর কাভার লাগিয়ে সোফাটা গোছালো। এছাড়া আরও অনেক কাজ বাকি। প্রীতিষা একে একে সব গুছিয়ে ফেললো যতটা পারে। কিন্তু আপাতত এগুলো কাজ শেষ করে সে এক গ্লাস পানি খেয়ে ক্লান্ত শরীরটা খাটে এলিয়ে দিলো ধপ করে। 

কিন্তু তখনই ঘটে এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের সূচনা। হুট করে মটমট শব্দের পরেই ঠাস করে খাটের একপাশ ভেঙে নিচে পড়ে গেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিষাও ধপ করে মেঝেতে পরে যায়। 

কি ঘটেছে তা সে বোঝারই সুযোগ পেলো না। কোমরে হালকা ব্যথা নিয়ে উঠে বসে তোষক সরিয়ে দেখে
খাটের কাঠ একপাশে ঘুণে খেয়ে ফেলেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত ঠেকালো সে। বিরবির করে আওড়ালো,
"এবার এটাও কিনতে হবে!"

ঠিক তখনই কাবির ফিরে এলো। খালি গায়ে, ভেজা চুল আর চেক চেক লুঙ্গি পরা স্বাভাবিক অবয়বে। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো ভাঙা খাটে। চমকে উঠে কাবির বলল,
“খাট কেমনে ভাঙলো!"

প্রীতিষা ধিমি কন্ঠে বলে,
"আমার জন্যই ভেঙেছে। ঘুনে ধরেছিলো একপাশে, দেখো। আমি ধপ করে শুয়েছিলাম, ওমনিই ঠাস করে ভেঙে গেলো।"

কাবির খাটের দিকে দ্বিতীয়বার তাকালও না। তার উদ্বেগপুর্ন চোখ স্থির হয়ে রইলো প্রীতিষার ওপর। কাবির চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, 
“তুমি ব্যথা পাও নাই তো? দেখি!”

প্রীতিষা মাথা নেড়ে মৃদু হাসলো,
“না, আমি ঠিক আছি। তবে… আমাদের এবার খাটও কিনতে হবে।”

কাবির ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেললো। বলল,
"আমি কিনতেই চাইছিলাম। এমনিতেও খাটটা অনেক পুরান। তাই মেলা দিন টিকছে! আরও আগে ভাঙা উচিত আছিলো! "

প্রীতিষা সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। কাবির আবার বলল,
“তুমি যাও এখন, গোসল কইরা আসো।”

প্রীতিষা বলল,
"হুম, যাচ্ছি। এমনিতেও জামায় ধুলোবালি লেগে শেষ!"

এই বলে সে এবার তোয়ালে আর জামাকাপড় নিয়ে চলে যায় বাথরুমে। তখন কাবির একটা টি-শার্ট গায়ে পরে কাজে লেগে পরে। একটা কাঠের চেয়ারের হাতল ভেঙে গিয়েছিলো। সেটাই হাতুড়ি দিয়ে ঠিক করছে কাবির।

এইমাত্র নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো প্রীষান আর কায়রা। কাবির টেরই পেলো না। সে তো উল্টোদিক হয়ে নিচে বসে চেয়ার ঠিক করতে ব্যস্ত। ঘরে এসে প্রথমেই তাদের চোখ যায় ভাঙা খাটের উপর। প্রীষান চমকায়, থমকায়। ওর চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম প্রায়।  কায়রা নিজেও হতবাক। ওদিকে কায়রা অস্ফুটে প্রায় জোরেই বলে উঠে,
“আস্তাগফিরুল্লাহ!”

কায়রার গলা পেয়ে কাবির তড়িৎ বেগে ফিরে তাকালো। প্রীষান আর কাবিরের চোখাচোখি হয়। কাবির তো নিজেই থমকে গেছে তাদের এভাবে দেখে, তার চটপটানো বুলি হারিয়েছে ঘরের পরিস্থিতি বুঝে। এদিকে কাবিরের ভেজা চুল নজরে আসে প্রীষানের।

ঠিক তখনই বাথরুম থেকে বের হলো প্রীতিষা। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে বাঁধা, মুখে সফেদ স্নিগ্ধতা। সদ্য গোসল করা বোনকে দেখে, ঘরের এমন অবস্থা বুঝে প্রীষানও ভুল মানেটাই ভাবলো। প্রীতিষা ভাইকে দেখে খুশি হলেও পরক্ষনেই ঘরের অবস্থা দেখে বুঝলো তাদের সাক্ষাৎকারের এই পরিস্থিতিটা অবান্তর। আনন্দ ভুলে মুহুর্তেই অপ্রস্তুত হয়ে পরলো প্রীতিষা। বুঝতে পারলো না কি বলবে বা বলা উচিত। তবে স্থান কাল না ভেবে কায়রা চোখ বড় বড় করে অবাক কন্ঠে মুখ ফসকে বেহায়ার মতো বলেই ফেলে,
“ভাইজান এতটা এগ্রেসি'ভ!”

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩৬

 

 

চারপাশের হঠাৎ বদলে যাওয়া পরিস্থিতি বুঝে কাবির মুহূর্তেই থমকে গিয়েছিলো। বিস্ময় আর অস্বস্তির এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো না চাইতেও। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে। পরিস্থিতি কি পরিমান বেগতিক তা বলার বাইরে। সবার নজর এখন কাবিরের দিকে। যেন কোনো অপরাধ করে ফেলেছে সে। পরিবেশটা এমন, কেউ কিছু না বললেও সব চোখ তাকে ঘিরেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে কোনো লজ্জাজনক কাজের। একেই বুঝি বলে, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে! 

এদিকে পাশেই দাঁড়িয়ে প্রীতিষা। বেচারির মুখ লাল হয়ে আছে লজ্জায়। চোখ তুলতেও পারছে না নিজের ভাইয়ের সামনে। অথচ তাদের বিন্দুমাত্র দোষ নেই এই ঘটনার। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে বেচারিকে মুক্ত করতে নীরবতা ভাঙে কাবির। কোনো প্রকার শয়তানি না করে হঠাৎ সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রীষানকে দেখে বলে ওঠে,
“আরে ভাইয়া যে! ভেতরে আসেন, বাইরে ক্যান এতক্ষন?"

তারপর প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে একটু তাড়া দিয়েই বলে,
“ইয়ে প্রীতি, ভাইয়া আসছে তোমার। খাবার-দাবার নিয়া আসো জলদি, যাও!”

কাবিরের এই কথার অপেক্ষাতেই যেন প্রীতিষা ছিলো। তার কথা শেষ হতেই প্রীতিষা মুক্তি পেয়ে দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। প্রায় এক ছুটে। 
আজ কাবির সত্যিই পরিস্থিতি সামলে দিলো কোনো দুষ্টুমি না করে। বরং প্রীতিষার অস্বস্তির প্রসঙ্গকেই অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলো। যাক, এ যাত্রায় কাবির বাঁচিয়ে নিলো তাকে।

এরপর প্রীষান ধীরে একটা শ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে সোফায় বসলো। তার মুখভঙ্গি এখন একদম স্বাভাবিক। এদিকে কায়রা এখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে কাবিরের দিকে। মুখটা আধখোলা, যেন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেছে। কাবির তা দেখে বিরক্তে চ' সূচক শব্দ করে বলল,
“তোর কি হইছে? এমনে ভ্যাবলা'র মতো তাকায় আছস ক্যান?”

কায়রা হকচকিয়ে গিয়ে দ্রুত নিজেকে সামলায়,
“না না… কিচ্ছু না!”

“তাহলে গিয়ে ওখানে বস, আসতেছি আমি।”

এই বলে কাবির বেরিয়ে যায়। সামনের দোকান থেকে বিস্কুট, সিঙারা আর এক বক্স লাড্ডু কিনে নেয়। চায়ের সাথে বিস্কুট না হলে ঠিক জমে না। তাছাড়া, বাড়িতে একটাও বিস্কুট নেই। মনে পড়ে, পরশু তো সব বিস্কুট সে একাই সাবাড় করে ফেলেছিলো!

কাবির ফিরে এসে সরাসরি ঘরের দরজা দিয়ে রান্নাঘরে না ঢুকে বাইরের দরজা দিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়। সেখানে প্রীতিষা চা বানাচ্ছে। কাবিরকে আসতে দেখেই তার চোখে আবার সেই অসহায় ভাব। প্রীতিষা কাতর গলায় বলল,
“কি হয়ে গেলো বলো তো! ভাইয়া কি না কি ভাবলো আমাদের দেখে! ছি ছি ছি…লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার!”

কাবির কি সান্ত্বনা দেবে বুঝলো না। লজ্জা তো সেও পেয়েছে একটু। কিন্তু তা না বলে কাবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে হালকা গলায় বলে,
“বাদ দেও। মানুষের ডা'র্টি মাইন্ড হইলেই তো আর আমরা ডা'র্টি হইতাছি না। তাছাড়া, আমরা তো জানি এক্সাক্ট ঘটনাটা কি। আবার খাট ভাঙলা তুমি, আর সবাই তাকায় রইলো আমার দিকে, আজব না?”

এরপর একটু থেমে কাবির বিরবির করে বলল,
"এমনভাব করলো সবাই, যেন আমরা ইয়ে করে ফেলছি!"

প্রীতিষা কাবিরের বিরবিরানো শুনলেও পুরো কথা শুনতে পায় নি। তাই জিজ্ঞেস করে, 
"কি বিরবির করছো একা একা?"

" কিছু না।"

তবুও প্রীতিষার মুখের সেই কাঁদো কাঁদো ভাব কাটে না। কাবির তখন একটা ট্রে-তে করে সিঙারা, বিস্কুট, লাড্ডু সাজাতে সাজাতে নরম গলায় প্রীতিষাকে বলল,
“প্যানিক কইরো না। আমি চা ঢাইলা দেই, তুমি নিয়া যাও।”

এই বলে কাবির চায়ের কাপগুলোতে ধোঁয়া ওঠা গরম  চা ঢেলে দেয়। প্রীতিষা একটু ইতস্তত করে বলল,
“তুমি যাবে না আমার সাথে?”

“না, তুমি যাও আগে। আমি আসতেছি।”

“কিসের আসতেছি! একা কেন যাবো? তুমি আমার সাথেই আসবে, চলো।”

শেষমেশ একপ্রকার জোর করেই কাবিরকে সঙ্গে নিয়ে ট্রে হাতে ঘরে ফিরে আসে প্রীতিষা। ঘরে ঢুকে দেখতে পায় প্রীষানের মুখে এখনো সেই স্বাভাবিক স্থিরতা। যেন কিছুই ঘটেনি। কাবির সামনেই বুকে হাত ভাজ করে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর প্রীষান প্রীতিষার হাত ধরে নিজের পাশে বসিয়ে নরম কণ্ঠে বলে,
“দুই দিনেই নিজের ভাইকে মেহমান বানিয়ে দিলি? এত ফরমালিটিস কেন?”

প্রীতিষা মৃদু হেসে মাথা নিচু করে বলল,
“প্রথম এসেছো এই বাড়িতে। খালি মুখে পাঠাতে বলছো?”

প্রীষান স্নেহভরে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়,
“তোকে দেখতে এসেছি। তুই আমার পাশে বস, এত ব্যস্ত হতে হবে না। এখন বল, কেমন আছিস?”

প্রীতিষা আলতো হেসে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তুমি?”

“আমার আর কি… সব আগের মতোই।”

এই স্বাভাবিক কথাবার্তার মাঝেই কায়রা চুপিচুপি লাড্ডুর দিকে হাত বাড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে কাবির চটচটানো কন্ঠে বলে ওঠে,
“এই! ছোঁচার মতো আগেই খাইতাছস ক্যান? খাইতে কইছি তোরে?”

কায়রা হাত থামিয়ে অসহায় চোখে তাকালো ভাইয়ের দিকে। এদিকে কাবিরের কথায় থমকালো প্রীতিষা, প্রীষান। ওরা তো অবগত নয় এই দুজনের খুনসুটির বিষয়ে। কায়রা হাত থামিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“একটাই খাবো ভাইজান… প্লিজ!”

পর মুহূর্তেই কাবির হো হো করে হেসে ওঠে,
“আরে খা, ভাই! মজা করলাম। এগুলা স্পেশালি তোর জন্যই তো আনছি!”

এই শুনে কায়রা খুশিতে দুটো লাড্ডু তুলে নেয়। তারপর কাবির প্রীষানের দিকে কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“এই নেন ভাইয়া, চা ঠান্ডা হয়ে যাইতেছে।”

প্রীষান মৃদু হাসি দিয়ে কাপ তুলে নেয়। ধীরে ধীরে তাদের কথোপকথনের উষ্ণতায় বিকেলটা গড়িয়ে যায়। অস্বস্তির ছায়া মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে নেয় এক ধরনের স্বাভাবিক, ঘরোয়া শান্তিময় আলাপচারিতা। 

---------------------------

কায়রা আর প্রীষান বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাতের আঁধার নেমে এসেছে। বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকেই কায়রা একরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। দ্রুত বাইরের জামাকাপড় বদলে নিলো সে। প্রীষান এখন ঘরে নেই। হয়তোবা বাচ্চাদের সাথে আছে। কায়রাও ভেবেছিলো সেখানেই যাবে। ঠিক তখনই ফোনখানা বেজে উঠলো রিনরিনে শব্দে। পরিচিত নম্বর দেখে ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করে কায়রা মিষ্টি গলায় বলল,
"আসসালামু আলাইকুম, ভাবী। বলো, কি অবস্থা?"

ওপাশে কায়েশী নরম কণ্ঠে বলল,
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালোই আছি। তুমি কেমন আছো? ও বাড়িতে সব ঠিকঠাক তো?"

কায়রা হালকা হেসে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে আকাশে মেঘ জমেছে। সেদিকে তাকিয়েই কায়রা জবাব দিলো,
"হুম, সব ঠিক আছে। এবার তুমি বলো, হঠাৎ ননদিনীকে মনে পড়ার কারণ?"

কায়েশী একটু থেমে ঠান্ডা স্বরে বলল,
"ননদিনীকে মনে পড়ার আবার কারণ লাগে বুঝি? তবে… আজ অবশ্য একটা কারণেই ফোন করা।"

কায়রার কৌতূহল বেড়ে গেলো। বিছানায় বসে সে একটু সামনে ঝুঁকে বলল,
"ঘটনা কি বলো তো?"

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর খুব আস্তে, লাজুক গলায় কায়েশী বলেই ফেলল, 
"উম'ম, একটা গুড নিউজ আছে… তুমি আবার ফুপু হতে চলেছো।"

মুহূর্তেই যেন সময় থমকে গেলো। তারপরই কায়রার মনে বিস্ফোরণের মতো আনন্দ জাগলো!
কায়রা হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত চিৎকার করে উঠে বলল,
"কিহ! সত্যি বলছো? উফ'ফ! কি শোনালে এটা ভাবীইইই? ভাইজানকে বলেছো? এই খবর শুনলে কত খুশি হবে ভাইজান!"

কায়েশীর কণ্ঠে এবার দ্বিধা, লাজুক কাঁপন,
"না… এখনো বলিনি। কিভাবে বলবো, উনি কি রিয়েকশন দেবেন… ভাবতেই কেমন লাগছে।"

কায়রার চোখে তখন শুধুই আনন্দের ঝিলিক। সে নরম, দৃঢ় স্বরে বুঝিয়ে বলল,
"এত ভেবো না। চট করে বলে দাও তো! দেখবে ভাইজান'ই সবচেয়ে বেশি খুশি হবে!"

কায়েশী আলতো হাসে।
"তা তো বলবোই… তবে আমি ভাবছিলাম, একটা সারপ্রাইজ দেওয়া যাক তোমার ভাইকে।"

কায়রা ভ্রু কুঁচকে মজা করে বলল,
"তুমি সারপ্রাইজ দেবে ভাইজানকে? এত পরিবর্তন কবে হলো শুনি?"

"এই শোনো, খুঁচিয়ো না তো!"

কায়েশীর মেকি রাগ দেখায় কায়রাকে। তবে তার মনভর্তি ভালোবাসার ছোঁয়া মেয়েটার প্রতি। কায়েশী আরেকবার সতর্ক করে বলল,
"আর শোনো, এই খবরটা এখনই কাউকে বলো না। আমি প্রথম তোমাকেই বললাম। পারলে একটু সময় করে বাড়িতে এসে দেখা করে যেও… খুব মিস করি তোমাকে।"

কায়রার কন্ঠ নরম হয়ে এলো। একটা মৃদু শ্বাস ফেলে সে। ননদ-ভাবী কম বোনের মতো থেকেছে দুজন। মাঝের হওয়া দূরত্বটা হঠাৎ করেই অনুভব করলো কায়রা। মুখে বলল,
" আচ্ছা, সময় করে আসবো। টে'ক কেয়ার, আল্লাহ হাফেজ।"

"হুম, আল্লাহ হাফেজ।"

ফোনটা কেটে যেতেই ঘরটা আবার আগের মতো হয়ে গেলো। কিন্তু কায়রার ভেতরে তখনও বইছে আনন্দের ঢেউ। সে ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পরে। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠেছে। আবার একটা নতুন প্রাণ আসবে…একটা পুচকু আসবে। ছোট্ট হাত, ছোট্ট পা, মিষ্টি কণ্ঠ, উফ'ফ! ওই বাড়িতে আবার হাসির শব্দ ভেসে বেড়াবে। কায়ান-এর জন্মের সময়কার সেই বিভৎস স্মৃতিটা আজও কায়রা ভুলতে পারেনি। কি দিন গেছে তাদের! এখন অবশ্য কায়েশী সব মেনে ভালো আছে তার ভাইয়ের সাথে। আর কি চাই! কায়রার এখন শুধু একটাই চাওয়া। তার দুই ভাই'ই সুখে থাকুক, ভালো থাকুক। আর তার বড় ভাইজানের জীবনের এই নতুন আগমনী বার্তা তাদের জীবনের সব অপূর্ণতা মুছে দিয়ে নতুন করে পূর্নতার আলো ছড়িয়ে দিক।

-------------------------------

কায়রা এবার ভাবলো প্রিহার রুমে যাওয়া যাক। একা একা ঘরে বসে বোর হওয়ার চেয়ে গল্প করুক। তাই উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে।  করিডোর পেরিয়ে কায়রা প্রিহার ঘরের দরজায় নক করলো। মৃদু স্বরে বলল,
" আসবো?"

চেয়ারে বসে আয়নার সামনে তখন প্রিহা চুল আঁচড়াচ্ছিলো। কায়রার ডাক শুনে সে পেছন ফিরে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক নির্মল হাসি। হাসিমুখেই প্রিহা বলল,
"আরে এসো আন্টি! নক করার প্রয়োজন নেই।"

অনুমতি পেয়ে কায়রা ভেতরে ঢুকে পড়লো। কায়রার চোখ আটকে যায় মেয়েটার নিষ্পাপ সৌন্দর্যে।  গোলাপি টি-শার্ট আর সাদা প্লাজো পরনে তার। ফর্সা, গোলগাল মুখশ্রীতে সর্বক্ষন সতেজতা থাকে। টানা টানা দুটি চোখ অবিকল প্রীষান স্যারের মতো গভীর আর মায়াময়। কথাবার্তা, ভঙ্গিমা, এমনকি ছোট ছোট আচরণেও এক অদ্ভুত পরিপক্বতা আছে। যা বয়সের তুলনায় অনেকটাই বেশি। কায়রার মনে অজান্তেই স্নেহের কোমলতা বয়ে গেলো। প্রথম দেখাতেই মেয়েটা তার মনে গেঁথে গিয়েছিলো ভীষনভাবে। কায়রা এগিয়ে গিয়ে প্রিহার পাশে বসলো। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার পাপা কোথায়? প্রীভানকেও তো দেখছি না।"

প্রিহা সহজ স্বরে বলল,
"পাপা প্রীভানকে প্রাইভেট থেকে আনতে গেছে। চলে আসবে।"

" ওহ…"

কায়রা হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল। তারপর সে খেয়াল করলো, প্রিহা বেশ কিছুক্ষণ ধরে চুল নিয়ে যুদ্ধ করছে। বারবার চেষ্টা করেও যেন কিছুতেই ঠিকমতো বাঁধতে পারছে না। তা দেখে কায়রা মুচকি হেসে বলল,
"ফ্রেঞ্চ বেণী করতে চাচ্ছো, তাই না?"

প্রিহা একটু লজ্জা মিশ্রিত স্বরে বলল,
" হ্যাঁ… কিন্তু পারছি না। বারবার প্যাঁচ লেগে যাচ্ছে। ইউটিউবে দেখে চেষ্টা করলাম, তবুও হচ্ছে না।"

কায়রা তখন এগিয়ে গিয়ে বলল,
"এদিকে ঘুরে বসো, আমি করে দিচ্ছি।"

স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রিহা ঘুরে বসলো। কায়রা আলতো করে তার চুলগুলো ছুঁয়ে নিলো। বেশ লম্বা, ঘন সিল্কি চুল। কায়রা জিজ্ঞেস করে, 
"দুইপাশে করবো?"

প্রিহা হালকা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। এরপর কায়রার আঙুলগুলো শিল্পীর মতো কাজ করতে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যেই সে নিখুঁতভাবে প্রিহার মাথার দুই পাশে ফ্রেঞ্চ বেণী করে দিলো। শেষ করে কায়রা মৃদু হেসে বলল,
"এবার দেখো তো, তোমার ইউটিউবের ভিডিওর মতো হয়েছে কি না?"

প্রিহা আয়নার সামনে নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো। এপাশ-ওপাশ ঘুরে তার চোখে ঝলমল করে উঠলো আনন্দের দীপ্তি। হ্যাঁ, সে এমন করেই বেণী করতে চেয়োছিলো। উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রিহা বলল,
"রিয়েলি, ভিডিওর থেকেও ভালো হয়েছে! থ্যাংক ইয়্যু, আন্টি!"

কায়রা বিনিময়ে শুধু স্নিগ্ধ হাসলো। সেই হাসিতেই লুকিয়ে ছিলো এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এই ছোটখাটো মুহূর্তেই খুঁজে পাওয়া যায় নতুন সম্পর্কের উষ্ণতা। কায়রা তা অনুভব করছে। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রীষান প্রীভানকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেলো ছাদের লাইব্রেরির দিকে। সেখানে গিয়ে প্রতিদিনের মতো বই পড়বে প্রীষান। 
ঘরের ফিরে কায়রাকে দেখতেই আগুনের মতো জ্বলে উঠলো প্রীভান। কায়রাকে দেখামাত্র তার চোখে জমে উঠলো মারাত্মক রাগ আর ক্ষোভ। সে তেতে উঠে বলল,
“আপনি এখানে কেন এসেছেন? এই রুমে কি করছেন আপনি?”

তার কণ্ঠে ছিল রাগের সঙ্গে কাঁপতে থাকা অস্থিরতা।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা প্রিহা হতভম্ব হয়ে গেলো তার ভাইয়ের এরুপ আচরণে। বড় বোন হওয়ায় ধমকে উঠলো প্রিহা,
“এভাবে কথা বলছিস কেন? ম্যানার্স ভুলে গেছিস!”

কিন্তু প্রীভানের ভিতরের ঝড় তখন আর থামার নয়।
প্রীভান দ্বিগুণ উচ্চস্বরে বলে,
“রাখ তোর ম্যানার্স! আমি কথা বলছি, তুই মাঝখানে আসিস না, আপু!”

এই মুহূর্তে কায়রাও আর নরম থাকলো না। উঠে দাঁড়িয়ে হেসে একইভাবে বলল,
“হ্যাঁ প্রিহা, তুমি আমাদের মাঝে এসো না। তোমার ভাই কথা বলছে!”

ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো। প্রীভান থমকে গেলো কায়রার এমন প্রতিক্রিয়ায়। যা সে আশা করেনি। প্রিহাও চমকেছে। কায়রা এবার বুকের কাছে হাত ভাজ করে মেকি হেসে বলে, 
“তো প্রীষান স্যারের দুই নম্বর ছানা! বলো, কি বলতে চাও? আজ না শুনে কিন্তু আমি উঠছি না।”

সে আবার বলল,
"এই আমি বসলাম। আজ তোমার সাথে একটা হেস্তনেস্ত করেই ফিরবো।"

এই বলে কায়রা আবার বসলো নিজের জায়গায়। “ছানা” শব্দটা যেন প্রীভানের অহংকারে হালকা আঁচড় কাটলো। তবুও সেসব পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
“আমার আপনার সাথে কোনো কথা নেই। আপনি ভালোয় ভালোয় বের হয়ে যান।”

কায়রা মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
“কিন্তু আমার কথা আছে।”

রাগে প্রীভানের চোখ লাল হয়ে উঠছে। এই মহিলা চাইছেটা কি? প্রীভান বলল,
“মানেটা কি এসবের? কি চান আপনি?”

কায়রা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“তোমার মাথা, আমার মুন্ডু!”

এই অপ্রত্যাশিত উত্তরে মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেলো ছেলেটা। পাশে প্রিহা চাপা হাসি হাসলো। হঠাৎ কায়রা প্রীভানের হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে দিলো। প্রীভান প্রতিবাদ করলো উচ্চস্বরে,
“সমস্যা কি আপনার? আমি ভালোভাবে বলছি চলে যান...”

কায়রা এবার কণ্ঠ নরম করলো। কিন্তু দৃঢ়তা রইলো আগের মতোই,
“আমি কথা বলবোই তোমার সাথে। জোর করে হলেও বলবো। সট আউট না করে যাচ্ছি না আজ। তোমার পাপা তোমাকে যথেষ্ট ম্যানার্স শিখিয়েছে। আমি কিন্তু মা-বাবা কোনোটাই পাই নি। তাই আমার ম্যানার্সও নেই। তোমার থেকেও দশগুন বেশি জেদ আমার আছে। তাই চুপচাপ বসো আর আমার কথা শোনো।”

অদ্ভুতভাবে থেমে গেলো প্রীভান। কারণ, তার চোখ পড়েছে কায়রার কৃত্তিম পায়ের দিকে। এটা সে আগে খেয়াল করেনি। মুহুর্তেই সেই চোখে রাগ বদলে শূন্যতা ছুঁয়ে গেলো। প্রীভান কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
"আপনার...পা?"

কায়রা কাঁধ ঝাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, 
" পা নেই আমার। আজ দেখলে তুমি?"

প্রীভান মাথা নাড়ায় ধীরে। কায়রা এবার নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা, এসব বাদ দাও। এবার বলো, আমার সাথে তোমার কিসের শত্রুতা? থাক, সেটা না-ই বা বললে…কিন্তু নিজের পাপাকে কেন কষ্ট দিচ্ছো? কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছো কেন? জানো, তোমার জন্য উনি কাল সারারাত ঘুমোয়নি?”

কথাগুলো যেন নিঃশব্দে গিয়ে আঘাত করলো প্রীভানের ভেতরে জমে থাকা অভিমানের দেয়ালে।
সে থমকে গেলো। তার পাপা ঘুমোয়নি তার জন্য। কিন্তু প্রীভান ভেবেছিলো, পাপার কিছু যায় আসবে না সে কথা না বললে। তার চোখে প্রথমবারের মতো রাগের বদলে ফুটে উঠলো দ্বিধা। প্রীভান নিজে নিজেই এবার এক দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রোবটের মতো বলল, 
“আমি জানি… আপনি পাপাকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন। পাপা আর আমাদের ভালোবাসবে না…”

এই কথায় কায়রার বুক কেঁপে উঠে। বিস্ময়, বিহ্বলতা চোখে ভাসে তার। এবার সে বোঝে পুরো বিষয়টা। কায়রা এগিয়ে এসে দু’হাতে প্রীভানের মুখটা নিজের দু'হাতের আঁজলায় ধরে নরম, আশ্বাসভরা স্পর্শে বলল,
“শোনো… তোমাদের পাপা তোমাদের আগের মতোই ভালোবাসে এবং বাসবে। আমি কেন তাকে দূরে সরাবো? তুমি এমন ভাবছোই বা কেন?”

প্রীভান মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“কারণ… সৎ মায়েরা বাবাদের দূরে সরিয়ে দেয়…”

কায়রা গভীর নিঃশ্বাস নিলো। তার চোখে ভেসে উঠলো নিজের শূন্য শৈশবের ছায়া। বলল,
“না, তুমি ভুল জানো। কেউ সন্তানকে তাদের বাবার কাছ থেকে দূরে সরাতে পারে না। আর ভালোবাসা কখনো ভাগ হয় না, এটা শুধু বাড়ে। সন্তানদের প্রতি তাদের বাবা-মায়ের ভালোবাসার কতটা, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। নিজের বাবার ভালোবাসাকে এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারো না তুমি।"

প্রীভান থেমেছে এবার। কায়রা আবারও বোঝালো,
"তোমার আমার উপর যত রাগ আছে দেখাও… কিন্তু নিজের বাবাকে কষ্ট দিও না।”

ঘরটা নিরবচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। অভিমান আর ভালোবাসার মাঝখানে, ভয়ের সাথে বিশ্বাসের টানাপোড়েনে থমকেছে ছোট্ট প্রানটি। আর এই নীরবতার মধ্যেই হয়তো খুব আস্তে আস্তে গলে যেতে শুরু করলো প্রীভানের অপরিপক্ক জমাট বাঁধা রাগ। নিজের ভুল বুঝতে পারলো সে। যতই হোক, পাপাকে কষ্ট দেওয়ার কথা তার কল্পনাতেও আসেনা। সে তো শুধু রাগ দেখাচ্ছিলো। 

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩৭

 

প্রীভান কায়রার কথাগুলো শুনে আর স্থির থাকতে পারলো না। নিজের ভেতরে নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না সে। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো তার। অপরাধবোধের ভারে ছোট্ট মনটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ছুটে গেলো তার পাপার রুমের দিকে। প্রিহা পেছন পেছন যেতে চাইছিলো, কিন্তু কায়রা ইশারায় তাকে থামিয়ে দিলো। বলল,
“বাবা-ছেলের মাঝে যেও না। নিজেদের অভিমান নিজেরাই ঠিক করুক।”

প্রিহা থেমে গেলো। সব বুঝে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো নিজ স্থানে। এদিকে প্রীষানের রুমে ঢুকেই প্রীভান কোনো কথা না বলে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। অনেক শক্ত করে। এই জড়িয়ে ধরাতেই তার সব ভুলের ক্ষমা লুকিয়ে আছে। প্রীভানের উদ্দেশ্য তার বাবাকে কষ্ট দেওয়া কখনোই ছিলো না। তারপর হাউমা'উ করে কেঁদে উঠলো প্রীভান,
“স্য'রি পাপা… আমি ইচ্ছে করে করিনি… আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি…”

প্রীষান প্রথমে কিছু বললো না। শুধু ছেলের মাথায় হাত রাখলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার নিজের বুকটাও কেঁপে উঠলো। চোখের কোণে জমে থাকা জল আর আটকে রাখতে পারলো না সে। শক্ত, দৃঢ় মানুষরা যখন কাঁদে তখন সেটা সাধারণ মানুষের থেকেও বেশি অন্যরকম লাগে। ছেলেকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে প্রীষান ভাঙা গলায় বললো,
“তুমি আর প্রিহা আমার অনেক শখের, জানো? তোমাদের মাম্মা বেঁচে থাকার জন্য দুটো সুন্দর কারণ দিয়ে গেছে আমাকে। নাহলে এই জীবনের মায়া কবেই ছেড়ে দিয়ে ছিলাম। আর সেই তোমাদের'ই নাকি ভালোবাসবো না এটা ভাবলে কি করে…”

কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এলো প্রীষানের।
প্রীভান আরও জোরে জড়িয়ে ধরলো তার বাবাকে। আর কেঁদে কেঁদে বলল, 
“আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো এমন করবো না, পাপা… প্রমিস…”

প্রীষান হালকা হাসলো। ছেলের চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,
“আচ্ছা, হয়েছে… আর কাঁদতে হবে না। দেখো, রাত অনেক হয়েছে… ঘুম পাচ্ছে না?”

প্রীভান মাথা নাড়লো। তখন প্রীষান তার হাত ধরে পাশের রুমে নিয়ে এলো। সেখানে কায়রা আর প্রিহা বসে ছিলো পাশাপাশি। রুমে ঢুকেই প্রীষান বললো,
“প্রিন্সেস, দুটো বালিশ নিয়ে আমার রুমে এসো। আজ সবাই একসাথে শোবো।”

প্রিহার মুখে সাথে সাথে হাসি ফুটে উঠলো। কায়রা চোখ তুলে তাকায়। বুঝতে পারলো মান-অভিমানের প্রবলেম সলভ। প্রিহা হাসিমুখে দুটো বালিশ নিয়ে তাদের বাবার রুমে চলে গেলো। প্রীভানও তার আপুর পিছু নিলো। তবে কায়রা একা বসে রইলো। কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা অচেনা অনুভূতি তাকে আটকে রাখছিলো। তখনই প্রীষানের গম্ভীর ডাক,
“তুমি কেন বসে আছো? রুমে চলো।”

কায়রা একটু থমকে বললো,
“আমিও?”

প্রীষান স্বাভাবিকভাবে বললো,
“অফকোর্স। আমার বেড যথেষ্ট বড়। লম্বালম্বিভাবে না শুয়ে পাশাপাশি আরামসে শোয়া যাবে চারজন। এসো!”

তার কথায় কোনো জোরাজুরি ছিলো না, কিন্তু নিশ্চয়তা ছিলো। যেটা অস্বীকার করা যায় না। একটা পারিবারিক অনুভূতি পেলো কায়রা এই বিষয়টাকে। আজ নিজেকে এই পরিবারের থেকে আলাদা লাগছে না। মনে হচ্ছে সেও খুব কাছের কেউ এদের। এই স্বাভাবিকতা প্রীষানই নিশ্চিত করেছে। তাই কায়রা আর কিছু বললো না। নীরবে প্রীষানের পিছু নিলো।
রুমে ঢুকে সে দেখলো বেশ তোরজোড় চলছে ঘরে।
প্রীষান সোফাটা টেনে বেডের পাশে বসিয়েছে। যাতে কেউ ঘুমের ঘোরে পড়ে না যায়। প্রীভান তাড়াতাড়ি গিয়ে কিনারের জায়গাটা দখল করে বললো,
“আমি এখানে শোবো!”

প্রিহা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“পড়ে যাবি!”

“পড়বো না! আমি বড় হয়ে গেছি!”

খুব গর্বে ভরা গলায় উত্তর দিলো প্রীভান। প্রীষান আলতো হাসলো তা দেখে। এদিকে প্রিহা মুখ ভেংচি দিলো ছোট ভাইকে। প্রীভান অবশ্য পাত্তাও দিলো না। এই ছোটখাটো ঝগড়ায় রুমটা আবার প্রাণ ফিরে পেলো। প্রীষান বললো,
“প্রিন্সেস, এসো… ঘুমানোর আগে তেল দিয়ে দিই। ঘুম ভালো হবে।”

প্রিহা বলল,
"ওয়েট পাপা। আমি তেলের বোতলটা নিয়ে আসি। "

এই বলে প্রিহা দৌড়ে চলে যায় তেলের বোতল আনতে। এই সময় কায়রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছিলো। এটা কায়রার খুবই বাজে অভ্যাস।
তার অজান্তেই প্রীষানের চোখে পড়ে গেলো সেই বাজে অভ্যাসটা। তবে সে একটুও শব্দ না করে কায়রার হাতটা চট করে নামিয়ে দিলো। আচমকা স্পর্শে কায়রা থতমত খেলো। প্রিহাও ততক্ষণে তেলের বোতল নিয়ে এসেছে। প্রীষান একটা চেয়ারে বসে আর নিচে মেঝেতে বসে প্রিহা। প্রিহার পরনে গোলাপি গোল জামা। প্রিহা চুলের রাবার খুলে দিলে ঝরঝর করে চুলগুলো পিঠ ছড়িয়ে যায়। প্রীষান তার চুলগুলো দুপাশে ভাগ করে তেল দিয়ে দেয়। একটু পরে, তেল দেওয়া শেষ হতেই প্রিহা উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“পাপা, আন্টিকেও তেল দিয়ে দাও না। দেখো না চুলগুলো কেমন ড্রা'ই আর ড্যামে'জ লাগছে!”

প্রীষান তাকালো কায়রার দিকে। কায়রা তাড়াতাড়ি বললো,
“না না, দরকার নেই। আমি পরে একাই দেবো…”

প্রীষানের কণ্ঠে এবার হালকা কঠোরতা,
“এতদিনে একবারও নিজে থেকে দিয়েছো? লাস্ট কবে তেল দিয়েছিলে মাথায়?"

কায়রা মিনমিন করে বলল, 
"মনে নেই। ভাবী দিয়ে দিয়েছিলো লাস্ট।"

প্রীষান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 
"এটাই আশা করেছিলাম তোমার থেকে। এবার অযথা কথা না বাড়িয়ে বসো এখানে।"

কায়রা চুপ করে গেলো। অবশেষে বাধ্য হয়ে বসতেই হলো তাকে। এবার প্রীষান নিজেই চুলের রাবার খুলে দেয়। চুলগুলো ছড়িয়ে পড়তেই দেখা গেলো ব্রাউন কালারের আভা। রঙিন চুল দেখে মাথাটাই গরম হয়ে যায় তার। প্রীষান জিজ্ঞেস করে বলল,
"চুল কালার করেছো কেন?"

কায়রা হতাশ গলায় বলল,
"সাধেই কি আর করেছি! দরকার ছিলো। "

প্রীষান বলল,
“আমার ওয়াইফের এইরকম বাঁদর-কাটিং রঙিন চুল আমি বরদাস্ত করবো না।”

বেশ ঠান্ডা স্বরে হুমকি দিলো প্রীষান। হুমকির তীব্রতায় কায়রা মুহূর্তেই হতবিহ্বল হয়ে বসে রইলো। পাশে থাকা প্রিহা আর প্রীভান উচ্চস্বরে হেসে উঠলো এমন কথায়। সবাই হাসাতে কায়রা একটুখানি লজ্জা পেলো। তারপর চাপা স্বরে বলল,
“কি বলছেন এগুলো? আমি অনেক টাকা খরচ করে ভালো মানের কালার করিয়েছি। এসব তো ট্রেন্ড, অনেক মেয়েরাই করে।”

কায়রার চুলে আলগোছে তেল দিতে দিতে প্রীষান গম্ভীর স্বরে বলল,
“পুরো টাকাটা'ই ওয়েস্ট। আর যেন এগুলো করতে না দেখি। আমার মেয়ের চুল দেখো আর নিজেরটা দেখো? ডিফরেন্স বুঝতে পারছো?”

কায়রা তাকিয়ে দেখলো প্রিহার ঘন কালো লম্বা চুল। আসলেই কায়রার থেকে অনেক বড়। প্রিহার তো কোমর ছাড়িয়ে গেছে। আর কায়রার তো কোমর অব্দিও যেতে পারেনি। কি লজ্জার ব্যাপার! এবার আসলেই লজ্জা করছে কায়রার। সে ঠোঁট চেপে বলল,
“আমি বড় চুল সামলাতে পারি না।”

প্রীষান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
"এর থেকেও বড় দায়িত্ব নিয়েছো তুমি। যাইহোক, এখন থেকে চুল বড় হতে দাও। মাঝে মাঝে শুধু আগা কাটবে। এছাড়া কোন বাড়াবাড়ি নয়। কালার তো একদমই নয়।”

কায়রা ঠোঁট উল্টালো। তবে আর দ্বিমত করলো না।
থাক, প্রীষান যখন বলেছে কায়রা আর বাড়াবাড়ি করবে না। এখন থেকে চুল বড় করবে সে। অনেক লম্বা করবে, যতটা প্রীষান চায়। এরপর প্রীষান চুলগুলো দুইপাশে ভাগ করতেই দেখে ভেতরে অসংখ্য পাকা চুল। বিস্মিত হয়ে যায় প্রীষান। প্রিহারও চোখে পড়ে যায়। তা দেখে চমকে প্রিহা বলল,
"ইয়া আল্লাহ! তোমার তো চুল পেকে গেছে, আন্টি!"

প্রীভান তা শুনে কৌতুহলে উঁকি দিয়ে দেখলো। সত্যি পেকে গেছে। কায়রা এই ভয়টাই পাচ্ছিলো। চোখ খিঁচে ফেলল সে অস্বস্তি আর লজ্জায়। কায়রা এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
"এইজন্যই বসতে চাইছিলাম না। এবার সবাই জেনে গেলো! আমি কি করবো বলো তো? আমার ক্লাস নাইন থেকেই চুল পাকা শুরু হয়েছিলো। আর এখন তো অর্ধেকের বেশি পেকে গেছে! এসব লুকোতেই ওপরে কালার করি।"

প্রীষান কায়রার অস্বস্তি বুঝতে পেরে কায়রার মাথায় তেল দিতে দিতে প্রিহাকে বলল,
"এগুলো বার্ধ্যকের চুল পাকা নয়, প্রিন্সেস। অনেকের হরমোনাল ইম্ব্যালেন্সের কারণেও চুল পাকে অল্পবয়সে। ইট'স নরমাল।"

প্রিহা ধীর কন্ঠে বলল,
"স্যরি, আন্টি। আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি।"

কায়রা মাথা নেড়ে বলল, 
"আরে ধু'র! তুমি কেন স্যরি বলছো! এটা যে কেউ দেখলেই বলতো!"

এবার কায়রা প্রীষানকে জিজ্ঞেস করে, 
"আচ্ছা স্যার, আপনার চুল পাকে নি?"

প্রীষান বলল,
"না, এখনো তো পাকা চুল চোখে পরেনি।"

একথা শুনে কায়রা হেসে বিরবির করে বলল,
“আপনার আর কি! আপনি তো ঠিকি দিন দিন হ্যান্ডসাম হচ্ছেন!”

প্রীষান বিরবির করা অস্পষ্ট শুনতে পেয়ে বলল,
“কি বিরবির করছো?"

কায়রা হাহুতাশ করে মাথা নাড়ায়। তেল দেওয়ার পর একে একে সবাই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। কায়রাও বিছানায় শোয় প্রিহার পাশে। প্রিহা নিজের বালিশে একটা পাতলা কাপড় রেখে আরেকটা কায়রার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, 
"এটা বালিশের উপরে দিয়ে শোও, আন্টি। তাহলে তেল লেগে বালিশ নোংরা হবে না।"

কায়রা বালিশে কাপড় রেখে শুয়ে পরে। প্রিহাও এভাবেই শুয়েছে। তারপর জিজ্ঞেস করে, 
"আচ্ছা, তোমরা এত পারফেক্ট কেন বলোতো? আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই।"

প্রিহা মুচকি হেসে বলে, 
"আমরা কতটা পারফেক্ট জানি না। তবে আমাদের পাপা খুব পারফেক্ট! হয়তো তার জন্য আমরাও কিছুটা গুন পেয়েছি।"

প্রিহা আর কিছু বলে না। চোখ বন্ধ করে নিমেষেই ঘুমিয়ে যায়। কায়রাও ঘুমোয় ধীরে সুস্থে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নিঃশ্বাসে ভেসে উঠলো গভীর ঘুমের ছন্দ।

রাত বাড়তে লাগলো। একসময় সবাই বিছানায় শুয়ে পড়লো। প্রিহা ঘুমের মাঝে কায়রাকে জড়িয়ে ধরলো। প্রীভান একপাশে গুটিসুটি মেরে আছে। আর সবশেষে প্রীষান নিচে গিয়ে মেইন গেইটে তালা লাগিয়ে ঘরে ফিরে আসে। ঘরে এসে দেখে সবাই ঘুমে। রাত হয়েছে বেশ। ঘুমানোরই কথা। আর প্রীভান তো সবার আগে ঘুমিয়েছে। প্রিহা আর কায়রাও ঘুমে। প্রীষান লাইট বন্ধ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে আসে। এরপর বিছানায় বসে তাকিয়ে দেখে তার ছোট্ট পৃথিবীকে। ঠোঁটের হাসি চওড়া হয় তার। ছেলেমেয়ে দুটোর কপালের চু'মু দেয় এক এক করে। আর দ্বিধাহীনভাবে কায়রার মাথাতেও হাত বুলিয়ে দেয়। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ওদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। প্রীষান মুখে না বললেও সে ভীষন সন্তুষ্ট এই সম্পর্কে। এরপর বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো প্রীষান। একটা সময় ক্লান্ত চোখ দুটোয় ভর করে নিদ্রা। ঘুমে তলিয়ে গেলো সেও।

---------------------

রাত তখন ধীরে ধীরে গভীরতার দিকে ঢলে পড়ছে। ঘড়ির কাঁটা একটার ঘরে থেমেছে। অথচ ঘরের ভেতরে দিব্বি আলো জ্বলা। আলো-আঁধারির নরম আবরণে মোড়ানো ছোট্ট ঘরটায় এখনও টিভির পর্দায় ঝলমল করছে একশন মুভির দৃশ্য। 

আজ কাবির আর প্রীতিষা দু’জনেই পাশাপাশি বিছানায় বসে আছে। রাত ক্রমশ বাড়লেও তাদের চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। আজ বিকেলের অলস ঘুমটা তাদের রাতের ঘুমকে চুরি করে নিয়ে গেছে।
প্রীতিষা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে কাবিরের কাঁধে মাথা রেখে। থেকে থেকে প্রীতিষার চুলের স্মেল নিচ্ছে কাবির। তবে চোখ টিভির পর্দায় নিবদ্ধ। মুভি শেষ হতেই কাবির রিমোটটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে বলল,
“মুভি শেষ, যাও প্রীতি। ভালো মাইয়ার মতো ঘুমাও এখন। কালকে ভার্সিটি আছে না তোমার?”

প্রীতিষা একটু নড়েচড়ে আরও আরাম করে মাথাটা রাখলো কাবিরের বুকে। গলায় একটা অলস সুর এনে বলল,
“কাল যাবো না। ইম্পর্টেন্ট ক্লাস নেই।”

কাবির হালকা হেসে চোখ সরিয়ে নিলো টিভির দিকে। বলল,
“তা না গেলা। কিন্তু রাত জাগবা ক্যান হুদাই! ঘুমাও তুমি।”

প্রীতিষা এবার মুখটা একটু তুলে তাকালো কাবিরের দিকে। ঠোঁটে চাপা হাসি হেসে বলে, 
“সত্যি আমার ঘুম পাচ্ছে না। কিন্তু তুমি আমাকে বারবার ঘুমোতে বলছো কেন? তুমি কি করবে?”

কাবির বিছানা থেকে নেমে উঠে দাঁড়িয়ে রিমোটের বোতাম টিপতে টিপতে চ্যানেল ঘোরাতে লাগলো। আর বলল,
“গেম খেলমু একটু পর। তার আগে নিউজের হেডলাইন দেইখা নেই।”

এই কথাটা শুনেই প্রীতিষার ভ্রু কুঁচকে গেলো। সে হঠাৎ একটু সোজা হয়ে হাঁটু গেড়ে বিছানায় বসলো। তারপর কাবিরের হাতটা ধরে টান দিয়ে আদুরে কন্ঠে জেদ ধরে বলল,
“কিসের গেম খেলা এখন! আমি একা ঘুমাবো না। তুমিও আসো।”

কাবির ঘুরে প্রীতিষার গালে ঠোঁট চেপে মুচকি হেসে বলল,
"এমন আদুরে গলায় কথা কইয়ো না, প্রীতি! বুকে লাগে। আসতেছি দাঁড়াও। ব্যস, হেডলাইন দেখমু শুধু।"

প্রীতিষা আর আপত্তি করলো না। কাবির খবরের চ্যানেলের উদ্দেশ্যে রিমোট চাপে। কিন্তু একটা চ্যানেলে এসে হাত থেমে যায় তার। টিভির পর্দায় ঝলমলে আলোয় নাচছে জনপ্রিয় আইটেম গার্ল। শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে নাচ প্রদর্শন করছে নারীটি। আর সাউন্ডবক্সে বাজছে গান,

“দারু পিকে ড্যান্স কারে, ড্যান্স কারে, ড্যান্স কারে,
খুল কে রোম্যান্স কারে, ড্যান্স কারে, ড্যান্স কারে…”

কাবিরের হাতে থাকা রিমোট দিয়ে চ্যানেল ঘোরাতে বেমালুম ভুলে গেলো। পায়ের তালুতে অদ্ভুত এক শিরশিরে অনুভূতি জাগলো তার। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছোটবেলার সেই দিনগুলো। তরুণ বয়সে বন্ধুরা মিলে টিভির সামনে বসে এইসব গান দেখার জন্য কি পরিমাণ হন্যে হয়ে থাকতো! মনে মনে বলতো, সানি আপা'র কি চেহা'রা… মাথা খারাপ করা ফিগা'র, উফ'ফ! একেবারে খা'পে খা'প! ঠিক তখনই, পেছন থেকে প্রীতিষা চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে মুখ কুচকে বলল,
“ছিঃ! এসব জঘ'ন্য গান শোনো তুমি?”

প্রীতিষার গলা পেয়ে চমকে উঠে কাবির তড়িঘড়ি পেছন ফিরে তাকায়। হায় হায়! কাবির তো ভুলেই গেছিলো যে সে বিবাহিত! প্রীতিষা বসে আছে ভ্রু কুঁচকে, মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে। আজ প্রীতিষার মুডের বারোটা বেজে গেছে। 

কাবির হুসে ফিরতেই তড়িঘড়ি করে চ্যানেল বদলালো। সত্যি বলতে, এতদিন পর প্রিয় গান শুনতে পেয়ে দিন দুনিয়ার জ্ঞান খুইয়েছিলো সে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুহূর্তেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটে কাবির। মুখভঙ্গিতে আনতে চায় ভীষণ ভদ্রতা আর নিষ্পাপ ভাব। যেটা সে একদমই নয়। তারপর হালকা কেশে কাবির বলে ওঠে,
“আস্তাগফিরুল্লা! তবা তবা! বিশ্বাস করো প্রীতি, এখন আমি এইসব গান শুনি না!”

প্রীতিষা রাগে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলে তাকালো কাবিরের দিকে, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। কাবির একটু থেমে কৃত্রিম হাসি হেসে বলল,
“আসলে… অনেক দিন পর সামনে আইলো তো গানটা। ছোটবেলার স্মৃতি মনে পইরা গেছিলো আরকি! হেহেহে…”

-"ছি'হ! তোমায় ভালো ভেবেছিলাম আমি! আর তুমি কিনা..."

-"ছিঃ ছিঃ কইতাছো ক্যান, আজব! ছোটবেলায় এইডি গান শুইনা নাচ উঠতো আমার, জানো?"

-"তো এখন নাচো ধে'ই ধে'ই করে! আটকাচ্ছে কে?"

এই বলে প্রীতিষা রেগেমেগে দু'ম করে চাঁদর গায়ে টেনে শুয়ে পরে। কাবির একটু থমকে গেলো। বুঝলো বউটা রেগে গেছে। এই বউজাতি নিয়ে কাবিরের একটাই প্রশ্ন? যে চব্বিশ ঘন্টা এরা রেগে কেনো থাকে? তা রাগুক, কাবির একশবার রাগ ভাঙাবে। কারণ কাবিরের একটামাত্র আদুরে বউ। কাবির গিয়ে লাইট বন্ধ করে এসে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
"এই! আইছি তো। আমারে রাইখা ঘুমাইতাছো নাকি?"

প্রীতিষা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“লাগবে না তোমাকে, যাও! তুমি ওসব নাচ দেখো বসে বসে!”

কাবির এবার নিজেও প্রীতিষার চাঁদরের ভেতরে ঢুকে পরে। প্রীতিষা থমকে যায়। অদ্ভুত অনুভুতির তীব্রতায় খামচে ধরে চাঁদরখানা। সে কেঁপে উঠে কাবিরের ঠান্ডা শরীরের স্পর্শ পেয়ে। প্রীতিষা অস্ফুটে বলে, 
"সাপের মতো এত ঠান্ডা কেন তোমার শরীর?"

কাবির সে উত্তর দেয় না। সে আস্তে করে প্রীতিষার ঘাড় বরাবর ঠোঁট ছোয়ালো। আর চুল থেকে ঘ্রান নিলো ভ্যানিলার। প্রীতিষা আরও একবার কাঁপলো। সে একটু ওপাশে সরে যায়। এবার শুধু দু’জনের নিঃশ্বাসের ওঠানামা অস্থির হচ্ছে। তারপর কাবির মেয়েটাকে পেছনদিক থেকে নিজের দিকে টেনে নেয়। প্রীতিষার পিঠ গিয়ে ঠেকে কাবিরের শক্ত, দৃঢ় বুকে। কাবিরের পুরুষালী হাতটা অবিন্যস্ত হয়ে ঘুরতে থাকে মেয়েটার কোমরে। আরেক হাতে একদম জাপ'টে ধরে রয় কাবির প্রীতিষাকে। এবার কাবির প্রীতিষার গলার মাঝে মুখ গুজে দিয়ে বলল,
“গুড নাইট, প্রীতি। কালকে ফুল আনা লাগবো। মনে কইরো।”

প্রীতিষা মৃদু লজ্জালু কন্ঠে বলল,
"উ'ফ! অস'ভ্য কাবির!"

কাবির প্রতিউত্তরে কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করে সে শুধুই মিটিমিটি হাসলো।

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

 

পর্বসংখ্যা:৩৮

 

ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁইছুঁই। সকালটা অলসতায় ভরা। মাত্রই কাবির আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো বিছানায়। বড় একটা হাই তার ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে এলো। অথচ তার চোখে তখনও ঘুমের রেশ লেগে আছে। চোখ দুটোয় ঢুলুঢুলু ভাব। অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়ে পাশে প্রীতিষাকে খুঁজলো কাবির। কিন্তু বিছানার একপাশটা ফাঁকা। প্রীতিষা নেই। বউকে না পেয়ে কিছুটা জোর করেই চোখ মেলে কাবির। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো ফোড়নের শব্দ। এবার সে বুঝলো প্রীতিষা রান্নাঘরে। তখনই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো কাবিরের। উঠে দাঁড়িয়ে ঢুলতে ঢুলতে আধো ঘুম চোখে কাবির এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে।

সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর ঢিলেঢালা ট্রাউজারে কাবিরের অবয়বটা ছিলো একেবারে সহজ পুরুষালী ভঙ্গি। হাত দুটো উপরে তুলে কসরত ভঙ্গিতে চওড়া কাঁধে হালকা টান দিয়ে ঘাড়টা চারপাশে বাঁকিয়ে নিলো সে। বলিষ্ঠ বাহু, চওড়া কাঁধ, বুকের মাংসাশী পেশির মাধ্যমে পুরুষালী সৌন্দর্য্য ঠিকরে বের হচ্ছে যেন। রান্নাঘরে ঢুকতেই কাবিরের চোখে পড়লো প্রীতিষাকে। মেরুন রঙের থ্রিপিস পরনে তার। চুলগুলো ভেজা, তোয়ালে দিয়ে আলতো করে জড়ানো। সদ্য গোসলের সতেজতা তাই প্রমাণ করছে।
ইতিমধ্যে কাবির এসে প্রীতিষার পেছনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রীতিষা তা খেয়াল করেনি। কাবির মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে, 
"এত সকালে উঠছো ক্যান?"

প্রীতিষা গলা পেয়ে একটুখানি চমকে পেছনে তাকিয়ে হেসে বলল, 
"ওহ! তুমি কখন উঠলে? আমার তো আজকে আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো।"

কাবির গ্যাসে থাকা প্যানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলল, "সকাল সকাল নুডুল'স!"

প্রীতিষা হালকা হেসে বলল, 
"মন চাইলো তাই। প্রতিদিন ভাত খেতে কেমন লাগে বলো তো? একঘেয়ে!"

কাবির এগিয়ে গিয়ে ক্যাবিনেটের উপর বসে পড়লো। 
এরপর হঠাৎ খেয়াল করলো প্রীতিষা হাসায় ওর গালে টোল পরেছে। কাবির আগে ঠিকভাবে খেয়াল করেনি। আজ দেখলো, মেয়েটার গালে টোল পড়লে মারাত্মক লাগে! সে আবারও নতুন করে আবিষ্কার করলো মেয়েটার অন্য এক সৌন্দর্য্যকে। কাবির এবার এগিয়ে এসে টোল পরা স্থানে ঠোঁট চেপে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
"এই প্রীতি! তোমার গালে টো'ল পড়ে? আজকে দেখলাম!"

প্রীতিষা প্যানে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মেকি রাগ দেখিয়ে  বলল, 
"আমাকে ভালোভাবে দেখো কখন তুমি? দেখবে তো সিনেমার নায়িকাদের!"

কাবির হো হো হেসে উঠলো। মেয়েটা রাগ করলেও আজকাল কাবিরের ভালো লাগে। প্রীতিষার গাল টিপে সে বলল,
"কি যে কও! আমি ক্যান নায়িকা দেখমু, যখন আমার ঘরেই আমান প্রীতি জিনতা আছে। দেখছো, নামেও কত মি'ল!"

কথাটার ভেতরে লুকানো ভালোবাসা নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেলো প্রীতিষাকে। এবার প্রীতিষা প্যান নামিয়ে ঢেকে রেখে হাত ধুয়ে নিলো। হাত ধুয়ে কাবিরের কাছে এসে ওর হাত ধরে আলতো করে নাড়াতে নাড়াতে প্রীতিষা বলল, 
"তুমি আজকাল আমার সাথে রোমান্টিক কথাবার্তা  বলো না, কাবির!"

কাবির ভ্রু কুঁচকে বলল, 
"এইটা কিন্তু রীতিমতো নেকামি! কাল রাতেও না কত কথা কইলাম!"

প্রীতিষা মুচকি হেসে উত্তর দিলো, 
"হাসব্যান্ডের সাথে নেকামি করবো না তো কার সাথে করবো? হুহ!"

কাবির নিজেও হাসলো। প্রীতিষার গালে হাত রেখে বলল,
"হুম, তাও ঠিক। আচ্ছা, আমি গোসল দিয়া আসি। তুমি রেডি করো সব।"

এই বলে কাবির চলে গেলো। প্রীতিষাও খাবার রেডি করে টেবিলে রাখে। কিছুক্ষণ পর একটা বালতিতে ময়লা পানি চোখে পরলে প্রীতিষা বালতি নিয়ে চলে যায় বাইরে রাস্তায় পানি ফেলতে। প্রীতিষা বাইরে পানি ফেলতে গিয়ে অসাবধানতায় একজনের গায়ে ময়লা পানি ঢেলে দিলো। দোষ পুরোপুরি তার নয়। প্রীতিষা খালি রাস্তাতেই পানি ফেলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু পানি ফেলার সময় ছেলেটা হুট করে সামনে চলে আসায় তার গায়ের উপর সব পানি পরে যায়। প্রীতিষা হতবম্ব হয়ে যায়। তারাহুরো করে বলে,
"স্যরি স্যরি! দেখতে পাই নি!"

ছেলেটা চোখ মুখ কুচকে পাশে তাকিয়ে কিছু বলতেই যাবে তার আগে প্রীতিষাকে দেখে থেমে যায়। মুলত, প্রীতিষাকে কাবিরের বাসায় দেখে অবাক হয়েছে সে। ছেলেটি রকি, এলাকার পাতি মাস্তান। প্রীতিষাও এবার খুব ভালো করে চিনতে পেরেছে ছেলেটাকে। এই তো সে, যে প্রীতিষাকে ডিস্টার্ব করেছিলো। তাই মুখভঙ্গি আবার কঠিন করে ফেলে প্রীতিষা। রকি সন্দেহজনক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
"তুমি একা মাইয়া কাবিরের বাসায় কি করো?"

প্রীতিষা দৃঢ় গলায় বলল, 
"আমি ওর বউ। সুতরাং, ওর বাসায়'ই তো থাকবো আমি, তাইনা?"

কথাটা আঘাত করলো রকির হৃদয়ে। কারণ, রকির পছন্দ হয়েছিলো মেয়েটাকে। সব জেনে রকি হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রয়। বিস্মিত হয়ে বলে,
"কিহ! কাবির বিয়া কইরা ফালাই'ছে তোমারে!"

ঠিক তখনই পেছন থেকে কাবিরের কণ্ঠ আসে, 
"হ, তোর কোনো সমস্যা?"

পরিস্থিতি মুহূর্তেই তপ্ত হয়ে উঠলো। রকি এবার সব বুঝে ফেলে। মেয়েটা অবিবাহিত হলে রকি কিছুই বলতো না। বরং খুশি হতো। কিন্তু শত্রুর বউ হওয়ায় জমানো রাগ উগরে প্রীতিষাকে ধমকে বলে,
"চোখে দেহো না? মাইনসের গায়ের উপর ময়লা পানি ফালাও!"

প্রীতিষা ভদ্রভাবেই বলল,
"আমি তো স্যরি বলেছি এর জন্য। ইচ্ছে করে ফেলিনি, ভাইয়া।"

ভাইয়া ডাক শুনে মাথাটা আরও গরম হয় রকির। রকি আবারও দ্বিগুণ বেগে ধমকে উঠে,
"তোমার স্যরিতে কি আমার গায়ের ময়লা যাইবো!"

এবার প্রীতিষা কিছু বলতেই যাবে তার আগেই কাবির প্রীতিষার সামনে এসে একেবারে রকির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। এরপর ঘাড় বাকিয়ে বিকারগ্রস্তের ন্যায় উচ্চস্বরে বলল,
"ওই গলা না'মা! চিল্লা'স কোন সাহ'সে! স্যরি কওয়ার পরেও এত কথা ক্যান?"

প্রীতিষা ঝামেলা হওয়ার ভয় পেয়ে কাবিরকে থামাতে বলল,
"থামো, কাবির। অযথা ঝামেলা করো না।"

এদিকে রকি আবার তেঁতে উঠে,
"তোর বউয়ের দোষ দেখস না?"

কাবিরের ঠোঁটে বাঁকা হাসি, 
"কিসের দোষ! তা তুই কোন ভদ্রলো'ক হে! আমার বউ তোর উপর ময়লা পানি ফালাইছে, বেশ করছে! তুই এমনিতেও আবর্জনা'ই।"

রকি এবার আঙুল তুলে কিছু বলার আগেই কাবির ওর আঙুল উল্টোদিকে মুচড়ে ধরে বলল,
"কারে আঙুল দেখা'স! এলাকায় টহল দেই না দেইখা সাহস বাড়ছে নাকি? ডিরেক্ট একবারে ক'ল্লা কাটমু! চল, ফো'ট!"

এরপর ঠা'স করে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো রকির মুখের উপর। এদিকে প্রীতিষা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো, 
"ভুল'টা আমারই ছিলো, কাবির। পানি তো আমিই ফেলেছিলাম।"

কাবির শান্ত গলায় বলল, 
"কিসের ভুল? ও কোনো ভদ্রলোক না যে স্যরি হবা তুমি। ওয় দিনে ইভটিজিং করে, রাইতে নেশা করে। আরও বহুত গুন আছে। ওর কাছে কিসের স্যরি? এরপর থেকে পারলে ওর মু'খে আবর্জনা ফালা'বা! বাকিটা আমি দেখমু।"

প্রীতিষা এসব শুনে ফিচ করে হেসে বলে,
"হাসব্যান্ড হলে তোমার মতো হওয়া উচিত। মানে এমন সাপোর্টি'ভ। হাহাহা!"

"আসো, খিদা লাগছে।"

প্রীতিষা কাবিরের এক হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
"চলো।"

---------------------

প্রীতিষা আর কাবির ছোট টেবিলটায় বসেছে। কাবির হাত দিয়েই নুডুলস গোগ্রাসে গিলছে। কিন্তু প্রীতিষা এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজছে। কাবির তা দেখে বলল,
"কি খুঁজো খাওয়া বাদ দিয়া?"

প্রীতিষা আশেপাশে খুঁজেও কাঙ্খিত বস্তুটি না পেয়ে বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করে বলে,
"কাটা চামচ'টা পাচ্ছি না। এখানেই রেখেছিলাম।"

কাবির স্বাভাবিকভাবে বলল,
"চামচ লাগবো না, হাত দিয়া খাও।"

প্রীতিষা যেন বিস্ময়কর কিছু শুনলো। সে অবাক কন্ঠে বলল,
"হাত দিয়ে নুডুলস খাবো!"

কাবির বলল,
"আরে ভাই! হাত দিয়া খাওয়ার মতো শান্তি আছে দুনিয়ায়! নাইলে আল্লাহ হাত দিছে ক্যান!"

কাবিরের যুক্তিতে হার মানে প্রীতিষা। অগত্যা তাই করলো। জীবনে প্রথম হাত দিয়ে নুডুলস খেলো সে। কাবির ওর খাওয়ার ভাব দেখে বলল,
"নিশ্চিত এইডাও ফার্স্ট টাই'ম?"

প্রীতিষা মাথা নাড়িয়ে খেতে খেতে জবাব দেয়,
"জ্বি...তোমার সাথে সব কিছুই ফার্স্ট টাই'ম। প্রতিদিন একদম নিউ নিউ এক্সপিরিয়েন্স করাচ্ছো আমাকে।"
 
কাবির এবার নিজের প্লেট থেকে নুডুলস তুলে প্রীতিষার মুখের দিকে বাড়িয়ে দিলো, 
"তা এই এক্সপিরিয়েন্সগুলা ভালো না খারাপ?"

প্রীতিষা কাবিরের হাত থেকে খেয়ে হাসিমুখে বলল,
"ইউনিক!"

সেই হাসির মধ্যে ছিলো ভালোবাসার, অভ্যাস হয়ে যাওয়ার আর একসাথে পথ চলার স্বীকৃতি। ওদের ছোট্ট পৃথিবীটা ঠিক ততটাই পূর্ণ ছিলো, যতটা হওয়া উচিত দুইজন মানুষের ভালোবাসায় ভরা পৃথিবী। যেখানে কমতি ছিলো না কিছুর। না হোক কমতি।

---------------------

প্রীষান সন্ধ্যার আগে প্রতিদিনের মতো পড়তে বসিয়েছে মেয়েকে। ছেলেটা সবে দুটো টিউশন থেকে ফিরেছে বলে প্রীষান ছাড় দিয়েছে। কারণ, যতই হোক সারাক্ষণ পড়াশোনা কার ভালো লাগবে? বাবার অনুমতি পেয়ে সাথে সাথে প্রীভান ক্রিকেট খেলতে ব্যাট নিয়ে চলে গেছে মাঠে। আর প্রিহার ঘরে প্রীষান রিডিং গ্লাস চোখে পরে মেয়েকে ম্যাথ বোঝাচ্ছিলো। 
বাবা-মেয়ে পড়তে বসেছে বলে কায়রা দুজনের জন্য কফি এনে টেবিলে রেখে বলে,
"এই যে গাই'স, কফি..."

এই বলে খুশিমনে কায়রা হেলেদুলে চলে যায়। কিন্তু মাঝপথে প্রীষান ডেকে উঠে,
"তুমি কোথায় যাচ্ছো? তোমার বই নিয়ে এসো যাও।"

কায়রার পা থেমে যায় এবার। পিছু ফিরে ঠোঁট উল্টে বলে,
"আমি এখন পড়বো না।"

প্রীষান সামনে চোখ রেখেই কঠিন গলায় বলল,
"তুমি এখনি পড়তে বসবে। বই-খাতা নিয়ে এসো। এক কথা দ্বিতীয় বার বলতে পছন্দ করি না আমি। গো!"

কায়রা বুঝলো আর বলে লাভ নেই। তাই অযথা তর্কে জড়ালো না সে। ভাঙা মন নিয়ে চলে গেলো বইখাতা আনতে। একটু সময় বাদে ফিরেও আসে। তবে কায়রা এই-কদিনে একটা জিনিস ভালোভাবে বুঝেছে। যে প্রীষান প্রচন্ড কন্ট্রোলিং। এমনকি ছেলেমেয়ে দুটোকেও ভীষন কন্ট্রোলে রাখে সে। একটু কথার হেরফের হলেই প্রীষান রেগে যায়। অবশ্য কায়রার এতে সমস্যা নেই। ওর জীবনে কন্ট্রোলের ভীষন অভাব ছিলো। কারণ, ভাইয়েরা কখনো কায়রাকে কোনো বিষয়ে আপত্তি করেনি। প্রীষান যা করে, অযৌক্তিক কিছু করে না। ভালোর জন্যই করে। তাই কায়রাও তর্ক না করে প্রীষানের কথা দিরুক্তি না করে মেনে নেয়। 

অবশেষে বই-খাতা নিয়ে কায়রা প্রীষানের পাশের চেয়ারে বসে। প্রিহা তখন লিখছে। প্রীষান কায়রার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
"ফাঁকিবাজি কমবে কবে তোমার?"

কায়রা হতাশ গলায় বলে,
"আমার সুখের সংসারে আপনি পড়াশোনা কেন ঢোকাচ্ছেন, স্যার?"

কায়রার বলার ভঙ্গিমায় প্রিহা হেসে ফেলে। প্রীষান এবার কঠোর ভাবে বলে,
"যদি তোমার কমেডি-শো শেষ হয়ে থাকে তো এবার আমরা পড়া শুরু করি?"

কায়রা সাথে সাথে বলে উঠে,
"ইয়েস, স্যার!"

প্রীষান বারবার 'স্যার' শব্দটি শুনে বিরক্ত হলো। বাড়িতে, কলেজে সবসময় এভাবে ডাকে মেয়েটা। সম্পর্ক বদলেছে, কিন্তু ডাক নয়। তাই সরাসরি প্রীষান কায়রাকে বলল,
"এভাবে স্যার ডাকা বন্ধ করো। দু'দিন পর ফ্রেন্ডরা মিলে একটা গেট টুগেদার এরেঞ্জ করছে। সেখানে তুমিও যাবে। তখন মুখ ফসকে সবার সামনে স্যার বলে ডাকলে কেমন শোনাবে?"

কায়রা বুঝলো ব্যাপারটা। তবে আর কি বলে ডাকবে? অত বড় মানুষ! হুট করেই কায়রা বলে ফেলে, 
"ওকে। নাম ধরে ডাকা তো অসম্ভব, তাই আমি আপনাকে 'প্রিহার পাপা' বলে ডাকবো। কিউ'ট না?"

প্রীষান বিমুঢ় কন্ঠে বলে,
"হোয়াট?"

প্রিহা তখন নিজের লেখা খাতা প্রীষানের দিকে এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
"ডাক'টা কিন্তু খারাপ না, পাপা। আন্টির চয়েস ভালো।"

কায়রা গর্বিত হলো। আর ফাইনাল করলো এই নামেই ডাকবে। এবার সে প্রিহাকে বলল,
"তুমি আর বাবা'ই আছো যারা আমাকে এই বাড়িতে সাপোর্ট করে। কিন্তু তোমার পাপা আমাকে সবসময় ধমকের উপর রাখে। ভার্সিটিতে তিন বছর ধরে তোমার পাপার ধমক খেয়ে আসছি। আর এখন তো পুরো জীবন খেতে হবে!"

এমন কথায় কায়রা আর প্রিহা দুজনেই হাসলো। 
এদিকে প্রীষানও কিছু বলছে না আর। সে ভাবছে অন্যকথা। এটলিস্ট, স্যার থেকে প্রিহার পাপা বেটার। প্রীষান চোরা চোখে একবার তাকালো কায়রার দিকে। এখন কলম কামড়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে পড়ছে মেয়েটা। কি অদ্ভুত! প্রীষানের জীবনে দুটো সঙ্গীনি ছিলো অদ্ভুত এবং বিপরীত। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, মনের দিক থেকে দুজনেই ভীষন চমৎকার। ভাগ্যের জোরে চমৎকার দুটো সঙ্গীনির সাথে পরিচয় হয়েছিলো প্রীষানের। ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভাবে। 

-----------------------------

কায়রাভ আজ কায়েশীর ফোন পেয়ে বেশ তারাতাড়ি করে পার্টি অফিস থেকে ফিরছে। বর্তমানে সে গাড়িতে। গাড়ির ফ্রন্ট সিটে রয়েছে ফিরোজ, কায়রাভ। পেছনে সবুজ বসে আছে। আর ফিরোজ গাড়ি চালানোতে মনোযোগী। কায়রাভকে এভাবে তারাহুরো করে আসতে দেখে সবুজ পেছন থেকে জিজ্ঞেস করে, 
"আজকে এত তারাতাড়ি বাড়ি যাইতাছেন ক্যান, ভাই? বাড়িতে সব ঠিক আছে তো?"

কায়রাভ মৃদু গলায় বলল,
"হ্যাঁ, সব ঠিকই আছে। ওই তোর ভাবী ফোন করেছিলো। বলল, তারাতাড়ি বাড়িতে আসতে। কি একটা সারপ্রাইজ দেবে। আমি ভাবলাম, মহাশয়া আমার উপর রহম করেছে। আজকাল আমাদের ঝগড়াঝাটি হয়না। স্বাভাবিক দম্পতির মতো দিন কাটছে কিছুদিন ধরে। এরই মধ্যে সারপ্রাইজ! তারাতাড়ি করবো না, বল?"

সবুজ পেছন থেকে হাহুতাশ করতে করতে বলল, 
"আপনাগো বিবাহ পরবর্তী অবস্থা দেইখা আর ফিরোজ ভাইয়ের প্রেমিকার প্যারা দেইখা আমার বিয়ার স্বাদ মিটা গেছিলো। ফিরোজ ভাইয়ের'টা তাও মানা যায়। কিন্তু ভাবীর মতো ভয়ংক'র মাইয়া আমি জীবনে দেখি নাই।"

ফিরোজ মৃদু হাসলো। কায়রাভও ঠোঁট টিপে হেসেছে। তবে ফিরোজ শান্ত গলায় বলল,
"ভাবী যথেষ্ট ভালো একটি মেয়ে। তাই সংসার করছে। আর ওই পরিস্থিতিতে কোনো মেয়েই স্বাভাবিক আচরণ করতো না, সবুজ। এই বিষয়ে ভাইকে আমি সাপোর্ট করছি না। কিন্তু সেদিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহসও আমার ছিলো না।"

কায়রাভ এবার হালকা শ্বাস ফেলে। ও অনুতপ্ত সব কিছুর জন্য। ওদের দলে একমাত্র ফিরোজই আছে যে সবচেয়ে বোঝদার, মাথা ঠান্ডা লোক। তাই কায়রাভকে রাজনীতি বিষয়ক সব পরামর্শ ওই দেয়। সবুজও কায়রাভের ডান হাত। এরা দুজনেই কায়রাভের ভাই-সম। তাই কোনো কথায় সংকোচ নেই তাদের। কায়রাভ মৃদু স্বরে বলল,
"ওইদিন আমার কি হয়ে গিয়েছিলো, আমি নিজেও জানি না। তোরা তো জানিস, কায়েশীকে এভাবে তুলে নিয়ে কখনোই বিয়ে করতে চাইনি আমি। ওকে বোঝাতেই গিয়েছিলাম ওইদিন। কিন্তু ও আমাকে থুথু দিয়ে মাথায় রাগ চড়িয়ে দিয়েছিলো। জেদ চেপে বসেছিলো আমার। ওই একটা ভুলের মাশুল আমি চার বছর ধরে দিচ্ছি। এখনো আমায় কায়েশী ভালোবাসতে পারেনি, ইয়ার! সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে কিন্তু ভালোবাসা হয় নি।"

ফিরোজ গাড়ি চালানোতে মনোযোগী থাকলেও কায়রাভের সমস্ত কথা শুনছিলো মন দিয়ে। ফিরোজ বলল,
"জোর করে তো ভালোবাসা হয় না, ভাই। তার মধ্যে ভাবীর পছন্দ অন্য কেউ ছিলো। মুভ অন করতেও সময় লেগেছে। এক্ষেত্রে, আপনার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।"

কায়রাভ হালকা ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। আর ধীর গলায় বলে, 
"দিয়েছি সময় ওকে। আমার পুরো জীবনটা'ই দিয়ে দিয়েছি। শুধু মরার আগে কায়েশীর মুখ থেকে একবার হলেও ভালোবাসার কথাটা শুনতে চাই। না হলে মরেও শান্তি পাবো না আমি।"

সবুজ আতঁকে উঠে বলে,
"এইসব বইলেন না, ভাই। ভালোবাসবো নি দেইখেন। আল্লাহ আপনারে ভাবীর ভালোবাসা পাওয়ার তৌফিক দান করুন।"

ফিরোজ আর কায়রাভ একসাথে বলে উঠে, 
"আমিন। "

চলমান......

(আপনারা মন্তব্য করেন না কেন? 🙁 বড় বড় মন্তব্য চাই!!) 

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Posts: 39
Topic starter
(@priyanshi-chowdhury)
Joined: 5 months ago

পর্বসংখ্যা:৩৯

 

 

কায়েশীকে আজ বেশ হাসিখুশিই লাগছে। ঘরটার প্রতিটা কোণ তার ছোঁয়ায় বদলে গেছে। আজ কায়েশী নিজ হাতে সব সাজিয়েছে, নিজ উপার্জনে। লাল আর সাদা লাভ-শেপ বেলুনগুলো ঘরের ছাদে ভাসছে। কিছু বেলুন মেঝেতেও ছড়ানো। আশেপাশে বিভিন্ন ক্যান্ডেলস। আর দেয়ালে হ্যাপি অ্যানিভার্সারি লেখা ব্যানার টানানো। বিছানা এবং মেঝে সাজানোর জন্য গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছে। বিছানায় পাপড়ি দিয়ে হার্ট শেপ বানানো। এর উপর ছোট ছোট কুশন এবং টেডি রাখা। সাজানো টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট কেকটা সাধারণ লাভ-শেপ চকলেট কেক।তবুও আজ সবচেয়ে বিশেষ। এর কারণ, আজ তাদের ফিফ্থ অ্যানিভার্সারি। তবে এই উদযাপন প্রথমবারের মতো। কায়রাভ সাহস করে কিছুই করেনি কায়েশীর পছন্দ না বলে। কিন্তু আজ কায়েশী নিজে থেকেই এতকিছু করেছে। তাদের বিবাহবার্ষিকী এবং কায়রাভকে দ্বিতীয়বার বাবা হওয়ার সুখবর দিতে। আজ বহুদিন পর কায়েশীর ঠোঁটে লেগে আছে ভীষণ আপন হাসি। অনেকদিন পর ও হাসলো বোধহয়। সে মনে মনে ভাবছে, কায়রাভ এতকিছু দেখে, বাবা হওয়ার কথা শুনে কেমন রিয়্যাকশন দেবে! নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। এছাড়া, আজ তো কায়েশী নিজের ভালোবাসার কথাও বলবে। এত চমক একসাথে পাবে কায়রাভ। ভেবেই খানিকটা হাসলো সে। 

ওদিকে সোফার উপর বসে কায়ান নিজের মতো খেলায় ব্যস্ত। ছোট্ট দুটো হাতে বেলুন মুখে চেপে ধরে ফোলানোর প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু আবারও ফলাফল, 
পটাস! এই বেলুনও ফেটে গেলো। এই নিয়ে তিনটি বেলুন ফাটালো কায়ান। তবুও কায়ান থমকে না গিয়ে বরং খিলখিল করে হেসে হাত তালি দিয়ে উঠলো,
“মা! বেলুন ফেতে গেলো তো!”

কায়েশী কাজের ফাঁকে পেছনে ফিরে তাকিয়ে হালকা চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ফাটবেই তো! তুমি এত বেশি ফোলাচ্ছো কেন?”

কায়ান মায়ের বকুনিতে একটুও বিচলিত হয়নি। তার চোখে এখনো খেলা করছে দুষ্টুমি। বলল,
“আলেকটা বেলুন ডাও…”

কায়েশী এবার একটু গম্ভীর সুরে মাথা নাড়লো,
“না, আর না। তোমার খেলার জন্য আলাদা করে রেখেছি আমি। পরে দেবো।”

ছোট্ট মুখটা একটু গম্ভীর হলো বটে, কিন্তু সেটা স্থায়ী হলো না। সোফা থেকে নেমে টলমল পায়ে টেবিলে রাখা কেকের দিকে এগিয়ে গেলো সে। গোলগোল চোখ দুটো বিস্ময়ে ভরে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো, 
“আজকে কি আমাল জন্মদিন? কেক এনেচো কেন?”

কায়েশীর হাতের কাজ প্রায় শেষ। সে মৃদু হেসে কায়ানকে কোলে তুলে নিলো। বলল,
“আজ তোমার জন্মদিন না, বাবা। ওটা আসতে এখনো দেরি আছে। আজ একটা স্পেশাল দিন… তোমার মা-বাবার। যাগগে, সারাদিন অনেক জ্বালিয়েছো। এখন খেয়েদেয়ে লক্ষী ছেলের মতো ঘুমু দিবে।”

কায়ান হয়তো পুরোটা বুঝলো না। তবুও মায়ের কাঁধে মাথা রেখে আবারও ফিচ করে হেসে উঠলো। ঘুম তখন ধীরে ধীরে তার চোখের পাপড়িতে ভিড় করছে। ছোট্ট হাত দিয়ে চোখ ডলতে ডলতে একটা বড় হাই তুলল সে। মাথাটা আলতো করে কায়েশীর কাঁধে হেলে পড়লো। কায়েশী নিঃশব্দে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো, বাচ্চা… তোমার বাবাকে চমকে দিতে হবে।”

------------------------------

সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। আকাশের শেষ রোদের রঙটা মিশে যাচ্ছে শহরের ধূসরতায়।  ঠিক সেই সময়েই কায়রাভ বাড়ির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। দরজার চৌকাঠ পেরোতেই তার কণ্ঠে ভেসে ওঠে পরিচিত ডাক,
“কায়েশী... কায়েশী!”

উপরতলা থেকে হালকা ব্যস্ত গলায় জবাব আসে, “শুনেছি! ওয়েট... এখনই আসবেন না। আর দশ মিনিট!”

কায়রাভ গায়ের শালটা খুলে পাশে রেখে মৃদু হাসলো। কণ্ঠে হালকা সুর,
“কি করছো বলতো? কিসের এত তোড়জোর?”

কায়েশী তখন ঘরের ভেতর যেতে যেতে বলে,
"আরেকটু সবুর করুন।"

কায়রাভ হাসলো খানিক। এরপর আর উত্তর আসে না, শুধু পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় ঘরের ভেতরে।
কায়রাভ আর কিছু না বলে এগিয়ে গিয়ে জগ থেকে পানি ঢেলে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নেয়। শরীরটা হালকা হতেই বসার উদ্দেশ্যে সোফার দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু হঠাৎই পায়ের সাথে ধাক্কা লাগে একটা লোহার বাক্সে। ধাতব শব্দে বাক্সটা উল্টে পড়ে যায়, আর ছড়িয়ে পড়ে ভেতরের সবকিছু। মেঝেতে বিডস, ইলাস্টিক সুতো, পেন্ডেন্ট, চেইন, প্লায়ার্স, কাঁচি, গ্লু , মুক্তা এসব সাজসজ্জার সরঞ্জাম ছড়িয়ে পরে। সব দেখে বুঝলো এসব কায়েশীর বিজনেসের সামগ্রী। আশেপাশে তাকিয়ে কায়রাভ এবার ডাকলো,
"চাচা! এসব জিনিস ড্রয়িং রুমে না রেখে এখানে ছড়িয়ে রেখেছেন কেন? কায়েশীর জিনিস না এগুলো?"

তখন মালি চাচা গাড়ি পরিস্কার করছিলো।কায়রাভের গলা পেয়ে জবাব দেয়,
"হ্যাঁ বাবা, বউমার'ই জিনিসপত্র এগুলা। বউমা বলল আজকেই তার বাড়ি থেকে এনে দিতে। আমি এক্ষুনি গাড়ি পরিস্কার করে আসতেছি!"

কায়রাভ আর কিছু বলে না। চুপচাপ সোফায় বসে পরে আরাম করে। কিন্তু হঠাৎই তার চোখ আটকে যায় একটা রঙিন ডায়েরি আর কিছু ছবির উপর।
ছবিগুলো সব তুলে নেয় কায়রাভ। আর দেখতে থাকে কায়েশীকে। বিয়ের আগের ছবি এসব। কোথাও নদীর ধারে, কোথাও খোলা আকাশের নিচে। প্রতিটা ছবিতে হাসছে মেয়েটা। তখন মেয়েটার বয়স আঠারো ছিলো। স্বচ্ছ, স্নিগ্ধ মুখভঙ্গি তাই বলছে। 

এরপর কায়রাভ সময় কাটাতে ডায়েরিটাও তুলে নেয়। ডায়েরির পাতা উল্টে দেখলো পাতার পর পাতা জুড়ে বিভিন্ন ছন্দ লেখা। তাও যেমন তেমন ছন্দ নয়, কাব্যিক প্রেমময় ছন্দ। এগুলো অনেক পুরোনো বোঝা গেলো। দুই হাজার বিশ সালের কাছাকাছি। কারণ কায়েশী প্রতিটি লেখায় নিজের নামসহ তারিখ, সাল উল্লেখ করে দিয়েছে। উপরে আবার নিজের ছবিও দিয়ে রেখেছে। ছবির নিচে বিভিন্ন ছন্দ লেখা। বউয়ের পুরোনো ছবিগুলো দেখে হঠাৎ কৌতুহল বাড়ে কায়রাভের। তাই সে কায়েশীর ছবিগুলো দেখতে দেখতে মন৷ দিয়ে আর তার লেখা বিভিন্ন ছন্দ উৎসুকতায় কায়রাভ পড়তে লাগে। ঠোঁটে হাসি ফোটে কায়রাভের। বাচ্চা মেয়ে ছিলো তখন কায়েশী। কিছু বাক্য পড়ে হাসিও পেয়েছে কায়রাভের। 

এরপর কয়েকটি পাতা উল্টাতেই দেখলো কাবির আর কায়েশীর হাসিমুখের ছবি। ভ্রু কুচকালো কায়রাভের। যদিও ছবিগুলো ঘনিষ্ঠ নয়, স্বাভাবিক ছবি কিন্তু কায়রাভের অদ্ভুত লাগলো। বিস্মিত হয়ে তাকালো কায়রাভ। মনে মনে ভাবলো, তাহলে কি ওরা পুর্ব-পরিচিত ছিলো! ভাবনা সরিয়ে নিমেষেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় নিচের লেখাগুলো দেখে।কায়রাভের হাত কেঁপে উঠে সামান্য। নিচে স্পষ্ট লেখা ভালোবাসার কথা। এছাড়া লাভ শেপের ভেতর কাবির আর কায়েশীর নাম। শ্বাস আটকে গেলো তার। আরও পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখে প্রত্যেকটাতেই কাবির আর কায়েশীর ছবি এবং নিচে ভালোবাসার স্বীকারোক্তিতে কাব্যিক ছন্দ লেখা।

অকস্মাৎ, কায়রাভ ডায়েরিটা ছুড়ে ফেলে দিলো অত্যাধিক রাগে। কায়রাভ জানতো কায়েশীর প্রেমিক আছে। কিন্তু সেই প্রেমিক কে তার ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের করার প্রয়োজনবোধ করেনি কায়রাভ। কিন্তু এবার আর বুঝতে বাকি নেই সেই প্রেমিক কে! ক্রমাগত অস্থির ভঙ্গিতে মাথার চুল খামচে উপরদিকে শ্বাস টানলো কায়রাভ। চোখ রক্তবর্ন ধারণ করেছে নিমেষে। শ্বাস ভারী হয়ে যায়। ঠিক তখনই উচ্ছ্বসিত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে কায়েশী। উজ্জ্বল মুখে, আনন্দভরা কণ্ঠে সে কায়রাভের হাত ধরে টেনে বলে,  
“এবার চলুন! সব রেডি!”

কায়েশী ঘুরে কায়রাভকে টেনে নিয়ে যেতে গেলে কায়রাভ স্থির হয়ে রইলো৷ কায়েশী বুঝলো কায়রাভকে তার স্থান থেকে নড়াতেও পারেনি সে। পেছন ফিরে অবাক কন্ঠে কায়েশী বলল,
"আরে! এভাবে স্ট্যা'চু হয়ে আছেন কেন? চলুন না উপরে। এত কষ্ট করে সাজালাম!”
 
কায়রাভ অনিমেষ কায়েশীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তবে সে দৃষ্টি আজ ভালোবাসার নয়, ক্ষোভের। কায়েশী এবার খেয়াল করে কায়রাভের চোখ রক্তাক্ত। মুখভঙ্গি একদম ঠান্ডা। তার চোখে কোনো অনুভূতি দেখতে পাচ্ছে না কায়েশী। হঠাৎ কায়রাভ অতি ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, 
“এমনটা কেন হলো, কায়েশী?”

কায়েশীর বুক ধক করে ওঠে। ভাবলো রাজনৈতিক কোনো ঝামেলা হয়েছে বোধহয়। তাই কায়েশী আতঙ্ক গলায় জিজ্ঞেস করে,
"মানে...কি হয়েছে? পার্টি অফিসে কোনো ঝামেলা হয়েছে? এমন অদ্ভুত বিহেভ কেন করছেন?"

কায়রাভ এবার রেগে কায়েশীর দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো, সর্বশক্তি দিয়ে। কায়েশী স্তম্ভিত হয়ে গেলো। পরমুহূর্তে অনুভব করলো দু-হাতে তীব্র ব্যাথা অনুভুত হচ্ছে। কায়েশী মৃদু আর্তনাদ করে অস্ফুটে বলে,
"আ'হ! লাগছে আমা'র!"

ধৈর্য্য হারিয়ে কায়রাভ উচ্চস্বরে গর্জে উঠে বলল,
"অভিনয় করেছো আমার সাথে? এতদিন মিথ্যে বলে এসেছো!"

কায়েশী কিছুই বুঝলো না। ওর ধ্যান এখন যে, ও ব্যাথা পাচ্ছে দুই-হাতে। ব্যথায় কায়েশীর মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। তাই কায়েশীও রেগে বলল,
"ব্যাথা দিচ্ছেন কেন? আমি মিথ্যে বলি না আপনি ভালো করে জানেন। আর কিসের অভিনয়? কি হয়েছে প্লিজ খুলে বলুন!"

কায়রাভ এক ঝটকায় ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিলো কায়েশীকে৷ তারপর নিচ থেকে সেই ডায়েরিটা তুলে কায়েশীর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"ইনোসেন্ট সাজছো এখন? বুঝতে পারছো না কিছু? এই ছবিগুলো কি, হ্যাঁ? কাবিরে'র সাথে সম্পর্ক ছিলো তোমার!!"

শেষের কথাটা জোরে চিৎকার করে বলল কায়রাভ। এমন চিৎকারে কায়েশী ভয় পেয়ে দু-পা পিছিয়ে যায়। নিচের ডায়েরিটা দেখে বুঝে যায় কি ঘটেছে। কায়েশীর চোখ ভিজে উঠে। সে ছলছল দৃষ্টিতে তাকায় কায়রাভের দিকে। কায়রাভ এখনো কেমন কঠিন হয়ে আছে। কায়েশী এগিয়ে এসে ধরা গলায় বলল,
"কাবিরের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো না। আপনি ভুল বুঝছেন! আমি সব বলছি আপনাকে। আমি..."

কায়রাভ পুরো কথা না শুনে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
"মি'থ্যে মি'থ্যে মি'থ্যে! আর কত মিথ্যে বলবে তুমি? বিয়ের সময় এই কথা বলোনি কেন? কে'ন??"

কায়রাভ অত্যাধিক রেগে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে হাত মুঠি করে সামনের দেয়ালে ক্রমাগত ঘুষি মারতে থাকলো। একের পর এক পুরুষালী আঘাতের তীব্রতায় একসময় রক্ত বের হয়ে আসে মুঠোয়।  কায়েশী আঁতকে উঠে। সে দৌড়ে এসে পেছন থেকে কায়রাভকে জরিয়ে ধরে তাকে থামাতে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
"থামুন থামুন, প্লিজ! এমন করছেন কেন? এভাবে আপনি আমাকে কষ্ট দিতে পারেন না! আমি তো অনেকবার বলতে চেয়েছি। কিন্তু আপনি...."

কায়রাভ তাকে সরিয়ে দেয়। তার চোখে তখন কেবল অবিশ্বাস। কায়রাভ তাকিয়ে দেখলো কায়েশী কাঁদছে। কিন্তু এতে কায়রাভের মন গললো না। কাবির তাচ্ছিল্য হেসে হাত তালি দিতে দিতে বলল,
"মাই গ'ড! কত বোকা আমি! তোমাদের দুজনের অভিনয় টের'ই পেলাম না। রিয়েলি, মাইন্ড ব্লোয়িং! এমন দেবর-ভাবীর অভিনয় করলে যেন দুজন দুজনকে চেনো'ই না!"

কায়েশী স্তব্ধ, বিমুঢ়। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে টপটপ করে। কায়েশী ধিমি গলায় চোখ মুছে বলল,
"আপনি আমাদের সম্পর্কে দাগ লাগাচ্ছেন এভাবে। তাও একটা ভিত্তিহীন অতীত টেনে..."

“ভিত্তিহীন অতীত?”

কায়রাভ হেসে উঠে বলল। কিন্তু সেই হাসি ভীষণ নিষ্ঠুর, ভীষণ বর্বর। সে আবার বলল, 
“এবং সেই ভিত্তিহীন অতীত নিয়েই পড়েছিলে তুমি! অতীত'টা এতটাই ভিত্তিহীন ছিলো যে এতবছরেও আমাকে ভালোবেসে উঠতে পারলে না।"

এবার কায়েশী সইতে না পেরে চিৎকার করে উঠে,
“চুপ করুন! আপনি পুরোটা জানেন না! কাবির কখনো...”

কায়রাভ কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে কায়েশীর চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে দু আঙুলে,
“এই চু'প! আর কিছু শোনার ইচ্ছে নেই আমার। নিজের ভাগ্যের উপর দোষ দিচ্ছি। তোমাকে দেবো না। কারণ, যাই হয়ে যাক, তোমাকে তো আমি ছাড়ছি না। নায়'ক হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি ভিলে'ন বানিয়ে দিয়েছো। শুরু থেকে'ই!”

তার কণ্ঠ নিস্তব্ধ কিন্তু ভয়ংকর। কায়েশীর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে আরো। ফুঁপিয়ে উঠে সে। এবার কায়রাভ কায়েশীকে ছেড়ে বিকারগ্রস্থের মতো হাসতে হাসতে বলে,
"আমার শা/লা কপালটাই খারাপ! জীবনে কারো ভালোবাসা'ই পাইনি। এমনকি আব্বা আম্মারও না। আর তুমি? তুমি তো পরের মেয়ে, কায়েশী ফারিয়াহ! আমার সব থেকেও কিছুই ছিলো না। কিন্তু কাবিরকে দেখো? ওর কিছুই ছিলো না কিন্তু সব পেয়েছে। দেখো না, ও মস্তি'তে থাকে অলটাইম। আর আমার হয়েছে যত জ্বা'লা!"

এরপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না কায়রাভ। ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে কায়েশীর গাল দুটো একহাতে চেপে ধরে একটা দীর্ঘ ওষ্ঠচুম্বন করলো। ওই মুহুর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রয় কায়েশী। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এরপর উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে যায় কায়রাভ। পেছনে অবলীলায় পড়ে থাকে কায়েশী। পিছু ফিরে কায়েশী অনেকবার ডাকলেও সাড়া মেলে না কায়রাভের। এবারে হাল ছেড়ে কায়েশী দরজার সামনে কাঁদতে কাঁদতে বসে পরে।

---------------------------

আকাশ কালো মেঘে ঢাকা পরেছে। শো শো ঝড়োয়া বাতাস বইছে চারিদিকে। এ যেন ঝড় আসার পুর্বাভাস। অবশ্য আজ খান বাড়িতে আগেই ঝড় বয়ে গেছে। প্রকৃতিও সে ঝড়ে সামিল হয়েছে যেন।কায়রাভ খান বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসে ফিরোজের বাড়িতে এসে দরজায় কড়া নাড়লো। ফিরোজ ছেলেটা ব্যাচেলর, সবুজ আর ও দুজনে থাকে এই বাসায়। তাই কায়রাভ ভাবলো কিছুক্ষণের জন্য এখানে থাকুক। কারণ, নিজ বাড়িতে দম বন্ধ লাগছিলো ওর। কাবির ঠিকই বলে, বাড়ি'টা সত্যি অভিশ'প্ত। সুখ নেই ওখানে। 

এদিকে রাস্তায় আসার সময় বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো বিধায় কায়রাভ অনেকটাই ভিজে গেছে। খানিকবাদে ফিরোজ এসে দরজা খুলে কায়রাভকে দেখে অবাক হয়। মানুষটাকে ভঙ্গুর দেখাচ্ছে ভীষণ। ফিরোজ জিজ্ঞেস করে,
"ভাই, আপনি এখন? কি হয়েছে? তার আগে ভেতরে আসেন।"

কায়রাভ একটা মৃদু শ্বাস ফেলে ভেতরে ঢোকে। ফিরোজ তারাতাড়ি করে একটা গামছা এগিয়ে দেয়। কায়রাভ গামছাটা নিয়ে শরীর মুছে মেঝেতেই ধপ করে বসে পরে। ফিরোজ বিমূর্ত হয়ে রয়। বুঝে উঠতে পারে না আসলে কি হয়েছে। ফিরোজ নিজেও কায়রাভের পাশে বসে। কায়রাভকে অবলোকন করে এতটা ঠাওর করতে পারে যে মারাত্মক কিছু ঘটে গেছে। তাই ধীর কন্ঠে ফিরোজ জিজ্ঞেস করে, 
"ভাই, আপসেট দেখাচ্ছে আপনাকে। কি হয়েছে?"

অনেকটা সময় পর মুখ খোলে কায়রাভ। ভেতরের সকল যন্ত্রণা উগরে বেরিয়ে আসে।
“ওরা আমার সাথে ছলনা করেছে, ফিরোজ! এত বড় সত্যটা লুকিয়ে গেছে! আর আমি… আমি না জেনেই কী ভয়ংকর ভুল'টা করে ফেললাম!”

কায়রাভের কথাটা গলা ছেড়ে বেরোতে চাইছে না। তবুও অমানসিক যন্ত্রণার চাপে শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে আসছে। কায়রাভ দু’হাত দিয়ে নিজের চুল খাম'চে ধরলো শক্ত করে। তার চোখে তখন একসাথে ক্ষোভ, যন্ত্রণা আর ভাঙা বিশ্বাসের অন্তর্দাহ আর্তনাদ বইছে। একটু থেমে কায়রাভ ফিরোজের বাহু ঝাঁকিয়ে পাগলের মতো বিলাপ করতে করতে বলল,
“এই ফিরোজ! ওরা কি আমাকে করুণা করলো? আমাকে করুণা করে কাবির নিজেকে মহান বানালো?”

শেষ কথাটা বলতেই তার ঠোঁট কেঁপে উঠলো। চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। ফুঁপিয়ে উঠে কায়রাভ, 
“ভাগ্য আমার সাথে বারবার প্রতারণা করে দেখেছিস? আব্বা-আম্মার মতো কায়েশীও আমায় ভালোবাসেনি…”

তার গলা ধীরে ধীরে ভেঙে আসছে। কায়রাভের প্রতিটা শব্দ বুকের ভেতর থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে বেরোচ্ছে। ওদিকে ফিরোজ স্থির বসে রইলো। সে বুঝে গেছে… সবকিছুই বুঝে গেছে। তার সেই আশঙ্কাটাই সত্যি হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, কোনো ভাষা নেই তার কাছে। কোনো শব্দ নেই যা দিয়ে সে এই ভেঙে পড়া মানুষটাকে সামান্য সান্ত্বনা দিতে পারে। হঠাৎ কায়রাভ আবার মাথা তুলে তাকালো। চোখ দুটো লাল, দৃষ্টিটা শূন্য। বড্ড নিস্তেজ কন্ঠে বলল,
“আমার… আমার মরে যাওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে, ফিরোজ। দম… দম আটকে আসছে…”

"শান্ত হোন, ভাই। শান্ত হোন।"

ফিরোজের এটুকু বলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
কিছুক্ষণ পর ফিরোজ উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দায় চলে যায়। ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত ডায়াল করে কাবিরের নম্বরে। ফিরোজ জানে, এখন সব ঝামেলার সলিউশন কাবির। ও ছাড়া পরিস্থিতি কেউ ঠিক করতে পারবে না। এদিকে কাবির আধঘন্টা আগে কাজ শেষে বাড়িতে এসেছে। আবার, আবহাওয়া আজ রোমান্টিক। তাই সে বউকে জড়িয়ে ধরে বারান্দায় বসে বৃষ্টিবিলাশ করছিলো। দিনশেষে মাত্রই কাছে পেয়েছে বউকে। তাই একেবারে বুকে চেপে ধরে রেখেছে প্রীতিষাকে। এমন অন্তরঙ্গ মুহুর্তে ফোন আসায় চরম বিরক্ত হলো কাবির। প্রীতিষা কাবিরের অনুভুতি বুঝে আলতো হেসে বলল, 
"ফোনটা রিসিভ করো। ইম্পর্টেন্ট কল হতে পারে।"

কাবির মাথা নেড়ে পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে ফোন নেয়। ফোন স্ক্রিনে ফিরোজের নাম দেখে ভ্রু কুচকে যায় তার। ও জানে, ফিরোজ ভাই অযথা ফোন করার মানুষ না। এর কিছুক্ষণ পর কাবির ফোন রিসিভ করে কানে দিয়ে বলে,
"জ্বি ভাই, কন!"

"কোথায় তুমি? ইমার্জেন্সি আমার বাসায় আসতে পারবে?"

"এখন! ঘটনা কি, ভাই?"

"কায়রাভ ভাই আমার বাসায়। ভাবীর পাস্ট জেনে গেছে, ভাই। তাই ভাবীর সাথে ঝামেলা করে এখানে এসেছে।"

এমন কথাতেও কাবিরের মুখভঙ্গি পরিবর্তন হলো না। যেন খুব স্বাভাবিক কথা। উল্টো সাংঘাতিক রাগ হলো তার। প্রীতিষাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রগরগে কন্ঠে বলল,
"এ ভাই, দুই দিন পর পর লাই'লি মজনু'র কি হয়? এরা কি শান্তি দিবো না, আমারে!"

কাবিরের কথায় প্রীতিষা ভরকালো। নাজুক মনে সে ভাবছে, 'এসব কি কথা বলছে, কাবির! কে লাইলি মজনু!' ফোনের ওপাশে থাকা ফিরোজ হেসেই ফেললো কাবিরের কথায়। বলল,
"তুমি ছাড়া গতি আছে নাকি আমাদের? এখন যত তারাতাড়ি সম্ভব আসো।"

কল কেটে যায়। প্রীতিষা নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করে, 
"কাবির, সব ঠিক আছে তো?"

কাবির এবার দ্রুত বেগে গায়ে শার্ট চাপাতে চাপাতে জবাব দেয়, 
"সব ঠিকই আছে। একটু ক্যাচা'ল লাগছে। সট আউট কইরা আসতাছি। তুমি দরজা ভালো কইরা লাগায় দেও।"

কাবির এবার বেরিয়ে যেতে গেলে পিছু পিছু প্রীতিষাও এসে দরজা লাগাতে যায়। তবে দরজা আটকানোর সময় কাবির হঠাৎ পিছু ফিরে হাত দিয়ে দরজা থামিয়ে দেয়। প্রীতিষা প্রশ্নবোধক চাহনিতে তাকালে কাবির মুচকি হেসে বলল,
"প্রীতি! ওই কালো শাড়িটা পইরো আজকে? আবহাওয়া কিন্তু ফ্যান্টাস্টি'ক!"

এমন কথায় প্রীতিষা লজ্জা পেলো। কাবিরের উদ্দেশ্য বুঝতে বাকি নেই তার। সামান্য লজ্জালু কন্ঠে প্রীতিষা বলল,
"আচ্ছা...পরবো। তুমি তারাতাড়ি এসো।"

কাবির ঝুঁকে এসে প্রীতিষার ফু'লো ফু'লো গালে ঠোঁট দাবিয়ে চু'মু খেয়ে বেরিয়ে গেলো। কাবির চলে গেলে প্রীতিষা নিজের গালে হাত চেপে দরজা লাগিয়ে দিলো। তারপর দু-হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেললো সে। উফ'ফ! মাঝে মাঝে এত লজ্জা করে প্রীতিষার। সব কাবিরের জন্যই। 

----------------------------

কাবির তিনটি স্পিড ক্যান হাতে নিয়ে ঝড়ের বেগে ঢুকে পড়লো ফিরোজের বাড়িতে। বাইকে করে পাঁচ মিনিটেই হাজির হয়েছে সে। দরজাটা খোলা থাকায় কোনো রকম আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করেই সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করে কাবির। তার উপস্থিতিতে ঘরের স্থির বাতাসে হালকা চঞ্চলতা ছড়িয়ে পড়ে।

ভেতরে ঢুকেই প্রথমে ফিরোজের সাথে হাত মুঠো করে ফিস্ট বাম্প করে। তারপর কাঁধ হেলিয়ে কায়রাভের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি টেনে চোখ টিপে কাবির বলল,
“হোয়াট'স আপ, ভাইজা'ন?”

কাবিরকে হঠাৎ এখানে দেখে কায়রাভের চোখে স্পষ্ট বিস্ময় খেলে যায় তার দৃষ্টি মুহূর্তেই সরে গিয়ে স্থির হলো ফিরোজের ওপর। কাহিনি বুঝতে বাকি রইলো না তার। যে কে ডেকেছে কাবিরকে! নিশ্চয়ই এতক্ষণে কাবির সব জেনেই এসেছে। কিন্তু অবাক করার বিষয়, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও কাবির অদ্ভুত রকম স্বাভাবিক। একরকম কু'ল ভাব নিয়ে এসেছে, যেমনটা সে সবসময় থাকে। অথচ এত বড় ব্লান্ডা'র হয়ে গেছে!

কাবিরের বেশভূষা আজও আগের মতোই এলোমেলো, ক্যাজুয়াল। কপালে ঠেকানো সানগ্লাস। কোনো কথা না বাড়িয়ে কাবির দুটো স্পিড ক্যান ছুড়ে দিলো। একটা ফিরোজের দিকে, আরেকটা কায়রাভের দিকে। এবং সাথে সাথে দুজনেই অনায়াসে ক্যাচ করে ফেললো। কায়রাভ ক্যানটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো কাবিরের দিকে। তারপর মৃদু বিস্ময় মেশানো স্বরে বলল,
“তোকে দেখে মাঝে মাঝে আমি অবাকও হতে পারি না, কাবির! তুই আসলে কী বল?”

কাবির মেঝেতে বসে পড়লো ঠিক তার ভাইয়ের পাশেই। বুড়ো আঙুল দিয়ে ক্যানটা খুলে এক চুমুক দিয়ে চোখ আধবোজা করে বলল,
“এক্সট্রাঅর্ডিনারি আলফা ম্যা'ন!”

ফিরোজ হাসলো সামান্য। কায়রাভও এবার ক্যানটা খুলে ঠোঁটে তুললো। ঠান্ডা পানীয়ের স্বাদ গলায় নামতেই মনে জমে থাকা প্রশ্নটা আর আটকে রাখতে পারলো না। সরাসরি তাকিয়ে কাবিরকে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই আমাকে এসব আগে কেন বলিসনি? তোকে বিয়ের পরদিনই তো দেখা করিয়েছিলাম কায়েশীর সাথে! তখন চুপ ছিলি কেন?”

কাবির একটুও সময় নিলো না। যেন সে তৈরি ছিলো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে। ঠোঁটে হাসি বজায় রেখেই খুব সহজ, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে বলল,
“তখন কইলে কি বউ ছাইড়া দিতা আমার জন্য?”

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
 

Loading spinner

Reply
Page 4 / 7
Share:

Loading spinner