মেঘ হতাশা শ্বাস ফেলে বলল -" ওই বেকুব ব্যাকটেরিয়া তোর রুমে নিয়ে লাগেজ রেখে ছিলো?"
মাইশা এসে মেঘের পাশে বসতে বসতে বললো-" হ্যা।পরে আমি নিয়ে ফাদিন ভাইয়ের রুমে রেখে এলাম।প্রথমে তো গেস্ট রুমে রাখতে চেয়েছিলাম।পরে মাথায় এতো তুই যা রাগি! রাতে কখন না কখন রেগে গিয়ে বিদেশি উল্লুকটার গলা টিপে ধরিস।"
-" ধরলে ধরতেই পারি।দেখলেই এই কথাটা মাথায় আসে।"
-" হুম তা আসল বিষয়ে আসা যাক। এখানে কেন?"
মেঘ গা এলিয়ে দিয়ে বলল -" একজন আমাকে বলেছেন আমি যেন তার ব্যক্তিগত জীবনে নাক না গলাই।আমার মনটা বেশ কৌতূহলী। বুঝলি? মনটা আমার দেখতে চাইল।আমি ছাড়া ওর জীবনে ব্যক্তিগত জিনিসটা কি?নিজের জায়গাটা পাক পবিত্র রাখতে পছন্দ করি। তাই লাগেজসহ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিয়েছি।"
মাইশা হেসে ফেললো মেঘের বলার ধরন দেখে।-" মেয়েটা এবার বেশ জব্দ হবে মনে হয়? "
-" জব্দ আর সে হলো কবে?আমাকেই তো পেয়েছে জব্দ করে রাখতে। "মাইশা শুধু একটু হাসলো।মেয়েটার ভাগ্য দেখলে অবাক লাগে।অথচ মেয়েটা তা পায়ে ঢেলে দিচ্ছে। হঠাৎ নিচে থেকে জোহানের কন্ঠ ভেসে আসলো। মেঘ সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-" উল্লুকটা বাসায় আছে নাকি?"
-" হ্যা।তানিশাকে ছাড়া সে আবার কোথাও যায় নাকি?"
মেঘ উঠে গিয়ে রেলিঙ ধরে দাঁড়ায়। নিচের পানে চেয়ে দেখে জোহান একদম তার নিচ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে।পাশে তোফায়েল রিদানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝলমলে আলো দেখছে।মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দার টবগুলোর পানে তাকাল। সেদিকে এগিয়ে যেতে যেতে মাইশাকে বলল-" তানিশাকে ছাড়া থাকতে হয় কিভাবে তার ক্লাস করাবো আমি এর। "
মেঘ টবের কাছে গিয়ে টবের মাটি চেক করলো।পানি দেওয়া হয়েছে দুপুরে হয়ত। এখন কাঁদা কাঁদা মাটি।মেঘ সেখান থেকে একখাবলা মাটি নিজের হাতে নিলো।আবার ফিরে গেল রেলিঙের কাছে।মাইশা জিজ্ঞেস করল -" কি করছিস এসব? "
মেঘ দাঁত কিড়মিড় করে বলল -" ওয়েট এন্ড সি।" মাইশা উঠে আসলো রেলিং এর কাছে। মাইশা যেতেই মেঘ তার হাতের মধ্যে রাখ কাঁদা ছুঁড়ে ফেললো জোহানের উপর। ছুড়ে দিয়েই সে নিচু হয়ে গেল।আকস্মিক এহেন ঘটনা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো জোহান। কাঁদায় তার সফেদ শার্টটা নোংরা হয়ে গেছে। তোফায়েল স্তব্ধ, হতবাক হয়ে উপরে পানে তাকাল। মাইশাকে দেখে বলল -" এটা কেমন বাচ্চামো মাইশা?"
তোফায়েলের কথা শুনে মাইশা নিজেই হতবাক হলো। পাশে তাকিয়ে দেখলো মেঘ মেজেতে বসে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। মাইশা রেগে গিয়ে মেঘকে উষ্ঠা দিলো। -" কু*ত্তা!"
মেঘের হাসির মাত্রা বেড়ে গেলো। -" ইউ টু কু*ত্তী।"
************
মাগরিবের নামজ পরে তানিশা নিজের রুম থেকে বের হলো।জোহানের খবর নেয়নি সে পুরোটা দিন গেলো।তানিশা নিজের রুমটার দরজার খুলতে সামনে দন্ডায়মান মানুষটাকে দেখে চমকে গেল।মেঘ জোহানের রুম থেকে বের হচ্ছিল। সামনে তানিশাকে দেখে একটা নির্মল হাসি দিলো। তানিশা নিজেকে স্বাভাবিক করে সৌজন্যে জিজ্ঞেস করল -" কেমন আছেন মেঘ ভাইয়া? "
মেঘ ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই তানিশার পাশে এগিয়ে এলো। তানিশার রুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে মুখে বেশ চিন্তিত একটা ভাব এনে বললো-" বুঝলে তানিশা ? একদম ভালো নেই আমি। তোমাকে একটা প্রশ্ন না করলে শান্তিই পাচ্ছি না। "
তানিশা স্মিথ স্বরে শুধালো -" কি প্রশ্ন করবেন? "
-" হুমম, এই যে তুমি কাল আমাকে বললে তোমার ব্যক্তিগত জীবনে যেন আমি নাক না গলাই।আচ্ছা এই ব্যক্তিগত জীবনটা যেন কি? ইসস! এই জিনিসটা কি যে বিরক্ত করেছে আমাকে কাল সন্ধ্যা থেকে। "কথাগুলো বলে মেঘ দুষ্টুমি মাখা হাসি উপহার দিলো তাকে। তানিশার বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেলো। রুষ্ট স্বরে শুধালো -" আপনি আমার সঙ্গে মজা করছেন মেঘ ভাইয়া? "
মেঘ যেন বিচলিত হয়ে গেল তানিশার কথা শুনে। দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল -" আরে না না! আমি একটুও মজা করছি না। একদমই না। সত্যি বলতে আমি তো আর তোমার মতো বিদেশি গিয়ে পড়াশোনা করিনি। এই প্রত্যন্তঅঞ্চলে পড়াশোনা করেছি তো তাই জানি না।তুমি যদি একটু বলে দিতে বেশ উপকার হতো।আচ্ছা দাঁড়াও এখনও বলো না। আমি আমার ফোনটা বের করে নোটটায় লিখে রাখি।ভুলোমন হয়ে যাচ্ছি দিন দিন বুঝো তো। "
তানিশা দাঁত দাঁত চেপে কিড়মিড় করে চেয়ে আছে মেঘের পানে।-" আপনি জানেন আপনার মধ্যে একটা ঘাপলা আছে? "
মেঘ সোজা হয়ে দাঁড়াল।কৌতুকের স্বরে বলল -" না তো? তুমি বললে বলে জানলাম। তা কি ঘাপলা আছে? "
-"আপনি থাকছেন একজনের সঙ্গে আর সঙ্গে দোষে ভাসছেন আরেকজনের। আপনার উচিত ছিলো মাইশা আপুর মতো একটা স্টং পার্সোনালিটির মানুষ হওয়া। তা না হয়ে আপনি ফাদিন ভাইয়ের মতো দিন দিন ফাজিল হচ্ছেন।"
মেঘ এবার দাঁত ক্যালানো হাসিটা দিলো। তানিশা ধমকে বললো -" হাসি থামান।"
মেঘ তাও হাসি থামালো না। তখন আরিয়া এসে ওদের পাশে এসে দাড়াল। মেঘের দিকে তার হাতে রাখা কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে বললো -" ভাইয়া তোমার কফি।"
মেঘ হাত বাড়িয়ে কফির কাপটা নিলো -" থাংকু ব্যাকটেরিয়া। আরেকটা থাংকু পেয়ে যেতে চাইলে আরেকটা কাজ করো তো? "
আরিয়া জিজ্ঞেস করল -" কি?"
মেঘ তার পাশে দন্ডায়মান তানিশাকে ইঙ্গিত করে বলল -" তোমার ছোট বেয়াইনের মাথা গরম হয়ে আছে। তাকেও একটা কফি এনে দাও।এই সরি সরি উনি তো আবার স্বাস্থ্য সচেতন। তুমি একটু কষ্ট করে একটা গ্রিন টি এনে দাও। "
আরিয়া তানিশার দিকে চেয়ে বললো-" সত্যি গ্রিন টি এনে দেবো তানিশাপু।"
তানিশা কোমল কন্ঠে বললো-" লাগবে না রিয়া।তোমার ভাইয়া মজা করছেন। " কথাটা বলে শেষ করার আগেই তানিশার কানে কারো চিৎকার এসে লাগলো। তানিশা কান খাড়া করে শুনে সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -" জোহানের কন্ঠ স্বর ভেসে আসলো মনে হয়? জোহান কোথায়? "
তানিশা জোহানের রুমের দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছি এমন সময় মেঘ ওর রাস্তারোধ করে দাঁড়াল।সে জোহানের আগে জোহানের ওয়াশরুমের গিয়েছিল। জোহান গোসল করবে বলে তার কাপড় চোপড় নিয়ে রেখেছিল ওয়াশরুমে।মেঘ সেগুলোকে রফাদফা করে দিয়ে এসেছে ব্লেড দিয়ে। এখন পরার মতো কাপড় না পেয়ে চিল্লাচিল্লি করছে।আর মেঘ একদমই চায় না এই মূহুর্তে তানিশা ওইখানে যাক।তানিশা চোখ তুলে মেঘের পানে তাকিয়ে বললো -" কি হয়েছে মেঘ ভাইয়া? রাস্তা থেকে সড়ে দাঁড়ান।"
মেঘ কঠোর গলায় বলল -" না, তুমি যেতে পারবে না। ওর যা লাগবে নিজে নিয়ে নিবে। তোমাকে যেতে হবে না। "
তানিশা দাঁত দাঁত চেপে বললো-" সে আমার মেহমান। ওর কোনো অসুবিধা হলে সেটা আমার দেখার বিষয় মেঘ ভাইয়া। আপনি বাধা দিতে পারেন না। সড়েন।"
-" যদি না সড়ি?"
-" সড়েন তো। "বলে তানিশা মেঘকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে জোহানের রুমের দিকে চলে গেল।মেঘের জেদ চাপলো।তানিশার হাত ধরতে নিয়েছিল।সেই সময় আরিয়াকে হা করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেঘ ধমকে বললো-" এমন হা করে তাকিয়ে দেখছিস কি?যাহ এখান থে.."
মেঘ তার কথার সমাপ্তি টানতে পারলো না। তার আগেই জোহানের রুম থেকে ভারি কিছু পরার আওয়াজ হলো। মেঘ সেইদিকে দৌড়ে চলে গেল।জোহানের রুমে গিয়ে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।তানিশা মেজেতে পরে আছে জ্ঞান হারিয়ে। পার্পল কালারের শাড়ীর আঁচল ওর মুখ ডেকে গেছে। মেঘ দৌড়ে গিয়ে তানিশার পাশে হাঁটু ঘেরে বসে তানিশাকে নিজের কোলে তুলে নিলো।তানিশার গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারলো মেয়েটার তীব্র জ্বর। এতো পরিমাণ জ্বর নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে কথা বললো কিভাবে মেয়েটা।মেঘের মাথায় ঢুকলো না।গালে মৃদু চাপর দিয়ে তানিশাকে ডাকলো।কোনো রেসপন্স নেই।মেঘের নিজেকে পাগল পাগল লাগছে।উম্মাদের মতো আশেপাশে পানির জগ খুঁজো। তার দৃষ্টি আরিয়ার পানে গেল।সে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘ ক্রোধান্বিত স্বরে চেচিয়ে বলল- " কু*ত্তার বাচ্চা এখানে দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? মাইশারে খবর দে।"
আরিয়ার ঘোর কাটলো মেঘের রাগান্বিত স্বরে শুনে।মেঘ তীব্র ভাবে রেগে আছে বুঝতে পেরে আরিয়া দৌড়ে নিচে গেল সবাইকে ডাকতে।মেঘ তানিশার মুখ হাত বুলিয়ে দিয়ে ডেকে যাচ্ছে। তানিশা চোখ খুলছে না দেখে তার বুক মুচড়ে ধরে। ওর নিজের গা কাঁপতে লাগল।এমন অবস্থায় মেয়েটাকে দেখবে সে চিন্তাও করেনি। সেই দিকে জোহান সমান তালে ওয়াশরুম থেকে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। মেঘের ক্ষোভ বাড়লো থরথর করে। পাশের কর্ণারসেট থেকে একটা শোপিছ নিয়ে ঠাস করে ছুড়ে মা*রলো ওয়াশরুমের দরজায়। দরজাটায় ধাক্কা খেয়ে শোপিসটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। মেঘ জোহানের উদ্দেশ্যে বললো-" আর একটাও আওয়াজ করবি। তোকে আমি বাথরুমেই পুঁতে রেখে দিবো। কু*ত্তার বাচ্চাআআ।"
জোহান এই বাংলায় দেওয়া গালিটা বুঝলো কিনা অনুধাবন করা গেলো না।তবুও সে থেমে গেল।
********************
তানিশার জ্ঞান ফিরেছে। সে এখন ভালোই আছে। ফাদিন জোহানকে উদ্ধার করে তানিশার চিকিৎসার কাজে লাগিয়েছিল। আপাতত সবই ঠিক। তানিশার রুমে বাসার সবাই এসে ভীর জমিয়েছিলেন। ফাইয়াজের ধমকে এখন রুমের পরিবেশ মুটামুটি শান্ত ।পুরোপুরি শান্ত হতে পারছে না মাইশার পদচারণের শব্দে। সে লাগাতার পায়চারি করেছে আর কি যেন বিরবির করছে।সুলতানা হায়দারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তিনি তানিশার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তানিশার খবর শুনে ফাইয়াজ আজ জলদিই বাড়ি ফিরেছে। পরনে তার এখন বাইরের পোশাক।তানিশা নিবু নিবু চোকে একবার সুলতানা হায়দারে পানে তাকাল। সুলতানা হায়দার চোখ সরিয়ে নিলেন। উনি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছেন নদ। আনমনেই চোখের কোণ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। তানিশা মাইশার পানে তাকিয়ে মৃদুহেসে জিজ্ঞেস করল -" কি করছো আপু?দেখতে তো রাস্তার পাগলীটার মতো লাগছে। "
মাইশা চিন্তিত ভঙ্গিতে তানিশার বিছানার পাশ ঘেসে দাঁড়িয়ে বললো-" তোর জ্বর কমছে?কমে যাবে তো? দুইদিন পর আমার বিয়ে আর তোর এখন জ্বর হতে হলো? ইসসরে! "
ফাইয়াজ মুখ তুলে তার ব্যাক্কল বোনটার দিকে তাকাল। চোখেমুখে তার চিন্তার পাহাড়। ফাইয়াজ মুখ কুঁচকে বলল -" এই তুই যাবি এখান থেকে? "
মাইশা মুখটা অসহায় করে অনুরোধ করে বললো -" থাকি না আরেকটু? "
ফাইয়াজ শক্ত গলায় বলল -" না, তুই এখনই যাবি। যাবি মানে যাবি।এর থেকে বেশি একটাও কথা না। যাআআ।"
মাইশা ভোতা মুখে তানিশার পানে তাকাল। তানিশা ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। তা দেখে মাইশার মন টুকরো টুকরোতে ভেঙ্গে গেলো। মুখ ফুলিয়ে বের হয়ে এলো রুম থেকে। রুম থেকে বের হতেই মেঘের মুখোমুখি হলো। -" এখন কেমন আছে ও? "
-" ভালোই আছে। এতো ভালো যে আমাকে মুখ বাঁকায়।"
মেঘ স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। টেনশনে তার মাথা ফেটে যাচ্ছিল।সে নিজেই কোলে করে নিয়ে তানিশাকে ওর রুমে দিয়ে এসেছে। চিকিৎসার সময় পুরোটা সময় পাশেই ছিল।কিন্তু ফাইয়াজের আদেশ তাকে মানতেই হয়েছে। যতই হউক সে এখন অধিকার দেখাতে পারে না। -" তাহলে সত্যিই ঠিক আছে। এতো জ্বর মেয়েটার তোমার পুরোটা দিন কোথায় ছিলে?খেয়াল রাখতে পারিস না একটু ওর দিকে? "
-" দেখ মেঘ এসব বিষয়ে আমাকে কথা শুনাস না।ও সবসময়ই রুমে ঘাপটি দিয়ে বসে থাকে। নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে। রুমে কেউ আসলেও তেমন পাত্তা দেয় না। তাই কেউ তেমন ওর রুমে আসেনি।জ্বর নিয়ে বসে আছে কাউকে মুক ফুটে বললে কি হতো? বাসায় এতো মানুষ থাকা সত্তে কাউকে বলেনি। "
জোহান রিদান রাশাদের নিয়ে নিজের রুমে ছিলো।সবগুলো তানিশার রুমে ভীর জমাচ্ছে।কোনো ভাবেই ওরা ছোট খালামুনিকে একা রাখবে না। ফাদিন টেনেটুনে নিয়ে আসতে পারেনি। জোহান একটু চেষ্টা করতেই ওর সঙ্গ এছে গেছে । বিদেশি আংকেলকে তাদের একটু বেশিই পছন্দ হয়েছে। জোহান রিদানকে রুমে রেখে। রুম থেকে বের হয়ে মাইশাকে দেখে বললো -" হাউ ইজ দ্য প্রিন্সেস ডুইং নাউ? "
মাইশা মুখ বাকিয়ে প্রস্থান করলো।মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে এমন ভাবে জোহানের পানে তাকাল যে জোহান মিনমিন করে আবার রুমে গিয়ে খিল দিলো।
*****
রাত গভীর হতেই তানিশার ঘাম দিয়ে জ্বরটা ছাড়লো।ঘামে গা ছিপছিপে হয়েছে বলে তানিশা সাওয়ার নিয়ে এসেছে। ডেসিং টেবিলের সামনে আসতেই দেখলো তার ডাইরিটার উপর বেশ কতগুলো নেতিয়ে যাওয়া টগরফুল।ডাইরিটার খুলামেলা দেখে বেশ চমকালো।ডাইরির মধ্যে থেকে একটা রঙিন কাগজ অর্ধ বের হয়ে আছে। তানিশা ভ্রু কুঁচকে ডাইরিটার উপর থেকে ফুলগুলো সরিয়ে ডাইরিটা হাতে নিলো। নীল রাঙা কাগজটা টেনে বের করলো। ছোট্ট একটা চিরকুট। চিরকুটটা মেলে ধরতেই কারো টানা হাতের লেখা ভেসে আসলো চোখের পাতায় ।ডাক্তার হলেও জোহানের হাতের লেখা এখনও অসম্ভব সুন্দর। তানিশার ডাইরিটায় জোহানেরও অনেকগুলো লেখা আছে। যা সে তানিশার অজান্তেই লিখেছিলো।তানিশা পরে জেনেও কিছু বলেনি। জোহান একমাত্র মানুষ যার কাছে সে খোলা বইয়ের মতো।জোহানের দেওয়া চিরকুটটা তানিশা পড়লো মনোযোগ দিয়ে।
" প্রিন্সেস,
এই ফুলগুলো আমি দিলাম বলে রাগ করলে প্রিন্সেস?জানি রাগ করেছো।ফুলগুলোর পানে প্রতিদিন চেয়ে থেকে ভাবি দেবো কি না। আজ দিয়েই দিলাম।যার জন্য তোমারই এই ফুলগুলো এতো পছন্দ। তার কাছ থেকে তুমি আর নিবে না জানি। তাই আমার কাছ থেকেই নিলে। এই স্নিগ্ধ ফুল দিয়ে আমি তোমায় আবার আমাকে বিশ্বাস করতে আহবান জানাই।আরও একটিবার কি আমার হাত ধরা যায় না?আরও একবার বিশ্বাস করা যায় না আমাকে? আমার স্থায়িত্ব ফুরচ্ছে। আমাকে যেতে হবে আবার। তুমি তোমার মনোভাব পাল্টে না ফেলে চলো না আমার সঙ্গে।এবার আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করবো।
তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী "
তানিশা যত্নে চিরকুটটা ডাইরিতে ঢুকিয়ে রাখলো। পা বাড়ালো পাশের রুমের দিকে। জোহান এখনও জেগে আছে তার মন বলছে। কিন্তু রুম থেকে বের হয়ে যখনই জোহানের রুমের দরজায় হাত রাখলো তখন থামিয়ে দিলো নিজেকে । কি দরকার প্রতিটা কথার জবাব দেবার। জোহান নিজেই খুঁজে নিক। তানিশা একা এই নিঃশব্দ পরিবেশে গিয়ে বসলো বারান্দায়। চারিপাশ থমকে আছে যেন। গাছের পাতাগুলোও যেন নিজেকে নাড়াতে দ্বিধাবোধ করছে। মরিচ বাতিগুলো জ্বলছে ঝিলমিলয়ে। তানিশা বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে করিডরের পানে দেখলো।খা খা করিডর। তা দেখে পূর্ণ করিডরে স্মৃতি ভেসে এলো তানিশার মনের জানালা খুলে দিয়ে।কি এক জ্বালায় পরেছে সে। ঘুরেফিরে সেই দিনগুলোতে ছুট লাগায়।
জোহানকে ফাহিমের পুরনো রুমে থকতে দেওয়া হয়েছে। চিলেকোঠার ঘরটায় যাবার আগে এটা ছিলো ফাহিমের রুম। আর ফাহিমের রুমের দরজার মুখমুখি ছিলো মাইশা তানিশার রুম। যখন মাইশা ছোট ছিলো। তখন সে তানিশার সাথেই থাকতো। তানিশা বড় হয়ে যাওয়ার পর সেটা একান্ত তানিশার রুম করে দেওয়া হয়েছে। মুখমুখি দরজা হওয়ার ফলে ফাহিম মাইশার মুখমুখি হতো বারবার। তাই মাঝের করিডরে অংশটুকু ছিলো তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্র।একজন এই দরজায় আরেকজন ওই দরজায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতো। ফাহিম পুরো দুনিয়ার জন্য এরকম শান্তশিষ্ট হলেও মাইশার কাছে ছিলো ঝগড়া করার উপযুক্ত ঝগড়ার সঙ্গী। মাইশাকে দেখলে ফাহিমেরও যে কি হয়? সেও পায়ে পা মিলিয়ে ঝগড়া শুরু করে।
তানিশার স্পষ্ট মনে আছে সে তখন আট কি নয় বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে। তখন মাইশা ক্লাস সিক্সে পড়ে।তখন মাইশার একটা বদঅভ্যাস ছিলো। দরজার পর্দা ধরে টেনে টেনে গুনগুন করতো আর নাচতো।নিজে তো করেই একদিন তানিশাকেও শরিক করলো।তানিশাকে ধরিয়ে দিলো নিজেদের রুমের পর্দা আর সে গেলো ফাহিমের রুমের পর্দা ধরে টানতে।নিয়ম দেওয়া হলো একসাথে পর্দা টেনে এনে করিডর মাঝ ধরমীয়ানে আসতে হবে। তানিশা আলতো করে ধরে টানলেও। মাইশা ফাহিমের রুমের পর্দা শক্তি দিয়ে টেনেছে।পরে যা হবার তাই হলো। পর্দার খুলে মাইশার হাতে চলে এলো। ফাহিম মাত্রই গোসল থেকে বের হয়ে এই কান্ড দেখে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো। আস্তে আস্তে তখন ঝগড়াটা একদম হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ালো।এসব দেখে তানিশা আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে গিয়ে আসফিয়া খাতুনকে নিয়ে এলো। আসফিয়া খাতুনের হাত পাতলা। ওনি এসেই মাইশার পিঠে ধুমধাম করে উত্তম মাধ্যম দিলেন। ফাহিমকে ছুয়েও দেখলেন না। কারণ ফাহিম সবার কাছে গুড এন্ড কুল বয়। কিন্তু ফাহিম যে ছাড় পেলেন তা নয়। মাইশার কান্না দেখে ঘটনা না শুনেই নাজমুল মর্তুজা নিজের ছেলেকে দিলেন আরও কয়েক গা। তখন তানিশা সেই কি মন খারাপ হয়ে ছিল নিজের ভাইবোনকে এমন মা*র খেতে দেখে।
তানিশা সেই দিনটা ভেবে হাসলো। বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলো বুঝতে পারলো না। তানিশা ঘুমিয়ে যাওয়ার খানিক পরে একটা রুমের দরজা খুলে গেল। একজন যুবক বের হয়ে এলো রুম থেকে। রুম থেকে বের হয়ে প্রথমে তানিশা রুমে উঁকি দিলো। না পেয়ে আশেপাশে দেখে বারান্দায় এসে থমকালো তার দৃষ্টি। সেও এগিয়ে এলো বারান্দায়। মেয়েটাকে এভাবে ঘুমাতে দেখে ওর পাশে বসলো।ধীরে ধীরে তানিশার মাথাটা তুলে নিলো নিজের চওড়া কাঁধে। আতঙ্ক নিয়ে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে রইল।যদি মেয়েটা জেগে যায়! তানিশাকে আরামসে ঘুমাতে দেখে স্বস্তি পেলো। মনে তার অসংখ্য প্রজাপতি ডানামেলে উড়তে লাগলো। এমন সুমধুর রাত তার জীবনে আসেনি কখনও।থাক মেয়েটা নিশ্চুপ। তবুও ওর পাশে তো আছে। এতেই তার মনপ্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।
চলবে........