গল্প : রুপকথা (writ...
 
Notifications
Clear all

গল্প : রুপকথা (writer- Nadia ferdousi)

Page 2 / 3

Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago
পর্বঃ১৫
 
 
‎মেঘ তানিশাদের করিডরের সেই বড় বারান্দাটায় বসে আছে। অফিস থেকে আজ জলদিই ফিরে এসেছে।ফ্রেস হতে হতেই আছরের  আজান দিয়ে দিলো।নামাজটা পরেই মাত্র এখানে এসে বসলো। গোধুলির খেলানেলা দেখতে ভালোই লাগছে।পাশের শূন্য  জায়গায় প্রিয় মানুষটার উপস্থিতি তীব্র ভাবে অনুভব করতে চাইল। কিন্তু সে তো নেই।আসার পর থেকে তানিশাকে দেখেনি। মাইশা, রাইশা  আরিয়াকে নিয়ে ঘুরে এসেছে। ওরা একসাথেই ফিরেছে। মেয়েটা যায়নি। মেঘকে এই জিনিসটা বেশ ভাবায়।এতো পাল্টে যেতে পারে একটা মানুষ! অবাক করার বিষয়।।হঠাৎ কে যেন কৃত্রিম আলোগুলো জ্বালিয়ে দিলো।মেঘ বিরক্ত হলো। মাইশা পিছনে এসে দাড়িয়েছে মেঘ খেয়াল করেনি।মাইশা পেছন থেকে তার হালকা ভেজা চুল এলোমোলো করে দিতেই মাইশার দিকে ফিরে তাকাল মেঘ। মাইশা ওর দিকে তাকিয়ে বললো -" কিরে পাগলা প্রেমিক? সকালে এসে আমাকে ডাকা যেতো না?সকালে ঘুম থেকে উঠে  দেখি আমার রুমে কারো মস্ত বড় লাগেজ।খুঁজেতে খুজতে তো আর লাগেজের মালিক পাই না।"

‎মেঘ হতাশা শ্বাস ফেলে বলল -" ওই বেকুব ব্যাকটেরিয়া তোর রুমে নিয়ে লাগেজ রেখে ছিলো?"

‎মাইশা এসে মেঘের পাশে বসতে বসতে বললো-" হ্যা।পরে আমি নিয়ে ফাদিন ভাইয়ের রুমে রেখে এলাম।প্রথমে তো গেস্ট রুমে রাখতে চেয়েছিলাম।পরে মাথায় এতো তুই যা রাগি!  রাতে কখন না কখন রেগে গিয়ে বিদেশি উল্লুকটার গলা টিপে ধরিস।"

‎-" ধরলে ধরতেই পারি।দেখলেই এই কথাটা মাথায় আসে।"

‎-" হুম তা আসল বিষয়ে আসা যাক। এখানে কেন?"

‎মেঘ গা এলিয়ে দিয়ে বলল -" একজন আমাকে বলেছেন আমি যেন তার ব্যক্তিগত জীবনে নাক না গলাই।আমার মনটা বেশ কৌতূহলী। বুঝলি? মনটা আমার দেখতে চাইল।আমি ছাড়া ওর জীবনে ব্যক্তিগত জিনিসটা কি?নিজের জায়গাটা পাক পবিত্র  রাখতে পছন্দ করি। তাই লাগেজসহ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিয়েছি।"

‎মাইশা হেসে ফেললো মেঘের বলার ধরন দেখে।-" মেয়েটা এবার বেশ জব্দ হবে মনে হয়? "

‎-" জব্দ আর সে হলো কবে?আমাকেই তো পেয়েছে জব্দ করে রাখতে। "মাইশা শুধু একটু হাসলো।মেয়েটার ভাগ্য দেখলে অবাক লাগে।অথচ মেয়েটা তা পায়ে ঢেলে দিচ্ছে। হঠাৎ নিচে থেকে জোহানের কন্ঠ ভেসে আসলো। মেঘ সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-" উল্লুকটা বাসায় আছে নাকি?"

-" হ্যা।তানিশাকে ছাড়া সে আবার কোথাও যায় নাকি?"

মেঘ উঠে গিয়ে রেলিঙ ধরে দাঁড়ায়। নিচের পানে চেয়ে দেখে জোহান একদম তার নিচ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে।পাশে তোফায়েল রিদানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝলমলে আলো দেখছে।মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দার টবগুলোর পানে তাকাল। সেদিকে এগিয়ে যেতে যেতে মাইশাকে বলল-" তানিশাকে ছাড়া থাকতে হয় কিভাবে তার ক্লাস করাবো আমি এর। "

মেঘ টবের কাছে গিয়ে টবের মাটি চেক করলো।পানি দেওয়া হয়েছে দুপুরে হয়ত। এখন কাঁদা কাঁদা মাটি।মেঘ সেখান থেকে একখাবলা মাটি নিজের হাতে নিলো।আবার ফিরে গেল রেলিঙের কাছে।মাইশা জিজ্ঞেস করল -" কি করছিস এসব? "

মেঘ দাঁত কিড়মিড় করে বলল -" ওয়েট এন্ড সি।" মাইশা উঠে আসলো রেলিং এর কাছে। মাইশা যেতেই মেঘ তার হাতের মধ্যে রাখ কাঁদা ছুঁড়ে ফেললো জোহানের উপর। ছুড়ে দিয়েই সে নিচু হয়ে গেল।আকস্মিক এহেন ঘটনা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো জোহান। কাঁদায় তার সফেদ শার্টটা নোংরা হয়ে গেছে। তোফায়েল স্তব্ধ,  হতবাক হয়ে উপরে পানে তাকাল। মাইশাকে দেখে বলল -" এটা কেমন বাচ্চামো মাইশা?"

তোফায়েলের কথা শুনে মাইশা নিজেই হতবাক হলো। পাশে তাকিয়ে দেখলো মেঘ মেজেতে বসে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। মাইশা রেগে গিয়ে মেঘকে উষ্ঠা দিলো। -" কু*ত্তা!"

মেঘের হাসির মাত্রা বেড়ে গেলো। -" ইউ টু কু*ত্তী।"

************

‎‎মাগরিবের নামজ পরে তানিশা নিজের রুম থেকে বের হলো।জোহানের খবর নেয়নি সে পুরোটা দিন গেলো।তানিশা নিজের রুমটার দরজার খুলতে সামনে দন্ডায়মান মানুষটাকে দেখে চমকে গেল।মেঘ জোহানের রুম থেকে বের হচ্ছিল। সামনে তানিশাকে দেখে একটা নির্মল হাসি দিলো। তানিশা নিজেকে স্বাভাবিক করে সৌজন্যে জিজ্ঞেস করল -" কেমন আছেন মেঘ ভাইয়া? "

‎মেঘ ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই তানিশার পাশে এগিয়ে এলো। তানিশার রুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে মুখে বেশ  চিন্তিত একটা ভাব এনে বললো-"  বুঝলে তানিশা ? একদম ভালো নেই আমি। তোমাকে একটা প্রশ্ন না করলে শান্তিই পাচ্ছি না। "

‎তানিশা স্মিথ স্বরে শুধালো -" কি প্রশ্ন করবেন? "

‎-" হুমম, এই যে তুমি কাল আমাকে বললে তোমার  ব্যক্তিগত জীবনে যেন আমি নাক না গলাই।আচ্ছা এই ব্যক্তিগত জীবনটা যেন কি?  ইসস! এই জিনিসটা কি যে বিরক্ত করেছে আমাকে কাল সন্ধ্যা থেকে। "কথাগুলো বলে মেঘ দুষ্টুমি মাখা হাসি উপহার দিলো তাকে। তানিশার বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেলো। রুষ্ট স্বরে শুধালো -" আপনি আমার সঙ্গে মজা করছেন মেঘ ভাইয়া? "

‎মেঘ যেন বিচলিত হয়ে গেল তানিশার কথা শুনে। দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল -" আরে না না! আমি একটুও মজা করছি না। একদমই না। সত্যি বলতে আমি তো আর তোমার মতো বিদেশি গিয়ে পড়াশোনা করিনি। এই প্রত্যন্তঅঞ্চলে পড়াশোনা করেছি তো তাই জানি না।তুমি যদি একটু বলে দিতে বেশ উপকার হতো।আচ্ছা দাঁড়াও এখনও বলো না। আমি আমার ফোনটা বের করে নোটটায় লিখে রাখি।ভুলোমন হয়ে যাচ্ছি দিন দিন বুঝো তো। "

‎তানিশা দাঁত দাঁত চেপে কিড়মিড় করে চেয়ে আছে মেঘের পানে।-" আপনি জানেন আপনার মধ্যে একটা ঘাপলা আছে? "

‎মেঘ সোজা হয়ে দাঁড়াল।কৌতুকের স্বরে বলল -" না তো? তুমি বললে বলে জানলাম। তা কি ঘাপলা আছে? "

‎-"আপনি থাকছেন একজনের সঙ্গে আর সঙ্গে দোষে ভাসছেন আরেকজনের। আপনার উচিত ছিলো মাইশা আপুর মতো একটা স্টং পার্সোনালিটির মানুষ হওয়া। তা না হয়ে আপনি ফাদিন ভাইয়ের মতো দিন দিন ফাজিল হচ্ছেন।"

‎মেঘ এবার দাঁত ক্যালানো হাসিটা দিলো। তানিশা ধমকে বললো -" হাসি থামান।"

‎মেঘ তাও হাসি থামালো না। তখন আরিয়া এসে ওদের পাশে এসে দাড়াল। মেঘের দিকে তার হাতে রাখা  কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে বললো -" ভাইয়া তোমার কফি।"

‎মেঘ হাত বাড়িয়ে কফির কাপটা নিলো -" থাংকু ব্যাকটেরিয়া। আরেকটা থাংকু পেয়ে যেতে চাইলে আরেকটা কাজ করো তো? "

‎আরিয়া জিজ্ঞেস করল -" কি?"

‎মেঘ তার পাশে দন্ডায়মান তানিশাকে ইঙ্গিত করে বলল -" তোমার ছোট বেয়াইনের মাথা গরম হয়ে আছে। তাকেও একটা কফি এনে দাও।এই সরি সরি উনি তো আবার স্বাস্থ্য সচেতন। তুমি একটু কষ্ট করে একটা গ্রিন টি এনে দাও। "

‎আরিয়া তানিশার দিকে চেয়ে বললো-" সত্যি গ্রিন টি এনে দেবো তানিশাপু।"

‎তানিশা কোমল কন্ঠে বললো-" লাগবে না রিয়া।তোমার ভাইয়া মজা করছেন। " কথাটা বলে শেষ করার আগেই তানিশার কানে কারো চিৎকার এসে লাগলো। তানিশা কান খাড়া করে শুনে সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -" জোহানের কন্ঠ স্বর ভেসে আসলো মনে হয়?  জোহান কোথায়? "

‎তানিশা জোহানের রুমের দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছি এমন সময় মেঘ ওর রাস্তারোধ করে দাঁড়াল।সে জোহানের আগে জোহানের ওয়াশরুমের গিয়েছিল। জোহান গোসল করবে বলে তার কাপড় চোপড়  নিয়ে রেখেছিল ওয়াশরুমে।মেঘ সেগুলোকে রফাদফা করে দিয়ে এসেছে ব্লেড দিয়ে। এখন পরার মতো কাপড় না পেয়ে চিল্লাচিল্লি করছে।আর মেঘ একদমই চায় না এই মূহুর্তে তানিশা ওইখানে যাক।তানিশা চোখ তুলে মেঘের পানে তাকিয়ে বললো -" কি হয়েছে মেঘ ভাইয়া? রাস্তা থেকে সড়ে দাঁড়ান।"

‎মেঘ কঠোর গলায় বলল -" না, তুমি যেতে পারবে না। ওর যা লাগবে নিজে নিয়ে নিবে। তোমাকে যেতে হবে না। "

‎তানিশা দাঁত দাঁত চেপে বললো-" সে আমার মেহমান। ওর কোনো অসুবিধা হলে সেটা আমার দেখার বিষয় মেঘ ভাইয়া। আপনি বাধা দিতে পারেন না। সড়েন।"

‎-" যদি না সড়ি?"

‎-" সড়েন তো। "বলে তানিশা মেঘকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে জোহানের রুমের দিকে চলে গেল।মেঘের জেদ চাপলো।তানিশার হাত ধরতে নিয়েছিল।সেই সময় আরিয়াকে হা করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেঘ ধমকে বললো-" এমন হা করে তাকিয়ে দেখছিস কি?যাহ এখান থে.."

‎মেঘ তার কথার সমাপ্তি টানতে পারলো না। তার আগেই জোহানের রুম থেকে ভারি কিছু পরার আওয়াজ হলো। মেঘ সেইদিকে দৌড়ে চলে গেল।জোহানের রুমে গিয়ে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।তানিশা মেজেতে পরে আছে জ্ঞান হারিয়ে। পার্পল কালারের শাড়ীর আঁচল ওর মুখ ডেকে গেছে। মেঘ দৌড়ে গিয়ে তানিশার পাশে হাঁটু ঘেরে বসে তানিশাকে নিজের কোলে তুলে নিলো।তানিশার গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারলো মেয়েটার তীব্র জ্বর। এতো পরিমাণ জ্বর নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে কথা বললো কিভাবে মেয়েটা।মেঘের মাথায় ঢুকলো না।গালে মৃদু চাপর দিয়ে তানিশাকে ডাকলো।কোনো রেসপন্স নেই।মেঘের নিজেকে পাগল পাগল লাগছে।উম্মাদের মতো আশেপাশে পানির জগ খুঁজো। তার দৃষ্টি আরিয়ার পানে গেল।সে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘ ক্রোধান্বিত স্বরে চেচিয়ে বলল- " কু*ত্তার বাচ্চা এখানে দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? মাইশারে খবর দে।"

‎আরিয়ার ঘোর কাটলো মেঘের রাগান্বিত স্বরে শুনে।মেঘ তীব্র ভাবে রেগে আছে বুঝতে পেরে আরিয়া দৌড়ে নিচে গেল সবাইকে ডাকতে।মেঘ তানিশার মুখ হাত বুলিয়ে দিয়ে ডেকে যাচ্ছে। তানিশা চোখ খুলছে না দেখে তার বুক মুচড়ে ধরে। ওর নিজের গা কাঁপতে লাগল।এমন অবস্থায় মেয়েটাকে দেখবে সে চিন্তাও করেনি। সেই দিকে জোহান সমান তালে ওয়াশরুম থেকে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। মেঘের ক্ষোভ বাড়লো থরথর করে। পাশের কর্ণারসেট থেকে একটা শোপিছ নিয়ে ঠাস করে ছুড়ে মা*রলো ওয়াশরুমের দরজায়। দরজাটায় ধাক্কা খেয়ে শোপিসটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। মেঘ জোহানের উদ্দেশ্যে বললো-" আর একটাও আওয়াজ করবি। তোকে আমি বাথরুমেই পুঁতে রেখে দিবো। কু*ত্তার বাচ্চাআআ।"

‎জোহান এই বাংলায় দেওয়া গালিটা বুঝলো কিনা অনুধাবন করা গেলো না।তবুও সে থেমে গেল। 

‎********************

‎তানিশার জ্ঞান ফিরেছে। সে এখন ভালোই আছে। ফাদিন জোহানকে উদ্ধার করে তানিশার চিকিৎসার কাজে লাগিয়েছিল। আপাতত সবই ঠিক। তানিশার রুমে বাসার সবাই এসে ভীর জমিয়েছিলেন। ফাইয়াজের ধমকে এখন রুমের পরিবেশ মুটামুটি শান্ত ।পুরোপুরি শান্ত হতে পারছে না মাইশার পদচারণের শব্দে। সে লাগাতার পায়চারি করেছে আর কি যেন বিরবির করছে।সুলতানা হায়দারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তিনি তানিশার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তানিশার খবর শুনে ফাইয়াজ আজ জলদিই বাড়ি ফিরেছে। পরনে তার এখন বাইরের পোশাক।তানিশা নিবু নিবু চোকে একবার সুলতানা হায়দারে পানে তাকাল। সুলতানা হায়দার চোখ সরিয়ে নিলেন। উনি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছেন নদ। আনমনেই চোখের কোণ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। তানিশা মাইশার পানে তাকিয়ে মৃদুহেসে জিজ্ঞেস করল -" কি করছো আপু?দেখতে তো রাস্তার পাগলীটার মতো লাগছে। "

‎মাইশা চিন্তিত ভঙ্গিতে তানিশার বিছানার পাশ ঘেসে দাঁড়িয়ে বললো-" তোর জ্বর কমছে?কমে যাবে তো? দুইদিন পর আমার বিয়ে আর তোর এখন জ্বর হতে হলো? ইসসরে! "

‎ফাইয়াজ মুখ তুলে তার ব্যাক্কল বোনটার দিকে তাকাল। চোখেমুখে তার চিন্তার পাহাড়। ফাইয়াজ মুখ কুঁচকে বলল -" এই তুই যাবি এখান থেকে? "

‎মাইশা মুখটা অসহায় করে অনুরোধ করে বললো -" থাকি না আরেকটু? "

‎ফাইয়াজ শক্ত গলায় বলল -" না, তুই এখনই যাবি। যাবি মানে যাবি।এর থেকে  বেশি একটাও কথা না। যাআআ।"

‎মাইশা ভোতা মুখে তানিশার পানে তাকাল। তানিশা ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। তা দেখে মাইশার মন টুকরো টুকরোতে ভেঙ্গে গেলো। মুখ ফুলিয়ে বের হয়ে এলো রুম থেকে। রুম থেকে বের হতেই মেঘের মুখোমুখি হলো। -" এখন কেমন আছে ও? "

‎-" ভালোই আছে। এতো ভালো যে আমাকে মুখ বাঁকায়।"

‎মেঘ স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। টেনশনে তার মাথা ফেটে যাচ্ছিল।সে নিজেই কোলে করে নিয়ে তানিশাকে ওর রুমে দিয়ে এসেছে। চিকিৎসার সময় পুরোটা সময় পাশেই ছিল।কিন্তু ফাইয়াজের আদেশ তাকে মানতেই হয়েছে। যতই হউক সে এখন অধিকার দেখাতে পারে না। -" তাহলে সত্যিই ঠিক আছে। এতো জ্বর মেয়েটার তোমার পুরোটা দিন কোথায় ছিলে?খেয়াল রাখতে পারিস না একটু ওর দিকে? "

‎-" দেখ মেঘ এসব বিষয়ে আমাকে কথা শুনাস না।ও সবসময়ই রুমে ঘাপটি দিয়ে বসে থাকে। নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে। রুমে কেউ আসলেও তেমন পাত্তা দেয় না। তাই কেউ তেমন ওর রুমে আসেনি।জ্বর নিয়ে বসে আছে কাউকে মুক ফুটে বললে কি হতো? বাসায় এতো মানুষ থাকা সত্তে কাউকে বলেনি। "

‎জোহান রিদান রাশাদের নিয়ে নিজের রুমে ছিলো।সবগুলো তানিশার রুমে ভীর জমাচ্ছে।কোনো ভাবেই ওরা ছোট খালামুনিকে একা রাখবে না। ফাদিন টেনেটুনে নিয়ে আসতে পারেনি। জোহান একটু চেষ্টা করতেই ওর সঙ্গ এছে গেছে । বিদেশি আংকেলকে তাদের একটু বেশিই পছন্দ হয়েছে। জোহান রিদানকে  রুমে রেখে। রুম থেকে বের হয়ে মাইশাকে দেখে বললো -" হাউ ইজ দ্য প্রিন্সেস ডুইং নাউ? "

‎মাইশা মুখ বাকিয়ে প্রস্থান করলো।মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে এমন ভাবে জোহানের পানে তাকাল যে জোহান মিনমিন করে আবার রুমে গিয়ে খিল দিলো।

*****

রাত গভীর হতেই তানিশার ঘাম দিয়ে জ্বরটা ছাড়লো।ঘামে গা ছিপছিপে হয়েছে বলে তানিশা সাওয়ার নিয়ে এসেছে। ডেসিং টেবিলের সামনে আসতেই  দেখলো তার ডাইরিটার উপর বেশ কতগুলো নেতিয়ে যাওয়া টগরফুল।ডাইরিটার খুলামেলা দেখে বেশ চমকালো।ডাইরির মধ্যে থেকে একটা রঙিন কাগজ অর্ধ বের হয়ে আছে। তানিশা ভ্রু কুঁচকে ডাইরিটার উপর থেকে ফুলগুলো সরিয়ে ডাইরিটা হাতে নিলো। নীল রাঙা কাগজটা টেনে বের করলো। ছোট্ট একটা চিরকুট। চিরকুটটা মেলে ধরতেই কারো টানা হাতের লেখা ভেসে আসলো চোখের পাতায় ।ডাক্তার হলেও জোহানের হাতের লেখা এখনও অসম্ভব সুন্দর। তানিশার ডাইরিটায় জোহানেরও অনেকগুলো লেখা আছে। যা সে তানিশার অজান্তেই লিখেছিলো।তানিশা পরে জেনেও কিছু বলেনি। জোহান একমাত্র মানুষ যার কাছে সে খোলা বইয়ের মতো।জোহানের দেওয়া চিরকুটটা তানিশা পড়লো মনোযোগ দিয়ে। 

" প্রিন্সেস, 

এই ফুলগুলো আমি দিলাম বলে রাগ করলে প্রিন্সেস?জানি রাগ করেছো।ফুলগুলোর পানে প্রতিদিন চেয়ে থেকে ভাবি দেবো কি না। আজ দিয়েই দিলাম।যার জন্য তোমারই এই ফুলগুলো এতো পছন্দ। তার কাছ থেকে তুমি আর নিবে না জানি। তাই আমার কাছ থেকেই নিলে। এই স্নিগ্ধ ফুল দিয়ে আমি তোমায় আবার আমাকে বিশ্বাস করতে আহবান জানাই।আরও একটিবার কি আমার হাত ধরা যায় না?আরও একবার বিশ্বাস করা যায় না আমাকে? আমার স্থায়িত্ব ফুরচ্ছে। আমাকে যেতে হবে আবার। তুমি তোমার মনোভাব পাল্টে না ফেলে চলো না আমার সঙ্গে।এবার আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করবো।

তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী  "

তানিশা যত্নে চিরকুটটা ডাইরিতে ঢুকিয়ে রাখলো। পা বাড়ালো পাশের রুমের দিকে। জোহান এখনও জেগে আছে তার মন বলছে। কিন্তু রুম থেকে বের হয়ে  যখনই জোহানের রুমের দরজায় হাত রাখলো তখন থামিয়ে দিলো নিজেকে । কি দরকার প্রতিটা কথার জবাব দেবার। জোহান নিজেই খুঁজে নিক। তানিশা একা এই নিঃশব্দ পরিবেশে গিয়ে বসলো বারান্দায়। চারিপাশ থমকে আছে যেন। গাছের পাতাগুলোও যেন নিজেকে নাড়াতে দ্বিধাবোধ করছে। মরিচ বাতিগুলো জ্বলছে ঝিলমিলয়ে। তানিশা বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে করিডরের পানে দেখলো।খা খা করিডর। তা দেখে পূর্ণ করিডরে স্মৃতি ভেসে এলো তানিশার মনের জানালা খুলে দিয়ে।কি এক জ্বালায় পরেছে সে। ঘুরেফিরে সেই দিনগুলোতে ছুট লাগায়।

‎জোহানকে ফাহিমের পুরনো রুমে থকতে দেওয়া হয়েছে। চিলেকোঠার ঘরটায়  যাবার আগে এটা ছিলো ফাহিমের রুম। আর ফাহিমের রুমের দরজার মুখমুখি ছিলো মাইশা তানিশার রুম। যখন মাইশা ছোট ছিলো। তখন সে তানিশার সাথেই থাকতো। তানিশা বড় হয়ে যাওয়ার পর সেটা একান্ত তানিশার রুম করে দেওয়া হয়েছে। মুখমুখি দরজা হওয়ার ফলে ফাহিম মাইশার মুখমুখি হতো বারবার। তাই মাঝের করিডরে অংশটুকু ছিলো তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্র।একজন এই দরজায় আরেকজন ওই দরজায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতো। ফাহিম পুরো দুনিয়ার জন্য এরকম শান্তশিষ্ট হলেও মাইশার কাছে ছিলো ঝগড়া করার উপযুক্ত ঝগড়ার সঙ্গী। মাইশাকে দেখলে ফাহিমেরও যে কি হয়?  সেও পায়ে পা মিলিয়ে ঝগড়া শুরু করে। 

‎তানিশার স্পষ্ট মনে আছে সে তখন আট কি নয় বছরের  ছোট্ট একটা মেয়ে। তখন মাইশা ক্লাস সিক্সে পড়ে।তখন মাইশার একটা বদঅভ্যাস ছিলো। দরজার পর্দা ধরে টেনে টেনে গুনগুন করতো আর নাচতো।নিজে তো করেই একদিন তানিশাকেও শরিক করলো।তানিশাকে ধরিয়ে দিলো নিজেদের রুমের পর্দা আর সে গেলো ফাহিমের রুমের পর্দা ধরে টানতে।নিয়ম দেওয়া হলো একসাথে পর্দা টেনে এনে করিডর মাঝ ধরমীয়ানে আসতে হবে। তানিশা আলতো করে ধরে টানলেও। মাইশা ফাহিমের রুমের পর্দা শক্তি দিয়ে টেনেছে।পরে যা হবার তাই হলো। পর্দার খুলে মাইশার হাতে চলে এলো। ফাহিম মাত্রই গোসল থেকে বের হয়ে এই কান্ড দেখে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো। আস্তে আস্তে  তখন ঝগড়াটা একদম হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ালো।এসব দেখে তানিশা আতঙ্কিত  হয়ে দৌড়ে গিয়ে আসফিয়া খাতুনকে নিয়ে এলো। আসফিয়া খাতুনের হাত পাতলা। ওনি এসেই মাইশার পিঠে ধুমধাম করে উত্তম মাধ্যম দিলেন। ফাহিমকে ছুয়েও দেখলেন না। কারণ ফাহিম সবার কাছে গুড এন্ড কুল বয়। কিন্তু ফাহিম যে ছাড় পেলেন তা নয়। মাইশার কান্না দেখে ঘটনা না শুনেই নাজমুল মর্তুজা নিজের ছেলেকে দিলেন আরও কয়েক গা। তখন তানিশা সেই কি মন খারাপ হয়ে ছিল নিজের ভাইবোনকে এমন মা*র খেতে দেখে। 

তানিশা সেই দিনটা ভেবে হাসলো। বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলো বুঝতে পারলো না। তানিশা ঘুমিয়ে যাওয়ার খানিক পরে একটা রুমের দরজা খুলে গেল। একজন যুবক বের হয়ে এলো রুম থেকে। রুম থেকে বের হয়ে প্রথমে তানিশা রুমে উঁকি দিলো। না পেয়ে আশেপাশে দেখে বারান্দায় এসে থমকালো তার দৃষ্টি। সেও এগিয়ে এলো বারান্দায়। মেয়েটাকে এভাবে ঘুমাতে দেখে ওর পাশে বসলো।ধীরে ধীরে তানিশার মাথাটা তুলে নিলো নিজের চওড়া কাঁধে। আতঙ্ক নিয়ে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে রইল।যদি মেয়েটা জেগে যায়! তানিশাকে আরামসে ঘুমাতে দেখে স্বস্তি পেলো। মনে তার অসংখ্য প্রজাপতি ডানামেলে উড়তে লাগলো। এমন সুমধুর রাত তার জীবনে আসেনি কখনও।থাক মেয়েটা নিশ্চুপ। তবুও ওর পাশে তো আছে। এতেই তার মনপ্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। 

চলবে........

Loading spinner

Reply
Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago

পর্বঃ১৬

 

 

দুপুর গড়িয়ে বেলা এখন বিকেলের পথে যাত্রা শুরু করেছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাসায় মেহমানেরও সংখ্যা বাড়ছে। তানিশা শাড়ীর কুচি ধরে দুতলায় উঠে ক্লান্তির দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।ঘরকোণো হয়ে যাওয়া তানিশাকে বিয়ের ঝামেলায় টেনে বের করে নিয়ে এসেছে রুম থেকে । সকাল থেকে কয়বার যে এই সিড়ি গুলো বেয়ে উপর নিচ করেছে ইয়ত্তা নেই।পায়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যাথা হয়ে গেছে।গন্তব্য এখন তার জোহানের রুম। এই ছেলেটাকে সে দুই দিন ধরে চোখের দেখাও দেখতে পারছে না। মাইশার রুম পার হওয়ার সময় ফাবিহা এসে তার পথরোধ করে দাঁড়ালো -" এই মেয়ে, কোথায় যাচ্ছো? "

‎তানিশা একটু সৌজন্যতা সূচক হাসি দিয়ে বলল -"এই তো রুমেই যাচ্ছিলাম আপু। "

‎ফাবিহা তানিশার হাত ধরে বললো -" পরে যাবে, এখন আসো মাইশা কেমন করে সাজালে ভালো লাগবে। দেখো তো! "

‎তানিশা আস্তে করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো।-তুমি দেখো না আপু। আমার একটু কাজ আছে । একটু পর আমি আসছি। "

‎তানিশা ছাড়া পেতেই লম্বা লম্বা কদম ফেলে ফাবিহাকে রেখে চলে এলো। ঠাস করে জোহানের রুমের দরজা খুলতেই কিছু সংখ্যক ছেলেপেলে দেখে তানিশা থতমত খেয়ে গেলো।এই ছেলেদের মধ্যে জোহানের ঠিকিটাও খুজে পেলো না তানিশা। ছেলেগুলো টানা টানা চোখ মেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এরমধ্যে একটা ছেলে ঠোঁট এলিয়ে তানিশাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে, তার আগেই তানিশা ঠাস করে আবার দরজাটা লাগিয়ে দিলো।এইগুলো মাইশা ফাদিনের নানাবাড়ি থেকে আগত মেহমান। তানিশাদের নিজেদের গুষ্টির মানুষও কম না। তার উপর মানজুম আরা ও আসফিয়া খাতুনের বাপের বাড়ি থেকেও অনেক মানুষ এসেছেন। এই ক্ষেত্রে সুলতানা হায়দার একদম ফকফকা পরিষ্কার। ওনারা মাত্র দুইবোন ছিলেন।সুলতানা হায়দার আরেকজন সুফিয়া হায়দার। সুফিয়া হায়দার স্বামী, একমেয়েকে নিয়ে আমেরিকার ভার্জিনিয়া সেটেল।তানিশা এতোদিন ওরে সাথেই ছিলো। ওনারা দেশে নেই বলে তানিশার নানার দিক থেকে কোনো মেহমান নেই। তানিশা দুতলা ছাঁদে জোহানকে খুঁজলো। না পেয়ে আবার নিচে নেমে এলো। ছেলেটাকে সে বলেছিল আজ যেন কোথাও না যায়।বিয়ের সবগুলো অনুষ্ঠান দেখবে বললো। অথচ কাল থেকে কিছুতেই সে নেই। এখন চলে গেল কিনা কে জানে। তানিশা কিচেনের দিকে গেলো। কিচেনে কাজের তোপ ভালোই। সকাল থেকে কেউ  তেমন কিছু খেতে পারেননি। তাই রাইশা এক প্লেটে খাবার নিয়ে সবার মুখে তোলে তোলে দিচ্ছে। তানিশা রাইশাকে জিজ্ঞেস করল -" এই বড়পু,জোহানকে দেখেছো কোথাও।"

‎রাইশা আইরার মুখে খাবারের লোকমা তুলে দিতে দিতে বললো-" না রে, সকালের পর আর দেখিনি। "

‎তানিশা হতাশ হলো। তানিশা আবার ফিরে আসতে চাইলে রাইশা পিছু ডাকলো। -" এই কোথায় যাস? আয়, তোকে মুখে তোলে দেই। "

‎তানিশা নাক ছিটকে চলে যেতে যেতে  বললো-" নাহ, এসব দিয়ে খাবো না। "

‎রাইশা হতবাক হয়ে বলল -" কি অবস্থা? বিয়ে বাড়িতেও ও এখন ডায়েট মানবে নাকি?কি নাখরা এই মেয়ের,বাবাগো বাবা।"

‎গার্ডনের একপাশে বড় করে হলুদের স্টেজ বাধানো হয়েছে। স্পিকার এখন হিন্দি গান বাজছে। বাচ্চাকাচ্চা দল বেধে সেখানেই বসে আছে। তানিশাকে দেখে অর্ক আদনান এগিয়ে এলো। অর্ক তানিশাকে উদ্দেশ্য করে বললো-"এই রাজকুমারী। "

‎তানিশা পিছু ফিরে অর্কদের পানে তাকাল। অর্ক বললো-" মেঘ কোথায় জানো?  আসার পর থেকে এই বান্দার খবর নেই। "

‎তানিশা মাথাটা ডানে বামে ঝাঁকিয়ে নাকচ করলো। আদনান বলল-" আচ্ছা, তাহলে এককাজ করো। ও যদি ফিরে আসে বলো আমরা রাফিকে নিয়ে ফিরবো। ও এলে যেন আমাদের কল দেয়। ওর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। "

‎তানিশা -"আচ্ছা। " বলতেই অর্ক আদনান চলে গেলো।তানিশা ওদের গমন পথে চেয়ে থাকলো খানিকক্ষণ। হঠাৎ ওর মাথায় একটা চিন্তা এসে ধাক্কা খেলো। মেঘ বাড়িতে নেই। জোহানও না। ফাদিনকে সে দেখিনি অনেকক্ষণ হলো। তানিশার মাথা ধরে গেলো। মেঘ তাদের বাড়িতে আসার পর থেকে ফাদিনের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। জোহানকে প্রতিদিন ঘুরতে নিয়ে গিয়ে বেহাল অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জোহান পুরো আধমরা হয়ে রাতে বিছানায় পরে থাকে। ফাদিনকে সে না করোছিল। কিন্তু ফাদিন শুনেনি। তানিশার প্রচন্ড রাগ হলো। গার্ডেনের ওখানে ফারহানকে দেখে এগিয়ে গেলো -" এই ভাইয়া, রাশাকে রাখো। এখানে অনেক বাচ্চারা আছে ওদের সাথে থাকতে পারবে। তুমি গিয়ে জোহানকে নিয়ে আসো।"

‎-" জোহান কোথায়? "

‎-" জানি না। মেঘ ভাই আর ফাদিন ভাই আবার ওকে নিয়ে কোথায় না কোথায় চলে গেছে। ওদের ফোনও বন্ধ। এখন তুমি যে করেই হউক ওকে ফিরিয়ে আনো। অসুস্থ  হলে হলুদের অনুষ্ঠানে থাকতে পারবে না। "

‎ফারহান বিরক্ত হয়ে বলল -" তোর কি আমাকে আলাদীনের জিনি মনে হয়? আরে! ওদের ফোন বন্ধ। আমি অনেক বার চেষ্টা করেও পারিনি।ওদের ঠিকানা না পেলে কোথায় খুঁজবো আমি ওদের? "

‎-" তার মানে তুমি যাচ্ছো না? "

‎-" জ্বি, আপনি সঠিক ধরছেন।"

‎তানিশা মুখ বাকিয়ে চলে এলো। খুঁজে খুঁজে ফাহিমকে বের করলো। ফাহিম বার্বুচিদের দেখাশুনা করছিল। একটা চেয়ার নিয়ে বার্বুচিদের পাশেই বসে আছে।সবাই কাজে থাকলেও ফাদিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। তানিশা ফাহিমের কাছে গিয়ে বললো-" ফাহিম ভাই, শুনো। "

‎ফাহিম তানিশার কন্ঠ শুনে মুখ তোলে তাকাল।-" বল।"

‎-" দেখো না, মেঘ ভাইয়া আর ফাদিন ভাই জোহানকে নিয়ে আজ আবার চলে গেছে। তুমি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসো না। প্লিজ প্লিজ। "

‎ফাহিম তানিশার অসহায় হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে হাসলো। বেচারি একজন মেহমান এনে বড় জ্বালায় পরেছে। ফাহিম তানিশাকে ভরসা দিয়ে বললো-" আচ্ছা, চিন্তা করিস না। আমি দেখছি। "

‎তানিশা সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -" সত্যি? "
‎‎-"হুম"

‎তানিশা স্বস্তি পেলো। ফাহিমের চুলো এলোমেলো করে দিয়ে ফিরে আসতে আসতে  বললো -" থ্যাঙ্কউ ।"

‎ফাহিম চেয়ে তাকলো তানিশার গমন পথে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে। 

‎****

‎জোহান ওয়াশরুম থেকে বের হতেই তানিশার মুখোমুখি হলো। সন্ধ্যার একটু আগেই ফাহিম ওদের ধরে নিয়ে এসেছে। জোহান তানিশার পানে থেকে অপরাধীর মতো চোখ সরিয়ে নিলো। তানিশা শক্ত গলায় বলল -" কেন এমন করছো তুমি?"

‎জোহান নত মস্তিষ্কে পাল্টা প্রশ্ন করল -" আমি আবার কি করলাম? "

‎তানিশা কপালে ভাজ ফেলে বলল -" তুমি কি করছো তুমি জানে না?খুব ভালো। ওদের কাছে নিজেকে বেকুব প্রমাণ করছো কেন?ওরা যা বলছে তা করতে হবে কেন তোমাকে? এসব করে ওদের কাছে তুমি নিজেকে বোকা প্রমাণ করছো। বুঝতে পারছো তুমি? "

‎জোহান এবার চোখ তুলে তাকাল তানিশার পানে -" দেখো প্রিন্সেস, এসব আমার ভালো লাগছে বলে করছি। ওরা যেভাবে আমাকে নিয়ে মজা পায়, পাক না।আমার কিন্তু বেশ মজাই লাগে জানো? তার উপর আমার এখানকার সময় ফুরচ্ছে। আর মাত্র চারটা দিন। একটু আনন্দের মাঝে কাটিয়ে দেই।পরে তো সেই আমার নিয়মতান্ত্রিক জীবন।"

‎তানিশা হতাশ হয়ে বলল -" তুমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছো।"

‎জোহান তানিশার মাথায় ঠুকা দিয়ে বললো -" দেশে গিয়ে একদম চাঙ্গা হয়ে যাবো। তাই চিন্তা করো না।আমাকে দিনগুলো উপভোগ করতে দাও।  "

‎তানিশা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল -" ওকে ফাইন। "

‎তানিশাকে রুম থেকে চলে যাচ্ছে দেখে জোহান বলল-" তুমি কিন্তু আমার জবাব দাওনি। আমি জানতে চাই তোমার জবাব হ্যা নাকি না। "

‎তানিশা পিছনে ঘাড় বাকিয়ে বলল -" তোমাকে আমি আমার জবাব অনেক আগেই দিয়েছি। "

‎-"এতো কিছুর পর তুমি তোমার জায়গায় আটকে আছো দেখে আমি কষ্ট পেলাম ভীষণ। তবে আমি আটকে থাকবো না। তোমাকে আমি সাবধান করে ছিলাম। "

‎তানিশা হাসে -" তুমি তেমনটা করবে না আমি জানি। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি মি.জোহান। "

‎তানিশা চলে গেল কথাগুলো বলে। জোহান ব্যাথিত চোখে চেয়ে বিরবিরয়ে বললো -" আমাকে বিশ্বাস করা তোমার উচিত হয়নি প্রিন্সেস।আমি তোমার বিশ্বাস ভেঙে দিতে পারি। কারন নিজের উপর আমার বিশ্বাস নেই। "

********

‎নিজের রুমের অবস্থা দেখে তানিশা বেশ হতাশ হলো। মামি চাচিদের দখলে। তার সঙ্গে বাচ্চা কাচ্চারাও রেডি হচ্ছে। তানিশা ওয়াশরুমটা খালি পেয়ে কোনো রকম ডার্ক গ্রিন রঙের লেহেঙ্গাটা পরে বের হলো। ভারি লেহেঙ্গাটা বগলদাবা করে মাইশার রুমে এসে ঢুকলো। অনান্য রুম থেকে এই রুম যাই হউক একটু শান্ত। মেকাপ আর্টিস্ট এখন মাইশাকে সাজাচ্ছেন। এককোণে রাইশা রিদানকে তৈরি করে দিচ্ছে পাশে রাশা চিরুনী নিয়ে বসে আছে। রাইশা তানিশাকে লক্ষ করে অপারগ হয়ে অনুনয় করে বলল -" তানিশা সোনা বোন আমার, রাশাটার চুলগুলো সুন্দর করে বেধে দে।"

‎তানিশা এগিয়ে গেলো। রাশাও খুশি হয়েই তানিশার কাছে এলো।রাশাকে তৈরি করে নিজেও তৈরি হয়ে নিলো তানিশা । মুখে তেমন প্রসাধনী ব্যবহার করেনি। চোখে আইলাইনার দিয়ে রেখা টানলো। ক্লিপ দিয়ে বেলি ফুলের গাজরাটা মাথার পিছনের চুলগুলোতে দুইদিক দিয়ে ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে দিলো। হালকা লিপস্টিক দিলো ঠোঁটে।তানিশার সাজা শেষ হতেই মাইশা ক্লান্ত স্বরে বলল -" এই দেখ, তোকে কত চমৎকার লাগছে। আর আমি এতো সাজতে সাজতে ম*রছি। আমার জান শেষ।"

‎পাশ থেকে ফাবিহা বললো-" হয় হয়, এমন হয়। "

‎মাইশা ফাবিহাকে খোঁচা দিয়ে বলল -" আহা! মানুষের যেনো কতশত বিয়ে হয়েছে? "

‎ফাবিহা মুখ বাকিয়ে তানিশাকে বললো -" আজ একটা বিয়ে হয়নি বলে। বুঝলে তানিশা, মানুষ কত কথাই না শোনাচ্ছেন। "

‎তানিশা হেসে বলল -"  চিন্তা করো না আপু তোনারও কপাল  থেকে কাল শনি কে*টে যাবে। তারপর তোমারও বিয়ে হয়ে যাবে।"

‎মাইশা খ্যাক করে উঠলো -" এই তুই কি বললি? আমাকে শনি বললি? "তানিশা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চলে এলো। মাইশা তবুও ওকে বকে যাচ্ছে। মেকাপের মেয়েগুলো মাইশাকে শান্ত হতে বললো। ওরা পরেছে বেশ জামেলায়। এতো অশান্তি একটা মেয়েকে শান্তিতে বসিয়ে রেখে মেকাপ করানো যাচ্ছে না। 

‎মেঘ হিমালকে নিয়ে মূলদরজা দিয়েই বাসায় প্রবেশ করছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি সামনে সিঁড়ি পানে যেতেই তার পা থমকে গেল।কিন্তু হৃদপিণ্ডের চালচলন বৃদ্ধি পেলো। মোহতে বিমূর্ত হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকলো।ডার্ক গ্রীন  রাঙা লেহেঙ্গা পরিহিত রমনির পানে। যে দুহাত দিয়ে লেহেঙ্গাটা উচু করে ধরে নিচে নামছে। লেহেঙ্গা পরে সে যে বেশ বিড়ম্ভনা পরতে হয়েছে তা দেখে বুঝা যাচ্ছে। মেঘের চারপাশ থমকে গেল। স্বাভাবিক হলো জোহানের কন্ঠ শুনে।  তানিশা নিচের সিড়িতে পা রাখতেই উপর থেকে জোহান নেমে আসলো৷ পড়নে তার কালো পাঞ্জাবি। ফর্সা ছেলেটাকে কালো পাঞ্জাবিতে আরও আকৃষ্ট দেখাচ্ছে। জোহান থরথর করে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। এসেই তানিশার পানে তাকিয়ে গাল ভর্তি হাসি দিলো।-" আমাকে কেমন লাগছে প্রিন্সেস? "

-" চমৎকার। "

জোহান ঘাড় চুলকে সন্দিহান কন্ঠে বললো -" সত্যি? আমার না কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে তোমার পোশাক পরে নিয়েছি৷ ওই যে তুমি মাঝে মধ্যে  পরো না ওইটা। " তানিশার ওড়নাটা ধরে ইঙ্গিত করে বলল -" শুধু এটা হলেই হয়ে যেতো। "

তানিশা জোহানকে ওর পিছনের দিকে ইঙ্গিত করে বললো -" এটাও আছে।দেখো ওরাও পরেছে। "

জাহান পিছু ফিরে হিমালয় আর মেঘের পানে তাকাল। মেঘ একটা মেহেদী  কালারের পাঞ্জাবি সাথে লাল রঙের মাফলার  পরছে৷ পাশে হিলাময় হলুদ রাঙা পাঞ্জাবি সাথে লাল মাফলার  পরেছে। চৌধুরীর বাড়ি ছেলেগুলো যেমন দৃষ্টি আকর্শন করে চলছে বিয়ে বাড়িতে । জোহান ওদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তানিশার পানে তাকিয়ে বললো -" আমাকেও দাও। "

তানিশা হাসলো। জোহানের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে ফিসফিসয়ে বলল-" সবাইকে সবকিছুতে মানায় না মি.।"

তানিশা মৃদু হেসে জোহানকে পাশ কে*টে চলে এলো। মেঘের চোয়াল কঠিন হলো।এদের এতো ঢং ওর সহ্য হয় না। মন তো তার চাচ্ছে এই উল্লুকটাকে ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দিতে। হিমালয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -" এটা কে রে ভাইয়া? "

মেঘ হিমালয়ের কাছে নিজের ক্ষোভ লুকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো -" তানিশা ফ্রেন্ড হয়। ওর সাথে এসেছে বিয়েতে। "

-"ওহহ" বলে হিমালয় থেমে গেলো। কথা বাড়ালো না আর। ওই দিকে  ড্রইংরুমের আরেক কোণের একজন মানুষের মুখ এতো পরিমান হা হলো যে আপেলের টুকরোটা পরে গেল। যেগুলো ওরা হলুদে থালা থেকে চুরিয়ে এনেছে। অর্ক সেই হা করে রাখা মুখটায় নিজের অংশ থেকে একটু আপেল ঢুকিয়ে দিলো। আদনান থু করে ফেলে দিয়ে বললো -" এসব কি রে মামা? "

-" অনেক কিছু। তুমি বুঝবা না সোনা। আমাদের মেঘবাবাকে কেউ মাইনার চিপায় না ফেলতে পারলেও এই লোক বেশ চিপায় রাখছে।"

তানিশা হিমালয়দের পাশে গেলো -"আসসালামু ওয়ালাইকুম হিমু ভাই। কেমন আছেন আপনি? "

হিমালয় সৌজন্য সূচক হাসি উপহার দিয়ে বললো -" আলহামদুলিল্লাহ আপু, তুমি কেমন আছো? "

 তানিশা মিষ্টি করে হাসলো। তানিশা হিমালয়ের এতো ছোট হবার পরও সে কখন তানিশার নাম ধরে ডাকেনি।-" আমি ভালোই। জানেন আপনাকে আজকে চমৎকার লাগছে। একদম হুমায়ুনের হিমু। সেই হিমু বুঝি আপনাকে দেখলে বলতো, তুমি এতো চমৎকার হলে আমার কি হবে ভায়া? "

হিমালয় লজ্জা পেলো। মাথা নত করে বলল -" কি যে বলো তুমি আপু। আমার থেকে ভাইয়া বেশি সুন্দর। সবাই বলে। "

তানিশা মেঘের পানে তাকাল। মেঘ একটু এক্সট্রা ভাব নিয়ে বুক টান টান করে দাঁড়াল।কিন্তু তানিশা ভাবুক হয়ে বললো-" আমার কাছে মনে হয় না।হিমু নামটা পছন্দ হয় বলে হয়ত আপানকে আমার সবচেয়ে সুন্দর লাগে। "

হিমালয় আবার লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মেঘের রাগ লাগলো নিজের নামের উপর। ওর নাম টা ওর মা হিমালয় রাখলে কি হতো?তানিশা প্রতিবার হিমালয়ের নামের প্রশংসা করে। মেঘ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল -" তানিশা বড় ভাইদের সঙ্গে ফ্লাটিং করতে নেই। এটা দৃষ্টিকটু।"

তানিশা চোখ ছোট ছোট করে বলল -" সত্যি?"

হিমালয় কথা কা*টাতে বললো -" আপু, চলো মা তোমাকে দেখবে। "

তানিশা মেঘের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে বললো-" হ্যা চলেন। "

তানিশা হিমালয়ের সঙ্গে মাহতিমা চৌধুরী  কাছে এলো।তিনি মাইশার মামির সাথে কথা বলছিলেন। হিমালয় ডাকতেই পিছু ফিরে তাকালেন। হিমালয়ের দিকে চেয়ে হঠাৎ তানিশাকে লক্ষ করতেই উনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। তিনি বিচলিত হয়ে উঠে দাড়ালেন।

-" আসসালামু ওয়ালাইকুম আন্টি। "

মাহতিমা চৌধুরী  তানিশার বাহুতে হাত রেখে সালামের জবাব দিলেন -" ওয়ালাইকুম আসসালাম আম্মু।কেমন আছে আমার আম্মুটা?"

-" আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি? "

মাহতিমা চৌধুরী  মনোমুগ্ধকর হাসি হেসে বললেন -" ভালো ছিলাম না। তোমায় দেখে একদম ঠিক হয়ে গেছি। তোমাকে দেখবো বলে আমার মনটা ছটফট করছিলো। দেখে খুব ভালো লাগলো। বসো না,  আন্টির পাশে একটু । "

তানিশা একটা চেয়ার টেনে বসলো। কোথায় থেকে মেঘ এসে মাহতিমা চৌধুরীর  ওপর পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পরলো।মাহতিমা চৌধুরী  তানিশার পানে ভালো করে খেয়াল করে বললেন -" এ কি? তুমি চুলে কে*টে ফেলেছো?তোমার চুলগুলো আমার ভীষণ পছন্দ ছিলো। " শেষের কতা গুলো ভীষণ আফসোস নিয়ে বললেম মাহতিমা চৌধুরী। 

তানিশা মলিন হাসে। -" কুঁকড়া চুল তো! অনেক ঝামেলা। তাই কে*টে ফেলেছি। "

-" ইস কি যে করো না! কুঁকড়া চুলে তোমাকে কতটা দারুণ লাগতো জানো?  না জানবে কেমন করে? জানো না বলেই তো এমন কান্ড করলে। "

তানিশা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে গেল। তা লক্ষ করে মেঘ বললো-" আম্মু তানিশাকে কিন্তু এই লুকে আরও বেশি সুন্দর লাগে। আমার মনে হয় এইরকম বেশি ভালো লাগছে। "

তানিশা মেঘের দিকে চোখ তুলে তাকাল।চোখাচোখি হতেই তানিশা চোখ সরিয়ে নিলো। 

**************

 চারপাশে কনের ছবি তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।কনেকে স্টেজে আনা হয়েছে।  এখন কনের সঙ্গে তার ফ্যামেলির ফটোসেশান চলছে। মেঘ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তার প্রিয়  মেয়েটাকে। ভীষণ হাসিখুশি দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। মুগ্ধতা ছেয়ে আছে যেন মেঘের চারপাশে। হঠাৎ এই মুগ্ধতায় ভাঁটা পরলো। ফাবিহা তার ছোট তনুকে লম্বা দেখানোর প্রয়াসে হিল পরেছিলেন। আর স্টেজে উঁকি ঝুঁকি দিতে গিয়ে সেই হিলখানা দিয়ে মেঘের পায়ে আক্রমণ করলেন।মেঘ ছ্যাত করে উঠলো। ফাবিহা আতঙ্কে উঠলো।মেঘের পানে মুখ তুলো চেয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে কানে ধরল।মেঘ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল-" ফাবুর বাচ্চাআআ। "

ফাবিহা দুহাত এক করে বললো -" ক্ষেমা।ক্ষেমা দিয়ে দে বাপ। "

মেঘ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ সরাতেই জোহানের কাছে গিয়ে তার দৃষ্টি আটকালো। একটা বুদ্ধি আসায় সে আবার ফাবিহার পানে তাকাল -" মাফ করবো একটা শর্তে। "

ফাবিহা আকুল হয়ে বললো -" কি শর্ত। সব শর্ত মানবো।"

মেঘ হাত দিয়ে একটু ভীরে জোহানকে দেখালো -" সেইম কান্ড ওই লোকের সাথেও করবেন আপনি। "

ফাবিহা অবাক হয়ে সন্দিহান কন্ঠে বললো -" কি? "

-" যা বলেছি তাই। চল। "মেঘ ফাবিহাকে টেনে জোহানের পাশে দাড় করালো। জোহান তাকে লক্ষ করে মৃদু হাসলো।ফাবিহা গলে একদম পানি পানি হয়ে গেল। এমন সুদর্শন যুবকে সে কিভাবে ইচ্ছে করে কষ্ট দিতে পারে। ফাবিহা আবার অপারগ হয়ে মেঘের পানে তাকাল। মেঘ চোখ রাঙাতেই ফাবিহা নিজের চোখ দুটো কুঁচকে নিলো। শরীরে সকল শক্তি একসঙ্গে করে দিলো পাড়া জোহানের পায়ে। জোহান আর্তনাদ করে উঠলো। ফাবিহার পানে চাইতেই ফাবিহা দুঃখিত হয়ে সরি বলতে নিয়েছিলো।তার আগেই মেঘ ওকে তুলোর মতো তুলে ওপর পাশে নিয়ে নিলো। ফাবিহা ঠোঁট উল্টে বলল -" সরি তো বলতে দিতি! "

-"এতে প্রেম দেখানোর দরকার নেই। এখন এখান থেকে মানে মানে কে*টে পরবি। যা হয়েছে একদম ঠিক হয়েছে। একদম উচিত শিক্ষা। "

চলবে........

Loading spinner

Reply
Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago
পর্বঃ১৭
 
 
হলুদের পালা শেষ হয়েছে। এখন মাইশাকে ওর এক খালাতো বোন আর ফাবিহা মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। পাশে সব যুবক যুবতীরা গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে ।মেয়েগুলো একে অন্যকে মেহেদী দিয়ে হাত রাঙিয়ে দিচ্ছে। বড়রা কাজ শেষ করে বাচ্চাকাচ্চা আর মুরুব্বিদের নিয়ে চলে গেছেন।রাত ঢলে দিন হতে বেশিক্ষণ নেই বোধহয়। মেহেন্দির অনুষ্ঠান শেষ করতে করতে ফজরে ধাক্কা লেগে যেতে পারে। তানিশা আড্ডা মহলের পাশেই একটা চেয়ারে বসে আছে। পাশের চেয়ার ডান পা টান টান করে মেলে রেখে জোহান বসে আছে। পায়ে ভালোই ব্যাথা পেয়েছে সে।একটা আঙুল থতলেই গেছে।ব্যাথা হচ্ছে অনেক। তানিশা হিমালয়ের পানে চেয়ে আছে। সবাই চেপে ধরায় সে এখন মজলিসের মধ্যখানিতে বসে গিটারে টং টং শব্দ তুলে খালি গলায় গান গাচ্ছে।রাত গভীর হওয়ায় স্পিকারগুলো এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জোহান তানিশাকে লক্ষ্য করে বলল -" তুমি ওখানে না গিয়ে আমার পাশে বসে আছো কেন? "

‎তানিশা দৃষ্টি সেখানেই রেখেই খামোখেয়ালি সাথে জবাব দিলো -" এমনিই।"

‎জোহান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল -" আজ ক্যাথরিন কল করেছিল। তোমার কাজিন ইলি আজ ওর বাসায় গেছে। তুমি নাকি ওর কল তুলছো না? কেন সবার প্রতি এতো খাম-খেয়ালি তোমার?"

‎তানিশা জোহানের পানে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো।জোহান মুখ কুঁচকে নিলো -"তুমি জানো? তুমি যত সবার থেকে দূরে যেতে চাও, ততই সবাই তোমার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। "

‎তানিশা এবার নড়েচড়ে বসলো। ভাবুক হয়ে বললো-" আচ্ছা জোহান, বলতে পারো?সবাই কেন আমাকে এতো ভালোবাসে?আমাকে সবাই এতো ভালোবাসার কারণ কি হতে পারে?"

‎-" এই প্রশ্নের উত্তর তুমি আমার কাছে চেও না। আমি সবার সঙ্গে একই রাস্তায় পাড়ি ধরেছি। আজ যদি এসব আমি জানতাম তাহলে আমি  পরিত্রাণ পেতান  এই দুর্বিষহ যন্ত্রণা থেকে।" 

‎তানিশা মলিন হাসে। জোহানের থেকে চোখ সরিয়ে নেবার সময় চোখের কোণে ফারহানকে ধরা পরল। ফারহান দুতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তানিশার পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। চোখদুটো তার অনুভূতি শূন্য। তানিশার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে সেখান থেকে ভ্যানিশ হয়ে গেল। তানিশার কাছে  ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকল।কিন্তু হঠাৎ মজলিসে সোরগোল শুরু হতেই ধ্যান সেই দিকে চলে এলো। সবাই এখন মেঘকে গান গাওয়ার জন্য চেপে ধরছে। মেঘ নাকচ করে দিচ্ছে বরাবরই। হুট করেই তানিশা মুখ ফসকে বলে দিলো -" একটা গান গেয়ে ফেলেন না মেঘ ভাইয়া। আপনার গান গাওয়ার গলা দারুণ। "

‎তানিশা কথাটা বলেই মুখ চেপে ধরল। এমনটা সে একদমই বলতে চায়নি। মেঘ মাথা নত করে ঘাড় চুলকায়। ওর কান লাল হয়ে গেছে তানিশার কাছে এতো ভালো কমপ্লিমেন্ট পেয়ে। মনে তার হাজারও প্রজাপতি উড়ো উড়ো করছে। মেঘ নিজের জায়গাতে থেকে না উঠেই হিমালয়ের কাছে থেকে গিটারটা নিলো। তানিশার দিকে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার গিটারের দিকে মনোযোগ দিলো। গিটারে ছোট্ট প্লেকট্রাম  দিয়ে সুমধুর সুর তুলে  তানিশার পানে তাকাল।খালি গলায় গেয়ে উঠলো -"
‎            
                বলো না, কেন তুমি বহুদূর ?
             কেন আমি একা? হৃদয়ে ভাঙচুর
               জানো না? তুমিহীনা এ আমার 
            স্বপ্ন মেঘে ঢাকা, নামে না রোদ্দুর।। 

‎           দেয়ালে দেয়ালে, খেয়ালে খেয়ালে 
            হিসেবে বেহিসেবে তোমাকেই খুঁজি।।।

‎‎তানিশার অস্বস্থি লাগতে লাগল।মেঘের পলকহীন দৃষ্টি ওকে অস্বস্তিতে গাট করে রাখছে। জেনো কথাগুলো ওকেই বলে যাচ্ছে সে। জোহান মুগ্ধ হয়ে শুনলো বাংলা গানটা।তানিশাকে জিজ্ঞেস করল -" ক্লাউডের গানের কথাগুলো কি খুবই মনোমুগ্ধকর প্রিন্সেস?"

‎তানিশা জোহানের পানে তাকালো অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে। হুট করে উঠে দাড়াল নিজের অবস্থান থেকে। গটগট করে প্রস্থান নিলো সেখান থেকে। মাইশা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকলো পিছন থেকে । তানিশা উত্তর দিলো না। এমনকি পিছু ফিরেও দেখলো না। তানিশার আচরণে মেঘ হতবাক হতবিহ্বল হয়ে থম মে*রে গেলো।জোহানের পানে চেয়ে তার তীব্র ক্ষোভ জাগ্রত হলো। গিটারের তারে জুড়ে টান দিতেই ডান হাতের  আঙুল কে*টে ফিচেল রক্ত বের হয়ে হলো। তা দেখে  সবাই মেঘকে নিয়ে ব্যস্ত হলেও মেঘের ক্রোধান্বিত দৃষ্টি জোহানের দিকে।নিশ্চয়ই  ও কিছু বলেছে যার ফলে তানিশা এভাবে চলে গেলো। ওর কথাগুলো অসম্পূর্ণ রেখে মেয়েটা এভাবে চলে গেল। শুধু মাত্র এই লোকটার কারণে। 

‎***

‎রুমের এতো মানুষের ভীরে নিজের ছোট্ট শরীরটা কোনো রকম জায়গায় করে শুয়েছিল তানিশা। খানিকটা জেগে থাকার পর আপনাআপনি যখন চোখ লেগে এলো। তখন তার ফোনের রিংটোন তার চোখ খুলতে বাধ্য করলো চোখ মেলে তাকাতে । পাশে আরিয়া গুঙিয়ে উঠলো এই আওয়াজে বিরক্ত হয়ে। তানিশা ফোনটা হাতে নিয়ে সাইলেন্স করে রেখে দিয়ে উঠে দাড়াল। জোহান কল করেছে। এখানে শুয়ে শুয়ে কথা বলা যাবে না।আস্তে করে দরজাটা খুলে যখন বের হয়ে এলো তখন জোহান তার রক্তিম আঁখি জোড়া নিয়ে ওর পানে তাকাল।জোহানকে নিজের রুমের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তানিশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে তোমার? না ঘুমিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?"

‎জোহান কাচুমাচু করে বলল -" আমাকে ওরা জায়গা দিচ্ছে না। "

‎তানিশা হতবাক হয়ে বললো -" কারা? "

‎জোহান জবাব দিলো না। তানিশার ভালো করেই বোধগম্য হলো। তার কপালের ভাজ শিথিল হলো। তানিশা গেস্ট রুমে  দরজায় গিয়ে লাগাতার শব্দ করতে লাগল।দরজা খুলার আগ পর্যন্ত করতেই থাকলো। ফাদিন চোখ মুখ কুঁচকে এসে দরজাটা খুলে দিলো। তানিশাকে দেখে খ্যাক করে বলল -" কি হয়েছে? চোখে ঘুম নেই তোর?"

‎তানিশা রুমের ভেতরটা লক্ষ্য করলো বিছানায় এমনি কি মেজেতেও জায়গা করে ছেলেরা শুয়ে আছে৷ মেজেতে মেঘ বসে ঘুমু ঘুমু চোখের ওর পানে চেয়ে আছে। তানিশা কঠোর গলায় বলল -" জোহানকে জায়গা দিচ্ছো না কেন তোমরা? "

‎মেঘ ভেতর থেকে  গম্ভীর স্বরে  জবাব দিলো -" এখানে জায়গা হবে না। "
‎তানিশা মেঘের কথা উপেক্ষা করে ফাদিনকে কঠোর গলায় বলল -" তুমি এই বাড়ির ছেলে হয়ে আরামছে না ঘুমালে হবে। মেহমানকে জায়গা দাও। তোমাদের এমন ব্যবহার দেখলে আমি আশ্চর্যান্বিত না হয়ে পারি না।এই মানুষটা কি প্রতিদিন চলে আসবে। আমাদের বাড়িতে এনে আমি লজ্জায় পরে যাচ্ছি রীতিমতো। "

‎ফাদিন বুঝলো তানিশা বেশ খ্যাপে আছে তাই সে শান্ত কন্ঠে বললো -" ওকে বল আসতে। "

‎ওই দিকে মেঘ গম্ভীর স্বরে বলল -" জায়গা দিতে পারি কিন্তু বালিশ দিতে পারবো না। "

‎-" আচ্ছা সমস্যা নেই।আপনারা ওকে জায়গা দেন। জোহান। "

‎জোহান পিছনে এসে দাড়াল। তানিশা ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে বলল-"এখানে একটু জায়গাতেই শুয়ে পরো জোহান।বিয়ে বাড়িতে একটু কষ্ট করতে হয়ে। "

‎-"ওকে। সমস্যা না। "

‎তানিশা চলে গেল। ফাদিন বিছানা থেকে একটাকে টেনে তুলে সেখানে জোহানের জায়গা করে দিলো। মেঘ ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগলো।একটু পরে আবার দরজায় ঠোকা পরলো।মেঘ ধুপধাপ পা ফেলে এই ভেবে গেলো। যে যাকে পাবে তার উপর কিছু রাগ মেটাবে। কিন্তু দরজা খুলে বালিশ বগলদাবা করে দাঁড়িয়ে থাকা তানিশাকে দেখে নিবে গেল। তানিশা মেঘের হাতে বালিশটা দিয়ে বললো-" এটা জোহানকে দিবেন মেঘ ভাইয়া। "

‎মেঘ মাথা নত করে রেখেছে।তাকে কিছু বলতে না দেখে তানিশা চলে গেল।মেঘ ঠাস করে দরজটা লাগালো।তাতে রুমের ঘুমন্ত মানুষ গুলো কেঁপে উঠলো। রাফি বিরক্ত হয়ে বলল -" কি সমস্যা রে ভাই? "

‎মেঘ জবাব দিল না।সে জোহানের কাছে গিয়ে বালিশটা এগিয়ে ধরে বললো-" এটা তোমার। "

‎জোহান সৌজন্যে হেসে জিজ্ঞেস করল -"প্রিন্সেস দিয়েছে? "

‎মেঘ দাঁত দাঁত চেপে বালিশটাতে শক্তি দিয়ে জোহানের পায়ে ফেলে দিলো।জোহান ব্যাথায় মুখ কুঁচকে নিলো। তবুও জোহানের ঠোঁটের কোণে দেখা গেল একচিলতে হাসি। মেঘ বিড়বিড় করতে করতে মেজেতে গিয়ে শুলো। অর্ক ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো -" মুখ বন্ধ কর বাপ আমার। ঘুমাতে দে।"

‎মেঘ চোখ রাঙিয়ে তাকাল অর্কের পানে। যখন দেখলো অর্ক ওর পানে তাকাচ্ছেই না তখন গাল ফুলিয়ে অন্য পাশ হয়ে গেল।বিড়বিড় করে করে জোহানের গুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়ল। 

‎****

‎তানিশা কনভেনশন হলের এককোনায় একটা চেয়ারে বসে আছে।এতো এতো মানুষের গিজগিজ শব্দ নির্ঘুম রাতে কাটিয়ে তানিশার মাথাটা এতো কোলাহল মেনে নিতে পারছে না।মাইশার পাশে আটার মতে লেগেছিল এতোক্ষণ। একটু অবসর পেতেই এখানে এসে বসেছে। তানিশা আজ হট পিংক   কালারের লেহেঙ্গা পরেছে। এতো ভারি কারুকাজ খচিত লেহেঙ্গা ওকে দেওয়ার কোনো মানে দেখে না। তবুও মানজুম আরাকে সে না করতে পারিনি।এটা পরে এখন ক্লান্ত লাগছে। দুর্বল শরীর নিয়ে লেহেঙ্গা টেনে চলতে গায়ে সব শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে।  হঠাৎ রাশা এসে ওর পাশে বসলো। লাল টুকটুকে ফ্রকে কি দারুণ দেখাচ্ছে বাচ্চাটাকে। রাশা এই ওর ছোট মাথাটা নিয়ে কি যে বুঝে কি জানে। তানিশার কাছ ছাড়া করতে চায় না। মাইশাকে পার্লারে নেওয়ার সময় বাকি বাচ্চা মেয়েগুলো যেতে চাইলেও রাশা একবারও যেতে চায়নি।  সে তার খালামুনির সঙ্গেই যাবে। রাশাকে এখানে দেখে রাইশা রিদানকে এনেও তানিশার পাশে বসিয়ে দিলো -' ওকে একটু খেয়াল রাখিস তো। কোথায় চলে যায়? পরে খুঁজে পাই না।"

‎তানিশা সায় দিয়ে অন্য পাশের একটা চেয়ার টেনে রিদানকে বসিয়ে দিলো। কোথায় থেকে ফারহানও এসে বসে পরলে তানিশার পাশে চেয়ারে।রাশাকে কোলে তুলে নিলো।ফারহানের মুখটা কেমন ফ্যাকাসে।প্রাণহীন দেহটাকে টেনে নিয়ে ঘুরাচ্ছে।-"তুই এখানে বসে আছিস কেন? শরীর খারাপ? "

-"না। তবে একটু দূর্বল লাগছে। "

ফারহান গম্ভীর স্বরে শুধালো -" খাবারের প্রতি অমনোযোগী হলে এরকম হবেই তো।"

তানিশা ভেতরে ভেতরে বিস্মমিত হলো। ফারহানের চেহারায় খানিকটা চেয়ে থেকে হেসে বললো -" আচ্ছা, কাল থেকে পাক্কা মনোযোগী হয়ে যাবো। তা তুমি এখানে কেন? সবাই কত মজা করছে। তুমি আজ কিছুতেই নেই।"

ফারহান রাশার ছোট্ট হাতের আঙুলগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে বলল-" তুইও তো কোথাও নেই।আমার বোন যেখানে থাকবে আমি তো সেখানেই থাকবো।"

-"বাহ!তা আসল কথাটা বলো তো।কি হয়েছে? মাইশা আপুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে কষ্ট পাচ্ছো?কষ্ট পেও না। তোমার যখন ইচ্ছে হবে মাইশা আপুকে দেখতে পারবে।"

ফারহান মাথাটা নত রেখেই বললো-" তোকেও যেনো ইচ্ছে হলে দেখতে পারি। তোকে তো আমি মাইশা আপু থেকেও বেশি মনে করি। আমার সব অভ্যাসে তুই।তোকে মনে করলে সবসময় দেখতে তো ইচ্ছে করবেই।"

তানিশা ফারহানের কাঁধে হাত রাখলো। কোমল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে তোমার? এমন কথা বলছো কেন তুমি? "

-" জানি না। সব থেকেও, নেই মনে হচ্ছে। আমি শূন্য হয়ে যাচ্ছি। এতো কোলাহলেও মনে হচ্ছে আমি একা। এতো একা! যে দম বন্ধ করে দেয়। "

তানিশা বিস্ময় নিয়ে ফারহানকে দেখে যাচ্ছে। ফারহানকে সে কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই ফারহান রাশাকে কোলে নিয়ে উঠে দাড়াল। তানিশার পানে চেয়েও দেখলো না। এইদিকে  তানিশার দুনিয়া থমকে আছে। 

*******

বিয়ে পড়ানো শেষ হয়েছে।কবুল বলতে গিয়ে মাইশা এতো পরিমান কাঁদলো যে পাশে বসে ইয়াসিরের অস্বস্তি হতে লাগলো।চিন্তায় পরে গেলো সে আবার নারী পাচারকারী নয় তো।তানিশা চোখ মেলে দৃশ্যগুলো দেখে গেলো জোহানের পাশে বসে। জোহান আবার ক্যামেরা ম্যানের সঙ্গে ডিল করেছে। তাকে সবগুলো ছবির এককপি দিতে হবে। সে এই গুলো দেশে নিয়ে যাবে।

‎সবার খাবার দাবার শেষ হলে তারপর তানিশারা লাস্ট স্টেপে  খেতে বসেছে। মাহতিমা চৌধুরী তানিশার সঙ্গে খাবেন বলে এতোক্ষণ খাননি।মেঘের হাতে ভালোই ক্ষত হয়ছে। তাই সেও মাহতিমা চৌধুরীর পিছুপিছু ঘুরছে। সে এসে চেয়ার না পেয়ে তানিশার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। মাহতিমা চৌধুরী নিজের পাত থেকে মেঘের মুখে তুলে দিচ্ছেন। তানিশা খেতে বসে বিপত্তি পরলো। ওয়েটাররা সবার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে। তানিশা কিছু নিচ্ছে না দেখে মেঘ এগিয়ে এলো। একটু ঝুঁকে তানিশাকে জিজ্ঞেস করল -" কোনো সমস্যা? "

‎তানিশা ঘাড় বাকিয়ে মেঘের দিকে চেয়ে অপ্রস্তুত হাসলো।-"  না মানে তেমন সমস্যা নেই। "

‎মেঘ পাশের ওয়েটারের হাত থেকে বাটিটা নিয়ে তানিশাকে বললো -" মোরগের রোস্ট দেই?এটার টেস্ট ভালো হয়েছে।"

‎তানিশা একবার পরের টেবিলে বসে থাকা জোহানের পানে তাকাল। জোহানও ওর পানে চেয়ে আছে। জোহান মাথা ঝাঁকাল। তানিশা আবার মেঘের পানে চেয়ে বললো-" না ভাইয়া, এটা খাবো না। "

‎-" তাহলে গরুর গোস্তো দেই। "

‎তানিশা আবার জোহানের পানে তাকাল।জোহান আবার মাথা ঝাঁকাল। মেঘ দাঁত দাঁত চেপে সব দেখে গেলো।এবার তানিশা মুখ খোলার আগেই তানিশার পাতে তরকারি ঢেলে দিলে।তানিশা অবাক হয়ে বলল -" এটা কি করলেন? "

মেঘ হেসে বলল -" তারকারিটা আমার এতো ভালো লেগেছে যে তোমাকেও দিয়ে দিলাম।"

মাহতিমা চৌধুরী পাশ থেকে হেসে বললে উঠলেন -" তোকে তো আমি এখনও রোস্ট দিয়েই দিচ্ছি।"মেঘ অসহায় হয়ে মায়ের পানে তাকালো। এখন এই বিষয়টা নিয়ে কথা না বললে ওনার কি হয়ে যেত?মাহতিমা চৌধুরী ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে মুখ সরিয়ে নিলেন।তানিশা আবার জোহানের দিকে তাকাতেই দেখলো জোহান বলছে খেয়ে নিতে।তানিশা খুশি হয়ে মেঘের পানে চেয়ে বলল-" মেঘ ভাইয়া, আমাকে রোস্ট দিয়ে এই প্লেটটা পাল্টে দিন।"

মেঘ যথা আজ্ঞা বলে চলে গেলো।নতুন প্লেট করে খাবার এনে তানিশার সামনে রাখতেই পাশে সুলতানা হায়দার এসে দাড়ালেন।তানিশাকে বললেন-" তানিশা, আম্মুর সঙ্গে চলো। আম্মুর সাথে খাবে। "

তানিশা অপারগ হয়ে সুলতানা হায়দারের সঙ্গে চলে গেল। মেঘ ঠোঁট উল্টে নতুন আনা প্লেটটা পানে তাকাল।মেয়েটাকে এখানে বসে খেতে দিলে কি হতো?

খাবারের পার্ট চুকতেই বিদায়ের পালা এলো।বিদায়ের পালা আসতেই সবাই দুঃখভাব হয়ে গেলেন। মাইশা সবাইকে জড়িয়ে ধরে ধরে কাঁদছে।তানিশাকে ধরে যেমন তেমন কাঁদলেও ফাহিমকে ধরে সেই রকম  কান্নাটা দিলো। বাবাগো বাবা। সাপে নেউলে একজন আরেকজনকে ধরে সেই কান্না। ফাহিমের মতো শান্ত ছেলেটার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরেছে অশ্রু। ফাহিমের হাত ধরেই গাড়িতে উঠে বসলো মাইশা। তানিশাকে সঙ্গে নিতে চাইলেও তানিশা যায়নি।সুলতানা হায়দারও চাননি। তাই আসফিয়া খাতুন একটু নাখুশ হয়ে বললেন -" মেয়েটাকে এতো করে দিতে বললো।দিলেই পারতে সুলতানা।"

সুলতানা হায়দার শান্ত কন্ঠে শুধালেন-" মেয়েটা আমার নতুন জায়গায় মিশতে পারবে না আপা। খাবারে দাবারে অনিয়ম করবে।"

আসফিয়া খাতুনও আর কিছু বললেন না। কিছু বলার নেই উনার।মাইশাকে নিয়ে ইয়াসিরের গাড়িটা যখন চলে যাচ্ছে। সুলতানা হায়দার তখন সিক্ত চোখ তুলে পাশে দন্ডায়মান ফাইয়াজের পানে চেয়ে বললেন -" ফাইয়াজ একদিন আমরা তানিশাকেই কি এভাবে বিয়ে দিবো?"

ফাইয়াজ সুলতানা হায়দারের বাহু জড়িয়ে বললো-" অবশ্যই ছোটমা। একদিন আমি আমার রাজকুমারীর বিয়েও দিবো "

সুলতানা হায়দার হু হু করে কেঁদে উঠলেন। তানিশা ওইখানে দাঁড়াল না আর। ফাহিমের পিছু পিছু এসে দেখে ফাহিম একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে কাঁদছে একা একা।তানিশা পাশে গিয়ে বসলো।ফাহিম হিচকি তুলে কাঁদছে।তানিশা ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো।নিজের পার্স থেকে এক এক করে অনেকগুলো টিস্যু বের করে দিলো।ফাহিম চোখ মুখ মুছে ফেলে দিয়ে আবার চোখ মুখ ভিজিয়ে ফেলছে। তানিশা ফাহিমের মাথাটা নিজের কাঁধে এনে রাখলো।আলতু করে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্তনা দিলো।এই মনোরম দৃশ্য জোহান দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেলো।তানিশার দৃষ্টি জোহানের পানে পরতেই সে একটু হাসলো।কিন্তু জোহান হাসলো না।সে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওদের পানে।তানিশা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।ফাহিমের পানে লক্ষ্য রাখলো।মাইশার সাথে যেরকম বিবাদ ছিলো তেমন এদের একজন আরেকজনের জন্য টান মায়া বেশি ছিলো। একবার ঈদের দুদিন পর... 

‎থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে পুরো বাসায়।সবসময় আসফিয়া খাতুন রাগারাগি করলেও আজ মানজুম আরা খ্যাপে আছেন।বাড়ির সব পুরুষ মিলে ফাদিন ফাইয়াজ রাইশাকে খুঁজেতে বের হয়েছেন।  দুইদিন হয়েছে ঈদ গেছে। বাচ্চাদের পকেটে টাকা পয়সা কম না। ফাইয়াজকে প্রতিবারই ঈদ সালামি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে আবার সেগুলো নিজের কাছে না রেখে ভাইবোনকে বিলিয়ে দেয়।তাই বাড়ির বড়দের থেকে সালামি নিয়ে জমিয়ে অনেক টাকার মালিকই হয়ে যান বাড়ির ছোট সদস্যরা।এবার সেই টাকা নিয়ে বাড়ির বড় বাচ্চারা কোথাও পাড়ি জমিয়েছেন। কোথায়?তা কেউ জানেন না। তাই খুজে ফেরার এতো হুলুস্থুল। ভাইবোনের হারিয়ে যাবার কথা শুনে ফাহিম ড্রইং রুমে এসে বসেছিল। ফাদিন অতি চঞ্চল এই বিষয়ে বকাবকি করতে করতে হুট করেই মানজুম আরা ফাহিমের দিকে ফিরে গেলেন। ওনার কোনো ছেলেই ঠিকঠাক ওনার মনের মতো হলো না।একটা চঞ্চল তো বেশিই চঞ্চল। একটা নিরব তো বেশিই নিরব। ঘর থেকে বের হয় না।পাড়ার কারো সাথে মিশতে পারে  না, খেলতে পারে না । ফাহিমকে পাশে পেয়ে সব রাগ ফাহিমের উপরই ঝাড়লেন মানজুম আরা। ফাহিমের এসব কথা শুনতে শুনতে উঠে গেল তীব্র ক্ষোভ। সে ভাইয়ের ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে চললো পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলতে। কিন্তু পারলেন না। ওরা ওনাকে মেনে নিতে না পেরে ওনাকে উত্তম মাধ্যম দিয়ে ফিরে দিলো।কপালে ঘা, কাঁটা ঠোঁট নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই মানজুম আরা রাগ আরও বাড়লো। একটু ঠান্ডা হয়েছিলেন যখন শুনেছেন রাইশারা তাদের নানাবাড়িতেই বেরাতে গেছে।কিন্তু ছোট ছেলের এই বেকুবপনা দেখে রাগ বাড়লো থরথর করে।সবাই ফাহিমকে বকাবকি করলেও মাইশা প্রতিশোধ নিতে বের হলেন।তার ভাইকে মে*রে পার পেয়ে যাবে?তা তো সে হতে দিবে না।একহাতে ক্রিকেট ব্যাট অন্য হাতে ফারহানের ছোট্ট হাত। ফারহানের বয়স তখন সাড়ে পাঁচ। তবুও যেন মাইশা থাকে শিখাতে নিয়ে গেলো কিভাবে এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়।

 মাইশা সেই ছেলেগুলো এতো পরিমান মা*রলো যে তার বিচার বাসায় এলো। নিজের মেয়ের এহেন কান্ড দেখে আসফিয়ার হাত আর থামলো না। মাইশার পিঠেও পরলো কয়েক ঘা।ফাহিমের কারণে মাইশা মা*র খেয়েছে বলে মানজুম আরা ফাহিমকেও দিলেন কয়েক ঘা।মা*র খেয়ে দুজন পাশাপাশি রুমে গাল ফুলিয়ে বসে ছিলেন।দিন ফুরিয়ে রাত হলো। রাইশারা বাসায় ফিরে এমন কান্ড হয়ে গেল আর ওরা ছিলো না। তা নিয়ে আফসোস করাও কয়েক দফা শেষ হলো। কিন্তু ওরা মুখে খাবার তুললেন না। পরে সুলতানা হায়দার গেলেন ফাহিম মাইশাকে খাওয়াতে। দুজনে এক সঙ্গে বসিয়ে মুখে খাবার তুলে দিলেন। দুজনেই অনশন ভাঙ্গলেন।ওরা দুজনকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন বলে বাসার সব বাচ্চারা চলে এলেন খেতে। সুলতানা হায়দার সবাইকে এক বিছানায় বসিয়ে পাতে বেশি করে ভাত নিয়ে বেশি করে আলুর তারকারি দিয়ে মেখে এক এক করে সবার মুখে তুলে তুলে দিতে লাগলেন।মানজুম আরা তারকারি ভাত এনে দিচ্ছেন। হঠাৎ আসফিয়া এলেন তানিশাকে কোলে করে নিয়ে।সে এতো ঘটনার মধ্যে ঘুমিয়ে ছিলো।তানিশাকে দেখলে ফাইয়াজকে আর পায় কে?সে রাইশার বিছিয়ে রাখা পায়ে পারা দিয়ে ডিঙ্গিয়ে চলে গেল। রাইশা খ্যাক করে বললো -" এই দেখো আম্মু, তোমার ছেলে আমাকে ডিঙ্গিয়ে চলে গেছে।আমি তো এখন খাটু হয়ে যাবো। "

ফাইয়াজ ঘুম ঘুম টানা চোখ, ফুলো ফুলো গালের তানিশাকে নিজের কোলে নিলো।লাল টকটকে ফ্রকের চোখ ধাঁদানো সুন্দর লাগছে তার পাখিটাকে। ফাইয়াজ টুপটাপ করে কয়েকটা চুমু খেলো তানিশা ফুলো গালে ।  রাইশাকে একটা ধমক দিয়ে ওয়াশরুম দিকে গেল। তানিশা মুখ ধোঁয়াতে। তানিশাকে কুলি করতে দিতেই সে ফ্রকের সামনের দিকটা ভিজিয়ে দিলো।ফাইয়াজ নিজের শার্টের হাতা দিয়ে তা মুছে দিলো।তা দেখে তানিশা ফুঁকলা দাঁত বের হাসলো। হাসলো ফাইয়াজও।

চলবে.......

Loading spinner

Reply
Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago

পর্বঃ১৮

 

 

আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ ভাসছে। মেঘগুলো একফালি চাঁদের টুকরেকে ঢেকে দিচ্ছে। চাঁদের সেই নিয়ন আলোতে মেঘগুলোকে দেখে কিভাবে বেপরোয়া লাগছে।ছুটে চলার পায়তারা অনেক তাদের । তানিশা মেঘের সেই চলতে থাকা দৃশ্য দেখে লম্বা করে একটা তাজা নিশ্বাস টেনে নিলো। শীতল বাতাস বইছে। বৃষ্টির আগমনী বার্তা। পাশে রাখা টবের গাছগুলোও দুলছে বাতাসে। তানিশার মন জোরালো। বৃষ্টির অপেক্ষাই তো দিন গুনছিল সে। পুরো বাড়িটা আলোকিত হলেও ছাঁদের দিকটায় এখন তেমন কোনো আলো জ্বালানো হয়নি। ফাহিম তার রুমে নেই। তাই ওই পাশটাও অন্ধকার। এই অন্ধকারে হঠাৎ কেউ কাঁধে হাত রাখায় তানিশা মৃদু চমকে উঠে। ঘাড় বাকিয়ে দেখলো সুলতানা হায়দার এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। উনার মুখটা অস্পষ্ট আলোতে তেমন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবুও তানিশা অনুভব করলো সুলতানা হায়দারে মনটা বড্ড বিষন্ন। তানিশা সুলতানা হায়দারের পানে চেয়ে জিজ্ঞেস করল -" ফাহিম ভাইকে খুঁজতে এসেছিলে?"

‎সুলতানা হায়দার আকাশের উড়ো উড়ো মেঘের পানে তাকিয়ে জবাব দিলেন -" নাহ,তোকে খুঁজে খুঁজে এলাম। তুই এখানে একা দাঁড়িয়ে কি করিস? "

‎তানিশাও আকাশের পানে চেয়ে বলল -" মেঘগুলোকে দেখি। তাদের এই নিরন্তর  ছুটে  চলা দেখতে ভালো লাগে। "

‎সুলতানা হায়দার হঠাৎ মলিন স্বরে শুধালালেন -" মানুষের জীবন এমন মেঘ দেখা দেয়। এই মেঘগুলো দেখতে যেমন চমৎকার ওগুলো তেমন অসহনীয়। "

‎তানিশা সুলতানা হায়দারে পানে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে তোমার আম্মু? এমন ভাবে কথা বলছো কেন? "

‎সুলতানা হায়দার তানিশার কথায় কান না দিয়ে নিজেই নিজেই বলে যাচ্ছেন -" ছোটবেলায় এমনকি বড় বেলায় আমার জীবনটা খুব স্মুথ ছিল। যা চাচ্ছি পাচ্ছি। কোনো কষ্ট নেই।তোমার বাবার মতো চমৎকার মানুষটাও পেয়ে গেলাম। কত সহজ এই জীবন। তবে কথায় আছে না।কখন সুখ থাকলে কখন দুঃখ পেতে হয়।ওই সুখের বিনিময়ে আমি যে দুঃখগুলো পাচ্ছি সেটা কি একটু বেশি হয়ে গেলো না? "শেষের কথাটা তানিশার পানে তাকিয়ে তানিশাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। 

‎তানিশার স্থির দৃষ্টিতে সুলতানা হায়দারের দিকে চেয়ে আছে । সুলতানা হায়দার এবার কেঁদে ফেললেন। তানিশার ভেরত চিড়ে দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে এলো। এতো স্ট্রং মানুষটাকে কেন ওর সামনেই এসে কাঁদতে হবে। তানিশা সুলতানা হায়দারের ডান হাত নিজের হাতের আজলায় নিয়ে স্বান্তনার সহিতে বললো-" তুমি কেঁদেও না।সব ঠিকই আছে।তোমার জীবনে সব মেঘগুলো মিলিয়ে দিবো দেখো। "

‎সুলতানা হায়দার ঝাপটা দিয়ে নিজের হাত সারিয়ে নিলেন। কান্নারত অবস্থায় আর্তনাদ করে বললেন-" তুমি কি ঠিক করে দিবে?কি ঠিক করবে তুমি?এই কষ্টগুলো আমি কার জন্য পাচ্ছি জানো?তোমার জন্য। তুমি কেন বারবার একই ভুল করছো? কেন নিজের জীবনটার সাথে সাথে আমার জীবনটা নরকে পরিনত  করছো? "

‎তানিশার চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু কণা পরলো। তানিশা ভাঙা স্বরে শুধালো -" কি করেছি আমি?বলো? কি করেছি আমি?"

‎-" কি করার বাকি রাখছো বলো?তুমি মনে করছো আমি কিছুই জানতে পারবো না। এটা তুমি ভুল ভেবেছো। আমি সব জানি, সব।জোহান আমাকে সব বলেছে। আমার কাছ থেকে কেন লুকালে?আমি তোমার মা হই তানিশা। আমি তোমার মা হই।তোমার জীবনের সবকিছু জানার আমার অধিকার আছে। "

‎তানিশা হতবাক বিমূঢ় হয়ে স্মিথ স্বরে শুধালো -" জো,জোহান বলেছে?ও কেন এমনটা করলো?কেন?"

‎সুলতানা হায়দার হুট করে ঝাপটে ধরলেন তানিশাকে। তানিশা এখনও বিমূর্ত হয়ে বিরবির করে যাচ্ছে। সুলতানা হায়দার তানিশার মাথাটা নিজের কাঁধে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। -" জোহানের সাথে ফিরে যাও তানিশা।তোমার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো অপশন। "

‎তানিশা সুলতানা হায়দারকে নিজের কাছ থেকে সরাতে চাইল।সুলতানা হায়দার তত আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তানিশা অপরাগ হয়ে বলল-" আমাকে ছাড়ো আম্মু। জোহানের সঙ্গে আমার বুঝাপড়া আছে। "

‎-" ওকে তুমি কিছু বলো না। "

‎-" ওসব আমার ব্যাপার।"

‎************
‎মেঘের গাড়িটা মাত্রই মর্তুজা বাড়িতে প্রবেশ করলো। অর্ক, ফাহিম, ফাইয়াজ বেশ কয়েকজন কালকের বউভাতে যাওয়ার জন্য বেশকিছু সরঞ্জাম  কিনতে বাজারে গিয়েছিল। মেঘও তাদের সাথে ছিল। কাজ শেষ হতেই সে চলে এসেছে। বাকিরা পরে আসবে। মেঘ গাড়িটা পার্ক করে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরতেই তানিশাকে মেইন ফটক দিয়ে আসতে দেখা গেলো।মুখ তার লাল হয়ে আসে। দেখেই মনে হচ্ছে প্রচুর  কেঁদেছে মেয়েটা।মুখে থমথমে অবস্থা। লম্বা লম্বা কদম ফেলে গার্ডেনের এড়িয়া দিকে যাচ্ছে। মেঘ ওর দিকে পা বাড়ালো।মেয়েটা কোথায় যাচ্ছে এমন অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখতে হবে। গার্ডেনে জোহানকে দেখে ও একটু থেমে গেলো। 

‎জোহান পিছনে কারো পদচারণে শব্দ পেয়ে পিছু ফিরলো।তানিশা এসেই ওকে ধাক্কা দিলো।জোহান দুপা পিছিয়ে গেলো। তানিশার মুখের অবস্থা দেখে ঘটনাটা উদঘাটন করতে তার  বেশি সময় লাগলো না।তানিশা চেঁচিয়ে বললো -" কেন এমন করলে তুমি? কেন? বলো। উত্তর দাও আমাকে। আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করে কি শান্তি পেলে? এই জন্য, ঠিক এই জন্য তুমি দেশে এসেছো। তাই না?"

‎জোহান এগিয়ে এলো। তানিশার মাথায় হাত রেখে শান্ত করতে চাইল মেয়েটাকে। কিন্তু তানিশা ঝাটকা দিয়ে সরিয়ে দিলো ওর হাত। আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো-" একদম স্বান্তনা দিতে আসবে না তুমি আমায়। তোমাকে বিশ্বাস করে আমি ঠকে গেছি। তুমি আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখোনি। আমার বিশ্বাসের কোনো মূল্য তোমার কাছে নেই। তোমার মতো প্রতারকের চেহারা আমি আর দেখতে চাই না।তুমি কখন আমার সামনে আসবে না জোহান। কখনই না । "

‎জোহান ফির হাত রাখলো তানিশার মাথায়। তানিশা পুনরায় হাত সরিয়ে নিলো। -" ডোন্ট টাচ মি। আই সে ডোন্ট টাচ মি। "তানিশা হু হু করে কেঁদে উঠলো এপর্যায়ে। -" আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেখে তোমার একটু কৃপা হলো না জোহান।কেন আমার জীবনে তুমি ফির সেই বুজাগুলো তুলে দিচ্ছো যেগুলো আমি আস্তে আস্তে মাথা থেকে নামিয়েছিলাম।আমার এতো পরিশ্রম তুমি কেন এভাবে বৃথা করে দিলে?একটু শান্তিতে বাঁচতে দিবে না তুমি আমায়? "

‎-"দেখো প্রিন্সেস।আমি যা করেছি তোমার ভালোর জন্যই করেছি ।একটু আমার কথাটা শুনো।এতো হাইপার হচ্ছে কেন?"কথাটা বলতে গিয়ে জোহানের হাত ফির উঠে তানিশার মাথায় চলে যাচ্ছিল।কিন্তু একটা পুরুষালী হাত শক্ত করে চেপে ধরল জোহানের বাড়িয়ে রাখা সেই হাতটাকে। জোহান মেঘের পানে তাকাতেই মেঘ হিসহিসিয়ে বললো-" সি সে ডোন্ট টাচ হার। "

‎জোহান তার হাত নামিয়ে নিলো। একপলক তাকালো তানিশা ভেজা পাপড়ির ওই চোখ জোড়ায়।এখন ওখানে ক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গে অন্য কিছুও মিশে আছে। মেঘ ঘাড় বাকিয়ে তানিশার পানে চেয়ে বলল -" তানিশা তুমি ঘরে যাও। "

‎জোহান শান্ত কন্ঠে বললো -" যে বিষয় জানো না তার মধ্যেখানে এসো না ক্লাউড। নাহলে তোমায় অশান্তিতে ভুগতে হতে পারে। "

‎মেঘ একদম এগিয়ে গিয়ে বললো-" ওটা আমার বিষয়।তোমাকে ভাবতে হবে না। "

‎জোহান ক্ষীণ হাসলো। তানিশার বুক কেঁপে ওঠে। সে পিছন থেকে মেঘের বাহু ধরে পিছু টানলো। -" চলেন মেঘ ভাইয়া। ভেতরে চলেন। আমি লোকটার চেহারা দেখতে চাই না। আপনিও আমার সাথে যাবেন।এই লোকটা এখানে পরে থাকুক। "
‎তানিশাকে এতো উতলা হতে দেখে জোহানের চোখে কষ্টের চাপ পরলো।তানিশা এখন আর তাকে বিশ্বাস করছে না।এটা তার জন্য তীব্র যন্ত্রণার। তবুও সে অনুতপ্ত নয় তা নিয়ে। যা সে করেছে। মেঘ তানিশার হাত ছাড়িয়ে নিলো তার বাহু থেকে। -" তুমি ভেতরে যাও তানিশা। আমি আসবো। একটু পর আসবো। "

‎তানিশা চোখের কোণে জল জমা হলো। অস্থির ভঙ্গিতে বললো- "না। আপনাকে আমার সঙ্গেই যেতে হবে। এখন, এই মূহুর্তে। "

‎জোহান তানিশার অস্থিরতা লক্ষ্য করে বলল -" তুমি ভেতরে যাও প্রিন্সেস। আমি এতোটাও নির্দয় নই।"

‎তানিশা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিলো।জোহানের ভেতর মুচড়ে ধরে। তবুও সে চোখ বুজে আস্বস্ত করলো। তানিশা একবার মেঘের পানে একবার জোহানের পানে চেয়ে চলে গেলো। তানিশা যাবার সময় বারবার পিছু ফিরে তাকিয়েছে। দুই যুবকই ওর পানে চেয়ে আছে দেখে বাড়িতে প্রবেশ করল।তানিশা যাবার পরে মেঘ জোহানের পানে তাকাল। জোহানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। মেঘ এগিয়ে গেলো জোহানের দিকে।জোহানের সামনে টান টান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো-" যদিও ওর পাশে তোমার উপস্থিতি আমার পছন্দ ছিলো না, তবুও ও তোমাকে আপন মনে করে বলে আমি তোমাকে কখন কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু তুমি, হ্যা তুমি। ওকে কষ্ট দিয়ে দিলে। এটা মানতে পারলাম না। " 

‎কথাটা শেষ করেই মেঘ জোহানের কাঁধ হাত রাখলো। চাপ দিলো তাতে। জোহানের মুখ মৃদু কুঁচকে এলো। মেঘ ওর মাথাটা জোহানের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিসয়ে বললো-" এইজন্যই তোমাকে আমি জীবনে আর কখনই ওর পাশে দেখতে চাই না।তুমি আর কখনও ওর আশেপাশে আসবে না। মাইন্ড ইট।"

জোহান মেঘের চোখে চোখ রেখে বলল -" এই কথাটা তোমার কাছে অনেক ভারি পরবে। আর আমি কেন তোমার কথায় ওর পিছু ছাড়বো?কি হও তুমি ওর? ও আমার কাছেই ফিরে আসবে। "

মেঘ শক্ত করে জোহানের কলার চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে বললো-" আমি দেবো না। শুনো, যদি মনে করে থাকো আমি তোমার পিছু পিছু আসতে পারবো না। তাহলে অনেক ভুল করছো তুমি। এতো দিন কিছু বলিনি বলে মনে করো না তুমি পাড় পেয়ে যাবে।ওর থেকে দূরে থাকবে।"

জোহান মেঘের রাগান্বিত চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে। মেঘকে ফিসফিসয়ে বলে -" তুমি কেউ হও না ওর। কিসের বৃত্তিতে এসব আমাকে বলছো তুমি?"

মেঘের গা জ্বলে গেল।জোহানকে আরেকটু চেপে ধরল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল -" আমি ওর সব, সব। বিকজ সি ইজ মাইন। মাথায় এটা ঢুকিয়ে রাখো।তোমাকে যেন ওর আশেপাশে আর না দেখি। "

কথাগুলো বলা শেষ করেই মেঘ জোহানকে ধাক্কা দিলো। জোহান দুপা পিছিয়ে গেলো।মেঘ সেদিকে তাচ্ছিল্য মাখা একটা দৃষ্টি ফেলে চলে গেল।মেঘকে চলে আসতে দেখে জোহান পিছু ডেকে বললো -" শুনো ক্লাউড, আমি তোমার কথা মানতে রাজি হয়ে যাবো। যদি তুমি একটা জিনিস করো। "

মেঘ ঘাড় বাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জোহানের পানে তাকাল। জোহান বলে -" বাংলাদেশে আমার মাত্র দুইদিন বাকি। তার মধ্যে একটা দিন আমি তোমার সাথে কাটাতে চাই।"

-" আমার সাথেই কেন?"

-" আমার বাংলাদেশে আসার দ্বিতীয় রিজন তুমি। তাই।"

কুঁচকে রাখা ভ্রু জোড়া আরও কুঁচকে গেলো মেঘের।" ভেবে দেখবো "বলে মেঘ চলে এলো। জোহান তার কাঁধের কুঁচকে যাওয়া শার্টের অংশটুকু ঝেড়ে হাসলো। 

*******

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি দেখে তানিশার একটা অদ্ভুত খেয়াল এলো। ডেসিং টেবিলের সামনে বসে চুলে চিরুনী চালাতে চালাতে আনমনেই ভাবছে সে। আজ কোথায় গেলে ভালো হয়। কি নিদারুণ বৃষ্টির শব্দ। এই বৃষ্টির সাথে জোহানের সাক্ষাৎ করাতে চেয়েছিল সে। জোহান তার একঝলক দেখেছিল। তার দেশে ফেরার দিন।জোহান আমেরিকা গিয়ে পৌঁছে গেছে আজ পুরো দুদিন। ওর সাথে ঝগড়া হবার পর যে দুইটা দিন ছিল তানিশা ওর সাথে দেখা তো দূর কথাও বলেনি।তবে বিদায়ের সময় নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি তানিশা। জোহান ওর সাথে কথা না বলে ঘর থেকে বের হচ্ছিল না।তানিশাও জেদ ধরে বের হচ্ছিল না। ওইদিকে দেড়ি হলে জোহান ফ্লাইট মিস করতো। একপ্রকার পিছু ছাড়াতেই ওর সামনে গিয়েছিল।যেতে যেতে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত গিয়ে ছিল তানিশা।পুরো রাস্তায়ও কথা বলেনি তানিশা।দুজন দুদিক হয়ে বসে ছিল। কি দারুণ বৃষ্টি ছিল সে দিন। এয়ারপোর্ট গিয়েও যখন  তানিশা কথা বলছিল না। জোহান শুধু এসে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেছিল -" তোমার দেশের বৃষ্টি সত্যিই খুব সুন্দর। "

তানিশা আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। জোহানের বাংলা শুনে হেসেছিল। কিন্তু চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু বেয়ে পরেছিল।জোহান তা নিজের হাতে মুছে দিয়ে শুধু একটা আবদার করেছিল। -" ফিরে এসো প্রিন্সেস।আমি তোমার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকবো। "

তানিশা বিপরীতে কিছু বলেনি।জোহান পারি ধরল নিজের মাতৃভূমিতে। জোহান চলে যাওয়ায় ফাদিন হয়ত একটু কষ্ট পেলো।এতোদিন ভালোই একটা জ্বালানোর মানুষ পেয়েছিল সে। মাইশা ফিরতিতে এসে বাড়ির এমন থমথমে অবস্থা দেখে অবাক হয়েছে।সুলতানা হায়দার তানিশার রুম ছেড়ে বের হন না। তবে তানিশা নিজে নিজে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বৃষ্টির তীব্রতাও তাকে ঘরে আটকে রাখতে পারছে না। হঠাৎ মাথায় কেউ হাত রাখায়। তানিশা চমকে মাথা পিছনে হেলিয়ে দিয়ে উপর তাকাল।ফাদিনকে তানিশা উল্টো দেখতে পারছে। ফাদিন দাঁত ক্যালিয়ে বললো -" কি করিস? "

তানিশা মাথাটা ঠিক করে বললো -" চুল গুছাই । "

ফাদিন কটাক্ষ করে বলল-" এ এমন কি আর কাজ? তোর তো চুলই নেই। দেখ আমিই করে দিচ্ছি।"ফাদিন তানিশার ছোট ছোট কুকড়ানো চুলগুলো উঁচু করে নিজের হাতে নিলো।পাশে থেকে একটা রাবার ব্যান্ড নিয়ে চুল গুলো পেচিয়ে দিলো।দুইগুচি চুল বের হয়েও এলো। তানিশা নিজের মাথাটা এইদিক সেদিক ঘুরিয়ে বললো-" হুমম!খারাপ না। "

ফাদিন এখন তানিশা হাত ধরে টেনে তুলে বলল-" এখন তুই আমার সাথে চল।"

-" কোথায়? "

-" চল না ইয়ার। "

ফাদিন তানিশাকে টেনে নিজের রুমে নিয়ে গেলো। তানিশা ফাদিনের রুমে গিয়ে  তাজ্জব বনে গেল। বিছানায় অনেকগুলো শার্ট পরে আছে। ফাদিন এগিয়ে গিয়ে সেখান থেকে একটা শার্ট নিজের গায়ে উপর দিয়ে বললো-" দেখতো, আমাকে কোনটায় পার্ফেক্ট দেখতে লাগছে? "

তানিশা হাসলো।ফাদিনকে বিয়ের জন্য রাজি করানো হয়েছে। তবে বিয়ে এখন না। পরে হবে৷ ফাদিনের পরের ছুটিতে।এখন মেয়ে দেখা চলছে। ফাদিন একটা শর্তে রাজি হয়েছে তাও।সে আগে মেয়েগুলোর সাথে দেখা করবে, কথা বলবে।তার যদি পছন্দ হয় তাহলেই সে বিয়ে করবে।সবাই মেনেও নিয়েছেন।গতকাল একজনের সঙ্গে দেখা করে এসেছে।মেয়েটা নাকি বেশ অহংকারী।ওর পছন্দ হয়নি। আজ আরেকজনের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। মানজুম আরা কাল থেকে কয়েক রাকাত নফল নামাজও পরেছেন। এটা যেন ফাদিনের পছন্দ হয় এই আশায়৷ এবারের মেয়েটা উনার পছন্দের ভীষণ। তানিশা ঠেস দিয়ে ফাদিনকে বললো-" বিয়ে করবে না বলে কত বাহানা দিচ্ছো।অথচ সাজের কমতি নেই।বাবাগো বাবা!"

ফাদিন সগৌরবে দাড়িয়ে বললো-" মেয়ে আমার  পছন্দ হউক আর না হউক। মেয়েটাকে অবশ্যই তোর ভাইকে পছন্দ করতে হবে। তোদের ভাই বলে কথা না।"

তানিশা ঠোঁট চেপে হেসে বলল -" তাই?"

-" হুমম!কিন্তু সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। কোনটা পরবো বুঝতে পারছি না। "

তানিশা কাপড়গুলোর পানে চেয়ে। কাবাড খুলে একটা ব্যাগ বের করে ফাদিনের পানে ছুড়ে মা*রলো। ফাদিন ঝাপটে ধরল। তানিশা অভিমান করে বলল -" আমার দেওয়া শার্টটা তো এখনও গায়ে দিলে না। এটাতে তোমাকে একদম রাজপুত্র মতো লাগতো। "

ফাদিন ঘাড় চুলকে বললো-" ভুলে গিয়েছিলাম। তাহলে আজ এটাই পরি। "

তানিশা কাবাডে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো-" মেয়ে পছন্দ হচ্ছে না কেন তোমার?"

ফাদিন হাসে।তানিশার পানে চেয়ে বললো-" তোর মতো কাউকে পাচ্ছি না যে তাই।তোর মতো কাউকে পেয়ে গেলেই বিয়ে করে নিবো।" 

তানিশা মুখ বাঁকায়।মানজুম আরা ফাদিন রেডি হচ্ছে কিনা দেখতে এসেছিলেন। হঠাৎ তানিশার এই প্রশ্ন শুনে দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ফাদিনের উত্তর শুনে থমকে গেলেন। দরজার ফাঁক দিয়ে তানিশার পানে চেয়ে উনার মাথায় নানান ভাবনা উঁকি দিলো। তানিশাকে নড়তে দেখে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে এলেন। তানিশা ফাদিনের পাশে এসে দাড়াল। জিজ্ঞেস করল -" আমার মতোই কেন?"

ফাদিন শার্টটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললো-" আমার বোনদের চেয়ে আমাকে কেই বা ভালো চেনে? আমি যার সাথে জীবন কাটাবো, সে অবশ্যই আমার বোনদের মতো চমৎকার মেন্টালিটির মানুষ হতে হবে। যে আমার পরিবারে সবাইকে আমার মতো করেই ভালোবাসবে। "

কথা শেষ করে যখন তানিশার পানে তাকাল। দেখলো তানিশা মুগ্ধ চোখে ওর পানে চেয়ে আছে। ফাদিন ওর মুখে তার দানবি হাত দিয়ে ঢেকে দিলো।-" বের হ আমার রুম থেকে। আমি এখন রেডি হবো। "

তানিশা মুখ ব্যাঙচি দিয়ে বললো-" যাবার সময় আমাকেও সাথে নিয়ে যেও। আজ আমি রেইন কোট পরে হেঁটে হেঁটেশহর দেখবো। "

ফাদিন মুখ কুঁচকে বলল -" আজব সব কারবার করছিস। ড্রেনে পানিতে পরলে বুঝবি। "

-" সেটা আমি দেখবো। "বল তানিশা পা বাড়ালো ফাহিমের চিলেকোঠার দিকে।ফাহিমের কাছ থেকে রেইন কোট আনতে হবে। 

******

বাইরে জুম বৃষ্টি হচ্ছে। রেস্টুরেন্টে কাঁচ বেদ করে রাস্তার উপর পাশ দেখা যাচ্ছে না। কাঁচের মধ্যে পানিগুলো লহরি বেধে নিচে নামছে। মারিয়াম অপলক দৃষ্টিতে সেই পানে চেয়ে আছে। বৃষ্টির দিনে ঘর থেকে বের হতেই যেখানে তার আলসি লাগে সেখানে কোন ব্যাক্কলকে দেখার জন্য ওকে আসতে হয়েছে।কথাটা মনে পরতেই মারিয়ামের মুখ কুঁচকে গেলো।হটাৎ পাশে কেউ গলা খাঁকারি দিতে মারিয়াম মুখ ঘুড়িয়ে সেই দিকে তাকাল।সমানে অতি সুপুরুষ একজন ব্যাক্তি দাড়িয়ে আছেন।লম্বা চওড়া। রোদে পুড়ে ফর্সা গায়ের রংটা একটু থামাটে হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে আর্মি প্রফেশন তার জন্য একদম ঠিক।কালো জিংন্সের সাথে ইন করা নেভি ব্লু শার্ট।কাঁধের দিকটা ভিজে গেছে। এতো গভীর ভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে মারিয়াম মুখ বাকালো। সুদর্শন হয়েছে তো কি?ও তারপরও এই বিয়ে করবে না। মারিয়াম ফাদিনের থেকে চোখ সরিয়ে আবার বাইরে তাকায়। 

‎ফাদিনে কপালে ভাজ পরল। কিছু না বলে সেও ওপর পাশের সিটটায় বসে পরলো।মেয়েটা আড়চোখে একবার ওর ভাবভঙ্গি পরোক্ষ করলো সেটা ফাদিন ভালোই লক্ষ্য করলো। ফাদিন মেয়েটার চোরা চাহনি দেখে বাঁকা হাসলো। সেও কাঁচের দিকে ভারি গভীর দৃষ্টি রেখে ঠেস দিয়ে বলল-" আচ্ছা বলুন তো, এই কাঁচের স্থায়িত্ব কত?"

‎মারিয়াম ওর দিকে চেয়ে কপালে ভাজ ফেলল বলল-" এক্সকিউজ  মি। আপনি কি আমাকে বললছেন?"

‎ফাদিন একটু ভাবুক হলো। ওর পানে চেয়ে বলল -" আমার জানা মতে আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি। আপনি নিশ্চয়ই তাই।এখন আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসে অন্য কারো সাথে তো কথা বলবো না। "

‎মারিয়াম ভাবলেশহীন  চিত্তে বললো -" বললে বলতে পারেন। আমার সমস্যা নেই। "

‎-" তাই?"

‎-" হুমম কারণ আমি আপনাকে বিয়ে করছিহ না। আপনার কি আমাকে দেখা শেষ? "

‎ফাদিনের অনেক হাসি পেলো।দেখতে ম্যাচিউর মেয়েটার মনটা ইমম্যাচিউর দেখে।এটা বুঝলো মেয়েটা তাকে বিয়ে করার কোনো ধরনের ইন্টারেস্ট  নিয়ে আসেনি। ফাদিন দুষ্টু হেসে বলল -" না তো। আপনি এককাজ করেন। এখানে এসে দাঁড়িয়ে একটা চক্কর দেন।আমি ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে আপনাকে দেখি।"

‎মরিয়ম দাঁতে দাঁত চাপে। -" অসভ্য আর্মি অফিসার একটা।"

ফাদিন গা জ্বালানোর মতো করে হেসে বলল -" ধন্যবাদ। নতুন উপাধি দেবার জন্য। "

মারিয়াম চেঁচিয়ে উঠলো -" আপনি খুব খরাপ একটা মানুষ। এতো গা জ্বালানো হাসি দেন কেন? "

ফাদিন ঠোঁট চেপে বলল-" কই?একদমই না। "

মারিয়ামের রাগের পারদ থরথর করে বারলো।সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-" আপনার সাথে দেখা করতে আসাই আমার ভুল হয়েছে। "

-" কখন কখন কিছু ভুল জীবনে ফুল হয়ে ধরা দেয় মিস। "

-" এতো দরকার নেই।শুনেন আপনি আসতে অনেক লেট করেছেন। আমি আরও আধা ঘণ্টা আগে এসেছি।"

মারিয়েমের কথার মাঝেই ফাদিন বলে উঠলো -" কই আমি তো ঠিক টাইমেই এলাম।আমি সবসময় টাইমলি চলি। "

-" এবার করেছেন। আর আপনি যেহেতু দেরি করেছেন বিল আপনি দিবেন। "

ফাদিন অবাক হয়ে বললো-" কিন্তু আমরা তো এখনও কিছু খাইনি?"

-" আমি খেয়েছি। "

-" ওহহহ। তাই বলুন।যে আপনার কাছে টাকা নেই। "

-" আমি তা বলেছি। "

-" না তো।"

মারিয়াম তার সাইড ব্যাগটা কাঁধে চাপিয়ে উঠে দাড়াল। -" আপনি একটা অসহ্য। আমি আর একমিনিটও এখনে দাঁড়িয়ে থাকবো না। "

-"তাহলে একজীবন থাকবেন?"

মারিয়ামের চোখ বের হবার জোগাড় হলো।-" আজব তো।"

কথাটা বলে মারিয়াম মুখ ঝামটা দিয়ে চলে এলো। মারিয়ামের যাওয়ার পানে চেয়ে থেকে ফাদিনের হাসি পেলো।মেয়েটা একদম ওর বোনদের মতো। বুঝে কম চিল্লায় বেশি। 

চলবে..........

Loading spinner

Reply
Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago

পর্বঃ১৯

 

 

সকাল ছয়টা ঘুমের ভেঙ্গে গেল তানিশার। বালিশের নিচের ফোনটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে ওকে কেউ সরণ করছে। তানিশা চোখ কুঁচকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে ফারহান কল দিয়েছে।তানিশা আবার চোখ বুঁজে ফোনটা কানে ধরল।-" এতো সকালে কল দিলে কেন?"

‎ফারহান গম্ভীর স্বরে শুধালো -" ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। অপেক্ষায় আছি। "

‎-" এখন পারবো না।ঘুম পূর্ণ হয়নি আমার। "

‎-" আসতে বলেছি আসবি। এখন রাখছি।"

‎তানিশা উঠে বসলো। বিরক্ত মিশ্রিত দৃষ্টিতে ফোনের দিকে চেয়ে চেয়ে ফারহানের উপর রাগ ঝেড়ে দিলো।ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে ফ্রেশ হতে চললো। ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখলো বাসাটা এখনও নিরব। শুধু নাজমুল মর্তুজার রুম থেকে কোরআন তিলাওয়াতের সুর ভেসে আসছে।মানজুম আরা তিলাওয়াত করে এসে কিচেনে যাবেন। তানিশা ড্রইংরুম, লিভিং রুমে চক্কর দিয়ে ফারহানকে খুজে না পেয়ে বাড়ির বাইরে বের হয়ে এলো।পুরো রাত ঝুম বৃষ্টির পর পরিবেশ এখন বেশ শীতল।আকাশে এখনও ঘণ কালো মেঘ।কখন না কখন আবার ঝুম বৃষ্টি শুরু হয় বুঝা যাচ্ছে না। বাইরে এসে ফারহানের খুঁজ পাওয়া গেল না। দারোয়ান চাচা গেইটটা হা করে খুলে বসে আছেন। তানিশা বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে ফারহানকে কল করতে  নিতে যাবেই তখন দেখলো ফারহান গেইট দিয়ে প্রবেশ করছে সাইকেলে চড়ে। সাইকেল নিয়ে একদম তানিশা পায়ের কাছে এসে থামলো।পুরোনো মডেলের সাইকেল।পিছনে বসার জন্য জায়গা আছে। তবে সাইকেলটা নতুনই।তানিশা দেখে জিজ্ঞেস করল -" এটা কার নিয়ে এসেছো?"

‎-" পরিচিত একজনের কাছ থেকে দাড় এনেছি। ওঠে আয়।তোর জন্য নিয়ে এলাম। "

‎তানিশা অবাক হয়ে বললো-" আমার জন্য? "

‎ফারহান সাইকেলের ব্রেক ধরে সামনের দিকে  চেয়ে নির্বিকার চিত্তে বললো-" হুমম। এখন উঠে আয়।"

‎তানিশা সন্দিহান কন্ঠে শুধালো -" বৃষ্টির জন্য রাস্তা পিচলে হয়ে আছে।তারউপর আমরা এখন বড় হয়ে গেছি। একসাথে চড়ে বসলে টায়ার চেপ্টা হবে না?"

‎ফারহান তানিশার পানে হতাশ হয়ে চাইল-" তোকে এতো ভাবতে কে বলেছে?আমি বলছি, তুই জাস্ট উঠে বসবি। যা হবে আমি দেখবো। "

‎তানিশা "আচ্ছা " বলে শাড়ীটা সামলে ওঠে বসলো।ফারহানের কাঁধ হাত রাখতেই ফারহান তার হাত পিছনে এনে তানিশার হাতটা টেনে নিলো। তানিশার একহাত নিজের পেটের উপর রেখে অন্য হাতে শার্ট ধরতে বললো।তানিশা ঠোঁট চেপে হাসলো।ছোট্ট বেলার স্মৃতি তাজা হলো।ঠিক এইভাবে ফরহানের সাইকেলে চড়ে সে স্কুল জীবন পার করেছে। শুধু কলেজ জীবনটায় গাড়ি চড়ে গেছে। ফারহান তখন হলে চলে গিয়ে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলএলবিতে চান্স পেয়ে চলে গিয়েছিল।ফারহান নিজের মায়ের পেশাটা বেছে নিয়েছে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য । অর্নাস শেষ করে এখন সে বাড়িতে আছে। রেজাল্ট দিলে মাস্টার্সে পড়বে।

‎ফারহান তানিশাকে নিয়ে বৃষ্টি  ভেজা রাস্তায় পাড়ি জমালো।গাছের সবুজ পাতায় পাতায় এখন বৃষ্টি পানি রয়ে গেছে।হালকা বাতাস গায়ে লাগলেই টুপ টাপ বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নিজের গা থেকে ঝেড়ে দিচ্ছে তারা।এই অরূপ পরিবেশে ফারহান তানিশাকে নিয়ে তার দুই চাকার বাহনটায় চরে স্মৃতির পাতায় ভেসে বেড়াচ্ছে। নিরিবিলি রাস্তায় মানুষের আনাগোনা এখন শুরু হয়নি। তানিশা আশেপাশে চেয়ে চেয়ে মাথাটা ফারহানের পিঠে ঠেকালো।হুট করে ফারহানের হাত কেঁপে ওঠে। তানিশা তার হাতের বাঁধন শক্ত করে। -" কি করছো? পরে যাবো তো! সবকিছুর চিন্তা বাদ দিয়ে ঠিকঠাক ভাবে চালাও। "

‎ফারহান তার দৃষ্টি সোজা সামনের রাস্তায় রেখেই ভাঙা স্বরে -" হুমম "উচ্চারণ করলো।তানিশা তা শুনে যা বুঝার বুঝে গেল।বুঝে গিয়ে অনেক কষ্টও পেলো।ফারহান তানিশাকে ওদের  স্কুলের দিকটায় ঘুরে আসতে আসতে বাড়ির সবাই জেগে গেছেন। শুক্রবার হবার কারণে সবাই বাড়িতেই আছেন। তানিশাকে নিয়ে মর্তুজা বাড়িতে প্রবেশ করতেই চৌকাঠে অবস্থানরত রাইশা মর্তুজা হইহই করে উঠলেন।আসফিয়ারা তিন জা গার্ডেনেই ছিলেন। রাইশার চেঁচামেচি শুনে গেইটের দিকে তাকালেন।তানিশা, রাইশা আর আইরাকে  দেখে হাসলো। রাইশা আর আইরা চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ফাহিমের সাথে কি নিয়ে যেন গুটুর গুটুর করছিল।

‎তানিশাকে নামতে দেখে রাইশা দৌড়ে এলো। -" এই ফারহান আমাকে তোল না ভাই। "

‎ফারহান টুপ করে সাইকেল থেকে নেমে গেল।গম্ভীর স্বরে শুধালো -"এখন আর পারবো না। "
‎ রাইশা ফারহানের বাহুতে হাত বুলিয়ে দিয়ে আহ্লাদী স্বরে বলল -" নেমে গেলি কেন ভাই আমার? চল না, বড় আপুকে একটু নিয়ে চল। সবশুধু ছোট বোনদের দিতে হয় না। চল না সোনা আমার। "

‎ফাদিন চৌকাঠ মাড়িয়ে এসে রাইশাকে এরকম করতে দেখে নাক ছিটকে বললো-" কি রে তুই?ছোট ভাইদের কষ্ট দিতে চাস। রাক্ষসী বড় বোন কোথাকার! "

‎রাইশা চোখ রাঙিয়ে তাকায় ফাদিনের পানে। দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে গেল ফাদিনের দিকে। ফাদিনের বাহু খামচে ধরে টেনে বলল-" তাহলে তুই চল।তুই তো আমার বড়। এখন তুই আমাকে চড়াবি।"

‎ফাদিন আতঙ্কে উঠে -" নাআআআ।আমি পারবো না। "

‎-"তোকেই পারতে হবে। চল।"

‎রাইশা টেনেটুনে ফাদিনকে সাইকেলে চড়িয়ে বসালো। নিজেও পিছনে বসে খামচি দিয়ে ধরলফাদিনের টি শার্ট।ফাদিন আর্তনাদ করে বলল-" খামচি দিস কেন রাক্ষসী?আর একবার খামছি দিবি তো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো। ",

‎কে শুনে কার কথা। রাইশা আরেকবার খামচি দিলো। ফাদিন সাইকেলটা নাড়িয়ে দিতেই ঠিক হয়ে বসলো রাইশা ভয় পেয়ে।ফাদিন রাইশাকে নিয়ে গার্ডেনেই দুই তিনবার চক্কর দিলো।চক্কর লাগানোর সময় দুতলার বারান্দায় তোফায়েলকে দেখে চেঁচিয়ে বলল- " ওখানে দাঁড়িয়ে কি দেখো জামাইবাবু?এখানে এসে নিজের বউ সামলান। "

‎তোফায়েল উপর থেকে বলল-" এখন তোমার বোন তুমি সামলাও।আমি ছুটিতে। "

‎এটা শুনে ফাদিন ফিসফিসয়ে রাইশাকে বলল -" তোর জামাই একটা আস্ত ধান্ধাবাজ। "

‎রাইশা দিলো আরেকটা খামচি।ফাদিন থেমে গেলো -" নাম নাম আমার পিছন থেকে। "

‎রাইশা মুখ বাকিয়ে নেমে গেলো।রাইশা নামতেই মানজুম আরা ছুটে এলেন। ফাদিন সাইকেল থেকে নেমেই যাচ্ছিল। উনি বললেন-" নামিস না ফাদিন। আম্মুকে নিয়ে চল। "

‎মায়ের কথা শুনে ফাদিনের মাথায় হাত। -" কি বলো এসব?  না বাবাহ!  না আমি পারবো না।"

‎-"একটা চড় দিবো। রাইশাকে চড়াতে পারলে আমাকে পারবি না কেন? দেখি সর। জায়গা দে। "

‎ফাদিন হতাশ হয়ে আসফিয়া খাতুনের পানে তাকাল -" কি গো বড়মা? কিছু বলো। "

‎আসফিয়া ইশারা দিলেন তুলে নিতে সাইকেলে।সুলতানা হায়দার হেসে বললেন -" তুলে নাও ফাদিন। ছোট্ট মানুষকে। "

‎-"এই সুলতানা! ছোট্ট মানুষ বলবা না একদম। "সুলতানা হায়দার বাধ্য বাচ্চাদের মতো মাথাটা কাত করলেন।ফাদিন আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে ফাহিমকে বললো -" এই তুই এসে আম্মুকে নিয়ে সাইকেল চালা।"

ফাহিম এমন ভাবে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল যেন সে কানেই শুনতে পারেনা। তানিশা মুগ্ধ হয়ে দেখলো তার এই ছোট্ট রাজ্যের সুখি মানুষদের ।মানজুম আরা নড়াচাড়া করছেন বলে ফাদিন বারবার বিরক্ত প্রকাশ করে মাকে না করছে নড়তে।তাতে উল্টো বকা শুনছে। ফারহান  রাইশার সঙ্গে কথা বলে ঘরের ভেতর চলে গিয়েছিল। এসে এমন কান্ড দেখে চেঁচিয়ে উঠলো -" আরে! একটা বাচ্চা ছেলের সাইকেল এনেছিলাম।তোমরা সবাই মিলে আমার বারোটা বাজিয়ে দিবে। হায় হায়!"

মানজুম আরা দিলেন একদম।ফারহান হতাশ হয়ে সুলতানা হায়দারের পানে তাকাল। -" আম্মু। "

সুলতানা হায়দার হেসে বললেন -" বাদ দে।একদিনই তো।" সুলতানা হায়দারের কথা শুনে ফারহান মুখ বন্ধ করে নিলো।

‎*********

‎পরের দিন ভোরে ফাদিন তার ব্যাগ গুছিয়ে তানিশার রুমে একবার উঁকি দিলো।তার ছুটি শেষ। ফিরে যাবে সে নিজের কর্মস্থলে। তানিশা মরার মতো ঘুমাচ্ছে দেখে আর ডাকলো না। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত মেয়েটা তার সঙ্গে বসে আড্ডা দিয়েছে। ওর অভ্যাস আছে বলে তেমন সমস্যা হচ্ছে না।কিন্তু তানিশাকে গভীর গুম চেপে ধরেছে। ভোরেই উঠে রওয়ানা হবে বলে রাতেই সবার কাছে বিদায় নিয়ে নিয়েছে। তবুও সবাই জেগে আছে প্রতিবারে মতো।শুধু তানিশা ছাড়া।এই বিষয়টা ফাদিনকে বিরক্ত করে। বিদায় তো নিয়েই নিয়েছে তাহলে কেন সবাইকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হবে।তানিশার দিকে চেয়ে ফাদিন একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।এই দেখার পরে আর কবে যে দেখা হবে মেয়েটার সাথে জানে না সে।সবাইকে তা নাহয় ছুটিতে এসে একটু চোখের দেখা দেখে।তানিশাকে তো আর দেখা হবে না। ফাদিন এগিয়ে গেল তানিশার বিছানার পাশে। ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো তানিশার মুখের উপর থেকে সরিয়ে হাসলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দরজাটা ভিরিয়ে দিয়ে চলে এলো।তানিশা আধো আধো ঘুমের মধ্যেও ফাদিনের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারলো।ঘুমের মধ্যে আর চোখ খুলেনি। হঠাৎ কি একটা ভাবতেই ধপ করে ওর চোখের পাতা খুলে গেলো । উঠেই এলোমেলো অবস্থাতেই দৌড়ে নিচে নামলো। সবাই ফাদিনকে বিদায় দিয়ে  ঘরে ফিরে আসছেন। তানিশাকে এমন হন্তদন্ত  হয়ে দৌড়ে আসতে দেখে অবাক হলেন সবাই।নুরুল মর্তুজা জিজ্ঞেস করলেন -"কি হয়েছে তোর?এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন? "

‎তানিশা উম্মাদের মতো আশেপাশে তাকাল। ফাদিনকে একঝপক দেখার জন্য। ফাইয়াজ এগিয়ে এসে ওর মাথায় হাত দিয়ে বলল -" কি হয়েছে?"

‎-" ফাদিন ভাই?"

‎-" ও তো চলে গেছে। "

‎তানিশা ঠোঁট উল্টে নিলো।চোখে তার অশ্রু কণা জমছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলায়।ফাইয়াজ ওর মনোভাব বুঝে বললো-" বেশি দূরে যায়নি হয়ত। আমি কল করে থামতে বলছি। "

‎-" তুমি কল দাও আমি এগিয়ে যাই।"তানিশা আবার ছুট লাগাল।মানজুম আরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন তানিশাকে। ফাদিনের জন্য তানিশাকে এমন উত্তলা হতে দেখে ওনার মনে নানান চিন্তা এসে ভর করলো। তানিশা দৌড়ে এসে মর্তুজা বাড়ির  গেইট পাড় হয়েও আরও অনেকটুকু এগিয়ে গেল।ফাদিনের জিপ গাড়িটা একটু পরেই দৃশ্যমান হলো। তানিশা তখন দৌড়াচ্ছে।তানিশাকে দেখে ফাদিন গাড়িটা থামিয়ে  লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল। নামতেই তানিশা ঝাপটে ধরল ওকে। তানিশা দৌড়ে এসে ধরায় নিজেকে পিছিয়ে যাওয়া থেকে অনেক কষ্টে সামলালো। তানিশা ফাদিনের কাঁধের নিচে মুখ রেখে বললো-" আমার কে আলবিদা জানিয়ে এলে না কেন?"

‎ফাদিন ওর মাথায় হাত রেখে বলল -" রাতে তো বলেছিই। সবাইকেই তো বললাম একসঙ্গে । "

‎তানিশা সরে এসে অশ্রু সিক্ত আঁখি জোড়া মেলে ফাদিনের পানে চেয়ে বলল -" কিন্তু আমি তো বলেছিলাম সকালে আমাকে বলে যাবে। তাহলে কেন জাগালে না?এখন যদি আমি না জাগতাম?তাহলে তোমায় দেখতাম কিভাবে? তুমি কখনও আমার কথা শুনো না কেন? কেন?"

‎ফাদিন হাসলো তানিশার বাচ্চামো দেখে। হাত বাড়িয়ে তানিশা চোখের জল মুছে দিয়ে। নিজের মানিব্যাগটা বের করলো। দুটাকার নোট বের করে হাস্যরস স্বরে বলল -" সামান্য দুটাকার জন্য মানুষ এতো পাগল! আমি জানতামই না। এই নে এখন আর কাঁদিস না গাধার রাজকুমারী । "

‎তানিশা চোখে জল নিয়েও হেসে ফেললো।হাতের মুঠোয় দুটাকার সেই নোটটা সামলে নিলো। -" তোমার সঙ্গে আমার কখন দেখা হবে ফাদিন ভাই? তোমাকে যে আমি অনেক মিস করি। "

‎-" আমিও তোকে অনেক মিস করি। "

‎-" আমাদের আর দেখা হবে তো ফাদিন ভাই? "

‎-" হবে না কেন?অবশ্যই হবে।তুই যখন দেশে ফিরে আসবি মাস্টারনি হয়ে। তখন আমি অনেক দিনের ছুটি নি আসবো।দেশে যদি ফিরে আসিস তাহলে তো প্রতি ছুটিতে দেখা হবে। আর যদি ওইখানে থেকে যেতে চাস তাহলে আরেক ব্যাপার। থাক ওসব, এখন বাড়ি যা। আমাকে যেতে হবে। ভালো থাকিস। আমার জন্য দোয়া রাখিস।"

‎তানিশা ঘাড় কাত করে সায় দিলো।ফাদিন ওর চুল এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল।জিপ গাড়িতে উঠে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো।তানিশা হাত তুলে মৃদু ঝাকাল।দাঁড়িয়ে থাকলো ততক্ষণ, যতক্ষণ জিপ গাড়িটা চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য না হয়েছে। 

********

‎ কালো ঘন মেঘে ঢাকা আকাশ।মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবার আগমনী বার্তা।এই বিকেলের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা পড় হয়ে গেছে।তানিশা বারান্দায় একা বসে বসে আকাশের পানে চেয়ে আছে। বাতাস দিতে শুরু করেছে শো শো করে। কয়েকটা পাতায় এসে তানিশার পাশে স্থান করে নিয়েছে। তানিশার বেশ চিন্তিত হলো।রাইশারা এখন কোথায় পৌঁছছে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কি জানি। রাইশা চলে গেছে। রিদানের স্কুল আছে। বিয়ের উপলক্ষে অনেক দিন গ্যাপ দিয়েছে ক্লাসগুলো। তানিশা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে গেলো সকলের চলে যাওয়া। তাকেও যেতে হবে। বাড়িটা নিরবতায় ছেয়ে যাবে আবার।সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে আবার।পৃথিবী তার নিয়মে চলবে।শুধু তানিশাই আটকে আছে একজায়গায়।  হঠাৎ তার স্বরে ফোনটা বেজে উঠল। তানিশার ধ্যান কেঁ*টে গেলো।ফোনটা হাতে নিতেই মাইশার হাসিখুশি একটা ছবি চোখ কাড়লো।উপরে ছোট আপু লেখাটা জানান দিচ্ছে মানুষটা ওর সাথে কথা বলতে চায়। তানিশা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। সে জানে মেয়েটা কেন কল করেছে। তানিশা দেখতে দেখতে কল কে*টে গেলো।ফির এলো। তানিশা এখন নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ফোনটা তুলে কানে চাপলো। মাইশার উৎফুল্ল কন্ঠ ভেসে এলো -" কিরে গাধার রাজকুমারী? কি করছিস? "

-"কিছু না। এমনি বসে আছি। তুমি কি করো?"

-"রান্না করছি।ইয়াসির খিচুড়ি খাবে বলে শখ করলো।তাই একটু এলাম রান্নাঘরে।তাহ তুই বসে আছিস যে আজ?কোথাও যাবি না?"

তানিশা ছোট্ট করে জবাব দিলো -"নাহ।"

-" সত্যি?না কি মিথ্যা বলছিস আমাকে? যাবি নিশ্চয়ই। কোথায় যাবি বল না। আমাকে বললে তো কিছু হবে না। আমি কি আর তোর সাথে চলে আসবো নাকি? "

তানিশা চোখ বুঁজে  বিরক্তর একটা নিশ্বাস ছাড়লো। চোখের পাতায় ভেসে উঠলো গত কয়েক দিনের মেঘের কর্মকান্ড।মাইশা প্রতিদিন ওর কাছ থেকে ফুসলিয়ে ফাঁসলিয়ে খবর নিয়ে মেঘকে পাচার করে। ওই দিন সে বৃষ্টির মধ্যে একা একা হাটতে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখে সেই জায়গায় মেঘও এসে পৌছছে। মেঘ তানিশাকে দেখার আগেই তানিশা লুকিয়ে গিয়েছিল। মেঘ হন্নে হয়ে খুঁজে ফিরেছে তাকে। বৃষ্টির মধ্যে ভিজে জুবুথুবু হয়ে গিয়ে ছিল। তানিশা লক্ষ্য করছে  সে কোথায় যাচ্ছে তা মাইশাকে জানালেই এমন কান্ড হচ্ছে। তাই সে গতকাল এক জায়গায় যাবে বলে আরেক জায়গায় গিয়েছিল। নিজেকে সে এই সময়টুকু দিতে চায়। একা নির্জনে। কারো উপস্থিতি ভালো লাগে না তার। তানিশার এসব ভাবতে ভাবতেই রাগ চড়ে গেল মাথায়। হুট করে কঠোর গলায় বলল -" তুমি জেনে কি করবে বলো?কি করবে?তোমার নতুন বিয়ে হয়েছে। কত জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছো। আমি একবারও জিজ্ঞেস করছি কোথায় যাচ্ছো?তাহলে কেন আমারটা তোমাকে জানতে হবে বলো? "

মাইশা একদম থ হয়ে গেল। হাতের খুন্তিটা হাত থেকে ছুটে গেল।-" এভাবে কথা বলছিস কেন তুই?আমি জানতে পারি না?আমি তোর বোন হয়ই না?জানতেই পারি তুই কোথায় যাচ্ছিস?"

-" না পারো না। কারণ তুমি তথ্য লিক করো। "

মাইশা হতবাক হয়ে গেল। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল -" আমি কাকে এসব তথ্য বললাম? "

-" তুমি জানো ভালো করেই।নিশ্চয়ই আমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। কারণ তুমি অলরেডি বুঝে ফেলেছো আমি কি বলছি।"

মাইশা নিভে গেল। তানিশাকে বুঝাতে চাইল-" দেখ তানিশা.."

-" চুপ করো। আমি কিছুই শুনতে চাই না।একটা বিষয় আমি বুজি না। আমি তোমার বোন। কিন্তু তুমি আমার থেকে অন্য কাউকে ভালোবাসো বেশি।তাকে আপন ভাবো বেশি। তার কথাই তোমার সব কথা। আমার দিকটা তুমি বুঝতে চাইছো না। আমার মতের বিরোধে কেন আমাকে টানতে চাইছো। "

-" তানিশা!"তানিশা থেমে গেল মাইশার ভেজা স্বর শুনে। তানিশার টনক নড়ে এবার।নিজের চুল টেনে ধরে সে। -" সরি আমি আসলে....। "

মাইশা কল কে*টে দিলো।তানিশা কানের কাছ থেকে ফোনটা সরিয়ে সামনে এনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকলো। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো।তানিশা ফোনটা সেখানেই রেখে ধীরে ধীরে ছাঁদে চলে গেলো।বৃষ্টির মধ্যে নিজেকে তুলে ধরল।বৃষ্টির পানি তাকে জড়িয়ে নিলো।শুষে নিলো সকল গ্লানি।  ভিজতে গিয়ে কখন যে বিকেল ফুড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো খেয়ালই করেনি ।ফাহিম হসপিটাল থেকে ফিরে এসে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিল। হেঁটে যাবার সময় ছাঁদের কোণে চোখ গেলো।তানিশাকে ভিজতে দেখে সেদিকে এগিয়ে গেল। মাথার উপর ছাতাটা মেলে দিলো। -" কি করিস এখানে? "

তানিশা চোখ মেলে তাকায়। ফাদিন ওর রক্তিম আঁখি জোড়ার দিকে চেয়ে কপালে হাত দিলো। উদ্বেগ নিয়ে বললো-" এসব কি করছিস? শরীর খারাপ করবে তো। আয় ভেতরে আয়। "

তানিশা কিছু বললো না। ফাহিম ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেও পিছু পিছু গেল কাঠের পুতুলের মতো। ফাহিম বড় একটা টাওয়াল জড়িয়ে দিলো ওর গায়ে। নিজের রুমের সবগুলো ড্রয়ার খুজে কয়েকটা ঔষধ এনে ওর হাতে দিলো। তানিশা হাত মেলে তা নিলোও। ফাহিম পানি ভর্তি গ্লাসটা ওর হাতে দিতেই তানিশা মুখ খুললো-"তোমার রুমের মেজে ভিজিয়ে ফেলছি। "

-" থাক। আমার কোনো সমস্যা না।নে এবার খা।"

তানিশা একসাথে সবগুলো ঔষধ মুখে দিয়ে গিলে ফেললো।পরে অকারণেই হাসলো।ফাহিম জিজ্ঞেস করল -"হাসছিস কেন?"

-"এমনি।"

ফাহিমের ফোনটা ব্রাইবেট করতে ফাহিম দেখলো ফাদিন কল করছে। ফাহিম আড়চোখে তানিশা পানে তাকিয়ে ফোনটা রেখে দিলো। তানিশা খেয়াল করলো সব। -" ফাদিন ভাইয়েরই কল তো। ধরলে না কেন? "

-" কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।? "

-" কেন? কি হয়েছে তোমাদের মধ্যে? "

-" আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি। তবে আরেকটা বিষয় নিয়ে। "

-" কি বিষয় শুনি?"

-"তোকে নিয়েই।"

তানিশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -" আমাকে নিয়ে? কি বিষয়ে? "

-" তোকে বলা কতটুকু ঠিক হচ্ছে জানি না। তবে আমার কাছে এর থেকে ভালো অপশন নেই মাকে বুঝানোর। "

-" মেজমার কি হয়েছে আবার? "

ফাহিম চোখ তুলে তানিশা পানে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলো।-" মা ভাবছে.."

-" থেমে গেলে কেন?বলো?"

ফাহিম ফোঁস করে শ্বাস ফেলে এক নিশ্বাসে বললো-" মা ভাবছে তোমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করো।তাই তিনি তোদের বিয়ে দিতে চাচ্ছেন।"

তানিশা মাথায় যেন আাকাশ ভেঙ্গে পরলো।চেঁচিয়ে বললো-" কি বলছো এসব তুমি?তোমার মাথা ঠিক আছে? "

চলবে.........

Loading spinner

Reply
Page 2 / 3
Share:

Loading spinner