গল্প : রুপকথা (writ...
 
Notifications
Clear all

গল্প : রুপকথা (writer- Nadia ferdousi)

Page 3 / 3

Posts: 19
Topic starter
(@nadia-ferdousi)
Joined: 5 months ago

পর্বঃ২০

 

 

ঝুম বৃষ্টি। ঝুম ঝুম শব্দ করে ঝরে পরছে পানির ফোটা। বারান্দায় বসে আছে বলে বৃষ্টি মৃদু ঝাপটা এসে মাইশার চোখেমুখে লাগছে।এই নিদারুণ বৃষ্টি মাইশার ভাবনায় ছেদ ফেলতে পারছে না। সে কিছুক্ষণ আগের ঘটনা নিয়ে বেশ চিন্তিত। সাথে ভীষণ মন খারাপ নিয়ে বসে আছে।সামনে রাখা ধোঁয়া উটা খিচুড়িটা এখন আর ধোঁয়া উড়াচ্ছে না।ইয়াসির মাইশার পানে চেয়ে থাকলো খানিকক্ষণ চুপ করে।মাইশার তেমন কোনো রেসপন্স না দেখে জিজ্ঞেস করল   -"কি হয়েছে তোমার?"
‎‎ইয়াসিরের ডাকে ঘোর কা*টে না মাইশার। ইয়াসির আবার ডাকে -" মাইশা।এই মাইশা।"

‎মাইশার সংবিৎ ফিরল। ইয়াসিরের পানে চেয়ে জিজ্ঞেস করল -" কি? "
‎অথচ নিজের কন্ঠ নিজেই শুনতে পায়নি সে।ইয়াসির উদ্বেগ নিয়ে বললো-" কি হয়েছে তোমার?এতো আনমনা হয়ে বসে আছো কেন?খাবারটা তো খাবে? "

‎মাইশা নিজেকে সামলে নেয়। অস্বস্তি নিয়ে হাসলো।মেকি হাসি দিয়ে বলল -" কই?  কিছু না তো! আমার আবার কি হবে?একি? তুমি খাচ্ছো না কেন? "

‎-" তুমিও তো খাচ্ছো না। "

‎"এই তো খাচ্ছি" কথাটা বলে মাইশা খিচুড়ির প্লেটটা হাতে তোলে নিলো। হটাৎ ইয়াসিরর বোন অহনি মাইশাকে ডেকে ডেকে আসলো রুমে ।-"ভাবি, ও ভাবি।"

‎-" অহনি আমি এখনে। "মাইশার জবাব পেয়ে ‎অহনি হাতে মাইশার ফোন নিয়ে বারান্দায় এলো-" তুমি তোমার ফোনটা কিচেনে রেখে এসেছিলে। আর তোমার বড় বোন কল করছেন সেই কখন থেকে। "

‎-" ভুলে গিয়ে ছিলাম। দাও।"

‎মাইশা ফোনটা হাতে নিতেই রাইশার আবার কল এলো। মাইশা ফোনটা কানে ধরল।রাইশার কন্ঠ ভেসে এলো ওপর পাশ থেকে -" হ্যালো মাইশা?"

‎-" হুমম। কেমন আছো? তোমরা পৌছে গেছো বাসায়?"

‎রাইশা বেশ উৎসাহ নিয়ে বললো-" হ্যা মাত্রই এলাম। আর শুন, বাসায় এসে যা শুনলাম না? আমার তো মাথা ঘুরাচ্ছে।মেজমা যা কান্ড করছে না?"

‎মাইশা নিরুত্তাপ স্বরে বলল -" মেজমা কয়েকদিন পরপরই তো কোনো একটা কান্ড করেন।এতে চমকে যাবার মতো কি হলো? "

‎-" আরে! শুন না? শুনলে আমার মতো তোর মাথাও ঘুরাবে। "

‎মাইশা নিরেট স্বরে বলল -" কি শুনলে এমন, যে মাথা ঘুরাচ্ছে? "

‎-" মেজমা তো তানিশাকে ঘরেই রেখে দিতে চাচ্ছেন।"

‎ মাইশার এমনিতেই মেজাজ খিটখিটে তার মধ্যে রাইশার এমন রহস্য নিয়ে কথা বলায় মাইশা বেশ বিরক্ত হলো। মুখ কুঁচকে বলল -" কেন তানিশা কি ঘরে থাকছে না?"

‎রাইশা খ্যাক করে উঠে -" বেকুবের বেকুর! কথার মর্মার্থ না বুঝে নাচতাছে। ঘরে রাখা মানে বুঝিস নি?তানুকে ফাদিনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নিজের কাছে রাখতে চাচ্ছেন।"

‎মাইশার মুখ হা হয়ে গেল বিস্ময়ে।এ কেমন আজগুবি কথা শোনালো রাইশা।-" আপু, তুই সত্যি বলছিস?এটা কিভাবে?আর ঘরের সবাই মানবে?"

‎-" আরে হ্যা! আমার মনে হচ্ছে তো হয়েই যাবে। কেমন হবে বলতো? আমার ভাবতেই কেমন জানি লাগছে।"

‎মাইশা অস্থির হয়ে ভাঙ্গা স্বরে বললো-" আ,আপু, আপু তুই কল রাখ। তুই এখন কলটা রাখ। "

‎রাইশাকে রাখতে হলো না। মাইশা নিজেই রেখে দিলো। অস্থির ভঙ্গিতে উঠে দাড়াল। শান্ত হতে পারছে না। ইয়াসির মাইশাকে এমন অস্থির হতে দেখে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করল -" কি হয়েছে?আপু কি বলেছে?খারাপ কিছু হয়ছে?"

‎মাইশা তার শুষ্ক ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে কপালে হাত রেখে বললো-" ইয়াসির তুমি এখন চুপ করে বসে থাকো। মেঘের সাথে আমি কথা বলে নেই। তুমি বসো। তুমিও অস্থির হইও না। আমাকে কথা বলতে দাও।"

‎মাইশা রুমে এসে মেঘকে কল লাগালো।মেঘ কল তুলছে না বলে রুমে পায়চারি করেছে অশান্ত ভঙ্গিতে। মেঘ কল তুলতেই মাইশা চেঁচিয়ে উঠলো -" সামান্য একটা কল তুলতে তোর এতো সময় লাগে কেন?বসে বসে ডিম থা দাও তুমি। কত করে বলেছি আমি হ্যা?কতবার বলেছি তোকে আন্টিকে দিয়ে পাকাপোক্ত কর কথাটা। না তুই আমার কথা শুনবি কেন? এখন যা হবে তার মধ্যে তুই আমাকে টানবি না।যা করার তুই করবি।আর কিছু করতে না পারলে বসে বসে আঙুল চু*ষো।"

‎-" তোর আবার হঠাৎ কি হলো?চ্যাতছিস ক্যান?"

‎-" একদম ঢঙের কথা বলবি না মেঘ। ঢং বের করে দিবো আমি তোর। ওর পড়াশোনা শেষ হউক।কেন তোর সাথে বিয়ে হলে তুই পড়তে দিবি না?ঢং মারাও আমার সাথে না?এখন মজা বুঝো। "

‎মেঘের বোধগম্য হলো বিষয়টা গুরুতর কিছু। শান্ত কন্ঠে শুধালো -" কি হয়ছে? খুলে তো বলবি! "

‎মাইশা মানজুম আরার বিষয়টা খুলে বলে যখন দেখলো ওপর পাশ থেকে কোনো রকমের সাড়াশব্দ নেই। তখন বিচলিত হয়ে ডাকলো-" মেঘ!মেঘ, তুই ঠিক আছিস?"

‎মেঘের তবুও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।মাইশা আবার মুখ খুলতে যাবে তখনই শুধু মেঘের বিস্মিত স্বরের কথাটা শুনে মাইশা থমকে গেল -" আমার মৃত বাবার সাথে তোর বাবা কথা করছে। তোদের একটু বিবেকে বাঁধলো না?"

‎মাইশা ঝিম ধরে গেল।ওপর পাশ থেকে কল কা*টার টুট টু শব্দ শোনতে পাওয়া গেল। মাইশার চোখের কোণে জল জমলো।যাদের এক করতে ও মর*ছে ওরাই ওকে কথা শুনাচ্ছে। 

‎**********

‎সুলতানা হায়দার তানিশার রুমে গিয়েছিলেন। তানিশাকে খুঁজে না পেয়ে আবার নিচে নামছিলেন। হঠাৎ পিছন থেকে ওনার বাহু ধরে কেউ টান দিতেই উনি চমকে পিছনে তাকালেন।তানিশাকে এমন রণমুর্তি রূপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উনার দম আটকে এলো। -" দেখ তানিশা। "

‎তানিশা চেঁচিয়ে উঠলো -" কি দেখবো? কি দেখার বাকি আছে? একটু বুঝিয়ে বলো তুমি আমায়। তুমি সব জানতে আগে থেকে?জানতে কিনা বলো? "

‎-" আমি ওসব বিষয়ে কিছুই জানতাম না।গতকাল তোর আব্বু আমাকে জানিয়েছেন।নাহলে তো আমি জানতামই না "

‎তানিশা আশ্চর্যান্বিত স্বরে শুধালো -" গতকাল?হাহ!গতকাল তুমি জেনেও আজ আমাকে ফাহিম ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে হচ্ছে কেন? "

‎-" বিষয়টা তুমি যতটা ভাবছো তার থেকেও জটিল। আমি কি তোমার আব্বুও এসব জানতেন না৷ সব আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। "

‎তানিশা দাঁতে দাঁত চেপে বললো-" জীবনে এতো এতো কেইস লড়লে আর সামান্য একটা ব্যাপার সামাল দিতে কেনো পিছু টানছো?"

‎সুলতানা হায়দার গম্ভীর স্বরে শুধালেন-" ফ্যামিলির বিষয়গুলো খুব বেশি নাজুক হয়ে থাকে তানিশা।এই ফ্যামিলেতে আমি ছোট সদস্য। তোমার আব্বু তোমার বড়চাচারা এসব দেখবেন।"

‎তানিশার কন্ঠস্বর এখন বেশ চড়ে গেল-" তাহলে কি তুমি বলতে চাচ্ছো আমি এই সম্পর্কে জড়িয়ে পরি? তুমি আমার বিষয়গুলো জেনেও এতো নিশ্চুপ। আমাকে এটা বেশ ভাবাচ্ছে। কেন আমাকে এমন পরিস্থিতি টানছো?মেজমা অবুঝ মানুষ। তুমি একটু বুঝালেই বুঝতেন না?"

‎তানিশার উচ্চ স্বর শুনে সুলতানা হায়দার নিচু স্বরে বললেন-" আস্তে কথা বলো তানিশা। নিচে মেহমানরা আছেন। "

‎-" তাহলে রুমে চলো। তোমার সাথে আমার কথাটা শেষ হউক।"

‎-" তোমার বিষয়টা তুমি যেমনটা ভাবছো তার থেকেও জটিল। ওই বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণাই ছিলনা।এই কথাটা উঠায় ওইটা বের হয়ে এসেছে। "

‎তানিশা বিস্মত হয়ে জিজ্ঞেস করল -" আমাকে নিয়ে?আমাকে নিয়ে এতো রহস্য! কি হয়েছে শুনি? "

‎সুলতানা হায়দার সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে বললেন -" নিচে আসো। মাহতিমা চৌধুরী এসেছেন। কথা শুনলে বুঝতে পারবে।"

‎মাহতিমা চৌধুরী কথা শুনে তানিশা একটু অবাক হলো। নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ের সাথে মাহতিমা চৌধুরীর আসার  সাথে সম্পর্ক কি? 

******

‎মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। অন্ধকার চিড়ে বিদুৎ চমকাচ্ছে সাথে  আকাশের গর্জন। সবকিছু মিলিয়ে ভয়ংকর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে মেঘের আশেপাশে। মেঘ তাদের বাগানের দিকটার পাথর খুদাই করে বানানো বেঞ্চে বসে আছে ।গা বেয়ে পরা শীতল বৃষ্টির কণা তার আত্মাকে শান্ত করতে পারছে না। মাইশার কাছ থেকে বিষয়টা জেনেই মাহতিমা চৌধুরীকে ওই বাড়িতে পাঠিয়েছে সে। তার মনটা বারবার কেন যেন কু ডাকছে। শরীর অবস হয়ে আসছে ওইসব চিন্তাভাবনায় গেলেই।বৃষ্টিতে ভেজার ফলে চোখ লাল হয়ে আছে। অথচ তার ভেতরকার অস্থিরতা, অশান্তি কা*টাতে পারছে না এই বৃষ্টি। তানিশাকে হারিয়ে ফেলার ভয় তার সবসময়কার ছিল।তানিশা যখন প্রথম আমেরিকা গিয়ে ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তখন সে নিজেকে রুমে বন্দিশালার মতো আটকে রাখতো। ছেলেকে দিন দিন এমন অসুস্থ হতে দেখে মীরশাদ চৌধুরী বেশ চিন্তায় পরে গিয়েছিলেন। অনেক চেষ্টার পর ছেলের মনের অবস্থা জানতে পারলেন তিনি।ব্যবসার সিলসিলায় মর্তুজা বাড়ির সঙ্গে উনার বেশ ভালোই সম্পর্কে ছিল। তাই নুরুল মর্তুজার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। উনাদের ছোট মেয়েটাকে যেন উনার ছেলের জন্য দিয়ে দেন। নুরুল মর্তুজাও হেসে বলেছিলেন -" কেন নয়? আপনার মতো একটা বেয়াই পেতে কে না চাইবে বলেন? মেয়েটা পড়াশোনা শেষ করোক।পরে আপনাকে দিয়ে দিবে নে যান।"

মীরশাদ চৌধুরী বিষয়টা সিরিয়াসলী বললেও নুরুল মর্তুজা কথার গভীরে যাননি।অথচ এই কথার পরিপেক্ষিতে চৌধুরী বাড়ির সবাই আশা নিয়ে বসেছিলেন। গাড়ির হর্নের শব্দে মেঘের ঘোর কা*টলো। হিমালয়ের গাড়িটা এসে চৌধুরী বাড়ির চৌকাঠ থামলো।মেঘ উঠে দাড়াল। ধীরে ধীরে মাহতিমা চৌধুরীর পাশে গিয়ে দাড়াল। মাহতিমা চৌধুরীর মুখ থমথমে দেখে মেঘের হৃদপিণ্ড মুচড়ে উঠে। মাহতিমা চৌধুরী কন্ঠ গাম্ভীর্য মিশিয়ে বললেন -" ভেতরে চলো। "

মাহতিমা চৌধুরী চলে যাবার পর মেঘ রক্তিম আঁখি তুলে হিমালয়ের পানে তাকাল। হিমালয় মাথটা নিচু করে নিলো। মেঘ শুষ্ক ঢোক গিললো। হিমালয়ের এহেন ব্যর্থ হয়ে যাওয়া চেহারা তার মনে ঝড় তুলছে। হিমালয় মেঘের কাঁধ মৃদু চাপর দিয়ে বলল-" ভেতরে চলো। এমন অবস্থায় থাকলে ঠান্ডা লাগবে। "

মেঘ তবুও ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে রইল। 

*******

মর্তুজা বাড়ির সবাই  ড্রইংরুমে বসে মাহতিমা চৌধুরীর সাথে কথা বলছিলেন। তানিশা নিস্তেজ হয়ে বসে আছে কিচেনে ছিল।হাফসা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে উঁকি ঝুঁকি মার*ছিন ড্রইংরুমে। খানিক পর পর তানিশা পানেও খেয়াল করছিলেন। ওনার উঁকি ঝুঁকি শেষ হতেই উনি এসে তানিশার পাশে চেয়ার পেতে বসলেন। তানিশা ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল -" আপা! মেহমান কি চলে গেছেন? "

-" হু আপা। "

তানিশা উঠে দাড়াল। দূর্বল শরীরটা টেনে নিয়ে গেলো ড্রইংরুমে। সবাই গোমড়া মুখে বসে আছেন। মাহতিমা চৌধুরীর সাথে কথাগুলো তাদের বেশ ভালো যায়নি। ফারহান এই বিষয় নিয়ে রাগারাগি করে রুমে খিল দিয়ে বসেছে। তানিশা ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে দাড়াল সবার সামনে। পরিবারের সবাই চোখ তোলে তাকালেন ওর দিকে।তানিশা স্থির নিষ্প্রাণ নয়নে নুরুল মর্তুজার পানে চাইল।স্মিথ স্বরে জিজ্ঞেস করল  -" ওনাদের কি সত্যি কথা দিয়েছিলে বড়আব্বু?"

নাজমুল মর্তুজা তানিশার হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসাতে চাইলেন। কিন্তু তানিশা নিজের অবস্থান থেকে নড়লো না। তা দেখে নাজমুল মর্তুজা বললেন-" এখানে বসো আম্মু। তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না। আমরা বিষয়টা মিটমাট করে ফেলেছি।"

তানিশা ছলছল আঁখি জোড়া তুলে নাজমুল মর্তুজার পানে চেয়ে শুধালো -" আমার জবাব দাও মেজআব্বু।আমি আ,,আমার জবাব চাই।"

ফাইয়াজ পিছন থেকে বললো-" তুই রুমে যা তানিশা। "

তানিশা এবার ছ্যাত করে উঠে ফাইয়াজের উপর -" কেন?কেন যাবো আমি? অবশ্যই এখনে আমার রাইট আছে জানার। আমার বিষয়ে এতো বছর ধরে একজন মানুষকে কথা দিয়ে রেখেছো। একবারও আমাকে জানালে না।কেন? "

নুরুল মর্তুজা মাথা নত করে বসে আছেন। মজায় মজায় এমন একটা বিষয় এতো গড়াবে উনার কোনো ধারণা ছিল না।মীরশাদ চৌধুরী যে এতো সিরিয়াস হয়ে কথাটা বলে ছিলেন উনার বোধগম্য হয়নি।  ফাইয়াজ আইরাকে বলল-" আইরা! ওকে রুমে নিয়ে যাও। "

তানিশা চেঁচিয়ে বললো -" একদম আমাকে ধরতে আসবে না কেউ। তোমরা কিভাবে পারলে আমাকে না জানি আমার জীবন নিয়ে এমন একটা ডিসিশন নিতে? মাইশা আপু, রাইশা আপুর একটা সম্মন্ধ এলে তাদের তোমরা একশবার জিজ্ঞেস করতে। তাহলে আমি কি দোষ করলাম? মীরশাদ আংকেলকে কথা দেবার সময় আমার মতামত কেন নেওয়া হলো না?একটা মৃত মানুষকে কথা দিয়ে, কথা ফিরে নিয়ে। আপনারা কেমন ঘৃণ্য কাজ করেছেন জানেন?"

সুলতানা হায়দার তানিশার হাত ধরে টেনে ধরলেন। -" বেয়াদবি হচ্ছে কিন্তু তানিশা। বড়দের সাথে এমন কথা বলার শিক্ষা আমি তোমাকে দেইনি।"

সুলতানা হায়দারের দিকে চেয়ে তানিশা হঠাৎ ঠোঁট ভেঙ্গে ঠুকরে কেঁদে উঠলো। -" আমি,, আ,আ,আমি যে জিনিসগুলোর পিছু ছাড়াচ্ছি বলে নিজেকে স্বান্তনা দেই। অথচ পিছু ফিরে দেখি, আমার পরিবারের মানুষগুলো অনেক আগেই তা আমার পায়ে শিকলের মতো বেঁধে দিয়েছে। আমার এখানটায় অনেক যন্ত্রণা আম্মু। এখান অনেক যন্ত্রণা।তোমরা কেউ কেন বুঝো না? "

সুলতানা হায়দারের চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো।ফাইয়াজ উঠে এলো। তানিশাকে বাহুবন্ধনী আবদ্ধ করে তানিশার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরল। তানিশা ফাইয়াজকে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করল। সবাই থতমত খেয়ে গেলেন। মানুজুম আরা কোণঠাসা হয়ে গেলেন। নিজের অজান্তেই তানিশাকে উনি কষ্ট দিয়ে ফেলেছেন বলে ওনার চোখে পানি জমা হলো।উনার কথায়ই না নাজমুল মর্তুজা নাহিদ মর্তুজাকে এমন প্রস্তাব রাখলেন।মেয়েটাকে তো উনি কত ভালোবাসেন। তাই তো নিজের করে রেখে দিতে চেয়েছিলেন। মেয়েটাকে এমন কান্না করতে দেখে তিনি হীনমন্যতা ভুগতে লাগলেন। আসফিয়া খাতুন দৌড়ে গেলেন ফাইয়াজের পাশে। ফাইয়াজের বুক থেকে টেনে এনে নিজে জড়িয়ে ধরলেন তানিশাকে। তানিশাকে এমন হাপুস হয়ে কাঁদতে দেখে তিনিও কেঁদে উঠলেন। -" কি হয়েছে রে মা আমার? কি হয়েছে আমার আম্মুটার?"

তানিশা আসফিয়া খাতুনের পানে চোখ তোলে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো -" আমি একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই বড়মা। তোমরা সবাই আমার অশান্তির কারণ হচ্ছো।আমার এখানটায় কি যে যন্ত্রণা। কি যে যন্ত্রণা গো বড়মা।"নিজের হৃদয়ের উপর আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখাল তানিশা। 

নাজমুল মর্তুজা ধমকে উঠলেন সবাইকে-" কি? কি শুরু করছো তোমরা? সবাই কাঁদতে শুরু করলে কেন? "

আসফিয়া খাতুন নাজমুল মর্তুজার কথায় কান না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন -" কি এমন যন্ত্রণা আমার আম্মুর? কি হয়েছে আমার আম্মুর? বলো বড়মাকে।"

তানিশার হঠাৎ টনক নড়ে। হুট করে কান্না থামিয়ে দিলো সে। আসফিয়ার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বললো-" ছাড়ো আমাকে। আমার এসব সহ্য হচ্ছে না। ছাড়ো তুমি আমাকে। "

আসফিয়া খাতুনসহ সবাই তানিশার এমন হুট করে পরিবর্তন হয়ে যাওয়াতে হতবাক হলেন। আসফিয়া খাতুন জিজ্ঞেস করলেন -" কি হয়েছে? কেন এমন লাগছে তোর?"

তানিশা চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বললো -" আমি চাই না আমার বিয়ের বিষয়ে আর কোনো কথা হউক।আমি এখন বিয়ে  করবো না। এর বেশি কথা আমি কারো সাথে কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না।কেউ যেনো এই বিষয়ে আমার সাথে কথা বলতে না আসে। আমি আপনাদের কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।"

সবাইকে বিস্ময়কর পরিবেশে থাক লাগিয়ে দিয়ে তানিশা পা বাড়ালো নিজের রুমের দিকে। ফাইয়াজ সবাইকে বললো-" ওর কথা চিন্তা করতে হবে না।মাথা গরম আছে। শান্ত হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। "

মানজুম আরা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে হিচকি তুলে বললেন-" বলে তো যাবে কিসের বুঁজা নিয়ে বসে আছে নিজের ছোট্ট মাথায়।এতো কাঁদলো কেন?"

-" পরে জেনো। এখন ওকে একা থাকতে দাও।"

***********

মেঘের গা থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরে পরে মেজেতে ছিপছিপে পানি জমছে।ভেজা শরীর নিয়েই ড্রইংরুমে চেয়ারে বসে আছে।রক্তিম চোখ জোড়া মেজেতে স্থির।হিমাচল মেঘের গায়ে একটা টাওয়াল জড়িয়ে দিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।মাহতিমা চৌধুরী মেঘের মাথায় হাত রাখলেন। মেঘ তার টকটকে লাল হয়ে যাওয়া চোখ তোলে তাকাল। মাহতিমা চৌধুরী স্নেহের পরশে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন মেঘের চুলে।মেঘ ক্ষীনমান স্বরে বলল -" আ,আব,আব্বুকে ওরা কথা দিয়েছিলো। কিভাবে মানা করতে পারলেন ওনারা? আমাকে তো ছেলের মতোই আপন ভাবতেন। তাহলে কিভাবে? "

মাহতিমা চৌধুরীর অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো ছেলের এমন অসহায়ত্বের স্বর শোনে। -"মানুষের স্বাভব নিজের কথ চিন্তা করা।তুমি আপন হলেও ফাদিন উনাদের নিজের। "

মেঘের চোখের পাতা কাঁপল। -" আমার সাথেই এমন কেন?"

-" মাথা ঠান্ডা রাখো আব্বু। ভুলে যেও না ওটা তোমার বোনের শশুর বাড়ি।সিনক্রিয়েট করতে যেও না। আমি চাই না আমার আরেকটা বাচ্চাও আমাদের জন্য কষ্ট পাক।"

মেঘ তাচ্ছিল্যের সুরে শুধালো -" তুমি আমাকে এতো বোকা ভাবছো মা?তোমার ছেলে সত্যি এতো বোকা?"

-" আমি আমার ছেলেকে বোকা প্রমাণ করছি না। তবে আমি জানি আমার ছেলে রগচটা ধরনের। "

মেঘ মাহতিমা চৌধুরীর হাত নিজের মাথা থেকে সরিয়ে আনলো। মাহতিমা চৌধুরী মেঘকে উঠে দাড়াতে দেখে শুধালেন-" তানিশার পথদেখা ছেড়ে দাও।আমি আমার ছেলের জন্য এর চেয়ে মিষ্টি মেয়ে খুঁজে বের করবো। "

মেঘের কপালের রগ ভেসে উঠলো।কাঠের চেয়ারটায় লাথি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো। মাহতিমা চৌধুরী কেঁপে উঠলেন।হিমালয় মেঘকে শান্ত করা জন্য মুখ খুললো-" ভাই শান্ত হ.."

মেঘ হিমালয়কে মাঝ রাস্তায় থামিয়ে দিলো হাত উঁচিয়ে। -" নো মোর ওয়ার্ড'স। ওর থেকে ভালো আমার জন্য এই পৃথিবীতে আর কেউ আছে। এই শব্দ আর যেন শুনতে না হয় আমাকে। ওই আছে। ইহতেশাম চৌধুরী মেঘালয়ের জন্য ওর থেকে ভালো আর কেউ নেই।ও শুধু এই ইহতেশাম চৌধুরী মেঘালয়ের। মৃত মানুষটার কথার এমন হেরফের করার পরিণতিতেও ওকে ওদের আমাকে দিতে হবে। "

মাহতিমা চৌধুরী উঠে দাড়ালেন -" মেঘ!"

মেঘ শুনলো না। পিছু না ফিরেই সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। মাহতিমা চৌধুরী অসহায়ত্ব নিয়ে তাকালেন হিমালয়ের পানে-" আমার ছেলেটা পাগল হয়ে যাবে রে হিমু। ওর পিছু যা একটু। "

হিমালয় এসে মাহতিমা চৌধুরীর হাত ধরে বললো-" তুমিও এমন করলে চলবে আম্মু? শান্ত হও।"

-" আমার মেঘ রে হিমু।"

-" সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি খেয়াল রাখছি।"

চলবে..........

Loading spinner

Reply
Page 3 / 3
Share:

Loading spinner