গল্প : চিরচেনা অচেনা (০৫)

পর্ব:০৫

লেখনীতে:মিফতাহুল জান্নাত জেমিম

(ইশশ, আতিকার পরিবার-পরিচিতি তো ভালোভাবে দেওয়াই হলো না)

★সিদ্দিক বংশ—সমাজের সম্মানিত, প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অসংখ্য টানাপোড়েনে ভরা একটি পরিবার।
বহু প্রজন্মের ঐতিহ্য, বিশাল সম্পত্তি আর গোঁড়া মূল্যবোধের মাঝে বেড়ে উঠেছে আতিকা — ‘আয়রাতুল সিদ্দিক আতিকা’।

~’ওমাইরুর সিদ্দিক মাহার’, সিদ্দিক বংশের বড় নাতি, আতিকার বড় ভাইয়া। যে বর্তমানে আমেরিকার একটি মাইক্রোসফট অফিসে জব করে। আতিকা মাত্র পাঁচ বছরের থাকতেই তার বাবা মাহারকে আমেরিকার কোন এক বন্ধুর বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তখন মাহার ভাইয়ার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। সে ছিল আতিকার একমাত্র আশ্রয়স্থল। ছোটবেলায় বড় ভাইয়ার আদরে বড় হতে থাকা আতিকার জীবন থেকে, তার বাবা যখন একটা পারিবারিক ঝামেলার জন্য, তার মাহার ভাইয়াকেই বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, তখন থেকেই আতিকার তার বাবার প্রতি একরাশ বিরক্তি। যেটা আজও কাটেনি। হয়তো বাবা মেয়ের এই দূরত্ব সময়ের সাথে সাথে কেটে যেত। যদি আতিকার বাবা চেষ্টা করতো!!

আতিকার বাবা, ‘সাইফুদ্দিন সিদ্দিক’, তার জীবনের প্রথম শত্রু যেন। শৈশবে বাবার কাছ থেকে যে ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিল, তা সে কখনও পায়নি।
বিপরীতে বাবার কঠিন মনোভাব, অবহেলা, আর অকারণ দূরত্ব তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করেছে।
এই দূরত্ব আরও বেড়ে গিয়েছিল যেদিন তার বড় ভাইকে পরিবারের কাছ থেকে ছিঁড়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
আতিকার মনে বাবার জন্য জমে থাকা ক্ষোভ আর অপূর্ণতার পাহাড় আজও ঘুচে যায়নি।

আতিকার মা~ ‘রাহনুমা বিবি’। যার কারণে হয়তো এই বিষাক্তময় বাড়িতে আতিকা পড়ে আছে। ভদ্রমহিলা তার স্বামী-সংসার ছেড়ে কোথায়ও যেতে ইচ্ছুক না। আতিকার মা-বাবা পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন, তাই তার নানাবাড়ির কেউ বিয়েটা মেনে নেননি আজও। ফলস্বরূপ নানাবাড়ির কারো সাথে তাদের সম্পর্ক নেই। তবে তার মা সিদ্দিক বংশের আদর্শ বড় বৌমা হয়ে রয়ে গেছেন এই সিদ্দিক নীড়ে। সাথে একজন আদর্শ আর যত্নশীল মা হিসেবে ও।

মেজো আব্বু ~’মাইনুদ্দিন সিদ্দিক’, যিনি আতিকার বাবার সাথে ব্যাবসায়িক কাজ করে।
মেজো আম্মু এবং মেজো আব্বু — ছোটবেলার এক নিষ্পাপ সম্পর্ককেও যারা বিষিয়ে তুলেছিলো।
এখনও মেজো আম্মু আর মেজো আব্বুর দিকে তাকালেই আতিকার মনে অজানা এক বিরক্তি জন্মায়।
তবে সেই আদিয়ান ভাই— যে এখন বিদেশে পড়াশোনা শেষ করেছে — তার সাথে ছোটবেলার স্মৃতি এখনো মধুর। সে আজও আতিকার মনে একটা নরম কোণায় জায়গা জাগিয়ে রাখে, যদিও বাস্তবে দুজনের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে।
তুরিনকে ও আতিকা তার ছোট্ট বোনের মত স্নেহ করে আগলে রাখে। তাদের বাবা-মা এর সাথে আতিকার যতই মনোমালিন্য হোক না কেন!!

তবে, রঙিন আলো ঠিক অন্ধকারের মধ্যেও দেখা যায় —
আতিকার সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা তার ছোট আম্মু এবং ছোট আব্বু।
ছোট আব্বু, ‘নাঈমুদ্দিন সিদ্দিক’— এক নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসার, যিনি সততার আদর্শে জীবন কাটান।
আর ছোট আম্মু — নারীদের উন্নয়নে কাজ করা সাহসী এক নারী।
ওদের ভালোবাসা, স্নেহ আর বন্ধুত্বের স্পর্শে আতিকা খুঁজে পায় একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেবার জায়গা।
তাদের মধ্যেই আতিকা খুঁজে পায় আসল পরিবারের স্বাদ। আর তাদের সন্তান নকিব-নাজিয়া তো আছেই, যাদের সাথে আতিকার মিষ্টি খুনসুটি সবসময় চলে।

সিদ্দিক পরিবারের পরিবেশ রক্ষণশীল —
সবার মাঝে একধরনের অদৃশ্য দেয়াল —
ভদ্রতা আছে, সৌজন্য আছে, কিন্তু উষ্ণতার বড় অভাব।

আতিকার দাদা~’রহমান সিদ্দিক’, এক সময়ের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। রিটার্ন হওয়ার পর বড় দুই ছেলের ব্যাবসায় মনোনয়ন করেছেন। তিনি তার বড় নাতনিকে বড্ড ভালোবাসেন। দাদাজান বলে যে ডাকে মেয়েটা!

আতিকার দাদু — তিনিও আতিকাকে পছন্দ করেন না খুব একটা। কারণ আতিকা কখনোই অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেনি। নিজের আত্মমর্যাদার সাথে কখনো আপস করেনি। তার সহজ-সরল অথচ তীক্ষ্ণ উত্তরগুলো দাদুর অহংকারে বারবার কাঁটা হয়ে বিঁধেছে। নিজে মেয়ে হয়েও অন্য একটা মেয়ের এমন স্বাধীনচেতা মনোভাব তিনি পছন্দ করেন না।

আতিকার কোনো ফুফু নেই। বাবা-চাচা সবাই মিলে তিন জন। প্রত্যেকের আবার দুইটি করে ছেলে-মেয়ে।

~
এভাবেই…
একটা বিশাল বাড়ির ভেতরে আতিকা নিজেকে বারবার খুঁজে পায় একা। কিছু মানুষ ভালোবাসে, কিছু মানুষ ঘৃণা করে, আর কিছু মানুষ কেবল দেখেও কিছু বলে না…

কিন্তু আতিকা?
সে কারো কৃপা নিয়ে বাঁচে না। সে নিজের সাহসে, নিজের স্বপ্নে, নিজের পথ নিজে গড়ে নেয়।
________________________________________

রাত সাড়ে দশটা।
আজ পড়ানো শেষ করে আতিকা ছোট ভাই-বোনদের হাত ধুয়ে টেবিলে বসতে বলে।
ডাইনিং টেবিলে ভাত, ডাল, ভাজি আর মুরগির ঝোলের গন্ধে টেবিলটা ভরে গেছে।

ছোট ভাই-বোনরা হাসাহাসি করে নিজেদের জায়গায় বসে। আতিকার মা ও ছোট আম্মু খাবার পরিবেশন করছে। ছোট আব্বুও আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছেন, পুলিশের কাজের চাপ সামলে ক্লান্ত হলেও টেবিলে সবার সাথে হাসিমুখে বসেছেন।

আতিকার মা ভাত তুলে দিতে দিতে বললেন,
— “তুই দুপুরে ভাত খাসনি শুনলাম। এখন ভালো করে খা, পরিশ্রম করলে তো শরীর ঠিক রাখতে হবে।”
তার গলায় মমতার কঠিন শাসন মিশে থাকে।

ছোট আম্মু পাশে বসে মজা করে বলে,
— “আতিকা, এত কাজের মেয়ে হলে বিয়ে দিতে হবে দেখি একদম কষ্টের ছেলেকে!” টেবিলে সবাই হেসে ওঠে। আতিকা লজ্জায় হেসে মাথা নিচু করে ভাত মিশাতে থাকে।

ছোট আব্বু সিরিয়াস গলায় যোগ করে,
— “তবে একটা কথা মনে রাখিস, মা — নিজের পড়াশোনা আগে। কাজ করতে হবে ঠিক আছে, কিন্তু নিজের স্বপ্নের জায়গায় যেন কখনো ছাড় না দিস।”
তার কথায় সবার মুখে কিছুক্ষণ নরম নীরবতা নেমে আসে।

আতিকা মুখ তুলে চুপচাপ ছোট আব্বুর দিকে তাকায়। নিজের ভিতরে কোথাও একটা শক্তি অনুভব করে।

এদিকে আতিকার দাদা, যিনি সাধারণত বেশি কথা বলেন না, খাওয়া শুরু করতে করতে হঠাৎ বললেন,
— “মেয়েরা কষ্ট করে বড় হয়, এই সংসার টিকিয়ে রাখে। তবে নিজের সম্মান আগে বুঝতে শিখতে হয়।”
তার কঠিন অথচ দরদভরা কথায় আতিকা মনে মনে একটা সংকল্প করে বসে — নিজের মূল্যকে কখনো হারাতে দেবে না।

সবাই মিলে গল্প করতে করতে খাওয়া শেষ করে।
হাসি-ঠাট্টা আর মাঝেমধ্যে বড়দের নরম শাসনের মিশ্রণে রাতটা ঘরের ভেতর একটা শান্ত, নিরাপদ আবহ বানিয়ে দেয়।

****নিঃশব্দ রাত।
উঁচু দালানের ছাদে বসে আছে আতিকা।
চারপাশে নরম বাতাস, মাথার ওপরে একফালি চাঁদ… আর চারদিকে হালকা হলুদ আলো।

মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছে আতিকা।
মা তার চুলে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
কিছু বলা হচ্ছে না কারো, তবু যেন হাজারটা কথা বয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।

“আম্মু…” হঠাৎ ফিসফিস করে ডাকলো আতিকা।

“হু, মা?” মা নরম গলায় সাড়া দিলেন।

“সবাই কেন এত দূরের হয়, আম্মু?”
কথাটা বলার সময় আতিকা অনুভব করলো বুকের ভেতর একটা ভারী কষ্ট চেপে বসেছে।

মা একটু থেমে বললেন, “সবাই নিজের মতো করে ভালোবাসে, মা। কিছু মানুষ শব্দ দিয়ে বোঝাতে পারে না। কিছু মানুষ আবার চাইতেও জানে না।”

আতিকা চোখ বন্ধ করে ফেললো। মনে মনে ভেসে উঠলো বাবার কঠিন মুখ, মেজো আম্মুর ঠান্ডা দৃষ্টি, দাদুর নিরাসক্ত আচরণ।

“আমি কি কখনো কারো কাছে প্রিয় হতে পারবো না, আম্মু?” আতিকা ভাঙা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।

মা তার কপালে একটা নরম চুমু দিলেন।
“তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয়, মা। আর একদিন আসবে, যেদিন এই পৃথিবীর কেউ তোমার গর্ব হবে।”

আতিকা জানে, তার নিজের উপর ভরসা রাখতে হবে।
কারণ এই পৃথিবীতে, সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর হার না মানা, সেই ভালোবাসাকে নিজ হাতে গড়ে নিতে হয়।

ছাদের একপাশে একটা পুরনো চেয়ার পড়ে আছে।
আতিকা উঠে গিয়ে চেয়ারে বসে, আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখে এখন চাঁদের আলো পড়ে — মিষ্টি অথচ একরকম একাকী।

এই নিস্তব্ধতাই হঠাৎই আতিকা কয়েকদিন আগের একটা তিক্ত ঘটনা মনে পড়ে গেল।

সেদিন বিকেলে,,,,

মেঝ আম্মু তুরিনকে বাড়ির কাজে সাহায্য না করার কারণে বকা দিচ্ছিল। আতিকা রান্নাঘরের কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল তখন। কিন্তু মেঝ আম্মুর এমন অকথ্য ভাষা আর শুনতে না পেরে সে বলে উঠলো,
“তুরি তো সবেমাত্র কলেজ থেকে এসেছে, ওকে একটু রেস্ট নিতে দিন। সারাদিন কলেজ, কোচিং, প্র্যাকটিক্যাল এসবের মধ্যে দিন যায় ওর। সামনে আরো এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার পর না হয় বাড়ির কাজে সাহায্য করবে তুরি। আমাকে বলুন না কি করতে হবে!”

মেজো আম্মুর গলা একদম ঠান্ডা — তবুও যেন খাঁচার মতো জব্দ করে রাখে আতিকাকে।
“এসব পড়াশোনা করেই তো তুমি বরবাদ হয়ে গিয়েছো, আতিকা! বড়দের মুখে মুখে কথা বলা শিখেছো! আমার মেয়েকে কি আমি এমন বানাবো? মা-মেয়ের মাঝে কথা বলতে এসো না। যাও, নিজের পথ দেখো।”

উনার কথা শুনে আতিকার খারাপ লাগল। তবুও সে গলার স্বর নিচু করে মেঝ আম্মুকে বুঝাতে বলল,
“আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, তুরি ক্লান্ত। ও এখন কিভাবে বাড়ির কাজে সাহায্য করবে? তাছাড়া ওর অনেক পড়া জমে আছে। আমি ওকে পড়াই, আমি জানি ওর গ্যাপটা কোথায়! অনেক প্র্যাকটিস বাকি আছে ওর”

“এই মেয়ের তো কোনো কৃতজ্ঞতাই নেই। মুখে মুখে কথা বলে। ছোটরা এভাবে বড়দের সাথে কথা বলে? তোমাকে তোমার মা কিছু বলে না বলে যে, আমিও আমার মেয়েকে কিছু বলবো না এমনটা কিন্তু ভেবো না, আতিকা!”—মেজো আম্মু এক প্রকার বিরক্তির সাথে চিৎকার করে বলেন।

আতিকার গলা শুকিয়ে আসে। সে ওভাবে কিছু বলতে চায়নি, শুধু তুরিনের দিকটা বুঝাতে চেয়েছিল। তবুও মেজো আম্মু এমনভাবে সবার সামনে কথা তুললেন যেন সে অপরাধী। মেজো আব্বুও পাশে বসে, ঠোঁটের কোণে একটা অদৃশ্য বিরক্তি নিয়ে চুপ করে থাকলেন।
কেউ ওর হয়ে কিছু বললো না।

একটা সময় আতিকা খুব ছোট ছিল।
তখন সে ভেবেছিল, এরা সবাই ওর আপন।
কিন্তু আজ এই রুক্ষ চোখগুলোর মাঝে দাঁড়িয়ে সে অনুভব করলো — আপন কখনও এমন করে কাঁটার মতো কথা ছুঁড়ে দেয় না।

দাদু পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন।
একবারও তাকালেন না আতিকার দিকে।
শুধু ফিসফিস করে বললেন, “এই মেয়ে তো কখনও বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে না।”

আতিকার বুকের মধ্যে কেমন একটা ভেঙে পড়া শব্দ হলো। চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি এসে আটকে রইলো। সে মুছে ফেললো পানিটুকু। আতিকা ভেবেই নিলো — কারো কাছে আর ভেঙে পড়বে না সে। কারণ কারো দয়া নয়, সে নিজের স্বপ্নের জন্য বাঁচবে।
________________________________________

টেবিলে চুপচাপ খাচ্ছিল সবাই।
শুধু আইরিন একটু একটু করে ফিসফিস করে বলল,
“ভাইয়া… তুমি আবার কবে গিটার বাজাবে? আগেরবার তো খুব সুন্দর বাজিয়েছিলে!”

শিহাব মৃদু হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল,
“দেখি, রে। মন ভালো থাকলে আবার বাজাব।”

আইরিন নাক সিঁটকালো, “মন খারাপ কেন ভাইয়া? আবার সেই… আতিকা আপুর জন্য?”

শিহাব একটু চমকে গেল।
মাথা নিচু করে বলল, “সব বুঝিস তুই?”

আইরিন হেসে ফেলল, “আমি তো ভাইয়ার হার্টের একদম ভেতরটা জানি!”

শিহাব মুচকি হাসলো। এই ছোট্ট বোনটাই বুঝি পুরো পৃথিবীর মাঝে ওর সবচেয়ে আপন মানুষ।

গতকালই শিহাবের আনমনা ব্যাবহার দেখে আইরিন একপ্রকার জোর করেই তার ভাইয়ার কাছ থেকে আতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছে। আইরিন তো রীতিমতো বায়না ধরেছে আতিকাকে দেখার জন্য। এদিকে শিহাব ও আইরিনকে কিছু শেয়ার না করে থাকতে পারে না। মেয়েটা এত জেদী!!

***রাতে বিছানায় শুয়ে শিহাব তাকিয়ে থাকল সাদা ছাদের দিকে। আতিকার মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে। ওর নরম অথচ শক্ত আত্মসম্মানী চোখদুটো,
ওর চুপচাপ হেঁটে চলার ভঙ্গি, ওর কষ্ট চেপে রাখা মুখ — সবকিছু শিহাবকে ব্যথা দেয়।

নিজের অজান্তেই শিহাবের মনে কথা ভাসে —
“তুমি কি কখনো বুঝবে আতিকা…কতটা গভীরে তোমাকে আপন মনে করে ফেলেছি আমি?”

পাশের ঘর থেকে ফুফির কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে দোয়া পড়ার শব্দ আসছে। সারা বাড়িতে যেন এক নিঃশব্দ আবরণ নেমে এসেছে। শুধু শিহাবের বুকের ভেতর — ভালোবাসার আর ব্যথার এক গভীর সমুদ্র হাহাকার করে বাজছে।
________________________________________

হঠাৎই আজও আবার আদিয়ান ভাইয়ের কল এসেছে আতিকার ফোনে। আতিকা কাঁপা কাঁপা হাতে রিসিভ করে কলটা, এই মানুষটার প্রতি আতিকার অদ্ভুত টান কাজ করে!!
…কিন্তু কারও সামনে তা কখনও প্রকাশ করেনি। নিজের ভেতরেই এক অসম্পূর্ণ অনুভূতির মতো জমিয়ে রেখেছে এতদিন ধরে।

ফর্মালিটিমূলক কথাবার্তার এক পর্যায়ে আদি বলে উঠল,

— “ক্লান্ত লাগছে তোর গলায়, আতিকা”।
— “হ্যাঁ আদিয়ান ভাই… দিনগুলো একটু কঠিন যাচ্ছে,” আতিকা স্বীকার করল চুপচাপ।

ওপাশ থেকে আদিয়ান খানিক চুপ থেকে বলল, —”কঠিন সময়ের মানে হলো, তুই বড় হচ্ছিস। শুধু মনে রাখিস, শক্ত থাকবি। তুই যেমন লড়াই করিস, অনেকেই পারে না। আমি গর্বিত তোর জন্য।”

আতিকার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। এই কদিনের বিষণ্নতা, কষ্ট — যেন কেউ বুঝে ফেলল এক মুহূর্তেই। চোখ বেয়ে নরম অশ্রু গড়িয়ে নামতে চাইল, কিন্তু সে দ্রুত গালটা মুছে নিল।

— “আদিয়ান ভাই…” আতিকা একটুকরো কাঁপা স্বরে বলল।
— “হ্যাঁ, বল?”
— “সবকিছু পার করার জন্য দোয়া করো, প্লিজ…”

ওপাশের মানুষটা যেন মৃদু হাসলো। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল, — “আমি সবসময় তোর জন্য দোয়া করি আতিকা। তুই কখনো একা না।”

—”তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, সাবধানে।”

—”আচ্ছা, আচ্ছা। আসব। তার আগে একটা কাজ করতে হবে তোকে।”

—”কি কাজ??”

—”কাল সকাল সাতটায় তোর মোবাইল থেকে একটা কল দিবি, হলরূমে গিয়ে। বাড়ির সবার সাথে একটা কথা আছে আমার।”

—”আচ্ছা দিব। তার আগে আমি একটা কথা বলি তোমাকে??”

ফোনের ওপাশ থেকে কোন শব্দ নেই। আদিয়ান খানিক্ষণ ধরে চুপ থেকে বলল-
—”বল না কী বলবি, তুই তো এমনিতেও নিজ থেকে আমার সাথে কথা বলতে আসিস না। আজকে তাই মানা ও করবো না।”

—”শুভ জন্মদিন। জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। তোমার জীবনের সকল ইচ্ছে পূরণ হোক, আমীন। আর হ্যাঁ, আমি তোমার সাথে কথা বলতামই। শুধু রাত বারোটা বাজার অপেক্ষায় ছিলাম।”

—”মনে আছে তাহলে। যাক অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আতিকা আপা। এখন ট্রিট খুঁজে লজ্জা দিবেন না প্লিজ। দেশে ফিরে দিব।”

—”ঠিক আছে তবে আমি রাখি। সকালে উঠতে হবে।”

—”হুম, যা ঘুমা। গুড নাইট।

কল কেটে গেল। আর এদিকে আতিকার ঠোঁটে নরম একটা হাসি ফুটে উঠল।

অনেকদিন পর মনে হলো, বুকের কোনো ভারী পাথর একটু নড়ে উঠেছে। অনেকদিন পর মনে হলো, কেউ আবার তার জন্য প্রার্থনা করছে। আর আতিকা জানে, কারও নিঃশব্দ প্রার্থনাও হয়তো একদিন তাকে আকাশ ছোঁয়াবে…

আতিকা চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল। শহরের নরম বাতাস জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল। ঘরটা হালকা একটা শান্তিতে ভরে উঠল। মনে মনে ঠিক করে নিল, কাল শুক্রবার। সে শাড়ি পরবে, তার আদিয়ান ভাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে। আর সোহাকে নিয়ে ঘুরতে বের হবে। এমনিতেও মেয়েটার মন খারাপ। যদি একটু ভালো করা যায় আর কি!!

চলবে….

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x