Golpo:Sherpodda(01)

“মানুষের চোখের মণি ছিঁ”ড়ে নেওয়ার সময় ঠিক কেমন শব্দ হয়, তা জানিস মেয়ে? তুই যখন চিৎকার করিস, তখন তোর এই ডাগর চোখ দুটো দেখতে বড্ড মায়াবী লাগে রে। কিন্তু অপলক চেয়ে থাকা ওই মণি দুটো যখন স্থির হয়ে যায়, তখন সেই রূপ যেন আরও খোলতাই হয়। কী অপরূপ! কী ঘোর!”

কুৎসিত, বিকৃ”ত একটা হাসির শব্দে শাহপুরের নিঝুম, অন্ধকার জঙ্গলটার বুক কেঁপে উঠল। রাত তখন কত, তা পরিমাপ করার মতো কোনো ঘড়ি সেখানে ছিল না, তবে প্রকৃতির নীরবতা জানান দিচ্ছিল সময়টা মধ্যরাত পেরিয়ে এক অপার্থিব প্রহরে রূপ নিয়েছে। ঘন বাঁশঝাড় আর প্রাচীন বটবৃক্ষের ডালপালা ভেদ করে চাঁদের আলোও পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির ভাঙা ছাদ গলে ভেতরে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছিল। চারদিকের স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে কালচে শ্যাওলার গন্ধ, আর তার সাথে মিশে ছিল এক তীব্র, ভ্যাপসা রক্তের ঘ্রাণ।

ঘরের ঠিক মাঝখানে ছাদ থেকে ঝুলছে একটি টিমটিমে লণ্ঠন। সেই লণ্ঠনের হলদেটে, কাঁপা কাঁপা আলোয় এক পৈশাচিক ছায়া দেওয়ালে দীর্ঘায়িত হচ্ছিল। কাঠের একটা জীর্ণ চেয়ারে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে তেরো-চৌদ্দ বছরের এক কিশোরী। তার ফর্সা মুখখানিতে ভয়ের এমন এক গাঢ় নীল রং লেপ্টে আছে, যা দেখলে যে কোনো পাষাণ হৃদয়েও কম্পন ধরে যাবে। মেয়েটির সারা শরীর কাঁপছে। ঠোঁট দুটি বোবা কান্নায় থরথর করে নড়ছে, কিন্তু চিৎকার করার সাধ্য তার নেই; মুখের ভেতর কাপড়ের এক বিরাট দলা শক্ত করে গুঁজে দেওয়া। চোখ দুটি থেকে অশ্রুর ধারা নেমে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জংধরা চেয়ারের হাতলে।

তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ অবয়ব। ঘুটঘুটে অন্ধকারের কারণে তার অবয়বের কোনো স্পষ্ট আকৃতি চেনা দায়, শুধু লণ্ঠনের আলোয় তার হাতের ধারালো ছুরি”টা চকচক করে উঠছে। পুরুষটির নিঃশ্বাস ছিল অস্বাভাবিক রকমের শান্ত এবং ধীর। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো উত্তেজনা নেই; যেন সে কোনো পবিত্র উপাসনায় বসেছে।

সে আলতো করে তার বাঁ হাতটি বাড়িয়ে দিল কিশোরীর মাথার দিকে। পরম মমতায়, অতি সন্তর্পণে সে মেয়েটির দীর্ঘ, রেশমি চুলগুলোর ওপর হাত বুলাতে লাগল। তার আঙুলের ছোঁয়ায় মেয়েটি আতঙ্কে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।

পুরুষটির কণ্ঠে তখন এক আদিম, বিকৃত তৃপ্তি। সে ফিসফিসিয়ে নিজের মনেই বলতে লাগল,

“আহা! ঠিক যেন রেশমের সুতো। এত দীর্ঘ, এত ঘন কৃষ্ণবর্ণের চুল তো সচরাচর দেখা যায় না। এই চুলে যখন আলো পড়ে, তখন মনে হয় যেন অমাবস্যার রাতটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই রূপ কি মাটির নিচে পচে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে? না, কখনই না। একে তো যত্ন করে সংরক্ষণ করতে হবে।”

কথাটি শেষ হতেই তার হাতের ধারালো ছুরিটি এক ঝটকায় মেয়েটির মাথার ত্বকের ওপর বসে গেল। তীব্র ব্যথায় কিশোরীর চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। মুখের ভেতরের কাপড়ের দলা ভেদ করে এক অমানুষিক, অবরুদ্ধ গোঙানির শব্দ ঘরের দেওয়ালে বাড়ি খেয়ে ফিরে এল। কিন্তু সেই পিশাচের হাত কাঁপল না। অত্যন্ত দক্ষ কোনো কারিগরের মতো সে নিখুঁতভাবে মেয়েটির মাথার চামড়াসহ সেই দীর্ঘ চুলের গোছাটি কেটে আলাদা করতে লাগল। তাজা রক্ত ছিটকে এসে পড়ল পুরুষটির গায়, তার মুখের কিছু অংশে, কিন্তু সে এক ফোঁটা রক্তও অপচয় হতে দিতে চাইল না। অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে সে নিজের জিভ দিয়ে ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা সেই গরম রক্তটুকু চেটে নিল।

মাথার চামড়া ও চুল আলতো করে পাশে রাখা একটি কাঠের টেবিলের ওপর বিছিয়ে রাখল সে। সেখানে আগে থেকেই সাজানো আছে আরও কিছু কাচের বয়াম এবং শুকনো চামড়ার টুকরো।
পিশাচটি এখানেই থামল না। সে আবার ঘুরে দাঁড়াল কিশোরীটির সামনে। মেয়েটি তখন যন্ত্রণার শেষ সীমানায় পৌঁছে অর্ধমৃত, তার মাথা থেকে রক্তের বন্যা বয়ে গিয়ে মেঝেতে এক ছোটখাটো পুষ্করিণী তৈরি করেছে। লণ্ঠনের আলোয় মেয়েটির বড় বড়, মায়াবী চোখ দুটির দিকে তাকাল সে। ওই চোখের মণি দুটো যেন সাগরের নীল পানির মতো টলটল করছে, যা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে।

পিশাচের ঠোঁটের কোণায় আবার হিংস্র হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে মেয়েটির থুতনিটা উঁচিয়ে ধরল। তার কণ্ঠস্বর এবার আরও খাদের দিকে নেমে গেল,

“এই চোখ! এই চোখ দুটো বড় মারাত্মক। এমন সুন্দর অক্ষিগোলক আমি হাতছাড়া করি কী করে? আমার কাচের বয়ামটা বড্ড শূন্য দেখায়। তোমার এই চোখ দুটো ওখানে বেশ মানাবে।”

বলামাত্রই কোনো দয়ামায়া ছাড়া, অত্যন্ত নৃশং”সভাবে সে তার হাতের অস্ত্র”টি মেয়েটির চোখের কোটরে ঢুকিয়ে দিল। ঘরের কোণায় থাকা একটা রাতচরা পাখি তীব্র ভয়ে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল দূর আকাশে। প্রকৃতির বুক চিরে যেন এক অদৃশ্য হাহাকার নেমে এল। পিশাচটি পরম যত্নে সেই সুন্দর চোখ দুটি উপড়ে এনে আলোয় ধরে দেখল। তার চোখে তখন কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো ভয় নেই… আছে কেবল এক তীব্র, মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

সে চোখ দুটিকে এনে একটি তরলপূর্ণ কাচের বয়ামে ডুবিয়ে দিল। বয়ামের ভেতর আরও কয়েকটি জোড়া চোখ ভাসছিল। সে পরম তৃপ্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রক্তাক্ত হাত দুটি সুতির কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে অন্ধকারের মিশে গেল। শাহপুরের মানুষ সকালে উঠে হয়তো আরেকটি নিখোঁজ সংবাদের মুখোমুখি হবে, কিন্তু এই নিঝুম জঙ্গলের ভেতরের পৈ”শাচিক সত্যটা ঢাকা পড়ে রইল এক গভীর, জমাট বাঁধা রহস্যের চাদরে।

<><><><><><><><><>

বাংলাদেশর বৃহত্তম নদী পদ্মা। তার পাড় বেয়ে গড়ে উঠেছে কত সভ্যতা! কালের পরিক্রমায় তা হয়ে উঠেছে একেকটি গ্ৰাম, কয়েকটি পাড় এখনো ঘন জঙ্গলে আবৃত। তবে নদীর পানি আজ অচেনা তীব্রতায় কেঁপে উঠছিল, যেন কোন গোপন সঙ্কেত দিতে চায়! নদীর তীরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল ভীতিকর নীরবতায়, এবং সেই নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অজানা কোন গল্প।

পদ্মা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠা এক গ্ৰাম–শাহপুর, রাজশাহী জেলা। গ্ৰামের মাঝদিকে মাঠের বুকে ছড়িয়ে থাকা ধানের সবুজ সমুদ্রের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাটির ঘর। দেয়ালগুলো কাদামাটির মিশ্রণে তৈরি। ছাদ খড়ের স্তর দিয়ে মোড়া, মাঝে মাঝে হাওয়ার দাপটে খড়গুলো নরমভাবে দুলতে আছে। ঘরের সামনে এক বাঁশের বারান্দা। বাড়ির উঠোনের দিকের ছোট কাঠের জানালার খাঁচা দিয়ে বাইরের অল্প আলো ভেতরে আসে।

বাড়িটি ‘বায়েজিদ হায়দার’ নামক এক গ্ৰাম সরকার কর্মচারীর। তিন কন্যার জনক বায়েজিদ বাবু। মহামারী কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী মারা গিয়েছে বছর দশেক হলো। ওনার স্ত্রী পারুল মারা যাওয়ার পর তিন মেয়েকে সামলাতে তেমন ভোগান্তি পোহাতে হয় নি ওনার। বড় মেয়ে পদ্মিনী হায়দার’ই বাকি দু’মেয়ে চিত্রানী হায়দার এবং তারিনী হায়দার’কে মায়ের মতো স্নেহ-মমতায় বড় করেছে। তবে পদ্মিনীর ব্যাবহারে তার কোন অনুভূতিই যেন প্রকাশ পায় না! যদিও কিছুটা প্রকাশ ও পায়, তা হলো পদ্মিনীর গাম্ভীর্য মিশ্রিত শাসন!

বায়েজিদ আলম এর বাড়ির উঠোনে দুপুরটা থেমে আছে যেন। রোদটা আর তেমন চড়া নেই, কিন্তু তার উষ্ণতা মাটির গায়ে এখনো লেগে আছে। উঠোনের ধারে আম গাছের ছায়া কাঁপছে হালকা হাওয়ায়। রান্নাঘরের দিক থেকে মশলার গন্ধে ঘর ভরে আছে। জিরা, পেঁয়াজ, আর ভাজা মরিচের তীব্র ঘ্রাণে দুপুরটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে।

চুলার সামনে বসে পদ্মা। তার কপালে ঘামের বিন্দু চিকচিক করছে, গায়ের লালচে সেলোয়ারটা ধোঁয়া আর মশলার দাগে ধূসর হয়ে গেছে। চুলার আগুনে চোখ আধভেজা, কিন্তু মুখশ্রী শান্ত-নির্লিপ্ত!

এমন সময় বাইরে থেকে ছুটে আসে তাড়াহুড়ো পায়ের শব্দ। মাঠে খেলতে গিয়ে বাবার চোখে ধরা পড়ার ভয়ে, বাড়ির পেছন দিয়ে ছুটে এসেছে তারা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। চুলোর পাশে থাকা স্টিলের জগ থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিলো সে‌। ভদ্রতার সহিত গ্লাসে ঢেলে খাবে, এটাও যেন তার ভাবনাতীত। তারার এমন কাজকর্মে পদ্মার রাগ উঠলেও সে নিজেকে সংযত করে নেয়। ওদিকে হাঁসফাঁস করতে থাকা তারা বলতে থাকে,

—”আপাই, আব্বা আইতেছে রে! চৌরাস্তার মোড়ে দেখছি। তোর রান্ধন শেষ হইছে নি?”

খুন্তি হাতে চমকে তাকালো পদ্মা। পরক্ষনেই ব্যাস্ত হয়ে বলল,
—”রান্না শেষের দিকে! তুই আব্বা আসলে ওনাকে মুখ হাত ধুয়ে ফেলতে বলবি!”

বাইরের উঠোনে এখন যেন খুশির স্রোত বয়ে গেল। গাছের নিচে একটা পাখি ডাকছে টুংটুং করে। গাছতলায় বসে চিত্রা তার মাথায় তেল দিচ্ছিল। বায়েজিদ বাবু আসার খবর পেয়ে তেল দেওয়া ভুলে সে পদ্মার কাছে এসে উল্লাসিত গলায় বলল,
—”আপাই, আমি না হয় চৌকি তে ভাত তরকারি রেখে আসি?”

চুলোয় আঁচ বাড়িয়ে দিতে দিতে পদ্মা বলল,
—”কয়েকটা শশার ফালি ও নিয়ে যাস তো। আব্বা শশা ছাড়া ভাত খেতে পারে না!”

ইতোমধ্যে বাড়িতে পা রাখেন বায়েজিদ হায়দার। ওনার সাদা পাঞ্জাবির পকেটে থাকা কয়েকটা লজেন্স তারা’র হাতে দিলেন, চিত্রার জন্য কয়েকটা অবশিষ্ট ও রাখলেন। পদ্মার এসব লজেন্স খাওয়ার ইচ্ছে করে না আর। তার কাছে এসব অহেতুক টাকা খরচ করা ছাড়া কিছুই না।

হাতমুখ ধুয়ে চৌকিতে বসতে বসতে বায়েজিদ বললেন,
—”বাড়িটা কত চুপচাপ থাকে সারাদিন। আর আমি বাড়িতে এলেই মনে হয়, নির্বাচনের সময় এসেছে। এতো শোরগোল করিস তোরা!”

তরকারির বাটি রেখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে, চিত্রা তার বাবার হাত থেকে লজেন্স নিল। মুখের ভেতর তৎক্ষণাৎ একটা ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
—”নির্বাচন না আব্বা, ঈদ এসেছে মতো লাগে আপনি আসলে!”

চিত্রার কথার পিঠে পিঠে তারাও বলে উঠলো,
—”ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি!
আব্বা, আমরা আপনারে অনেক ভালাবাসি!”

চিত্রার আছে এক বাজে স্বভাব। একে বলা যায়, খুঁতখুঁতে স্বভাব। তার স্বাভাবিকভাবে কিছু হতে দিতে বা বলতে মোটেও ইচ্ছে করেনা। মেজো মেয়ে হয়েও সে সবসময় তারার পেছনে লেগে থাকে। এই যে এখন সে তারাকে ক্ষেপাতে বায়েজিদ বাবুকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—”আব্বা, তারা কে বাড়ির বাইরে পা দিতে দেওয়া যাবে না আর! দেখেছেন, কথার ধরন কেমন হয়ে গেছে!”

তবে তারার এসব শুনে মোটেও রাগ হয় না। সে ঠোঁট কামড়ে একচোট হাসে, চোখে দুষ্টুমি নিয়ে বলে,
—”গ্ৰামের মাইয়্যা আমি, কতা তো এমনই অইবো!”

পদ্মা রান্নাঘরের দিক থেকে আসছিল বাকি তরকারি নিয়ে। চিত্রা, তারার কথা কাটাকাটি বন্ধ করতে সে শাসনের সুরে বলে,
—”চিত্রা, তারা! আব্বা খেতে বসেছে দেখছিস না?”

বায়েজিদ তার তিন মেয়েকে দেখে মৃদু হাসেন।
—”পদ্মা মা, ওদের আর বকিস না। ছোট মানুষ, এই বয়সেই তো এমন করবে!”

—”ছোট মানুষ বলে বলে আর লাই দিবেন না আব্বা। ওরা যে কি কি করে বেড়ায়, আপনি শুনলে কানে তালা ঝুলিয়ে রাখবেন।”_চাপা রাগে বললো পদ্মা।

বায়েজিদ তার গোঁফে হাত বুলিয়ে হেসে ফেলেন। পদ্মাকে দেখলেই ওনার পারুল বিবির কথা মনে পড়ে। দেখতে অবিকল মায়ের মতো হয়েছে পদ্মা। পাতলা গড়নের মাঝারি উচ্চতার মেয়ে পদ্মা, গায়ের রং উজ্জল শ্যামলা। তার গায়ের রং পদ্মফুলের মতো শুভ্র নয়। কেবল পারুল নদী ভালোবাসেন বলে শখ করে মেয়ের নাম দিয়েছিল পদ্মা। তবে পদ্মিনীর বিচার বিবেচনা পুরোটাই মিলে যায় তার বাবার সঙ্গে। তার বাবার মতো বিচক্ষণ সে। দুহাতে দুই বোনের সাথে সাথে পড়ালেখা আর সংসার সামলাচ্ছে পদ্মা। বাড়িতে পদ্মার পদমর্যাদা বায়েজিদ বাবুর পরেই!

বায়েজিদ এবার খানিকটা গলা ঝেড়ে গর্বের সহিত বললেন,
—”আমার পদ্মা মা আছে ওদের সামলানোর জন্য। এই সুবাদে কানটা রক্ষে পেল। কি বলিস রে মায়েরা?”

তারা-চিত্রা একসাথে হেসে ওঠে। দুজনের খুশি কে দেখে! তাদের কাছে বায়েজিদ বাবু গ্ৰামের সবচেয়ে ভালো বাবা। চিত্রা এবার খুশিতে গদগদ হয়ে পদ্মাকে বললো,
—”আপাই, যত চেষ্টাই করোনা কেন, আমাদের নামে আব্বার কান ভারী করতে পারবে না। হি হি!”

তখন হঠাৎ বায়েজিদ এর চোখে গাম্ভীর্য নামে, কণ্ঠ একটু নিচু হয়ে যায়। বাড়ি ফেরার পথে যে অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখেছিলেন, তা মনে পড়ে পড়তেই আশঙ্কায় ছেয়ে উঠে ওনার মুখশ্রী। তিনি বেশ রাশভারী গলায় চিত্রার উদ্দেশ্য বলেন,
—”চিত্রা মা, মজিদ চাচার বাড়িতে দুপুরের সময়ে না যাওয়ার চেষ্টা করবি।”

চিত্রা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। ওদিকে খুন্তি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পদ্মা যেন আগেই কিছু বুঝে ফেলে। তার ও কেমন গা ছমছম করতে লাগলো।

বায়েজিদ তার কথা এগুতে লাগলেন,
—”আমি একেবারেই যেতে মানা করিনি। কিন্তু সবসময় ও যেতে বলিনি। বাবার কাছে ছোট থাকলেও সমাজের কাছে তো বড় হচ্ছিস তুই। ও বাড়িতে জোয়ান ছেলে আছে। আশা করি আর কিছু বলতে হবেনা আমার!”

এবার বায়েজিদ খেতে খেতে পাশে বসা তারার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান। তারা বুঝে যায়, এবার জ্ঞানের বাণী শোনার পালা তার। শুকনো একটা ঢোক গিলে সে বায়েজিদ এর কথা শুনতে লাগলো,
—”তারা, তোমার দলবলের সাথে বিকেলে দেখা করবি। সন্ধ্যার আগে বাড়ি চলে আসবি। পদ্মার যেন ডাকতে যেতে না হয়। আর, বাড়ির সবাই যেভাবে কথা বলে, সেভাবে কথা বলার চেষ্টা কর। নিশ্চয়ই আমরা গ্ৰামের মানুষ, তবে শুদ্ধ ভাষায় ও কথা চাই। ঠিক বললাম তো?”

তারা মৃদু মাথা নাড়ে, চোখ নামিয়ে ফেলে। পদ্মা পাশ ফিরে দাঁড়ায়, তার চোখে অদৃশ্য এক আশঙ্কা। যেন বায়েজিদ বাবুর আগাম সতর্কবাণী তাকে চিন্তিত করছে! বায়েজিদ তখন তার তিন মেয়ের দিকে তাকালেন। বড় বোনকে উপদেশমূলক কথা না বলায় নিশ্চয়ই ছোট দুই বোনের খারাপ লাগতে পারে। তাই তিনি নরম গলায় বলেন,

—”তোদের আপাইয়ের জাররা পরিমাণ ভুল ও আমার চোখে পড়েনি। সে পারুলের মেয়ে, ভুলত্রুটি তাকে ছুঁতে গিয়েও গড়িয়ে পড়ে।”

একটু থেমে নিঃশ্বাস টেনে নেন তিনি, তারপর খুব আস্তে বলেন,
—”তোরা আমার কাছে পারুলের দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান আমানত। যতদিন না পর্যন্ত তোদের যোগ্য মানুষের হাতে তুলে দিতে পারছি, আমার মরার খুব ভয় হয়। আমি না থাকলে তোদের তিন বোনকে কে দেখবে রে মা?”

তিন বোনের বুকের ভেতর কেমন একটা ঠাস করে ওঠে। চিত্রার কণ্ঠ ভেঙে আসে। সে গোঙানির মত করে বলল,
—”আব্বা, আপনি এভাবে বলছেন কেন? আমি এবার কান্না করে দিবো।”

তারাও ঝট করে বলে ওঠল,
—”হ আব্বা, আপনি এইসব কতা বাদ দেন।”

বায়েজিদ তাকান দূরের দিকে, আম গাছের ফাঁকে দুপুরের আলো ঢলে পড়ছে। ওনার খাওয়া ও প্রায় শেষের দিকে। তিনি পানি খেয়ে আবারো নিজের কথা বলতে লাগলেন। আর ওনার তিন মেয়ে আশঙ্কায় থেকে শুনতে লাগলো,

—”এই গ্ৰাম তো আর সুবিধার না রে মা! আমার বাপের ভিটা ছেড়ে যাওয়ার মতো ও কোন জায়গা নেই। যদি পারতাম, তবে তোদের তিন বোনকে আমার কলিজার ভেতর ঢুকাই রাখতাম। আমার মেয়েগুলোর দিকে কোন শুয়োরের বাচ্চা ও চোখ দিতে পারতো না! কিন্তু আমি বড় অপারগ। তোদের চিন্তায় রাতে ঘুম ও হয় না!”

তখনই উঠোনের দরজা থেকে ফিরোজ মিয়া চিৎকার করে বলতে লাগলো,
—”ও বাজিদ ভাই? আইয়্যা পড়েন। আর কত খাইবেন?”

শেষ লোকমাটা মুখে নিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেন বায়েজিদ বাবু। এখন আবারো তাকে গ্ৰাম সরকার বাড়ি- শাহকুঞ্জ এ যেতে হবে। খেতে এসেও একটু জিরিয়ে নিবে, এই ফুরসৎ ও নেই ওনার। সরকার বাড়ির আরেক কর্মচারী ফিরোজ মিয়া হাজির। নিশ্চয়ই হিসেব নিকেশ এ সুলাইমান বাবু কোন গন্ডগোল করেছেন। বেছে বেছে এই কর্মই যে কেন মিললো বায়েজিদ এর, এ নিয়ে ওনার বড় আফসোস।

তিনি খানিকটা এগিয়ে ফিরোজ এর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
—”তুমি আমার নামটা ঠিক করে ডাকো বাজান। বায়েজিদ আমার নাম!”

সহজ সরল এক হাসি দে ফিরোজ মিয়া। মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই তিনি বললেন,
—”আন্নের মতো পড়ালেহা করিনাই ভাই‌। মুখ দিয়া এতো সুন্দর কথা বাইর অয় না।”

হতাশার এক শ্বাস ফেললেন বায়েজিদ হায়দার। পেছন ফিরে একবার ওনার তিন মেয়েকে দেখে নেন। অতঃপর সাবধানতার সাথে আদেশ করলেন,
—”পদ্মা, চিত্রা, তারা! বিকেলের আগে বাড়ির দরজা যাতে না খুলে! আমি সরকার বাড়ি গেলাম।”

বায়েজিদ এর পায়ের শব্দ মাটির উপর মিলিয়ে যায়। চিত্রা-তারা ও বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়। পদ্মা খানিকটা এগিয়ে এসে দরজার কপাট টেনে দেয়। চারদিকের হাওয়া নিঃশব্দ হয়ে পড়ে, শুধু হাঁড়ির ভেতর ফুটন্ত ঝোলের বুদবুদগুলো তখনও টগবগ করছে।

<><><><><><><><><>

বিকেলের রোদটা তখন নিস্তেজ হয়ে এসেছে। গাছের ডালে ডালে পাখিরা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড়পুকুরের পানি নড়ছে হাওয়ার ছোঁয়ায়, কিন্তু তার মাঝখানে অদ্ভুত এক বুদবুদ ওঠানামা করছে। পাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে আছে মতিন, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে।.

তার গলা কেঁপে উঠল। কপালে ঘাম জমেছে। পুকুরের জল যেন তার বুকের ভেতর দাপাচ্ছে।
—”ভাইজান উইঠা আসেন। এইবার তো মইরা যাইবেন!”

মতিন আবারো চিৎকার দিলো,
—”ও ভাইজান, আপনের আর রেকড করা লাগতো না। দয়া কইরা উইঠা আসেন।”

তার চিৎকারে পাশের একজন কৃষক দৌড়ে এলো। সে হন্তদন্ত হয়ে বলল,
—”কি হইছে রে মতিন? এমন চিল্লাফাল্লা করোস কেন?”

মতিন কাঁপা গলায় পুকুরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে,
—”ওই যে দেহেন, বড়পুকুরের মাঝখানটাই বুদবুদ হইচ্ছে। ওইহানে আমার ভাইজান আছে। ওনারে ডাকতাছি, ওনি উঠতেছেন না ক্যান? ভাইজান কি ইন্নালিল্লাহ হই গেল নাকি? ও আল্লাহ! মোড়ল বাবায় তো আমারে জ্যান্ত পুঁতে মারবে!”

তবে সেই কৃষক আর দাঁড়ালো না। সে জানে, এখানে কথা বাড়ানো মানেই তার মূল্যবান সময় নষ্ট করাই। কারণ কর্মহীন মানুষকে নিয়ে কর্মঠ মানুষ ভাবতেই পারেনা। কখন জানি তার ও এমন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে চেপে বসে! কিংবা অকারণ অলাভজনক কাজ করার ইচ্ছে জাগে! তবে যেতে যেতে কৃষকটি মতিনকে উদ্দেশ্য করে খানিকটা জোরেই বলে উঠলো,
—”তোর ভাইজানের এমন আজব শখের লইগা একদিন তুই ও ফাঁসবি রে মতিন। আমি তো গেলাম। সাবধানে থাকিস।”

মতিন ওদিকে কান দিলো না। তার পুরো ধ্যান আপাতত পুকুরের মধ্যিখানে। উদগ্ৰীব হয়ে সে পুনরায় ডাকা শুরু করলো,
—”ভাইজান, ও ভাইজান! আপনে কই?”

একটা মুহূর্ত যেন থেমে গেল। পুকুরের ঢেউ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। হঠাৎ পানির ভেতর থেকে একদলা বুদবুদ ফেটে উঠল, তারপর ভেসে উঠল এক সুঠামদেহী সুশ্রী চেহারার পুরুষ। শ্বাস নিতে হাপাচ্ছে সে। উঠে এসেই রাশভারী গলায় মতিনের অস্থিরতা থামাতে সে বললো,
—”চুপ কর মতিন। শ্বাস নিতে দে।”

মতিনের মুখ ফ্যাকাশে, গলা কাঁপছে।
—”চলেন, আন্নে বাড়ি চলেন। আর রেকড ফেকড করা লাগবো না।”

—”মাত্র পাঁচ মিনিট! তোর জন্য হয়েছে সব। এমন ডাকাডাকি না করলে আমি আরো এক মিনিট পানির নিচে থাকতে পারতাম!” পুরুষটির শ্যামরঙা চেহারায় রাজ্যের বিরক্তি। চোখ মুখ কুঁচকে গায়ের পানি ঝাড়তে লাগলো সে।

সে ছন্নছাড়া, বেখেয়ালি, তবু অদ্ভুতভাবে মুগ্ধকর এক পুরুষ। সাধারণত চুলগুলো এলোমেলো, রুক্ষশুষ্ক থাকে, তবে সদ্যই পানির নিচ থেকে উঠে আসায় তার ঢেউ খেলানো চুলগুলো ভিজে ঘনকালো দেখাচ্ছে। দাড়িটা অল্প গজানো, চাপ দাড়ি। চোখ দুটি গভীর, তবে গাঢ় বাদামী। চোখের পাপড়ি সাধারণ পুরুষ মানুষের তুলনায় একটু বেশিই ঘন। শরীরে দামি কোন পোশাক নেই। সাধারণ গ্ৰামের ছেলের মতোই সে। তবে আভিজাত্য তো তার রক্তে। যা চেহারায় ও প্রতীয়মান।

শের শাহ–শাহপুর গ্ৰামের বর্তমান গ্ৰাম সরকার সুলাইমান শাহ এর ছোট ছেলে। পদ্মা নদীর মাঝি ও বলা যায় তাকে! জগত সংসারের প্রতি তার অনাগ্ৰহের কারণে পরিবারে তার কোন মূল্য নাই বললেই চলে। বাড়ি ফেরার ঠিক নেই। মাঝে মাঝে কোন একগাছতলে বা হেফজখানার বারান্দায় রাত কাটিয়ে দেয়। কিংবা এই যে তার সামনে দাঁড়ানো তার বিশ্বস্ত সঙ্গী মতিন উরফে মোতাহের হোসেন এর ভাঙাচোরা টিনের বাড়িতে এক রাত পার করে সে। মতিনের প্রতি শের এর আছে একরাশ কৃতজ্ঞতা। কোন উদ্দেশ্যে, কোন ফায়দা ছাড়াই শের এর ছায়াসঙ্গী মতিন। শের আজও বুঝতে পারেনা, কোন মোহে পড়ে তার মতো কর্মহীন মানুষের পেছনে মতিন তার সময় নষ্ট করে!

খানিক বাদে হতাশার সুরে মতিন বললো,
—”পরেরবার আমি আইমু না ভাইজান। তখন থাইকেন যতন খুশি পানিতে। আপনে তো আমার কথা হুনেন না।”

মতিনের কথায় শেরশাহ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। নিরাসক্ত ভঙ্গিতে সে বলল,
—”ফতুয়াটা দে মতিন। খালি গায়ে শীত লাগছে।”

মতিন তার হাতে থাকা খয়েরি রঙের ফতুয়াটা শেরশাহ এর দিকে এগিয়ে দিল। ঘাটের পাড়ে বসে পড়লো শের। ঘাটের পাকা পাড়টাও খয়েরি রঙের। কোণায় শ্যাওলা জমেছে। ওদিকটায় তাকিয়ে শ্যাওলা পরিষ্কার করার ইচ্ছে জাগলো শের এর। দেশ যদি মায়ের মতো হয়, তবে গ্ৰাম হলো খালার মতো। মায়ের বোন খালা, মায়ের থেকেও ভালা। একথাই সদা মানে সে। তাই গ্ৰামটাকে ছবির মতো শান্তিপূর্ণ আর পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সে নিজেই নিয়েছে। কে বলে সে কাজের না? এই যে এখন এই শ্যাওলা পরিষ্কার করে সে যাবে পাড়ার মাঠের দিকে। মাঠের দিকে গতকাল সাপ দেখা গিয়েছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তার কাছে অভিযোগ করেছে। সাপটার পুরো বংশকে নির্বংশ করতে হবে তার। নয়তো বাচ্চাগুলো খেলতে ভয় পাবে! আরো কত যে চিন্তা আছে তার!

মতিন এবার তার কালো পুঁটলি থেকে কি যেন একটা বের করলো। শের এর মুখ বরারব তা এনে বললো,
—”এই যে ভাইজান, আমি গরম পানির ব্যাগ ও আনছি আপনার লইগা। আন্নের একটু আরাম লাগবো। নেন।”

শেরশাহ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। চোখে একরাশ মায়া, কিন্তু গলায় দুষ্টুমি মেশানো গর্ব নিয়ে সে বললো,
—”এই জন্যই তোরে এতো দেখতে পারি মতিন। তোর মতো করে খেয়াল আমার আম্মায় ও রাখে না।”

মতিন নিচু স্বরে বলল,
—”আপনে তো আম্মার কাছে তেমন যান না ভাইজান। বুঝবেন কি করে? আম্মায় আন্নের জন্য বহুত চিন্তা করে।”

শেরশাহ হেসে মাথা নাড়ল, কিন্তু চোখের কোণে একটু কষ্টের চাপ, যা সে হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েও পারলো না। তাচ্ছিল্যের স্বরে সে বলল,
—”হও। আম্মায় এই চিন্তা করে, তার স্বামীর বিশাল সম্পত্তির অর্ধেক আমার মতো আকাইম্মা পাইলে কত খারাপ হবে। ওনার যে আফসোস এর শেষ নাই।”

মতিন প্রতিবাদ করে বললো,
—”আপনে আকাইম্মা নয় ভাইজান। এমন কথা আর কইয়েন না তো। আপনেই তো আসল কামের। ও বাড়ির সবকিছু তো আপনার নখের গোড়ায়।”

তখনই পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ায় শেরশাহ এর বড় ভাই..আরাম শাহ। গ্ৰামের সবাই তারে আরাম মাস্টার বলেই চিনে। বয়স বেশি না। শের এর বয়স যদি ছাব্বিশ ছুঁই ছুঁই হয় তবে তার পিটাপিটি বড় ভাই হিসেবে আরাম এর বয়স আনুমানিক সাতাশ বছরই হবে। শেরশাহকে আরাম পছন্দ করে না, আবার অপছন্দের তালিকায় ও শের নেই। মা ভিন্ন হলেও একই বাবার সন্তান, তবুও তাদের কথা শুনে মনে হয় তীক্ষ্ণ খেয়ালী দুজন আইনজীবীর বাকযুদ্ধ চলছে!

স্কুলে পড়িয়ে বাড়ি ফিরছিল আরাম। রাস্তা হতে শের আর মতিন এর কথা কানে যেতেই থমকে এদিকটায় চলে এলো সে। হাতে থাকা রসায়ন বইটা কোমরের পাশ বরাবর রেখে ভারী গলায় বললো,
—”মতিন? এসব উস্কানি না দিয়ে কিছু ভালো জ্ঞান ও তো দিতে পারিস তোর ভাইজানকে।”

শের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো না। কন্ঠ শুনে বুঝে গেল উপস্থিত তৃতীয় ব্যক্তিটিকে। ভেজা চুলে হাত ঘুরাতে ঘুরাতে সে বললো,
—”মতিন, ওরে বলে দে, তুই ওর মতো স্কুলের মাস্টার নোস, জ্ঞানের বাণী তোর জবান দিয়ে বের হবে না। বের হলেও আমি মানবো না।”

পুকুরের ধারে এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর আরাম ধীরে ধীরে বলল,
—”সেজন্যই তো অশিক্ষিত থেকে গেলি।”

শেরশাহ হেসে উঠল, কিন্তু হাসির নিচে একটা চাপা অভিমান লুকিয়ে আছে।
—”সেই শিক্ষা পেয়ে কি লাভ, যে শিক্ষা মানুষকে সম্মান করা শেখায় না? ওমন শিক্ষাকে লাল সালাম।”

মতিন এবার চুপ করে থাকতে পারলো না। তার সামনে শের কে কেউ নিচু কথা বলে, সেটা মানা তার পক্ষে অসম্ভব। হ্যাঁ, হতে পারে সে নিচু জাতের। তাই তো দুভাইয়ের কথার মাঝে ঢুকতে চাইনি।

আরামকে উদ্দেশ্য করে গলার স্বর নামিয়ে মতিন বললো,
—”ভাইজান তো মেট্রিক পাশ করছে আরাম ভাই। আপনে এমন করে বলতেছেন কেন?”

আরাম থামে না। সে পুনরায় তাচ্ছিল্যের সাথে কথা বলতে লাগলো,
—”স্কুল কলেজের শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলে অশিক্ষিত হয় না মতিন, অশিক্ষিত হয় দীন দুনিয়ার সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে। তোর ভাইজান এভাবে দিনের পর দিন ছন্নছাড়া বেখেয়ালি হয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। তার জীবনের উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছে!”

শেরশাহ চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশটা যেন তামাটে লাল, দিনের শেষ আলো নিভে আসছে। সে ধীরে বলে উঠল,
—”আমার জীবনের উদ্দেশ্য একটাই। নিজের জীবনে নিজের ইচ্ছেই খাটানো। নিজের জীবন আমি নিজেই ভেঙেচুরে ফেলবো, আবার নিজেই গড়বো।”

—”তোর কি মনে হয়? আমরা নিজেদের জীবন নিজেরা চালাচ্ছি না?”

—”না, চালাচ্ছিস না। তোর তো বিদেশে পড়ার ইচ্ছে ছিল, তোর তো নীল পাহাড়ের চূড়ায় উঠার শখ ছিল। একটাও কি পূরণ করতে পেরেছিস?”

শের এর পাল্টা কথার উত্তর দিতে না পেরে আরাম যার মাথা নিচু করল। গলায় ভারী নিঃশ্বাস। সত্যিই তো! সমাজের কাছে আদর্শ মানুষ হতে গিয়ে সে কতকিছুই না ত্যাগ করলো। তার শখের বয়স, তার স্বপ্নের দেশ!
—”সবকিছু পূরণ হয় না শের! অপূর্ণতা, নিঃসঙ্গতা আঁকড়েই মানুষের জীবন।”

শেরশাহের চোখে তখন অদ্ভুত এক জ্বালা! আরাম’এর কথায় শের এর স্বাভিমান ক্ষতিগ্রস্ত হলো। সাধারণত রেগে গেলে কিংবা কোনকিছুতে কষ্ট পেলে তার মুখ দিয়েও ভারী ভারী কথা বের হয়!
—”জানি আমি। কথাটা মানিও। তবে চেষ্টা করলে ক্ষতি কি? সূরা আন নাজম এ একটা আয়াত আছে, ‘মানুষ তাই পাই যা সে চেষ্টা করে!’ তুই তো কখনো চেষ্টা ও করে দেখিস নি নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে!”

শের এর কথাটা মতিন এর এতো ভালো লাগলো যে, খুশিতে তার চোখ চিকচিক করছে! সে এবার বেশ গর্বের সাথে আরাম’কে বলে উঠলো,
—”আপনে আরো আমার ভাইজানরে অশিক্ষিত কইলেন, আরাম ভাই! শের ভাইজান হইলো আসল শের, আমাগো সিংহ! ওনি তো প্রকৃতির শের। ওনার শিক্ষা দীক্ষা সব এই প্রকৃতিতেই আছে!”

শের এবার মাথা ঘুরিয়ে মতিনের দিকে তাকায়। আড়চোখে একবার আরাম’কে দেখে নেয়। রসিকতা করে শের বলে,
—”মতিন! তোর সাথে দেখছি সঙ্গ রাখা যাবে না। এমন ভারী ভারী কথা বলা মানুষ আমি পছন্দ করি না। তারা কথার ভারে মানুষ পটিয়ে ফেলে! সাধারণ মানুষ তা পারেনা।”

আরাম এর মনে হলো তার কথায় কোন কাজ হবে না। শের কে কখনোই সে ঘরের ছেলে বানাতে পারবে না। নিজের ভাইকে এভাবে সন্ন্যাসীর মতো দিন কাটিয়ে দেওয়াই দেখতে হবে তার। সে গলা নামিয়ে শের কে জিজ্ঞেস করলো,
—”বাড়ি ফিরবি না? দুপুরে খেয়েছিস?”

শের এবার উঠে দাঁড়ালো। উচ্চতায় আরাম কেও ছাড়িয়ে যাওয়ায় চোখদুটো সামান্য নিচু করে সে বললো,
—”মতিনের বাড়িতে খিচুড়ি খেয়েছি। সেই স্বাদ।”

—”বাড়িতে পদ্মার ইলিশ রান্না হয়েছিল!”

হাসতে হাসতে শের ও বললো,
—”নাথিং ক্যান বিট খিচুড়ি! হা হা হা!”

কয়েক সেকেন্ড পর আবারো হেসে উঠলো শের। তার শ্যামরঙা চেহারায় হাসিটা বেশ মায়া মায়া লাগছে আরাম এর! শের ও পুনরায় মতিনকে বলে,
—”সিই মতিন, আই ক্যান স্পিক ইন ইংলিশ! আ’ম নট আনএজুকেটেড! হা হা‌ হা!”

দ্বিতীয়বারের মতো আবারো হো হো করে হেসে উঠলো শেরশাহ। মনে হলো যেন হাসির তীব্রতার নিচে সে অপমান আর কষ্টের জ্বালা উড়িয়ে দিচ্ছে। যারা বেশি হাসে..তারাই ভেতরে ভেতরে বেশি কাঁদে! শের এর ও হয়েছে এই অবস্থা। মনখুলে কাঁদতে পারছে না যখন হাসতে তো পারবে! হাসির চোটে তাকে সবাই পাগল বলুক, কিন্তু চোখভেজা কান্নার দেখে কেউ তাকে বেচারা না বলুক! বেচারা শব্দটা শের এর বড় অপছন্দের। মানুষ বেচারা কেন হবে? যখন শক্তি, গর্ব আর অনুভূতি একসাথে বাঁচতে পারে!

শেরশাহের গগন ভোলানো হাসি তার ভেতরের দ্বন্দ্বের এক অবচেতন প্রতিবাদ। হাসি হচ্ছে তার ঢাল, তার অস্ত্র, এবং এক ধরনের নীরব শক্তি, যা ভেতরে ভেতরে তাকে টিকিয়ে রাখে। কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, সেই হাসি বলছে, মানুষের আঘাত তাকে ভেঙে দিতে পারেনি, বরং তাকে আরও দৃঢ় করেছে।

চলবে ইংশাআল্লাহ……

পর্ব:০১

লেখনীতে:মিফতাহুল জান্নাত জেমিম

জনরা:- সোশ্যাল ক্রাইম থ্রিলার

সতর্কীকরণ: এই উপন্যাস এ বর্ণিত দৃশ্যপট দুর্বলচিত্তের পাঠকদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। উপন্যাসের মূল অপরাধ ও মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের পটভূমি তৈরিতে কিছু দৃশ্য এমন হবে।
প্রিয় পাঠকবিচ্ছুরা, ‘শেরপদ্মা’ উপন্যাসের প্রথম পর্বের এই রোমহর্ষক সূচনা কেবল একটি বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস মাত্র। শাহপুর গ্রামের শান্ত-শ্যামল রূপের আড়ালে যে পৈশাচিক অন্ধকার দানা বেঁধে উঠেছে, তা খুব শীঘ্রই একে একে গ্রাস করতে শুরু করবে অনেকগুলো নিষ্পাপ জীবনকে। বায়েজিদ বাবুর আশঙ্কা কি তবে সত্যি হতে চলেছে, নাকি বাউন্ডুলে শের শাহের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো সত্য উল্টে দেবে পুরো দাবার ঘুঁটি? তাছাড়া মুখোশের আড়ালে থাকা সেই পিশাচের পরবর্তী শিকার কে, তা জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে। এবং হ্যাঁ, এই উপন্যাস এ একজন সাইকো কিলার থাকবে, যাকে উপন্যাস এর প্রথমেই পড়েছেন।

আর হ্যাঁ সবাই বেশি বেশি করে শেয়ার করবেন প্লিজ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x