গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৪২)

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

পর্ব:৪২

[ ভাল লাগলে শেয়ার করে দেবেন।❤️]

দিনটা শুক্রবার৷ সাতসকালে কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে কিচেনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে আবৃতি। এক হাতে মাংসের কড়াইতে কাটা আলুগুলো দিয়ে অন্য চুলায় লুচি গুলো ভেজে নিচ্ছে। পাশে রেণু রুটি সেঁকছে ঐশীর জন্য।

— ভাবি হালুয়ার জন্য বাদাম কুঁচি কুঁচি করমু?

আবৃতি হাতের কাজ জারী রেখে ব্যস্ত গলায় বললো,

— হ্যাঁ করো৷ কিসমিস ভিজিও মনে করে।

— আইচ্ছা৷

–বাহ অনেক সুন্দর সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে! কি রান্না করছো আম্মু?

রানাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন জোবায়দা চৌধুরী। আবৃতি ওনাকে দেখে মৃদু হেসে বললো,

— এই তো আম্মু লুচি, মাংসের ঝোল করছি। আর ওয়াফা,আরশানের জন্য সুজির হালুয়া৷

— তুমি একা একা পারছ তো? নাকি আম্মু হেল্প করব?

— না না আম্মু৷ এই তো আমার সব হয়ে গিয়েছে অলমোস্ট৷ আর রেণু তো হাতে হাতে সাহায্য করছেই। আমি পারব বাকিটুকু সামলাতে। আপনি বসুন। আমি আপনার গরম আদা পানি দিচ্ছি।

জোবায়দা মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখলেন পুত্র বধূকে। মাত্র চারদিনেই মেয়েটা এই সংসারটাকে এমনভাবে আগলে নিয়েছে যে মনেই হচ্ছেনা এটা তার নতুন সংসার। এত গুলো কাজের লোক থাকা স্বত্বেও নিজ হাতে সবার জন্য রান্না করে। জোবায়দা মানা করলেও কানে তোলেনা মেয়েটা। যদিও তিনি মনে মনে বেশ খুশি। আবৃতির হাতের রান্না যেন অমৃত। আবৃতি গরম পানিতে আদার রস মিশিয়ে একটা ট্রেতে নিল, সাথে দুটো খেজুর। তারপর মাংসটা নামিয়ে শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে বললো,

— রেণু রুটিগুলো হটপটে ভরে রাখ । ঐশী উঠবে লেইট করে। নাহলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।

রেণু মাথা নাড়ায়৷ আবৃতি ট্রেটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যায় কিচেন থেকে।

— আম্মু নিন আপনার আদা পানি।

মুখের সামনে থেকে বইটা সরিয়ে সেন্টার টেবিলে রাখলেন জোবায়দা চৌধুরী । গ্লাসটা তুলে মৃদু হেসে বললেন,

— এখানে একটু বসো মা। অনেক ঘেমে গিয়েছ৷

আবৃতি বসলো ওনার পাশে। জোবায়দা চৌধুরী মিহি স্বরে বললেন,

— আজকে তোমার চাচ্চু আর বেয়াইনকে আসতে বলেছি। আহান, ঐশীর বিয়ের বিষয়ে আলোচনা করতে। ভাল করেছি না মা?

আবৃতি আলতো হেসে বলে,

— আপনারা যা ভাল বোঝেন আম্মু।

— ঐক্যকে আজ অফিস যেতে বারণ করে দিও। আমি তোমার মামা শশুরদেরকেও কল করে আসতে বলেছি।

আবৃতি তৎপর হয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যতিব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো,

— আম্মু তাহলে তো ওনাদের জন্য দুপুরের ভালোমন্দ রান্নার আয়োজন করতে হবে। আর আপনার ছেলে এখনো পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে। একটু বাজার করেও তো আনতে পারে৷

জোবায়দা শব্দ করে হাসলেন,

— কি যে বলোনা মা। ঐক্য করবে বাজার? তুমি কি কি লাগবে লিস্ট করে সেলিমকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও।

আবৃতি বললো,

— আজ আপনার ছেলেই বাজার করবে।

জোবায়দা চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন,

— দেখি পারো কিনা।

.
রুমে ঢুকে আবৃতি দেখে ঐক্য বালিশে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে। কোমর অব্দি ব্লাংকেট টানা। শ্যামলা উদাম পিঠটা দেখে আবৃতি লজ্জায় নুইয়ে যায়। পুরো পিঠ জুড়ে লালচে আঁচড়ের দাগ। স্বামীর পিঠের অবস্থা দেখে আবৃতির ভারী মায়া হলো। চোখের সামনে হাত তুলে নিজের নখগুলো দেখল। বিরবির করে বললো,

— আজই এই রাক্ষুসে নখগুলো কাটতে হবে।

ধীর পায়ে হেঁটে আবৃতি ঐক্যের শিয়রে বসলো। ঐক্যের বদ্ধ নেত্রে ভারী শ্বাস ছাড়ছে। শ্যামলা সুদর্শন মুখটায় নিদারুণ ক্লান্তির ছটা। আবৃতি নরম হাতে কপাল ঢেকে যাওয়া ঐক্যের এলো-মেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল। ডাকল মোলায়েম স্বরে,

— ঐক্য?ঐক্য উঠুন৷

ঐক্য নড়েচড়ে উঠে চোখ পিটপিট করে তাকাল। চোখের সামনে আবৃতির ঝাপসা সুন্দর মুখটা দৃশ্যমান হতেই ঐক্য মুচকি হাসল। আবৃতির কোমরটা আঁকড়ে আচমকা একটা হেঁচকা টান মারল। ঘটনার আকস্মিকতায় আবৃতি টাল হারিয়ে ঐক্যের উন্মুক্ত বুকে আছড়ে পড়ে। ঝরঝর করে কেশরাশিতে ঢেকে যায় ওর পেলব কপোল। ঐক্য ঘুমঘুম নেশারু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবৃতির কপালের চুলগুলো সরিয়ে দেয়। ঘোরলাগা গলায় ফিসফিসিয়ে বলে,

— আজকের সকালটা এত সুন্দর! ঘুম ভেঙ্গে প্রতিদিন এমন একটা পুতুল দেখতে পেলে আর কি লাগে।

আবৃতি ঐক্যের প্রেমময় মুডে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে হঠাৎ বলে উঠে,

— উঠুন না৷ একটু বাজারে যেতে হবে৷

সহসা ঐক্যের সব ঘোর ছুটে পালাল। ভ্রু কুঁচকে শিওর হতে শুধায়,

— কি বললে?

আবৃতি ওর বুক থেকে উঠে প্রচ্ছন্ন গলায় বলে,

— বলছি তাড়াতাড়ি উঠতে। বাজারে যেতে হবে আপনাকে।

ঐক্য সটান হয়ে উঠে বসলো। হতভম্ব গলায় শুধাল,

— কিন্তু বাজারে কেন যাব এত সকালে?

— এত সকাল কোথায়। প্রায় আটটা বেজে গিয়েছে। আর বাজারে মানুষ কেন যায়? অবশ্যই বাজার করতে।

ঐক্য চোখ বড় বড় নিজেকে ইশারা করে হতবাক গলায় বললো,

— আমি করব বাজার?

আবৃতি ভ্রু কুঁচকে থমথমে আওয়াজে বললো,

— কেন কোথায় লেখা আছে আপনি বাজার করতে পারবেন না? এখন উঠুন তো। আজকেও ফজরের নামাজটা পড়েন নি। এখন জলদি গোসল সেরে, নাস্তা করে বাজারে করে নিয়ে আসুন। আমি লিস্ট দিচ্ছি কি কি আনতে হবে।

ঐক্য অসহায় গলায় বলে উঠে,

— আবৃতি, সেলিম আর ড্রাইভার থাকতে আমাকে কেন বাজারে পাঠাচ্ছ।

— কারণ ওদের দিলে দেখেশুনে সব কিনতে পারবেনা। শুনুন একটা বড় দেখে ইলিশ নিয়ে আসবেন। ইলিশ পোলাও করব৷

ঐক্য তবুও মিনমিন করে বললো,

— সেলিম গেলেই পারে। আমি কখনো বাজার করি…

আবৃতি ক্ষেপে উঠে বলে,

— এই উঠুন তো। দামড়া একটা ব্যাডা অথচ বাজার করতে পারেনা। আজকে সব বাজার আপনাকেই করতে হবে। এখন উঠুন৷ নাস্তা সেরে বাজারে যান।

**

ঐক্যকে ঠেলেঠুলে বাজারে পাঠিয়ে আবৃতি আবার দোতলায় উঠে। কাঙ্ক্ষিত রুমটায় ঢুকে দেখে নিজেদের জন্য বরাদ্দ করা বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে মহা সুখে ঘুমের দেশে তলিয়ে আছে আরশান, ওয়াফা। আবৃতি জানালার পর্দা গুলো সরিয়ে দিল। সহসা সূর্যের তীব্র আলোকরশ্মি এসে ভিড়ল ওদের নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখগুলোতে। খানিকটা বিরক্ত ভঙ্গিতে নাকমুখ কুঁচকে দুজন অন্য দিকে ফিরে ফের নিদ্রায় তলিয়ে গেল। আবৃতি হেসে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে ওয়াফার পাশে বসল। মেয়েকে সোজা করে শুইয়ে ডাকল,

— ওয়াফা, আম্মু? উঠো। আজকে কে আসবে বলোতো?

ওয়াফা চোখ ঢলে ঘুম জড়ানো গলায় আদোস্বরে বললো,
— কে আসবে মাম্মাম?

— তোমার নানুমনি,বড় নান্নান,মেজ নান্নান সবাই আসবে।

ওয়াফা সহসা উঠে বসলো। আবৃতি মুচকি হেসে মেয়ের ঘুম ঘুম ফোলা আদুরে মুখটায় চুমু এঁকে দিল। ওয়াফাকে ঘুম থেকে তুলতে তুলনামূলক কম কষ্ট করতে হয়। তাই সবার আগে ওকেই ঘুম থেকে তোলে আবৃতি। আরশানের বিছানায় তাকিয়ে আবৃতি হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওয়াফার রুমে আগে একটা বেড ছিল। এই বাড়িতে আসার পর ঐক্য আরশানের জন্যেও একটা নতুন বেড এখানে সেট করে দিয়েছে। এখন এই বিশাল বিছানায় তার ছেলে রাতভর কৈ মাছের মতো লাফঝাপ করে। রাতে শুইয়ে যায় একরকম সকালে এসে পায় আরেকরকম৷ এখন এই কৈ মাছটাকে জাগাতে আবৃতির যুদ্ধে নামতে হবে। প্রায় বিশ মিনিট যুদ্ধ শেষে অবশেষে আরশানকে জাগাতে সক্ষম হলো আবৃতি। তারপর দুজনের হাতে ব্রাশ ধরিয়ে দিয়ে দুটো টুলের উপর দাঁড় করিয়ে ফ্রেশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ফ্রেশ হওয়া শেষে ওদের নাইট স্যুট চেইঞ্জ করে ফ্রেশ জামাকাপড় পরিয়ে দেয়৷ আরশান বেডের উপর বসে পা দোলাচ্ছে আর ভ্রু কুঁচকে দেখছে তার মাম্মামকে, যে কিনা ভীষণ মনোযোগে ওয়াফার চুল বেঁধে দিচ্ছে। আবৃতির ওয়াফার চুল গুলো দুটো ঝুঁটি করে বো ক্লিপ পরিয়ে দিল৷ ওয়াফা চুপটি করে বসে আছে। মাম্মাম প্রতিদিন ওর চুলে সুন্দর সুন্দর হেয়ারস্টাইল করে দেয়। মেয়ের চুল বাঁধা শেষ হলে আবৃতি ওকে নিজের দিকে ফেরাল। মেয়ের পুতুলের মতো অবয়ব দেখে চোখদুটোতে আবেগের জোয়ার উঠল। মনে মনে কয়েকবার মাশাল্লাহ পড়ে নেয়। আরশান পেটে থাকতে আবৃতি একটা মেয়ের আকাঙ্খা করতো। ওর অনেক মেয়ে বাচ্চার প্রতি শখ ছিল। মনে মনে কত ঝল্পনা কল্পনা করতো মেয়ে হলে সেজেগুজে পুতুল বানিয়ে রাখবে। এই করবে, সেই করবে। ছেলে হওয়াতে ওর সেই শখটা অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ অনাকাঙ্খিতভাবে এই পুতুলটা
উপহার দিয়ে সেই শখটা পূরণ করে দিয়েছেন।
আবৃতি বাচ্চা দুটোর সামনে নাস্তা বেড়ে দিয়ে নিজেও প্লেট টেনে বসলো। জোবায়দা চৌধুরীর পেটে মাংস, লুচি তুলে দিয়ে বাচ্চাদের উদ্দেশ্য বললো,

— তোমাদের পাপাকে বলেছি আইসক্রিম নিয়ে আসতে। তোমাদের মধ্যে যে পুরো প্লেট ফিনিশ করতে পারবে, সেই আইসক্রিম পাবে৷

দেখা গেল আবৃতির লোভনীয় অফারে দু’জনেই নিজেদের পুরো খাবারটা খেয়ে শেষ করল। জোবায়দা চৌধুরী মুগ্ধ চোখে দেখলেন সবটা। এই মেয়ের সন্তান লালনপালনের দক্ষতা দেখে উনি আপ্লুত। ওদেরকে নাস্তা খাইয়ে আবৃতি বাড়ির লনে খেলতে পাঠিয়ে দিল। সকাল বেলার রোদটা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী তাই৷ তারপর চা নিয়ে আরাম করে শাশুড়ীর পাশে বসল। জোবায়দা চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন,

— এতো কাজের ধকল যাচ্ছে তোমার উপর মা। কত ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

— এই কাজগুলো আমি ভালোবেসে করি আম্মু। তাই কোন ক্লান্তি আমাকে ছুঁতে পারেনা।

জোবায়দা চৌধুরী মনে মনে বেশ প্রসন্ন হলেন। নিজের একমাত্র ছেলের জন্য সবসময় তিনি আবৃতির মতোই ঘরকুনো সংসারী গোছের মেয়ে চাইতেন। কিন্তু ছেলের যখন নিজের ভালবাসার দাবি নিয়ে মাহিরাকে চাইল তখন তিনি মানা করতে পারেননি। মনের মধ্যে খচখচ করলেও মেনে নিয়েছিলেন একমাত্র ছেলের পছন্দকে। কিন্তু বলেনা মায়ের মন আগাম বিপদ টের পেয়ে যায়। অবশেষে তাই হলো। ওই মাহিরা তার ছেলেকে পুরোপুরি ভেঙ্গে গুড়িয়ে চলে গেল।

— আপনার ছেলের বাজার করার ট্যালেন্ট দেখব আজ।

জোবায়দা চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন,

— শুধু শুধু পাঠিয়েছ, দেখবে বাজার দেখেই নাক সিঁটকে ফিরে আসবে।

ঐক্যের গাড়িটা এসে থামে মাছ, মাংসের বাজারের সামনে। হঠাৎ বাজারের মুখে গাড়ি থেমে যেতে ঐক্য ভ্রু কুঁচকে রাশভারী আওয়াজে শুধায়,

— হোয়্যাট হ্যাপেন্ড সাবের? এখানে গাড়ি থামিয়েছ কেন?

— স্যার গাড়ি আর ভেতরে যাবে না। এখান থেকে বাজারের ভেতর পায়ে হেঁটেই যেতে হবে আমাদের।

ঐক্য বিরক্তিকর ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নামল। গাড়ি থেকে নেমে সামনে তাকাতেই বেচারার মাথাটা চক্কর কেটে উঠে। সামনে যতটা দেখা যায় স্যাতস্যাতে কদমাক্ত রাস্তা। নাকে এসে বাড়ি খাচ্ছে মাছের উৎকট গন্ধ। ঐক্য তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে টিস্যু বের করে নাকে চাপে। ঐক্যের অবস্থা দেখে ড্রাইভার সাবের সচেতন গলায় বললো,

— স্যার, আপনি পারবেন? না পারলে আপনি গাড়িতে বসুন। আমি করে আনছি বাজার।

ঐক্য বাজারের ব্যাগটা সাবেরের হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা ছিনিয়ে নেয় একপ্রকার। গলা ঝেড়ে বলে,

— না পারার কি আছে। ড্যাডের এতবড় বিজনেস সামলাতে পারলে সামান্য এই বাজার করতে পারবেনা?

— না না স্যার আমি তেমনটা বলতে চাইনি।

— কাম অন ফলো মি।

কয়েক কদম বহু কষ্টে পার করে ঐক্য একটা মাছের দোকানের সামনে থামল। ফিটফাট সাহেব গোছের ঐক্যকে দেখে দোকানির চোখ চকচক করে উঠে। তৎপর হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পান খেয়ে লালচে দাঁত গুলো বের করে হেসে বলে,

— আহেন সাব। কি মাছ লাগব? সব দেখেন এক্কেবারে তাজা লাফাইতাছে।

বলে পাশে থু করে পানের ফিঁক ফেললো। ঐক্য নাক সিঁটকে নিল। গম্ভীরমুখে বললো,

— বড় দেখে ইলিশ মাপুন।

দোকানি কথা মতো বড় বড় দেখে ইলিশ মেশিনে রাখল।

— নেন সাব৷ এখানে সাত কেজি হইছে। আপনেরে একেবারে সরস দেইখা দিছি।

ইলিশ মাছ কিনে ঐক্য এবার সাবেরকে জিজ্ঞেস করে,

— মাংসের দোকান গুলো কোনদিকে?

— এইতো স্যার আরেকটু সামনে।

ঐক্য অসহায় চোখে নিজের পায়ের দিকে চাইল। কাঁদায় একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা বুটগুলোর। ভাগ্যিস বুট পড়ে এসেছে। না হলে এই দুর্গন্ধ যুক্ত কাঁদায় পা দুটো হাবুডুবু খেত৷ তবুও আজ বৌকে বাজার করে দেখিয়েই ছাড়বে। অতঃপর মাছ,মাংস থেকে লিস্ট মোতাবেক সব দ্রব্যাদি কিনে ঐক্য বাসায় ফেরে।
বাড়িতে তখন ও বাড়ি থেকে জাহানারা আর আবৃতির চাচা চলে এসেছেন। ঐক্য ওনাদের সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর বাজারের ব্যাগটা হাসিমুখে গিন্নির হাতে তুলে দিল। আবৃতি ঐক্যের হাতে এক গ্লাস তরমুজের সরবত তুলে দিয়ে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

— কি এনেছেন? আবার বাজারের আবর্জনা ব্যাগে ভরে
নিয়ে আসেননি তো?

ঐক্যের হাসিমুখটা দপ করে নিভে গেল। মুখ লটকে বললো,

— তুমি খুলেই দেখনা৷ আমাকে এত অপদার্থ মনে হয় তোমার?

বাজারের ব্যাগটা ঢেলে তরতাজা ইলিশ আর ফ্রেশ মাংস দেখে আবৃতি খুশি হয়ে গেল। সাথে সবজি, ফলমূল,দই-মিষ্টি আর বাচ্চাদের জন্য আইসক্রিম ও আছে। আবৃতি বেশ প্রসন্ন হলো। ঐক্য সরবত খেতে খেতে বৌয়ের মুখভঙ্গি পরখ করে জিজ্ঞেস করে,

— কি বাজার ঠিকঠাক হয়নি?

আবৃতি প্রসন্ন চিত্তে বললো,

— একদম সব ঠিকঠাক।

ঐক্য অহংকার ফুলেফেঁপে উঠে বলে,

— বলেছিলাম ঐক্য চৌধুরীকে আন্ডারেসটিমেন্ট করতে যেওনা। দেখলে তো এখন, এই ঐক্য চৌধুরী চাইলে সবই পারে।

আবৃতি গদগদ হয়ে বললো,

— এবার থেকে তাহলে বাজারট আপনি করবেন৷

মুখে নেওয়া সরবতটুকু পেটে চালান করার আগেই গলায় আটকে গেল বেচারার। কাশতে কাশতে প্রকট নেত্রে রইল আবৃতির হাসোজ্জল মুখটায়। কোথা থেকে যেন কেউ গেয়ে উঠলো,

— ইয়ে ক্যায়া হুয়া, কিউ হুয়া, ক্যাছে হুয়া।

*

— ঐশী,এই ঐশী? উঠো।

ঘুমঘুম চোখে পিটপিট করে চোখ খোলে ঐশী। আবৃতির মুখটা স্পষ্ট হতেই চোখ কচলে উঠে বসে। ঘুম জড়ানো গলায় বলে উঠে,

— কি হয়েছে ভাবি?

— হয়নি এখনো কিন্তু হবে।

— কি হবে?

— তোমার বিয়ে।

প্রকট নেত্রে চেঁচিয়ে উঠে ঐশী,

— কিহ!

আবৃতি কানে হাত দিয়ে বললো,

— আহ, আস্তে চেঁচাও নারে বাবা। আমার কানের পর্দা ফেটে গেল।

ঐশী হতবাক গলায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে আওড়ায়,

— ভাবি? তুমি কি সত্যি আমার সামনে আছ? নাকি আমি এখনো স্বপ্নে আছি?

— না গো ননদিনী তুমি বাস্তবেই বসবাস করছ।

— একটা চিমটি কাটো তো।

আবৃতির ঐশীর কথামতো বেশ জোরেশোরে একটা চিমটি কাটে।

— আহ!

আবৃতি হাসতে হাসতে বলে,

— কি এবার হয়েছে বিশ্বাস? যাও এবার ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো। তোমার শাশুড়ী মা এসেছেন।

— ইশ ভাবি, মা আসবে যেহেতু আগে কেন উঠিয়ে দাওনি। এখন কি মনে করবেন উনি?

আবৃতি ঐশীর হালকা এলোমেলো হয়ে থাকা রুমটা গুছাতে গুছাতে মৃদু হেসে বলে,

— কিছুই মনে করবেনা। তোমার শাশুড়ী জানেন তার হবু বৌমার রাত জেগে পড়তে হয়। এখন উঠো। জলদি গোসল সেরে আসো। শাড়ি পরিয়ে দিই।

ঐশী মনের উত্তেজনা বহু কষ্টে দমিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। আবৃতি কাজ করছিল। হঠাৎ মুঠোফোনটা তারস্বরে ভাইব্রেট হয়ে স্ক্রিন জ্বলে উঠে। আবৃতি ফোনটা হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে দেখে একটা আননোন নাম্বার। তবুও রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরে ধিমি স্বরে বললো,

— হ্যালো, কে বলছেন?

ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটা দারাজ গলার স্বর,

— আমি ওয়াফার মাম্মাম।

চলমান…..

[ আসসালামু আলাইকুম পাঠক। আর দু একটা পর্ব বাকি আছে এই গল্পটার। নাইস, নেক্সট না লিখে কয়েকটা গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখছি। হ্যাপি রিডিং। ❣️]

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x