গল্প: হৃদয়ের আশ্রয়(০৩)

লেখিকা:নুসরাত পুতুল

 

পর্ব:০৩

 

বিকেলে বড় মামা এসে হাজির হলেন আমাদের বাড়িতে,কাল রাতের পর থেকে মায়ের মুখে এখন অব্দি দানা পানি পড়েনি এক ফোঁটা ও। সকালের পর বড় ফুফু রান্না করেছে৷ সকলে মিলে খেয়েছে ও সেখাবার,
এমনকি আমার বাবা ও,। বাবাকে আমাকে ও ডেকে খাবার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মা কে কেউ খাবার খাওয়ার কথা বলেনি, এমন কি বাবা ও না। সকলের ভাবমূর্তি এমন যে তারা জানেই না,বাড়িতে একজন গর্ভবতী মানআছে,
অভিমানে হয়তো মা ও আর আগ বারিয়ে খায়নি খাবার নিয়ে।

বিকেলে মামা আসলে দাদির ঘরে নালিশের বৈঠক বসে। বৈঠকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় মা কে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার লোকের অভাব নেই। আমার ফুফু দাদি ফুফা সকলে তার বিরুদ্ধে একে একে নালিশের আসর জমিয়ে বসেছে যেন।
বাবা তেমন কোনো কথা বলছে না। খুবই আনমনা লাগছে তাকে। মনে হয় কিছু নিয়ে খুবই আপসেট।

অনেকটা সময় ধরে মায়ের নামে বদনাম করে শেষ করে থামলেন তারা। মামা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন।
” তোমার কিছু অভিযোগ আছে?
বাবা ফেলফেল করে একবার তাকাতে চাইলো মায়ের মুখের দিকে। পরক্ষণেই কি মনে করে মাটির দিকে তাকিয়ে বললো,

” না,
ওরে নিয়া যান। আমার মা বোনরে দেখতে না পারলে তাদের সাথে মিশতে না পারলে আমি তাকে রাখতে পারব না। আমার কাছে আমার মা আগে। আমি তো আমার মা বোন ফেলে দিয়ে পারব না।

কথাটা বলার পর মা চোখ তুলে তাকায় বাবার দিলে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। হয়তো এতো বছরের সংসার শেষে নিজ স্বামীর মুখে এমন কথা আশা করেনি তিনি।
মামা দাদির উদ্দেশ্যে বলে,
” আপনাদের সবার কি এটাই কথা? এজন্য ডেকেছেন আমায়?

দাদি কিছু বলার আগপই ফুফু বলে উঠলো।
” যার বউ সে সিদ্ধান্ত জানাইছে। এখানে আমাদের কি বলার আছে।
আর ভাই তো না বুঝে এমন সিদ্ধান্ত নেয় নাই। যে মেয়ে আমাদের সবার সামনে এমন করতে পারে সে তো আমরা চলে গেলে একা বাড়িতে আমার আম্মা কে বালিশ চাপা দিয়ে মে’রে বলবে ঘুমের মাঝে ম’রে গেছে। এমন যে করবে না তার কি গ্রেরান্টি।

” এসব কি বলতাছেন আপনি? আমার বোন সম্পর্কে যা খুশি বলে যাচ্ছেন। বিয়ের এতো বছর হলো এতোদিন তো কোনো বদনাম শুনি নাই। তাহলে এখন হঠাৎ বলছেন আপনার মাকে খু*ন করবে। মাথা ঠিক আছে আপনাদের?

মামার প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় ফুফু। পরক্ষণেই জবাব দেয়,
” মানুষ বদলায়। দেখেন গিয়ে আপনার বোন কার সাথে বা কার সাথে মিলে এমন করতেছে।

” যথেষ্ট বলে ফেলছেন আপনারা। আপনাদের সাহস কি করে হয় আমার বোনের চরিত্র নিয়া কথা বলার।
আমার মা বাপ ম’রা বোন, তাই বলে কি যা খুশি বলে যাবেন আমরা কিছু বলমু না। আমার বোনরে নিয়া এতো সমস্যা তো। নিয়া যাইতাছি আমি তারে। আপনাদের হাতে পায়ে ধরে বোনরে এ বাড়ির ভাত খাওয়ামু সে কথা ভাইবেন না। খাওয়াতে না পারলে বি’ষ খাওয়াই মা*ইরা ফেলমু তবুও এমন জায়গায় বোনরে খাইখা জামু না। টাকা পয়সায় আপনাদের থেকে কম থাকতে পারে আমাদের। তবে সম্মান আছে, চরিত্র আছে।

রুমি যা রেডি হয়ে নে।

আর একটা কথা,
” আমি না হয় আমার বোন নিয়া যাব। কিন্তু ছামির, আপনাদের বাড়ির ছেলে তাকে কিন্তু নিব না আমি।

দাদি মুখ ভেংচি কেটে বললো,
” আমগো আাড়ির পোলা আমগো আাড়িত থাকবো। তারে কোনহানে নিতে দিমু না। এখন তারে নিয়া দুই দিন পর অন্য মানুষ কামাই খাইব তার। সে কাজ হইতে দিমু না।

” আমি তো বললাম আমি শুধু আমার বোন নিব,

মা রেডি হওয়ার জন্য কয়েক কদম পা এগিয়েছিল।
মামা আর দাদির কথা শুনে ছুটে আসলো মামার কাছে।

” ভাইজান আমি ছামির রে রেখে যাব না। তাকে আমার সাথে নিয়ে নেন।

” সা*পের বাচ্চা সা*পই হয়, । দুধ কলা দিলেই সে আপন হবে না। সময় বুঝে ঠিক ছোবল মা*রবে। সে সুযোগ তো আর দিতে পারি না আমি।

তৈরি হয়ে নিতে বলছি তারাতাড়ি কর।
আমি নিতে পারব না এ বাচ্চা।

মা আরও কিছু বলতে গেলে মামা থামিয়ে দিয়ে বলে,
” কি বলল শুনিস নাই? এখনই বলল। আমরা তাদের ছেলের কামাই খাওয়ার লো*ভ করি, সাথে করে নিয়ে গেলে দু দিন পর তো মামলা করবে কথা না বাড়িয়ে কাজ কর।

মায়ের মুখটা চুপসে গেল। সারা দিন না খেয়ে মুখটা শুখিয়ে আছে এমনিতেই।, চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে। মা আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো। যেন বহু বছর দেখে না আমাকে।

তার পর চলে গেলো নিজের ঘরে।
আমিও মায়ের পিছন পিছন গিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি,

মা তার কয়েকটা কাপড় চোপড় ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। ব্যাগের চেইন টা লাগিয়েও আবার কি মনে করে আমার একটা নতুন শার্ট আর প্যান্ট মায়ের ব্যাগে নিয়েছে।

আমি দাড়িয়ে থেকে দেখছি সবটা,

সব গুছিয়ে মা বের হওয়ার আগে ডাকলেন

” ছামির,

মায়ের মুখের ডাক, মুহুর্তে মনে হলো সব ঠিক হয়ে গেছে। মনের সকল ব্যাথা নিরাময় হলল যেন।
আমি ধীর পায়ে মায়ের কাছে এগিয়ে যেতেই মা খব করে আমার হাত ধরে কাছে টেনে নিলেন আমায়, জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন একেবারে।
যেন ছেড়ে দিলেই হাড়িয়ে ফেলবে বুকের ধন

মা কাঁ*দছে আমায় জড়িয়ে ধরে।
আমার বুকের ভিতর লাফাচ্ছে, কিন্তু আোখে পানি আসেনি। ছোট থেকেই শোনে আসছি, ছেলেদের নাকি জোড়ে কাঁদতে নেই। এই সমাজ হয়তো কান্নাটাকে শুধু মেয়েদের ব্যক্তিগত সৃষ্টি বলে মনে করেন। যে সৃষ্টি ছেলেদের জন্য না,

বাইরে থেকে মামার ডাক পরে,
” রুমি তারাতাড়ি কর,

মা কোনো মতে চোখের পানি মুছে বেরিয়ে যায়।

আমি সেখানেই দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছি।

সব শেষে মাকে নিয়ে গেলেন মামা,
রাতের সেই খাওয়াই ছিল আমার মায়ের এ বাড়িতে করা শেষ আহার।

মা চলে গেলে সমস্ত বাড়ি যেন মুহুর্তে জনমানবহীন মনে হতে লাগলো।
আশ্চর্য সকলেই আছে, শুধু একজন নেই, তবুও এতো খালি খালি কেন লাগছে?
তবে কি এটাই মায়ের জন্য সন্তানের টান?

আমার চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল।
কোথা থেকে যেন ঝুমুর এসে একটা ২ টাকা দামের চকলেট এগিয়ে দিয়ে বললে,
” কেঁ*দো না, বড় হয়ে তোমায় আমি বিয়ে করব।

বলেই চলে গেলো চকলেট টা হাতে ধরিয়ে দিয়ে।

ঝুমুরের কথাটা বার বার কানে বাজছে আমার, খানিকক্ষণ পর ঘোর কাটলো ছোট ফুফুট অট্টহাসির শব্দে। যে হাসি বি’ষের মতো লাগছিল আমার কাছে।

ছোট ছয় বছরের আমিটার ভিতর জন্ম নিতে শুরু করে অ*গ্নি শিখায় তৈরি এক দা*নব। যা পারলে এই মুহুর্তে তছনছ করে দিতো সব। কিন্তু সে দা*নব টা এতোটাই ক্ষুদ্র যে সে ক্ষমতা তার নেই।
তার জন্য তালে বড় হতে হবে, অনেক বড়।

কা*ন্না ভুলে হেসে ফেললাম হঠাৎ। ঝুমুরের কথা মনে করে আরও একবার হাসলাম।
মনে মনে বললাম,
” করব তোকে বিয়ে আমি,

__________

পড়ার টেবিলে মুখ গুজে আছি, কেন জানি বারংবার মনে হচ্ছে বাবা তো এমন না। বাবার এমন রূপ তো আগে দেখিনি। বাবাকে নিশ্চিত এমন করতে বাধ্য করছে কেউ। নয়তো আমার বাবা এমন করতে পারে না মায়ের সাথে।
না আর বসে থাকব না। এক্ষুনি বাবাকে জিগ্যেস করব। কেন করছে এমন।

যে ভাবনা সেই কাজ, উঠে বাবার কাছে যেতেই ঘরের বাইরে থেকে এমন কিছু শুনলাম যার পর পুরো শরীর হিমশীতল হয়ে যাচ্ছে আমার। নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিনা যেন।

 

 

 

চলবে ইনশাআল্লাহ……

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments