গল্প:বিদেশি বাবু বাঙালি ম্যাম (০১)

লেখনীতে:তাছমিয়াতুল জান্নাত

পর্ব:০১

👇

👇

👇

বাইরে তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। রাতটা যেন এক বিশাল কালো চাদর বিছিয়ে পুরো শহরটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। জানালার ওপাশে আকাশের বুক চিরে দু-একটা তারা টিমটিম করে জ্বলছে, যেন তারাও গোধূলির মনের মতোই কোনো এক গভীর ব্যথায় ম্লান হয়ে আছে। ঝিরঝিরে বাতাস জানালার পর্দাকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর গোধূলি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জানালার গ্রিল ধরে। তার দৃষ্টি আকাশের সেই অসীম শূন্যতায় নিবদ্ধ, যেখানে গিয়ে পৃথিবীর সব দীর্ঘশ্বাস মিশে যায়।
​ঘরটা নিস্তব্ধ।

সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে গোধূলির ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল।

খুব শান্ত, প্রায় অস্ফুট স্বরে সে বিড়বিড় করে বলল,

“আমাকে ক্ষমা করে দাও, জেহের…”

​বলতে বলতে তার দুচোখ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গালে। গোধূলির কণ্ঠস্বর এবার একটু গভীর আর আচ্ছন্ন হয়ে এল। সে যেন সামনেই জেহেরকে দেখতে পাচ্ছে, যেন জেহের ওই অন্ধকারের আড়াল থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

গোধূলি এবার একটু আবেগঘন স্বরে, নিজেকে হারিয়ে ফেলে বলতে শুরু করল,

“আমি তো কথা দিয়েছিলাম জেহের… বলেছিলাম তোমার মৃত্যুর পরে সারাটা জীবন শুধু তোমার স্মৃতিটুকু সম্বল করেই কাটিয়ে দেব। আজীবন তোমার হয়েই থাকব। কিন্তু আমি কেন পারছি না? কেন এই একাকীত্ব আমাকে এভাবে কুরে কুরে খাচ্ছে?”

​শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে গোধূলির গলা ধরে এল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে গিয়ে একদম নিচু হয়ে গেল।।

সে জানালার চৌকাঠে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে আবার বলল,

“আমাকে মাফ করে দিও জেহের, আমি নিজের কাছেই নিজে হেরে যাচ্ছি।”
গোধূলি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “জেহের, আমি তোমারই স্ত্রী। কথা দিয়েছিলাম তোমার মৃত্যুর পর সারাটা জীবন তোমার হয়েই থাকব। দেখো, তোমার প্রিয় সেই সাদা শাড়িটা আজও আমার অঙ্গে জড়িয়ে আছে, কিন্তু এই লাল দুপাট্টা… পড়েছি মিথন নওশাদের স্ত্রী হিসাবে আমাকে ক্ষমা করে দিও জেহের।”

(ফ্ল্যাশব্যাক)

আরহাম বাড়িতে তখন উৎসবের আমেজ। বড় কর্তা ফারুক আরহামের আদরের ছোট মেয়ে নিতুর বিয়ের আয়োজন চলছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা পরে নববধূর সাজে বসে ছিল নিতু। চোখেমুখে রাজ্যের বিষাদ মেখে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল সে। ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল গোধূলি। তার পরনে সাদা জামদানি, হাতে কোনো অলঙ্কার নেই।

গোধূলিকে দেখেই নিতু ডুকরে কেঁদে উঠল।

​”কাকিয়া! আর কতকাল তুমি এই সাদা শাড়ি পরে জীবনটা কাটাবে? তোমার বয়স তো মাত্র আঠারো!”

​গোধূলি আলতো করে নিতুর মাথায় হাত রাখল।

এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। সে ধীরস্থিরভাবে গোধূলি বলল,

“আমি যখন এ বাড়ির বউ হয়ে এলাম নিতু, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র সতেরো। জেহেরের সাথে মাত্র ছয় মাসের সংসার ছিল আমার। পারিবারিকভাবে বিয়ে হলেও আমি মানুষটাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝে শুধু একটাই আফসোস হয়—সেদিন যদি ও বাইরে না বেরোত! ওই গুলিটা যদি ওর বুকে না বিঁধত, তবে আজ আমি বিধবা হতাম না, আর ওকেও আমাকে ছেড়ে চলে যেতে হতো না। যাইহোক, আমি কিন্তু বয়সে তোমার ছোট। আমাকে কাকিয়া বলে আর লজ্জা দিও না।”

​নিতু চোখের জল মুছে নিয়ে বলল

, “আচ্ছা ঠিক আছে গোধূলি ইসলাম লিরা। কিন্তু তোমাকে আজ একটা জরুরি কথা বলার জন্যই একা ডেকেছি। লিরা, আমি এই বিয়েটা করতে পারব না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। যাকে বিয়ে করতে বলা হচ্ছে সে একজন সুপারস্টার, সেলিব্রেটি! সিনেমায় কত মেয়ের সাথে তাকে অভিনয় করতে হয়, আমি তা সহ্য করতে পারব না। আমি শুধু তাহানকে ভালোবাসি। তুমি তো জানো ভালোবাসার মানুষকে হারানোর কষ্ট কতটা ভয়াবহ!”

​গোধূলির বুকটা একবার কেঁপে উঠল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“এখন আমাকে কী করতে হবে, সেটা বলো।”
​”আমাকে পালাতে সাহায্য করো লিরা। তাহান গেটের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তুমি শুধু আমাকে কিচেনের পেছনের জানালাটা খুলে দাও।”

​গোধূলি আর দ্বিধা করল না। সে জানত হৃদয়ের হাহাকার কতটা কষ্টের। সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বড় জানালাটা খুলে দিল। সেই জানালার ওপারেই ছিল এক অনিশ্চিত আগামীর হাতছানি।
★★*

নিতু রান্নাঘরের সেই খোলা জানালা দিয়ে অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে গেল। বাইরে তাহান ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। ওর হাত ধরে এক অনিশ্চিত কিন্তু কাঙ্ক্ষিত নতুন জীবনের দিকে পা বাড়াল নিতু। পেছনে পড়ে রইল এক রাজকীয় আয়োজন আর একরাশ নিস্তব্ধতা।

★★★★★

​সেই নিস্তব্ধতা ভাঙল ঠিক বিশ মিনিট পর।
​নিতুর বড় বোন নীলা হাতে এক জোড়া ঝুমকো দুল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। আয়নার সামনে কেউ নেই। সারা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজল সে, বারান্দা থেকে ওয়াশরুম—কোথাও নিতুর চিহ্ন নেই। খোলা জানালা আর পড়ে থাকা বিয়ের কিছু গয়না দেখে নীলার বুকটা ধক করে উঠল। সে বুঝতে পারল সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে।



​নীলা হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে তখন মেহমানদের ভিড়, চারদিকে হাসাহাসি। মাঝখানে গম্ভীর মুখে বসে আছেন বড় কর্তা ফারুক আরহাম। নীলা টলতে টলতে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ফ্যাকাশে মুখ দেখে ফারুক আরহামের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

​নীলা কাঁপাকাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল,

“বাবা! সর্বনাশ হয়ে গেছে! নিতু ঘরে নেই… ও পালিয়ে গেছে বাবা!”

​মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ির আনন্দ বিষাদে রূপ নিল। ফারুক আরহামের হাতের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল এই আকস্মিক খবরে।
★★★

পুরো ড্রয়িংরুমে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। বরযাত্রী নিয়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে আজকের বর— মিথন নওশাদ। তার কানে যখন খবরটা পৌঁছাল যে পাত্রী পালিয়েছে, তখন তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে কোনো সাধারণ যুবক নয়; সে এদেশের হার্টথ্রব সুপারস্টার, একের পর এক অ্যাওয়ার্ড জয়ী নায়ক। তার চাইতেও বড় পরিচয়, তার বাবা চাইনিজ, যার ফলে মিথনের গায়ের রঙ দুধে-আলতা আর চেহারা হুবহু চাইনিজদের মতো তীক্ষ্ণ ও সুন্দর। কিন্তু সেই সুশ্রী চেহারায় এখন আগ্নেয়গিরির লাভা খেলা করছে।

​মিথন ধীর পায়ে ফারুক আরহামের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত কিন্তু বরফের মতো শীতল। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—

​”ঠিক ত্রিশ মিনিট সময় দিচ্ছি আরহাম সাহেব। এই ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আপনার মেয়েকে আমার সামনে এনে দাঁড় করাবেন। নয়তো এই বাড়িতে আজ বিয়ের সানাই নয়, কান্নার রোল উঠবে। আমি কথা দিচ্ছি, এই বাড়ির একজনকেও আমি জ্যান্ত ছাড়ব না।”

​মিথনের এই চড়াসুরের হুমকি শুনে ফারুক আরহামের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তিনি জানেন, মিথন যা বলে তা করে দেখানোর ক্ষমতা রাখে। সে শুধু তার বান্ধবীর ছেলেই নয়, সে এমন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যার একটা ইশারায় অনেক কিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।

​ফারুক আরহাম কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন
,

“বাবা মিথন, তুমি শান্ত হও। আমি দেখছি…”

​কিন্তু মিথন আর কোনো কথা শুনল না। সে গটগট করে সোফায় গিয়ে বসল, তার চোখজোড়া তখন শিকারি চিতার মতো জ্বলছে। আধঘণ্টার এই মৃত্যুবান যেন পুরো আরহাম বাড়িতে এক বিভীষিকা তৈরি করল।


​এদিকে রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে গোধূলি সব শুনছিল। তার বুকটা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে। সে-ই তো নিতুকে জানালা খুলে দিয়েছে! এখন যদি নিতু না ফেরে, তবে এই পাগলাটে সুপারস্টার কি সত্যিই সবাইকে মেরে ফেলবে?

চলবে………….

5 1 vote
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x