গল্প: কাছে আসা বারণ (০৬)

লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা

পর্ব — ৬

বারান্দা থেকে ত্রস্ত পায়ে ফিরে এলো রিমঝিম। মাঘের মাঝামাঝি সময়ে এতটা সময় শীতে জমে যাবার উপক্রম ছিল৷ তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। শ্যামলা মুখশ্রীতে যেন কেউ সাদা রঙ ঢেলে দিয়েছে ওর। ফ্যাকাশে লাগছে ভীষণ। নিজের জন্মদায়িনীকে অনেক বছর পর হুট করে দেখার পর থেকে মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠল ওর। মাঘের কুয়াশাজড়ানো সকালেও কপালে ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘামের আস্তরণ। অন্তঃপুরে চলতে থাকা অসংখ্য প্রশ্নের ভীড়ে থ বনে মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল সে। নাজিম চাচা কি জানেন এটা কার বাসা? আর যদি জেনেই থাকেন তবে এখানে এসেছেন কেন? জেনেশুনে এই বাসা ভাড়া নিয়েছেন তিনি? তার ওই ছেলেটা! যাকে উদেশ্যে করে ওর আম্মু কথা বলছিল? সে কে ছিল?  অদম্য কৌতুহল নিয়ে ফের বারান্দায় গেল রিমঝিম। ঘাড়টা সামান্য নামিয়ে তিনতালার খোলা ছাদে নজর পড়তেই দেখল ওর মা এখনো সেখানে বসা। চা খাচ্ছেন ছোট ছোট চুমুকে। সেই একই বসার ভঙ্গিমা, পরিপাটি খোপা বাঁধা চুল, ছোট ছোট ফুলের সুতি শাড়ি, গায়ে জড়ানো শাল চাদরে তিনি আজও ঠিক ততটাই আকর্ষণীয় আছেন যতটা আজ থেকে দশ বছর আগে শেষবারের মত রিমঝিম দেখেছিল। নাকে,কানে, হাতের স্বর্ণালংকারে সজ্জিত সুমনাকে অভিজাত মধ্যবয়সী মার্জিত রমনীর ন্যায় লাগছে। তিনি রিমঝিমকে এখনো দেখতে পাননি সম্ভবত। অনেকদিন পর মাকে দেখে দুচোখ ভিজে এলো রিমঝিমের। ঘোলাটে হল সামনের দৃশ্যপট।

বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে অনুভুতিহীনভাবে চেয়ে রইল সেই মহিলার দিকে যে কি না আট বছরের একটা মেয়েকে অন্যের ভরসায় রেখে পাড়ি জমিয়েছিলেন নতুন সংসারে। বেমালুম ভুলে বসেছিলেন সেই ছোট্ট প্রাণের কথা। মামা-মামিরদের মুখ কালো, ভাই-বোনদের সামনে প্রতিনিয়ত হেয় হওয়া এসব যেন নিত্য নতুন উপায়ে হাজির হত একেকদিন। রিমঝিম তো সেদিনই নিঃশেষ হয়ে যেত। সেই মানুষটা যদি সঠিক সময় না আসত! আজ রিমঝিম এখানে থাকত না। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি  ছেলেটাকে উদেশ্যে করে বললেন, —

‘ এইই ছেলে আমার কথা তোর কি একটুও শুনতে ইচ্ছে হয়না? আয়। আমার পাশে বোস। তোর কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো বাবা।’

ঠিক তখনই ছেলেটা ফিরে এলো। এসে স্বাভাবিকভাবে বলল,— ‘ একটু ফ্রেশ হবার সময় তো দেবে ছোটমা।’

এবারে তার পরণে কালো টিশার্ট। আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতেই কদম হড়কাল রিমঝিম।সেই লোকটা আর কেউ নয় বরং শুদ্ধ। লোকটার সম্পর্কের মারপ্যাচ সম্পর্কে তখনও বেখেয়াল রিমঝিম অনুভুতিশূন্য হয়ে দেখে গেল তার জন্মদায়িনীকে।

রান্নাঘর থেকে ডাকতে ডাকতে ভেতরে এলেন শিরিন। তিনি ভীষণ যত্নসহকারে ভাপাপিঠা বানিয়েছেন। কয়েকটা পিঠা বানানো হওয়া মাত্র ছোট বাটিতে করে উঠিয়ে এনেছেন রিমঝিমের জন্য। ঘোলা নেত্রে চাচীর মুখশ্রীতে ফুটে উঠা মায়া, সহবোধ, মমতা চেয়ে চেয়ে দেখল রিমঝিম। মায়ের আদরে কমতি রাখেননি তিনি কোনোদিন। সেই ছোট্ট রিমঝিমকে সামলেছেন একাহাতে। মমতাবোধ উড়াজ করে দিয়েছেন তিনি। জন্ম না দিয়েও মা হওয়া যায়? হ্যাঁ যায় তো! তার চাচী  আছেন তো উদাহরণ হিসেবে। আর ওইযে ওর জন্মদায়িনী তাকে পায়ে ঠেলে নতুন সংসারে মননিবেশ করেছেন।ছেলেকে আদুরে শাসন করছেন।

কিন্তু আল্লাহতালা হয়তো রিমঝিমের ভাগ্যটা খুব একটা খারাপ করেননি। তাই তো ওকে এনে ফেলেছেন শিরিনের আঁচলের ছায়াতলে। টলটলে আঁখিতে ধীরে ধীরে রিমঝিম এগিয়ে এলো শিরিনের কাছে। আচমকাই জড়িয়ে ধরল চাচীকে। কম্পিত কণ্ঠে বলল , — ‘ তুমি এই দুনিয়ায় আমার দেখা সবচেয়ে ভালোমানুষ, চাচী। ‘

রিমঝিমের আচম্বিতে জড়িয়ে ধরায় ভ্যাবাচেকা খেলেন শিরিন। পিঠার বাটিটা রেখে রিমঝিমকে সোজা করে ধরলেন তিনি। একরাশ মমতা নিয়ে বললেন,

— ‘ আমার মেয়ের মন খারাপ কেন? পিঠা পছন্দ হয়নি? অন্য কিছু বানিয়ে দেব? রুটি-ডিম করে দিই?’

আবারও চাচীকে জড়িয়ে ধরল রিমঝিম। ঝরঝর করে কান্নার মাঝে নাক টানল কয়েকবার।  টেনে বলল,

— ‘ আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘায়ু দান করুন চাচী।তুমি সারাজীবন আমার পাশে থেকো। ‘
রিমঝিমকে কাঁদতে দেখে শিরিনের চোখ ভিজে গেলো।  শাড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন।

মেকি গলায় ধমকালেন, — ‘পাগল মেয়ে। নে পিঠা খেয়ে নে। তারপর ভার্সিটি যা। সকাল সকাল আমাকে ইমোশনাল করিয়ে দিলি তো? আমি মোটেও ভালো চাচী নই। দজ্জাল চাচী।’

— ‘ আমার জন্য এমন দজ্জাল চাচীই থাকবে তুমি। ‘ বলেই ফের বারান্দায় চলে এলো রিমঝিম। এখন সে একটু মন খুলে কাঁদবে।

————–

আজ বেশ বেলা করে ভার্সিটির জন্য বের হলো রিমঝিম। সেদিনের পর থেকে সে লিফট ব্যবহার করেনা। শুদ্ধকে তিন তালার ছাদে দেখার পর তো আর-ও নয়। যেচেপড়ে ঝামেলা পোহানোর কোনো দরকার নেই। সিড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে আসার সময় তিনতালায় কারো সঙ্গে বেশ জোরেই ধাক্কা লাগল ওর। সে তো সিড়ির রেলিং ধরে সামলে নিল নিজেকে কিন্তু ওপাশের মেয়েটি  ছিটকে পড়ল ডোর ম্যাটের উপর। দরজার পাশে একটা ফুলের টব রাখা ছিল। মাথাটা গিয়ে ঠুকে গেল টবের সঙ্গে। মেয়েটার পরণে স্কুল ড্রেস। বলা বাহুল্য স্কুল ড্রেসে ভেজা মাটি লেগে নষ্ট হল। মেয়েটির চেহায়া এখনো দেখতে পায়নি রিমঝিম। তবে সে দৌড়ে গিয়ে উঠালো মেয়েটিকে। আস্তে করে বলল, — ‘ ঠিক আছো? ব্যথা পাওনি তো?’

ব্যথায় কোঁকানোর মাঝে চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা,

— ‘ ব্যথা!  মাই ফুট। চোখটা কোথায় রেখে এসেছো? আমাকে দেখতে পাওনি? নাকি ইচ্ছে করে ধাক্কা দিলে?’ বলতে বলতে রিমঝিমের বাড়িয়ে রাখা হাতটা ঝামটা দিয়ে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। পিছু ফিরে দাঁড়াল রিমঝিমের মুখোমুখি। আর তখনই দুজনেই যেন বিদ্যুতস্পৃষ্ট হল। মেয়েটি দেখতে অবিকল রিমঝিমের মত! একইরকম ভাসা ভাসা চোখ, ছোট নাক, আদুরে থুতনির খাঁজ, মেয়েটার চুলও রিমঝিমের মত লম্বা। দুটো বেনুনি করে সাদা ফিতা দিয়ে বেঁধে সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে সে। তবে কিছুটা অমিল আছে বোধহয় ওদের। রিমঝিমের গায়ের রঙ চাপা। আর ঠিক ওর সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি সাদা ফর্সা। রিমঝিমকে নিয়েও হয়তো সেই মেয়েটির একই খেয়াল এলো। বিস্ময়ে ফেটে পড়ল মেয়েটি। ঠিক রিমঝিমের মত ভাসা ভাসা চোখে হতচকিত হয়ে পলক ঝাপটাল। তোতলানো কন্ঠে বলল, — ‘ তুমি কে হও আমার?’

এতক্ষণ রিমঝিম নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেও এবারে স্পষ্টতই বিরক্তিকর একটা আভা ছড়িয়ে পড়ল ওর মুখশ্রীতে। সেই বিরক্তিকর রেশ ধরে শীতল কণ্ঠে বলল, — ‘ কেউ না।’ বলেই হনহন করে নিচে নেমে গেল রিমঝিম। ওর মায়ের সংসারের ছেলেমেয়েরা সব ওকেই পাচ্ছে বিরক্ত করার জন্য? নেমে আসার আগে শুনল ওর আম্মুর কন্ঠস্বর, — ‘ ইরা? শব্দ হলো কেন অত জোরে? আমার সোনা মেয়েটা কি পড়ে গিয়েছে?ব্যথা…. ‘

সুমনার মমতামাখা কন্ঠস্বর কানে যেতেই তাচ্ছিল্যের সহিত হাসল রিমঝিম। মা একজন আবেগপূর্ণ সত্ত্বা। সন্তানের জন্য তার চিন্তার শেষ নেই। ওর মায়েরও তাই-ই। সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন তিনি। শুধু সেই কাতারে রিমঝিম নেই! ফের ভাসা ভাসা চোখ জোড়া ছলছলে হল। দীর্ঘশ্বাসটা গোপন করে সে ছুটল নিজের কাজে।

গেটের বাইরে এসে দাঁড়াতেই একটা রিক্সা এসে থামল রিমঝিমের সামনে। সকাল থেকে কান্নাকাটির উপরেই আছে সে। এমনভাবে বারবার নাক টানতে হচ্ছে যেন সর্দি লেগেছে। মাথাটা ভার। চোখ জোড়া ফুলে ঢোল হয়ে আছে। কান্নাকাটির এই এক সমস্যা। চোখ ফুলে  ঢোল হয়। এমনকি ছোট বাচ্চাদের মত ফোপাঁতে থাকে সে অনেকক্ষণ ধরে। নিজের কান্নার বাহারে নিজেই বিরক্ত রিমঝিম আর এর মধ্যে রিক্সাওয়ালাটা যেন ওর অপেক্ষাতে গেটের সামনে দাঁড়ানো ছিল। ওকে দেখে সবগুলো দাঁত বের করে হাসল। হেসে বলল,

— ‘আপামনি উডেন। ‘

— ‘ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি যাবেন? ‘

— ‘ যাইমু।’

— ‘ ভাড়া কত?’

— ‘ ভাড়া আপনার যা ভালা লাগে দিয়েন

আপা… ‘

রিক্সায় উঠে বসতেই রিমঝিম দেখল শুদ্ধ বের হচ্ছে তার রাজকীয় ভঙ্গিতে। পরণে সাদা পাঞ্জাবি, হাতাটা গোটানো কনুই পর্যন্ত। পেশীবহুল  লোমশ বাহু রোদের তাপে চকচক করছে। তার সেই একই ঝাকড়া চুল, দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ছেয়ে আছে গোটা মুখবিবর। হাতের ঘড়ি কিংবা রিস্টলেট কোনো কিছুতে কমতি নেই তার। রিমঝিমকে দেখে পাঞ্জাবির উপর ঝোলানো রোদচশমাটা চোখে দিয়ে রিক্সাওয়ালাকে হুংকার দিয়ে বলল, — ‘ ও-ই…  আপারে ভার্সিটি নামায় দিয়া আয়। ভাড়া নিবি না। যা.. দেখে শুনে সাবধানে নিয়ে যা।’

ফের বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল রিমঝিমের। মুখশ্রীতে স্পষ্ট ফুটে উঠল তা। শুদ্ধ সম্ভবত ওকেই দেখছিল রোদচশমার আড়ালে। ওকে বিরক্ত হতে দেখে বাঁকা হাসল। আর তাতেই বিরক্তির চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনে তাঁকিয়ে থাকল। কি ঝামেলা! ওর মায়ের বাবুসোনারা সব একে একে ওকে বিরক্ত করার জন্য পথেঘাটে দাঁড়িয়ে আছে কেন?

————

ভার্সিটি এসে একটা মিনিট একটু দম নিতে পারল না নীরব। গেটের কাছে বাইকের উপর রাজকীয় দরবার জমিয়েছেন ওয়াহিদ শুদ্ধ। আশেপাশে কতগুলো মন্ত্রী, সেনা, পেয়াদা জুটিয়েও নিয়েছেন তিনি। পেয়াদা গুলো মিষ্টির উপর যেভাবে কালো বড় মাছিরা ভিনভিন করে, ঠিক ওভাবেই ভিনভিন করছে। রিমঝিম ওদের দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেতে উদ্যত হয়। যেন ওখানে কোনো কাকপক্ষী উপস্থিত নেই। শ্বাস আটকে জায়গাটা পেরিয়ে যাবার মুহুর্তে ভেসে এলো গম্ভীর কণ্ঠস্বর,  — ‘ এইই মেয়ে এইই…?’

কন্ঠস্বর মালিককে রিমঝিম চেনে। তার মায়ের আদরের বাবুসোনাদের একজন। এক সেকেন্ডের থমকে দাঁড়ালো সে। পিছু না ফিরে আবার চলে যেতে উদ্যত হতেই কয়েকটা ছেলে এসে ঘিরে ধরল ওকে। সকলের ঠোঁট জুড়ে লেপ্টে আছে ফিচেল হাসি। সেই হাসি নিয়ে ওদের মধ্যে থাকা একজন বলল,

— ‘আপুমনি একটু সময় হবে?’

দাঁতে দাঁত পিষল রিমঝিম। ঝাঝাল স্বরে বলল, — ‘ না।’

— ‘ এক মিনিটও হবে না? ‘ ওদের মধ্যেকার ছেলেটা ফের জিজ্ঞেস করল রিমঝিমকে।

— ‘ দশ সেকেন্ডও হবেনা। পথ ছাড়ুন। আমার ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। ‘

— ‘ আপুমনি ভাই একটু কথা বলবেন আপনার সঙ্গে। প্লিজ এদিকে আসুন। ‘
কাঁধের ব্যাগটা চেপে ধরে ছেলে গুলোর উদেশ্য আঙুল উঁচিয়ে শাসাল রিমঝিম, — ‘

আমি কোনো বখাটে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলিনা। আমার পথ ছাড়ুন।’

কথাটা শেষ করে ছেলে গুলোকে সাইডে রেখে বেরিয়ে যাবার জন্য উদ্যত হল সে। তবে তার আগে রিমঝিমের মনে হল একটা লম্বা ছায়া এসে দাঁড়াল ওর সামনে। মাথাটা উঁচিয়ে চেয়ে দেখল দীর্ঘদেহি পুরুষের অবয়ব। ঠোঁটের ভাঁযে জলন্ত সিগারেট। ধোঁয়াটা বোধহয় গিলে নিল। নিয়ে ধমকে বলল, — ‘ বড়দের দেখলে সালাম দিতে হয় জানো না?  বেয়াদব মেয়ে? সালাম দাও এক্ষুনি। ভার্সিটির সিনিয়রদের অসম্মান করো? হু? ‘ বলেই একরাশ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল ঠিক রিমঝিমের মুখশ্রী বরাবর। রিমঝিম কিছু বলবে তার আগেই ফের হুংকার দিয়ে ডাকল একটা ছেলেকে। শীতল কণ্ঠে আওড়ালো, — ‘ সিনিয়রদের অসম্মান করার শাস্তি কি ছিল রাতুল? ‘

জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা রাতুল নামের ছেলেটা সেখানে এসে দাঁত কেলিয়ে হাসল। হেসে বলল,

— ‘ কান ধরে দাঁড়ায় থাকা ভাই।’

— ‘ হুম…  কান ধরে দাঁড়ানো।’ বলেই বাইকে গিয়ে বসল সে। ইশারায় রিমঝিমকে কাছে ডাকল। যদিও রিমঝিম এগিয়ে গেল না। তবে শুদ্ধ সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে বলল, — ‘ এই বেয়াদব মেয়ে? ওই গেটের সামনে গিয়ে কান ধরে দাঁড়াও।’ কিন্তু রিমঝিম সে কি আদৌও কান ধরবে? কখনোই না। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল , — ‘

আমি এখানে পড়াশোনা করার জন্য এসেছি।কারো কথায় কান ধরার জন্য নয়। ‘ বলেই হন হ৷ করে হেঁটে চলে গেল গেটের ভেতর। কি আশ্চর্য!  ওর আবার কান্না পাচ্ছে।

————

গভীর রাত। ঘড়িতে বাজে প্রায় দুটো। পুরান ঢাকার এক জীর্ন শীর্ন সাবেকি আমলের দোতালা বাড়ির কিচেনে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। পরণে একটা বহুল ব্যবহৃত সাদা-কালো চেক শার্ট আর ছাইরঙা ট্রাউজার। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ। আজ ঠান্ডা পড়েনি তেমন একটা। অবশ্য মাঘ মাসের শেষের দিকে ঢাকায় তেমন একটা শীত করেনা। কফি বানানোর জন্য দ্রুত গতিতে হাত চালাচ্ছে সে। পানি ফুটে ওঠার অপেক্ষায় আছে। সেল্ফ থেকে চিনির বয়াম নামাতেই দেখল সেটা খালি। কয়েকটা দানা পড়ে আছে সেগুলো আবার কালো পিপড়াদর টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। চিনি নেই দেখে একটা মেদুর ছায়া পড়ল ওর সুদর্শন মুখশ্রীতে। তারা বংশানুক্রমিকভাবে পাকিস্তানের নবাব পরিবারের। কালের পরিবর্তনে নবাবী হারিয়েছে যদিও।  কিন্তু ছাব্বিশের রাফিদের চেহারার গড়ন , উচ্চতা, কন্ঠস্বর তার পূর্বপুরুষের মত বলিষ্ঠ। বড় বোনের তিন বছরের তিতির  চিনি ছাড়া কিছু সুজি খেতে পারেনা। এইজন্যই বোধহয় সন্ধ্যায় কাঁদছিল সে। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে এক টিউশনির টাকায় রাফিদের গোটা সংসারটা চলে। এখনো রাফি ওর টিউশনির বেতন পায়নি এখনো। কাল বেতন পেলে বেশি করে চিনি কিনে রাখবে। গুড়ো দুধের বয়ামও খালি। শেষমেষ গরম পানিতে ব্ল্যাক কফি পাউডার মিশিয়ে, একটা স্টিলের চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে নিজের রুমে এলো। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় জ্বলজ্বল করছে কারেন্ট এফেয়ার্স। আজ রাতের মধ্যে বইটা শেষ করে তবেই ঘুমোতে যাবে সে। একটা চাকরির খুবই প্রয়োজন রাফির। মাস্টার্স ফাইনাল দিয়ে সে বছরই বিসিএস পরীক্ষা দেবার ইচ্ছা তার।সেভাবেই নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলবে রাফি। যেন… ভাবনাটা আসতেই ফোনের গ্যালারিতে ঢুকল সে। স্ক্রিনে ফুটে আছে শান্ত,স্নিগ্ধ মুখশ্রীর, ভাসা ভাসা চোখের এক কিশোরীর অবয়ব। পরণে স্কুল ড্রেস। পরম আনন্দে সে ফুচকা খাচ্ছে৷ পরের ছবিতে  কথা বলতে বলতে বান্ধবীর গায়ে হেলে পড়েছে। থুতনির খাঁজটা এতটা আদুরে লাগে। রাফির ইচ্ছে করে শক্তপোক্ত একটা চুমু দিয়ে দেয় সেথা।  বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রিনে হাত বুলাল রাফি। ঠোঁটের কোনে ফুটে থাকা বিষন্ন হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কলম উঠিয়ে বইয়ের উপর ছোট্ট করে লিখল,

— ‘ প্রিয় ইরাবতী… তি আমো।’ ছবিগুলোর দিকে তৃষ্ণার্তের মত চেয়ে রইল রাফি।

চলবে…..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x