গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (১১)

পর্বসংখ্যা:১১

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

 

 

দুটো ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ প্রীতিষা আর কাবির মেলার ভিড়ে পাশাপাশি হাঁটছিল। রঙিন আলো, মানুষের কোলাহল, আর দূরে ভেসে আসা নাগরদোলার শব্দ এসবকিছুই প্রীতিষার জন্য প্রথম। তাই প্রীতিষার মনটা অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে ছিল। তাছাড়া কাবিরের সঙ্গে আসতে পেরে সে আরও বেশি খুশি। এত সহজে যে ঘাড়ত্যাড়া’টা রাজি হয়ে যাবে, সেটা নিজেও ভাবেনি।

অন্যদিকে কাবির পুরোপুরি নিজের ভেতরের ভাবনায় ডুবে। মেলায় একা একা অনেক ঘোরা হলেও, জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের সঙ্গে ঘুরছে সে। তাও আবার মেলায় এভাবে! সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার জীবনে যা কিছু ঘটছে, সবকিছু যেন হঠাৎ হঠাৎ এসে তাকে অপ্রস্তুত করে দিচ্ছে। কিছুই আটকাতে পারছে না, কিছুই পুরোপুরি বুঝতেও পারছে না। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল প্রীতিষার ডাকে,
” এই কাবির, শোনো না! ওগুলো কিনে দাও না! “

কাবির চমকে উঠে বলল,
” কি! কোনডা?”

প্রীতিষা আঙুল তুলে সামনের হাওয়াই মিঠাইয়ের দিকে দেখিয়ে একেবারে বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে উঠল,
“ওইযে! গোলাপি গোলাপি, সাদা সাদা! “

কাবির নাক সিটকে বলল,
“বাচ্চাদের মতো ফাল পারতাছো ক্যা! ভালো কইরা কইলেই তো হয়। আসো, দিতাছি। “

তারপর একটু থেমে আবার বলল,
“আর গোলাপি-গোলাপি, সাদা-সাদা কি? মানুষ শুনলে কি কইবো! ওইগুলার নাম বুড়ির চুল। “

প্রীতিষা লজ্জিত ভঙ্গিতে খানিকটা মাথার চুলকে বলল,
“ওহ! আচ্ছা… আমি জানতাম না নামটা।”

এরপর কাবির এগিয়ে যায় হাওয়াই মিঠাই কিনতে। কাবিরের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে প্রীতিষার ঠোঁটে আপনাতেই একটা মুচকি হাসি এসে গেল। কিছুক্ষণ পর কাবির তার হাতে দুটো হাওয়াই মিঠাই ধরিয়ে দিল। প্রীতিষা যেন খুশিতে ঠিকরে পড়ল। যা তার চোখে মুখে একরাশ উচ্ছ্বাস দেখে যে কেও বলবে। আর এসবই দৃষ্টিগোচর হলো কাবিরের। এত অল্পতেই খুশি হলো মেয়েটা! কি একটা ভেবে চোখ নামিয়ে নিল কাবির।

আরও একটু সামনে যেতেই প্রীতিষার চোখে পড়ল ফুচকার স্টলগুলোর, সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তেই সে কাবিরের শার্টের কোনা ধরে আলতো করে টেনে খোঁচাতে লাগল। কাবির ছিটকে সরে গিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“এই ছেমরি! খোঁচাখুচি করো ক্যা? আবার কি দেখলা? আজ তো দেখা যায় আমারে ফতুর বানানোর মতলব কইরা আইছো! “

প্রীতিষা ফিক করে হেসে বলল,
” কিপ্টুস একটা! আচ্ছা যাও, এইটাই লাস্ট। ফুচকা খাওয়াও শুধু। “

” পারুম না। সরো। “

কাবিরের উত্তর ছিল একেবারে সোজাসাপটা। কিন্তু প্রীতিষা দমলো না। নিজের মোক্ষম চাল চেলে ঠোঁট উল্টে কৃত্রিম কাঁদো কাঁদো মুখ করে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর কাবিরের সামনে-পেছনে, আশেপাশে সবজায়গায় গিয়ে নিজের দিকে তাকানোর চেষ্টায় বলল,
“দেখো আমাকে… দেখোওও!”

কাবির মুখ ফিরিয়েই রইল।
“না না। তাকামুনা। তুমি আমার দুর্বলতা বুইঝা ফালাইছো না? “

কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই কাবিরের চোখ পড়ে গেল প্রীতিষার পানপাতার ন্যায় মুখটায়। ব্যাস, প্রীতিসা জিতে গেল আর কাবির হারলো। কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেই ফেলল,
“আজ বহুত জ্বালাইছো তুমি। এইভাবে কোনোদিন কেউ আমারে জ্বালায় নাই! “

প্রীতিষা একগাল হেসে উত্তর দিল,
“আমিও এভাবে কারো কাছে বায়না করিনি। আর কখনো মেলাতেও আসিনি কারো সঙ্গে। তুমিই প্রথম।”

কাবির একটু অবাক, একটু আগ্রহী হয়ে বলল,
“কোনোদিন মেলাতে যাও নাই মানে?”

হাঁটতে হাঁটতেই প্রীতিষার কণ্ঠ হঠাৎ ম্লান হয়ে এল। বলতে লাগলো,
“আমি আসলে বাইরের জগতের সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নই, কাজ ছাড়া। জীবনের বেশিরভাগ সময় পড়াশোনার মাঝেই আবদ্ধ হয়েই থেকেছি। মাথার ভেতর একটাই কথা গেঁথে ছিল পড়াশোনা করো, আর নিজের জায়গা শক্ত করো। বাইরের জীবন চেনা বলতে নিজের খরচ চালাতে পার্টটাইম কাজ করেছি, প্রয়োজনে ঘরোয়া কেনাকাটা। এইতো এতটুকুই। ভাইয়াই শিখিয়েছিল এসব আমাকে। কারণ, আল্লাহ না করুক যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়… তখন ভাইয়া ছাড়া আমার রক্তের কেউ থাকবে না এই পৃথিবীতে। তখন আমার কি হবে? “

কাবির থমকে গেল। অপলক তাকিয়ে রইল প্রীতিষার দিকে। কথাগুলোর মাঝে যে অকথ্য ব্যথা লুকিয়ে আছে, সেটা তার অচেনা নয়। এই অন্তর্গত ক্ষতচিহ্নগুলো কাবির নিজের ভেতরেও বহুদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে।

——————————————-

কাবির ধ্যান ভঙ্গ হয়ে সম্বিৎ ফেরে কারো পরিচিত কন্ঠে,
“ভাইজান!!”

ডাক শুনে পেছন ফিরে তাকাল কাবির। তার সঙ্গে প্রীতিষাও তাকায়। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে কায়রা, বেশ গুরুতর ভঙ্গিমায়। যেন গোপন কিছু ধরে ফেলেছে। তাই ছোট ছোট কৌতূহলী নজরে সে কখনো কাবিরকে দেখছে, আবার কখনো কাবিরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে। হঠাৎ কোমরে হাত রেখে দুষ্টু হাসি হেসে বলে উঠল,
” ওয়ে হয়ে! তাহলে বড় ভাইজান ঠিকই বলেছিলো!”

কাবির সেসবে পাত্তা না দিয়ে সন্দিহান নজরে ভ্রু কুঁচকে একপাশে তাকিয়ে বলল,
“তুই এইখানে কী করস? একা একা মেলায় আইছস নাকি?”

কায়রা চোখ পাকিয়ে বলে,
” একা? কখনোই না! আমার বড় বড় দাম*ড়া দুই ভাই জীবনে আমাকে একা ছাড়বে? রিলাক্স! বান্ধবীদের সঙ্গে এসেছি।”

“তাইলে তোর বান্ধবীরা কই?”

কায়রা হাতের ইশারায় পাশের দোকানের দিকে দেখিয়ে দেয় নিজের কয়েকজন বান্ধবীদের। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই ভোল পাল্টে বলে,
” এক মিনিট, এক মিনিট! তুমি আমাকে জেরা করছো কেন, ভাইজান? জেরা তো আমি করব তোমাকে!”

কাবির হো হো করে হেসে ওঠে। আর প্রীতিষা? সে তখনো পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেনি। তবে “ভাইজান” ডাকটা শুনেই বুঝে যায়, মেয়েটি কাবিরের বোন। কায়রা এগিয়ে এসে প্রীতিষাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
” ভাইজান! এই মেয়ের বয়স কত? কেন জানি পিচ্চি লাগছে? সত্যি সত্যিই এ আমার ভাবী তো?”

” এক্সকিউজ মি আপু! ”
বলে গলা খাঁকারি দেয় প্রীতিষা। সে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল,
“আমার বয়স উনিশ বছর এগারো মাস। আমি কিন্তু একদম পিচ্চি নই! “

কায়রা আলতো হেসে বলে,
” কিসে পড়ো? “

“অনার্স ফাস্ট ইয়ার। “

এদিকে কাবিরের চোখ কপালে। এত ছোট! সে তো ভেবেছিল মেয়েটির বয়স অন্তত একুশ-বাইশ হবে। এদিকে কায়রা হাসিমুখে চোখ টিপে বলল,
” সমস্যা নেই। ভাবী আমার পছন্দ হয়েছে। “

প্রীতিষা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, লজ্জায় চোখ মাটিতে নামিয়ে নেয়। কাবির বিরক্ত গলায় বলে,
“আরে কিসের ভাবী-টাবি! চুপ থাক তো। আর তুমি সত্যিই এত ছোট? আমার তো দেইখা লাগে না! “

“এত ছোট ছোট করছো কেন? “

প্রীতিষা গম্ভীর গলায় বলে,
“আমার বান্ধবীদের কেউ কেউ তো বাচ্চার মা পর্যন্ত হয়ে গেছে!”

কাবির দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণ করে,
” এসবে আমি নাই ভাই। এখন মশকরা রাখ তোরা! “

এরপর প্রীতিষার দিকে তাকিয়ে বলে,
“অনেক ঘোরা হইছে। এখন আসো, রিকশায় উঠায় দিই। আমিও বাড়িত যামু।”

তারপর কায়রার দিকে তাকিয়ে কড়া স্বরে বলে,
“আর শোন কায়রা, সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবি। তোর বান্ধবীরা না থাকলে আমিই বাসায় দিয়া আইতাম।”

” হ্যাঁ ভাইজান, এখনই বের হবো। লেট করব না। “

এরপর কায়রা প্রীতিষার দিকে ঘুরে মুচকি হেসে বলে,
” আর ভাবী, ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও। মাঝেমধ্যে ফোন-টোন দিব তো। “

” এইসব কী শুরু করছস! “

কাবির মাথায় হাত তুলে বলে সানগ্লাস কপালে উঠিয়ে বলল। কায়রা কাবিরকে বলে,
” তুমি চুপ থাকো তো, ভাইজান! “

প্রীতিষা পরক্ষণেই হেসে কায়রাকে বলে,
“নাম্বার সেভ করো, বলছি। “

নাম্বার সেভ করেই কায়রা ঘুরে চলে যেতে যাবে, ঠিক তখনই এক শক্তপোক্ত, চওড়া বুকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পিছলে পড়ে যেতে গেলে মুহূর্তেই এক বলিষ্ঠ বাহু তাকে আগলে ধরে। ভয়ে কায়রা চোখ বন্ধ করে খিচে ফেলে। একটু ধাতস্থ হয়ে চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
“আমার কোমরে ব্যথা পাচ্ছি না কেন? এতক্ষণে তো ভেঙে যাওয়ার কথা!”

গম্ভীর কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে কেউ বলে,
” পড়লে তো ব্যথা পাবে, ইডিয়েট! “

ধমক খেয়ে কায়রা ছিটকে তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়ায়। চোখ খুলতেই সামনে প্রীষানকে দেখে। মুহূর্তেই ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলে যায় কায়রার। পুরো দৃশ্যটাই যেন সিনেমার মতো লাগলো তার কাছে! ভাবনার মাঝে প্রীষান তেজি স্বরে বলে,
“যেখানেই যাও ঝড় নিয়ে আসো কেন? স্বাভাবিক থাকতে পারও না কোথাও? “

কায়রা তার বোকামি বুঝতে পেরে বলে,
” এক্সট্রিমলি সরি…স্যার। “

এরই মাঝে প্রীষান প্রীতিষাকে মেলায় দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,
” তুই মেলায় এসেছিস? কই আমাকে বলিসনি তো!”

প্রীতিষা থমকে যায়। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ভাগ্য ভালো, কাবির তখন আশপাশে নেই। প্রকৃতির ডাকে কোথাও গিয়েছে। কিন্তু প্রীতিষা কি বলে সামাল দেবে বুঝতে পারছিলো না। এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো ভয়ের চোটে। কোনোমতে আমতা আমতা করে বলতে চেষ্টা করল,
“ওই আসলে ভাইয়া…হয়েছে কি? আমি… “

কায়রা বুঝলো প্রীষান স্যারের বোন এই প্রীতিষা! অবাক হলো প্রচুর। তবে সেসব নিয়ে না ভেবে পরিস্থিতি বুঝে এগিয়ে এসে বলে,
“প্রীতিষা আমার ফ্রেন্ড হয়, স্যার। ও আমার সাথেই এসেছে। তাই না?”

প্রীতিষা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ায়। কায়রা ভদ্রভাবে বলে,
“ঠিক আছে, স্যার। তাহলে এবার আমরা আসি। আসসালামু আলাইকুম।”

প্রীষান সংক্ষেপে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
” ওয়ালাইকুম আসসালাম। “

প্রীষান চোখের চশমাটা ঠিক করে বলে,
“আমাকে বললেই তো নিয়ে আসতাম। আচ্ছা চল, বাড়ি যাই। প্রীভান আজ জোর করছিলো, বলল মেলার শেষ দিন আজ, নিয়ে যেতেই হবে। তাই ওকে নিয়ে এসেছি। মেয়েটা তো পায়ের জন্য আসতে পারলো না। “

প্রীতিষা মাথা নেড়ে বলে,
” হ্যাঁ। প্রিহার সঙ্গে আসারই প্ল্যান ছিলো। যাইহোক, প্রীভ কোথায়? “

ঠিক তখনই স্ট্রিটফুডের প্যাকেট হাতে প্রীভান এসে হাসিমুখে বলে,
” মণি! তুমিও এসেছো এখানে?”

” হ্যাঁ। চল, বাসায় যাই। সন্ধ্যা হলো বলে…আর হাতে এগুলো কি?”

প্রীভান বলল,
“আপুর জন্য, তোমার জন্য স্ট্রিট ফুড কিনেছি। আমি তো খেয়েও এসেছি বিভিন্ন আইটেম। এত টেস্টি না এগুলো! “

প্রীতিষা অল্প হাসলো। আর কোনো কথা না বলে প্রীষান প্রীতিষা আর প্রীভানকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে। তাছাড়া মেয়েটাও বাসায় একা রয়েছে। বেশি দেরি করা ঠিক হবে না।

***************************

সন্ধ্যার আগেই কায়রা বাসায় ফিরে এলো যথারীতি। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে ঢুকে পড়ল কায়েশীর ঘরে। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো সবসময়ের মতো ভাবীর কাছে না উগরে দিলে তার শান্তি নেই। তাই ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলল,
“ভাবীইইই! ভাবীইইই! কোথায় তুমি?”

কায়েশী তখন নিঃশব্দে কাপড় ভাঁজ করছিল। কায়ানকে মাত্রই ঘুম পাড়িয়েছে সে। কায়রার চিৎকারে ধ্যান ভাঙতেই সে নরম স্বরে ধমক দিল,
“আরে কী করছো! আস্তে কথা বলো। কায়ান তো এইমাত্র ঘুমালো! “

কায়রা একগাল হেসে বলল,
“তাহলে আমার রুমে আসো। কুইক! “

মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল কায়েশী। কায়রার ঘরে গিয়ে দু’জনে বারান্দায় বসল। কায়রা মুখ খুলতে যাবে, তার আগেই কায়েশী ডিভানে গা এলিয়ে বলল,
“সব শুনব। তবে তার আগে তেলের বোতলটা নিয়ে এসো। তেল দিতে দিতে গল্প শোনা যাবে। যাও। “

কায়রা ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভাবীর দিকে। আবার কিসের তেল!
“ভাবী, এমন করছো কেন? আমি তেল দেব না। তেল দিলে কেমন দেখায় জানো! ই’উ’উ!”

কথাটা বলেই নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল সে। কায়েশী হেসে উঠল এরুপ ভঙ্গিমায়। বলল,
“তোমার চুল দেখেছো? দিনদিন ঘোড়ার লেজের মতো রং ধরছে। আর কথা নয়, গিয়ে নিয়ে এসো। “

আর কোনো তর্ক না করে কায়রা তেলের বোতল এনে দিল। কায়রা মেঝেতে বসতেই কায়েশী তার লম্বা চুলের রাবার ব্যান্ড খুলে তেল ঢেলে দিতে শুরু করল, আঙুলের ছোঁয়ায় আলতো মাসাজ করলো। মাথায় এরকম হালকা মাসাজ পেতেই কায়রার চোখ আপনাআপনি বুজে এলো। কী বলতে এসেছিল, সব ভুলে গিয়ে আরামের ঢেউয়ে ভেসে গেল সে। কায়েশী মৃদু স্বরে বলল,
“এত সুন্দর লম্বা চুলের যত্ন নাও না কেন? এভাবে তেল লাগালে দেখবে কত আরাম লাগে। মাথাব্যথা, ভারী ভাব, সব একেবারে উধাও হয়ে যাবে।”

চোখ বুজেই কায়রা ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ ভাবী… এবার সিরিয়াসলি খুব আরাম লাগছে। “

কায়েশী আলতো করে তেল দিতে দিতেই বলল,
“এবার বলো। কী যেন বলতে চেয়েছিলে? তখন তো ছুটে আসলে! “

কায়রা চোখ খুলে হালকা নড়েচড়ে বসল।
” ওহ… হ্যাঁ। জানো আজ কী হয়েছে? আজ প্রীষান স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।”

কায়েশী স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“তা তো তোমার সাথে প্রায় রোজই দেখা হয়।”

কায়রা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে আপত্তি জানাল। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতে লাগে,
“আরে…না না, পুরোটা শোনো আগে। স্যারের একটা বোন আছে। যদিও আমি জানতাম না। তার সঙ্গে কাবির ভাইয়ার কিছু–মিছু চলছে! আজ মেলায় দু’জনকে হাতেনাতে ধরেছি।”

কায়েশী না বুঝতে পেরে বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিছু–মিছু মানে?”

কায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওফ…ভাবী! কিছু–মিছু মানে প্রেম..প্রেম! একেবারে খাঁটি প্রেম। বুঝেছো?”

কায়েশী হঠাৎ তেল দেওয়া বন্ধ করে দিল।
” কাবির প্রেম করছে? অবিশ্বাস্য!”

কায়রা হেসে উঠল।
“আমারও প্রথমে তাই লেগেছিল। তবে মেয়েটা দেখতে বেশ ভালোই। মানাবে দুজনকে।”

কায়েশী একটু ভেবে নিয়ে বলল,
“আচ্ছা, এই প্রেম সফল হওয়ার চান্স কতটা বলো তো? কোনো প্রফেসর কি সহজে তার বোনকে এমন ছন্নছাড়া, বেপরোয়া ছেলের হাতে তুলে দেবে?”

কায়রা অবাক চোখে তাকাল।
“এসব কী বলছো ভাবী? আমার ছোট ভাইজান কোন দিক দিয়ে খারাপ? “

কায়েশী হেসে নরম স্বরে বলল,
“আমি খারাপ বলিনি, কথার মানে ভুল বুঝো না। আমি শুধু বাস্তবতার কথা বললাম। তুমিও একটু লজিক দিয়ে ভেবে দেখো তো! “

কায়রা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তীক্ষ দৃষ্টিতে কায়েশীর দিকে তাকিয়ে চোখেমুখে একরাশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,
“আমার ছোট ভাইজানকে আমি চিনি। তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যদি সে সত্যিই ভালোবাসে, তাহলে যেকোনো মূল্যে ভাবীকে নিজের করেই ছাড়বে।”

কায়েশী তেলের বোতলটা পাশে সরিয়ে রেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। কিছুটা হেয়জ্ঞান করেই বলল,
“কী করবে সে? না মানলে তোমার বড় ভাইয়ের মতো তুলে নিয়ে আসবে নাকি?”

কায়রা মাথা নেড়ে মুচকি হাসলো। এরপর দৃঢ় মনোবলের সহিত বলল,
“উহু! দুটো কাহিনিকে এক করে ফেলো না। তোমার মত ছিল না, তাই বড় ভাইজান তুলে নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু ছোট ভাবীর মত আছে। তাই সবাইকে মানিয়েই ভাবীকে নিয়ে আসবে আমার ছোট ভাইজান… যদি আমি খুব ভুল না করি।”

কায়েশী কথার পিঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলতো হাসলো। অতপর নিরেট স্বরে বলল,
“তোমার কথারই জয় হোক, ভাগ্য যেন তার পক্ষেই থাকে। বিশ্বাস করো, আমিও এটাই চাই। “

চলমান…….

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x