গল্প: যদি আবার ভালোবাসো (০৬)

লেখনীতে:আইরা নূর

পর্ব :০৬

 

 

‼️কার্টেসি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ‼️

একটা মেয়ে দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে সায়েরের গলা জরিয়ে ধরে তার গালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সায়ের মেয়েটাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মুচকি হেসে তার হাতের তালুর উল্টো পিঠে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সাইনা তাদের থেকে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল।

মেয়েটার হাতে সায়ের কে ঠোঁট ছোঁয়াতে দেখে সাইনার হৃদপিণ্ড টা যেনো জ্বলন্ত আগুনের পিণ্ডে পরিণত হয়েছে। বুকের ভেতরটা তার খাঁ খাঁ করছে। গলা টা ক্রমশ ধরে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু যেনো ঘোলাটে হয়ে আসছে মেয়েটার।

তবুও সাইনা ঠাঁই সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যেনো সে কোনো এক মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। মেয়েটা সায়েরের হাত ধরে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মেয়েটিকে দেখেই মনে হচ্ছে যে সে খুব মডার্ন। পরনে রয়েছে একটা শর্ট ড্রেস। চুল গুলো পিঠ অব্দি ছড়ানো, ওতো টা বড় ও না তবে একদম স্ট্রেট।

মুখে একগাদা মেকআপ দেখে মনে হচ্ছে যে কোনো ফ্যাশন শো তে যাবে মেয়েটা। সাইনা অশ্রু ভরাট চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দুইজনের দিকেই। মেয়েটা সায়েরের হাত ছেড়ে দিয়ে তার উদ্দেশ্যে বলে,

—সায়ের, বেইবি এই মেয়েটা কে..??

সায়ের:- ওহ রিদি, এই মেয়েটা হলো আমার নতুন মেড সাইনা।

সায়েরের মুখে মেড কথাটা শোনা মাত্রই সাইনা নিজের বুকে হাজার টন ভারী কিছুর উপস্থিতি অনুভব করে। কষ্টে ভেতর টা তার দুমড়ে মুছড়ে যাচ্ছে বারে বারে। তবে সাইনা তো কষ্ট লুকাতে বেশ পারদর্শী। ছোট থেকে সে এটাই করে আসছে। অবশ্য নিজের কষ্ট গুলো সে কার সামনেই বা প্রকাশ করবে। তার আপন বলে কেই বা আছে এই পৃথিবীতে।

সায়ের পলকহীন ভাবে সাইনার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার বলা কথাই সাইনার প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন হতে পারে তাই বোঝার চেষ্টা করছে সায়ের। কিন্তু সাইনা এতো গুলো বছরে একটু একটু করে নিজের বাইরের খোলস টাকে এতটাই শক্ত করে ফেলেছে যে বাইরে থেকে তার মনের ভেতর ঠিক কি চলছে সেটা বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ্ ছাড়া আর কারোরই বোঝার ক্ষমতা নেই।

সাইনা খুব ভালো করেই জানে সায়ের ইচ্ছা করেই এমনটা করছে কারণ সায়ের তো সাইনার প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইছে। সাইনা আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে চুপচাপ সেখান থেকে চলে যায় খাবার টেবিলের কাছে আর অন্য প্লেটে ও খাবার বাড়তে শুরু করে। সাইনা, সায়ের কে অবাক করে দিয়ে ভেতরে চলে যাওয়ায় সায়ের ও রিদি কে নিয়ে খাবার টেবলের কাছে আসে আর সাইনার উদ্দেশ্যে বলে,

সায়ের:- সাইনা, meet my fiance রিদি। কিছুদিন ও এই বাড়িতেই থাকবে তাই না ডার্লিং।

সায়েরের কথার প্রতিউত্তর রিদির মুখের হাসি আরো প্রশস্থ করে আর বলে,

রিদি:- অবশ্যই, যত দিন না আমাদের বিয়ে হচ্ছে ড্যাড ততদিন আমাকে এখানেই থাকতে বলেছেন। তাই তো সব জিনিস পত্র গুছিয়ে নিয়ে একে বারে তোমার ফ্ল্যাটে উঠেছি, সায়ের।

সায়ের রিদির কথাই একটা সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে আবারো সাইনার উদ্দেশ্যে বলে,

সায়ের:- আরেকটা কথা সাইনা, ওর কিন্তু ভালোভাবে খেয়াল রাখবে। আমার ফিওন্সে বলে কথা। ওর যত্ন আত্তি তে যেনো কোনো ত্রুটি না থাকে। আমি যখন বাড়িতে থাকবো না তখন ভালো ভাবে ওর দেখা শোনা করবে তুমি, বুঝেছ কি বললাম আমি।

সাইনা শুধু সায়েরের কথাই মাথা নাড়াই। কিন্তু মুখে একটা কথা ও বলে না। মাথা নিচু করে সে এক নাগারে নিজের হাত দুইটা ডলছে। সায়ের, সাইনার এই রকম ব্যবহার দেখে একদমই শান্তি পাচ্ছে না। সায়ের তো চাইছে যেনো সাইনা রিয়েক্ট করে কিন্তু সাইনা তো সাইনাই তার মনে যে এখন ঠিক কি চলছে সেটা শুধু সে আর তার আল্লাহ ই জানেন।

সাইনা হঠাৎই মাথা তুলে সায়ের আর রিদির উদ্দেশ্যে বলে,

সাইনা:- আপনাদের খাবার সার্ভ করা হয়ে গিয়েছে ম্যাম আর স্যার। আপনারা খেতে বসুন।

সাইনার কথাই সায়ের বেশ অবাক হয়ে যায়। সাইনা তাকে স্যার বলে ডাকছে। সায়েরের ভাবনার মাঝেই রিদি বলে উঠে,

রিদি:- এই মেয়ে আগে বাইরে থেকে আমার ল্যাগেজ গুলো ভেতরে নিয়ে আসো।

সাইনা:- জি ম্যাম, আমি এক্ষণই যাচ্ছি।

বলেই সাইনা দেরি না করে দ্রুত বাইরে চলে যায়। ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রিদির দুইটা বড় বড় আর ভারী ল্যাগেজ রাখা ছিল। সাইনা তার জীর্ণ শীর্ণ শরীর নিয়েই সেই ভারী ল্যাগেজ গুলো কোনো রকমে টেনে ভেতরে আনে। এরপর সায়ের কে জিজ্ঞেস করে,

সাইনা:- এই ল্যাগেজ গুলো কোথায় রাখবো..??

সায়ের:- আমার পাশের রুমটাতে গিয়ে রাখো।

সাইনা ও আর কথা বাড়ায় না। কালকে সায়ের তাকে যেই রুমে থাকতে বলেছিল সেই রুমে রিদির ল্যাগেজ নিয়ে চলে যায় সাইনা। ল্যাগেজ গুলো রেখে রুমের বাইরে এসে সায়ের আর রিদি কে খেতে বসতে বলে। রিদি ও চেয়ার টেনে বসে পড়ে। খাবারের দিকে তাকিয়েই রিদি নিজের মুখটা বিকৃত করে সাইনার উদ্দেশ্যে বলে,

রিদি:- এইসব কি রান্না করেছো..?? এত অয়েলি কেনো এগুলো…? তুমি কি আমার এই সুন্দর চেহারা নষ্ট করে দিতে চাও..??

বলেই রিদি, সায়েরের দিকে তাকিয়ে ন্যাকা স্বরে বলে,

রিদি:- বেইবি তুমি এই মেয়েকে বলোনি কেনো যে আমি এত অয়েলি খাবার খাই না। এগুলো খেলে আমার ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে তো। তখন আমাকে একদম বাজে দেখাবে না।

সায়ের চেয়ার টেনে রিদির পাশে বসে আর টেবিলের দিকে তাকাতেই খেয়াল করে যে সাইনা তার পছন্দের খাবার গুলোই রান্না করেছে আজকে। লুচি, ছোলার ডাল, আলু ভাজার সাথে আরো তিন রকমের সবজি ভাজা বেগুন ভাজা, পটল ভাজা, ফুলকপি, গাজর আর আলু দিয়ে এক রকমের ভাজা।

খাবার গুলো দেখে খুব লোভনীয় লাগছে সায়েরের কাছে। অনেক দিন হলো সে এই খাবার গুলো ছুঁয়ে ও দেখেনি। বাবা মা চলে যাওয়ার পর তো এইসব খাবার খাওয়া কোন কালেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার। সায়ের কে চুপ থাকতে দেখে রিদি আবারো বলে উঠে,

রিদি:- বেইবি তুমি চুপ করে কেনো আছো..?? এই মেয়েটা এইসব কি রান্না করেছে..?? আমি এগুলো খেতে পারব না। এতো অয়েলি খাবার খেলে তো আমি অসুস্থ্য হয়ে যাবো। এমনিতেই সামনে আমাদের বিয়ে, বিয়ের আগে অসুস্থ্য হয়ে গেলে কি ভালো হবে বলো। আমি এইসব খাবার খাবো না।

রিদির কথাই সাইনা বলে উঠে,

সাইনা:- আচ্ছা ম্যাম আপনি আমাকে বলুন যে আপনি কি খাবেন আমি এক্ষণই বানিয়ে দিচ্ছি আপনাকে।

রিদি এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে আসে আর সাইনার কাছে গিয়ে খুব জোরে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দাঁত কটমট করে বলে,

রিদি:- এখন রান্না করেই বা কি হবে। আমার খাওয়ার টাইম তো শেষ। তোর জন্য আমাকে আজকে না খেয়ে থাকতে হবে যত্তসব। কোথা থেকে যে তুলে আনো এইসব ফালতু মেয়েদের। বেইবি উঠো তোমাকে ও এই সব অয়েলি খাবার খাওয়া লাগবে না। আমি চাইনা আমাদের বিয়েতে কোনো বাঁধা আসুক।

বলেই রিদি সায়েরের হাত ধরে চেয়ার থেকে টেনে তাকে দাঁড় করাই আর তার রুমে দিয়ে আসে। রিদির পাল্লায় পড়ে সায়েরের আর খাইনা হয়না। সাইনার বেশ খারাপ লাগে তাই সে এতক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সায়ের রুমে যাওয়ার আগে একবার সাইনার দিকে ঘুরেও তাকাই নি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সায়ের একদম ফরমাল পোশাকে রেডি হয়ে নিজের রূম থেকে বের হয় অফিসে যাওয়ার জন্য। সায়ের যাওয়ার আগে সাইনা কে একবার নিজের কাছে ডাকে আর বলে,

সায়ের:- শোনো রিদির ভালো করে করে খেয়াল রাখবে। ও যা যা বলবে তাই তাই করবে। ব্রেকফাস্ট এ এইযে অয়েলি খাবার রান্না করেছো না। লান্সে আর ডিনারে আবার এইসব খাবার রান্না করো না। ও যা যা খেতে চাইবে তাই তাই রান্না করবে। আর রিদি একটু পরিপাটি কাজ পছন্দ করে। কাজ গুলো যেনো একটু গোছানো হয়।

বলেই সায়ের চলে যেতে নেয় কিন্তু সাইনা তাকে পিছন থেকে আবারো ডাক দেয়। সাইনার ডাক শুনে সায়ের, তার দিকে তাকাই। সায়েরের মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। সাইনা নিজের সব সংকোচ বোধ এক পাশে রেখে সায়েরের উদ্দেশ্যে বলে,

সাইনা:- আমি সব করবো তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে সায়ের।

সায়ের:- কি প্রশ্ন? (ভ্র কুঁচকে)

সাইনা:- আমাকে কেনো বিয়ে করলে..?? যখন তোমার বিয়ে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল অন্য একজনের সাথে।

সায়ের একটা বাঁকা হাসি দিয়ে সাইনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

সায়ের:- তোমাকে বিয়ে করেছি শুধুমাত্র কষ্ট দেওয়ার জন্য। তুমি কি ভেবেছো তোমার মতো মেয়েকে আমি নিজের বউ বলে সবার সামনে স্বীকৃতি দেবো। হয়তো দিতাম তবে তুমি নিজের হাতেই সেই অধিকার নষ্ট করেছো। এখন আমার কিছু করার নেই। আজকে তোমার যা অবস্থা তার জন্য কেবল মাত্র তুমি নিজেই দাই সাইনা।

সাইনা কিচ্ছু বলে না। সে ফ্যাল ফ্যাল নয়নে সায়েরের দিকেই তাকিয়ে আছে। সায়ের, সাইনার খুব কাছে এসে আবারো বলে,

সায়ের:- তোমার জীবন আমি হেল করে দেবো। যেই ভাবে তুমি ২ বছর আগে আমার জীবনটাকে হেল করে দিয়েছ, মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে। কি ভেবেছো এত সহজে ছেড়ে দেবো তোমাকে। উহু এতো সহজে তো তোমাকে ছাড়বো না আমি।

সাইনা একটা কথা ও বলছে না কারণ সায়ের যা বলছে তা তো ঠিকই। সেই তো নিজের হাতে সায়েরের জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছে। তার পড়াশোনা, তার স্বপ্ন সব কিছু শেষ করে দিয়েছে সে। এখন এইসব কিছুর দাই ভার তো তাকেই নিতে হবে। তাই এখন সায়ের যা করছে তাতে সাইনার আর কিছুই বলার নেই।

সাইনা:- হুম ঠিকই করেছো তুমি। আসলে আমি কারো কাছে ঋণী হয়ে থাকতে চাই না। আর তোমার কাছে তো আমি একটা অ’প’রা’ধী। তাই তুমি আমার সাথে যা খুশি তাই করতে পারো আমি তোমাকে আর বাঁধা দেবোনা। আমার কারণেই তুমি সবকিছু হারিয়েছো। তার দাই ভার তো আমাকেই নিতে হবে। এতো বড় পাপের দাই তো আর এড়িয়ে যেতে পারি না আমি। ও আরেকটা কথা বলছিলাম। তোমরা কি কি খাবে সেটার যদি একটা লিস্ট করে দিতে তাহলে আমার জন্য খুব ভালো হতো। আসলে সকালে তো তোমরা কিছুই খেলে না। তাই যদি একটা লিস্ট করে দিতে।

সায়ের:- সেটা রিদি কে বলো ও তোমাকে লিস্ট করে দেবে। আর শোনো ওকে বেশি বিরক্ত করবে না।

বলেই সায়ের দ্রুত পায়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যায়।

~চলবে~

 

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x