লেখিকা:আয়াত বিনতে নূর
পর্ব:০৬
🚫 কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫
রাত তখন প্রায় তিনটার কাছাকাছি।
চারদিক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে—এমন নিস্তব্ধতা যেন শব্দও সাহস করে জন্ম নিতে পারে না।
কোনো কাক-পক্ষী তো দূরের কথা, রাতজাগা কুকুরের ডাকও আজ শোনা যাচ্ছে না।
ঠিক সেই নীরবতাকে ভেঙে শেখ বাড়ির সামনে এসে থামল রিদওয়ানের বাইক।
হালকা একটুখানি ব্রেকের শব্দ, তারপর ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশ আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রিদওয়ানের বাইক রাইডিং-এর প্রতি দুর্বলতা সবারই জানা। দেশে-বিদেশে যতবার গেছে, ফিরেছে ততবারই সঙ্গে করে এনেছে নতুন কোনো বাইক। তার গ্যারেজে সারি সারি বাইক দাঁড়িয়ে থাকে—কোনোটা স্পোর্টস, কোনোটা ক্লাসিক, কোনোটা আবার শুধুই তার প্রিয় সংগ্রহ।
আজ দেশে ফিরেই সে এক মুহূর্ত বিশ্রাম না নিয়ে নিজ হাতে সব গাড়ি-বাইক পরিষ্কার করেছে।
বিদেশের ধুলোমাখা সফর শেষে নিজের জিনিসগুলো ছুঁয়ে দেখতে তার আলাদা এক শান্তি লাগে।
সেই পরিষ্কার করা বাইকগুলোর মধ্য থেকেই আজ একটি বাইক নিয়ে বের হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে। অনেকদিন পর দেখা, তাই প্রলম্বিত আড্ডা—পুরনো স্মৃতি, হাসি, গল্প আর ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনায় সময় যে কখন ফুরিয়ে গেছে, তা কেউই খেয়াল করেনি।
একসময় ঘড়ির কাঁটায় চোখ পড়তেই বুঝল—রাত পেরিয়ে ভোরের পথে। এখন সে দাঁড়িয়ে আছে নিজের বাড়ির সামনে। বাইক থেকে নেমে একবার গভীরভাবে নিশ্বাস নিল রিদওয়ান।
শেখ বাড়ির অন্ধকার ছায়ার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এত রাতেও যেন এই বাড়িটা তাকে চিনে রেখেছে।চুপচাপ হেলমেট খুলে ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগিয়ে গেল সে—নীরব রাতের বুকে পা ফেলে।
***
এদিকে তানভীকার হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে গেল।
হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত, কপাল ঘামে ভেজা।
আজ থেকে তেরো বছর আগের সেই রাত—আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
চোখ বন্ধ করলেই স্বপ্নের পর্দায় ভেসে ওঠে সেই কালো রাত্রি, যে রাত তার জীবনের সব আলো, সব সুখ, সব নিশ্চিন্ততা কেড়ে নিয়েছিল।
সবার সামনে তানভীকা শক্ত থাকার অভিনয় করে।
মুখে একটুখানি দৃঢ়তা, চোখে নির্লিপ্ত ভাব—কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ে।
এই বাড়ির প্রায় সবার চোখেই সে আজ ঘৃণার পাত্রী। অথচ এখানে তানভীকার কোনো দোষই ছিল না। তেরো বছর আগে তানভীকা ছিল একটা অবুঝ বাচ্চা। যে বয়সে মাটিতে বসে খেলা করার কথা, দৌড়ে বেড়ানোর কথা, হাসি-ঠাট্টা আর নির্ভার আনন্দে দিন কাটানোর কথা—
সেই বয়সেই তার জীবন থেকে সব রং মুছে গিয়েছিল। তারপর থেকে মেয়েটা যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছে। অকারণ হাসি নেই, ছেলেমানুষি নেই। অন্য মেয়েদের মতো সহজ, স্বাভাবিক একটা জীবন—এটাই তানভীকার সবচেয়ে বড় আফসোস।
কেন তার জীবনটা এমন হলো না?
এই প্রশ্নটা তাকে প্রতিরাতে নিঃশব্দে কুরে কুরে খায়। ভাবনার গভীরে ডুবে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
প্রচণ্ড পানির পিপাসা অনুভব করল সে।
পাশের বেডসাইড টেবিল থেকে জগটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে দেখল—একফোঁটাও পানি নেই।
বিরক্তির সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তানভীকার ঠোঁট থেকে।
আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারল না সে।
ধীরে ধীরে উঠে দরজা খুলে বাইরে বের হলো, তারপর নিঃশব্দে দরজা লাগিয়ে দিল।
এত রাতে কেউ থাকবে না ভেবে উড়নাটা নিল না।
নিস্তব্ধ করিডোর পেরিয়ে সে নিচের দিকে হাঁটতে লাগল—
কিচেনের দিকে, যেখানে হয়তো এক গ্লাস পানি তার শুকিয়ে যাওয়া গলাটাকে আর অল্প একটু হলেও শান্ত করবে।
**
কিচেনে ঢুকে তানভীকা প্রথমে নিজের জন্য এক গ্লাস পানি ঢালল।
এক নিশ্বাসে পুরোটা খেয়ে ফেলল সে। ঠান্ডা পানিটা গলা বেয়ে নামতেই মনে হলো, শরীরটা একটু হলেও শান্ত হলো। কিন্তু বুকের ভেতরের অস্থিরতা, ভারী চাপ—সেটা একচুলও কমল না।
এরপর সে হাতের জগটা কলের নিচে ধরল।
পানি পড়তে লাগল—টুপটাপ, টুপটাপ।
ধীরে ধীরে জগ ভরতে থাকল, আর সঙ্গে সঙ্গে তার মনটা আবারও ভরে উঠল অজানা ভারে।
এদিকে রিদওয়ান বাইক পার্ক করে নামল।
গভীর রাত, চারপাশ নিস্তব্ধ। বাড়ির মেইন দরজার এক্সট্রা চাবিটা পকেট থেকে বের করে সাবধানে দরজা খুলল সে। ভেতরে পা রাখতেই তার কানে এল অদ্ভুত একটা শব্দ—পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ।
রিদওয়ান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই সময়ে সবাই ঘুমিয়ে থাকার কথা। তাহলে কিচেন থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে কেন?
সে ধীরে ধীরে শব্দের দিকেই এগোতে লাগল।
পায়ের শব্দ যেন না হয়, সেই চেষ্টা করেই হাঁটছিল।
কিচেনে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়ানো অবয়বটার দিকে। পাশের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে তানভীকার চোখে-মুখে।
ম্লান, সাদা আলোয় তার মুখটা আরও ফ্যাকাশে লাগছে। চোখদুটো স্থির, কিন্তু শূন্য।
যেন সে এখানে নেই—কোথাও অনেক দূরে হারিয়ে আছে।
তানভীকা তখনও জগে পানি ঢালছে।
জগ ভরে উপচে পড়ছে, পানি মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছে—কিন্তু তার কোনো খেয়াল নেই।
কল বন্ধ করার কথা, জগ সরানোর কথা—কিছুই তার মাথায় আসছে না।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তেরো বছর আগের সেই রাত।অন্ধকার। ভয়। অসহায় কান্না।
তানভীকা বারবার নিজেকে বোঝাতে চায়—সে আর সেই ছোট্ট মেয়েটা নেই।সব শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু স্মৃতিগুলো কি বোঝে? অতীত কি কখনো কাউকে ছেড়ে যায়? চাইলেও সে কিছু বদলাতে পারবে না—এই উপলব্ধিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
এই বাড়িতে সে আজও একা।
ঘৃণার চোখ, অবহেলার দৃষ্টি—সব সে নীরবে সহ্য করে যায়। এইসব ভাবনার সাগরে ডুবে থেকেই তানভীকা দাঁড়িয়ে থাকে। পানি তখন পুরো মেঝে ভিজিয়ে ফেলেছে। রিদওয়ান দৃশ্যটা দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যায়। এভাবে, এত রাতে, একা একটা মেয়েকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে সে আশা করেনি।
আর তার চোখের শূন্যতা—ওটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আরও কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে সে বুঝতে পারে, মেয়েটা তাকে দেখতেই পায়নি।
অবশেষে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে একটু জোরেই বলল—
“হেই! লিসেন!!”
শব্দটা কিচেনের নিস্তব্ধতার বুক চিরে ছড়িয়ে পড়ল। একটা গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর কানের কাছে আসতেই তানভীকার ধ্যান হঠাৎ করেই ভেঙে গেল।
পেছন থেকে ভেসে আসা সেই জোরালো কণ্ঠস্বর শুনে সে চমকে উঠল।
হাত কাঁপতে কাঁপতে কলের পানি বন্ধ করে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল। এত রাতে সামনে একজন পুরুষ মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তানভীকা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল তার। এই সময়ে সাধারণত নিচে কেউ থাকে না—এই ভেবেই তো সে উড়না না নিয়েই নেমে এসেছে। সাদা রঙের সাধারণ একটা টি-শার্ট আর ঢিলেঢালা প্লাজু পরা।
লম্বা, হাঁটু ছাড়ানো চুলগুলো যত্ন করে বেণী করা।
ঘুম থেকে ওঠা এলোমেলো ভাবটা এখনো পুরোপুরি কাটেনি তার মুখে।
নিজেকে হঠাৎ এতটা অসহায় মনে হলো তানভীকার।
এত গভীর রাতে, নিস্তব্ধ বাড়ির ভেতর, একজন অচেনা পুরুষ মানুষ—ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা শঙ্কা জমে উঠল।কিন্তু ঠিক সেই ভয়ের মাঝেই আরেকটা অনুভূতি মাথা চাড়া দিল। এই কণ্ঠস্বর…
কেন যেন খুব পরিচিত লাগছে। তানভীকা চোখ শক্ত করে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করল।
মনে করার চেষ্টা করল—কার কণ্ঠ এটা?
কবে শুনেছে? কোথায় শুনেছে? কিন্তু যতই ভাবছে, ততই মাথার ভেতর ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সব।
কণ্ঠস্বরটা পরিচিত, অথচ নামটা মনে পড়ছে না।
অন্ধকারের কারণে রিদওয়ানের চেহারাটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। শুধু একটা লম্বা অবয়ব আর গলার স্বর—এইটুকুই তার সামনে পরিষ্কার।
কিন্তু অন্যদিকে, রিদওয়ানের চোখে পুরো দৃশ্যটা একেবারেই ভিন্ন। পাশের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঠিক মতো এসে পড়েছে তানভীকার মুখে।
ম্লান আলোয় তার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
রিদওয়ান অবাক হয়ে লক্ষ করল—
মেয়েটার মুখে কোনো বাড়তি আতঙ্ক নেই।
না আছে অস্থিরতা, না আছে কৃত্রিম ভদ্রতা।
একদম স্বাভাবিক।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—
তার মনে একটুও হচ্ছে না যে সে তানভীকাকে এই প্রথম দেখছে। বরং মনে হচ্ছে, এই মুখটা সে বহু আগেই কোথাও দেখেছে। চেনা… খুব চেনা। রিদওয়ানের চোখের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে গভীর মনোযোগে তানভীকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখে লুকিয়ে থাকা ভাঙা ভাব, মুখের নীরবতা—সবকিছুই তার অচেনা লাগলেও অদ্ভুতভাবে আপন মনে হলো।
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হালকা একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
এমন হাসি—যেটা কেউ সহজে বুঝতে পারবে না।
না আনন্দের, না বিদ্রুপের। বরং যেন কোনো পুরোনো স্মৃতির ছায়া। তানভীকা তখনও বুঝে উঠতে পারছে না—
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটা ঠিক কে।
আর কেনই বা তার বুকের ভেতর অজান্তেই একটা অদ্ভুত পরিচিত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।
আর এদিকে তানভীকা যেন ভূত দেখার মতো করে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, পলক ফেলতেও ভুলে গেছে সে।
চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয় লেপ্টে আছে—যেন এক মুহূর্তে রক্ত হিম হয়ে গেছে তার শরীরে। ভয়ে তার পা দুটো অবশ হয়ে এসেছে। নিজের জায়গা থেকে নড়তে পর্যন্ত ভুলে গেছে সে। মনে হচ্ছে, যদি নড়ে—কিছু ভয়ংকর ঘটে যাবে।
কিন্তু এইভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না—এই বোধটা হঠাৎ করেই তার মাথায় আঘাত করল।
নিজের ভেতর থেকে যতটুকু সাহস জোগাড় করা যায়, সবটুকু একসাথে টেনে আনল তানভীকা।
আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে
হঠাৎ করেই সে এক দৌড়ে কিচেন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
করিডোর পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে—প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা অবস্থায় নিজের রুমে ঢুকে পড়ল সে।
ভেতরে ঢুকেই বিকট শব্দে দরজা বন্ধ করে দিল।
তারপর কাঁপা হাতে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিল।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে, বুকের ওপর হাত চেপে ধরে হাঁপাতে লাগল তানভীকা।হার্টবিট এত জোরে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে—এখনই কেউ শুনে ফেলবে।
তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
“এই লোকটা কে?”
****
আর কিচেনে একা দাঁড়িয়ে থাকা রিদওয়ান পুরো দৃশ্যটা চুপচাপ দেখল। মেয়েটার পালিয়ে যাওয়া, ভয়ে জমে যাওয়া চোখ—কিছুই তার চোখ এড়ায়নি। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা চিকন, ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল।
মুখ বাঁকিয়ে, প্রায় ফিসফিস করে বলল—
“তাহলে আপনি এই বাড়িতেই আছেন, আশ্রিতা মেডাম।”
একটু থেমে, যেন কথাগুলো উপভোগ করে নিল সে।
“আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। নাকি আপনি এখনো জানেন না… আমি ফিরে এসেছি?”
তার চোখে তখন এক ধরনের বিকৃত আনন্দ।
গলায় ঠান্ডা স্বর।
“এবার খেলতে তো আরও মজা হবে, মেডাম।”
হালকা হেসে আবার বলল—
“আমাকে ভুলে গেলেন নাকি আবারও?”
কথার শেষে সেই চেনা চিকন হাসি।
তারপর আরও নিচু স্বরে, আরও ভয়ংকরভাবে—
“নাহ… নাহ… আমাকে ভুলতে আমি আপনাকে দেব না।”
একটু থেমে দাঁত চেপে বলল—
“আমার স্পর্শই আপনাকে মনে করিয়ে দেবে…
আমি কে।”
তার চোখে তখন তীব্র প্রতিশোধের আগুন।
“এবার আমার পালা। এত বছর ধরে আমি এই আগুনে পুড়েছি… এবার না হয় আপনিও একটু পুড়ুন।”
আর কথা না বাড়িয়ে রিদওয়ান ধীরে ধীরে কিচেন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নিস্তব্ধ করিডোর পেরিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার ঠোঁটে তখনও লেগে আছে সেই ভয়ংকর চিকন বাকা হাসি।
*********************************************
রিদওয়ান ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
শরীরটা আরাম পেতে চাইলেও চোখের পাতা এক করতে পারল না সে। ঘুম? সেটা যেন তার জীবনের সঙ্গে বহু বছর ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। হয়তো ঠিক তেরো বছর ধরে প্রতিটি রাতই এমন নির্ঘুম কেটে গেছে—অবচেতন আতঙ্কে, অস্থির স্মৃতির মধ্যে, নিজের ভেতরের অগ্নি নির্বাপন করতে করতে।
শরীর শুয়ে আছে, কিন্তু মন জেগে আছে।
চোখের পাতা এক করতে পারছে না—কারণ চোখ বন্ধ করলেই তার ভেতরে ঢুকে পড়ে সেই অন্ধকার।
সেই রাতগুলো—যে রাতগুলো তার জীবনের সব রঙ কেড়ে নিয়েছিল, যে রাতগুলো তার হৃদয়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে, যে রাতগুলো তাকে শূন্য করে দিয়েছিল—ওগুলো আবার তার চোখের সামনে ভেসে আসে।
মনের ভেতর হাহাকার আর বিষাদ একত্রিত হয়ে তাকে চেপে ধরে। কিন্তু আজ কিছুটা অন্যরকম।
হঠাৎ, অজানা ভাবে, এই সব চিন্তা-আবেগের ভিড়ে হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তানভীকার মুখ।চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার চোখে-মুখে।
প্রত্যেকটি রঙ, প্রত্যেকটি ছায়া যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তানভীকার চাহনি, মুখের নিঃশব্দ ভয়, চোখে লুকিয়ে থাকা অজানা দুঃসহ অনুভূতি—
সবকিছু একত্র হয়ে রিদওয়ানের বুকের ভেতরে হিম শীতল ধারা বয়ে দিল।
হঠাৎ করেই সে অনুভব করল, যেন পুরো শরীর জুড়ে হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশান্তি এসে পড়েছে।
চোখ বন্ধ করলেই সেই ছবি ভেসে আসছে—তানভীকার মুখ, চোখের ভেতরের ভয়, নীরবতা।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে সে অদ্ভুতভাবে ঘুমিয়ে পড়ল।
প্রায় তেরো বছর পর তার চোখ, মন এবং শরীর প্রথমবারের মতো বিশ্রাম পাচ্ছে।
এদিকে তানভীকা। তার শ্বাস এখনো নিয়ন্ত্রণে নেই।
নিজেকে রক্ষা করতে সে দ্রুত তার রুমে ঢুকে দরজা আঁটকিয়ে বেডের ওপর গুটিশুটি হয়ে বসেছে। চোখ বড়, হৃদয় দ্রুত দ্রুত ধড়ফড় করছে।
পা দুটো বুকের কাছে টেনে ধরে সে নিজেকে যতটা সম্ভব আড়াল করছে। মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরছে, বারবার মাথা ধাক্কা খাচ্ছে।
“ভূত কোথা থেকে এলো এই বাড়িতে?”
“ওই লোকটাই বা কে?”
“এই বাড়িতে তো বাইরের কেউ ঢুকতে পারে না… তাহলে সে কে ছিল?”
প্রতিটি প্রশ্ন তার মনকে আরও অস্থির করে তুলছে।
বারবার সে সেই কণ্ঠস্বর শুনছে, তার ভেতরে চেনা, কিন্তু অজানা। কোনো না কোনোভাবে এটি তার মনকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
সে চোখ বন্ধ করে চেষ্টা করছে মনে করার—কার কণ্ঠ এটি? কোথায় শুনেছে?
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল—রিদওয়ানের কথা।
মুহূর্তের মধ্যে তানভীকার চোখে-মুখে অজানা আশঙ্কা ফুটে উঠল।
ভয় যেন তার শরীরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ল।
চোখে স্পষ্টভাবে ভয়, বুকের ভেতর জড়িয়ে থাকা অস্থিরতা। শরীর কেঁপে উঠল।
নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল—
“নাহ… নাহ… উনি আর কখনো ফিরে আসবেন না।
আমি হয়তো ভুল দেখেছি।কিছু না কিছু দেখেছি, শুনেছি—মনের ভ্রম।”
“উনি কী করে ফিরে আসবেন?”
এই প্রশ্ন বারবার নিজেকে বলতে বলতে সে ধীরে ধীরে বেডের ওপর শুয়ে পড়ল। শরীরটা কাঁপছে, কিন্তু মন এক ধরণের অজানা প্রশান্তি খুঁজছে।
তানভীকা চাইছে না, চাইছে না অতীতের সামনে দাঁড়াতে।
ভয় পাচ্ছে সেই কালো অতীতকে, যে অতীত আজও নিঃশব্দে তার পিছু ছাড়ে না।
তানভীকার ভয়, রিদওয়ানের অশান্ত রাত—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেছে।
কিন্তু সেই স্থিরতার ভেতরও মন জুড়ে থাকে স্মৃতি, আশঙ্কা এবং অজানা অনুভূতির চাপ।
আজকের এই সকালও নতুন গল্পের সূচনা—যা হয়তো তাদের অতীতের সাথে নতুন ধাঁধা জুড়ে দেবে।
**
দেখতে দেখতে ধরণীতে নতুন সকালের সূর্যোদয় শুরু হলো। পাখিরা একে একে চিৎকার করে উঠছে, হালকা হাওয়ায় তাদের কণ্ঠ যেন ঘরের ভিতরে ঢুকে প্রতিটি কোণে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
শীতের বাতাসে ভেসে আসছে কাঁচা পান্তা আর মাটির গন্ধ, আর ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকছে সূর্যের নরম আলো, যা ধীরে ধীরে প্রতিটি কোণ আলোকিত করে তুলছে।
শেখ বাড়ি যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেয়েছে—ঘরের প্রতিটি জায়গায় ক্রিয়াশীলতা, শব্দ, গন্ধ মিলিয়ে তৈরি করছে এক অদ্ভুত সকালের ছন্দ।
রান্নাঘরে মেয়েরা ব্যস্ত—ডাল, ভাত, সব্জি, রুটি, চা, সব সাজানো হচ্ছে। চুলার ধোঁয়া ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে, রান্নার শব্দ প্রতিটি কানে প্রবেশ করছে।ছোট ছোট পাত্রের ধ্বনি, লাডলের লাজুক শব্দ, নরমভাবে কেটে যাওয়া সব্জির শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে যেন সকালকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সাতটা বাজে।
বাড়ির সবাই একটু দেরিতে উঠে।
কেউ ঘুমে ঢেকে থাকা চোখ মেলে কাজ শুরু করছে।
কিন্তু মালিহা শেখ—না, তিনি অন্যরকম।
তার অভ্যেস সকালেই উঠে যাওয়া, ঘুম ভেঙে শরীরকে সতেজ করা।
প্রতি সকালে তিনি বাড়ির প্রতিটি কাজের দিকে নজর দেন, তারপর তানভীকার দিকে মন দেন।
মাহিলা শেখের জন্য এটি শুধু রুটিন নয়, বরং এক ধরণের স্নেহময় অভ্যাস—যেখানে প্রতিটি সকালের শুরু হয় তানভীকার যত্ন দিয়ে।
মালিহা শেখ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে এলেন।
চুল আঁচড়ে ধরলেন, মুখে হালকা হাসি ফুটল।
ধীরে ধীরে তিনি রান্নাঘরের দিকে এগোলেন।
মেয়েদের সঙ্গে কথা বললেন—আজ কী কী রান্না হবে, কোন কোন কাজ আগে শেষ করতে হবে।
তারপর চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি—তানভীকার দিকে।
কেন যেন মনে হলো, এই সকালে তার দৃষ্টি ছুঁয়ে গেছে তানভীকার শান্ত মুখে।
মালিহা শেখ তার কাঁধে হালকা হাত বুলিয়ে রুমের দিকে এগোলেন।
তানভীকার ঘরে ঢুকেই চোখে পড়ল—তানভীকা শান্তভাবে, বাচ্চাদের মতো করে ঘুমিয়ে আছে।
গালগুলো হালকা গোলাপী, নাকের ওপর সূর্যের আলো পড়েছে, চুলগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে আছে।
মুহূর্তের জন্য মালিহা শেখ থেমে একটু হাসলেন।
ঠোঁটের কোণে সেই ছোট্ট মৃদু হাসি, যা শুধু ভালোবাসা প্রকাশ করছে।
“উঠ মা,” তিনি ধীরে ধীরে বললেন।
“আজ তো তোর ভার্সিটিতে যেতে হবে, তাড়াতাড়ি।”
তানভীকা ঘুমঘুম চোখ মুছল, চারপাশে তাকাল।
প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে, তারপর হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে উঠে বসল। হৃদয় এখনো দ্রুত ধড়ফড় করছে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। মালিহা শেখের দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হাসি দিয়ে বলল—
“হ্যাঁ, আম্মু। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।
ভাগ্যিস তুমি মনে করিয়ে দিলা।”
তারপর আবারও বলল,
“আচ্ছা আম্মু, আমি রেডি হয়ে আসছি।”
মাহিলা শেখ মাথা নেড়ে উত্তর দিল—
“ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি চল। দেরি করিস না।”
তানভীকা আর কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল।
টাওয়াল হাতে নিয়ে গরম পানির স্পর্শে তার শরীর ধীরে ধীরে সতেজ হতে লাগল।
পেছনের রাতের ক্লান্তি, অজানা স্মৃতি, অন্তরের অস্থিরতা—সবই যেন ধুয়ে গেল।
শরীরটা হালকা লাগতে লাগল, চোখে এক ধরণের সতেজতা। গরম পানির ঝাপটা, সাবান ও শরীরের স্পর্শে মন শান্ত হলো।
শরীর সতেজ হলেও চোখে মনে হালকা ঘুমের ছায়া—একটি দিনের শুরু, নতুন সম্ভাবনার দিকে ধাবিত।
ফ্রেশ হয়ে এসে সে নীল রঙের একটি স্নিগ্ধ টপস পরল। সাথে জিন্সের প্যান্ট—সহজ, আরামদায়ক, এবং পুরো রঙের সঙ্গে মিল।
তারপর মাথায় নীল রঙের ম্যাচিং উরনা রাখল, আলতো করে গলায় জরিয়ে নিলো।
আজকের সকাল, টেবিল একদম ফাকা।
কেউ নেই। নিস্তব্ধতা। শুধু হালকা বাতাস, রান্নাঘরের দূর থেকে আসা নরম শব্দ এবং চায়ের ধোঁয়া। এমন সময় মনে হলো যেন পুরো বাড়ি শুধুই তার জন্য। তানভীকা টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে এক চুমুক চা নিল। গরম চা তার হাত স্পর্শে অদ্ভুত প্রশান্তি আনল। শরীর ঠান্ডা হলেও ভিতরে এক অদ্ভুত উদ্দীপনা অনুভব করল। আজকের দিনটা বিশেষ। প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে।
আজকের সকাল, আজকের শান্তি, এই একান্ত মুহূর্ত—সবকিছু মিলিয়ে তার মনকে পূর্ণতা দিচ্ছে।
চা খেতে খেতে তানভীকা ভাবল—আজকের দিনটা কেমন কাটবে?
ভার্সিটিতে কি হবে?
সেখানে তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তার মনে উঁকি দিচ্ছে সেই গভীর উদ্বেগ—পুরনো স্মৃতির ভাঁজ থেকে যা কিছু উদ্রেক হতে পারে।
তানভীকার মনে হচ্ছিল, আজকের সকাল যেন নতুন জীবনের সূচনা।
**
সকালের হালকা আলোটা ধীরে ধীরে ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে তানভীকার ঘরে আলোর এক নরম ঝিলিক ছড়ালো।
চেয়ারে বসার আগে সে কিছুক্ষণের জন্য জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরে রাস্তায় হালকা কুয়াশা, কিছু গাছের পাতায় শিশিরের জল ঝাপসা করছে।
তানভীকার মন ভীষণ শান্ত, কিন্তু একই সঙ্গে কিছুটা তাড়াহুড়ো।
আজকের ক্লাস তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সকাল সকাল ভার্সিটিতে পৌঁছাতে হবে, আর বাসা থেকে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগে।
তানভীকা জানে, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে না কেউ, তাই এই ব্যাপারে বেশি মাথা ঘামায় না।
চেয়ার টেনে বসলো ডাইনিং টেবিলে।
মুহূর্তেই মালিহা শেখ হাতে নাস্তার থালা নিয়ে এলেন।
“খেয়ে নাও, মা। তোর জন্য তাজা চা আর পিঠা বানিয়েছি,” তিনি মৃদু হাসি দিয়ে বললেন।
তানভীকা আর কথা না বলে চুপচাপ খেতে শুরু করল। তার চোখে, মুখে, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি থেকে বোঝা যাচ্ছিল—তার মন এখনো কিছুটা স্বপ্নময় এবং গভীরভাবে অতীতের স্মৃতিতে ডুবে আছে।
তবে নাস্তা খাওয়ার সময় সে চেষ্টা করছিল বাস্তবে ফিরে আসতে।
একই সময়ে, ডাইনিং রুমের এক কোণে একজন দাঁড়িয়ে ছিলো, হাতে ব্ল্যাক কফির কাপ।
চোখে ঠোঁটের কোনে হালকা চিলতে হাসি।
তানভীকার খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছিল, কিন্তু চোখের কোণে সেই ব্যক্তির উপস্থিতি কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করছিল। কিছুক্ষণের জন্য কফির কাপ হাতে ধরে সে তানভীকার দিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর হঠাৎ ধীরে ধীরে রুম থেকে চলে গেল।
তানভীকা যখন বুঝল আর কিছু নেই, তখন দ্রুত খাওয়া শেষ করল।
হঠাৎ করে রেসিপ্রেশনের মতো এক তাড়াহুড়ো বোধ হলো। বাসার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে রিকশা ডাকল। রিকশা এসে থামল, সে উঠে বসল, ভাড়া মিটিয়ে রিকশা ছুটে চলল।
প্রায় আধ ঘন্টা পরে রিকশা ভার্সিটির সামনে থামল।
তানভীকা রিকশা থেকে নেমে, ধীরে ধীরে ভাড়া মিটিয়ে সামনে এগোল।
ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল—তিয়াসা আর নীলিমা দাঁড়িয়ে আছে।
তানভীকার চোখে এক অদ্ভুত স্বস্তি—পরিচিত মুখ, বন্ধুত্বের হাসি।
তানভীকা তাড়াহুড়ো করে তাদের কাছে গেল।
“কি রে, তোরা দাঁড়িয়ে আছিস যে? ভিতরে যাসনি?”
সে বলল, একটু হতাশ ভাবভঙ্গিতে।
তিয়াসা হেসে উত্তর দিল—
“হুম, তোর জন্য দাঁড়িয়েছি। চল, একসাথে যাই।”
তানভীকা আর কিছু বলল না।
বন্ধুদের সঙ্গে কানে কানে কিছু কথা বিনিময় করে, হাসি-মুখে ভিতরে চলে গেল। ক্লাসরুমে পৌঁছতেই সে একটি গভীর শ্বাস নিল। আজকের সকাল, নতুন দিনের শুরু—সবকিছু যেন তার জন্য প্রস্তুত।
********************************************
ঘড়ির কাঁটায় তখন ১১টা বাজছে।
শেখ বাড়ির প্রতিটি কোণে ভোরের ব্যস্ততা ছাপ ফেলেছে। ডাইনিং রুম থেকে রান্নাঘর, লিভিং রুম, লং করিডর—সবখানে সকালের ধাপে ধাপে ছায়া খেলছে। সকালবেলার হালকা রোদ ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ছে।
বাইরের রাস্তার শব্দ, পাখির ডাক, দূর থেকে স্কুলে যাওয়া পড়ুয়াদের চিৎকার—সব মিলিয়ে যেন একটি জীবন্ত সিম্ফনি তৈরি করছে।
তাহমীনা শেখ সোফায় বসে রয়েছেন, চোখে হালকা ভাবনা।
সোফার কোমলতার সঙ্গে শরীর এলিয়ে বসেছেন, হাত থামিয়ে রেখেছেন। তার মনে ঘুরছে নানা চিন্তা—আজকের দিনটি ঠিকঠাক যাচ্ছে কি না,
পরিবারের সকলের ব্যস্ততা ঠিকমতো চলছে কি না।একদিকে রান্নাঘর থেকে মালিহা শেখের আওয়াজ আসছে, আগুন, নাড়াচাড়া করা—সবকিছু যেন নিখুঁত সামঞ্জস্যে চলছে।
মালিহা শেখের চোখে দৃঢ়তা, প্রতিটি পদক্ষেপে যত্ন।
প্রতিটি কাজ যেন তার অভ্যস্ত রুটিনের অংশ, কিন্তু সেই রুটিনের মধ্যে লুকিয়ে আছে তার নিজের মায়ার ছোঁয়া।হঠাৎ মালিহা শেখের মনে পড়ে গেল—রিদওয়ান এখনও নাস্তা করেনি।
তিনি সাথে সাথে শারমিন খাতুনকে ডাকলেন।
“শারমিন খাতুন, একটু দেখে আসো তো। রিদওয়ান ঘুম থেকে উঠেছে কি না।”
থেকে কিছু খায়নি ছেলেটা। নিশ্চয়ই তার খেয়াল রাখতে হবে।”
শারমিন খাতুন মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক আছে, আপা। আমি দেখব।”
মাহিলা শেখ শান্ত স্বরে আরও বললেন,
“দেখতে হবে যেন কিছু বাকি না থাকে। সে ঠিকভাবে খেতে পারে।”
এই বাড়িতে, রিদওয়ান—যিনি তাহমীনা শেখের ছেলে—তা কেউ বুঝতেই পারবে না।
বহু বছর ধরে বাড়ির সব সদস্য জানে না, সে আসলে তাহমীনার ছেলে। ছোটবেলায় থেকে মাহিলা শেখই সব খেয়াল রেখেছেন।
শিশু রিদওয়ান ছোটবেলা থেকে প্রতিটি কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, প্রতিটি আচরণের মধ্যে মাহিলা শেখের প্রিয়ময় দৃষ্টি স্পর্শ করেছে।
তিনি নিজের সন্তানের মতো করে বড় করেছেন তাকে। তার যত্নে লুকিয়ে আছে মায়ের মতো, শান্তির মতো, গভীর ভালোবাসার ছোঁয়া।
এই যত্নের মাঝেও তাহমীনা শেখের মন কেমন যেন অদ্ভুতভাবে গাঢ় হয়ে যায়—মালিহা শেখ হয়তো তার চেয়ে রিদওয়ানের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল।
এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করেই রিদওয়ান লিভিং রুমের দিকে নেমে আসে।
ফর্মাল ড্রেসে সে যেন পুরো ঘরকে আলোকিত করে তুলেছে। তার পোশাক, কাঁচের বোতামের নেকলাইন, স্টাইলিশ জ্যাকেট, সবকিছু মিলিয়ে রিদওয়ানকে এক দৃষ্টিনন্দন উপস্থিতিতে রূপান্তর করেছে।
তার চোখে আত্মবিশ্বাস, হালকা হাসি, মাথার উচ্চতা—সবকিছু মিলে যেন পুরো ঘরকে এক নতুন প্রাণ দেয়।
শারমিন খাতুন রিদওয়ানকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তার চোখ বড় হয়ে গেল, হাত সামলাতে পারলেন না। রিদওয়ানের এই পরিপাটি ও স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি যেন মুহূর্তে তাদের সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।
তাহমিনা শেখও তাকিয়ে রইলেন, এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। গর্ব, আশ্চর্য্য, এবং এক সামান্য চিন্তা—কি ভাবে তার ছেলে এত বড় হয়ে গেছে।
“যা বাবা,”
তাহমিনা শেখ ধীরে বললেন,
“গিয়ে খেয়ে নে। কিছু খাসনি তো।”
শারমিন খাতুন অবিলম্বে বললেন, “হুম, রিদওয়ান বাবা, আসো। খেতে বসো।”
মালিহা শেখও তার দিকে হাত নেড়ে ডাকলেন।
কেউই তার উপর চাপ না দিয়ে, কিন্তু সবাই একসাথে বুঝিয়ে দিল—খাওয়ার জন্য বসতে হবে।
রিদওয়ান চুপচাপ খেতে বসল।
মাহিলা শেখ খাবার বেশী করে দিলেন যেন সে যথেষ্ট শক্তি পায়। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছিলেন—রিদওয়ানের খাওয়ার ধরন, মুখের ভাব, চোখের দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টি।
রিদওয়ান খাবার খেতে খেতে ধীরে ধীরে কথার সূচনা করল। তাহমিনা শেখ সোফা থেকে উঠে এসে তার পাশে বসে বললেন,
“কোথাও কি যাচ্ছিস বাবা?”
রিদওয়ান হাত থামিয়ে তাকাল, চোখে এক মৃদু হাসি ফুটল।
“হুম, আম্মু। কিছু কাজ আছে।
কানাডা আর ফিরে যাওয়া হবে না। এখানেই হেড অফিস খুলছি। ৩ বছর ধরে কাজ চলছে, আজকে সরাসরি দেখতে যাচ্ছি।সব ঠিক থাকলে সামনের সপ্তাহ থেকেই কাজ শুরু করবো।”
তাহমিনা শেখের মুখে হাসি ফুটল।
“তা তো বেশ ভালো কথা। কিন্তু তুমি কবে কবে এতো বড় বিজনেসম্যান হয়ে গেলে? আমাদের সাথে এতগুলো বছর কথা বলিসনি।কল দিলেও ধরিসনি।”
রিদওয়ান হেসে উত্তর দিল,
“আম্মু, তোমার ছেলে এখন কানাডার টপ তিন বিজনেসম্যানের মধ্যে একজন। আরও ভালোভাবে বলতে গেলে, আমি সব কাজ নিজের হাতে পরিচালনা করি।”
তাহমীনা শেখ অবাক।
“আচ্ছা, এবার সাবধানে যাস। দেরি করিস না।”
রিদওয়ান হাসল, ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বের হল।
তার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, হাতে শক্ত করছিল রিয়েলিটি—কাজের দায়িত্ব, নিজের ভবিষ্যৎ।
********-*-***-*
ঘড়ির কাঁটায় তখন ১টা বাজে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বের হওয়া ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লাস শেষ হওয়ার সময় অনুযায়ী সবাই তাড়াহুড়ো করছে, কেউ টুকিটাকি খাওয়ার জন্য, কেউ বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে হালকা আড্ডার জন্য।
এই মাঝের ঘোরে তানভীকা নিজের চোখে ঘুমের ভাজ দেখতে পাচ্ছে।
মাথার মধ্যে এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে কালকের রাতের সেই ঘটনা। চোখ বন্ধ করলেই, মনে ভেসে আসে অদ্ভুত, অজানা আতঙ্ক। রুমের দেয়ালে পড়ে থাকা হালকা আলো তার চোখে ভয় ও বিস্ময় মিশিয়ে দিচ্ছে।
“কি রে, তানভী?” হঠাৎ তিয়াশার কণ্ঠ তাকে ধ্যানভঙ্গ করল।
“কি হলো? দাড়িয়ে আছিস কেনো? বাড়ি যাবি না তুই?”
তানভীকা চুপচাপ চোখে আংশিক আতঙ্ক নিয়ে তাকাল। তার মনে ভয়, লজ্জা আর সামান্য রাগ—সব মিশে একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।
তার কণ্ঠে হেসে উঠে, সে বলল,
“তোরা যা, আমার টিউশনি আছে।”
নীলিমা একটু অবাক হয়ে বলল,
“তোর বাবা তোকে নিষেধ করছিল টিউশনি করার জন্য।”
তানভীকা দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল,
“আমি কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।
তোরা বাড়ি যা।”
এই বলে সে এগিয়ে গেল, যেন নিজের স্বাধীনতার প্রতি এক চূড়ান্ত ঘোষণা করছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি রিকশা ডাকা হলো। রিকশার চালক মুখে হালকা হাসি নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসল। তানভীকা ভাড়া পরিশোধ করে, রিকশায় উঠে বসল। সীটের কোমলতা তার ক্লান্তি কিছুটা ভুলিয়ে দিচ্ছে।
চোখের ভেতর আবারও কালকের রাতের সেই ঘটনা ফুটে উঠছে, কিন্তু সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল—আমার আব্বু কি বলবে?
মনেই মনে বলল,
“সরি আব্বু, তুমি নিষেধ করলেও আমি করছি।
আমি নিজের মতো করে থাকতে চাই। কারও উপর নির্ভরশীল থাকতে চাই না।আমি যেমন আছি, ভালো আছি। এমন অনেক ঋণী আমি তোমাদের উপর।”
রিকশা ধীরে ধীরে ২ তলা বাড়ির সামনে পৌঁছালো।
তানভীকা নামল, খেয়াল করল বাড়ির সামনের পরিবেশ—দু’তলা বাড়ির পাকা গেট, সুসজ্জিত ফুলের বাগান, এবং খোলা আকাশে হালকা রোদ।
তার হৃদয় দ্রুত ধড়কছে।
তাকে যেন মনে হচ্ছে, সে যেন কোন অজানা রহস্যের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে চলেছে।
এই সময়ে রিদওয়ান, যা কবে থেকে লক্ষ্য রাখছে, চোখে সরাসরি ধরল—তানভীকা রিকশা থেকে নামছে।
হঠাৎ করেই রিদওয়ানের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
“এই মেয়ে এখানে কি করছে?”
মনে মনে বলল সে।
তার দৃষ্টি তানভীকার দিকে স্থির হয়ে গেল, আর ধীরে ধীরে হালকা রাগ, কৌতূহল, এবং আগ্রহ একসাথে মিশে গেল। পরিস্থিতি আরও সিরিয়াস হয়ে এলো। রিদওয়ান ফোন বের করল, নিজের পারসোনাল সেক্রেটারি সাহিল সরকারকে ডাকল।
একটি ছবি তুলল, যেখানে তানভীকা রিকশা থেকে নামছে। ছবিটি পাঠিয়ে বলল,
“এই মেয়েটা এখানে কি করছে?
এই বাড়ির সামনে কি করছে? আর এই মেয়েটার সব ডিটেলস চাই আমার। কখন, কোথায় যায়, কি করে সব কিছু ওকে।”
ফোনের ওপাশ থেকে সাহিল উত্তর দিলো,
“আচ্ছা স্যার। আমি সব ইনফরমেশন কালেক্ট করে আপনাকে পাঠাচ্ছি।”
কল কেটে রিদওয়ান ধীরে ধীরে নিজের গাড়িতে ফিরে গেল। চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, যেন প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে।
অন্যদিকে, তানভীকা ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো…..
চলবে…
🚫নোট🚫 : বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। আর এই পর্বে শুধু ফারিস আর নিশিতার ভালোবাসার মুহূর্ত থাকবে।
আশা করি সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন।
আমি পর্ব গুলা এতটা বড় দিয়ে আমার লাভ কি যদিআপনারা রেসপন্স না করেন? কাল থেকে ছোট করে দিব।