পর্বসংখ্যা:১৮
লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী
সন্ধ্যার সূর্যটা অস্তমিত হয়ে গেছে অনেক আগেই। আকাশজুড়ে লালচে-ধূসর এক মায়াময় স্তরের আভা ছড়াচ্ছে চারদিক। দিনের ক্লান্তি সেথায় মিশে একাকার হয়েছে। কাবির খাওয়া-দাওয়া সেরে কখন যে বেরিয়ে গেছে কেউ খেয়ালও করেনি। শুধু কায়রাভকে বলে গিয়েছে যাওয়ার আগে। আর কায়রা নিজের রুমে হেডফোন কানে গুঁজে ভাতঘুম দিয়েছে। গানের সুরে নিজের আলাদা জগতে ডুবে আছে সে।
দুপুরে খাওয়ার পরপর বিকেলের দিকে কায়েশী আর কায়রাভ নিজেদের ঘরে এসেছে। ঘরটায় মৃদু হলদেটে আলো জ্বলছে। কায়ান ঘুমিয়েছে বলে সাদা লাইটটা নেভানো। কায়েশী বিছানায় হেলান দিয়ে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে। তবে তার অবিচল দৃষ্টি এক জায়গায় নিবদ্ধ, কায়রাভের দিকে। কায়রাভ ব্যস্ত ভঙিমায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি স্বরুপ। স্বভাবসিদ্ধ ভাবে চুল আঁচড়ানো, পারফিউম স্প্রে করা, শার্টের হাতা গুটিয়ে নেওয়া প্রতিটা কাজ কায়েশীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে না। সবকিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নিচ্ছে সে। মনে প্রশ্ন, এতো সেজেগুজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে মশাইয়ের? প্রশ্নটা মনে জমে থাকলেও মুখ ফুটে বলতে পারছে না সে। কারণ, কায়েশীর অনাবশ্যক হঠকারিতা। জেদ করে ঠোঁটে অদৃশ্য তালা লাগিয়ে রেখেছে মুখে কুলুপ এঁটে। অতি সহজ প্রশ্ন করতেও কত ভাবনা চিন্তা করছে! হঠাৎ আয়নায় কায়েশীর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার তীক্ষ্ণতা টের পেয়ে কায়রাভ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। ঠোঁটে বরাবরের ন্যায় দুষ্টু হাসি। চুল ব্যাক ব্রাশ করতে করতে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপার? এভাবে তাকিয়ে কী দেখছো? আজ কি একটু বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে আমাকে?”
কায়েশী ঠোঁট উল্টে দিয়ে বলেই ফেললো,
“নিজেকে কী ভাবেন! যাই হোক, আপনি না সকালে বললেন আজ সারাদিন ফ্রি, তাহলে এভাবে সেজেগুজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
কায়রাভ পুরো শরীর ঘুরিয়ে বিস্ময়ের ভান করে বলল,
“ওহ হো! টিপিকাল ওয়াইফদের মতো লাগছো আজ। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়ে গেছে দেখছি!”
এইবার কায়েশী বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। কায়রাভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদম চোখে চোখ রেখে শক্ত গলায় বলল,
“রাইট আছে আমার।”
“সব অধিকার নিজে নিয়ে বসে আছো। আমার রাইট কোথায়? আমার তো কম পরে যাচ্ছে!”
কায়েশী কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করে,
“আর কি কি রাইট চান? বাকি আছে কিছু? বিয়ের দিন থেকেই তো সব অধিকার নিয়ে বসে আছেন!”
এই কথা শুনে কায়রাভ বাঁকা হাসলো। ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে কায়েশীর মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এলো কায়রাভ। কায়েশী ভাবগতিক বুঝে তৎক্ষনাৎ এক পা পেছনে সরে যায়। কায়রাভ গলা নামিয়ে ধিমি আওয়াজে বলল,
“এই যে তুমি সরে গেলে, এটাই আমার অধিকারের বাইরে। তোমাকে যখন তখন সাচ্ছন্দ্যে চু’মু খাওয়ার রাইট চাই। ওটা বাকি আছে।”
কায়েশী ভড়কালো খানিক। তবু বলল,
“সেদিন যে রান্নাঘরে বেলাল্লাপনা দেখালেন, ওটা কি ছিলো? ভুলে গেলেন নাকি?”
কায়রাভ হতাশ হলো বউয়ের কথায়। তাকালোও হতাশ চোখে। তার রোমান্টিকতাকে কিনা শেষমেষ বেলাল্লাপনা বললো তার বউ! এই বউটাকে এই জন্মে রোমান্টিকতা শেখাতে পারবে না সে। এক মিনিট, এসব আজগুবি স্বপ্ন ভাবে কি করে কায়রাভ! যেখানে তার বউ তার স্বামীকে শত্রুরুপে দেখে সেখানে রোমান্টিকতা আশা করা বৃথা। কায়েশীকে বলল,
“ওটাকে বেলাল্লাপনা নয় রোমান্টিকতা বলে। কবে বুঝবে তুমি! অবশ্য আমার বোঝা উচিত ছিলো, সেদিন তুমি রোমান্টিক হবে যেদিন হাতি আকাশে উড়বে। ”
“আপনার থেকে রোমান্টিকতার লেকচার শুনতে চাইছি না আপাতত। এবার যান যেখানে যাচ্ছিলেন, আমার কি!”
এই বলে কায়েশী বিরক্ত হয়ে কায়রাভের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরে যেতে চাইলো, কারণ কায়রাভ অনেকটা কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু কায়েশী যাওয়ার সময় কায়রাভ তার হাত ধরে এক টানে নিজের বুকে এনে ফেললো। টাল সামলে উঠতে না পেরে রমনী নিজের অজান্তেই আশ্রয় নিলো সেই পৌরুষদীপ্ত সুঠাম বুকে। ভারসাম্য রাখতে তার শীর্ন দু-হাত কায়রাভের শক্তপোক্ত প্রশস্ত কাঁধ দখল করলো। আর কায়রাভের হাত দুটো স্থান পেলো রমনীর সুগঠিত মসৃন লতানো কোমরে। মুহূর্তের জন্য দু’জনের দৃষ্টি মিললো। নিঃশ্বাসের দূরত্বটুকু ঘুচলো। কায়রাভ কায়েশীর কপালে নেমে আসা অবাধ্য চুলগুলো আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে নরম স্বরে বলল,
“কখনো তো মুখ ফুটে বলতে শেখো, কায়েশী। আমি অন্তর্যামী নই যে সব বুঝে যাবো।”
কায়েশী চোর ধরা পড়ে যাওয়ার ন্যায় চোখ ফিরিয়ে নিলো। কায়রাভ সত্যি ধরে ফেলেছে কায়েশীর মনোভাব। যে কায়েশী চাইছে না কায়রাভ বাইরে যাক। সেসব ভাবনায় ঠোঁটদুটো তিরতির করে সামান্য কাঁপলো রমনীর। কায়রাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সারাদিন বাসায় বসে কী করবো? তাই ভাবছিলাম ফিরোজের বাসায় যাই, একটু আড্ডা দিই। সময় কেটে যাবে।”
কায়েশী তা শুনে অবচেতনভাবে মুখ ফসকে বলে ফেললো,
“সময় কাটাতে বাইরে কেন যেতে হবে? আপনার বাড়িতে কেউ নেই নাকি!”
কায়রাভ বলল,
“বাড়িতে বোন আছে, সে ঘুমে। ছেলে আছে, সেও ঘুমে। যদিও বউ জেগে আছে, তবে সে আমার সঙ্গে সময় কাটানো তো দূরের কথা, কথা বলতে পর্যন্ত আগ্রহী নয়!”
“আপনার বউ আপনাকে এটা বলেছে?”
“না।”
“তাহলে না বুঝে নিজের বউয়ের বদনাম করছেন কেন?”
কায়রাভ হেসে ফেললো এইবার। এই ত্যাড়া বউ নিয়ে সে কোথায় যাবে! সামান্য কথাটুকু মুখে বলতে এতো আপত্তি! কায়রাভ নিজেই বলল,
“একটা কথা সরাসরি বলতে এত গাইগুই কিসের? আচ্ছা, এবার যাও। শাড়ি চেঞ্জ করে আসো। বাইরে তোমাকে নিয়েই যাবো।”
কায়েশী মুখ ঘুরিয়ে নিলো। দৃঢ় পায়ে হেঁটে যেতে যেতে বলল,
“এখন তো আমি বলেছি তাই আমাকে নিয়ে যেতে চাইছেন। আগে তো বলেন নি! কিন্তু সরি, এখন আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না।”
পেছন থেকে কায়রাভের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“তা হলে তুমি চাইছো আমি তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দেই? নট আ ব্যাড আইডিয়া। আ’ম জাস্ট কামিং….”
কায়েশী আঁতকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো,
“নাআআআ! যাচ্ছি, যাচ্ছি। সবসময় জোর করে!”
কায়রাভ মুচকি হেসে বিছানার পাশে বসে। আর কায়েশী ওয়ারড্রোব থেকে একটা শাড়ি তুলে প্রায় দৌড়ে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। ঠিক সেই সময় ছোট্ট কায়ান ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠলো। শরীর হালকা মোচড় দিয়ে টান টান করছে। ঘুম ভেঙে গেলে চোখ দুটো পিটপিট করে খুলে সামনে বাবাকে দেখে বলল,
“বাবা…”
“হুম, বাবা। ঘুম কেমন হলো?”
“ভালোও।”
কায়রাভ আদর করে বলল,
“একদম ঠিক সময় উঠেছো, আব্বা। এবার তোমাকে রেডি করিয়ে দেই আমি।”
এই বলে কায়ানকে কোলে তুলে নিলো সে। কায়রাভ ছেলের জন্য নিজের সঙ্গে মিলিয়ে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট বেছে নিলো। কায়ানকে সেই পোশাকগুলো পরিয়ে দিয়ে আয়নায় একবার দেখে মনে মনে ভাবলো এখন পুরো বাপ ব্যাটা লাগছে!
—————————————–
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে ট্যাপে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। কায়েশী ওয়াসরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাল পেরে সাদা শাড়িটা গায়ে জড়াতে জড়াতে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালো। বাইরে ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে মনটা হালকা হয়ে গেছে, সেটা সে নিজেও জানে। অনেকদিন পর বাইরে যাচ্ছে। এমনিতে বাসায় সারাদিন একাই থাকতে হয়। একা একা থাকতে কার ভালো লাগে? এসব ভাবনার মাঝে শাড়ির কুচি ঠিক করে ওয়াসরুমের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে কায়েশী।
ঘরের ভেতর কায়রাভ কায়ানকে কোলে বসিয়ে শার্টের বোতাম ঠিক করে পরাচ্ছিলো। ছোট্ট হাতদুটো বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরেছে বারবার। কায়েশীকে শাড়ি পড়তে দেখে কৌতুহলে জিজ্ঞেস করে,
“বাবা, আমলা কি বাইলে যাবো?”
“হ্যাঁ, যাবোই তো। তাই তো তোমাকে রেডি…..”
কায়রাভ পুরো কথা বলার আগেই চোখ পড়ে কায়েশীর উপর। যাকে দেখে কিছুসময়ের জন্য চোখদুটো থমকে গেলো বোধহয়। লাল-সাদা রঙের শাড়ি, চুলগুলো আলতো করে পিঠে ছড়ানো। কায়রাভের সবচেয়ে ভালো লাগে কায়েশীর দুই ভাজে আঁচল নেওয়ার ধরনটা। এইভাবে রুচিশীল, মার্জিত ভঙিতে শাড়ি পরে কায়েশী। শরীরের একটা অংশ বা ভাজও বোঝা যাবে না। যেটাতে বড্ড এলিগ্যান্ট লাগে ওকে। সাধারন কায়দা অথচ দৃষ্টিনন্দন। এছাড়া কোনো বাড়তি সাজসজ্জা নেই, তবুও অপুর্ব লাস্যময়ী লাগছে। কায়রাভ তাকিয়ে থাকলো অপলক। কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হলো এভাবেই। চোখ সরাতে পারল না সে। এখনও সেই বিমোহিত রুপের মায়াজালে আটকা পরে রয়েছে কায়রাভ। কি সুন্দর তার নারী, যার বর্ননা কখনো করতে পারে না কায়রাভ। শুধু এতটুকুই বলতে পারে, ভয়ংকর রকমের সুন্দর তার বউ। কায়ানই তাদের মাঝে নীরবতা ভাঙলো। সে নিজের মাকে নতুন শাড়ি পরতে দেখে বরাবরের ন্যায় প্রশংসা করে বলল,
“মা…সুন্দর।”
কায়েশী আলতো হেসে ছেলের কাছে এগিয়ে গিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“তুমি আরো সুন্দর।”
কায়রাভ হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে ছেলেকে বলল,
“সব তুমিই বলে দেবে নাকি! আমি কি বলবো এবার?”
কায়ান বুঝলো না তার বাবার হেয়ালি কথা। সে নিজের শার্টের চকচকে বোতাম দেখতে ব্যস্ত। এদিকে কায়েশী তা শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালো কায়রাভের দিকে। আনমনেই বলল,
“আপনি তো এমনিতেই বেশি বলেন।”
এই বলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একে একে লাল চুড়িগুলো হাতে পরে নিলো। কায়রাভও উঠে দাঁড়ালো। কায়ানকে বিছানায় বসিয়ে রেখে ধীরে ধীরে কায়েশীর সামনে এসে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো বুকের কাছে হাত ভাজ করে। কায়রাভের মনে হলো, এইতো তাদের মাঝে সব স্বাভাবিক। শুধু মুহুর্তগুলোর স্থায়ীত্ব কম হয়। এই স্থায়ীত্বটুকু সারাজীবন ধরে রাখতে পারলেই তারা সুখী মানুষের খাতায় নাম লেখাতে পারবে। ভাবনা অন্য কিছু হলেও কায়রাভ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে তার বহুকাঙ্ক্ষিত অপার্থিব নারীকে। কায়রাভের গলার স্বর এবার অনেকটা নরম,
“তোমার এইভাবে হঠাৎ সুন্দর পরিবর্তন হয়ে ওঠাটা কিন্তু বিপজ্জনক।”
“কিসের জন্য?”
“আমার ধৈর্যের জন্য।”
কায়েশী আর কিছু বলল না। শুধু একবার তাকিয়ে ধীরে চোখ নামিয়ে নিলো। ওমন গভীর পুরুষালী দৃষ্টি তার ভেতরের সমস্ত সত্তাকে নাড়িয়ে দেয়। এতটাই যে সে অবচেতনে খানিকটা সরে যেতে চাইলেও পারে না। শুধু কোনোভাবে দৃষ্টিটুকু থেকে পালিয়ে বাঁচার ব্যর্থ চেষ্টা করে যায়। অথচ এই নীরবতার মাঝেই কত কথা বলা হয়ে গেল দু’জনের। কায়েশী দু’হাত তুলে মাঝখান দিয়ে সিঁথি কেটে চুল বেঁধে নিলো খোপার মতো করে। দৃশ্যটা চোখ এড়ালো না কায়রাভের।
“চুল খোলা রাখবে না?”
কায়েশী হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন? বেঁধে নিলে সমস্যা কী? এভাবে ভালো লাগছে না?”
চুল বাঁধার কারনে কায়েশীর ঘাড়-গলা উন্মুক্ত। কায়রাভের দৃষ্টি তখন আটকে আছে কায়েশীর সফেদ, মসৃণ ঘাড়ের সেই লাল তিলে। ওটাই তার চরম দুর্বলতা। ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে সে তিলটাকে আলাদাভাবে যত্ন করে ছুঁয়ে দেয়। এখন এই তড়পানো অনুভূতি সে বোঝাবে কীভাবে? নিজের অস্থিরতা সে লুকোবে কীভাবে? এই তিলকে ঘিরেই তার সমস্ত সংযম ভেঙে পড়ে কায়েশী তা জানে না। উপলব্ধি হলো শ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। এই মেয়েটা তার আত্মসংযমের ফাটল ধরিয়েই ছাড়বে দেখছি! কায়রাভ এবার একটু শক্ত গলায় বলে,
“ভালো লাগা–না লাগার কথা না, কায়েশী। এভাবে বাইরে যাওয়া যাবে না। চুল খোলাই রাখো। ”
কায়েশী অবাক হয়ে তাকালো। মাঝে মাঝে লোকটার মতিগতি বুঝতে পারে না সে। হঠাৎ কি হলো? বলল,
“আশ্চর্য! এমন করছেন কেন? চুল বাঁধা নিয়ে এতো আপত্তি কিসের?”
কায়রাভ প্রায় অস্থির ভঙ্গিতে কায়েশীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঠিক ঘাড়ের ওই লাল তিল বরাবর তপ্ত শ্বাস ফেলে ব্যাকুল হয়ে বলল,
“প্লিইজ! চুল খোলাই রাখো, কায়েশী। এভাবে বাঁধা থাকলে আমার অস্থির লাগে!”
কায়েশী সামান্য তুতলিয়ে বলার চেষ্টা করলো,
“কা…কায়ান.. আছে, ”
কায়রাভ মৃদু আওয়াজে বলল,
“কায়রা নিয়ে গেছে ওকে। যখন আমরা কথা বলছিলাম, তুমি খেয়াল করোনি। কায়ান নেই এখানে।”
কায়েশী নড়তে পারে না আর, পাথরের ন্যায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কায়রাভের বাহুবন্ধনের মাঝে। ছাড়ানোর প্রচেষ্টা চালায় না আগের মতো। এদিকে ইহজগৎের হুস হারিয়েছে এবার কায়রাভ। অসহায় পুরুষ কায়রাভ কায়েশীর ভাষ্যমতে আবার এক বেলাল্লাপনার ন্যায় অঘটন ঘটালো। বেপরোয়া হয়ে একটা চু’মু খেয়েই ফেললো সেই লাল তিলে, একলহমায়।
কায়েশী চমকে উঠলো। তার চোখ ছলছল আকার ধারন করলো পরক্ষনেই। তপ্ত অনুভুতির জোয়ারে কিছুটা জমেও গেলো সে। ক্রমেই অস্থিরতা বাড়ছে কায়রাভের। সামলাতে কষ্ট হচ্ছে নিজেকে। কায়েশীর কথা ভেবে কায়রাভ যদিও নিজেকে সামলাতে অগ্রসর হচ্ছিলো কিন্তু এইবার তাতে বাঁধা দিলো স্বয়ং প্রকৃতি। হঠাৎ জোরে শব্দ করে বজ্রপাত ঘটে ধরনীর বুকে। পরপরই মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। ঘরে থাকা বিদ্যুৎের আলো মুহুর্তেই নিভে যায়। ঘরে এবার বড় জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলো আবহের সঙ্গে মিশে রইল। বজ্রপাতের সেই মুহুর্ত পর কায়েশী ঘুরে গিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে কায়রাভকে। কায়েশীর এই জড়িয়ে ধরা মোটেও আতঙ্কের জন্য নয়। ও ভয় পায় না বাজ পড়ার শব্দে। ও আজ অনুভুতির আবেশে সাড়া দিয়ে কায়রাভকে আপন করে নিয়েছে। মুহুর্তেই অনুভুতির তড়পানো কমে কায়রাভের তনুমন শান্ত হলো এমন বিগলিত স্পর্শে। কায়রাভ নিজেও জানে কায়েশীকে। তাই আজ আনমনেই হাসলো কায়রাভ। ওভাবে জড়িয়ে রেখেই জিজ্ঞেস করে,
“বজ্রপাতের আওয়াজে ভয় পাওয়ার মতো মেয়ে নও তুমি, কায়েশী। আর না এইসব অনুভুতি নতুন যে তুমি আমায় আবেশে জড়িয়ে ধরবে। এবার বলো, জড়িয়ে ধরার কারণ?”
কায়েশী আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলো। এতক্ষণ সে নীরবে কাঁদছিলো, এবার আর ধরে রাখতে পারলো না। ভাঙা গলায় বলল,
“আমি জানি না… সত্যি জানি না। কিছুই জানি না আমি।”
কায়রাভ চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চোখ খুলেই শক্ত হাতে কায়েশীর মাথা বুক থেকে তুললো। তার হাত কায়েশীর গালে স্থির হয়ে রইল। স্পর্শে কোনো রূঢ়তা নেই, শুধু জমে আছে না জানা প্রশ্নের ভার।
“আমার অনেক প্রশ্ন আছে, কায়েশী। আজ সবগুলোর উত্তর চাই। শত্রুর গুলি লাগার পর তুমি ছুটে এলে কেন? এটা কেমন ঘৃণা? শত্রুর জন্য প্রতিদিন রান্না করা, শত্রু জ্বর হলে রাত জেগে লুকিয়ে তার সেবা করে সকালে তা অস্বীকার করা, শত্রুর সন্তানকে ভালোবেসে বড় করা, এসব কেমন ঘৃণা? সত্যি বলতে আমি তোমার ঘৃনা বিয়ের পর কখনো অনুভব করিই নি। যা ছিলো ওটাকে রাগ বলে, ঘৃনা নয়। ঘৃনা ঘৃনা বলে চিৎকার করেই ঘৃনার প্রমান দেওয়া যায় না, কায়েশী ফারিয়াহ! ঘৃনার ডেফিনেশন আদৌও জানো তো তুমি? চলো, আজ তোমার থেকে ঘৃণার ডেফিনেশন জানবো। বলো কায়েশী… বলো! জাস্ট স্পিক আপ, ড্যামেট!!”
শেষ কথাটায় কায়রাভের কণ্ঠ চড়ে উঠতেই কায়েশী কেঁপে উঠলো। অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমি আপনাকে কখনো বুঝতে পারিনি। আসলে… নিজেকেই কখনো বুঝতে পারিনি। এই কয়েক বছর সংসার করে আপনার কথামতো ভালোবাসতে পেরেছি কি না জানি না। কিন্তু এটুকু উপলব্ধি হয়েছে যে আমার ভরসার জায়গায় একমাত্র আপনি আছেন। যাকে আমি বিশ্বাস করি। আপনার সঙ্গে আমি সংসার করতে চাই, বাকিটা জীবন কাটাতে চাই সব ভুলে। আমার ছেলের জন্য…আমার আপনাকে দরকার। আর…আমার জন্যও আপনাকেই দরকার।”
কায়রাভ এবার যেন দম ছাড়লো। এতক্ষণ তার শ্বাস আটকে ছিলো। কায়েশীর মুখখানা হাতের আঁজলায় নিয়ে নিজের লাগামছাড়া ঠোঁটের স্পর্শে ভরিয়ে দিলো। কায়েশী তখনও কাঁদছে। কেন কাঁদছে জানে না, শুধু জানে কান্নাটা দরকার ছিলো। অন্তত এই সময়ে। ভেজা চোখে বলল,
“আমি হয়তো খুব খারাপ মা ছিলাম। প্রথম মা হওয়ার পর স্বার্থপরের মতো বাচ্চাটাকেও দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আর আপনার স্ত্রী হিসেবে তো কখনো আমি ভালো ছিলাম না। কারণ, আমি তো…অন্য কাউকে ভালো বেসেছিলাম।”
কায়রাভ ওর ঠোঁটে চুমু দিয়ে কথা থামিয়ে দিলো।
“চুপ করো। আগে কী হয়েছে, না হয়েছে এসব শুনতে চাই না। তুমি ভালো মা, ভালো স্ত্রী। এসব ফালতু কথা মাথায়ও আনবে না। তোমার পৃথিবীতে আমি আর কায়ান ছাড়া আর কেউ নেই—কিচ্ছু নেই। ব্যস, এতটুকু মাথায় রাখবে শুধু। ”
কায়েশী হু হু করে কাঁদলো। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভেঙে এলো। তবুও বলার চেষ্টা করলো,
“আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই…যদি কখনো আপনি আমাকে ভুল বোঝেন, আমি সহ্য করতে পারবো না। তখন আমি একেবারে ভেঙে যাবো। তাই আপনি আগেই জেনে রাখুন, শুনুন….”
কায়রাভ শান্ত কিন্তু কঠোর স্বরে বলল,
“আমি কিছু শুনতে চাই না। কী বলেছি শুনতে পাওনি? তোমার জীবনে আমি আছি, আমিই থাকবো। অতীত নিয়ে আর একটা কথাও নয়। ওটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিলোই না। আমি সব জেনেই তোমাকে নিজের করেছি তাহলে ভুল কেন বুঝবো! আমাদের মাঝে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি এলাও করবো না আমি।”
মুলত কায়রাভ কায়েশীর অতীককে হিংসা করে তাই শুনতে চায় না। ওর রাগ হয়। তবে নিজেকে সামলে নেয়, বুঝতে দেয় না কাওকে। কায়েশী কাঁপা গলায় শেষ প্রশ্নটা করলো,
“একটা কথা বলুন… কখনো কোনো সত্য জেনে আপনি আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে আফসোস করবেন না তো?”
কায়রাভ হালকা মাথা নাড়লো,
“না। কখনোই না। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে বিয়ে করাটা হয়তো আমার ভুল ছিলো। কিন্তু তোমাকে বিয়ে করা আমার জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত। দে্য়ার ইজ এবসোলিউটলি নো ডাউট!”
কায়েশী আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করলো না, কোনো হম্বিতম্বিও করলো না। তার সব সংকোচ, সব দ্বিধা ভেঙে গিয়েছে। নিজ থেকেই প্রথমবার কায়রাভের বুকে মাথা ঠেকিয়ে পড়ে রইলো। আজ কায়রাভের ভালোবাসা পাওয়ার অনুভুতিতে সেও সামিল হলো। সত্যি বলতে, এমন অনুভূতি আগেও এসেছে কিন্তু নিজের অযথা জেদ, হঠকারিতায় নিজে থেকে কাছে আসা কখনো হয়নি। আজ যখন অনুভুতি ব্যক্ত হয়েই গিয়েছে তখন আর কোনো দূরত্ব রাখবে না সে, অন্তত তার তরফ থেকে।
#চলমান…….
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]
হাই পাঠক! 🙋♀️
🚫নিয়মিত গল্প পেতে ফলো রাখবেন।
আইডির লিংক-
https://www.facebook.com/profile.php?id=61576268698554
🚫আমার সব গল্পের লিংক একত্রে
https://www.facebook.com/share/p/1AZyThqcJK/