গল্প: রাগে অনুরাগে(১১)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

১১.
~
বাইরের ব্যালকনির সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে তানভীর। বিষন্ন আকাশেল ন্যায় তার মনেও এই মুহুর্তে ছেয়ে আছে একরাশ বিষন্ন। ‘ফিহা’ মেয়েটাকে সে পছন্দ করে। সেই প্রথম থেকে। তার এতদিন ধারণা ছিল মেয়েটাও হয়তো তাকে পছন্দ করে। কিন্তু আজ তার সমস্ত ধারণা পাল্টে গেছে। তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হাতটা বাহির করে বৃষ্টিতে ভেজায়। চোখ বুজে প্রাণ ভরে এক নিশ্বাস নেই। তারপর আবার চোখ মেলে তাকিয়ে বৃষ্টি ভেজা হাতটা পকেটে পুরে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। পেছনে ফিরে তাকাতেই সে ফিহাকে দেখল। মুখে তার চমৎকার হাসি। তানভীর তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই ফিহা তাকে আটকালো। বললো,

‘কোথায় যাচ্ছো?’

তানভীর ফিহার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল,

‘রুমে।’

ফিহা মৃদু হেসে তানভীরের দিকে একটা কফির মগ এগিয়ে দিয়ে বললো,

‘উঁহু রুমে যাবে না। আমার সাথে এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কফি খাবে আর বৃষ্টিবিলাস করবে।’

তানভীরের মনের কোণে জমে থাকা সুপ্ত রাগ যেন মাথা চেরে উঠল। সে তখন কর্কশ গলায় ফিহাকে বলে উঠল,

‘তোর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কফি খাওয়া ছাড়াও আমার আরো অনেক কাজ আছে। আর যদি এতই বৃষ্টিবিলাস করতে শখ হয়, তাহলে তুই এক কাজ কর; তোর প্রিয় মানুষকে কল করে এখানে ডেকে নে তারপর দুজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কফি খেতে পারবি আর বৃষ্টিবিলাসও করতে পারবি। এটাই তোর জন্য বেটার হবে।’

তানভীরের রাগ দেখে ফিহা মিটিমিটি হাসল। তানভীর যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ফিহা আবারও তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে বললো,

‘আমার প্রিয় মানুষটা এখানে আসতে পারলে কি আর আমি তোমাকে বলতাম, বলো? এখন যখন এটা আর পসিবল না কি আর করার? এক কাজ করো, এখন না হয় কিছুক্ষণের জন্য তুমিই আমার প্রিয় মানুষ হয়ে যাও।(একটু থেমে) অবশ্য যদি তুমি চাও তাহলে আমি কিন্তু তোমাকে শুধু সাময়িক সময়ের জন্য না ইনফিনিটি সময়ের আমার প্রিয় মানুষ বানিয়ে রাখতে পারি। মানে আরকি, এটা তোমার ইচ্ছের উপর ডিপেন্ড করছে। যদি চাও তাহলেই, আর নয়তো না।’

তানভীর আহাম্মকের মতো চেয়ে রইল ফিহার দিকে। তার কথার আগা মাথা তানভীরের বোধগম্য হলো না। সে চোখ মুখ কুঁচকে ফিহাকে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘কি বলছিস এসব? আগা মাথা তো কিছুই বুঝেনি।’

ফিহা মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলে,

‘ঐসব তুমি বুঝবাও না। আরেকটু বড় হয়ে নাও তারপর সব বুঝতে পারবা। এখন নাও কফিটা খাও। নিজের হাতে বানিয়ে এনেছি।’

তানভীর তার দৃষ্টি সূচালো করে ফিহার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘দিন দিন ফাজিল হচ্ছিস। ফায়াজ ভাইয়াকে বলতে হবে, তোকে যেন একটু নজরে নজরে রাখে। নাহলে আবার কখন কি কীর্তি করে বসিস বলা যায় না!’

ফিহা তখন অভিমানী কন্ঠে বলে উঠল,

‘ফায়াজ ভাইয়া কেন নজরে নজরে রাখবে? তুমি রাখতে পারো না? তোমার এত কিসের কাজ শুনি? এখন তো তোমার ভার্সিটিও বন্ধ। একটু তো আমাকেও সময় দিতে পারো, তাই না।’

ফিহার কথা শুনে তানভীর হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল তার দিকে। মেয়েটা কাকে কি বলছে? তানভীর এবার অত্যদিক মাত্রায় বিরক্ত হলো। কপালের ভাজ চওড়া হলো তার। গলার স্বর খানিকটা তীক্ষ্ণ করে সে বললো,

‘তোকে কেন আমি সময় দিতে যাব শুনি? আর তুইই বা আমার কম্পানি চাস কেন? তোকে সময় দেওয়ার মতো তো আরো মানুষ আছে। যার জন্য গোলাপটা রেখেছিস সে কই? সে বুঝি তোকে সময় দেয় না?’

ফিহা জবাব না দিয়ে ব্যালকনির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে পেছন ফেরে আবার তানভীরের দিকে চাইল, তারপর মিহি কন্ঠে বললো,

‘একটা গান গাইবো, শুনবে?’

নিমিষেই মন ঠিক হয়ে গেল তানভীরের। মনের কোণের সমস্ত অভিযোগ তার বিলীন হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল চমৎকার এক হাসি। মেয়েটার গানের গলা দারুণ। সে চটপট বলে উঠল,

‘অবশ্যই!’

ফিহা মুচকি হেসে সুর তুললো,

“আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে
ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে
জানি নে, জানি নে
কিছুতে কেন যে মন লাগে না, লাগে না
ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে
আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে।

এই চঞ্চল সজল পবন বেগে
উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়, মন চায়
এই চঞ্চল সজল পবন বেগে
উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়
মন চায়, ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে
আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে
ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে..
…..

____________________________________

ফায়াজ গাড়ি থামাতেই তনিমা গাড়ি থেকে নেমে গেল। তারপর দৌঁড়ে গিয়ে সামনে অবস্থানরত ছোট্ট খুপরির মতো দেখতে এক কুড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকল। হাতের ইশারা দিয়ে সে ফায়াজকেও ডাকল। গাড়ির মধ্যে বসে থেকেই ফায়াজ তনিমাকে দেখছে। অবাক হলো সে তনিমার কান্ডে। বাধ্য হয়ে তাকেও নেমে যেতে হলো গাড়ি থেকে। ছুটে গিয়ে তনিমার পাশে দাঁড়াল। তারপর শরীর ঝাড়তে ঝাড়তে কিছুটা রাগ দেখিয়ে সে তনিমাকে বললো,

‘এখানে কেন নেমেছিস? কি আছে এখানে?’

তনিমা মুচকি হেসে বললো,

‘কিছু নেই তো কি হয়েছে? তুই আর আমি আছি না আর কি লাগে?’

ফায়াজ বিরক্ত হয় তনিমার কথায়। বৃষ্টিতে ভিজে দুজনেরই অবস্থা খারাপ। আর এই খুপরির নিচে দাঁড়িয়েও শান্তি নেই। বৃষ্টির যা বেগ, যেকোনো সময় এটা ভেঙ্গে পড়তে পারে।

তনিমা প্রশ্বস্ত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক দেখে যাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে চারপাশ সব সাদা দেখাচ্ছে। তারা যেখানে আছে তার কিছুটা সামনেই তনিমা একটা ছোট্ট মাঠ দেখল। যেটাতে এই মুহুর্তে বৃষ্টির পানি জমে ছোট্ট পুকুরের আকার ধারণ করেছে। এই মাঠ থেকে অনেক দূরে কিছু টিনের ঘর দেখা যাচ্ছে। তনিমা সরু সরু চোখ করে সেদিকেই চেয়ে রইল। বাম হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ফায়াজ টাইম দেখল। দুইটা পনেরো বাজে। ফায়াজ এবার তনিমার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘তনু চল এবার। দেখ দুইটার উপরে বাজছে। আর লেইট হলে দেখবি বাড়ির সবাই না খেয়ে আমাদের জন্য বসে থাকবে।’

তনিমা মুখ কালো করে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘আমরা না যেতে ইচ্ছে করছে না। দেখ কি সুন্দর লাগছে চারপাশ। অজস্র বৃষ্টির মাঝে কেবল তুই আর আমি। আর কেউ নেই। নিশ্চুপ নিস্তব্ধ চারপাশ। কেবল বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ কানে বাজজে। তোর তো এই রকম পরিবেশই পছন্দ। তাহলে এখন চলে যেতে চাইছিস কেন? থাকি না আরেকটু!’

ফায়াজ মাথা নাড়িয়ে না করলো। তনিমা চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। রাগ করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো,

‘তাহলে তুই চলে যা। আমি একাই এখানে দাঁড়িয়ে থাকব।’

ফায়াজ বাঁকা হেসে বললো,

‘তাহলে থাক দাঁড়িয়ে, আমি চলে যাচ্ছি।’

তনিমাও রাগ দেখিয়ে বললো,

‘যা, তোকে কেউ আটকাবেনা।’

সত্যি সত্যিই ফায়াজ চলে গেল। গাড়ি নিয়ে উল্টো রাস্তায়। তনিমা এবার অসহায়ের মতো এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল তাকে। ফায়াজ সত্যি সত্যিই তাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছে? সত্যি সত্যিই চলে গিয়েছে? ওকে না নিয়েই ফায়াজ কিভাবে চলে গেল? একটুও বাঁধল না ওর। তনিমার কান্না পেয়ে যায়। ফায়াজ, ফায়াজ বলে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু বৃষ্টির আওয়াজের মাঝে তার ধ্বনি হারিয়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও ফায়াজকে ফিরে আসতে না দেখে তনিমা এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে যায়। মোবাইলটাও তার গাড়িতে। কাউকে কল দেওয়ারও উপায় নেই। ভয় আর দুশ্চিন্তায় এবার কেঁদে ফেলে সে। বৃষ্টির মাঝে আবার কিছু দেখতেও পাচ্ছে না। যারদিকের নিস্তব্ধতা তার ভয়কে আরো বাড়িয়ে দিল। তনিমা এবার এদিক ওদিক তাকিয়ে ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলে উঠল,

‘ফায়াজ কই তুই?’

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x