গল্প: শখের পদ্মফুল (০৮)

লেখনীতে:লুনা আক্তার নূর

পর্ব:০৮

 

ইভান এতক্ষণে সব কিছুই দেখেছে। কিভাবে তার মম সায়ান কে আদর করেছে। আর সে দেশে আসার পর থেকে তার মম তার দিকে ঠিক মতো ঘুরেও তাকাই নি। এইসব দেখে তার মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। আজকে যদি সব কিছু ঠিক থাকতো তাহলে তার মম ও তাকে এইভাবেই জ’ড়ি’য়ে ধরতেন।

তার মম ও তো তাকে খুব বেশি ভালোবাসেন। শুধু তার করা ভুলের জন্যই আজকে সে নিজের পরিবারের থেকে, আইরার থেকে এতটা দূরে সরে গিয়েছে।

এইসব ভাবতে ভাবতে ইভানের চোখ ভিজে উঠে। হঠাৎই কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে ইভান চোখ মুছে পিছনে ফিরে।

আরিয়ান:- এখানে একা একা দাঁড়িয়ে কি করছিস। চল ঐদিকে যায়। সবাই তো ঐদিকে আছে।

ইভান:- এখানেই ঠিক আছি আমি। আর আমার থাকা না থাকায় কারোর কিছুই যায় আসে না। দেখছিস না মম ড্যাড সবাই আমাকে কেমন করে ইগনোর করছে। মনে হচ্ছে আমি ওদের কেউই হই না।

আরিয়ান:- তুই যে ভুলটা করেছিস তার জন্য এই টুকু ব্যবহার তো তোর প্রাপ্য।

ইভান:- হ্যাঁ মানছি যে আমি ভুল করেছি। এখন তো আমি সেটা শুধরাতেও চাচ্ছি। মানুষ মাত্রই তো ভুল হয়। আমি মমের কাছে শুধু একটা সুযোগ চেয়েছি। কিন্তু মম তো আমার কোনো কথাই শুনছে না।

আরিয়ান:- দেখ ইভান তুই যা করেছিস সেটা ফুপি ঠিক মেনে নিতে পারেননি। উনার অনেক আশা ছিল যে তুই হয়তো উনাকে নিরাশ করবি না। উনি তোকে অনেক ভালোবাসেন তাই তো তোর করা ব্যবহারে উনি অনেক ক’ষ্ট পেয়েছেন।

ইভান:- আমি বুঝতে পারছি।

আরিয়ান:- আচ্ছা বাদ দে এসব। চল নওমির কাছে। আজকে ওর গায়ে হলুদ। তুই বড় ভাই হয়ে গায়ে হলুদ না ছোঁয়ালে হবে নাকি। চল তাড়াতাড়ি।

বলেই আরিয়ান, ইভানের হাত ধরে তাকে স্টেজের কাছে নিয়ে যায়। স্টেজের কাছে যেতেই ইভানের চোখ পড়ে আইরার ওপর। আইরা একটা কর্নারে চুপ করে বসে আছে।

আইরা কে দেখেই ইভানের হার্টবিট বেড়ে যায়। কারণ আইরা আজকে একটা সাদা সারারা পড়েছে। জামাটাতে সাদা স্টোনের কাজ করা। আইরার গায়ে সাদা রঙটা বেশ মানিয়েছে। অবশ্য আইরা যে রঙের জামাই পড়ুক না কেনো তাকে সব গুলোতেই খুব বেশীই মানাই।

ইভান এক দৃষ্টিতে আইরার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কিছু না ভেবেই আইরার কাছে যাওয়ার জন্য যেই না পা বাড়াবে এমন সময় কোথায় থেকে সায়ান হাসতে হাসতে আইরার পাশে বসে পড়ে।

কেউ হঠাৎ করে পাশে বসাই আইরা একটু ভয় পেয়ে যায় আর সরে বসতে যায়, যার ফলে পড়ে যেতে নেয় আর তখনই সায়ান, আইরার হাত ধরে তাকে পড়ে যাওয়া থেকে আটকাই।

সায়ান:- তুমি ঠিক আছো তো?

আইরা:- হ্যাঁ আমি ঠিক আছি। আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য।

সায়ান:- ব্যাপার না, তুমিই আইরা। 𝐀𝐦 𝐈 𝐫𝐢𝐠𝐡𝐭?

আইরা একটু অবাক হয়। আইরা কে অবাক হতে দেখে সায়ান ফিক করে হেসে বলে,

সায়ান:- ভাবছো যে আমি তোমাকে কিভাবে চিনলাম।

আইরা:- আপনি কি সায়ান!!

সায়ান:- বাহ তাহলে চিনে ফেললে। হুম, আমিই সায়ান।

সায়ান যতটা সম্ভব নিজেকে সকলের সামনে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। এইরকম আরো টুকিটাকি কথা হয় তাদের মাঝে। আর অন্যদিকে এমন দৃশ্য দেখে ইভান রা’গে’র চোটে নিজের হাত মুষ্ঠি বদ্ধ করে ফেলে। তখনই আরিয়ান, ইভানের কাছে আসে।

আরিয়ান:- কিরে ভাই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস চল নওমির গায়ে হলুদ দিবি না।

আরিয়ানের কথাই ইভান কিছু বলে না। তাই আরিয়ান ইভানের কাঁধে হাত দিয়ে হালকা করে ধা’ক্কা দেই। কিন্তু ইভান তবুও কিছু বলছে না।

তাই আরিয়ান, ইভানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আর দেখতে পাই যে ইভানের চোখ জোড়া র’ক্ত বর্ণ ধারণ করেছে, সাথে তার শরীর থর থর করে কাঁপছে রা’গে’র চোটে।

আরিয়ান:- ইভান তোর কি হয়েছে। চোখ গুলো এমন লাল লাল হয়ে আছে কেনো। শরীর খারাপ করছে নাকি।

আরিয়ানের কথাই ইভান কিছু বলে না শুধু সামনের দিকেই তাকিয়ে আছে। আর ফোস ফাস করে শ্বাস ছাড়ছে। আরিয়ান, ইভান কে এমন করতে দেখে সেও সামনের দিকে তাকাই আর বুঝতে পারে যে কেনো ইভান এমন করছে।

আরিয়ান সামনে তাকাতেই দেখতে পায় যে সায়ান, আইরার হাতটা ধরে আছে আর দুইজনই কি যেনো বলছে আর থেকে থেকে তারা হাসাহাসি করছে।

ইভান, আরিয়ান কে ঠেলে সামনে এগোতেই যাবে কিন্তু আরিয়ান তাকে আটকিয়ে ফেলে।

কারণ এমনি তে ইভান খুব শান্তশিষ্ট কিন্তু একবার রে’গে গেলে সে কি করবে সেটা সে নিজেও জানে না। রা’গে’র সময় সে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

আর এখন এই খুশির মুহূর্তে যদি ইভান কিছু করে ফেলে তাহলে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে। তাই আরিয়ান তার যথেষ্ঠ চেষ্টা করছে ইভান কে আটকানোর।

ইভান:- আমাকে ছাড় আরিয়ান। ওর সাহস হয় কিভাবে যে ও আমার জিনিসের দিকে নজর দেই।

আরিয়ান:- ইভান মাথা গরম করিস না। অনুষ্ঠান বাড়ি এটা। তার ওপর নওমির শশুর বাড়ির লোকজন আছে এখানে। তুই যদি মাথা গরম করিস তো উল্টা পাল্টা কিছু করে বসবি। এটা ভালো দেখায় না।

আরিয়ানের কথা শুনে ইভানের এবার হুস হয়। আরিয়ান তো ঠিক কথাই বলেছে। এখন যদি সে নিজের রা’গ ক’ন্ট্রো’ল না করতে পারে তাহলে সে উল্টা পাল্টা কিছু করে বসবে।

তাই ইভান নিজের রা’গ কে ক’ন্ট্রো’লে আনার চেষ্টা করে। তবে সে কিছুতেই নিজের রা’গ ক’ন্ট্রো’লে আনতে পারছে না। তাই ইভান কিছু না ভেবেই আরিয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সেখান থেকে বের হয়ে যায়। আরিয়ান ও তার পিছন পিছন যায়।
,,,,,,,,,,

মিসেস শারমিন:- সায়ান ভাবির সাথে গল্প করলেই হবে চল নওমির কাছে। ওকে তুই হলুদ দিবি না। সবাই তো দিলো তুই ও চল। আর আইরা চল তুই নওমির গায়ে হলুদ দিবি।

মিসেস শারমিনের কথা শুনে সায়ানের বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। সে নিজেকে সামলিয়ে বলে,

সায়ান:- আম্মু আমাকে কি হলুদ দিতেই হবে। না দিলে হয় না।

__:- সে কি কথা। হলুদ কেনো দিবি না। তুই নওমির ভাই হোস, চল। আর আইরা তুই চল আমার সাথে।

বলেই তিনি আইরার হাত ধরে নিয়ে যেতে থাকেন। সায়ান কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে শক্ত করে স্টেজের দিকে এগিয়ে যায়।

সায়ান আসতেই সবাই সরে দাড়াই। সায়ান ধীর পায়ে নওমির কাছে যায় আর হলুদের বাটি থেকে একটুখানি হলুদ নিয়ে নওমির গায়ে ছোঁয়ায়। এরপর সায়ান উঠে আসতে চাইলে মিসেস শারমিন বলেন,

__:- আরে উঠে আসছিস কেনো। একটু ক্ষীর তো মুখে ছোঁয়া।

সায়ান টলমল চোখে ক্ষীরের প্লেট থেকে একটু খানি ক্ষীর নিয়ে নওমি কে খাইয়ে দেই।

মিসেস সাবরিনা তখন পিছন থেকে বলেন,

__:- বেটা নওমির জন্য দোয়া করে দে।

সায়ান ওর মায়ের দিকে তাকাই তারপর আবার নওমির দিকে তাকিয়ে নিজের পকেট থেকে ৫০০০ টাকা বের করে নওমির হাতে গুজে দিয়ে বলে,

সায়ান:- খুব সুখে থাক। ভালো থাক। আল্লাহ্ যেনো তোকে কোনো কিছুর অভাব বুঝতে না দেই। আমি সবসময় মন থেকে তোর জন্য দোয়া করব।

বলেই সায়ান স্টেজ থেকে নেমে আসে আর জলদি করে নিজের রুমের দিকে যায়। এখানে আর একমুহুর্ত থাকলেই সে নিজেকে আর সামলাতে পারবে না।

আর সে চাইনা সবার সামনে এই ভাবে নিজের ইমোশন কে প্রকাশ করতে। রুমে এসেই সায়ান দরজা বন্ধ করে দেই আর কান্না করতে থাকে।
,,,,,,,,,,,

আরিয়ান:- ইভান ভাই আমার, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা কর। চল স্টেজে চল। সবাই হয়তো তোকে খুঁজছে। তুই না গেলে নওমি, আম্মু সবার খুব খারাপ লাগবে।

ইভান:- সায়ানের কত বড় সাহস যে ও আমার জিনিসের দিকে নজর দেই। আমি ওকে ছাড়বো না। ছোট থেকেই ওকে ছাড় দিয়ে আসছি কিন্তু আর না।

আরিয়ান:- এইসব পরেও করতে পারবি। দেখ আম্মু সেই কখন থেকে কল দিচ্ছে আর বলছে যে আমরা কোথায় আছি। চল ভাই প্লিজ চল।

ইভান:- তুই যা আমি যাবো না।

আরিয়ান:- ইভান বড় ভাই হিসেবে বলছি তুই এক্ষণই আমার সাথে যাবি, চল।

ইভান:- আরে আমি বললাম তো আমি যাবো না। (রা’গী গলায়)

আরিয়ান:- বেশ তবে রা’গ করে এখানেই বসে থাক। আর সায়ান তোর বউকে পটিয়ে নিক। এমনিতেই ফুপি তোর ওপর অসন্তুষ্ট। ফুপি তো তোকে এ ও বলেছে যে আইরা কে ডিভোর্স দিতে। আর ফুপি সায়ান কে খুব ভালোবাসে। সায়ান কে যা বলে তাই করে। শেষে আবার দেখা গেলো তোর সাথে আইরার ডিভোর্স দিয়ে সায়ানের সাথে না বিয়ে দেই। আর তুই নিজের রা’গ নিয়েই ঘরে বসে থাক। কোথায় বউয়ের পিছন পিছন ঘুরে তার রা’গ ভাঙ্গাবে তা না করে নিজে রে’গে বসে আছে। থাক তুই আমি গেলাম। আমি আর কারো বউয়ের খেয়াল রাখতে পারবো না। যার যার বউ সে খেয়াল রাখবে। (মেকি রা’গ দেখিয়ে)

আরিয়ান, ইভানের রুম থেকে বের হয়ে যায়। ইভান কিছুক্ষণ বসে থেকে আরিয়ানের বলে যাওয়া কথা গুলো মন দিয়ে ভাবতে থাকে।

ইভান:- সত্যি তো। আরিয়ান তো ঠিক কথাই বলেছে। মম যদি সত্যি আইরা কে সায়ানের সাথে বিয়ে দিয়ে দেই তখন আমার কি হবে। না না এভাবে এখানে বসে থাকলে চলবে না, নিচে যায়।
,,,,,,,,

__:- আরে আরিয়ান তুই একা কেনো ইভান কোথায়।

আরিয়ান:- ওর রুমে। (গম্ভীর কণ্ঠে)

__:- সেকি ও রুমে কেনো। অনুষ্ঠান তো এখানে হচ্ছে। যা ওকে ডেকে নিয়ে আয়।

আরিয়ান:- আমি কি জানি, আম্মু। আমি ওকে বলেছিলাম, কিন্তু ও আসবে না বলল।

__:- তা বললে হয় নাকি। দাড়া আমি ওকে ডেকে আনি।

বলেই মিসেস রুবিনা, ইভানের রুমের দিকে যাবেই এমন সময় ইভান তার সামনে হাজির হয়।

ইভান:- আরে মামনি এই তো আমি। তোমাকে আর ক’ষ্ট করতে হবে না।

__:- তুই রুমে কি করছিলি। চল নওমির কাছে।

ইভান ও মিসেস রুবিনার সাথে নওমির কাছে যায়। নওমি কে হলুদ লাগিয়ে ইভান পিছে মুড়ে আইরা কে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে। মিসেস শারমিন, মিসেস সাবরিনার সাথে কথা বলছিলেন। এখন আইরার কাছে কেউ নেই।

চলবে….

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x