গল্প: রাগে অনুরাগে(১৪)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

১৪.
~
ঔষধ খাওয়ার পর তনিমার জ্বর কিছুটা কমলেও এখন আবার বেড়েছে। সবাই শুয়ে পড়লেও ফায়াজের চোখে ঘুম নেই। বিচলিত চোখে চেয়ে আছে তনিমার মুখ পানে। তনিমার মুখটা লাল হয়ে আছে। ঠোঁট দুটো হালকা পাতলা কাঁপছে তার। ফায়াজ ক্রমাগত তার মাথায় জল পট্টি দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাও জ্বর নামছে না। ফায়াজ এবার অস্থির হয়ে ছুটে গেল ওয়াশরুমে, তারপর বালতিতে কিছুটা পানি আর মগটা হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে এল। তনিমাকে আস্তে আস্তে করে আড়াআড়ি ভাবে শুয়ালো। মাথার নিচে বালিশ রেখে মাথাটা খানিকটা উঁচু করলো। তারপর তার মাথায় পানি ঢালতে লাগল।

রাত তখন অনেক গভীর। দূরে কিছু কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে।
ফায়াজের চোখটা লেগে এসেছিল, হঠাৎ কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো সে। তাকিয়ে দেখল তনিমা বসে আছে। ফায়াজকে দেখে তখন তনিমা ক্লান্ত কন্ঠে বললো,

‘পানির গ্লাসটা নিতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে, ফায়াজ।’

ফায়াজ নরম গলায় বললো,

‘তুই কেন উঠতে গেলি? আমাকে বললেই তো আমি দিতাম।’

কাঁচের গ্লাসটা ভেঙে যাওয়ায় ফায়াজ সেটা পরিষ্কার করে রান্নাঘরে থেকে আরেকটা গ্লাস নিয়ে এল। তারপর তনিমাকে পানি দিয়ে ফায়াজ তার কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল, তনিমা ঘামছে। জ্বরটা ছেড়েছে তাহলে।

তনিমাকে‌ বুকে জড়িয়ে ফায়াজ বিছানার হেডবোর্ডটার সাথে হেলান দিয়ে বসলো। তনিমা ফায়াজের বুকের সাথে মিশে আছে। ফায়াজের শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণটা সে অনুভব করতে পারছে। ফায়াজ তনিমার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বললো,

‘এখন শরীর কেমন তোর? খারাপ লাগাটা কমেছে?’

তনু মাথা হেলিয়ে মৃদু সুরে বললো,

‘হুম।’

তারপর দুজনেই চুপ হয়ে রইল। ফায়াজ চুপচাপ তনিমার মাথায় বিলি কেটে যাচ্ছে। আর তনিমা তার বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে তার শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছে। ঐ ভাবেই তনিমা কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে হঠাৎ সে ফায়াজের বুকে আলতো করে তার নাক ঘষলো। তারপর অস্পষ্ট স্বরে বললো,

‘আমায় একটু ভালোবাসবি, ফায়াজ?’

ফায়াজ প্রথমে না বুঝলেও পরক্ষনেই তার মস্তিষ্ক জেগে উঠল। বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দনটা হঠাৎ বেড়ে গেল। তনিমার মাথার উপর ফায়াজ ঠোঁট লাগিয়ে চুমু খেল, অতঃপর সে বললো,

‘কিভাবে ভালোবাসতে হয় রে? আমি তো জানি না।’

তনিমা রাগি লুকে ফায়াজের দিকে তাকাতেই সে হাসলো, বললো,

‘রেগে যাচ্ছিস কেন? আমি রাগার মতো কিছু বলেছি নাকি? আমি সত্যিই ভালোবাসতে জানিনা। কি করে ভালোবাসে বলতো? আমাকে একটু শিখিয়ে দিবি?’

তনিমা রাগে ফুঁসছে। নাক ফুলিয়ে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তনিমার রাগ দেখে ফায়াজ ঠোঁট চেপে হাসছে। ফায়াজের হাসির মাঝেই, হঠাৎ তনিমা এমন একটা কাজ করে বসলো যেটা ফায়াজ কখনো কল্পনাও করতে পারে নি।

ফায়াজের ঠোঁটে ঠোঁট বসালো তনিমা। তনিমার উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়ায় ফায়াজ পুরো স্তব্ধ। তনিমা অনেকক্ষণ ফায়াজের ঠোঁট আঁকড়ে বসে ছিল।

ফায়াজকে ছেড়ে তনিমা এবার সোজা হয়ে বসলো। তারপর সে রাগ দেখিয়ে বললো,

‘এবার বুঝেছিস কিভাবে ভালোবাসতে হয়?’

ফায়াজ হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল তার দিকে। ঠোঁটের উপর হাত রেখে সে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠল,

‘তুই আমাকে চুমু খেলি?

‘হুম খেলাম।’

ফায়াজ বেশ অবাক হলো তনিমার কথায়। এমনিতে যে মেয়ে কিনা ফায়াজ একটু কাছে গেলেই লজ্জায় মরে যেত, সে আজ নিজ থেকে তাকে চুমু খেয়েছে? ব্যাপারটায় অবাক না হয়ে পারলো না সে। তনিমা এবার ফায়াজের কাছে গেল, তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,

‘একটু ভালোবাসলে কি হয় ফায়াজ?’

ফায়াজ জোরে নিঃশ্বাস নিল। মেয়েটার জ্বরের ঘোর হয়তো এখনো যায়নি। ফায়াজ তখন মৃদু হেসে বললো,

‘আমি তো তোকে ভালোবাসিই, খুব ভালোবাসি। সেই ছোট্ট বেলা থেকে, যখন তুই তোর ছোট ছোট চুলের দুই বেণী দুলিয়ে দুলিয়ে আমার সামনে হেসে খেলে কথা বলতি, তখন থেকেই ; বিশ্বাস কর তখন না আমি হা করে তোকে দেখতাম।‌ একটা মেয়ে এতটা মিষ্টি কি করে হয় বলতো? উফফ, আমার রসগোল্লা!’

তনু ফিক করে হেসে দিল। ফায়াজও হাসলো। তনু বললো,

‘আচ্ছা শোন, আমরা হানিমুনে যাবো কবে? আচ্ছা, কোথায় যাওয়া যায় বলতো? সাজেক যাবি? আমি না কখনো সাজেক যায়নি। আমাকে নিয়ে যাবি, প্লিজ!’

ফায়াজ মুচকি হেসে বললো,

‘ঠিক আছে।’

তনু খুশিতে ফায়াজকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আদুরে গলায় বললো,

‘এবার ভালোবাস আমায়!’

ফায়াজ আলতো হেসে তনিমার গলায় মুখ ডুবাল।

___________________________

সকালে মিষ্টি রোদের ঝলকানিতে তনিমার ঘুম ভাঙল। নিজেকে ফায়াজের উন্মুক্ত বুকে দেখে মিষ্টি হাসলো সে। তারপর সে ফায়াজের লোমশ বুকটাতে কিছুক্ষণ নিজের ঠোঁট বুলালো। ফায়াজের ঘুম ভেঙে গেল। তনিমাকে জড়িয়ে উল্টো পাশে শুইয়ে তার বুকে মাথা রাখল। তনিমা মৃদু হেসে ফায়াজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। ফায়াজ তনুর বুকের উপর ঠোঁট বুলাতেই সে শিউরে উঠলো। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে তনিমা বললো,

‘ফায়াজ ছাড়, আমি উঠব।’

ফায়াজ তো ছাড়লই না উল্টো আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। ফায়াজের উষ্ণ নিঃশ্বাস তনু কে অস্থির করে তুলছে। ফায়াজের ঠোঁটের স্পর্শ গভীর থেকে আরো গভীর হয়ে উঠছে। তনু আবেশে চক্ষু মুদন করলো।

দরজার ঠকঠক আওয়াজে তনু চোখ খুললো। ফায়াজ কে বললো,

‘ফায়াজ, কে যেনো দরজায় নক করছে। দরজাটা খোল গিয়ে।’

ফায়াজ বিরক্ত হলো, যাকে বলে চরম বিরক্ত। তনিমাকে ছেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর শার্টটা গায়ে দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা খুললো। দরজাটা খুলতেই তনিমার মায়ের অস্থির কন্ঠ খানা শোনা গেল।

‘তনিমা এখন কেমন আছে, ফায়াজ? ওর জ্বরটা কমেছে?’

ফায়াজ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেশ ফুটিয়ে তুলে বললো,

‘জ্বি মা, এখন ও অনেকটাই সুস্থ।’

মায়ের মুখে যেন প্রশান্তির হাসি ফুটলো।

‘আচ্ছা বাবা, তুই তাহলে ওকে নিয়ে খেতে আয়। আমি তোদের জন্য নাস্তা বানাতে গেলাম।’

ফায়াজ হেসে বললো,
‘ঠিক আছে মা। আমি তনুকে নিয়ে আসছি।’
.

ফায়াজ রুমে এসে দেখল তনিমা নাকে মুখে কম্বল দিয়ে শুয়ে আছে। ফায়াজ এক টানে তনিমার গায়ের উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে বললো,

‘অনেক ঘুমিয়েছিস, উঠ এবার।’

তনিমা এক চোখ খুলে ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘এমনি এমনি উঠবো না। আমাকে ভালোবাসা দিয়ে উঠাতে হবে।’

ফায়াজ সরু সরু চোখে তনিমার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘সারারাত এত ভালোবাসা দিলাম, তাও তোর এখন আরো ভালোবাসা লাগবে? এত ভালোবাসা‌ রাখবি কই বলতো?’

তনিমা ব্রু কুঁচকে বললো,

‘সেটা আমার ব্যাপার।‌ তোকে যা বলেছি তুই তাই কর। আমাকে আদর করে ডেকে ঘুম থেকে থেকে তুলবি, শুধু এখন না সবসময়। বুঝেছিস?’

ফায়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,

‘ওকে ম্যাডাম, আপনি যা বলবেন তাই হবে।’

‘ঠিক আছে। আর শোন, আমাকে এখন থেকে আর তুই বলা যাবে না। তুমি করে বলতে হবে। সবার সামনেও তুমি আর আমি একা থাকলেও তুমি, বুঝেছিস?’

ফায়াজ‌ ব্রু কুঁচকে বললো,

‘শুধু কি আমি একাই বলবো, তুমি বলবে না?’

ফায়াজের মুখে তুমি ডাকটা শুনে তনিমার অন্তরটা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।  যেন এই ছোট্ট ডাকে তাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পেয়েছে…

চলবে…

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x