লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
১৩.
~
জ্বরে রীতিমতো কাঁপছে তনিমা। ফায়াজ অস্থির হয়ে তার কপালে জল পট্টি দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই তাকে ডাক্তার দেখে গিয়েছে। ঔষধ দিয়েছে, কিন্তু সমস্যা হলো খালি পেটে খাওয়ানো যাবে না। আর তনিমাকে শোয়া থেকে উঠানোও যাচ্ছে না যে কিছু খাইয়ে ঔষধ খাওয়াবে। ফায়াজ বেশ কিছুক্ষণ তনিমাকে ডেকেছে। কিন্তু জ্বরের ঘোরে মেয়েটা কিছু শুনতেও পাচ্ছে না। তনিমার বাবা-মা, তানভীর, ফিহা সকলেই দুশ্চিন্তা করছে। ফায়াজ এবার বিচলিত কন্ঠে বলে উঠল,
‘মা, তনিমাকে তো জাগানোই যাচ্ছে না। ওকে কিছু খাইয়ে তো ঔষধ খাওয়াতে হবে। কি করবো মা?’
তনিমার মার কপালের দুশ্চিন্তার রেখাটা আরো তীব্র হলো। তিনি এবার মেয়ের মাথায় ক্রমাগত হাত বুলিয়ে তাকে ডাকতে লাগলেন,
‘তনু, এই তনু! মা আমার, উঠ না মা। কিছু একটা খেয়ে নে মা। ঔষধ খেতে হবে তো নাকি? নাহলে জ্বর কমবে কি করে? মারে তাকা না আমার দিকে।’
তনু কিঞ্চিৎ নড়ল, তবে চোখ মেলে তাকাল না। তনুর মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তনুর শরীরের তাপমাত্রা যেন তার হাতকে ঝলসে দিবে। চোখ ভিজে উঠল তার। মেয়ের এইটুকু কষ্টও যে সহ্য করতে পারেন না তিনি। মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তনুর বাবা তার পায়ের নিচে বসে ছিল। তিনি গিয়ে তাকে কড়া গলায় বললেন,
‘তোমার মেয়েকে উঠতে বলবে নাকি আমি ওকে ঠাস ঠাস করে দুটো লাগাবো? এতগুলো মানুষ ওকে তখন থেকে ডেকে চলছে অথচ ও এখনও চোখ অবধি খুলছে না। এত কিসের ঘুম ওর? ওকে বলো, পরে ঘুমাতে পারবে। এখন যেন উঠে আগে কিছু খেয়ে ঔষধ খায়। তারপর যত খুশি পরে ঘুমাক কেউ ওকে আটকাবে না।’
কথাটা বলে মেকি রাগ দেখিয়ে রুমের এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। তনিমার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েটা তার বড্ড দূর্বল। কিছু থেকে কিছু হলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তনিমার বাবা মেয়ের পায়ের উল্টো পিঠ ঘষতে ঘষতে মেয়েকে ডাকতে লাগলেন।
গায়ের তাপমাত্রা এখনও কমেনি। তনিমা জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে। ফিহা ভিডিও কলে রিনা রহমানকে তনিমার অবস্থা দেখিয়েছে। উনিও ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ে তনিমার এই অবস্থা দেখে। অনেকটা সময় পাড় হলো। তনিমা এবার চোখ মেলল। চোখের পাল্লা মেলে রাখতে পারছে না সে। তাও তাকালো। মায়ের কান্নামাখা মুখটা দেখে তনিমার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফায়াজ তনিমাকে আস্তে আস্তে উঠে বসালো। কিছুক্ষণের জ্বরেই তনিমার চোখ মুখের অবস্থা বারোটা ভেজে গেছে। তনিমা পানি খেতে চাইলে ফায়াজ তাকে পানি দিল। তনিমার মা ততক্ষণে খাবার নিয়ে হাজির। খাবার দেখেই তনিমার কান্না পেয়ে গেল। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে সে অসুস্থ কন্ঠে বলে উঠল,
‘আম্মু, আমার বমি পাচ্ছে। আমি এখন কিছু খেতে পারবো না।’
তনিমার মা তার পাশে বসলো। তারপর আলতো হেসে নরম গলায় বললো,
‘বেশি খেতে হবে না মা, এই দুই লোকমা খাবি। তারপর ঔষধ খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়বি। আর কেউ তোকে জ্বালাবে না।’
তনিমা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো,
‘আম্মু, আমার সত্যিই এখন খুব বমি পাচ্ছে। একটু পরে খাই?’
মেয়ের এমন আকুতিমাখা কন্ঠ মায়ের মনের অস্থিরতাকে আরো বাড়িয়ে দিল। তিনি তখন খাবারের প্লেটটা পাশে রেখে বললেন,
‘আচ্ছা ঠিক আছে। খাবারটা এখানে রেখে দিয়ে যাচ্ছি একটু পরে এসে আমি খাইয়ে দিয়ে যাবো। তখন কিন্তু আমি আর কোনো কথা শুনবো না। মনে থাকে যেন!’
তনিমা মাথা নাড়াল। তার মা তার কপালে চুমু খেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তনিমার বাবাও তাকে আদর দিয়ে রুম থেকে চলে গেলেন। তারপর একে একে ফিহা আর তানভীরও বেরিয়ে গেল। সবাই বেরিয়ে যেতেই তনিমা ফায়াজের দিকে তাকাল। তার চোখ মুখের দুশ্চিন্তা তনিমাকে এই মুহুর্তে বড্ড প্রশান্তি দিচ্ছে। তনিমা ফায়াজের ডান হাতটা চেপে ধরে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ফায়াজ, তোর চোখ মুখ এমন কেন হয়ে আছে? অসুস্থ তো আমি তাহলে তোর চেহারা এত বিষন্ন লাগছে কেন?’
ফায়াজ তাকাল তার দিকে। চোখে মুখে মেকি রাগ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে সে বললো,
‘বিষন্ন লাগবে না, তোর সেবা করতে করতেই তো আমি শেষ। তুই তো ইচ্ছে করে অসুস্থ হয়েছিস, যেন আমাকে ইচ্ছেমতো খাটাতে পারিস। কি দরকার ছিল আজকে বৃষ্টিতে ভেজার? শুনিস তো আমার কথা, এখন কে ভুগছে? কথা না শুনলে এমনই হয়।’
ফায়াজ যেন রাগে ফোসফোস করছে। তনিমা ফায়াজের হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। হঠাৎ করেই তার চোখ ভিজে উঠল। ভেজা গলায় সে তখন ফায়াজকে বললো,
‘তুই এমন কেন ফায়াজ? কেন নিজের মনের কথাটা বলতে চাস না? তুই যে আমাকে ভালোবাসিস সেটা আমি জানি। অযথা মিথ্যা বললে কি লাভ? সময় থাকতে নিজের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দে। নয়তো দেখবি একদিন এই সময়টাই তোর কাছে আর থাকবে না। পরে আফসোস করবি। জানিস তো আপাত দৃষ্টিতে মানুষের জীবনটা খুব বড় মনে হলেও আসলে কিন্তু এই জীবন চক্রটা খুব ছোট। এই যেমন ধর না আমার এখন জ্বর হয়েছে, এমনও তো হতে পারে এই সামন্য জ্বরেই আমি মারা গেলাম। হতেই তো পারে, তাই না? মানুষের মারা যাওয়ার তো আর আহামরি তো কোনো কারণের প্রয়োজন পড়ে না। আর..’
তনিমা আর কিছু বলতে পারলো না। ফায়াজের অগ্নিচক্ষু দেখেই তার সব হাওয়া ফুঁস। ফায়াজ রাগে দাঁতে দাঁত পিষছে। তনিমা এবার ছোট্ট ঢোক গিলে বললো,
‘আমি তো শুধু কথার কথা বলছিলাম। তুই এতো সিরিয়াস হলি কেন?’
ফায়াজ ফট করেই তনিমার একদম কাছে চলে গেল। আরেকটু এগুলেই তনিমার ঠোঁটে তার ঠোঁট লেগে যেত। তনিমা চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। ফায়াজের রাগ যে এখনও বিন্দু মাত্র কমেনি সেটা সে হারে হারে টের পাচ্ছে। ফায়াজ তনিমার মাথার দুপাশে হেডবোর্ডের উপর দু হাত রেখে তনিমার কপালের সাথে তার কপাল লাগাল। তারপর আক্রোশ নিয়ে সে বললো,
‘এতই যখন ভালোবাসা বুঝিস, তাহলে বাসর রাতে তুই কেন বলেছিলি যে, তুই এই বিয়েটা মানিস না? আমি যেন তোর স্বামী হওয়ার চেষ্টা না করি। সেদিন তো তুই আমার সাথে এমন ব্যাবহার করেছিস যেন, তুই আমাকে খুব ঘৃণা করিস। তাহলে আজ কেন এসব বলছিস? আমি তোকে ভালোবাসি কি বাসি না সেটা আমার ব্যাপার, তোকে কেন সেটা বলতে যাবো? তুই বলেছিস আমায় কিছু? উল্টো বাসর রাতে তুই আমাকে অপমান করেছিলি। তখন তোর মনে ছিল না এই ভালোবাসার কথা?’
তনিমা চোখ নামিয়ে ফেলল। এখন সে কি করে ফায়াজকে বুঝাবে ঐসব সে শুধুমাত্র করেছে ফায়াজকে বাধ্য করতে তার ভালোবাসা স্বীকার করার জন্য। তনিমার কোনো উত্তর না পেয়ে ফায়াজ তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর কোনো কথা না বলেই সে সোজা বারান্দায় চলে গেল। তনিমা চেয়ে রইল বারান্দার দিকে।
আকাশ মেঘলা হলেও বাইরে এখন বৃষ্টি নেই। ঠান্ডা বাতাসে বারান্দার দরজার নীল সাদা পর্দাগুলো উড়ছে। তনিমা মন খারাপ করে চেয়ে রইল সেই পর্দাগুলোর দিকে। ভালোবাসে যখন বলে দিলেই পারে। অযথা এত কথা ঘুড়িয়ে প্যাঁচিয়ে কি লাভ?
‘ফায়াজ, আমি তোকে ভালোবাসি!’
নিস্তব্ধ এই পরিবেশে তনিমার কন্ঠস্বর যেন নুপুরের মতো বেজে উঠল। ফায়াজের কর্ণকুহুরে কথাটা পৌঁছতেই মস্তিষ্কের মাঝে এটা বাজতে লাগল, ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি’। চারদিকে কেবল ভালোবাসা আর ভালোবাসা..
চলবে..