পর্ব:০৪
লেখনীতে:মিফতাহুল জান্নাত জেমিম
আগের রাতে বৃষ্টির দাপট ছিল, তাই ভোরের বাতাসটা এখনো ভারী আর ভিজে মাটির ঘ্রাণে ম ম করছে। আতিকার জন্য এই সকাল মানেই এক মহাযুদ্ধের শুরু। প্রতিদিনের মতো আজকেও সে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রিকশা নিয়েছে, কিন্তু মোড়ের মাথার ভাঙা রাস্তা আর জমে থাকা বৃষ্টির পানি তার হিসাবটা ওলটপালট করে দিল। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা যেন আজ একটু বেশিই নির্দয়। যখন সে রিমির বাসার দরজার সামনে পৌঁছাল, তখন কবজির ছোট ঘড়িটা জানান দিচ্ছে—আটটা বেজে পাঁচ মিনিট।
আতিকা কলিং বেল টেপার আগেই ভিতর থেকে সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল, “আতিকা আপু! তুমি না কইছিলা ঠিক আটটায় আসবা? এহন বাজে আটটা পাঁচ মিনিট!”
রিমি—ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। মাস ছয়েক হলো সপরিবারে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। ওর বাবা মধ্যবিত্ত সচ্ছলতার খোঁজে ঢাকায় থিতু হলেও রিমির মনের ভেতরের সেই গ্রামীণ সরলতা আর কথার আঞ্চলিক টানটুকু এখনো শহরের ইট-পাথরের দেয়ালে বন্দি হয়নি। আতিকা অনেক চেষ্টা করেও ওর এই কথার ধরণ বদলাতে পারেনি, কিন্তু মেয়েটার সারল্য আতিকার ভেতরের কাঠিন্যকে নিমেষেই গলিয়ে দেয়।
আতিকা হেসে ফেলে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। রিমি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন খুব বড় কোনো অপরাধীকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে। আতিকা ব্যাগটা সোফায় রাখতে রাখতে বলল, “তুই যদি জানতি রাস্তায় কতগুলো গর্ত ছিল! বৃষ্টির পর রাস্তা যে অবস্থা, মনে হচ্ছিল সকাল সকাল আমার রিকশাটা দুলছিল নৌকার মতো। আমি তো ভেবেছিলাম মাঝপথে ডুবেই যাব!”
রিমি মোটেও গলার স্বর নামাল না, চোখ পাকিয়ে বলল, “এইসব বাহানা আমারে দিয়ে লাভ নাই। পড়তে বসাইলে তোমারেই জিজ্ঞেস করুম—লেটের কারণে পড়া কম দিবা, তাই না?”
আতিকা চেইন টেনে বই বের করতে করতে গম্ভীর হওয়ার ভান করল, “একদম না। বরং আজ একটু বেশি পড়াবো। এইভাবে ঢঙ করে পালানোর পথ খুঁজিস না। আর শোন, সময় পাঁচ মিনিট গেছে বলে কি পড়ার চাপ পাঁচ গুণ কমবে ভেবেছিস?”
রিমি এবার একটু নরম হলো। সে আতিকার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, “আচ্ছা আপু, একটা কথা কই? তুমি কি ছোটবেলায়ও এমনই সিরিয়াস আছিলা? মানে সারাক্ষণ পড়ালেখা আর এইরকম রাশভারী চেহারা?”
আতিকার হাতটা বইয়ের ওপর স্থির হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে হারিয়ে গেল তার ফেলে আসা কৈশোরে। যেখানে অভাব ছিল না, কিন্তু ছিল এক নিদারুণ মানসিক শূন্যতা। রাহনুমা বিবির সেই চাপা কান্না আর একাকীত্বের মাঝে আতিকাকে অকালপক্ক হতে হয়েছিল। সে ম্লান হেসে বলল, “আমার মনে হয় তখন আরও ভয়ংকর ছিলাম। হাসি কী জিনিস হয়তো জানতামই না।”
রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তাইলে তো দয়া কইরা তুমি ভয়ংকর না হইয়া মানুষ হও। পড়ালেখার আগেই এক কাপ চা খাও, আমি বানায় আনতেছি। তোমার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে কাল রাতে ঠিকমতো ঘুমাও নাই।”
“তুই না থাকলে সকালে মনই ভালো হতো না রে। যা, চা আন—আজকে পড়া কিন্তু ছাড়ব না। চা খেতে খেতেই ওই ইংরেজি থিওরিটা বুঝিয়ে দেব।”
রিমি রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে পেছনে তাকিয়ে শাসিয়ে গেল, “তুমি যদি চা না খাও, বই খুলতে দিব না। আর বেশি বুঝাইলে কিন্তু চিনি ছাড়া চা দিমু!”
আতিকা মাথা নাড়ল। এই মেয়েটার মাঝে এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—সে বিরক্তি আর ভালোবাসা একসাথে মিশিয়ে আতিকার পাথুরে জীবনে একটুখানি মায়া ছড়িয়ে দিতে পারে।
***রিমির বাসা থেকে বেরিয়ে ভার্সিটি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আতিকার মনের মেঘগুলো যেন ক্যাম্পাসের চিরচেনা কোলাহলে মিশে গেল। গত কয়েকদিন ধরে ক্যাম্পাসটা আতিকার কাছে নতুন কোনো গোলকধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। এর প্রতিটি কোণ, প্রতিটি করিডোর এখন আর কেবল ইটের গাঁথুনি নয়, বরং একটা মানুষের অস্তিত্বের সাক্ষী দিচ্ছে।
শিহাব। ইখতিয়ার শিহাব।
নামটা এখন আর আতিকার কাছে কেবল এক উদ্ধত সিনিয়র বা প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলের পরিচয় বহন করে না। কোনো এক বিচিত্র উপায়ে লোকটা আতিকার চারপাশের বাতাসে তার উপস্থিতি ছড়িয়ে দিয়েছে। ক্যান্টিনের জটলায় যখন আতিকা চা নিতে দাঁড়ায়, দূর থেকে এক জোড়া চোখের দৃষ্টি সে অনুভব করে। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ শুনতে পায় সেই পরিচিত চাপা হাসির শব্দ। যেন শিহাব নামের ওই দুর্বোধ্য মানুষটি আতিকার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে বিচরণ করছে।
ব্রেক টাইম। আতিকা আজ একটু ক্লান্ত। গত রাতের অ্যাসাইনমেন্ট আর ভোরের টিউশনির ধকল সহ্য করতে না পেরে সে লাইব্রেরির এক নির্জন কোণ বেছে নিল। পুরোনো বইয়ের গন্ধ মাখানো এই শীতল ঘরে এক ধরণের প্রশান্তি আছে। আতিকা তার রেফারেন্স বইগুলো পাশে রেখে টেবিলের ওপর দুহাত পেতে মাথা নামিয়ে রাখল। চোখের পাতা দুটো যখন ভার হয়ে আসছিল, তখনই টেবিলের ওপর হালকা একটা খসখস শব্দ হলো।
সে চোখ তুলে তাকাল। মুহূর্তেই তার সব ক্লান্তি উবে গেল বিস্ময়ে। তার চোখের সামনে একদম সতেজ, মলাট দেওয়া একটা বই পড়ে আছে— “Modern Literary Theories: Advanced Volume”।
এই বইটা সে গত এক মাস ধরে খুঁজছে। লাইব্রেরিয়ান বলেছিল বইটা কেউ একজন ইস্যু করে রেখেছে, আর নীলক্ষেতের কোনো দোকানেও এটা পাওয়া যাচ্ছিল না। বইটার ওপর একটা ছোট সাদা কাগজের চিরকুট আঠা দিয়ে লাগানো। তাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা:
“আশা করি এবার আপনার খোঁজ শেষ, আতিক্কা পিঠা—শিহাব”
আতিকার বুকটা হুট করে একটু কেঁপে উঠল। সে দ্রুত চারদিকে তাকাল। লাইব্রেরির লম্বা সারিতে সাজানো আলমারিগুলোর আড়ালে কেউ নেই। জানলার ওপাশে বাতাসের তোড়ে নারিকেল গাছের পাতা দুলছে। শিহাব লোকটা কি তবে তার মনের ইচ্ছের হদিসও রাখা শুরু করেছে? আতিকা চিরকুটটা হাতে নিল। হাতের লেখাটা সুন্দর, কিন্তু তাতে এক ধরণের বেপরোয়া ভাব আছে—ঠিক শিহাবের চরিত্রের মতো।
নিজের অজান্তেই আতিকার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “পাগল লোক… যত্তসব আদিখ্যেতা!”
ভাগ্যিস আজ সোহা সাথে নেই। থাকলে এতক্ষণে পুরো লাইব্রেরি মাথায় তুলে ফেলত। সোহার মতো ড্রামাটিক বান্ধবী থাকলে গোপন হাসিও জনসমক্ষে চলে আসে। তবে সোহার কথা মনে পড়তেই আতিকার মনটা একটু ভার হয়ে গেল। সোহা ছাড়া এই ক্যাম্পাসের চত্বরগুলো কেমন যেন পানসে লাগে। আতিকার সবটুকু রুক্ষতা আর একগুঁয়েমি সোহা নামক ওই নরম মানুষটার কাছে গিয়ে হার মানে। বিকেলে একবার হোস্টেলে গিয়ে ওকে দেখে আসতে হবে। সোহা না থাকলে আতিকার মনে হয় তার জগতের একটা বড় অংশ অন্ধকার হয়ে আছে!
আতিকা বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে লাগল, কিন্তু অক্ষরগুলো যেন চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মনে পড়ে গেল কাল রাতের কথা। আদিয়ানের সেই সংক্ষিপ্ত টেক্সট মেসেজ— “কেমন আছো?”
আদিয়ান। আতিকার জীবনের সেই ধূসর অধ্যায়, যাকে সে না পারে ভুলতে, না পারে আপন করতে। আদিয়ান সম্পর্কে আতিকার মনের টানাপোড়েনটা বড় গভীর। সে জানে, এই সমাজের চোখে আদিয়ান তার জন্য এক নিষিদ্ধ নাম। তার মেজ আম্মু-আব্বু, যারা আতিকাকে ছোটবেলা থেকেই করুণা আর অবহেলার চোখে দেখে এসেছেন, তাদের সাথে আদিয়ানের সম্পর্কটা এমন এক জায়গায় যে আতিকার ভালোবাসা সেখানে কেবল একপাক্ষিক যন্ত্রণাই বয়ে আনে।
আতিকা নিজের হাত দুটোর দিকে তাকাল। সে আজ স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই লড়ছে। সে রিকশায় চড়ে, টিউশনি করে, রিমির মতো ছাত্রীকে পড়িয়ে নিজের খরচ চালায় কেবল একটা পরিচয়ের জন্য। যাতে কোনোদিন কারো দয়ায় তাকে বেঁচে থাকতে না হয়। কিন্তু তার মনের এই যে আদিয়ান নামের ক্ষত, এটা তো কোনো অর্থ বা সাফল্য দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়।
শিহাবের কফি অফার করা, লাইব্রেরিতে বই রেখে যাওয়া—এসবই আতিকার মনে এক ধরণের দোলা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই এক অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করে। সে কি তবে আদিয়ানকে দেওয়া তার সেই নীরব প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হচ্ছে? নাকি শিহাবই সেই মানুষ, যে আতিকাকে এই নিঃসঙ্গতার অন্ধকার গহ্বর থেকে টেনে বের করে আনবে?
আতিকা গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইয়ের চিরকুটটা আলতো করে খুলে ব্যাগের গোপন পকেটে রাখল। মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। কেউ হয়তো কাছে থেকেও যোজন যোজন দূরে থাকে, আর কেউ হয়তো এক চিলতে রোদ হয়ে জীবনের সব অন্ধকার কোণগুলোকে আলোকিত করে তোলে। শিহাব সেই রোদ কি না, তা আতিকা এখনো জানে না। তবে এই মুহূর্তে বইটার মলাটের স্পর্শে সে যে শান্তিটুকু পেল, তা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে কম নয়।
বিকেলের আকাশটা মেঘলা হয়ে আসছে। আতিকা জানে, তাকে এখন সোহার কাছে যেতে হবে। জীবনের অনেক না বলা কথা কেবল সোহার সামনেই বলা যায়। রিমির সরলতা, শিহাবের দুষ্টুমি আর আদিয়ানের নীরবতা—এই সবকিছুর মাঝে আতিকা নামের মেয়েটা আসলে কী চায়, তা হয়তো আজও তার নিজের কাছে অজানা।
দরজা পেরিয়ে সে যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে, তখন তার কানে আবার বেজে উঠল সেই নামটা— ‘আতিক্কা পিঠা’। সে মনে মনে হাসল। হয়তো এই বিদ্ঘুটে নামটার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা!
***
বিকেলের আকাশটা তখন ফিকে হয়ে আসা রোদে সোনালি আর তামাটে রঙের এক অদ্ভুত মিশেলে সেজেছে। সারাদিনের লেকচার, লাইব্রেরির ধুলোমাখা বই আর টিউশনির ক্লান্তি আতিকার শরীরে এক ধরণের অবশ ভাব এনে দিয়েছে। সে ফুটপাত ঘেঁষে ধীর পায়ে হাঁটছে। বাতাসের ঝাপটায় তার গায়ের সাদা ওড়নাটা বারবার অবাধ্য হয়ে উড়ছে, যেন সে একখণ্ড সাদা মেঘের মতো নগরের ভিড়ের মাঝে নিজের পথ খুঁজে ফিরছে। রাস্তার ধারের নিম গাছটার ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে তার চলার পথে।
হঠাৎ পেছন থেকে এক চেনা বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে এল। যান্ত্রিক সেই আওয়াজটা পরিচিত, ঠিক যেভাবে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে মানুষ নিজের রক্ত চলাচলের শব্দ শুনতে পায়। আতিকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না। সে জানে, এই শহরে এই বিশেষ বাইকের শব্দের সাথে একটি বিশেষ মানুষের নাম জড়িয়ে আছে।
শিহাব।
বাইকের চাকা ঘুরিয়ে শিহাব ধীরে ধীরে আতিকার একদম পাশাপাশি এল। বাইকের গতি কমিয়ে সে আতিকার হাঁটার ছন্দের সাথে তাল মেলাচ্ছে। শিহাব কোনো কথা বলল না। তার চোখে ছিল এক গভীর নীরবতা, যা হাজারো শব্দের চেয়েও বেশি মুখর। সেই চাউনিতে ছিল এক নীরব প্রস্তাব— “তুমি আজ বড্ড ক্লান্ত আতিকা, তোমার কাঁধের ব্যাগের ভার আর চোখের নিচে জমে থাকা কালিটুকু আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। জেদ ছাড়ো, বাইকের পেছনে বসো, তোমাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিই।”
শিহাবের এই নীরব মায়া আতিকার মনে এক মুহূর্তের জন্য দোলা দিয়ে গেল। এক নিমেষের জন্য তার মনে হলো, যদি সত্যিই এই যান্ত্রিক জীবনের সব ভার কারো কাঁধে তুলে দিয়ে একটু নিশ্চিন্তে বসা যেত! কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরের সেই দাহ্যমান আত্মসম্মান জেগে উঠল। সে তার ঠান্ডা, স্থির দৃষ্টি একবার শিহাবের চোখের ওপর রাখল। মুখে একরাশ নিরাসক্তি ঝুলিয়ে সে খুব শান্ত গলায় বলল, “ধন্যবাদ শিহাব ভাই, কিন্তু আমি একা যেতে পারি। আপনার অযথা চিন্তা করার কোনো দরকার নেই।”
শিহাবের হাসিতে আজ কোনো বিদ্রূপ ছিল না। সে বাইকের ক্লাচ চেপে ধরে ধীর স্বরে প্রশ্ন করল, “আতিকা, তুমি কি সবসময় নিজেকে এভাবে সবার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাও? এই দেয়াল তুলে রাখাটা কি খুব জরুরি?”
আতিকার কপালে এক কুঞ্চন দেখা দিল। সে এবার সরাসরি শিহাবের চোখের মনিতে চোখ রেখে খুব নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল, “দূরত্ব কখনো কখনো আশীর্বাদ হয়ে আসে শিহাব। এই দূরত্বই মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত আর অপ্রয়োজনীয় মায়া থেকে রক্ষা করে। আমি আমার পথে ভালো আছি। আসি।”
আতিকার এই কথাগুলো যেন বিকেলের শান্ত বাতাসকে চিরে দিয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে তার সিধাসাপ্টা ভঙ্গিতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। শিহাব সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তার বাইকের স্টার্ট তখনো বন্ধ হয়নি। সে দেখল আতিকার সাদা ওড়নাটা ক্রমশ ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছে। আতিকা আলাদা—সে কেবল সন্দরী নয়, সে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। যে দুর্গের প্রাচীর কেবল সৌন্দর্য দিয়ে নয়, বরং সীমাহীন আত্মসম্মান আর জেদ দিয়ে গড়া। সে কারো করুণা নেয় না, বরং নিজের একাকীত্বকে আভিজাত্য হিসেবে গ্রহণ করে।
শিহাবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান কিন্তু মুগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের বাইকটা এবার উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিল। ক্লাচ ছাড়ার আগে সে অস্ফুট স্বরে নিজেকেই শোনালো, “আজ না হয় হার মেনেছি আতিকা। কিন্তু মনে রেখো, একদিন তোমার পথের পাশে ঠিক দাঁড়িয়ে থাকব—তবে তোমার করুণায় নয়, তোমার ইচ্ছায়। তোমার এই রুক্ষতা, এই কঠিন অ্যাটিটিউডের আড়ালেও আমি এক ধরণের বিশুদ্ধ ভালোবাসা খুঁজে পাই। তাই তুমি যতই দূরে থাকতে চাইবে, আমার তোমাকে কাছে পাওয়ার তীব্রতা ততই বেড়ে যাবে।”
বাইকটা তীব্র গতিতে রাস্তার মোড় পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আতিকা একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না ঠিকই, কিন্তু তার বুকের ভেতর এক অজানা কম্পন তখনো থামেনি। সে জানে, এই মানুষটা তার জীবনের সেই অংক, যা সে মেলাতে চায় না, কিন্তু যার উত্তর বারবার তার সামনে এসে হাজির হচ্ছে। গোধূলির শেষ আলোটুকু যখন মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন আতিকার মনে হলো—শহরের এই ব্যস্ত পথে সে কি সত্যিই একা, নাকি একজোড়া অদৃশ্য চোখ তাকে সবসময় ছায়ার মতো আগলে রাখছে?
________________________________________
সন্ধ্যার মায়াবী আলো তখন ফিকে হয়ে অন্ধকার নামছে শহরের বুকে। প্রতিদিন এই সময়ে আতিকা রিমির বাসায় বিজ্ঞানের জটিল সূত্র কিংবা ইংরেজির গ্রামার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু আজ তার মন বসেনি। সোহার সেই সকালের ফোন কলটা তার বুকের ভেতর এক অজানা খচখচানি তৈরি করে রেখেছিল। ফোনের ওপাশ থেকে সোহার ভাঙা গলা আর ভার্সিটিতে ওর অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে আতিকা টিউশনিটা আজ বাদ দিয়েই সোজা চলে এসেছে হোস্টেলে।
হোস্টেলের তিনতলার করিডোরটা ভ্যাপসা গরমে গুমোট হয়ে আছে। আতিকা ২০৫ নম্বর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে একবার বুক ভরে শ্বাস নিল, তারপর আলতো করে ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে যা দেখল, তার জন্য আতিকা মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
সোহা—সবসময় যে মেয়েটার হাসিতে পুরো ডিপার্টমেন্ট মুখরিত থাকে, সেই চঞ্চল মেয়েটা আজ বিছানায় গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। ওর পিঠটা কান্নায় কাঁপছে। আতিকার বুকটা ধক করে উঠল। এই দুই বছরের বন্ধুত্বে সোহার চোখে জল দেখা তো দূরের কথা, ওকে কোনোদিন সামান্য গম্ভীর হতেও দেখেনি আতিকা।
আতিকা ব্যাগটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দ্রুত বিছানায় গিয়ে সোহাকে জড়িয়ে ধরল। “কী হয়েছে রে সোহা? আমাকে বল? আমি আছি তো, এই তো আমি এসে গেছি।”
আতিকার স্পর্শ পেতেই সোহার কান্নার বাঁধ যেন পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে আতিকাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। সোহার কান্নার শব্দগুলো আতিকার বুকের ভেতর গিয়ে তীরের মতো বিঁধছিল। আতিকা সোহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বারবার অভয় দিতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ পর সোহা ভেজা গলায় আধো আধো স্বরে বলল, “আম্মু ফোন দিয়ে বললো, আমি আর নাকি এমন একা থাকতে পারবো না। ওরা চায় আমি বিদেশ চলে যাই… কিন্তু আমি তো তোকে রেখে কোথাও যেতে চাই না আতি.. আমি একা তোকে ছাড়া থাকতে পারব না। আমি কী করব বল না?”
আতিকা ভ্রু কুঁচকে একটু অবাক হলো। আন্টি তো সবসময় সোহার মতের ওপর গুরুত্ব দেন। সে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “আন্টি হঠাৎ এমন কথা কেন বলছেন? তুই কি কিছু বলেছিস?”
সোহা চোখ মুছতে মুছতে বলল, “কিছুই বলি নি রে। ওরা আমার ফিউচার নিয়ে টেনশন করছে। বিদেশের ভালো ভার্সিটিতে পড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু দেখ, আমি তো এখানে আমার দেশে ভালই আছি। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আমার আতির সাথে আছি। আমি তোকে ছাড়া অন্য কোনো দেশে থাকার কথা ভাবতেই পারি না।”
আতিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ভেতরের সেই বাস্তববাদী সত্তাটা এবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে বড় একটা শ্বাস নিয়ে ধীর স্বরে বলল, “কী আশ্চর্যের বিষয় তাই না! তোকে আমি আমার বেপাত্তা ব্যবহার আর হুটহাট করে বকা দেওয়া ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি। আর তুই আমার মতো এই আন-সোশ্যাল আর অ্যারোগ্যান্ট একটা মেয়ের জন্য নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বরবাদ করছিস? আই থিঙ্ক আন্টি ঠিকই বলেছেন। তুই ঠান্ডা মাথায় আরেকটু ভেবে দেখ সোহা। উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যাওয়া তোর ক্যারিয়ারের জন্য অনেক বড় সুযোগ।”
সোহার কান্নার বেগ মুহূর্তেই থেমে গেল। তার বদলে চোখে জ্বলে উঠল এক তীব্র অভিমান আর রাগের আগুন। সে আতিকাকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “বাহ! যার জন্য চুরি করি, সেই বলে চোর! আমি কেন আমার জন্মদাতা বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে চাইছি না, সেটা তুই এখনো বুঝলি না আতিকা? তোর এই অতিরিক্ত ‘ম্যাচিউরিটি’র কারণে একদিন তুই বড় বিপাকে পড়বি। তুই নিজেকে অনেক বুদ্ধিমতী আর বুঝদার মনে করিস না? তাহলে কেন আমার মনের কথা বুঝতে পারছিস না আতি!”
আতিকা সোহার এই রুদ্রমূর্তি দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল, “আমি তোর ভালোর জন্যই তো বলছি রে বোন। বিদেশের ডিগ্রি তোর জীবন বদলে দেবে। অবুঝের মতো করিস না, শোন আমার কথা…”
“তুই এখান থেকে চলে যা আতিকা! একদম আমার সাথে আর কথা বলতে আসবি না। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার যোগ্যই না!” সোহার কণ্ঠস্বর অভিমানে বুজে এল। “হ্যাঁ, ঠিকই তো বলেছিস তুই। আমি অবুঝ, আমার মাথায় বুদ্ধি কম, কমন সেন্স একদম নেই। আমার মতো একটা হাঁদা মেয়ের সাথে কি তোর মতো পারফেক্ট মেয়ের বন্ধুত্ব মানায়? সেই জন্যই তো আমায় বিদায় করতে চাইছিস।”
আতিকা এবার সোহার সামনে গিয়ে ওর হাতটা ধরার চেষ্টা করল। “আমাকে ভুল বুঝছিস তুই। আমি মোটেও ওভাবে বলতে চাইনি। আঙ্কেল-আন্টির দিকটা ভেবে আর তোর ভালোর জন্য…”
সোহা এবার সরাসরি আতিকার চোখের দিকে তাকাল। ওর টলটলে চোখের সেই শান্ত প্রশ্নটা আতিকার সব যুক্তি এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। সোহা কাঁপা গলায় বলল, “আচ্ছা, সব মানলাম। কিন্তু আমাকে একটা কথা বল তো আতি, আমি কি তোকে খুব বিরক্ত করি? আমি চলে গেলে তুই কি আমাকে একটুও মিস করবি না? আমি কি এতটাই মূল্যহীন তোর কাছে যে আমাকে তুই প্যাকিং করে অন্য দেশে পাঠিয়ে দিতে পারছিস?”
আতিকা এবার পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। সোহার এই সহজ প্রশ্নটি তার হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন কোঠায় গিয়ে আঘাত করেছে। আতিকার চোখের সামনে গত দুই বছরের প্রতিটি স্মৃতি সিনেমার মতো ভেসে উঠতে লাগল। সেই লাইব্রেরির আড্ডা, বৃষ্টির দিনে একই রিকশায় ভিজে বাড়ি ফেরা, মাঝরাতে সোহার আজব সব আবদার মেটানো, কিংবা আতিকার যখন খুব মন খারাপ থাকে তখন কোনো কথা না বলে সোহার কাঁধে মাথা এলিয়ে দেওয়া। আতিকা বুঝতে পারল, সে যতই নিজেকে গম্ভীর আর স্বনির্ভর দেখানোর নাটক করুক না কেন, সোহার প্রাণবন্ত উপস্থিতিই তাকে জীবন্ত রাখে। সোহা ছাড়া তার জীবনটা হবে এক ধূসর মরুভূমি।
আতিকার চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল। যে আতিকা নিজেকে লোহা বলে দাবি করত, সে আজ তুচ্ছ এক বিচ্ছেদের ভয়ে মোমের মতো গলে গেল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দ্রুত গিয়ে সোহাকে আবার জড়িয়ে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই ও হারিয়ে যাবে।
“এমন করে বলিস না রে সোহা,” আতিকার গলা বুজে এল কান্নায়। “তুই ছাড়া একটা দিনও আমি কল্পনা করতে পারি না। আমাকে ভুল বুঝিস না। আই অ্যাম রিয়ালি সরি। আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। তুই কোথাও যাবি না। আমি তোকে হারিয়ে যেতে দেব না। আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে তোর মতো করে বোঝেনি। তোর আম্মুর সাথে আমি নিজে কথা বলব। উনি আমার কথা ফেলবেন না।”
সোহা আতিকার বুকে মাথা রেখে স্তম্ভিত হয়ে রইল। আতিকার মুখ থেকে ‘সরি’ শব্দটা শোনা যেন আকাশ থেকে চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। যে আতিকা পাহাড়ের মতো অনড়, সে আজ সোহার জন্য কাঁদছে! সোহা বুঝতে পারল, এই কাঠখোট্টা মেয়েটার ভেতরে ভালোবাসার এক সমুদ্র লুকানো আছে।
আতিকা সোহার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে ম্লান হেসে বলল, “কী রে বেদ্দপ, কী ভাবছিস? বললাম তো সরি। তুই কি পারবি না আমার এই কাঠখোট্টা আর ওভার-ম্যাচিউর কথাগুলো সহ্য করে আমার সাথে আজীবন থাকতে?”
সোহা এবার হেসে ফেলল, যদিও চোখে তখনো জল চিকচিক করছে। সে আতিকার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। “পারব রে আতি, পারব। আই উইল অলওয়েজ বি দেয়ার ফর ইউ। আমাদের ফ্রেন্ডশিপ কোনোদিন ভাঙবে না।”
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হয়েছে। হোস্টেলের ছোট ঘরটায় দুই বান্ধবী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। একজনের ভেতর ছিল আকাশছোঁয়া আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য, আর অন্যজনের ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল এক হৃদয়। এই দুই বিপরীত চরিত্রের মিলনমেলার নামই ছিল বন্ধুত্ব—এক অদৃশ্য সুতো, যা বিদেশের হাতছানি কিংবা সময়ের দূরত্ব দিয়ে ছেঁড়া সম্ভব নয়। আতিকা অনুভব করল, জীবনে চলার পথে কেবল নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত হলেই হয় না, পাশে হাত ধরার জন্য এমন একটা বিশ্বস্ত মানুষও লাগে।
________________________________________
রাতের নিস্তব্ধতা যখন শহরটাকে চাদরের মতো ঢেকে দেয়, তখন আতিকার ঘরের জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা মনের ভেতরে জমে থাকা ধুলোবালিগুলো যেন উড়িয়ে দেয়। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, কিন্তু চায়ের লিকারটা আজ হয়তো একটু বেশিই কড়া হয়ে গেছে। আতিকা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় দু-একটা পতঙ্গ ডানা ঝাপটাচ্ছে—ঠিক আতিকার মনের অবদমিত ভাবনাগুলোর মতো।
হঠাৎ করেই তার চেতনার দরজায় করাঘাত করল লাইব্রেরির সেই বইটা আর সেই চিরকুট। ‘মডার্ন লিটারারি থিওরিজ’—বইটার মলাটের স্পর্শ যেন এখনো তার আঙুলের ডগায় লেগে আছে। শিহাবের সেই চিরকুটের লেখাগুলো মনের পর্দায় ভেসে উঠছে বারবার। আতিকা মনে মনে ভাবল, “যে ছেলেটা করিডোরে অতটা উদ্ধত আর গম্ভীর মুখে কথা বলে, সে পর্দার আড়ালে এতটা সূক্ষ্ম আর কোমল হয় কী করে? এটা কি তার স্বভাবজাত সৌজন্য, নাকি নিছকই কোনো গোলকধাঁধার খেলা?”
নিজেকেই একটা মৃদু ধমক দিল আতিকা। চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি কেন এত ভাবছি ওই লোকটাকে নিয়ে? আমার কি মাথা গরম হচ্ছে? নাকি একাকীত্ব আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে!”
কিছুক্ষণ আগেই আতিকা এক অসাধ্য সাধন করেছে। সোহার আম্মুর সাথে টানা এক ঘণ্টা ফোনে কথা বলে তাকে মানিয়েছে। রাহনুমা বিবির মতো সোহার মা-ও আতিকাকে খুব ভরসা করেন। আতিকা যখন নিজের গম্ভীর আর ধীরস্থির কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দিল যে সোহার পড়াশোনা আর দেখভালের দায়িত্ব সে নিজে নেবে, তখন ওপার থেকে আন্টি অবশেষে হার মানলেন। সোহাকে আর জোর করে বিদেশে পাঠানো হবে না।
সোহাকে কথা দিয়ে সে হয়তো নিজের জন্য এক মস্ত বড় টেনশন ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। ওই পাগলী মেয়েটাকে সামলানো আর নিজের টিউশনি-ভার্সিটি সামলানো—দুটো সমান্তরাল যুদ্ধ। আতিকা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। অদ্ভুত এক তৃপ্তি আর আশঙ্কার দোলাচল তার ভেতরে। সে জানে, সোহা ছাড়া তার জগতটা অসম্পূর্ণ। তাই এই বাড়তি দায়িত্বটুকু সে সানন্দেই গ্রহণ করেছে।
তবে আজ রাতের খাবারের টেবিলে পরিবেশটা ছিল ছমছমে নিরব। রাহনুমা বিবি রান্নাটা বেশ যত্ন করেই করেছেন, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। আতিকা আলতো করে ভাতে হাত দিয়েছে মাত্র, ঠিক তখনই তার মা অনেকটা ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বোমাটা ফাটালেন।
“আদি আসছে রে আগামী সপ্তাহে। এক বছরের জন্য। এখানে কোনো একটা ভার্সিটিতে নাকি সাময়িকভাবে চাকরি করবে ও।”
মায়ের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আতিকার হাতের চামচটা প্লেটে লেগে টুং করে একটা শব্দ হলো। তার সমস্ত শরীর যেন এক মুহূর্তে পাথর হয়ে গেল। গলার কাছে খাবারটা আটকে এল তার।
আদিয়ান ভাই আসছে? এই শহরে? তাদের এই চিরচেনা বাড়িতে?
রাহনুমা বিবি মেয়ের দিকে না তাকিয়েই নিজের খাবার গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, হয়তো তিনি আতিকার চোখের সেই আকস্মিক ঝড়টুকু দেখতে চাননি। কিন্তু আতিকার মনের ভেতরে তখন সহস্রাধিক স্মৃতির ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। আদিয়ান—আতিকার জীবনের সেই ধ্রুবতারা, যাকে ছুঁতে না পারলেও যার আলোয় সে এতদিন পথ চলেছে।
আদিয়ান ভাই ছিল আতিকার কৈশোরের একমাত্র আশ্রয়। যে মানুষটির চোখের শাসন আর স্নেহের মাঝে আতিকা নিজের এক অদ্ভুত জগত তৈরি করে নিয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক জটিলতা আর মেজ আব্বুর সেই নিষ্ঠুর ব্যবহারের কারণে আদিয়ান আর আতিকার মাঝে এক অলঙ্ঘনীয় দেয়াল তৈরি হয়েছিল। গত কয়েক বছর আদিয়ান বিদেশে ছিল, আর আতিকা এখানে তিল তিল করে নিজেকে গড়েছে কেবল এই মানুষটির যোগ্য হওয়ার জন্য।
আতিকার কণ্ঠে কোনো শব্দ এল না। তার চোখ দুটো কেবল ভাতের থালার দিকে স্থির হয়ে রইল। মনের গহীনে একরাশ না বলা ভালোবাসা, হাজারো অভিযোগ আর চাপা অভিমান একসাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি করল।
সে চায়ের কাপটা শেষ করে ধীর পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এল। জানালার ওপাশে রাতের আকাশটা আজ বড্ড বেশি রহস্যময়। আতিকা জানে না, আগামী সপ্তাহ তার জীবনে কী নিয়ে আসবে। সে কি পারবে আদিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে তার সেই অপ্রকাশিত ভালোবাসাকে আড়াল করতে? নাকি শিহাবের সেই ‘আতিক্কা পিঠা’ সম্বোধনটাই তার জীবনের নতুন আশ্রয় হয়ে দাঁড়াবে?
অন্ধকারের মাঝে আতিকা কেবল নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে পেল। শহরটা ঘুমিয়ে গেলেও, আতিকার ঘুম আজ অনেক দূরে।
চলবে ইনশাআল্লাহ….